সীরাত পড়ার উসূল ; হযরত পয়গাম্বর (স.) এর জীবনকে কিভাবে পাঠ করবো?

আজ রবিউল আওয়াল মাসের ১২তম রজনী। অর্থাৎ, রাসূলে আকরাম (স.)-এর আগমনের ১৫০১তম জন্মবার্ষিকী। মুসলিম উম্মাহর ঈদে মিলাদুন্নবী মোবারক হোক। সালাত ও সালাম দোজাহানের কাণ্ডারি, রাহমাতুল্লিল আলামীন এবং তাঁর আহলে বাইত ও আসহাবে কেরামের ওপর।

মিলাদুন্নবী কীভাবে উদযাপন করব এই ব্যাপারে আমি আমার তরুণ বন্ধুদের সাথে আমার কিছু চিন্তাকে শেয়ার করতে চাই। অথবা মিলাদুন্নবীকে ওসিলা হিসেবে নিয়ে সীরাতুন্নবীকে কিভাবে পাঠ করবো? কোন কোন বই পড়ব এবং কীভাবে পড়ব? এ বিষয়গুলো নিয়ে আমি আপনাদের সাথে আমার কিছু চিন্তা তুলে ধরতে চাই।

সীরাত ও সিয়ার নামক শব্দদ্বয়ের আভিধানিক অর্থ হলো পথ, পন্থা ও চলার ধরন। ইসলামের মতে, দুনিয়া একটি স্টেশন, অবস্থান করার জায়গা নয়; দুনিয়া মূলত একটি পথ। এই পথে আমাদের যাত্রাই হলো সীরাত। হযরত পয়গাম্বর (স.) ইলাহী ওহীর নির্দেশনায় এই পথ ধরে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ অর্থে হেঁটেছেন। তাই তাঁর যাত্রাই সীরাতের সবচেয়ে সঠিক ও পরিপূর্ণ উপমা। রাসূলুল্লাহ (স.) সমগ্র মানবতার জন্য উসওয়ায়ে হাসানা হওয়ার কারণে তাঁর এই পথচলা তাঁর উম্মতের কাছে আজও অনুসরণীয় ও অব্যাহত রয়েছে।

যার কারণে সীরাত ইতিহাসে কেবল একবার ঘটে যাওয়া কোনো জীবনকাহিনী নয়। এটি শুধু রেওয়ায়েত ও হাদীসের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। সীরাত হলো হাকীকতের সাক্ষী। এটি এমন সব শিক্ষা (ইবরাত) ও নিদর্শনের সমষ্টি, যা অনন্তকাল পর্যন্ত আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে।

সিয়ার এমন কোনো বিষয় নয়, যা একবার লিখেই চূড়ান্ত করে ফেলা যায়। সময়ের পরিবর্তন, নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হওয়া রাসূলের সীরাতকে নতুনভাবে পাঠ ও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিনিয়ত সামনে নিয়ে আসে।

আমরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সীরাত থেকে শুধু অতীতই নয়, ভবিষ্যৎকেও শিখে থাকি। শুধু আমাদের আখলাক নয়, আমাদের আকল ও ইরাদা (ইচ্ছাশক্তি) বিনির্মাণের পন্থাও এখান থেকে শিখি। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সীরাত মানে কেবল অতীতের ঘটনাবলি পাঠ করা নয়; একইসঙ্গে সীরাতুন্নবীর পথ ধরে চলতে শেখাও।

এই কারণে কোনো একক সীরাতগ্রন্থের পক্ষেই সীরাতুন্নবীকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। রাসূলে আকরাম (স.) কামালিয়াত বা পূর্ণতার সর্বোচ্চ চূড়ার প্রতিনিধিত্ব করেন বলে প্রতিটি সীরাতগ্রন্থেই কিছু না কিছু গ্যাপ থেকে যায়। পাশাপাশি, হযরত পয়গাম্বরকে বুঝতে জ্ঞানের প্রতিটি শাখাই নিজস্ব পরিসর ও মেথডোলজি অনুযায়ী একটি স্বতন্ত্র পঠনরীতি তৈরি করেছে।

  • মুহাদ্দিসগণ হযরত পয়গাম্বরের কথা, কাজ, অনুমোদন ও তাকরীরের ভিত্তিতে পয়গাম্বরের একটি ধারণা বা নবী-পরিচিতি তুলে ধরেছেন।
  • ফকীহগণ তাঁর জীবনকে হুকুম-আহকাম, হালাল-হারাম, ইবাদত এবং মানুষের জীবনকে বিন্যস্তকারী বিভিন্ন নীতিমালার আলোকে মূল্যায়ন করেছেন।
  • ঐতিহাসিকগণ রাসূলুল্লাহ (স.)-এর জীবনকে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, গাজওয়া ও সারিয়্যার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন।
  • সুফী ও সাহিত্যিকগণ নবী করীম (স.)-কে আশক, মুহাব্বত, রহমত ও মারহামাতের আলোকে পর্যালোচনা করেছেন।
  • আখলাকবিদগণ রাসূলে আকরাম (স.)-কে আখলাকে হামিদার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখারূপে তুলে ধরেছেন।

এই পঠনরীতিসমূহের প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ এবং সীরাত রচনা ও চর্চার ক্ষেত্রে নিজ নিজ দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে নবী করীম (স.)-এর ব্যক্তিত্বকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে এসব পঠনরীতিকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে এবং এর মধ্য দিয়ে সীরাত-চিন্তাকে আরও পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

সামগ্রিকভাবে দেখলে দেখা যায়, সীরাত-লেখকগণ সাধারণত হযরত পয়গাম্বর (স.)-এর জীবনকে মক্কী ও মাদানী, এই দুই পর্বে বিভক্ত করেছেন। আমাদের যুগের গাজ্জালীখ্যাত মরক্কোর প্রখ্যাত দার্শনিক আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানও এই বিভাজনকে অনুসরণ করেছেন। তবে তিনি একে ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে আরও বিকশিত ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন। আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমানের মতে, পয়গাম্বর (স.)-এর জীবনকে যদি দুই ভাগে বিভক্ত করতেই হয়, তাহলে সেই বিভাজন হওয়া উচিত এভাবে:

১. মক্কী জীবনে তিনি ওহীর আলোকে একটি আকল বিনির্মাণ করেছেন।

২. আর মাদানী জীবনে সেই একই ওহীর নির্দেশনায় তিনি একটি ইরাদা বা ইচ্ছাশক্তির বিনির্মাণ করেছেন।

মক্কায় তিনি আকলের সবচেয়ে বড় আখলাক সিদককে বিনির্মাণ করেছেন, আর মদীনায় তিনি ইরাদা বা ইচ্ছার সবচেয়ে বড় আখলাক হিসেবে বিবেচিত আমানতকে বিনির্মাণ করেছেন। আর এই কারণে তিনি হলেন আস-সাদিকুল আমীন। এখানে সিদক বলতে কেবল কথার সঙ্গে অবস্থার সামঞ্জস্য বোঝানো হয়নি। বরং কথার সঙ্গে কর্মের এবং কর্মের সঙ্গে বিশ্বাসের সামঞ্জস্যও এর অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে আমানত বলতে শুধু কারও কাছে কোনো বস্তু গচ্ছিত রাখাকে বোঝানো হয়নি। এখানে আমানত বলতে সমগ্র সৃষ্টিজগতের সঙ্গে একটি আস্থা ও আমানতের সম্পর্ক স্থাপন করা বুঝায়। সিদক হলো, হাকীকতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করা, আর আমানত হলো অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। 

 

প্রিয় তরুণতরুণীরা,

আজ আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে অর্থবহতার এক গভীর সংকটের মুখোমুখি, তখন কেবল ‘হযরত পয়গাম্বর (স.) কখন ও কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন, কখন হিজরত করেছেন, তাঁর কতজন সন্তান ছিলেন কিংবা তাঁর দুধমাতা কে ছিলেন’ এধরনের ঐতিহাসিক তথ্য জানাই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আমাদের ভাবতে হবে, তাঁর সুন্নত ও সীরাতকে কীভাবে আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গী করে তুলবো এবং কীভাবে তাঁকে আমাদের রাহবার হিসেবে গ্রহণ করবো। বর্তমান সময়ে সীরাতচর্চার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হওয়া উচিত এগুলোই।

এই কারণে রাসূল (স.)-এর সীরাত সম্পর্কে অবশ্যপাঠ্য বইগুলোর কথা বলার আগে এমন দুটি গ্রন্থ এবং তাদের লেখকের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই, যেগুলো হাকীকতের পথ অনুসন্ধানে সহায়ক হতে পারে। এর একটি হলো ইবনে তুফায়েলের হাই ইবনে ইয়াকযান, আর অপরটি ইবনে নাফিসের ফাযিল ইবনে নাতিক, যেখানে ‘কামিল’-এর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

এই দুই যুবকের মধ্যেই হক ও হাকীকতের প্রতি এক প্রবল তৃষ্ণা ছিল। তাঁদের অন্তরে ছিল হাকীকত ও অর্থবহতার গভীর অনুসন্ধান। কিন্তু তাঁদের কাছে কোনো পূর্বনির্ধারিত কোনো উত্তর ছিলো না। বরং উভয়ের সামনেই ছিল এক বিশাল প্রশ্ন। সেই প্রশ্নটি হলো, হাকীকত কী? আর মানুষ কীভাবে সেই হাকীকতে পৌঁছাতে পারে?

ইবনে তুফায়েল ‘হাই’কে কল্পনা করেছেন একটি নির্জন দ্বীপে। তাঁর পাশে কোনো শিক্ষক নেই, কোনো বই নেই, নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। তবে আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন তিনটি মহাগ্রন্থ: আকল, তাঁর নিজ সত্তা এবং মহাবিশ্ব।

হাই তাঁর চারপাশের জগৎকে দেখেন, পর্যবেক্ষণ করেন, কৌতূহলী হন, প্রশ্ন করেন এবং চিন্তা করেন। জীবজগতের জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে অনুসন্ধান করেন, আকাশের দিকে তাকান এবং সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা ও বিন্যাস নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। এভাবে এক কারণ থেকে আরেক কারণের অনুসন্ধানে অগ্রসর হতে হতে অবশেষে তিনি সৃষ্টি থেকে স্রষ্টার দিকে, বহুত্ব থেকে একত্বের দিকে এবং বিশ্বজগতের অস্তিত্ব থেকে আল্লাহর অস্তিত্বের উপলব্ধিতে উপনীত হন।

ইসলামও আমাদের এমন এক আকলের অধিকারী হতে শিক্ষা দেয়, যে আকল হাকীকতকে অনুসন্ধান করে, হাকীকতকে নিয়ে প্রশ্ন করে এবং শেষ পর্যন্ত হাকীকতের সামনে আত্মসমর্পণ করে। কেননা বিশুদ্ধ বা সহীহ আকল যদি আন্তরিকতার সঙ্গে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখে, তবে তা মানুষকে হাকীকত থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না; বরং ক্রমেই তাকে হাকীকতের নিকটবর্তী করে।

ইবনে তুফায়েলের প্রায় এক শতাব্দী পর ইবনে নাফিসও আরেক যুবককে নিয়ে প্রায় অনুরূপ একটি কল্পকাহিনী নির্মাণ করেন। সেই যুবকের নাম কামিল।

কামিলও চিন্তা করে, পর্যবেক্ষণ করে এবং কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন তোলে। সেও তার আকলকে ব্যবহার করে। তবে তার অনুসন্ধান হাইয়ের তুলনায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। মানুষ কি কেবল আকলের মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্বের সন্ধানই পায়? মানবতার জন্য একজন পয়গাম্বরের প্রয়োজনীয়তাও কি সে আকলের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে? নবুয়তের হিকমত, ওহীর প্রয়োজনীয়তা এবং মানবতার জন্য ইলাহী নির্দেশনার অপরিহার্যতা কি মানুষের আকল উপলব্ধি করতে সক্ষম?

কামিল এসব প্রশ্ন করতে করতে একপর্যায়ে উপলব্ধি করেন যে, মানুষের শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানাই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে কীভাবে সে তাঁর অভিমুখী হবে, কীভাবে তাঁর ইবাদত করবে, সেই পথও তার জানা প্রয়োজন। এ কারণেই আকলের ঊর্ধ্বে গিয়ে তার ওহীর প্রয়োজন। আর সেই ওহীকে বাস্তব জীবনধারায় রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন একটি উসওয়ায়ে হাসানা, অর্থাৎ একজন পয়গাম্বর। কামিল শেষ পর্যন্ত এটিও উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।

এভাবে হাইয়ের যাত্রা কামিলের মাধ্যমে এসে নতুন একটি পর্যায়ে উপনীত হয়। হাই মহাবিশ্ব থেকে ইলাহী হাকীকতের দিকে যাত্রা করেন, আর কামিল মানুষ ও সমাজের হাকীকত থেকে নববী হাকীকতের দিকে অগ্রসর হন। একজন আমাদের আয়াতে কাউনিয়া পাঠ করতে শেখান, আর অপরজন আয়াতে নববিয়্যাকে  বুঝতে শেখান।

প্রিয় যুবক ভাই বোনেরা,

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্য বা জ্ঞানের ঘাটতি নয়। মানব ইতিহাসে সম্ভবত আমাদের মতো আর কোনো প্রজন্ম এত সহজে এবং এত দ্রুত জ্ঞান ও তথ্য-উপাত্তের নাগাল পায়নি। মাত্র কয়েকটা ক্লিকেই অসংখ্য তথ্য আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। কিন্তু এই বিপুল সুযোগের সঙ্গে একটি বড় বিপদও যে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে, তা ভুলে গেলে চলবে না।

তথ্যের প্রবাহ যত বাড়ছে, আমাদের অনুসন্ধানের প্রবণতা ততই কমে যাচ্ছে। জবাব যত বাড়ছে, প্রশ্ন ততই কমছে। স্ক্রিনের আকৃতি বড় হচ্ছে, অথচ তাফাক্কুরের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

হাই ইবনে ইয়াকযানের ছোট্ট দ্বীপে কোনো ইন্টারনেট ছিল না। কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল সত্যকে জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, বিস্ময়বোধ এবং গভীর অনুসন্ধিৎসা।

ফাযিল ইবনে নাতিক-এ বর্ণিত কামিলের হাতেও চ্যাটজিপিটি বা ক্লাউড প্রযুক্তির মতো কোনো আধুনিক উপকরণ ছিল না। কিন্তু হাকীকতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ এবং তাকে অনুসন্ধান করার অদম্য তৃষ্ণা।

কিন্তু আমরা আজ হয়তো সব জবাবই পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই, অথচ কখনো কখনো সেই বিপুল জবাবের ভিড়েই নিজেকে হারিয়ে ফেলি। এই কারণেই আপনাদেরকে ‘অনেক কিছু জানুন’ বলার আগে আমি আরও জরুরি মনে করি এই কথাটি: হক ও হাকীকতের প্রতি আপনাদের আকাঙ্ক্ষাকে জীবন্ত রাখুন, হাকীকতের অনুসন্ধানী হোন এবং যা কিছু দেখেন, তার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শিখুন।

এই কারণে এখন আমাদের মূল কাজ শুধু তথ্য-উপাত্ত জমা করা নয়। আমাদের আসল কাজ হলো এমন একটি আকলকে নতুন করে বিনির্মাণ করা, যা হাকীকতকে ইদরাক করতে সক্ষম হবে, এবং এমন একটি ইরাদাকে গড়ে তোলা, যা হাকীকতের দিকে ধাবিত হয়ে তার দাবি পূরণ করবে। আর এর জন্য,

আকাশের দিকে তাকান হাইয়ের মতো, আর মানুষ ও সমাজকে পর্যবেক্ষণ করুন কামিলের মতো।

ইতিহাসের দিকে তাকান ইবরাতের দৃষ্টিতে।

কোরআনের দিকে তাকান নিজেকে ইলাহী ওহীর মুখাতাব হিসেবে বিবেচনা করে।

আর হযরত পয়গাম্বর (স.)-এর জীবনকে কেবল অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে নয়, বরং আপনার নিজের জীবনের প্রতি নিবেদিত এক জীবন্ত আহ্বান হিসেবে দেখুন।

ভুলে যাবেন না, ইসলামী সভ্যতায় আকল ও ওহী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক। দ্বীনবিহীন আকল হাকীকতের পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে না, আবার আকল ছাড়া দ্বীনের যথার্থ ব্যাখ্যাও সম্ভব নয়। আকল হলো চোখ, আর ওহী হলো আলো। চোখ ছাড়া যেমন আলোকে দেখা যায় না, তেমনি আলো ছাড়া চোখও পথ খুঁজে পায় না।

হাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, আকল কত উচ্চতায় আরোহণ করতে পারে। আর কামিল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের আকল যত বেশি পরিণত ও বিকশিত হবে, আমরা নবুওয়তের হিকমতকে ততই গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারব।

সুতরাং আপনাদের পথ যেন কেবল তাকলিদের পথ না হয়, আবার অহংকারী র‍্যাশনালিজমের পথও না হয়। আপনাদের পথ হোক এমন এক পথ, যেখানে আকল হাকীকতের অনুসন্ধান করবে, ওহীকে রাহবার হিসেবে গ্রহণ করবে, রাসূলে আকরাম (স.) কে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করবে এবং সর্বশেষে হাকীকতের সামনে আত্মসমর্পণ করবে।

প্রিয় তরুণ-তরুণীরা,

তিনটি মূলনীতিতে জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করবেঃ  কৌতূহলকে কখনো হারিয়ে ফেলবেন না; আপনার আকলকে কারও কাছে বন্ধক রাখবেন না; আর হাকিকতের সন্ধান করতে গিয়ে কখনো ক্লান্ত হবেন না।

মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ভুল কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো হাকীকতের অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষাকে হারিয়ে ফেলা। কেননা হাকীকত এমন এক বাস্তবতা, যে তাকে আন্তরিকভাবে অনুসন্ধান করে, তার কাছেই তা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। মানুষ হাকীকতের জন্য যত বেশি তৃষ্ণার্ত হয়, হাকীকতও তার সামনে তত বেশি উন্মোচিত হতে থাকে।

হাই আমাদের বলেন, ‘মহাবিশ্বকে পড়ো।’ কামিল আমাদের বলেন, ‘মানুষ ও নবুওয়তকে নিয়ে চিন্তা করো।’ আর কোরআন যেন এই দুই ধারাকে এক সূত্রে গেঁথে আমাদের আহ্বান জানায়, পড়ো, চিন্তা করো, আকলকে কাজে লাগাও, তাফাক্কুর করো। তবে এই পাঠ, চিন্তা ও অনুসন্ধানের সবকিছুই যেন শেষ পর্যন্ত তোমাকে তোমার রবের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক আধ্যাত্মিক সফরে পরিণত হয়।

প্রিয় তরুণ-তরুণী ভাই ও বোনেরা,

আপনাদের প্রত্যেকের কলবে যেন একজন হাই থাকেন, যিনি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে সৃষ্টিজগতের দিকে তাকান।

আপনাদের প্রত্যেকের অন্তরে যেন একজন কামিল থাকেন, যিনি মানুষ ও ইতিহাসের অন্তর্নিহিত অর্থের অনুসন্ধান করেন।

আর আপনাদের প্রত্যেকের সামনে যেন থাকেন মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ, যিনি দেখিয়ে দেন, আপনারা যে হাকীকতের সন্ধান পেয়েছেন, সেই হাকীকতকে কীভাবে জীবনে বাস্তব রূপ দিতে হয়।

কেননা হাকীকত কেবল জানার বিষয় নয়। হাকীকতকে অনুসন্ধান করতে হয়, আবিষ্কার করতে হয়, জীবনে ধারণ করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই হাকীকতকে আখলাকে রূপান্তরিত করতে হয়।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের সভ্যতার প্রত্যাশা হলো, তারা মুকাল্লিদ বা অন্ধ অনুকরণকারী হবে না, বরং হবে মুহাক্কিক।

তারা নিষ্ক্রিয় দর্শক হবে না, বরং হবে মুশাহিদ।

তারা কেবল তথ্য-উপাত্তের বাহক হবে না, বরং হবে হিকমতের সন্ধানী।

এখন যারা হক ও হাকীকতের অনুসন্ধানে হযরত রাসূলে আকরাম (স.)-এর সীরাতকে সঙ্গী করে পথ চলতে চান, সেই প্রিয় তরুণদের জন্য আমি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পাঠের পরামর্শ দিতে চাই। আমার বিশ্বাস, প্রতিটি গ্রন্থই রাসূলুল্লাহ (স.)-এর জীবনকে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এবং তাঁর পথনির্দেশনাকে নিজেদের জীবনে নতুনভাবে উপলব্ধি ও অনুধাবন করার সুযোগ করে দেবে।

১. ইব্রাহিম সারিচাম রচিত হযরত মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর বিশ্বজনীন বার্তা

২. জেলালেদ্দিন ভাতানদাশ রচিত হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবন ও ইসলামী রাষ্ট্র

৩. ওয়াদ্দাহ খানফার রচিত রবিউল আওয়াল বা প্রথম বসন্ত

৪. ইজ্জত দারওয়াজা রচিত কোরআনের আলোকে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবন

৫. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ রচিত ইসলামের পয়গাম্বর

৬. ত্বহা আব্দুর রহমান রচিত আস-সীরাতুন নববিয়্যা ওয়াত-তা’সিসুল আখলাকী

 

আমি আমাদের আলোচনাকে কোরআনে কারীমের এই আয়াতটি দিয়ে শেষ করতে চাই,

وَمَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِۦٓ إِذْ قَالُواْ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ عَلَىٰ بَشَرٍ مِّن شَىْءٍ‌ۗ قُلْ مَنْ أَنزَلَ ٱلْكِتَـٰبَ ٱلَّذِى جَآءَ بِهِۦ مُوسَىٰ نُورًا وَهُدًى لِّلنَّاسِ‌ۖ تَجْعَلُونَهُۥ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا‌ۖ وَعُلِّمْتُم مَّا لَمْ تَعْلَمُوٓاْ أَنتُمْ وَلَآ ءَابَآؤُكُمْ‌ۖ قُلِ ٱللَّهُ‌ۖ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِى خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ

এই লোকেরা আল্লাহর যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করেনি। কেননা তারা বললঃ আল্লাহ কোন মানুষের উপর কোন কিছু অবতীর্ণ করেননি; তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো: মানুষের হিদায়াত ও আলোকবর্তিকা রূপে যে কিতাব মূসা এনেছিল তা কে অবতীর্ণ করেছেন? তোমরা সেই কিতাব খণ্ড খণ্ড করে বিভিন্ন পত্রে রেখেছো, ওর কিয়দংশ তোমরা প্রকাশ করছো এবং বহুলাংশ গোপন করছো। (ঐ কিতাব দ্বারা) তোমাদেরকে বহু বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্ব-পুরুষরা জানতো না; তুমি বলে দাওঃ তা আল্লাহই অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং তুমি তাদেরকে তাদের বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দাও, তারা খেলা করতে থাকুক। (সূর আনআম, ৯১)

যদি তাই হয়, তাহলে আল্লাহকে চেনা ও তাঁকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করার পথ হলো নবুওয়তকে চেনা। আর নবুওয়তকে চেনার অর্থ হলো সর্বশেষ নবী, খাতামুল আম্বিয়া, রাসূলে কিবরিয়া মুহাম্মদ মুস্তফা (স.)-কে চেনা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর জীবন ও আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করা।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top