ইসলামী সভ্যতা মানুষকে সত্য, সুন্দর ও আদালতের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এটি এমন এক সভ্যতা, যে সভ্যতা সকলের চিন্তার স্বাধীনতা দিতে চায়। সে চায় মানুষ যেন সত্যকে দলীল ও প্রমাণসহ জানতে পারে।
এই সভ্যতার মূলভিত্তি- কোরআন এবং সুন্নতেও চিন্তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং চিন্তা করাকে ইবাদত বলে গণ্য করা হয়েছে।
মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে, দর্শনের প্রাথমিক অর্থটি সংক্ষেপে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। সকলেই জানেন ফিলোসফি শব্দটি গ্রিক philosophía থেকে এসেছে। এখানে “Philo” – অর্থ হল, ‘ভালোবাসা’ আর “Sophia” অর্থ হল, ‘জ্ঞান/হিকমত’। এই শব্দদ্বয় থেকে উদ্ভূত শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে প্রথমে আরবিতে, এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে ইংরেজি ভাষায় গিয়ে ‘Philosophy’ নামে রূপলাভ করেছে। যার অর্থ হলো, হিকমতের প্রতি ভালোবাসা (‘love of wisdom’)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রথম ফিলোসফার বা দার্শনিক হিসেবে পিথাগোরাসকে গণ্য করা হয়। তিনি বলেন, ‘হিকমত হলো স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয় এবং আমরা কেবল সেটাকে ভালোবাসতে পারি”। এর মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন যে, হিকমতের উৎস স্থান ও সময়ের উর্ধ্বে।
হিকমত এমন একটি বিষয়, একে যদি আমরা আকলী ও রূহীভাবে ভালোবাসি তাহলেই কেবল তা আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হবে। ভালোবাসাবিহীন হিকমত অপূর্ণ আবার হিকমতবিহীন ভালোবাসাও খণ্ডিত।
মুসলমানগণও হিকমতকে ভালোবাসার কারণে সমগ্র মানবতার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং যেসকল জ্ঞান, চিন্তা ও হিকমত মানুষের জন্য উপকারী ও মানবসভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সেটাকে অনুবাদ ও ব্যাখা করে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে।
ইসলামী দর্শন কখন–কোথায়–কীভাবে শুরু হয়েছে? ইসলামী দর্শন বলে কোনো কিছু সম্ভব কিনা ?
ইসলামী দর্শন নামক পরিভাষাটি মূলত আধুনিক সময়ে উদ্ভাবিত হয়েছে। যদি এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায় যে, ইসলামী সভ্যতা নবম শতাব্দী থেকে থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে জ্ঞান তৈরি করেছে সে মানসকে ‘ ইসলামী দর্শন’ নামক পরিভাষার মাধ্যমে বুঝানো হয়ে থাকে। এই ইসলামী দর্শন পরিভাষার মধ্যে যে ‘ইসলাম’ – এটা দ্বীন অর্থে নয়, এটা মূলত ইসলামী সভ্যতা যতদিন এই বিশ্বকে শাসন করেছে সেই সময়কালকে বুঝিয়ে থাকে।
কেননা, আমরা মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, একেক সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা এই বিশ্বকে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহকে শাসন করেছে। বর্তমানে যেমন পাশ্চাত্য সভ্যতা বিশ্বকে শাসন করছে, অনুরূপভাবে ইতিপূর্বেও এই বিশ্বকে বিভিন্ন সভ্যতা শাসন করেছে তাঁর মধ্যে অন্যতম হলো, গ্রিক, রোমান, ভারতীয়, চীনা সভ্যতাসহ সহ আরও অনেক সভ্যতা। এ সভ্যতাগুলোর মধ্যে গ্রিক সভ্যতা একটি সময়কাল পর্যন্ত জ্ঞান ও চিন্তাগতভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিলো। গ্রিক সভ্যতার পর হেলেনিস্টিক যুগের সূচনা হয় এবং তারপর ইসলামী সভ্যতার যুগ শুরু হয়। এখানে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যে ইসলাম আসার পর থেকে বিগত ১৪০০ বছরের মধ্যে ১২০০ বছর ইসলামী সভ্যতা সমগ্র বিশ্বে তার প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিলো। যার দরুন, বিগত ১২০০ বছর মানবতার ভাগ্যনিয়ন্তা ছিলো ইসলামী সভ্যতা ও এই সভ্যতার নেতৃত্বদানকারী মুসলমানগণ।
বিশেষ করে সপ্তম শতাব্দীকাল থেকে মুসলমানগণ সভ্য দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং এই সভ্যতা যেন জ্ঞানগত ও চিন্তাগত ভাবে মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে পারে এই জন্য জ্ঞানগত ধারা তৈরি করে। এর মধ্যে যেমন শরয়ী জ্ঞান রয়েছে তেমনি ভাবে অন্যান্য জ্ঞানও রয়েছে। যেমন, হিজরী ২য় শতাব্দীতে (অষ্টম শতাব্দী) বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চলের জ্ঞানগত চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে ‘হিকমাহ’ নাম দিয়ে আরবী ভাষায় অনুবাদ করা শুরু করা হয়। এই অনুবাদ আকলী জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করে দেয়। এই সময় থেকে নিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীকাল পর্যন্ত উৎপাদিত আকলী জ্ঞানকে মূলত আমরা ইসলামী দর্শন নামে অভিহিত করে থাকি।
যেমন গ্রিক বা ভারতীয় দর্শন বলতে সেই সভ্যতাগুলোর প্রভাবশালী সময়ে গড়ে ওঠা চিন্তামূলক জ্ঞানকে বোঝায়, তেমনি ইসলামী সভ্যতায় উৎপাদিত ও তৈরিকৃত আকলী জ্ঞানভাণ্ডারকে ইসলামী দর্শন বলা হয়। এখানে ইসলামী দর্শনের মধ্যে যে ‘ইসলাম’ সেটা দ্বীন অর্থে নয় বরং এটা সভ্যতা অর্থে। তবে অনেকেই এটাকে ভিন্নভিন্ন নামে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন।
যেমন, কেউ কেউ আরব দর্শন বলেছেন, কেউবা আবার আরবী ভাষার দর্শন বলেছেন ইত্যাদি। তবে দ্বীন ইসলাম এই সভ্যতার মূল ভিত্তি হওয়ায় এবং এর অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতাগুলোতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশে অংশগ্রহণ করায়, ইসলামী সভ্যতায় সৃষ্ট জ্ঞানভাণ্ডারকে নির্দেশ করতে মূলত এই পরিভাষাটিই ব্যবহৃত হয়।
আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, আধুনিক সময়ে এসে এই পরিভাষাটির উৎপত্তি হয়। আজ থেকে ৫০০ কিংবা ৬০০ বছর পূর্বে কিংবা ক্ল্যাসিক্যাল যুগে এই পরিভাষাটি আমরা পাই না। শুধুমাত্র শাহরাস্তানি রচিত আল মিলাল ওয়ান নিহাল নামক গ্রন্থে ফালাসিফাতুল ইসলাম এই পরিভাষাটি পাই। শাহরাস্তানি মূলত মুসলিম চিন্তাবিদগণের দার্শনিক জ্ঞানকে বুঝানোর জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন যার অর্থ হলো, ‘ইসলামের দার্শনিকগণ’। তিনিও ইসলামী সভ্যতার সময়কালে তৈরি হওয়া দার্শনিকদেরকে বুঝিয়েছেন। যেমন ফালাসিফাতুল ইউনান- এর অর্থ হলো, ‘গ্রিক দার্শনিকগণ’। এর দ্বারা গ্রিক সভ্যতার সময়ে জ্ঞান ও চিন্তা উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী দার্শনিকদের বুঝানো হয়ে থাকে।
পারিভাষিক অর্থে দর্শন হলো; কোনো ধরণের অথোরিটির (সেটা দ্বীন কিংবা সংস্কৃতি যাই হোক না কেন) অধীনে না থেকে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা। আর এই কাজ একজন মুসলমানও করতে পারে, বা অন্যান্য ধর্মের যে কেউও করতে পারে। অর্থাৎ মানুষ মাত্রই এ কাজ করতে সক্ষম।
আমরা জানি যে, জ্ঞান এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতায় রূপান্তর হয়ে থাকে। একটি সভ্যতা যখন জ্ঞান ও চিন্তা উৎপাদন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে তখন জ্ঞান ও চিন্তার নেতৃত্বও ঐ সভ্যতার হাতছাড়া হয়ে যায়। এ নেতৃত্ব তখন চলে যায় বিজয়ী সভ্যতার হাতে। যেমন বর্তমানে জ্ঞান ও চিন্তার ঝাণ্ডাকে পাশ্চাত্য বহন করে চলছে। এই কারণে পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যকার সৃষ্ট জ্ঞানকে আমরা পাশ্চাত্য দর্শন বলে অভিহিত করে থাকি। যেমন, ভবিষ্যতে যদি ভিন্ন কোনো সভ্যতা সামনে চলে আসে তাহলে জ্ঞান, গবেষণা ও চিন্তাপদ্ধতি সেই সভ্যতার হাতে চলে যাবে আর তারা এর ঝাণ্ডাবাহী হয়ে কাজ করবে।
ইসলামী দর্শনের সাথে কোরআন ও সুন্নতের সম্পর্ক
প্রতিটি সভ্যতার মৌলিক কিছু উপাদান করেছে যা ঐ সভ্যতার গঠনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এই মৌলিক উপাদানসমূহ দার্শনিক ও চিন্তাগত কাজকে প্রভাবিত করে থাকে। আর ইসলামী সভ্যতা হলো এমন এক সভ্যতা যা ইসলামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা হলেন স্বয়ং হযরত পয়গাম্বর (স)। ইসলামী সভ্যতা যা কিছু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার সবটাই কোরআন ও সুন্নতকে কেন্দ্র করে। ফলশ্রুতিতে এই সভ্যতার মধ্যে তৈরি হওয়া সকল কিছুর সাথেই কোরআন ও সুন্নতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই অর্থে দার্শনিক কর্মকাণ্ড কিংবা দার্শনিক তাফাক্কুরের সাথে কোরআন ও সুন্নতের সম্পর্ক রয়েছে। আর এই সভ্যতার বড় বড় দার্শনিকগণের বেশির ভাগ-ই হলেন মুসলমান। অনেক অমুসলিম দার্শনিক থাকলেও মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন মুসলমানরাই। রয়েছেন আল কিন্দি, ফারাবী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, আল আল মাওয়ার্দী, রাগিব আল ইসফাহানী, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে খালদুন, শামসুদ্দিন ইসফাহানী, সাদরুশ শরিয়া, দাউদ আল কায়সারী, আদুদ্দিন ইজি, কুতুবুদ্দিন আর রাযি, জামালুদ্দিন ইসনাবী, ইবনে মোকারক শাহ, একমেলুদ্দিন বাবারতী, সাদুদ্দিন তাফতাযানী, বদরুদ্দিন যারকাশী, ইবনে রজব, সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী, বদরুদ্দিন সিমাভী এবং ফিরোজাবাদীসহ আরও অনেক চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। আর এরা সকলেই ছিলেন মুসলমান। এসকল মুতাফাক্কিরগণ শুধু দার্শনিক-ই ছিলেন না একই সাথে ঐ সময়ের বড় বড় মুতাকাল্লিমও ছিলেন। এই অর্থে ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও এই দার্শনিক ধারার মৌলিক বিষয়সমূহের ওপর ভিত্তি করে জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে মুসলমান হওয়া কোনো আবশ্যক শর্ত নয়। এখানে কোরআন ও সুন্নতকে একটি মুলনীতি হিসেবে ধরে সেই মূলনীতির আলোকেই গবেষণা করতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। এই কারণে এটা দ্বীন ইসলামের দর্শন নয়। দ্বীন ইসলাম কর্তৃক গঠিত সভ্যজগতে উৎপাদিত ‘দর্শনের ভাণ্ডার’।
বর্তমান সময়ে ইসলামী দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রযোজ্যতা
আমরা জানি যে বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে জ্ঞানের যে ধারা রয়েছে সেটা হল, ইউরোপ কেন্দ্রিক। যেটাকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান হলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই পাশ্চাত্যের যে জ্ঞানগত ধারা এই ধারাটি গড়ে উঠেছে মেটাফিজিক্সকে বাদ দিয়ে। অথচ আমাদের ইসলামী সভ্যতায় যে দর্শনের চর্চা রয়েছে এর মূলে ছিলো মেটাফিজিক্স। আধুনিক সময়ে এসে জ্ঞানের ভিত্তিকে experiment, observation, and verifiability/falsifiability (পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং যাচাইযোগ্যতা) – এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। আর মেটাফিজিক্স যেহেতু এসকল ভিত্তির আলোকে নির্ধারিত কোন জ্ঞান নয়, তাই তারা মেটাফিজিক্সকে বিজ্ঞান নয়-এই যুক্তি দেখিয়ে একে জ্ঞানচর্চার পরিসর থেকে বাদ দেয়।
কিন্তু এই সময়ে এসে অনেক চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও গবেষকগণ উপলব্ধি করছেন যে আসলে মেটাফিজিক্স ছাড়া জ্ঞানের যে মৌলিক উদ্দেশ্য সেখানে উপনীত হওয়া সম্ভবপর নয়।
এমতাবস্থায় আমাদের সামনে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা হলো, ‘ আধুনিক সময়ে ইসলামী দর্শন সম্ভব কিনা?’ আমি মনে করি এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এমন একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে আসার অন্যতম মূল কারণ হলো, ব্রিটিশ উপনিবেশ ও শোষণ, মুসলিম উম্মাহর উপর আধুনিকতার প্রভাব, পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপান্তর ও পরিবর্তনের ক্ষমতা- শুধু ইসলামী দর্শনই নয়, বরং ইসলামী সভ্যতার সমগ্র জ্ঞানগত মিরাসের উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও আমাদের সামনে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। আমাদের বিভিন্ন চিন্তাবিদ এই বিভিন্নভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেসকল উত্তরের মধ্যে আমি কয়েকটিকে উল্লেখ করতে চাই,
১. ইসলামী দর্শনকে আমাদের সভ্যতার জ্ঞানগত একটি মেমোরী হিসেবে বিবেচনা করা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইসলামী দর্শন নানা পরিস্থিতিতেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার চারটি প্রধান ধারার মধ্যে এটি একটি হলো ইসলামী দর্শন। আমাদের সভ্যতায় জ্ঞানের চারটি বড় ধারা রয়েছে, সেগুলো হল, দর্শনিক ধারা, কালামী ধারা, তাসাউফী ও ফিকহী ধারা। আমরা যদি ইসলামী দর্শনকে বিবেচনায় না নেই, ইসলামী দর্শন কী এটা ভালোভাবে না বুঝি তাহলে বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসের ১৪শ বছরকে বুঝতে সক্ষম হবো না। যেমন, আমরা যদি ইসলামকে বাদ দেই, তাহলে মানবসভ্যতার ১৪শত বছরের কোন হদিস পাওয়া যাবেনা। এই ১৪শত বছরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ একটি অংশ হলো ইসলামী দর্শন। এ কারণে ইসলামী দর্শনকে না বুঝলে আমরা মানবসভ্যতার ইতিহাসের ১৪শত বছরকেই বুঝতে পারবো না। এক অর্থে বলতে গেলে, আধুনিক দুনিয়াকে গঠন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একটি ধারাকে আমরা বুঝতেই পারব না। অর্থাৎ, ইসলামী দর্শনকে মানবজাতির ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে।
২. নিজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা ও তুলে ধরার জন্য দর্শনকে শক্তিশালী একটি মাধ্যম হিসেবে পাঠ করা।
আমরা মুসলমান হিসেবে ইসলামী সভ্যতার একজন সদস্য। প্রতিটি মানুষ-ই তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত মিরাসের (জ্ঞান, চিন্তা, আচরণ, রীতিনীতি,ভাষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি) আলোকে বসবাস করে। আমরা যদি এই মিরাসকে অস্বীকার করি তবুও আমরা এর আলোকেই বসবাস করি। কারণ এই দুনিয়াকে তৈরি করেছে এই সকল মিরাস। এর বাহিরে যাওয়ার কোন সুযোগ আমাদের নেই।
যেমন, আমরা বাংলায় কথা বলি, বাঙ্গালী সমাজের একজন সদস্য এবং আমরা বাঙ্গালী। আমরা চাই বা না চাই, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বসবাসকারী বাঙ্গালীরা আমাদের পূর্বপুরুষ। ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক তাঁদের প্রভাবে ও তাঁদের তৈরিকৃত ধারার আলোকে গঠিত একটি সমাজে আমরা বসবাস করি। আমরা যদি এই সামাজিক হাফিজা বা মেমোরিকে উপেক্ষা করে আমাদের আত্মপরিচয়কে গঠন করি তাহলে আমরা আমাদের মৌলিক গঠনগত উপাদানগুলোকেই উপেক্ষা বা অস্বীকার করে বসবো। এর মানে হলো আমরা আমাদের নিজেদেরকেই চিনতে পারবো না, নিজেকেই ভুলে যাবো। ইতিহাসের গতিধারায় আমাদের যে অবস্থান সেটাকে অর্থাৎ আমাদের নিজেদেরকেই ব্যখ্যা করতে পারবো না। আমাদের চিন্তাশীল যিহিনের প্রেক্ষাপট কী, এখনো অব্যাহত আছে এমন অনেক বিষয়ের এক্সেটেনশনসমূহ কী সেটাও বুঝতে পারবো না।
৩. নতুন চিন্তা তৈরি ও বিকাশের জন্য ইসলামী দর্শনের গুরুত্ব
নতুন চিন্তা তৈরি করার জন্য এবং সে চিন্তাকে ধারাবাহিক রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকটে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অতীত মিরাসের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। কেননা অতীত চিন্তা কিংবা নিজেদের তৈরিকৃত জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে যখন কেউ ওয়াকিফহাল না থাকে, তখন সে প্রায়শই অন্যদের চিন্তার প্রভাবে পরিচালিত হয়। একইসাথে চিন্তা করার ও জ্ঞান উৎপাদন করার যোগ্যতাকে হারিয়ে ফেলে। সে কিসের আলোকে চিন্তা তৈরি করবে এটা সে না জানার কারণে গতিশীলতাও হারিয়ে ফেলে।
আমরা যদি এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাই তাহলে আমাদেরকে ইসলামী দর্শনের যে বিশাল ভাণ্ডার এই ভাণ্ডার সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে এবং এখান থেকে উপকৃত হয়ে নতুন করে জ্ঞান ও চিন্তা তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
৪. মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ইসলামী দর্শন
একজন ব্যক্তি যখন তার অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত থাকে না, তখন তার মানস বা যিহিন ফাঁকা থাকে। এই ফাঁকা যিহিনকে যেকোনো দিকে ধাবিত করা যায় এবং যেভাবে ইচ্ছা তাতে গঠন করা সম্ভব। আমাদের অবস্থাও আজ এমনই। আমরা আমাদের জ্ঞানের অতীত মিরাস সম্পর্কে অপরিচিত থাকায়, শোষক ও সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে আমাদের মানস ও চিন্তাজগতকে নিজেদের ইচ্ছামতো গড়ে তুলছে এবং আমাদের শোষণ করছে। আজ অবস্থা এমন যে তাঁরা শোষণ না করতে চাইলেও হয়ত আমরা তাঁদেরকে ডেকে নিয়ে আসবো শোষণ করার জন্য। আমরা আজ সেলফ-কলোনাইজড হয়ে গিয়েছি। নিজেদের শাসন ও শোষণ করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে যেন নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছি।
এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে ইসলামী দর্শনের চর্চা বাড়াতে হবে, কেননা পাশ্চাত্যের চিন্তা ও দর্শন থেকে কেবল ইসলামী দর্শনই আমাদের যিহিন ও মানসকে মুক্ত করতে পারে। আধুনিক সময়ে এসে আমরা কোন সকল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি ইসলামী দর্শন আমাদের ঐতিহাসিক পরিচয় বা আইডেন্টিটিক সামগ্রিকভাবে বুঝতে সাহায্যকারী মৌলিক একটি উপাদান। যার কারণে আমরা যে দুনিয়ায় বসবাস করছি সেই দুনিয়ার বর্তমান ও পরবর্তী সময়ে চিন্তাগত ও জ্ঞানগত কাজকে সঠিকভাবে করার জন্য আমাদের অতীত মিরাসকে জানতে হবে ও সেই মিরাসের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
৫. কোরআন ও সুন্নতকে বুঝার জন্য ইসলামী দর্শনের গুরুত্ব
কোরআন ও সুন্নত হলো, শাশ্বত ও বিশ্বজনীন। এই মৌলিক উৎস দূটি শুধুমাত্র মুসলমান-ই নয় সমগ্র মানবতার মুক্তির পথনির্দেশক। এখন কথা হলো, আমরা কি আমাদের অতীতকে বাদ দিয়ে এই দুইটি ভাণ্ডারকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবো? আমার মতে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের অতীত চিন্তা ও চিন্তাবিদগণ তাঁদের সময়ে কোরআন ও সুন্নতকে কিভাবে বুঝেছেন এটা যদি আমাদের সামনে থাকে, তাহলে আমরা এই দুইটি মূল উৎসকে আরও সঠিকভাবে বুঝে সমগ্র মানবতার সামনে আরও বোধগম্য ভাবে তুলে ধরতে পারবো।
ইসলামী দর্শন মূলত কোরআন ও সুন্নতকে একটি সভ্যতাগত মিরাসে, সংস্কৃতিতে ও চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে। একইসাথে আমাদের সভ্যতার নাজারী ও তাত্ত্বিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে কালাম ও দর্শন। আমরা যদি এই জ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে বাদ দেই তাহলে বিগত ১০০০ বছরে উৎপাদিত বিশেষত দ্বাদশ শতাব্দী থেকে রচিত তাফসীরগুলোও আমরা বুঝতে পারব না। কেননা এই সময়কালের পর থেকে যত বড় বড় মুফাসসির এসেছেন, তাঁদের অধিকাংশ-ই ছিলেন শক্তিমান দার্শনিক। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের একটি বিশেষ দায়িত্ব দান করেছেন। এই দায়িত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি পবিত্র কোরআনে বলেছেন-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
অর্থঃ এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল৷ তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য ৷ তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো৷
এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসলমানদের সর্বপ্রথম কাজ হলো তার উপর অর্পিত দায়িত্ব বা তাকলিফকে মানুষের কাছে তুলে ধরা, মানুষকে এই তাকলিফের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এই দায়িত্ব বা তাকলিফকে পরিচয় করানোর মাধ্যমেই মুসলমানদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং একইসাথে এটাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে আল্লাহপ্রদত্ত এই দায়িত্বের সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব করাও আবশ্যক। এ তাকলিফকে মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এর প্রতিনিধিত্ব করা মুসলমানদের মৌলিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
এ দায়িত্বকে যথাযথ ভাবে পালন করতে গিয়ে মুসলমানগণ ইলমুল কালাম ও ইলমুল ফিকহের উদ্ভাবন করেন।
‘ইলমূল কালাম’ আল্লাহ প্রদত্ত তাকলিফ বা দায়িত্বের পরিচয় প্রদান করে আর এই তাকলিফকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার পন্থা তুলে ধরে ‘ইলমূল ফিকহ’ । এক কথায় বলতে গেলে ইলমুল কালাম হলো দ্বীন ইসলামের থিওরীটিক্যাল দিক আর ফিকহ হলো প্র্যাকটিক্যাল দিক। আর এই নাজারী বা থিওরীটিক্যাল দিকটির ইতিহাসসহ সকল বিষয়কে আমাদের খুব ভালো করে জানতে হবে।
কালাম ও দর্শনের মধ্যকার পার্থক্য
আমাদের অনেকেই কালাম ও ইসলামী দর্শনের মধ্যকার পার্থক্যকে ধরতে পারেন না। যার কারণে কালামকেই ইসলামী দর্শন মনে করে থাকেন। আসলে বিষয়টি তা নয়, এই দুইটি ধারাই স্বতন্ত্র ভাবে গড়ে উঠেছে। এই দুই ধারার মেথডও ভিন্ন ভিন্ন।
প্রখ্যাত মুতাকাল্লিম ইমাম সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী ইলমুল কালামের সংজ্ঞায় বলেন,
لْمٌ يُبْحَثُ فِيهِ عَنْ ذَاتِ اللَّهِ تَعَالَى وَصِفَاتِهِ وَأَحْوَالِ الْمُمْكِنَاتِ مِنَ الْمَبْدَإِ وَالْمَعَادِ عَلَى قَانُونِ الْإِسْلَ
অর্থাৎ, ইলমুল কালাম হল এমন একটি জ্ঞান যা আল্লাহ তায়ালার যাত ও সিফাত থেকে নিয়ে মাবদা’ ও মায়াদ (সৃষ্টির সূচনা ও শেষ)- পর্যন্ত সৃষ্টির সকল অবস্থাকে ইসলামের নিয়মনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করে থাকে।
উক্ত সংজ্ঞার মধ্যে উল্লেখিত ‘ ইসলাম কানুন তথা নিয়মনীতির আলোকে’ এই বাক্যটি ইলমুল কালামকে দর্শন থেকে আলাদা করে দেয়। কেননা, ইসলামী দর্শন ও মেটাফিজিক্সের মধ্যে আল্লাহ, মাবদা’ ও মায়াদ ( সৃষ্টির সূচনা ও শেষ) এবং সৃষ্টির অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে। তবে দর্শনের ক্ষেত্রে মুভমেন্ট পয়েন্ট বা সূচনা বিন্দু ‘নাকল’ (ওহী) নয়, বরং ‘আকল’ হলো চিন্তার সূচনাবিন্দু।
দর্শন সকল বিষয়কে আকলী মূলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে। অপরদিকে কালামের মুভমেন্ট পয়েন্ট বা সূচনাবিন্দু হলো নাকল তথা ওহী। কালাম তার আলোচিত বিষয়সমূহকে তুলে ধরার সময় আকলকে ব্যবহার করলেও সর্বদা ওহীর সাথে সঙ্গতি রাখে। কিন্তু দর্শন সেটাকে আবশ্যক মনে করে না।
সবশেষে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, কয়েক দশক ধরে পাশ্চাত্যের চিন্তার প্রভাবে মুসলিম বিশ্বে গড়ে উঠে কিছু ধারা দর্শন চর্চার বিরোধিতা করে থাকে। তাঁদের চিন্তার কিছু ভিত্তি থাকলে তাঁরা যেভাবে দর্শন চর্চাকে নিরুৎসাহিত করে তা মোটেও সমীচীন নয়। প্রতিটি জ্ঞান মানুষের সৃষ্ট, তাই সব জ্ঞানই সমালোচনার জন্য উন্মুক্ত। মানুষের তৈরি চিন্তার সমালোচনা করা স্বাভাবিক; তবে এ ক্ষেত্রে কিছু মানদণ্ড মেনে চলা জরুরি। তাই জ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাটিকে নিষিদ্ধ করা বা চর্চাকে হারাম ঘোষণা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। প্রয়োজন হলে আমরা সমালোচনা করবো এবং সংশোধনের প্রয়োজনীয় অংশগুলো সংশোধন করবো। যাই হোক না কেন, আমাদের অতীত মিরাসকে উপেক্ষা করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারটি মুসলিম উম্মাহর মহান দার্শনিক, আলেম ও মুতাফাক্কির প্রফেসর ড. তাহসিন গরগুন তাঁর অনন্য গ্রন্থ ‘জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও মেথডোলজি’তে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন-
“আমাদের সভ্যতাকে খুব ভালোভাবে চিনতে ও জানতে হবে। এ সভ্যতার মিরাসকে ধারণ করতে হবে। আমরা সভ্যতার মিরাসকে উপেক্ষা ও অস্বীকার করলে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর অন্য কোনো পথ নেই। নিও-সালাফিজমের মূল সমস্যা এটাই। এ বিষয়ে আমি মনে করি ইসলামী সভ্যতার মিরাসের (ভুল ও ভ্রান্তিসহ) দায়ভার আমাদেরকে নিতে হবে। এটা খুবই জরুরি। ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব নিবো-সে ভুল থেকে শেখার জন্য, পুনরাবৃত্তির জন্য নয়। কিন্তু সেই ভুলগুলোও যে আমরা করেছি, সেটার স্বীকৃতি দিয়েই আমাদেরকে ইসলামী সভ্যতাকে ধারণ করতে হবে। অতীতকে কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে, বুঝার জন্য অতীতকে পাঠ করতে হবে। অতীতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পাঠ করার কারণে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস আজ আমাদের সামনে ইসলামবিচ্যুত ইতিহাস হিসেবে এসেছে। ইতিহাসকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেনো যত সময় গিয়েছে উম্মত হিসেবে আমরা ইসলাম থেকে ততই দূরে সরে গিয়েছি। সাহাবীদের পর থেকে যত সময় গড়িয়েছে, ইসলাম থেকে আমরা ততই দূরে সরে গিয়েছি। আমাদেরকে এ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে”। (পৃ.৩৪-৩৫)
তাই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো নিজেদের অতীত মিরাসকে ধারণ করে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালানো। মহান আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।


