বিস্তীর্ণ একটি ইনসানিয়াত এবং কার্যকর একটি ঈমানিয়াত

বিস্তীর্ণ একটি ইনসানিয়াত এবং কার্যকর একটি ঈমানিয়াত

আমাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, জীবন ও কর্মজগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানবসভ্যতা যে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সেগুলোর উৎস মূলত দুটি মৌলিক কারণের মধ্যে নিহিত। এগুলির মধ্যে প্রথমটি হলো, মহাদিগন্তে যখন অর্থবহতার মৃত্যু ঘটে এবং কিবলার বিলুপ্তির প্রমাণসমূহ প্রকাশ পায়, তখন ‘মানুষকে রক্ষা করা’ করাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় [১]। দ্বিতীয়টি হলো-যখন স্রষ্টার মৃত্যু ঘোষণা করা হয় এবং বিস্মৃতির যাত্রাপথে প্রবেশের কথা বলা হয়, তখন লক্ষ্য হয়ে ওঠে ‘ঈমানের সংরক্ষণ’। এখানে ‘সংরক্ষণ’ বলতে তাজদীদ/নবায়ন ও ইহইয়া/পুনর্জাগরণকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, মানুষ ও ঈমান উভয়কেই কেবল তখনই সংরক্ষণ করা সম্ভব, যখন তারা এই পৃথিবীতে সংঘটিত নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদেরকে এমনভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, যাতে তারা জীবন্ত ও গতিশীল অবস্থায় টিকে থাকে।

এর ব্যাখ্যা হলো: এই জগতে মানুষ এখন আর কেবল একটি ‘উপাদান/যন্ত্র’ ছাড়া কিছুই নয়। এরপর তাকে কেবল একটি ‘বাণিজ্যিক পণ্যে (product)’ পরিণত করা হয়েছে। আর পরবর্তীতে এসে তাকে নিছক একটি ‘তথ্য (data)’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। এটি সর্বজনবিদিত যে, যন্ত্রের গঠনপ্রকৃতি মূলত ‘বিমূর্তকরণ ও খণ্ডীকরণ’ ((Abstraction and Fragmentation)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত; পণ্যের গঠনপ্রকৃতি ‘অর্থ ও মুনাফা’ (Price and Profit)-র ওপর, আর তথ্যের গঠনপ্রকৃতি ‘সংখ্যা ও অনুমান’ (Data and Inference)-এর ওপর নির্ভরশীল। এই আধুনিক মূল্যবোধ ও কার্যপ্রণালীগুলো মানুষের অস্তিত্বকে কীভাবে অবনমিত ও সংকুচিত করেছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। মানুষের নবায়ন কেবল তখনই সম্ভব, যখন তাকে আলাত তথা ‘উপাদান বা যন্ত্রের’ স্তর থেকে তুলে ‘আয়াতের’ মর্যাদায় উন্নীত করা হবে। এটি সর্বজনবিদিত যে, আয়াতের গঠনপ্রকৃতি নির্ভর করে অস্তিত্বের উপাদান ও তার নির্দেশিত অর্থের মধ্যকার ক্রমবিকাশের ওপর।

অনুরূপভাবে, এ নবায়নের অর্থ হলো তাকে পণ্যের অবস্থান থেকে তুলে এনে ‘হিবা/উপহার’-এর মর্যাদার স্তরে উন্নীত করা। আমরা জানি যে, হিবার গঠনপ্রকৃতি মূল্যায়ন ও সম্মানিতকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষকে নবায়নের সর্বশেষ ধাপ হলো তাকে ‘তথ্য হওয়ার’ স্তর থেকে তুলে এনে ‘ইলাহী নাফখা’র মর্যাদায় উন্নীত করা। আর নাফখা মূলত ফিতরাত ও হাকীকতের সমন্বয়ে গঠিত। আয়াত, হিবা বা নাফখা-যাই হোক না কেন, এই অন্টোলজিক্যাল অপরিহার্যতাগুলোর কার্যকর প্রয়োগ মানুষের অস্তিত্বকে কতটা উচ্চে তুলে ধরে এবং বিস্তৃত করে, তা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।

অন্যদিকে ঈমান বর্তমান জগতে ‘আনুষ্ঠানিকতা’, ‘অতিরিক্ততা’ ও ‘ভ্রম’–এর রূপ ধারণ করেছে।  একথা সর্বজনবিদিত যে, আনুষ্ঠানিকতা কেবল বাহ্যিক খোলসে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং ঈমানের প্রকৃত সত্তার প্রতি তার কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকে না। যখন ঈমানকে ‘অতিরিক্ত’ বলে বিবেচনা করা হয়, তখন তার থাকা বা না থাকাটা সমার্থক হয়ে যায়। তাকে যখন কৃত্রিম ওয়াহাম বা ভ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন তা তা মানুষের প্রবৃত্তিনির্ভর এক অন্তর্গত আবেগে পরিণত হয়। এসকল বিষয় ঈমানের হাকীকতকে নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর করে তোলে।

ঈমানকে কেবল তখনই নবায়ন করা সম্ভব যখন এটি স্পষ্ট করা হয় যে ঈমান নফল বা অতিরিক্ত কোন বিষয় নয়, বরং ঈমান হলো মানুষের একটি মৌলিক প্রয়োজন; যখন ঈমানকে আনুষ্ঠানিকতা থেকে মুক্ত করে রূহের মূল সত্তার পর্যায়ে উন্নীত করা হয়; এবং যখন তাকে ওয়াহাম বা ভ্রম হিসেবে বরং অন্তর্জাত এক আধ্যাত্মিক স্বাদ হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। রূহ বা আধ্যাত্মিক স্বাদ-যাই হোক না কেন, এ অন্তর্নিহিত অপরিহার্যতাগুলোকে বিবেচনায় নিলে ঈমানের হাকীকত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তা তার স্থবিরতা ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে মুক্তি লাভ করে।

তবে ব্যক্তির ‘নতুন মানুষ’ ও ‘নতুন মুমিনে’ উত্তরণ তখনই ঘটে, যখন সে এক সমন্বিত রূহী ও চিন্তাগত জাগরণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আজ মুসলমানদের মধ্যে রূহানী ও চিন্তাগত এক শূন্যতা বিরাজ করছে। এমনকি আমরা লক্ষ্য করছি যে ‘দাওয়াতের ভাষা’ ও ‘ফতওয়ার ভাষা’ – নিজ নিজ অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেই ভাষ্যগুলো চিন্তা ও রূহানিয়াতের ক্ষেত্রকেও দখল করে নিচ্ছে। যেসকল সংকট আজ মানুষকে অন্তর্গতভাবে নিঃস্ব করে দিচ্ছে এবং ঈমানকে নিষ্ক্রিয় করে তুলছে, সেগুলোর কার্যকর মোকাবিলা তখনই সম্ভব, যখন এসবের ফলে গড়ে ওঠা বস্তুগত পরিসরের তুলনায় অধিক বিস্তৃত একটি রূহানী (আধ্যাত্মিক) চিন্তাক্ষেত্র নির্মাণ করা যায়।

এই রূহানী ও চিন্তাগত ক্ষেত্রকে পদ্ধতিগত ও মৌলিক দিক থেকে এমনভাবে বিকশিত করতে হবে, যাতে তা আধুনিক বস্তুবাদী দর্শনের সঙ্গে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হয়। এর পরিপক্বতা প্রথমত কিছু ইসলামী মূল্যবোধ ও ধারণাকে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন, সেগুলোর সার্বজনীন ও সামগ্রিক মাত্রা উন্মোচন, এবং মানবজাতির আখলাকী ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট নিরসনে সেগুলোর সম্ভাব্য অবদান ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হওয়া উচিত। এ ধারণাগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় উল্লেখ করাটাকে প্রাসঙ্গিক বলে আমরা মনে করি। এগুলো হলো—‘শাহাদাত/সাক্ষ্য’, ‘আয়াত’, ‘আমানত’, ‘মাইয়্যত/সহাবস্থান’ এবং ‘আমল’ ইত্যাদি।

এ পর্যায়ে আমাদের সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা গভীরতাসম্পন্ন এবং নান্দনিক ও স্বতন্ত্র সৃষ্টিশীলতার সক্ষমতা অর্জন করতে পারি? এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ধরনের চিন্তাগত উৎপাদনশীলতা কীভাবে একদিকে আমাদের মানবতাকে আরও বিস্তৃত ও গভীরতর করে তুলতে পারে এবং অন্যদিকে আমাদের ঈমানকে সক্রিয় ও কর্মমুখী রূপে রূপান্তরিত করতে পারে। আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘ইনসানিয়াতুন ওয়াসিয়াতুন তথা বিস্তৃত একটি ইনসানিয়াত’ ও ‘ঈমানিয়াতুন ফায়িলাতুন তথা কার্যকর একটি ঈমানিয়াত’ বিষয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান, এবং আমি এই আলোচনার প্রেক্ষিতে চারটি পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করতে চাই।

১। একজন গবেষক যতক্ষণ না হীনমন্যতা তথা নিজেকে তুচ্ছ মনে করা এবং অন্যকে অতিরঞ্জিতভাবে মহান মনে করার প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে পারে, ততক্ষণ তার পক্ষে মৌলিক চিন্তার উদ্ভাবন সম্ভব নয়। তাই তার উচিত নিজের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, তার ভেতরেই এমন এক সম্ভাবনার ভাণ্ডার রয়েছে, যা তাকে আবার সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে।

২। গবেষক যদি তার চিন্তাকে নিজস্ব স্বকীয়তা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে গড়ে না তোলে, তবে তার পক্ষে গভীর ও নান্দনিক কোনো চিন্তাগত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারণ এসব প্রয়োজনের মধ্যেই নিহিত থাকে মানুষের প্রতি এক উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঈমানের প্রতি একটি বিশেষ প্রয়োগপদ্ধতি। এ কারণেই সে এসবের মধ্য থেকে পূর্বে অনাবিষ্কৃত নতুন সমস্যাবলি ও দলীল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়। ফলে বৈশ্বিক সংস্কৃতির দিগন্তকে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে তার নিজস্ব এক বিশেষ অবদান থাকে।

৩। বাইরের চিন্তা ও জ্ঞানকে আয়ত্ত করার পর, সেগুলোকে অতিক্রম করে সেই বিষয়বস্তুর উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ ও পদ্ধতির ওপর দক্ষতা অর্জন না করা পর্যন্ত সে স্বকীয় কোনো চিন্তাগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। অন্য সংস্কৃতি থেকে অনূদিত বিষয়সমূহ সাধারণত টেক্সটভিত্তিক হয়ে থাকে। এসব টেক্সটে সাধারণত পরিভাষা, ধারণা ও সংজ্ঞা স্থান পায়। ফলে সেগুলোকে নিজেদের চিন্তার আলোকে পুনর্গঠন ও উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম ও প্রক্রিয়া অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অথবা সেখানে বিভিন্ন ভিত্তি-প্রমাণ (তর্ক/যৌক্তিক ভিত্তি) স্থান পায়। সে ক্ষেত্রে তা কল্পনা ও ধারণা নির্মাণের উপায়গুলোর প্রয়োজনীয়তার তৈরি হয়।

৪। বিকল্প চিন্তাকে কল্পনা করার সক্ষমতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত স্বকীয়তা অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ এ অবস্থাই একজন গবেষককে অনূদিত বিষয়বস্তুর প্রতি প্রশ্ন তোলার শক্তি জোগায় এবং তার কল্পনাশক্তিকে আরও বিকশিত করে।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ।

 

টীকা
[ ১] কিবলা বলতে এখানে নামাজের দিক বুঝানো হচ্ছেনা। কিবলার বিলুপ্তি বলতে এখানে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য ইস্তেকামাতের সাথে টিকে থাকার যে শক্তি, সেটার ঘাটতি বুঝানো হয়েছে। মূলত এটা একটা সাহিত্যিক রূপক। অর্থাৎ এরূপ অবস্থা যখন হয়, তখন মূল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় মানুষকে তাজদীদ ও ইহইয়া করা।

৮২৪ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান (জন্ম ১৯৪৪) সমকালীন মুসলিম উম্মাহর বহুমাত্রিক একজন আলেম, মুতাফাক্কির ও দার্শনিক। তাঁর দার্শনিক সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাগত বহুমাত্রিকতার কারণে চিন্তকেরা তাকে যুগের গাজ্জালী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মরক্কোর আল জাদিদায় জন্মগ্রহণকারী আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান, রাবাতের মুহাম্মদ পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে প্যারিসের সোরবোনে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ইসলাম ও পাশ্চাত্য উভয় দার্শনিক ঐতিহ্যের উপর প্রগাঢ় অধিকারের ফলশ্রুতিতে তিনি বিগত অর্ধশতাব্দীর চিন্তাগত জীবনে দ্বীন, আখলাক, দর্শন, রাজনীতি, ফিকহ, ভাষা ও আধুনিকতার মতো বিস্তৃত বিষয়ে ত্রিশটিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন।তাঁর চিন্তাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময়। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ/চব্বিশ বছর এবং সাহিত্য ও কবিতার প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ। যুদ্ধের বিপর্যয় তাকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: দৃশ্যমানভাবে হলেও মুসলমানদের আকলকে বিপর্যস্ত করে এমন আকলের প্রকৃতি কী?, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আমাদের জন্য কী বয়ে এনেছে এবং এর মাধ্যমে আমরা কোন অবস্থায় উপনীত হলাম? এ প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষিতে তিনি ‘আমরা কারা এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অপর’ই বা কারা’? তিনি এই আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়ান এবং এই মৌলিক পাঁচটি প্রশ্নকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর চিন্তাজগতকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিন্তাগত সফরের ভেতর দিয়েই তিনি আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান হয়ে ওঠেন।  পরবর্তী জীবনে তার প্রায় সমগ্র চিন্তাপ্রকল্পই এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এ কারণেই তার রচনাগুলো বিচ্ছিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা স্বতন্ত্র গ্রন্থমাত্র নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত ও আখলাকী পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ প্রকল্পের অংশ।ত্বহা আব্দুর রহমানের কাছে মুসলিম সমাজের সংকট নিছক রাজনৈতিক ক্ষমতার সংকট নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে এবং তার গভীরে প্রয়োজন আকল, আখলাক ও মানুষের রূহানী পরিবর্তন। এ জায়গা থেকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী ও সংস্কারবাদী আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন এবং শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে উম্মাহর পুনর্জাগরণ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। একইসঙ্গে পাশ্চাত্যায়নকে তিনি কেবল বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব হিসেবে দেখেননি; মুসলিম সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, চিন্তাপদ্ধতি ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে দেওয়া একটি গভীর প্রক্রিয়া হিসেবে বিচার করেছেন। তার কাছে মুক্তির অর্থ তাই পশ্চিমকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং নিজস্ব আকল, ভাষা, আখলাক ও ঈমানের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য ফিরে পাওয়া।এই অনুসন্ধান থেকেই তার দর্শনে ‘আল ফালসাফাতুত তাদাভুলিয়্যাহ’ এবং বিশেষত ‘আল ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, দর্শন কোনো একটি সভ্যতা বা ভাষার একচেটিয়া সম্পদ নয়। গ্রিক বা আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাতেই কেবল দর্শন সম্ভব, এমন ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং আরবীকে স্বতন্ত্র দার্শনিক নির্মাণের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। একইভাবে ঈমানকে তিনি চিন্তার বিপরীতে স্থাপন করেন না; বরং ঈমান, আকল ও আখলাকের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন। তার ই’তিমানী দর্শনে ‘আমানত’ মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান ও কর্মকে বোঝার কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়। আধুনিকতার নৈতিক সংকটের বিপরীতে আখলাকের নিজস্ব ভিত্তি থেকে একটি বিকল্প দার্শনিক ভাষা নির্মাণই তার দীর্ঘ চিন্তাসাধনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:• العمل الديني وتجديد العقل • تجديد المنهج في تقويم التراث • فقه الفلسفة: الفلسفة والترجمة • الحق العربي في الاختلاف الفلسفي • سؤال الأخلاق: مساهمة في النقد الأخلاقي للحداثة الغربية • روح الحداثة: المدخل إلى تأسيس الحداثة الإسلامية • روح الدين: من ضيق العلمانية إلى سعة الائتمانية • بؤس الدهرانية: النقد الائتماني لفصل الأخلاق عن الدين • دين الحياءসমকালীন মুসলিম চিন্তায় ত্বহা আব্দুর রহমানের স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি পশ্চিমা দর্শনের প্রশ্ন ও পরিভাষাকে কেবল ইসলামী ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেননি; বরং মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব জ্ঞান, ঈমান, ভাষা ও আখলাকের ভিত থেকে নতুন দার্শনিক প্রশ্ন এবং পরিভাষা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, এবং এ প্রকল্পকে সামনে রেখে শতশত পরিভাষা তৈরি করেছেন। তার কাছে ইসলামী ঐতিহ্য অতীতের কোনো স্থির স্মারক নয়, আবার আধুনিকতাও অনিবার্যভাবে অনুসরণীয় কোনো চূড়ান্ত মডেল নয়। ঐতিহ্যের গভীরতা ধারণ করে বর্তমানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো একটি ‘স্বাধীন ও সৃষ্টিশীল মুসলিম আকল নির্মাণ’ই তার প্রকল্পের কেন্দ্র। এই সুবিশাল ও সুসংহত চিন্তাপ্রকল্পের কারণে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কণ্ঠগুলোর একজন।
Picture of আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান (জন্ম ১৯৪৪) সমকালীন মুসলিম উম্মাহর বহুমাত্রিক একজন আলেম, মুতাফাক্কির ও দার্শনিক। তাঁর দার্শনিক সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাগত বহুমাত্রিকতার কারণে চিন্তকেরা তাকে যুগের গাজ্জালী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মরক্কোর আল জাদিদায় জন্মগ্রহণকারী আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান, রাবাতের মুহাম্মদ পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে প্যারিসের সোরবোনে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ইসলাম ও পাশ্চাত্য উভয় দার্শনিক ঐতিহ্যের উপর প্রগাঢ় অধিকারের ফলশ্রুতিতে তিনি বিগত অর্ধশতাব্দীর চিন্তাগত জীবনে দ্বীন, আখলাক, দর্শন, রাজনীতি, ফিকহ, ভাষা ও আধুনিকতার মতো বিস্তৃত বিষয়ে ত্রিশটিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন।তাঁর চিন্তাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময়। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ/চব্বিশ বছর এবং সাহিত্য ও কবিতার প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ। যুদ্ধের বিপর্যয় তাকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: দৃশ্যমানভাবে হলেও মুসলমানদের আকলকে বিপর্যস্ত করে এমন আকলের প্রকৃতি কী?, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আমাদের জন্য কী বয়ে এনেছে এবং এর মাধ্যমে আমরা কোন অবস্থায় উপনীত হলাম? এ প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষিতে তিনি ‘আমরা কারা এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অপর’ই বা কারা’? তিনি এই আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়ান এবং এই মৌলিক পাঁচটি প্রশ্নকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর চিন্তাজগতকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিন্তাগত সফরের ভেতর দিয়েই তিনি আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান হয়ে ওঠেন।  পরবর্তী জীবনে তার প্রায় সমগ্র চিন্তাপ্রকল্পই এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এ কারণেই তার রচনাগুলো বিচ্ছিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা স্বতন্ত্র গ্রন্থমাত্র নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত ও আখলাকী পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ প্রকল্পের অংশ।ত্বহা আব্দুর রহমানের কাছে মুসলিম সমাজের সংকট নিছক রাজনৈতিক ক্ষমতার সংকট নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে এবং তার গভীরে প্রয়োজন আকল, আখলাক ও মানুষের রূহানী পরিবর্তন। এ জায়গা থেকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী ও সংস্কারবাদী আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন এবং শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে উম্মাহর পুনর্জাগরণ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। একইসঙ্গে পাশ্চাত্যায়নকে তিনি কেবল বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব হিসেবে দেখেননি; মুসলিম সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, চিন্তাপদ্ধতি ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে দেওয়া একটি গভীর প্রক্রিয়া হিসেবে বিচার করেছেন। তার কাছে মুক্তির অর্থ তাই পশ্চিমকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং নিজস্ব আকল, ভাষা, আখলাক ও ঈমানের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য ফিরে পাওয়া।এই অনুসন্ধান থেকেই তার দর্শনে ‘আল ফালসাফাতুত তাদাভুলিয়্যাহ’ এবং বিশেষত ‘আল ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, দর্শন কোনো একটি সভ্যতা বা ভাষার একচেটিয়া সম্পদ নয়। গ্রিক বা আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাতেই কেবল দর্শন সম্ভব, এমন ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং আরবীকে স্বতন্ত্র দার্শনিক নির্মাণের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। একইভাবে ঈমানকে তিনি চিন্তার বিপরীতে স্থাপন করেন না; বরং ঈমান, আকল ও আখলাকের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন। তার ই’তিমানী দর্শনে ‘আমানত’ মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান ও কর্মকে বোঝার কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়। আধুনিকতার নৈতিক সংকটের বিপরীতে আখলাকের নিজস্ব ভিত্তি থেকে একটি বিকল্প দার্শনিক ভাষা নির্মাণই তার দীর্ঘ চিন্তাসাধনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:• العمل الديني وتجديد العقل • تجديد المنهج في تقويم التراث • فقه الفلسفة: الفلسفة والترجمة • الحق العربي في الاختلاف الفلسفي • سؤال الأخلاق: مساهمة في النقد الأخلاقي للحداثة الغربية • روح الحداثة: المدخل إلى تأسيس الحداثة الإسلامية • روح الدين: من ضيق العلمانية إلى سعة الائتمانية • بؤس الدهرانية: النقد الائتماني لفصل الأخلاق عن الدين • دين الحياءসমকালীন মুসলিম চিন্তায় ত্বহা আব্দুর রহমানের স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি পশ্চিমা দর্শনের প্রশ্ন ও পরিভাষাকে কেবল ইসলামী ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেননি; বরং মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব জ্ঞান, ঈমান, ভাষা ও আখলাকের ভিত থেকে নতুন দার্শনিক প্রশ্ন এবং পরিভাষা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, এবং এ প্রকল্পকে সামনে রেখে শতশত পরিভাষা তৈরি করেছেন। তার কাছে ইসলামী ঐতিহ্য অতীতের কোনো স্থির স্মারক নয়, আবার আধুনিকতাও অনিবার্যভাবে অনুসরণীয় কোনো চূড়ান্ত মডেল নয়। ঐতিহ্যের গভীরতা ধারণ করে বর্তমানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো একটি ‘স্বাধীন ও সৃষ্টিশীল মুসলিম আকল নির্মাণ’ই তার প্রকল্পের কেন্দ্র। এই সুবিশাল ও সুসংহত চিন্তাপ্রকল্পের কারণে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কণ্ঠগুলোর একজন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top