প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।

মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।

এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন।

তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।

২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।

২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

৪২টি লেখা
আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব

ইলম ও আখলাক: বিশ্বমানবতার সংকট উত্তরণের দুই পথ

বর্তমান বিশ্বমানবতা এক গভীর অর্থহীনতার সংকটের মুখোমুখি। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ অনুসন্ধানের পাশাপাশি সেই পথ বিশ্বমানবতার সামনে তুলে ধরাও আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনের জন্য কেবল ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই…

উসূল ও মেথডোলজি

সীরাত পড়ার উসূল ; হযরত পয়গাম্বর (স.) এর জীবনকে কিভাবে পাঠ করবো?

আজ রবিউল আওয়াল মাসের ১২তম রজনী। অর্থাৎ, রাসূলে আকরাম (স.)-এর আগমনের ১৫০১তম জন্মবার্ষিকী। মুসলিম উম্মাহর ঈদে মিলাদুন্নবী মোবারক হোক। সালাত…

চিন্তা ও দর্শন

আল্লাল আল ফাসী; উসূলের নবায়নে তাঁর চিন্তাদর্শন

আল্লাল আল-ফাসী হলেন এমন একজন মুতাফাক্কির ও আলেম যিনি বিংশ শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকাতে মাকাসিদ ও আখলাককে একত্রিত করে নতুন একটি…

ব্যক্তিত্ব

আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ এর চিন্তাদর্শন (১৮৭৫-১৯৪৯)

আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ ঊনবিংশ শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণের একজন। যুগের চাহিদাকে সামনে রেখে তিনি নতুন এক উসূলের অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর…

আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব

আখলাক ও আদালত

আদালত কী? দ্বীনে মুবীন ইসলামে ‘আদালত’ পরিভাষাটি কেবল মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত একটি পরিভাষাই নয়, আদালত একই সাথে বিশ্বজগৎ…

আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব

রিথিংকিং আখলাক

আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্য উপাত্তে, এই তথ্য উপাত্ত আবার বিনোদনের সেক্টরে পরিণত হয়েছে এবং দিন যত গড়াচ্ছে,…

আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব

ইসলামী সভ্যতায় শিল্পকলা ও নান্দনিকতা

মহাবিশ্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এই বিষয়টি হযরত পয়গাম্বর (স) এর - “আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
ইসলামী চিন্তা

বিশ্বায়নের যুগে মাসলাহাত প্রতিষ্ঠায় মুসলিম স্কলারদের ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান রাব্বে কারীমের নামে। দরূদ ও শান্তির বার্তা প্রেরিত হোক আমানাতদার সৎ বান্দার…

আখলাক ও নন্দনতত্ত্ব

ইসলামে পর্দার দর্শন

সমগ্র মানবসভ্যতার জন্যই পর্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষ তাঁর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত থাকার কারণে সৃষ্টির সূচনাকাল…

মুসলিম উম্মাহ

গাজা এবং মুসলিম উম্মাহ

।। বিসমিল্লাহির রহমানীর রাহীম ।। জালিমের বিচারক এবং মজলুমের সহায়ক শক্তিশালী সেই মহান রবের নামে শুরু করছি। প্রশংসা তাঁর, যিনি…

চিন্তা ও দর্শন

আল্লামা ত্বহা আবদুর রহমান ও তাঁর চিন্তাদর্শন

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বহুমাত্রিক একজন আলেম ও চিন্তাবিদ। তাঁর মতো চিন্তাবিদের চিন্তাধারা একটি প্রবন্ধের মধ্যে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে কঠিন…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
ইসলামী চিন্তা

উম্মতে ওয়াসাতের পরিচয়

যে পরিভাষাটি আমাদেরকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে তা হল ‘মুসলিম উম্মাহ’। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, إِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
উসূল ও মেথডোলজি

জ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠগ্রন্থ ” হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা”

ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ যে সকল গ্রন্থ রচনা করেছে তাঁর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’। এই গ্রন্থে তিনি তাঁর…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
ইসলামী চিন্তা

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের চিন্তা ধারায় ‘আকল’

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানকে এই শতাব্দীর গাজ্জালী বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। কেননা তিনিও গাজ্জালীর মতই যুগ জিজ্ঞাসার জবাবকে ইসলামের…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
মুসলিম উম্মাহ

গ্রানাডা, গাজা ও মুসলিম উম্মাহ

১৪৯২ সালে আন্দালুসিয়ার সর্বশেষ দুর্গ গ্রানাডার পতনের প্রাক্কালে সেখানের মুসলমানগণ তাঁদের সাহায্যের জন্য উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের নিকটে সহায়তা কামনা…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
মুসলিম উম্মাহ

গাজার সংকটকালে পশ্চিমাদের স্বরূপ উন্মোচন এবং উম্মাহর কর্তব্য

বিসমিল্লাহির রহমানীর রাহীম জালিমের বিচারক এবং মজলুমের সহায়ক শক্তিশালী সেই মহান রবের নামে শুরু করছি। প্রশংসা তাঁর, যিনি সর্বদা নিত্য-নতুন…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
ইলমুল কালাম

ইলমুল কালামের নবায়ন

প্রথম প্রজন্মের মুসলমানগণ যেমন হাসান আল বসরী (রহঃ) মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপণ করেন রহমতের ভিত্তিতে, তাদের পরে আসেন…

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ
অনুদান দিন
Scroll to Top