আল্লাল আল-ফাসী হলেন এমন একজন মুতাফাক্কির ও আলেম যিনি বিংশ শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকাতে মাকাসিদ ও আখলাককে একত্রিত করে নতুন একটি উসূলের প্রস্তাবনার মাধ্যমে একটি ইহইয়া/ পুনর্জাগরণ ও ইসলাহ/সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেন এবং এক্ষেত্রে অগ্রগামী ব্যক্তিত্বের ভূমিকা পালন করেন।
আল্লাল আল-ফাসী, ১৯১০ সালে মরক্কোতে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি স্পেন ও ফ্রান্সের শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন এবং মরক্কো ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোকে শোষকদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন। যার কারণে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁকে নির্বাসনে কিংবা দেশের বাহিরে কাটাতে হয়েছে। ১৯৫৬ সালে মরক্কো স্বাধীনতা অর্জন করলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং আইন অনুষদে অধ্যাপনা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভিন্ন পত্রিকার সাথে যুক্ত হন। তিনি দেড় বছর ওয়াকফ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য এক রাষ্ট্রীয় সফরে রোমানিয়াতে যান। রোমানিয়াতে সরকারের বিভিন্ন মহলে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার সময়ে সেখানেই ৬৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
আল্লাল আল-ফাসীর মতে, আধুনিক সময়ে এসে মুসলমানগণ যে সকল উদ্ভূত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রাচীন উসূলে ফিকহ সেসকল সমস্যা সমাধান করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, আমাদেরকে এমন একটি উসূল দাঁড় করাতে হবে যা প্রাচীন উসূলকে প্রত্যাখ্যান করবে না, বরং ক্ল্যাসিক উসূলের ভেতরে থেকেই যুগসমস্যার সমাধান প্রদানে সক্ষম হবে।১
কোরআন, সুন্নত, ইজমা, কিয়াস, ইসতিহসান, মাসালিহি মুরসালা, ইসতিসহাব, ওরফ, সাদ্দে যারাই-এর মতো উসূলে ফিকহের মৌলিক বিষয়াবলিকে তিনি স্বতন্ত্রভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং এর প্রতিটিকেই বর্তমান সময়ের আলোকে কীভাবে বুঝবো সে ব্যাপারে নতুনভাবে প্রস্তাবনা দেন। তবে ইসতিসহাব ও সাদ্দে যারাই নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং নতুন উসূলের বিনির্মাণের ক্ষেত্রে এই দুটি পরিভাষা থেকে কীভাবে উপকৃত হওয়া যাবে, সেই বিষয়ে উপমা পেশ করেন।
তাঁর মতে, ইসতিসহাবের চারটি ধরণ রয়েছে। সেগুলো হলো-
প্রথমত, বারায়াত-ই আসলিয়্যাহ।২
দ্বিতীয়ত, নসের মাধ্যমে নির্ধারিত উমুম ও খুসুস তথা সাধারণ ও বিশেষের মধ্যে সম্পর্ক।
তৃতীয়ত, সাবিত ওয়াসিফ-সংক্রান্ত বিষয়।৩
চতুর্থত, إبقاء ما كان على ما كان তথা পূর্ববর্তী অবস্থাকে পূর্বের মতোই বজায় রাখা।৪
এই বিষয়টিকে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন এবং নতুন উসূলের ক্ষেত্রে ইসতিসহাবকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেই বিষয় নিয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন।
তিনি মনে করেন ইমাম শাতিবীর মুয়াফাকাতের পর মাকাসিদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি উসূলের জন্য একটি ঘাটতি ডেকে এনেছে। যদি মুয়াফাকাতের পর এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হতো তাহলে ইলমুল উসূল আজ আরও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হতো। উসূলে ফিকহের উচিত হলো, কেবল ইল্লত (কারণ) কে কেন্দ্র করে না থেকে, সমস্যাসমূহকে শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্য তথা মাকাসিদ আশ শরীয়াহর আলোকে ব্যাখ্যা করা। তিনি মাকাসিদকে ‘মাকাসিদ আশ শরীয়াহ/শরীয়তের সামগ্রিক উদ্দেশ্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। মাকাসিদের ধারণাকে তিনি আদালত ও হুররিয়াতের (স্বাধীনতা) উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।
তাঁর মতে, শরীয়তের সম্পূর্ণটাই হলো আদালত ও রহমত। আদালত ও রহমত যখন জুলুমে পরিণত হয়, তখন শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য অবলুপ্ত হয়ে যায়।৫
আল্লাল আল ফাসী, তাঁর নতুন উসূলকে মাকাসিদ ও আখলাকের সামগ্রিকতার উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর এই চিন্তাকে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ, ‘মাকাসিদুশ শারিয়াতিল ইসলামিয়্যা ও মাকারিমাহা’ নামক গ্রন্থে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর অন্যতম বিশেষত্ব হলো, মাকাসিদকে তিনি আখলাকের মধ্যে স্থাপন করেছেন।
এছাড়াও তিনি উসূলে ফিকহের মৌলিক বিষয়ের মধ্যকার অন্যতম বিষয় কুল্লিয়াতি খামসা তথা জীবন, আকল, দ্বীন, বংশধারা ও সম্পদ-কে তিনি বর্তমান সময়ে এসে যথেষ্ট মনে করেননি। সমাজ ও সভ্যতাকে রক্ষাকারী ইসলামের বড় বড় মৌলিক মূলনীতিকে (কুল্লি আসাস) তিনি শুধুমাত্র কুল্লিয়াতের খামসার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাননি। মানুষের সম্মান, তাঁদের চিন্তার স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, সম্পদের মালিকানার স্বাধীনতার মতো মৌলিক রাজনৈতিক, সামাজিক অধিকারকেও কুল্লি আসাসসমূহের মধ্যে বিবেচনা করেছেন এবং এগুলোকে মাকাসিদের মধ্যে যুক্ত করেছেন।
তাঁর মতে, হিজরী পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম আলেমগণ ইজতিহাদকে ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সুন্দর সমাধান পেশ করে আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু তাকলীদের যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে যে অনুপম বৈশিষ্ট্যটি ইসলামকে অন্য সকল দ্বীন থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে, সে ইজতিহাদ থেকে মুসলমানরা বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে একজন মুজতাহিদকে ইজতিহাদ করতে হলে তাঁকে মাকাসিদ সম্পর্কে অবশ্যই জানা থাকতে হবে। এটা ইজতিহাসের অন্যতম প্রধান শর্ত। কেননা যে ব্যক্তি মাকাসিদ জানে না, তাঁর পক্ষে ইজতিহাদ করা সম্ভবপর নয়। শুধু তাই নয়, মাকাসিদ সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিকে মুজতাহিদও বলা যায় না।
উসূলের মধ্যে ‘আমরি ইরশাদী বা ইরশাদী আমরকে’ যুক্তকরণ
আল্লাল আলা ফাসী তাঁর নতুন উসূলের ধারণাকে একটি ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে গিয়ে কাওয়াইদে ফিকহিয়্যার মধ্যে “ইরশাদী আমর (أمر إرشادي)” নামক নতুন একটি পরিভাষা যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, ইরশাদী আমরসমূহ দুই প্রকার:
প্রথমত, যে সকল হুকুম-আহকামের ব্যাপারে কোরআন ও সুন্নত চূড়ান্ত বক্তব্য প্রদান করেছে। এগুলোর ক্ষেত্রে উম্মতের দায়িত্ব হলো, এসকল হুকুম-আহকামের প্রতি পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করা এবং এখানে উল্লিখিত আদেশ ও নিষেধকে বিনাপ্রশ্নে বাস্তবায়ন করা।
দ্বিতীয়ত, কোরআন ও সুন্নত যেসকল হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে সামগ্রিক উদ্দেশ্য ও মাকাসিদের মাধ্যমে উম্মতের উপনীত হওয়া প্রয়োজন এমন একটি লক্ষ্য দেখিয়ে থাকে। এ ধরণের আদেশসমূহ হলো, “ইরশাদী আমর (أمر إرشادي)”। এগুলো হলো সেসব হুকুম-আহকাম, যেগুলোর মাধ্যমে উম্মতের কাছে প্রত্যাশা করা হয় যে তারা শরীয়তের উদ্দেশ্যসমূহ (মাকাসিদ)-কে অনুধাবনের মাধ্যমে চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে। আল্লাল আল-ফাসীর এ কায়েদাটি খাজানের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ কর্তৃক উদ্ভাবিত “আহকাম-ই ইবতিদাইয়া” এবং “আহকাম-ই বিফাকিয়া” নামক পরিভাষাদ্বয়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।৬
যেমন, তিনি মদ হারাম হওয়ার বিষয়টিকে ইরশাদী আমর হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং মদের হারাম হওয়ার ইল্লতকে শুধুমাত্র ‘মত্ততা কিংবা মাতাল হওয়া বোঝাকে ইরশাদী আদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে যথেষ্ট মনে করেননি। মদকে যে আয়াতের মাধ্যমে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে সে আয়াতটি হলো,
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
অর্থ: শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবে?’৭
আল্লাল আল ফাসীর মতে, উক্ত আয়াতে ইরশাদী আমরের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনটি ইল্লত রয়েছে। সেগুলো হলো,
১. মানুষদের মধ্যকার আদালতকে বিনষ্ট করা।
২. মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ও শত্রুতা সঞ্চার করা।
৩. মানুষকে আল্লাহর যিকির ও নামাজ থেকে দূরে রাখা।৮
অনুরূপভাবে এতিমের সম্পদকে তাঁদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার যে আয়াত রয়েছে সে আয়াতটি হলো,
وَ ابْتَلُوا الْيَتَمَى حَتَّى إِذا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
অর্থ: আর ইয়াতীমরা বিয়ের যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে পরীক্ষা করে নাও; অতঃপর যদি তাদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি পরিদৃষ্ট হয় তাহলে তাদের ধন-সম্পত্তি তাদেরকে সমর্পণ করো।৯
আল্লাল আল ফাসী, ইরশাদী আমরের দাবি অনুযায়ী এতিমের সম্পদ হস্তান্তরের জন্য কেবল রুশদ (বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা) নয়, একইসাথে অভিজ্ঞতাকেও শর্ত হিসেবে যুক্ত করেছেন। তবে তাঁর এই শর্তটি অধিকাংশ আলেমই গ্রহণ করেননি।
আল্লাল আল ফাসী তায়াদ্দুদু যাওজাত তথা বহুবিবাহের ব্যাপারেও তার এ ইরশাদী আমরের নীতিকে প্রয়োগ করেছেন।
যে আয়াতের মাধ্যমে বহু বিবাহের ব্যাপারে রুখসত দেওয়া হয়েছে সেই আয়াতটি হলো,
فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلث وَرُبَعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ ذَلِكَ أَدْنَى أَلَّا تَعُولُوا
অর্থ: “তোমরা পছন্দনীয় নারীদের মধ্যে থেকে দু’টি, তিনটি অথবা চারটি বিয়ে করো। কিন্তু যদি তোমরা ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা করো, তাহলে একজন নারীর সাথেই সীমাবদ্ধ থাকো অথবা তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাসীদের সঙ্গেই সন্তুষ্ট থেকো। এটি হলো আদালত থেকে বিচ্যুত না হওয়ার জন্য অধিকতর উপযুক্ত।”১০
ইরশাদী আমরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আদালত বজায় রাখা সাপেক্ষে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বহু বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে এমন কোনো রুখসত দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, বহুবিবাহের বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্যায়ে, কিংবা বিশেষায়িত ক্ষেত্রের জন্য। সামাজিক পর্যায়ে একে গণহারে উৎসাহিত করা, কিংবা এর ব্যাপক প্রচলন করা, কোনোটাই ইসলামের উদ্দেশ্য ছিলো না।
পারিবারিক ব্যবস্থাকে আদালতের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মূল বিষয় কী হবে? অর্থাৎ এখানে কাকে প্রাধান্য দেয়া হবে? ব্যক্তি নাকি সমাজ? সকলেই এই ব্যাপারে একমত হবেন যে, সমাজ-ই হবে মুখ্য বিষয়। ফলশ্রুতিতে ইরশাদী আমরের দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো, এক বিবাহ।
একইভাবে তাঁর মতে, যুদ্ধের আয়াতসমূহও বিশেষ পরিস্থিতির বিবেচনায় বিভিন্ন মাসলাহাতের বা কল্যাণের জন্য যুদ্ধের ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেছে। তবে এখানে মূল বিষয় কী? যুদ্ধ নাকি শান্তি? আমরা যদি কুল্লি আসাস বা সামগ্রিক মূলনীতির আলোকে দেখি তাহলে দেখতে পাই যে ইরশাদী আমরের দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে মূল বিষয় হলো শান্তি বা সুলহ।
দাসপ্রথার ব্যাপারেও ইরশাদী আমরের দৃষ্টিকোণ থেকে শরীয়ত প্রণেতার চূড়ান্ত উদ্দেশ্যকে বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। রাসূল (স.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়ে যদিও তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতার কারণে দাসপ্রথাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়নি তবে শরীয়ত প্রণেতা মানুষের স্বাধীনতার দিকে যে পরিমাণ গুরুত্বারোপ করেছেন, যদি সেদিকে দৃষ্টিপাত করা হয় তাহলে ইরশাদী আমরের দাবি অনুযায়ী শরীয়ত প্রণেতার মূল উদ্দেশ্য হলো দাসপ্রথার বিলোপ সাধন।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ।
টীকাঃ
১. আল্লাল আল ফাসী, মাকাসিদুস শারিয়াতিল ইসলামিয়্যা ওয়া মাকারিমাহা।
২. বারায়াতে আসলিয়্যা (البراءة الأصلية) কে উসূলে ফিকহের ইসতিসহাব-এর একটি ধরণ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ভিত্তিতে বলা হয়-যে দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতার অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো প্রমাণ না থাকলে, সেটি মূলত ব্যক্তির উপর বর্তায় না। অন্যভাবে বললে, যদি কোনো ব্যক্তির ওপর কোনো দায়িত্ব, ঋণ, নিষেধাজ্ঞা বা দায় আরোপ করতে হয়, তবে তার জন্য স্পষ্ট প্রমাণ থাকা আবশ্যক। প্রমাণ না থাকলে ব্যক্তিকে “দায়মুক্ত” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। (অনুবাদক)
৩. সাবিত-ওয়াসিফ, উসূল ফিকহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচ্য বিষয়। একটি জিনিস বা ব্যক্তির নির্দিষ্ট কোনো গুণ (বিশেষত্ব) স্থায়ীভাবে তার সঙ্গে থাকে কি না, অর্থাৎ একটি গুণ একটি জিনিসের বা ব্যক্তির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পর্কিত কিনা, তা বোঝানোর জন্য এই সাবিত ও ওয়াসিফ নামক বিষয়টি দিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে। অন্যভাবে বললে, সাবিত-ওয়াসিফ হলো, একজন ব্যক্তির পূর্ববর্তী অবস্থা, গুণ বা বৈশিষ্ট্য যদি পরিবর্তন না হয়, তবে সেটি তার সাথে অব্যাহত থাকবে কি না, এ বিষয়টি নির্ধারণকারী একটি নীতি। অন্যভাবে বললে,
সাবিত-ওয়াসিফ হলো একটি জিনিস বা ব্যক্তির যে গুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেটি সেই ব্যক্তি বা বস্তুতে আছে কি না এবং তা চলতে থাকবে কি না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। এটি ইসতিসহাবের কাছাকাছি একটি ধারণা। এখানে, একটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য যদি একটি ব্যক্তির বা জিনিসের থেকে চলে না যায়, তবে এটি অব্যাহত থাকে। তবে, শুধুমাত্র তখনই তা পরিবর্তিত হবে যদি কোনো প্রমাণ (যেমন, অন্য একটি সিদ্ধান্ত বা নতুন কোনো ঘটনা) সামনে আসে।
উদাহরণ: ধরা যাক, একজন ব্যক্তি পূর্বে একটি অপরাধে দোষী ছিলো এবং এমন নতুন কোনো প্রমাণ নেই, যা তার নির্দোষ হওয়াটা প্রমাণ করবে। তাহলে সে এখনও অপরাধী হিসেবেই গণ্য হবে। অন্য কথায়, সে তার অপরাধী হওয়ার বৈশিষ্ট্যটি হারায়নি। তবে, যদি সে তার নির্দোষ হওয়া প্রমাণ করতে কোনো নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করে, তবে তার সাবিত-ওয়াসিফ পরিবর্তিত হবে এবং তাকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটি সাবিত-ওয়াসিফ ধারণার একটি সাধারণ উদাহরণ। (অনুবাদক)
8. إبقاء ما كان على ما كان, উসূলের গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি এবং এর অর্থ হলো “পূর্ববর্তী অবস্থাকে পূর্বের মতোই বজায় রাখা।” এই নীতি অনুযায়ী, একটি বিদ্যমান অবস্থা, যদি কোনো পরিবর্তনের জন্য স্পষ্ট প্রমাণ না থাকে, তবে তা যেমন ছিলো তেমনি অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যভাবে বললে, কোনো জিনিসের বর্তমান অবস্থা, তার পরিবর্তনের জন্য একটি যথাযথ কারণ না পাওয়া পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে এবং পূর্বের অবস্থায় চলতে থাকে। এ নীতি ইসতিসহাবের মূলনীতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
৫. আল্লাল আল ফাসী, মাকাসিদুস শারিয়াতিল ইসলামিয়্যা ওয়া মাকারিমাহা।
৬. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, Musa Carullah, İslam Şeriatının Esasları, çev. Hatice Kübra Görmez, OTTO yay., 2017 Ankara. একইসাথে, আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তাদর্শন সম্বন্ধে জানতে পড়ুন, আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ এর চিন্তাদর্শন (১৮৭৫-১৯৪৯)।
৭. সূরা মায়েদা, ৯১।
৮. আল্লাল আল ফাসী, মাকাসিদুশ শারিয়াতুল ইসলামিয়্যা ও মাকারিমাহা
৯. সূরা নিসা, ৬।
১০. সূরা নিসা, ৩।


