আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ এর চিন্তাদর্শন (১৮৭৫-১৯৪৯)

আল্লামা মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ ঊনবিংশ শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণের একজন। যুগের চাহিদাকে সামনে রেখে তিনি নতুন এক উসূলের অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর মতে, কাওয়ায়িদুল ফিকহিয়্যা’র কুল্লি কায়েদাসমূহকে মাসলাহাতের উপর ভিত্তি করে নতুনরূপে ব্যাখ্যা করে উসূলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানো সময়ের দাবি। একইসাথে তিনি বারায়াতে আসলিয়া-কে কুল্লি কায়েদা ও আসলসমূহের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন এবং বুরহানী দলীল, কসমোলজিক দলীল, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং সমাজের দাবির মতো আকলী দলীলসমূহকে শরীয়তের দলীলের মধ্যে সংযুক্ত করার জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছেন।

 

জীবনী

মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ ১৮৭৫ সালে তাতারিস্তানের রাজধানী খাজানের নিকটবর্তী রুস্তভ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা একজন আলেম ছিলেন। তিনি খাজানে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি বুখারার মাদরাসায় গিয়ে ক্ল্যাসিক ধারার জ্ঞান অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি ইস্তাম্বুলে যান, সেখানে কয়েকমাস অবস্থান করে পরবর্তীতে মিশরে চলে যান এবং আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আজহারে কিছুদিন পড়ার পর “এখানে থেকে আলেম হওয়া সম্ভব নয়”—এ কথা বলে আজহার ত্যাগ করেন। আজহারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করলেও তিনি মিশরে অবস্থান করেন এবং সেখানের বিখ্যাত আলেমগণের নিকট থেকে বিশেষভাবে দারস নিতে থাকেন। এরপর তিনি মিশর থেকে হিজাজে (সৌদি আরব)—এ যান এবং সেখান থেকে শাম ও ভারত সফর করেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে জ্ঞান অর্জনের এই সফর শেষ করে দেশে ফিরে যান।

১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে আযবুকা ইসলামীকা (ইসলামের আলিফ-বা) গ্রন্থ রচনার অপরাধে তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দী করে রাখা হয়।

পরবর্তীতে তিনি জেল থেকে পালিয়ে চীনে চলে যান এবং সেখানেও তিনি স্থায়ীভাবে থাকতে পারেননি। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তাঁকে আফগানিস্তানে চলে যেতে হয়। আফগানিস্তানের তৎকালীন বাদশাহ আমানুল্লাহ তাঁকে মাদরাসায় দারস দেওয়ার সুযোগ দিলেও তিনি কিছুকাল আফগানিস্তানে অবস্থান করার পর ভারতে চলে যান। সেখানে গেলে রাশিয়ান গুপ্তচর সন্দেহে ইংরেজরা তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের পেশওয়ারের জেলে দেড় বছর যাবৎ বন্দী করে রাখে। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি কিতাবুস সুন্নাহ, ফিকহুল কোরআন, সারফুল কোরআন ও নাহউল কোরআনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন।

পেশোয়ারের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি তুরস্কে যান। সেখানে তিনি মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের সাথে সাক্ষাত করেন এবং নবপ্রতিষ্ঠিত তুর্কী প্রজাতন্ত্রের সংবিধান প্রণয়নে অংশগ্রহণ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। একইসাথে তাঁর নেতৃত্বে একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করার জন্য প্রস্তাবও করেন। শুধু তাই নয়, আতাতুর্ককে তিনি বলেন যে, নব প্রতিষ্ঠিত তুর্কী প্রজাতন্ত্রের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে আইন-কানুন ধার করে আনার প্রয়োজন নেই। তিনি সহ তুর্কী আলেমরাই এর জন্য যথেষ্ট।

পরবর্তীতে তিনি তুরস্কের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ইসমেত ইনুনুর সাথেও সাক্ষাত করেন। তার সাথে সাক্ষাত করে তুরস্কের কোনিয়া ও বুরসা শহরে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনুমতি চান। তাঁর এই সকল প্রস্তাবের কোনোটাই তারা গ্রহণ করেননি। তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানদের এমন আচরণে হতাশ হয়ে তিনি ইরাক ও ইরানে সফর করেন এবং সেখানে শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যকার ইখতেলাফকে দূর করার কাজে অংশগ্রহণ করেন।

মুসা জারুল্লাহর জীবনের শেষভাগ এইভাবেই নির্বাসন ও সফরের মধ্য দিয়ে কাটে। তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই শিক্ষাকার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী তৈরি করতে সক্ষম হোন। তিনি তাঁর বন্ধু আব্দুর রশিদ ইব্রাহীমের সাথে জাপানে যান এবং সেখানেও তিনি ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজে অংশগ্রহণ করেন। কোরআনের সেমান্টিক কাজের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জনকারী জাপানের ওরিয়েন্টালিস্ট তোশিহিকো ইযুতসুও (Toshihiko Izutsu) ছিলেন তাঁর ছাত্র। মূলত মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ জাপানে অবস্থানকালেই তোশিহিকো ইযুতসু তাঁর নিকট থেকে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।

মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ নব্বইটির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি প্রধানত আরবী, রাশিয়ান ও তুর্কী ভাষায় তাঁর গ্রন্থসমূহ লিখেছেন।

তাঁর অন্যতম একটি কাজ হলো, ইমাম শাতিবীর অনন্য সৃষ্টি আল-মুয়াফাকাত’কে তাহকীক করে খাজানে প্রকাশ করা। তিনি এমন সময়ে এই কাজ করেন যে সময়ে মুসলিম উম্মাহর বেশিরভাগ আলেম-ই ইমাম শাতিবী সম্পর্কে জানতেন না। মুয়াফাকাত’কে পরিচিত করার লক্ষ্যে তিনি ‘আর রিসালা আলা উসুলী মুয়াফাকাত’ নামক একটি স্বতন্ত্র  রিসালাও (প্রবন্ধ) রচনা করেন। পরবর্তীতে তিনি এ রিসালাটি সংক্ষেপ করে তাঁর তাহকীককৃত মুয়াফাকাতের ভূমিকা হিসেবে প্রকাশ করেন। মুসা জারুল্লাহর এই কাজ উসূল শাস্ত্রের ক্ষেত্রে, বিশেষভাবে মাকাসিদের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক একটি কাজ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।

 

ফিকহের ক্ষেত্রে নতুন উসূলের অনুসন্ধান

যেসকল আলেম যুগজিজ্ঞাসার জবাব দানের জন্য নতুন উসূলের সন্ধানী ছিলেন তাঁদের মতো মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফও ক্ল্যাসিক উসূলের কিছু কিছু বিষয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন। উসূলে ফিকহের ব্যাপারে মুসা জারুল্লাহর যে সমালোচনা, সেটা নির্দিষ্ট কোনো গ্রন্থে নয়, বরং বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যেমন—মুসা জারুল্লাহ তাঁর ‘দীর্ঘদিনের ক্ষেত্রে রোযার বিধান’ নামক গ্রন্থে ইজতিহাদ, তাকলীদ ও কিয়াসের মতো উসূলে ফিকহের বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন। এছাড়াও জনগণের দৃষ্টিতে বিভিন্ন বিষয়, আদাবিয়্যাত-ই আরাবিয়্যাউলুম-ই ইসলামিয়্যা নামক গ্রন্থসমূহে উসূলের ব্যপারে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।

তাঁর মতে, মানুষ যেন সত্যিকারের আদালত পায় এজন্য উসূলে ফিকহকে এমন অবস্থায় উপনীত করতে হবে, যেনো এর উপর ভিত্তি করে শক্তিশালী একটি আইনব্যবস্থা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়। এটা সকলের-ই জানা যে, উসূলে ফিকহে ইবাদতের হুকুমসমূহ অনেক শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হয়েছে। তবে সাধারণ-বিশেষ বিভাগসমূহের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মতো মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

মুসা জারুল্লাহর মতে, ইসলাম জীবনধারাকে অপরিবর্তনীয়, স্থির ও গতিহীন মনে করে না। বরং ইসলাম মানুষের জীবনধারাকে প্রাণবন্ত, বহুমাত্রিক ও গতিশীলভাবে দেখে। উসূল শুধুমাত্র আসল (আরবী) ও ফুরু (আরবী) এর মধ্যকার সম্পর্ক সৃষ্টিকারী একটি বিষয়-ই নয়, উসূল একইসাথে স্থায়ী ও পরিবর্তনের মধ্যেও সম্পর্ক স্থাপনকারী একটি বিষয়ের নাম।

মুসা জারুল্লাহ তাঁর নতুন উসূলকে মাসলাহাতের উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করেছেন। উসূলে ফিকহের মধ্যে থেকে, বারায়াতে আসলিয়্যাকে কুল্লি কায়েদার মধ্যে এমনকি কুল্লি আসলসমূহের মধ্যেও যুক্ত করার কথা বলেছেন। কুল্লি কায়েদাসমূহকে তিনি উসূলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেন যে, নাকলকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণকারী আদিল্লায়ে শারইয়্যাকে আকলী দলীলের নিরিখে নতুন করে ব্যাখা করা প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, আদিল্লায়ে শারইয়্যার মধ্যে তিনি বুরহানী হুজ্জত, কসমোলজিক দলীল, ইতিহাসের সাক্ষ্য এবং মানুষের চাহিদার মতো নতুন আকলী দলীলসমূহকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। শরয়ী হুকুমকে তিনি আহকাম-ই ইবতিদাইয়্যা এবং আহকাম-ই বিফাকিয়্যা নামে দুভাগে বিভক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন যে, ইসলামী জ্ঞানের পুনর্জাগরণ, উসূলে ফিকহের পুনর্জাগরণের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ উসূলে ফিকহের পুনর্জাগরণ ছাড়া ইসলামী জ্ঞানের পুনর্জাগরণ সম্ভবপর নয়।

 

বারায়াত-ই আসলিইয়্যা

মুসা জারুল্লাহর মতে, প্রথমত বারায়াত-ই আসলিয়্যাকে কুল্লি আসল হিসেবে উসূলে ফিকহের মধ্যে স্থাপন করতে হবে। কেননা, বারায়াত-ই আসলিয়্যা হলো, মানুষের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিষয়সমূহের কুল্লি নস। অর্থাৎ, জুযয়ী তথা বিশেষ নসসমূহ আমাদেরকে যে মূল উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত করে সেসকল সার্বজনীন উদ্দেশ্য। কেননা, এই পন্থার মাধ্যমে ইসলাম মানুষকে যে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা দিয়েছে, সে সার্বজনীন ও সামগ্রিক উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের জন্য সহায়ক এমন একটি উসূলে ফিকহ বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে। আমাদের প্রাচীন ফিকহের মধ্যে আমরা এর ইঙ্গিত পাই। “العصمة بالآدمية – মানুষের সম্মান ও মর্যাদা মানুষ হওয়ার কারণে” নামে আমাদের একটি ফিকহী মূলনীতি রয়েছে। কেননা, মানুষ ইসলামের দৃষ্টিতে গুনাহগার হিসেবে জন্মগ্রহণ করেনি। যেমনটা খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বে মনে করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ জন্মগতভাবে মাসুম তথা নিষ্পাপ। 

তাঁর মতে, উসূলের প্রথম অর্থ হলো দলীলসমূহ, আর দ্বিতীয় অর্থ হলো কুল্লি কায়েদাসমূহ। এক নাম হলো আদিল্লায়ে শারইয়্যা, আর অপর নাম হলো কাওয়ায়িদী ফিকহিয়্যা। কুল্লি নসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া কুল্লি কায়েদাসমূহ হলো ফিকহের রূহ। এ কারণে একে উসূলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মূলত ইসলামের সাথে অন্য দ্বীনসমূহের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য হলো মানুষের অধিকার ও চিন্তার স্বাধীনতার মতো বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে। যে বিষয়টি দ্বীনে মুবিন ইসলামকে অন্য সকল মতাদর্শ ও ধর্মের তুলনায় অনন্য করে তুলেছে তা হলো, মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা। তবে এ পার্থক্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হলে বারাইয়াত-ই আসলিয়্যা নামক পরিভাষাটিকে কুল্লি কায়েদা হিসেবে উসূলের মধ্যে স্থাপন করতে হবে এবং মুয়ামালাতের সাথে সম্পর্কিত সকল ফুরু’ (শাখা-প্রশাখা) বিষয়কে এই কায়েদার উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে।

 

নসকে কুল্লি ও জুযয়ী হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস

মুসা জারুল্লাহর মতে, কোনো একটি বিষয়ে হুকুম দেওয়ার সময় কুল্লি নস ও জুযয়ী নস এই শ্রেণিবিন্যাসকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। জুযয়ী নস হলো, নির্দিষ্ট ও বিশেষ কোনো একটি আয়াত বা হাদীস কিংবা নির্দিষ্ট কোনো আয়াত বা হাদীসের একটি অংশ। কুল্লি নস হলো, সকল নস এবং আকলী দলীল আমাদেরকে যে অভিন্ন উদ্দেশ্যের দিকে নিয়ে যায়। যেটাকে মাকাসিদ বা মাকাসিদে কুল্লি বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যদি জুযয়ী নস ও কুল্লি নসের মধ্যে কখনো কোনো বিরোধ হয় তখন অবশ্যই কুল্লি নসের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এটা ফিকহের মৌলিক একটি মূলনীতি। আমাদের মতে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে উসূলের ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ হলো, সকলেই জুযয়ী নসের উপর ভিত্তি করে কুল্লি বিষয়সমূহকে পর্যালোচনা করে থাকে। স্থিতিশীলতা অর্জনের সবচেয়ে বড় পথ হলো, জুযয়ী নসকে সর্বদা-ই কুল্লি নসের আলোকে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা।

 

আদিল্লা-ই শারইয়্যাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা

মুসা জারুল্লাহ মনে করেন, উসূলে ফিকহ মানে যে আদিল্লা-ই শারইয়্যা এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এটাও সুস্পষ্ট যে, উসূলকে শুধুমাত্র এসকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করা যাবে না। কেননা, আদিল্লা-ই শারইয়্যা যে অবস্থায় রয়েছে, তা আমাদের বর্তমান সময়ের সমস্যাকে সমাধান করার জন্য যথেষ্ট হতে পারছে না। একইভাবে উসূলে ফিকহ যে পন্থায় আদিল্লা-ই শারইয়্যাকে বুঝে ও ব্যাখ্যা করে সে পন্থাও আমাদের সমস্যাকে সমাধান করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।

তাঁর মতে, কিতাব আমাদের জন্য কীভাবে সার্বজনীন দলীল হতে পারে এ বিষয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। সুন্নতের দলীল হওয়ার বিষয়টিকে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। সুন্নতকে নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় নববী সুন্নতওয়াযয়ী সুন্নত নামে সুন্নতকে দুইভাগে বিভক্ত করা দরকার। নববী সুন্নত হলো রাসূল (স.)-এর বাস্তব আমল ও কর্ম। ওয়াযয়ী সুন্নত হলো, সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণ এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কোরআন ও সুন্নতকে বিবেচনায় নিয়ে যে সকল সুন্দর বিষয়কে নিম্নোক্ত এই হাদীস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে উদ্ভাবন করেছেন সেই বিষয়সমূহ।

  من سن فى الإسلام سنة حسنة فله أجرها

অর্থ: যদি কেউ ইসলামে সুন্দর একটি সুন্নত শুরু করে তাহলে তাঁর জন্য অনেক বড় একটি পুরষ্কার রয়েছে।

তাঁদের উদ্ভাবিত সেসকল সুন্দর কাজ ও উদ্ভাবন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি দলীল। বিশেষ করে মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ তাঁর কিতাবুস সুন্নাহ নামক গ্রন্থে সুন্নত ও উম্মতের মধ্যকার যে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন তা অনেক বেশি অর্থবহ।

তাঁর মতে, ইজমাকে স্বতন্ত্র একটি দলীল হিসেবে গ্রহণ করা উসূলী দৃষ্টিকোণ থেকে বড় একটি ঘাটতি। এই কারণে ইজমাকে স্বতন্ত্র একটি দলীল হিসেবে নয়; স্বীকৃতিদানকারী হিসেবে, কিয়াসের একটি পরিপূরক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেননা, ইজমা, এককভাবে কোনো দলীল নয়। ইজতিহাদ যেন উম্মতের দৃষ্টিতে একটি বিধানে পরিণত হয় এজন্য প্রয়োজনীয় একটি শর্ত। কোনো ইজতিহাদের ইজমা হওয়ার জন্য শুধুমাত্র উলামাদের একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করাই যথেষ্ট নয়; বরং সমগ্র উম্মতের অভিন্ন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই কেবল ইজমা হতে পারে।

মুসা জারুল্লাহর মতে, আমাদের ক্ল্যাসিক উসূলশাস্ত্রে কিয়াসকেও খুব সংকীর্ণ অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিয়াসকে এভাবে সংকীর্ণ অর্থে ব্যাখ্যা করার কারণে ইসলামী শরীয়তে তা বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। কেননা, কিয়াসের ব্যাপারে এই সংকীর্ণ ধারণার কারণে, শরীয়তপ্রণেতা যেসব হুকুমের ইল্লত বর্ণনা করেননি, সেসব হুকুমের মধ্যে প্রতিফলিত ইল্লতকে তথা ইল্লত-ই মুতায়াদ্দিয়াকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়েছে। আর খুঁজে পাওয়া গেলেও যে কারণটি পাওয়া গিয়েছে সে ইল্লতকে দলীলীকরণের ক্ষেত্রে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। এমতাবস্থায় কিয়াসের ব্যাপারে উসূলে ফিকহের এই সংকীর্ণ ব্যাখ্যা আমাদেরকে ইখতিলাফ ছাড়া আর অন্য কোনো কিছু এনে দেয়নি। এ কারণে কিয়াসকেও বিস্তৃত অর্থে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, উরফের বদলে আওয়ায়িদ (আদাতসমূহ) নামক পরিভাষা ব্যবহার করাটা অধিকতর সমীচীন হবে। কেননা, উরফ অনেক সময় পরিবর্তনকে অগ্রাহ্য করে মারুফ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ায়িদ (ﻋﻮﺍﺋﺪ) সমাজ থেকে সমাজের পরিবর্তনশীল আদাত (রীতিনীতি)-কেও পরিগ্রহ করে। সমাজের সামাজিক আইনকে বুঝিয়ে থাকে। এই কারণে আওয়ায়িদ নামক পরিভাষাটি, একজন ফকীহকে ইবাদতের ক্ষেত্রে ফতোয়া দেওয়ার সময়, বিচারের ক্ষেত্রে রায় দেওয়ার সময় এবং মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়কে মূল্যায়ন করার সময় শুধুমাত্র শরয়ী বিধানসমূহই নয়; একইসাথে সামাজিক বিধানসমূহকেও বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ দিয়ে থাকে।

 

ইজতিহাদ ও আকলী দলীল

মুসা জারুল্লাহর মতে, মুসলমানগণ ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দী যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলো, সেগুলো তারা ইজতিহাদ ও ইসতিনবাতের মাধ্যমে সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিলো। তবে উসূলে ফিকহশাস্ত্রে আকলী দলীলের ক্ষেত্রে ইজতিহাদের আবশ্যিক শর্ত হিসেবে বুরহানী দলীলকে খুব কম স্থান দেওয়া হয়েছে অথবা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, রূহ ঘুমিয়ে পড়ে, চিন্তা নিভে যায় এবং ফিকহ শুধুমাত্র অতীতের মাসয়ালা-মাসায়েল মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, আকলী দলীলকে উপেক্ষা করার কারণে নতুন নতুন পুস্তক রচনা করার পরিবর্তে পূর্বে লিখিত গ্রন্থসমূহের ব্যাখ্যা ও শরাহ’র মধ্যে ফিকহের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা ইজতিহাদের পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং একে অচল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। অথচ ইজতিহাদের মূল বিষয় হলো ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা করে নবোদ্ভূত সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়াটা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড় বিপদ ডেকে নিয়ে আসে, যা ফিকহকেও অকার্যকর করে দেয়। শুধু তাই নয়, এই বিষয়টি সামগ্রিকভাবে ইসলামী জ্ঞানকেও অকার্যকর একটি জ্ঞানে পরিণত করে।

অথচ মানুষকে শুধুমাত্র ইজতিহাদের ক্ষমতাই দেওয়া হয়নি, একইসাথে তাদেরকে শরীয়তের সাথে সম্পর্ক রেখে আইন প্রণয়ন করারও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে মানুষের উপর যে খেলাফতের দায়িত্ব সেটা শুধুমাত্র প্রকৃতির উপর নয়, একইসাথে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁদেরকে খেলাফতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান বের করার জন্য নতুন একটি উসূলের প্রয়োজন, যে উসূল শুধুমাত্র নাকলী দলীলের মাধ্যমেই যথেষ্ট হবে না, একইসাথে আকলী দলীলকেও তাঁর মধ্যে সংযুক্ত করবে। বর্তমান সময়ে আদিল্লা-ই শারইয়্যাকে নতুন নতুন আকলী দলীলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। আকলী দলীল শুধুমাত্র মুতাকাল্লিমদের জন্যই নির্দিষ্ট নয়। ফকীহগণও এসকল দলীলকে ব্যবহার করতে বাধ্য।

কেননা, যখন কোনো নস থেকে হুকুম নির্গত করবে তখন শুধুমাত্র নাকলী দলীল-ই যথেষ্ট নয়, একইসাথে আকলী দলীলেরও প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, আদিল্লা-ই শারইয়্যার মধ্যে কসমোলজিক দলীলকেও সংযুক্ত করা প্রয়োজন। কেননা, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি পরতে পরতে ইলাহী কুদরতের কলমের দ্বারা লিখিত প্রাকৃতিক আয়াত/নিদর্শনাবলি, অর্থাৎ কাওনী আয়াতসমূহও একইসাথে তাশরী’ বা শরীয়তের উৎস। এ কারণে কোনো ইজতিহাদের সময়ে প্রকৃতির মধ্যকার এ সকল আয়াতকে বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশেষত নতুন কোনো বিষয়ে ইজতিহাদ করার সময় পূর্ববর্তী জাতিসমূহ কর্তৃক ইতিহাসের পাতায় ইলাহী আদালতের কলমের দ্বারা লিখিত সুন্নাতুল্লাহ নামক বিষয়টিকে ইজতিমায়ী আয়াত (সামাজিক নিদর্শন) হিসেবে বিবেচনা করে আদিল্লা-ই শারইয়্যার মধ্যে  একটি দলীল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কেননা সামাজিক জীবনের শরীয়তসম্মত প্রয়োজনসমূহও শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যের ন্যায় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। ইতিহাসের সাক্ষ্য, সমাজের দাবি, নিদেনপক্ষে নসের দালালতের মতোই বিবেচনাযোগ্য। মূলত ইসতিহসান, ইসতিসহাব, উরফ, সাদ্দে যারিয়ার মতো বিষয়সমূহকে উসূলের মধ্যে স্থান দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো সমাজের প্রয়োজন। শরীয়ত হলো মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার চুক্তি। যার কারণে একেকজন নবীর শরীয়ত ছিলো একেক রকম এবং সময়ের সাথে সাথে তা পরিবর্তিত হয়েছে। ইলাহী বিধান হিসেবে বিবেচিত তাকামুল (পরিপূর্ণতা)-এর দাবি হিসেবে সর্বশেষ শরীয়ত অতীতের সকল শরীয়তকে পূর্ণতা দিয়েছে।

মুসা জারুল্লাহর মতে, বুরহানী হুজ্জত হলো এমন এক দলীল যা আদিল্লা-ই শারইয়্যার মধ্যে স্বতন্ত্র একটি দলীল হিসেবে স্থান পাওয়ার যোগ্য। বুরহান’কে উসূলে ফিকহের একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বুরহানী দলীল তিন ভাগে বিভক্ত—

  • ১. বুরহান-ই ইনদিরাজ,
  • ২. বুরহান-ই তালাযুম,
  • ৩. বুরহান-ই তায়ানুদ।

বুরহান-ই ইনদিরাজ হলো, কোনো কিছুর যে অস্তিত্ব অন্য কিছুর অস্তিত্বকেও আবশ্যক করে তুলে। বুরহান-ই তালাযুম হলো, কোনো কিছুর যে অস্তিত্ব অন্য কিছুর অস্তিত্বকে প্রয়োজনীয় করে তুলে। আর বুরহান-ই তায়ানুদ হলো, কোনো কিছুর যে অস্তিত্ব অন্য অস্তিত্বের বিলুপ্তিকে আবশ্যক করে তুলে।  

 

আহকাম-ই ইবতিদাইয়া ও আহকাম-ই বিফাকিয়্যা

মুসা জারুল্লাহর মতে, মাসলাহাতকে শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যের আলোকে নতুন করে বিশ্লেষণ করা এবং এক একটি কায়েদায় রূপান্তরিত করা জরুরী। এই ক্ষেত্রে যে কাজ করতে হবে তা হলো, আহকামে শারইয়্যাকে ‘স্থায়ী’ ও ‘পরিবর্তনশীল’ এভাবে বিভক্ত করতে হবে। অন্যকথায়, আহকামে শারইয়্যাকে আহকামে ইবতিদাইয়্যা (সাবিত বা স্থায়ী) এবং আহকামে বিফাকিয়্যা (পরিবর্তনশীল) এ দু’ভাগে বিভক্ত করতে হবে।

আহকামে ইবতিদাইয়্যা হলো সাবিত, অপরিবর্তনশীল ও বিশ্বজনীন হুকুম-আহকাম। শরীয়ত প্রণেতা মানুষের ফিতরাতকে বিবেচনায় নিয়ে মানুষের আবশ্যিক প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সামনে রেখে যে সকল হুকুম দিয়েছেন সেসকল হুকুম। শরীয়ত এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছে। এসকল বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো মানুষের-ই বলার কিছু নেই এবং সংযুক্ত করারও কোনো অধিকার নেই।

আহকাম-ই বিফাকিয়্যা হলো, যে সকল হুকুম ধারাবাহিকতার দাবি করে না, বিশ্বজনীন নয়, সময়, স্থান ও সমাজের চাহিদার আলোকে পরিবর্তিত হয়। তবে এগুলোকেও আখলাক, আদালত, হাক্কানিয়াতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ থেকে পরিবর্তিত হতে হবে। পরিবর্তনীয় হলেও এগুলো কখনোই মূলনীতির বিরুদ্ধে যেতে পারবেনা। আহকাম-ই বিফাকিয়্যা নিয়ে শরীয়ত কিছু কিছু বিষয়ে প্রাথমিক কথা বলেছে, কিন্তু শেষ কথা উম্মতের উপর ছেড়ে দিয়েছে। সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে শরীয়তের মাকসাদকে কীভাবে বাস্তবায়ন করবে সেটা উম্মতকে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। যেমন—দাসপ্রথার বিষয়টি আহকাম-ই বিফাকিয়্যার অন্তর্গত। শরীয়ত শপথভঙ্গের কাফফারাকে গোলাম আজাদ করার সাথে সম্পর্কিত করে দিয়েছে, গোলাম আজাদ করার ফজিলত বর্ণনা করে গোলাম আজাদের প্রতি উৎসাহিত করেছে। সবশেষে মুকাতাবার বিধান দিয়েছে। এসকল বিষয় দ্বারা বুঝা যায় যে শরীয়ত দুনিয়া থেকে দাসপ্রথাকে উচ্ছেদ করতে চায়।

ইসলামের রহমতের বার্তার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে সকল ধরনের গোলামী থেকে মুক্ত করা। ইসলাম সমাজজীবন সম্পর্কে যেসকল বিধান নাযিল করেছে তাঁর উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে স্বাধীন ও সম্মানজনক একটি জীবনধারা দান করা। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও আইন প্রণয়নের লক্ষ্যও এটা। শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনী গঠন করার উদ্দেশ্যও এটা। মানুষের সকল অধিকারকে সংরক্ষণ করা এবং তাঁদের অধিকার যেন কেউ হরণ করতে না পারে, এর নিশ্চয়তা প্রদান করা।

 

কাওয়ায়িদ-ই ফিকহিয়্যা 

কাওয়ায়িদ-ই ফিকহিয়্যা নামক পরিভাষাটি, নতুন একটি উসূলের জন্য মুসা জারুল্লাহর যে অনুসন্ধান সেটার কেন্দ্রীয় পরিভাষা। তাঁর রচিত কাওয়ায়িদুল ফিকহিয়্যা নামক গ্রন্থটি তিনি রচনা করেছেন এ কাওয়ায়িদের বিষয়টিকে শক্তিশালী একটি ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রন্থটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খাজানে নতুন একটি ইসলামী সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে নতুন একটি উসূলের প্রয়োজন ছিলো। সে প্রয়োজনকে সামনে রেখে মূলত তিনি এ গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি তাঁর এ গ্রন্থে ২০১টি কুল্লি কায়েদাকে স্থান দিয়েছেন। এই ২০১টি কায়েদার মধ্যে ৯৯টি তিনি নিয়েছেন মাজাল্লা থেকে আর বাকি একশত দুইটি ইজ্জ বিন আব্দুস সালাম, কারাফী, শাতিবী ও তিনি নিজে প্রণয়ন করেছেন। মুসা জারুল্লাহ এ গ্রন্থে কুল্লি কায়েদাসমূহকে উসূলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্থান দিয়েছেন এবং মাসলাহাতের উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করেছেন।

মুসা জারুল্লাহর মতে, শরীয়তের সকল হুকুম-ই হলো মানুষের মাসলাহাতের জন্য। শুধু তাই নয়, সমগ্র শরীয়ত-ই হলো মাসলাহাত, রহমত ও আদালত। এর আলোকে কোনো কিছু যদি মাসলাহাতের পরিবর্তে অন্য কোনো কিছুতে পরিণত হয়, তাহলে সেটা শরীয়ত থেকেই খারিজ হয়ে যাবে। কোনো কিছু যদি রহমত থেকে বের হয়ে যায় কিংবা আদালতের গুণাবলিকে হারিয়ে ফেলে তাহলে সেটা শরীয়ত নয়। কেননা, আল্লাহর কাজ ও তাঁর প্রেরিত হুকুম-আহকাম তাঁর বান্দাদের মাসলাহাতের সাথে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংশয় পোষণ করাটাও জায়েজ নয়। এ ধরনের কোনো সংশয় মহান প্রভুর সাথে অপূর্ণতা সংযুক্ত করার শামিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন—

 اَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثاً

অর্থ:  কোনো কিছুকেই অযথা সৃষ্টি করা হয়নি।

 وَمَا خَلَقْنَا السَّمَٓاءَ وَالْاَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِب۪ينَ

অর্থ:  আকাশ ও যমীনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে সেগুলোকে খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করা হয়নি। 

মহান প্রভুর সৃষ্টির যেমন হক অনুরূপভাবে তাঁর দেওয়া আহকাম ততটাই হক। তাঁর সৃষ্টি যতটা মাসলাহাত, আহকামও ততটাই মাসলাহাত।

তাঁর মতে, মাসলাহাত হলো শরীয়তের মীযান। কোনো একটি মাসলাহাতের অস্তিত্ব, স্বয়ং সেটার গ্রহণযোগ্যতার উৎস। অন্যথায় মানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সংবিধান তৈরি করা, আইন  প্রণয়ন করা, সেনাবাহিনী গঠন করা সংক্ষেপে বলতে গেলে শরীয়ত কর্তৃক দেওয়া কর্তৃত্ব ব্যবহার করা সম্ভবপর নয়। এসকল বিষয় করার সময় সকল নসের মধ্যে আল্লাহ যে মাসলাহাত নামক কানুনকে রেখে দিয়েছেন, সেটাকে মীযান হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মাসলাহাতের মীযান হওয়ার বিষয়টি শুধুমাত্র ইল্লতের সাথে সম্পর্কিত মুয়ামালাতের হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তায়াব্বুদী (ইবাদত সংক্রান্ত) হুকুমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

তায়াব্বুদী হুকুমের ক্ষেত্রে মীযান হলো হিকমত, মাসলাহাত নয়। কেননা, তায়াব্বুদী হুকুমের ক্ষেত্রে তা’লীল নেই। সকলেই যেন উপকৃত হতে পারে এরকম সীমাহীন হিকমত ইবাদতের মধ্যে রয়েছে। যেমন—নামাজ সকল প্রকার খারাপ কাজ ও পঙ্কিলতা থেকে মানুষকে দূরে রাখে। কেউ যদি এই বিষয়কে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত হিসেবে না দেখে এ কথা বলে নামাজ ছেড়ে দেয় যে, ‘যেহেতু আমার অন্তর পরিষ্কার, আমি অন্য ভালো কাজের মাধ্যমে খারাপ ও পঙ্কিলতা থেকে দূরে থাকবো’—তাহলে সেটা হবে না। এ কারণে নসের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থ দেওয়া আবশ্যক। সুন্নতের মাধ্যমে ইবাদতকে যেরূপে করতে বলা হয়েছে সেটাই মূল, এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুদ, বিবাহ কিংবা পারিবারিক বিষয়ে যেসকল মাসলাহাতকে সামনে রাখা হয়; নামাজ, রোজা, হজ্জ ও কোরবানীর মতো ইবাদতের ক্ষেত্রে সেই ধরনের মাসলাহাত অনুসন্ধান করা যাবে না।

ফলশ্রুতিতে, ইল্লতের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি আমল মাসলাহাতের আলোকে গ্রহণযোগ্য হবে। এর আলোকে মাসলাহাত শেষ হলে আমলও শেষ হয়ে যাবে। যেমন—বিবাহের যে মাসলাহাত সেটা যদি না থাকে বা চলে যায় তাহলে বিবাহের বৈধতাও চলে গেছে বলে গণ্য হবে। বিবাহ মূলত চুক্তি, আকদ ও মিসাকের মাধ্যমে গঠিত ত্রিমুখী একটি আমল। পরিবার গঠনের জন্য নারী ও পুরুষের মধ্যকার যে চুক্তি; সেটার নাম হলো আকদ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্বামী ও স্ত্রীকে একে অপরের প্রতি আখলাকী দৃষ্টিকোণ থেকে দায়বদ্ধ করে তোলে। নিকাহ (বিবাহ) একইসাথে উভয় পক্ষকে একে অপরের অধিকারী হওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে জাগতিক একটি চুক্তিনামা (আকদ)। আর এ বিষয়টি উভয়কে একে অপরের প্রতি যে অধিকার রয়েছে সেই অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে আইনগত দায়বদ্ধতা আরোপ করে থাকে। এছাড়াও নিকাহ (বিবাহ) হলো এমন এক আধ্যাত্মিক চুক্তি (মিসাক), যা একজন নারী ও পুরুষ তাঁদের প্রভুর সাথে আবদ্ধ হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নিকাহ হলো মিসাক। আর এই বিষয়টি উভয়পক্ষকে আধ্যাত্মিক কিছু দায়-দায়িত্ব প্রদান করে। মাসলাহাতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটাই হলো নিকাহ বা বিবাহের মূল বিষয়। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে, মাসলাহতের এ বিষয়কে বাদ দিয়ে আরবদের রীতি-নীতিকে, শুধু তাই নয়, তাঁদের সমাজের নিকাহের ধারণাকে শরীয়তে পরিণত করা হয়েছে। যা মাসলাহাতকে অগ্রাহ্য ও অবজ্ঞা করার শামিল। আমাদের ক্ল্যাসিক ফিকহের গ্রন্থে বিবাহের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, বিবাহ হলো এমন একটি লেনদেন, চুক্তি যা পুরুষকে নারীর সতীত্বের অধিকারী করে। যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মোটেই মানানসই নয়। হিল্লা বিবাহ নামক বিষয়টিও মাকাসিদ আশ-শরীয়াহ লঙ্ঘন করা ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। মহান প্রভু যে পারিবারিক জীবনকে মু’মিনের জন্য দুনিয়ার জান্নাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেই পারিবারিক জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও মাসলাহাতসমূহকে এক পাশে রেখে দিয়ে এই ধরনের বিষয়কে গ্রহণ করা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

তাফসীর ও হাদীসের ক্ষেত্রে নতুন উসূলের অনুসন্ধান

মুসা জারুল্লাহ শুধুমাত্র উসূলে ফিকহের ক্ষেত্রেই নয়, একইসাথে তাফসীর ও হাদীসের ক্ষেত্রও নতুন উসূলের জন্য অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এই বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন।

উসূলে তাফসীরের ক্ষেত্রে দেখলে দেখা যায় যে, মুসা জারুল্লাহর মতে অধিকাংশ মুফাসসির-ই দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ আরবী ভাষাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যার ফলে ভাষাগত বিতর্ক তাফসীরের উপরে প্রাধান্য পেয়েছে। এ কারণে অনেক তাফসীরের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ব্যাকরণগত বিতর্ক তাফসীর গ্রন্থের অর্ধেকের বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে। কেউ-বা আবার রেওয়ায়েতের প্রতি অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যার ফলে রেওয়ায়েত ভিত্তিক তাফসীরসমূহে রেওয়ায়েতের প্রাধান্য অত্যধিক। সামগ্রিকভাবে তাফসীর শাস্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এমন তাফসীর গ্রন্থের সংখ্যা অনেকটাই কম যেখানে একইসাথে জ্ঞানগত ও জীবন সংশ্লিষ্ট বিষয় অধিক পরিমাণে স্থান পেয়েছে। যেমন—খুব কম তাফসীর-ই রয়েছে যেখানে শুরা ও প্রাশাসনিক ব্যবস্থার পরিপূর্ণ সমাধান পেশ করা হয়েছে। এমন তাফসীরও খুব কম রয়েছে যেখানে সুদ ও নিকাহ-তালাক থেকে শুরু করে পারিবারিক বিষয়ের পরিপূর্ণ সমাধান দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, মুফাসসিরগণের মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিলো কোরআন আমাদেরকে জীবনে কীভাবে রাহবার হতে পারে, কোরআনের উপর ভিত্তি করে কীভাবে বিশ্বব্যবস্থাকে পাঠ করে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান বের করা যেতে পারে, সেসকল বিষয়কে তুলে ধরা। কিন্তু তার পরিবর্তে আমাদের মুফাসসিরগণ দালালাতের অধ্যায়সমূহ তথা ব্যাকরণগত বিষয় নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করেছেন। শুধু তাই নয়, কিছু কিছু মুতাকাল্লিম মুফাসসিরও তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা করেছেন। সৃষ্টির উদ্দেশ্য, মহাসৃষ্টির হিকমত—এসকল মৌলিক বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেননি।

মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ যখন পাকিস্তানের পেশোয়ারের জেলে বন্দী ছিলেন তখন তিনি সেখানে বসে ফিকহুল কোরআন নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটির পরিসর ছোট হলেও সেই গ্রন্থে তিনি তাফসীরের ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন এবং মাকাসিদী ও ইজতিমায়ী (সামাজিক) তাফসীর কেমন হওয়া উচিত সেটার উপমা পেশ করেছেন। যার ফলে উসূলে তাফসীরের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মহামূল্যবান একটি গ্রন্থ।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতে উৎপত্তি হওয়া আহলে কোরআনের যুক্তির অসারতা প্রমাণের লক্ষ্যে তিনি কিতাবুস সুন্নাহ  নামে গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেন। যা উসূলে হাদীসের উপরে লিখিত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজন। মুসা জারুল্লাহর মতে, উসূলে হাদীসের ক্ষেত্রেও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি বলেন, সহীহ হাদীসকে যায়িফ হাদীস থেকে পৃথকীকরণে, হাদীসের সংকলনে ও সনদসমূহকে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ যে সকল কাজ করেন তার কোনো তুলনা নেই। এটি সত্যি আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে অনেক বড় একটি অর্জন। তবে, ‘উসূলে হাদীস’ রিসালাতের বিশ্বজনীনতাকে আমাদের সামনে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারেনি। হাদীস শাস্ত্রের শরাহসমূহে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ নিয়ে অনেক আলোচনা থাকলেও জীবনের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় এবং আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাগত ধারণাকে আরও উপরে নিয়ে যাবে এরকম আলোচনা খুব বেশি স্থান পায়নি। আমাদের চিন্তা ও জ্ঞানকে বিকশিত করবে, ভিন্ন একটি মাত্রায় নিয়ে যাবে এমন অনেক বিষয় রাসূল (স.)-এর হাদীসসমূহের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আমাদের মুহাদ্দিসগণ মূল কথাকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অনেক ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন।

 

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

 

উৎস-

  • ১. মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, আদাবিয়্যাতু আরাবিয়্যা ইলা উলুমুল ইসলামিয়্যা।
  • ২. মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, ফিকহুল কোরআন।
  • ৩. মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, ইসলামী শরীয়তের মূলনীতিসমূহ।
  • ৪. মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, ইসলামের আলিফ-বা।
  • ৫. মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, কাওয়ায়িদুল ফিকহিয়্যা। 
  • ৬. মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, কিতাবুস সুন্নাহ। 
  • ৭. Musa Carullah Bigiyef, Uzun Günlerde Oruç বা দীর্ঘ সময়ে রোজা।  
  • ৮. শাতিবী, আল-মুয়াফাকাত।
  • ৯. Mehmet Görmez, Musa Carullah Bigiyef, Diyanet Vakfi yay. Ankara 2002.
১৫৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top