এক। প্রয়োজনীয়তা
দার্শনিক ও ধর্মীয় সাহিত্য যেমন একটি জাতির মতাদর্শের মৌখিক বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন সেই মতাদর্শ দ্বারা নির্ধারিত হয়, ঠিক তেমনি মিউজিক ও শব্দশিল্পও একটি জাতির গভীরতম বিশ্বাসের “অনুবাদ”। এগুলো একটি বৃহৎ মোজাইকের ক্ষুদ্রাংশের মতো, যা সংস্কৃতির সামগ্রিক কাঠামোয় মিলে যায়, প্রতিটি টুকরো সেই জাতির বিশ্বদৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে এবং সেই একই চেতনার অন্যান্য বহিঃপ্রকাশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকে। সংস্কৃতিতে এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে শব্দশিল্প একটি জাতির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি অপরিহার্য রক্ষাকবচে পরিণত হয়।
মতাদর্শ যখন নান্দনিক সুর ও ছন্দে রূপান্তরিত হয়, সেই ‘অনুবাদ’কে ইংরেজিতে মিউজিক বলা হয়। শব্দটি সাধারণত শব্দশিল্পের সব ধরনের প্রকাশকে অন্তর্ভুক্ত করে, সেগুলোর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য কিংবা পরিবেশনার প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন। কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় এমন কোনো একক শব্দ বা পরিভাষা নেই, যা সামগ্রিকভাবে শব্দশিল্পের সব ধারাকে ধারণ করে।
আরবি মুসিকা (musiqa) শব্দটি প্রায়ই ইংরেজি মিউজিক-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর অর্থ ইংরেজি শব্দটির মতো ব্যাপক নয়। গ্রিক ভাষা থেকে আগত এই পরিভাষাটি মূলত সেসব শব্দশিল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো, যেগুলো পরিবেশনার প্রেক্ষাপট বা নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হয়েছে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিন্দিতও হয়েছে। বিপরীতে, ইসলাম যেসব শব্দশিল্পকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ও লালন করেছে, যেমন কোরআন তেলাওয়াত, আজান, তালবিয়া পাঠ কিংবা শি‘র, সেগুলো কখনোই মুসিকা পরিভাষার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এই কারণেই আমি অন্যত্র একটি নতুন পরিভাষার প্রস্তাব করেছি: হান্দাসাহ আল-সাউত (handasah al-sawt) (আল-ফারুকী ১৯৮২: ৩০ ও পরবর্তী পৃষ্ঠা)। এই পরিভাষাটি শব্দশিল্পের সব ধারাকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম এবং সে অর্থে ইংরেজি মিউজিক ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় ব্যবহৃত সমতুল্য শব্দগুলোর সঙ্গে যথার্থভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পরিভাষা এবং এর ব্যাপক তাৎপর্যকে সামনে রেখেই পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে যাবে।
হান্দাসাহ আল-সাউত এমন একটি সাংস্কৃতিক উপাদান, যা কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বিষয়বস্তু ও রূপ নির্বিশেষে যেকোনো শব্দশিল্পের পক্ষে এই ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। কেবল সেই শিল্পই এমন ভূমিকা রাখতে পারে, যা তার জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে উঠে আসে এবং যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার জন্ম, সেই পরিমণ্ডলের বার্তা ও মূল্যবোধকে প্রকাশ করে। এ ধরনের শব্দশিল্প বা সংগীত-ঐতিহ্যের চর্চা ও প্রসার ইতিহাসের যেকোনো সময়ে, যেকোনো জাতির জন্যই অপরিহার্য। তবে বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য এর প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। কারণ আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে প্রতিনিয়ত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির এমন মিথস্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, যার ফলে নিজস্ব ও বহিরাগত উপাদানের মধ্যকার পার্থক্য ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। হান্দাসাহ আল-সাউত সেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি ও বিলুপ্তির বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত একমাত্র কার্যকর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যভাবে বললে, এটি উম্মাহর ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
বিগত কয়েক দশক ধরে ‘ইসলামীকরণ’ মুসলিম চিন্তক ও সংস্কারকদের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। তা সত্ত্বেও হান্দাসাহ আল-সাউতের প্রভাব ও তাৎপর্য সম্পর্কে যথেষ্ট উপলব্ধি নিয়ে ইসলামীকরণের প্রশ্নে অগ্রসর হয়েছেন, এমন লেখক ও চিন্তাবিদের সংখ্যা খুবই কম। আমরা জ্ঞানের ইসলামীকরণ, অর্থনীতির ইসলামীকরণ, সমাজতত্ত্বের ইসলামীকরণ, রাজনৈতিক চিন্তার ইসলামীকরণ, মনোবিজ্ঞানের ইসলামীকরণ, এমনকি পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের ইসলামীকরণের প্রচেষ্টাও দেখতে পাই। এসব আন্দোলন ও প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো মুসলিম উম্মাহর জন্য এমন একটি সুদৃঢ় ইসলামী সত্তা ও পরিচয় গড়ে তোলা, যার ভিত্তিতে তারা সমকালীন জীবনের চাপিয়ে দেওয়া প্রভাবগুলোর মোকাবিলা করতে পারবে, সেগুলো এড়িয়ে চলতে পারবে কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হবে। ইসলামীকরণ ছাড়া একটি ইতিবাচক, সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্বমঞ্চে একটি প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে।
সংস্কৃতির এতগুলো দিকের ইসলামীকরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সমসাময়িক মুসলিমরা নিজেদের জীবনের নান্দনিক পরিসরের ইসলামীকরণ সম্পর্কে আশ্চর্যজনকভাবে উদাসীন। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই তাদের ঘর ফরাসি আসবাব কিংবা উনিশ শতকের ইউরোপীয় ধারার চিত্রকর্মে সাজিয়ে রাখেন। তারা পশ্চিমা বা হিন্দি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের মাধ্যমে বিনোদন গ্রহণ করেন, যেগুলো বিষয়বস্তু ও রূপ উভয় দিক থেকেই ইসলামী নয়। রেডিও, ক্যাসেটসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমও অ-ইসলামী সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিপূর্ণ। একইভাবে উদ্বেগজনক হলো রক্ষণশীল শ্রেণির বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া। মিউজিক কিংবা শব্দশিল্পের ইসলামী প্রকাশ নিয়ে তাদের কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা দ্রুত আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন, যেন শুধু মিউজিক শোনাই নয়, এ নিয়ে কথা বলাও তাদের কলুষিত করে ফেলতে পারে। মিশরের নতুন একটি ধর্মীয় গানের বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করার সময় এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী বলেছিলেন, তিনি আর কোনো ধরনের মিউজিকই শুনবেন না, কারণ তা ইসলামে নিষিদ্ধ হতে পারে। এমনকি কোনো ইসলামী সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতেও মিউজিকবিষয়ক প্রসঙ্গ সাধারণত স্থান পায় না। আর কতবার যে বিভিন্ন মুসলিম আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, মিউজিক হালাল নাকি হারাম, তার কোনো হিসাব নেই।
এ কথা সত্য যে, মুসলিমপ্রধান কিংবা অমুসলিম যেকোনো দেশেই প্রবীণ মুসলিমদের একটি বড় অংশ টেলিভিশন, চলচ্চিত্র বা ক্যাসেটের মাধ্যমে প্রচারিত অমুসলিম উৎসের সংগীতের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। তবে এই অনীহা বা প্রত্যাখ্যানের কারণ তারা খুব কমই বিশ্লেষণ করেন। তারা কেবল অনুভব করেন, সর্বশেষ পপ তারকাদের গান হোক কিংবা ইউরোপ ও আমেরিকার আধুনিক ধ্রুপদি সংগীত, এসব প্রকাশের টার্গেট অডিয়েন্স তারা নন এবং এগুলো এমন কোনো বার্তা বহন করে না, যা তারা শুনতে আগ্রহী। ধ্রুপদি ইসলামী সংগীত-ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের পরিচয়ই সমকালীন প্রচলিত সংগীত থেকে তাদের দূরত্ব তৈরি করেছে এবং শব্দশিল্পের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র রুচিবোধ গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেই তরুণ প্রজন্মের কী হবে, যারা এলভিস প্রেসলি, রোলিং স্টোনস ও আর্নল্ড শোয়েনবার্গের জগতে জন্মেছে এবং বেড়ে উঠেছে? শিগগিরই প্রাপ্তবয়স্ক সমাজে প্রবেশ করতে যাওয়া এই মুসলিম তরুণদের খুব কমই ইসলামী শব্দশিল্পের ঐতিহ্যে দীক্ষিত হয়ে নিজেদের পরিচয় দৃঢ় করার সুযোগ পেয়েছে। কারণ তারা যেসব শব্দশিল্পের সংস্পর্শে আসে, তার অধিকাংশই বিজাতীয় সংস্কৃতি ও মতাদর্শ থেকে উৎসারিত। ভবিষ্যতে এর গুরুতর পরিণতি অনিবার্য, কেননা এর ফলে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ক্রমেই ক্ষয় ও বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়ছে।
ইসলামের আলোকে ব্যক্তিত্ব গঠনকে যদি অপরিহার্য বলে স্বীকার করা হয়, তবে সেই গঠনপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী সংস্কৃতির এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি দিককে উপেক্ষা করা যায় না। শব্দশিল্পের প্রভাব দৃশ্যমান না হলেও তা সর্বক্ষণ সক্রিয় এবং ব্যক্তি ও সমাজের ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। এ কারণেই সাংস্কৃতিক দীক্ষা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের পাশাপাশি হান্দাসাহ আল-সাউতের অবদান এবং এর ইসলামীকরণের গুরুত্ব সম্পর্কেও মুসলিমদের গভীরভাবে সচেতন হওয়া জরুরি।
দুই। শব্দশিল্প সম্পর্কে আমাদের মনোভাবের পটভূমি
শব্দশিল্প নিয়ে এমন উদাসীনতা এবং এর ইসলামীকরণের প্রতি অনাগ্রহের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
ক.
নান্দনিকতার প্রতি এই উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টির একটি কারণ হলো মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত সেই ধারণা, যার ভিত্তিতে সংগীতকে একটি ‘নিষিদ্ধ’ আনন্দ হিসেবে দেখা হয় এবং এতে অংশগ্রহণের সঙ্গে অপরাধবোধ বা দ্বিধা জড়িয়ে থাকে। এই ধারণার মূলে রয়েছে সংগীত ও শব্দশিল্পের বিভিন্ন রূপ নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বিতর্ক, যা আজও সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। এ বিষয়ে ইসলামী সভ্যতার মহান আলেম ও মুতাফাক্কিরগণের অসংখ্য বক্তব্য ও গ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও, যেমন আল-শাফিঈ (১৯০৬), ইমাম গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়্যাহ (১৯৬৬) এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেক্টর মাহমুদ শালতুত (১৯৬০), বিতর্কটি কখনো চূড়ান্ত মীমাংসায় পৌঁছায়নি। ফলে মিউজিক কিংবা শব্দশিল্পের শরয়ী ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা নিয়ে মুসলিম মানসে আজও বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।
খ.
শব্দশিল্প সম্পর্কে সমসাময়িক মনোভঙ্গির সঙ্গে মুজিকা শব্দটির ভুল উপলব্ধি ও ভিন্নধাচের ব্যাখ্যাও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরিভাষাটি হান্দাসাহ আল-সাউত-এর কেবল নির্দিষ্ট কিছু ধারাকে বোঝায় এবং সাধারণত বাদ্যযন্ত্রনির্ভর শব্দশিল্পের সঙ্গেই অধিকতর সম্পৃক্ত। ইংরেজি মিউজিক শব্দের মতো এর অর্থ কখনোই এতটা ব্যাপক ছিল না যে, তারতিল আল-কোরআন বা আজানের মতো শব্দশিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। অথচ এগুলোতেও সুরের শিল্পসম্মত বিন্যাস রয়েছে, যা ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত মিউজিক ধারণার অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই এই পার্থক্যটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করেননি। তবে ইসলামী সংস্কৃতিতে মিউজিকের বৈধতা নিয়ে যে বিতর্ক গড়ে উঠেছিলো, তার উদ্দেশ্য কখনোই সব ধরনের শব্দশিল্পকে একই বিচারের আওতায় আনা ছিল না। ফকীহগণ মুজিকা-বহির্ভূত ধারাগুলোর বৈধতা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলেননি, আবার মুজিকা-র অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি ধারাকেও নির্বিচারে নিন্দা করেননি। তাই শব্দশিল্পের কোনো কোনো রূপের প্রত্যাখ্যানকে সমগ্র হান্দাসাহ আল-সাউত-এর ওপর আরোপিত সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। বরং এটি ছিল নেতৃত্ব ও সমাজের পক্ষ থেকে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন ও উদ্যাপনের রীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল করার প্রচেষ্টা, যেন তা ইসলামের মতাদর্শ ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
গ.
হান্দাসাহ আল-সাউত ধারাগুলোর ইসলামীকরণে অনাগ্রহের তৃতীয় একটি কারণ হলো এই ভয় যে, যেকোনো ধরনের মুজিকায় সম্পৃক্ততা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক পবিত্র কোরআনে নিষিদ্ধ। বিষয়টি মোটেও এমন নয়; কোরআনে এমন কোনো আয়াত নেই, যা সাধারণভাবে শব্দশিল্পকে বা মুজিকা নামে পরিচিত ধারাগুলোকেও নিন্দা করে। এমনকি এই বিষয়ে কোরআনে সরাসরি কোনো উল্লেখও নেই। শব্দশিল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একমাত্র আয়াতগুলো কোরআনের তেলাওয়াত বা কোরআনকে সুন্দর সুরে তেলাওয়াতের নির্দেশ দেয় (যেমন ২৫:৩২; ৭৩:৪)। তবে মুজিকা যারা সমর্থন করেন কিংবা বিরোধিতা করেন, উভয় পক্ষই অন্যান্য আয়াতে তাদের মতের সমর্থন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ঘ.
সমসাময়িক ইসলামীকরণের প্রবক্তাদের রচনায় শব্দশিল্পের প্রতি উদাসীনতার চতুর্থ কারণ হলো, হাদীসে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন সম্পর্কে যা আছে বলে অনেক মুসলিম মনে করেন, তার প্রতি তাদের মনোভঙ্গি। মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের বিরুদ্ধবাদীরা কিছু হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিউজিককে নিন্দা করেছেন।১ অন্যদিকে, যারা মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের সমর্থন করেন, তারা অন্যান্য হাদীস উল্লেখ করেন, যা তাদের অবস্থানের সমর্থন করে বলে মনে হয়।২ উভয় পক্ষই আপাত-বৈপরীত্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা না করে, নিজেদের মতকে সমর্থন করে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
নিশ্চয়ই নবী (সা.) এতটা অসংগতিপূর্ণ ছিলেন না যে, একটি বিষয়কে এক সময় নিন্দা করবেন এবং অন্য সময় একই বিষয়কে অনুমোদন করবেন। সুতরাং তাঁর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার পেছনে নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ছিলো। হতে পারে মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল; অর্থাৎ, সেটি কি নান্দনিক ও সঙ্গীতগতভাবে সুন্দর, যথোচিত, এবং আখলাকীভাবে উন্নয়নমূলক ছিলো কিনা? অথবা নবীর (সা.) ভিন্ন প্রতিক্রিয়াগুলো হয়তো সেই মিউজিকের পরিবেশনার পরিস্থিতির কারণে ছিলো, যা সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও সমাজের পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো?
ঙ.
ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় শব্দশিল্পের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করার পঞ্চম একটি কারণ হতে পারে, সমসাময়িক মুসলিমদের ইসলামীভাবে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দশিল্প এবং এর বাইরের শব্দশিল্পের মধ্যে পার্থক্য করার সাধারণ ব্যর্থতা বা অক্ষমতা। অনেক সমসাময়িক মুসলিম নির্দিষ্ট ধরনের শব্দশিল্প পছন্দ করেন এবং অন্যগুলো জ্ঞাতসারে প্রত্যাখ্যান করেন। নিজেদের কাছে প্রশ্ন না করেই যে, প্রথমটি কেন শেষেরটির চেয়ে শ্রেয়। যেখানে অ-ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রভাব অনুপস্থিত বা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে নগণ্য, সেখানে এটি হয়তো কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না। কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসবাস করলেই সেরূপ পরিবেশ এক অবাস্তব স্বপ্নমাত্র। তাই কেউ কেউ নিজেদের ও পরিবারের চারপাশে এক “লৌহ যবনিকা” টানার চেষ্টা করেছেন, ইসলামের নান্দকিতার বাইরে হতে পারে, এমন শব্দশিল্প থেকে সন্তানদের বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছেন। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার প্রতিটি শহর ও গ্রামে পৌঁছে যাওয়ায়, এই বিচ্ছিন্নতার প্রচেষ্টা খুব কমই কার্যকর হয়। অন্যরা নির্বিশেষে সব ধরনের শব্দশিল্পকে নিষিদ্ধ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে যে শিল্পশূন্যতা তৈরি হয়, তা অনিবার্যভাবে অ-ইসলামী সঙ্গীতের দ্বারা পূর্ণ হয়, যা সমাজের তরুণদের মনে অনুপ্রবেশ করে। এই মানসিক ও নান্দনিক পলায়নপরতার পরিণতি সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।
চ.
শব্দশিল্পের ইসলামীকরণে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে না আসার ষষ্ঠ একটি কারণ হলো, এ বিষয়ে ইসলামী তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, অনেক মুসলিম তাদের নান্দনিক জীবনে কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তারা অবশ্যই এর ধর্মীয় ও নৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, কিন্তু এটি তাদের নান্দনিক ও সঙ্গীত-বোধ গড়ে তোলায় যে ভূমিকা রাখে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বিকশিত ও পরিবেশিত শব্দশিল্পের অন্যান্য ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে এটি কতটা প্রভাব রেখেছে, সেটি সম্পর্কে তারা সচেতন নয়।
অবশ্যই মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গীত ঐতিহ্যের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু মরোক্কো থেকে দক্ষিণ ফিলিপাইন পর্যন্ত মুসলিমদের দ্বারা পরিবেশিত ও উপভোগ করা হান্দাসাহ আল-সাউতের অনেক ধারায় কিছু মূল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান এবং সেগুলো ইসলামী শব্দশিল্পের প্রাচীনতম শিল্প কোরআন তেলাওয়াতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কোরআনি প্রভাব ও নির্ধারণকে প্রতিফলিত করে, এমন শব্দশিল্পকে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একইভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করা, নান্দনিক ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কখনো সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হয়নি। এটি এমন এক বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার, সেই সমসাময়িক মুসলিমদের জন্য অপেক্ষা করছে, যারা ইতিমধ্যে তাদের ভূমিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন এবং এখন হয়তো আরও বিধ্বংসী একটি সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক আগ্রাসনের ফল ভোগ করতে চলেছেন, যে আগ্রাসন তাদের মানসের গভীরে আঘাত হানছে।
তিন। হান্দাসাহ আল-সাউতের ইসলামীকরণ করার গুরুত্ব
আপনারা হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, হান্দাসাহ আল-সাউত কোরআনি নীতিমালার আলোকে ইসলামীকরণে অবদান রাখতে পারে?
ক.
প্রথমত, ইসলামী শব্দশিল্প যেভাবে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে, তা হলো তাওহীদের বার্তাকে শব্দে “অনুবাদ” করার ভূমিকা পালনের মাধ্যমে। সেই বার্তাকে প্রতিনিধিত্বকারী শব্দশিল্পগুলোকে কখনোই নিছক বিনোদন হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো এমন সৃজনশীলতার উদাহরণ, যা শ্রোতাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলো মানুষের দিকে, পার্থিব জগৎ ও তার কার্যকলাপের দিকে, কিংবা নিছক মানবিক আবেগের চিত্রায়নের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে না। এগুলোর একটি উচ্চতর লক্ষ্য আছে, এবং এগুলোর বিমূর্ত গুণাবলি সেই লক্ষ্যের প্রমাণ দেয়।
শব্দশিল্পের প্রকাশ যখনই শ্রোতাকে উচ্চতর সত্তার দিকে চিন্তায় নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, অতিমাত্রায় ইন্দ্রিয়পরায়ণ বা পার্থিব ও মানবিক গুণাবলির চিত্রবর্ণনাকারী হয়ে পড়ে, মুসলিমরা তখনই তাতে সংশোধন বা প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করেছেন। মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের ইসলামী অর্গানাইজেশন উচিত মিউজিকে এমন এক অসীম প্যাটার্ন প্রতিফলিত করা, যার মডুলার এককে (modular units), পুনরাবৃত্তিতে, জটিলতায় ও অন্তহীন গুণে- কোরআনের সাহিত্যিক প্যাটার্নের নিখুত পরিপূরক হবে এবং এর দৃশ্যমান আরাবেস্কে (arabesque) রূপান্তরিত হবে। তাওহীদের বার্তার আলোকে সজ্জিত এই শব্দশিল্প, ব্যক্তি ও সমাজের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়াকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করবে।
খ.
দ্বিতীয়ত, হান্দাসাহ আল-সাউত ইসলামীকরণে যেভাবে অবদান রাখতে পারে তা হলো মুসলিমদের জাতীয় পরিচয়, নৃতাত্ত্বিক পটভূমি, এবং বসবাসের স্থান নির্বিশেষে একটি সাধারণ ও স্বজাত নান্দনিক শব্দ-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে। উম্মাহজুড়ে ইসলামী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলা ও টিকিয়ে রাখার জন্য, ইসলামীকরণ কার্যকর ও তা ব্যাপকতর হতে হবে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভাষাগত জাতীয়তা বা নৃতাত্ত্বিক জাতি-অহংকারের মাধ্যমে কখনো এটি অর্জন করা যাবে না। এটিকে অবশ্যই কোরআনী নীতিমালার ওপর ভিত্তি করতে হবে, যা সকল মুসলিমের কল্পনাকে উদ্দীপিত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীনকালে এই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল; এবং এখনো মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মুজিকা ও হান্দাসাহ আল-সাউতের অন্যান্য ধারার অনেক পরিবেশনায় কোরআন তেলাওয়াতের প্রভাবের ছাপ রয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত, বিজাতীয় নান্দনিক প্রভাব আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক। ভিডিও ও অডিও ক্যাসেট, স্যাটেলাইট রিলে এবং ট্রানজিস্টর রেডিওর মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মুসলিম বিশ্বের সুদূরতম প্রান্তেও ভিন্ন মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত শব্দশিল্পের আগ্রাসন নিয়ে এসেছে। তাওহীদ-ভিত্তিক শিল্পের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দশিল্পগুলোকে যদি উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া না হয়, তাহলে ইসলামী অস্তিত্বে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা অবশ্যই তাওহীদ বহির্ভূত শব্দশিল্প দ্বারা পূর্ণ হবে, বরং অনেক ক্ষেত্রে এরই মধ্যে হয়েছেও!
গ.
তাওহীদ-অনুপ্রাণিত শব্দশিল্পগুলো শুধুমাত্র বৈশ্বিক পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বকে মিউজিক্যালি ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমেই ইসলামীকরণে অবদান রাখতে পারে না (যাকে আমরা তাদের ইসলামীকরণ গুরুত্বের অনুভূমিক মাত্রা বলতে পারি), বরং এগুলো মুসলিমদের একটি উল্লম্ব মাত্রায়ও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। এর অর্থ হলো, যেকোনো জাতি বা অঞ্চলের মুসলিম সমাজ কর্তৃক লালিত ও সমর্থিত একটি সাধারণ শব্দশিল্প বা মিউজিকের ঐতিহ্য সেই সমাজকে যেসব পরস্পর-বিচ্ছিন্ন স্তরে বিভক্ত করে রেখেছে, সেগুলোর মধ্যকার বাধাগুলো অপসারণ করতে সহায়তা করবে।
মুসলিম উম্মাহর যে দেশেই যাওয়া যাক, বিগত শতকগুলোতে দুটি পরস্পর-বিরোধী শিক্ষাব্যবস্থা মুসলিম সমাজকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। একটি হলো ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বা প্রাথমিক/মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চতর ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালিত। অপরটি পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলে গড়া। এই শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিবিভাজন একটি মেরুকৃত সমাজের জন্ম দিয়েছে, যেখানে এক ব্যবস্থার স্নাতকদের সঙ্গে অন্য ব্যবস্থার স্নাতকদের খুব কম মিল। বোঝাপড়ার অভাব, রাজনৈতিক কলহ, হতাশা, অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা- এই দুর্ভাগ্যজনক ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল। এটি চিন্তা, জ্ঞান ও কর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করে এবং মুসলিম সমাজের দুটি অংশকে পরস্পরের সঙ্গে অর্থবহভাবে যোগাযোগ ও সহযোগিতা করতে অক্ষম করে তোলে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে সংহতির বহু অভাবের কারণের মধ্যে এটি অন্যতম, এবং এটি অনেক মুসলিম দেশে বিপর্যয়কর সংঘর্ষের সম্ভাব্য অগ্নিস্ফুলনের মত অপেক্ষা করছে। এই সম্ভাব্য সমস্যা কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস এবং বসবাস, দৃশ্যমান ও শব্দ উভয় শিল্পের প্রকাশেও পার্থক্য জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক কালপর্বে জীবন ও সংস্কৃতির এই সব দিকই পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে। এসকল কিছু (শব্দশিল্পসহ) যদি পুনরায় ইসলামীকরণ না করা হয় এবং আমাদের সমাজকে উল্লম্বভাবে পুনরায় সংযুক্ত না করা হয়, তাহলে বিভিন্নভাবে শিক্ষিত মুসলিম সমাজের দুটি অংশের মধ্যে ক্রমাগত বিভাজন এবং এই পরিস্থিতি যে পরিণতির ইঙ্গিত দেয়, তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
চার। সমাধান কোথায়?
সমসাময়িক শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার প্রেরণা কোথা থেকে আসবে? বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকারগুলোর ওপর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই নির্ভর করা যাবে না, কারণ তারা অধিকাংশই এই ইসলামীকরণ থেকে প্রাপ্ত বৈশ্বিক এই অনুভূমিক (horizontal) ঐক্য ও জাতীয় উল্লম্ব (vertical) ঐক্যের সুফল সম্পর্কে অসচেতন বা উদাসীন। এছাড়া, বর্তমান সরকারগুলোর অধিকাংশ রাজনৈতিকভাবে এতটাই অস্থিতিশীল যে, ইসলামীকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ এটি তাদের একদিকে রক্ষণশীলদের, অন্যদিকে সেক্যুলারদের আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠনগুলোও রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে শব্দশিল্পের ইসলামীকরণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তারা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অগ্রগতির ধারাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করার এই প্রবণতা দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই দৃশ্যমান। নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও টিকে থাকতে এবং ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে সক্ষম শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে, আমরা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক ধ্বংসের ক্ষেত্র তৈরি করতেই যেন বেশি অভ্যস্ত। মূলনীতি ও সুসংহত ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বদলে আমরা এমন নেতৃত্ব তৈরি করি, যারা অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসে, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সাফল্য অর্জন করে এবং পরে প্রতিপক্ষের কাছে স্থান হারায়।
নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেই পূর্ববর্তী নেতৃত্বের অর্জনগুলো বদলে দিতে শুরু করে। ফলে ইতিপূর্বে যতটুকু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিলো, তা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা উম্মাহ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আরও পিছিয়ে পড়ে। একসময় এই নেতৃত্বও প্রতিস্থাপিত হয় এবং আবারও শুরু হয় নতুন এক দফা ‘আমূল অস্ত্রোপচার’। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি কোনোভাবে টিকে থাকলেও উম্মাহ তার কাছ থেকে প্রাপ্য সুফল লাভ করতে পারে না।
সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শব্দশিল্পের ইসলামীকরণ সূচনা ও পরিচালনার প্রত্যাশিত উৎস না হয়, তবে এই আন্দোলন কোথা থেকে আসবে? এটি আসতে পারে কেবল সেইসব মুসলিম ব্যক্তির কাছ থেকে, যারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাওহিদের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং সেই উপলব্ধি ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কাজ করেন। ব্যক্তি ও তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ইসলামকে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। একই শক্তিই শব্দশিল্পের ইসলামীকরণকেও বাস্তবে রূপ দেবে। কেবল তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রেরণা ও ইসলামীকরণের আহ্বানই স্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিঃসন্দেহে, মুসলিম হিসেবে আমাদের আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাওহীদমুখী হয়ে ওঠা। আমাদের দ্বীনকে এমনভাবে সক্রিয় করে তুলতে হবে, যেন তা আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব ও অঙ্গীকারকে ধারণ করে। এর মধ্যে সেই নান্দনিক সৃষ্টিগুলোও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, যেগুলো সৃষ্টির সামর্থ্য আল্লাহ তাঁর খলিফাকে দিয়েছেন। একইভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত জীবনের সেইসব সৌন্দর্যও, যার প্রতি সংবেদনশীলতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ দিয়ে তিনি তাঁর খলিফাকে সৃষ্টি করেছেন।৩ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের পাশাপাশি যখন আমরা এই ক্ষেত্রেও সফল হব, কেবল তখনই দ্বীন ও জীবনের সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যা বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম আবির্ভূত হয়েছে।
……………………………
১. উদাহরণস্বরূপ, একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা.) একটি বিশেষ ধরনের মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশন শ্রবণ এড়ানোর উদ্দেশ্যে তাঁর দুই কানে আঙুল প্রবেশ করিয়েছিলেন (আবু দাউদ ১৩৯৬হি./১৯৫০: কিতাবুল আদব, অধ্যায় ৫২)। পরবর্তীকালে এই ঘটনাকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেন তা মুজিকার সব ধারা কিংবা সামগ্রিকভাবে হান্দাসাহ আল-সাউতের প্রতি একটি সাধারণ নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞা নির্দেশ করে।
অপর একটি হাদীসে আবু উমামাহ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: “কোন ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে নিজ থেকে গান গায় না, বরং আল্লাহ তার প্রতি দুটি শয়তান প্রেরণ করেন; তারা তার দুই কাঁধে অবস্থান করে এবং তাদের গোড়ালি দিয়ে তার বক্ষে আঘাত করতে থাকে এবং ততক্ষণ সে গান গাইতে থাকে।” তবে এই বর্ণনাটি সহিহ আল-বুখারি বা সহিহ মুসলিমে স্থান পায়নি। মুজিকা কিংবা হান্দাসাহ আল-সাউতের বিভিন্ন ধারাকে নিরুৎসাহ সংক্রান্ত হাদীসের জন্য ইবনে আল-কায়সারানী (১৩৯০ হি./১৯৭০: ৭৫–৯৫) দ্রষ্টব্য।
২. অন্যদিকে, মিউজিক্যাল এক্সপ্রেশনের প্রতি নবীর (সা.) অনুমোদনমূলক প্রতিক্রিয়ার দৃষ্টান্তও হাদীসে পাওয়া যায়। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন: “আল্লাহর রাসূল (সা.) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমার কাছে দুটি বালিকা বু’আস যুদ্ধের গান গাইছিল। নবী (সা.) শয্যায় শয়ন করলেন এবং মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আবূ বকর (রা.) প্রবেশ করে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, “আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নিকট শয়তানের বাদ্যযন্ত্র!” তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “ওদের ছেড়ে দাও।” এরপর আবূ বকর (রা.) যখন অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন, আমি ইশারায় মেয়েদুটিকে বেরিয়ে যেতে বললাম, তারা চলে গেল। সেদিন ছিল ঈদের দিন।” (আল-বুখারি ১৯৭১: ৩৭)। ‘আয়িশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত অপর একটি ঘটনায় বলা হয়েছে: “মিনার দিনগুলোতে- অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে আগমন করেন। সে সময় দুই কিশোরী দফ বাজাচ্ছিল এবং নবী (সা.) কাপড় দিয়ে নিজেকে আবৃত করে শুয়ে ছিলেন। আবু বকর (রা.) তাদের তিরস্কার করলে নবী (সা.) মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে বলেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও; কারণ এগুলো ঈদের দিন এবং মিনায় অবস্থানের দিন।’” (আল-বুখারি ১৯৭১: ৫৫–৫৬)। মুজিকা ও সামা সমর্থিত হাদীসসমূহের সংকলনের জন্য রায়চৌধুরী (১৯৫৭: ৬৬–৭০), আল-গাজ্জালী (১৯০১–১৯০২), ইবনে আল-কায়সারানী (১৩৯০ হি./১৯৭০) এবং রবসন (১৯৩৮) দ্রষ্টব্য। এ প্রসঙ্গে আল-কারযাভী-ও প্রাসঙ্গিক।
৩. হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্য সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করেছে? আর আল্লাহর দেয়া পবিত্র জিনিসগুলো কে নিষিদ্ধ করেছে? বলো, দুনিয়ার জীবনেও এ সমস্ত জিনিস ঈমানদারদের জন্য, আর কিয়ামতের দিনে এগুলো তো একান্তভাবে তাদেরই জন্য হবে। এভাবে যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের জন্য আমার কথাগুলো আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে থাকি। হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ যেসব জিনিস হারাম করেছেন সেগুলো হচ্ছে: প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, গোনাহ, সত্যের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি, আল্লাহর সাথে তোমাদের কাউকে শরীক করা, যার স্বপক্ষে তিনি কোন সনদ পাঠাননি এবং আল্লাহর নামে তোমাদের এমন কোন কথা বলা, যা মূলত তিনি বলেছেন বলে তোমাদের জানা নেই।
তথ্যসূত্র:
১. আবু দাউদ। সুনান। ৪র্থ খণ্ড। সম্পাদনা: এম. এম. আবদুল হামিদ। কায়রো।
২. আল-বুখারি, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল। সহিহ আল-বুখারি। ২য় খণ্ড। অনুবাদ: মুহাম্মদ মুহসিন খান। মদিনা: ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, ১৯৭১।
৩. আল-ফারুকী, লুইস লামিয়া (ইবসেন)।
- “মিউজিক এবং মিউজিশিয়ানদের ব্যাপারে শরিয়ত।” ইসলামিক থট অ্যান্ড কালচার। সম্পাদনা: ইসমাঈল রাজি আল-ফারুকী। ওয়াশিংটন ডিসি: ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট, ১৯৮২, পৃ. ২৭–৫২।
- “মুসলিম বিশ্বের মিউজিকের সংস্কৃতিতে ধারাবাহিকতার উপাদান।” প্রোগ্রেস রিপোর্টস ইন এথনোমিউজিকোলজি, ১(২), ১৯৮৩–৮৪, পৃ. ১–১৮।
- “মিউজিক, মিউজিশিয়ান এবং মুসলিম আইন।” এশিয়ান মিউজিক, ১৬(১), ১৯৮৫, পৃ. ৩–৩৬।
৪. আল-গাজালী, আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ।
- ইহইয়া উলুমুদ্দীন। ২য় খণ্ড। কায়রো: মাতবাআত আল-ইস্তিকামাহ।
- ইহইয়া উলুমুদ্দীন-এর অংশবিশেষ, ডানকান বি. ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক “ইমোশনাল রিলিজিয়ন ইন ইসলাম অ্যাজ অ্যাফেক্টেড বাই মিউজিক অ্যান্ড সিঙ্গিং” শিরোনামে অনূদিত। জার্নাল অব দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯০১–০২।
৫. ইবনে আল-কায়সারানী, আবুল ফাদল মুহাম্মদ ইবনে তাহির ইবনে আলি ইবনে আহমদ আল-মাকদিসি আল-শায়বানি। কিতাব আল-সামা। সম্পাদনা: আবুল ওয়াফা আল-মারাফি। কায়রো: হাই কমিটি ফর ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স, ১৩৯০ হি./১৯৭০।
৬. ইবন তাইমিয়্যাহ, তাকি আদ-দিন আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে আবদুল হালিম। “কিতাব আল-সামা ওয়াল-রাকস।” মাজমুআত আল-রাসাইল আল-কুবরা। ২য় খণ্ড। কায়রো: মাতবাআত মুহাম্মদ আলি সুবাইহ, ১৯৬৬, পৃ. ২৯৫–৩৩০।
৭. আল-নাবুলুসি, আবদুল গনি। ইযাহ আল-দালালাত ফি সামা আল-আলাত। দামেস্ক: মাকতাবাত আল-হাফনিয়্যাহ, ১৩০২ হি./১৮৮৪।
৮. আল-কারযাভী, ইউসুফ। ইসলামে হালাল ও হারাম। অনুবাদ: কামাল এল-হেলবাওয়ি, এম. মইনউদ্দিন সিদ্দিকী ও সৈয়দ শুকরি। ইন্ডিয়ানাপোলিস: আমেরিকান ট্রাস্ট পাবলিকেশনস।
৯. রবসন, জেমস। ট্র্যাক্টস অন লিসেনিং টু মিউজিক। লন্ডন: দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৩৮।
রায়চৌধুরী, এম. এল। মিউজিক ইন ইসলাম। কলকাতা: এইচ. ভট্টাচার্য, ১৯৫৭।
১০. আল-শাফিঈ, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস। কিতাব আল-উম্ম। রিওয়ায়াত: আল-রাবি ইবনে সুলায়মান। কায়রো: বুলাক, ১৯০৬।
১১. শালতুত, মাহমুদ। আল-ফাতাওয়া। কায়রো: দার আল-শুরুক, ১৯৬০, পৃ. ৩৫৫–৩৫৯।
অনুবাদঃ সাব্বির হাসান সিফাত


