بسم الله الرحمن الرحيم
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র জাহানের প্রতিপালক। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গের উপর এবং আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন মুহাজির ও আনসারদের উপর এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাদের উপর যারা কিয়ামত পর্যন্ত উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করে যাচ্ছেন।
অতঃপর আপনাদের সবাইকে স্বাগতম। আজ আমি আপনাদের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করবো। সেটি হলো- “মাকাসিদভিত্তিক পদ্ধতি” (Maqasid Methodology) ব্যবহার করে পবিত্র কোরআন পাঠের একটি বিস্তর ধারণা ঠিক কেমন হতে পারে।
শুরুতেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্নের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। প্রায়ই আমরা এই প্রশ্নটি করে থাকি যে- “আমি কীভাবে কোরআন পড়ব?” প্রশ্নটি দেখতে হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জন্য এটি ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত জটিল। কেন? কারণ পবিত্র কোরআন বোঝার জন্য এমন কিছু দরজা আছে, যা আল্লাহ নিজেই বান্দার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
আমাদেরকে সেই দরজায় কড়া নাড়তে হবে, এবং অপেক্ষা করতে হবে কখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আমাদের দোয়া কবুল করে কোরআনের আয়াত সমূহ, নিদর্শন, মিসাল ও অর্থগুলো আমাদের সামনে উন্মুক্ত করবেন। যেটি পাঠক হিসেবে আমাদের জন্য নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটাবে। এরপর আমরা সেই অর্থ ও উপলব্ধির মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক খুঁজে পাবো, বুঝতে শুরু করবো কোরআনের কিছু বক্তব্য কীভাবে আমাদের প্রশ্ন ও উদ্বেগের সাথে সম্পর্কিত।
এজন্য মহাগ্রন্থ আল কোরআনের কাছে আমাদের দ্বারস্থ হতে হবে একদম পরিষ্কার মন নিয়ে, যেন একেবারে নতুন একটি পাতার মতো আমরা সেখানে উপস্থিত হয়েছি। যাতে করে আমাদের উপলব্ধিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চারকারী নিদর্শন সমূহ আমরা লীপিবদ্ধ করে উপকৃত হতে পারি। শুধু তাই নয়, কোরআনের কাছে আমাদের যেতে হবে এমন একটি হৃদয় নিয়ে, যা আল্লাহর কাছে একান্তে হেদায়েত প্রত্যাশা করে। কারণ কোরআন হলো কেবল তাদের জন্যই পথনির্দেশ, যারা আল্লাহভীরু। যদি আমাদের অন্তরে সমস্যা ও রোগাক্রান্ত থাকে, তবে কোরআনের গভীর জ্ঞান, বোঝাপড়া বা ফিকহ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য কখনোই সম্ভব হবেনা। কারণ কোরআন হলো মুমিনদের জন্য হেদায়েত ও রহমত সরূপ, যেমন বলা হয়েছে- “হুদা ওয়া রহমাতুল্লি কওমিন ইউ’মিনুন।”
আমরা জানি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি আমাদের বিশ্বাস স্থাপনের পরের স্তরে ঈমানের গভীরতা সকলের এক নয় এবং এটি ওঠানামা করে। যেমন, নেক আমল করলে তা বৃদ্ধি পায়, আর গুনাহ করলে তা কমে যায়। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যদি আমাদের নৈতিক বা মানসিক সমস্যা থেকে থাকে, যদি ঈমানের প্রাথমিক স্তরে পরিপূর্ণনা না থেকে থাকে কিংবা যদি সন্দেহ পোষণ করে থাকি; তবে এইভাবে কোরআন পড়ার আগে সেই সমস্যাগুলো দূরীকরণের উপর বিশেষ মনোযোগী হতে হবে ও এজন্য কাজ করতে হবে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে তখন আমরা একেবারে নির্ভুল হয়ে কোরআন পড়তে পারবো। আমরা সবাই মানুষ, আমাদের সবারই ভুল আছে। কিন্তু অন্তত বড় বড় সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে, যাতে আমাদের হৃদয় সমূহ মহান আল্লাহর দেওয়া পবিত্র জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে।
মহাগ্রন্থ আল কোরআন একটি শাশ্বত আলো। আমরা যখন তা পড়তে শুরু করি, তখন আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেখানে স্বয়ং নিজেই আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টি এমন নয় যে অন্য কেউ আল্লাহর কথা বর্ণনা করছে; এটি সরাসরি আল্লাহরই বাণী। এ কারণে এই বাণীর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। মানব রচিত যেকোনো বক্তব্য থেকে তার আলোকবর্তিকা ভিন্ন এক ছন্দের মাধ্যমে আমাদের হৃদয় সমূহ বিগলিত করে যায়। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা নিজেই বলছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মতো নয়।
ফলে আমরা বলি, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। কিন্তু তাঁর শোনা আমাদের মতো নয়, তাঁর দেখা আমাদের মতো নয়, তাঁর জীবনও আমাদের মতো নয়। আমাদের জীবন দেহ ও আত্মার সমন্বয়, কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এ কারণেই তাঁর বাণীও আমাদের বাণীর মতো নয়। হ্যাঁ, আমরা এটি আরবি ভাষায় পড়ি। কিন্তু এটি তাবৎ জাহানের সকল লেখ্যরূপের চেয়েও ভিন্ন। এর শব্দের নির্বাচন, ধ্বনি, শব্দমূল, বাক্যের বিন্যাস, আয়াতের ক্রম; সবকিছুতেই এক ঐশ্বরিক বিশেষত্ব রয়েছে। ভাবার্থের জায়গা থেকেও কখনো বাক্যের মাঝেই একবচন থেকে বহুবচনে পরিবর্তন হয়, কখনো আখিরাত থেকে দুনিয়া, আবার দুনিয়া থেকে আখিরাতে ফিরে আসে। এটি এক অসাধারণ গ্রন্থ। তাই আমাদেরকে সেই দরজায় কড়া নাড়তেই হবে, যাতে মহান আল্লাহ আমাদের জন্য তা উন্মুক্ত করে দেন এবং আমাদের প্রতি সহায় হোন।
এজন্য আমাদের যে বিষয়টি করা জরুরী তা হলো একটি পবিত্র হৃদয়কে কোরআনের সামনে নিবেদিত করে কোরআন থেকে জ্ঞান উৎপাদনের চেষ্টা করা। প্রকৃত ফিকহ এটিই। কোরআনের গভীর বোঝাপড়া নির্ণয়ের চেষ্টা করা; শুধু কিছু ফিকহি বিধানই “ফিকহ” এর মতো গভীর একটি বিষয়কে পরিপূর্ণতা দেয়না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ফিকহ কেবল শরীয়তের বিধান নিয়ে আলোচ্য কোনো বিষয় নয়; এটি আমাদের জ্ঞানের একটি বিস্তৃত ধারণা। যেমন স্থাপত্য, চিকিৎসা, মনোবিজ্ঞান, শিক্ষা, প্রকৌশল, নীতি নির্ধারণ; সব ক্ষেত্রেই ফিকহের প্রয়োগ রয়েছে, পাশাপাশি হাদীস ও দাওয়াহর ক্ষেত্রেও। এখানে আমরাই গবেষক, আমরাই পাঠক, এবং এক অর্থে আমরাই মুজতাহিদ। আমাদের কাজ হলো- নতুন তত্ত্ব, নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির চেষ্টা করে যাওয়া।
কোরআন পাঠের অর্থবহতা তো কেবল তখনই পরিপূর্ণতা পায় যখন আমরা এখান থেকে কোনো সমস্যার নতুন সমাধান আবিষ্কার করতে চেষ্টা করবো, নতুন কৌশল তৈরি করতে স্বচেষ্ট হবো, অথবা আমাদের নিজস্ব জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুনভাবে কাঠামো নির্মাণ করে তা নিয়ে পূনরায় গবেষণা করবো। এজন্য আমি পরামর্শ দিতে পারি যে, আপনারা যে যেই ক্ষেত্রেই দক্ষ হোন না কেন, বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন লেখকের লেখা তাফসির পাঠ করা অত্যন্ত জরুরী। আমি বলছি না যে আপনি ফকিহদের মতো ফতোয়া দেবেন, বরং আমাদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপট ও নিজস্ব অবস্থানের আলোকেও কোরআনকে বুঝতে চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে এর একটি সামগ্রিকতা আমাদের সামনে নতুন করে হাজির হতে পারে। যেমন, কানাডার একজন ইঞ্জিনিয়ার কোরআনকে একভাবে পড়বে, আবার সামরিক বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী ভিন্নভাবে পড়বে। এর মানে এই নয় যে এইক্ষেত্রে তাফসীর অপ্রাসঙ্গিক, বরং তা আরো ব্যপকতা পাবে সেই আকাঙ্খা নিয়েই আমাদের কোরআনের নিকটবর্তী হওয়া উচিত।
প্রসঙ্গত, জ্ঞানের ইতিহাস এবং নতুন জ্ঞান উৎপাদন; এই দুইয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে। আর আমরা যেন আমাদের সময়ের আলোকে নতুন জ্ঞান তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি, সেই বিষয়ে আমাদের স্বচেষ্ট হওয়া জরুরী। এজন্য আমাদের নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট তাফসীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখাটা কখনোই সমীচিন নয়।
ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে চিন্তা উৎপাদনের পথ উন্মুক্তকারী জ্ঞান হলো “উসূল”। এর উৎপত্তি ও বিকাশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- ইলমুল উসূল শুধু ফিকহের নিয়ম তৈরির একটি সাধারণ পদ্ধতিই নয়, বরং এটি জ্ঞান উৎপাদনের সীমানা নির্ধারণ করে এবং ইসলামী জ্ঞানকেও একটি দার্শনিক উচ্চতায় উন্নীত করতে সহায়তা করে। বিশেষত আইন ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে মুসলমানদের দার্শনিক জ্ঞান গঠনে উসূল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তাই নয়, এটি কাঠামো নির্ধারণ, নিয়ম প্রণয়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কাজও করে।
এই কারণে উসূলে ফিকহকে স্রেফ ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বিষয়টি সঠিক হবেনা, বরং এটি অন্যান্য জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবেও কাজ করেছে। সংক্ষেপে, দ্বীনের নামে কথা বলার সীমানা নির্ধারণ করেছে এই জ্ঞান। এজন্য উসূল কেবল একটি জ্ঞানের শাখাই নয়; এটি চিন্তারও একটি পদ্ধতি। কোরআন ও সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে সবসময় উসূলের নীতিমালা ব্যবহার করা হয়েছে।
মাকাসিদ ধারণাটি ক্লাসিক উসূলের “ওয়াসফুল মুনাসিব” থেকে এসেছে। ইমাম গাজালী এটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন; জারুরিয়্যাত, হাজিয়্যাত এবং তাহসিনিয়্যাত। তিনি আবার জারুরিয়্যাতকেও পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন; দ্বীন, জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি ও বংশ রক্ষা।
কিন্তু বর্তমান সময়ের তাবৎ সব জটিল সমস্যার সমাধানে এই সীমিত ধারণা যথেষ্ট কার্যকর নয়। তাই এখন আমাদের মাকাসিদকে সংকীর্ণ অর্থ থেকে বের করে দ্বীনের সামগ্রিক উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্ত করে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে-
সৃষ্টির উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত তাকবীন), জীবন ও সভ্যতার উদ্দেশ্য (মাকাসিদুল উমরান), ওহী নাযিলের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুত তানযিল), কোরআনের উদ্দেশ্য, সুন্নাহর উদ্দেশ্য এবং দায়িত্বের উদ্দেশ্য।
নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর দ্বীনে কোনো অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন বিষয় নেই। কিন্তু আমাদের সংকীর্ণ চিন্তা কখনো কখনো আমাদের ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। মাকাসিদ আমাদেরকে এই অর্থহীনতা থেকে রক্ষা করে থাকে; যদি আমরা সঠিকভাবে এর অর্থ নির্ধারণ করে দ্বীনের রহমত, হিকমত, ন্যায়বিচার ও কল্যাণকে মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে পারি।
এছাড়া আহকামের পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বর্তমান সমস্যার সমাধানের জন্য ফিকহকে গতিশীল করতে তিনটি মূলনীতি খুবই গুরুত্ব বহন করে। সেগুলো হলো-
- ১. সময় ও স্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে হুকুমের পরিবর্তন অস্বীকার করা যায় না।
- ২. কোনো হুকুম যদি তার উদ্দেশ্যের বিপরীত ফল দেয়, তবে তা বাতিল গণ্য হবে।
- ৩. নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হলে সেই হুকুমের কার্যকারিতাও শেষ হবে।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিলে বর্তমান যুগের সমস্যার উপযোগী কোনো ফিকহ তৈরি করা সম্ভব নয়। এটা এই অর্থে নয় যে তারা ভুল, বা তাদের পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য; বরং আমরা এখানে যে অনুশীলনটি করতে চাইছি, সেটি ভিন্ন। যেমন, যদি আমরা এই অনুশীলনের মধ্যে প্রবেশ করে সরাসরি ইবনে কাসীরের মতো তাফসীর খুলি, তাহলে আমাদের নিজস্ব চিন্তার প্রক্রিয়াটি হয়তো পূর্ণতা পাবেনা।
কারণ আমরা যদি শিক্ষা বিষয়ে কাজ করি, তাহলে আমাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা নিশ্চয়ই ইবনে কাসীরের মধ্যে যত্রতত্রভাবে খুঁজে পাব না! কারণ এই তাফসিরে তিনি শিক্ষা-দৃষ্টিকোণ থেকে কোরআন ব্যাখ্যা করেননি। তিনি একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করেছেন যেখানে তিনি আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীস, সাহাবা ও তাবেঈদের বর্ণনা সংগ্রহ করেছেন। তবে এটি অবশ্যই একটি অত্যন্ত সম্মানিত পদ্ধতি, এবং ব্যক্তিগতভাবে আমিও তাঁর থেকে অনেক কিছু শিখেছি।
কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিষয়টি হলো- আংশিকতা (partialism), অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন করে পড়া। কোরআন পড়ার সময় কখনোই আমাদের বিচ্ছিন্নভাবে পড়া উচিত না। সবসময় সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগের আয়াতের সাথে পরের আয়াতকে যুক্ত করা, শব্দগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করা। সেইসাথে, কেন এমন বলা হলো; এই “কেন” প্রশ্নটি নিজেকে বারবার করা।
আমি মনে করি, ছোটবেলায় যখন আমরা কোরআন মুখস্থ করতাম, তখন শায়খরা আমাদের পরীক্ষা করার জন্য মাঝখান থেকে আয়াত শুরু করতেন, কখনো কখনো শব্দের মাঝখান থেকেও। এর ফলে আমাদের মধ্যে কোরআনকে টুকরো টুকরো করে দেখার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি চাই না আমরা কোরআনকে এভাবে ভেঙে ফেলি। বরং আসুন আমরা কোরআনকে তার অর্থবহতার জায়গা থেকে সমন্বিতভাবে (integrated) পড়তে চেষ্টা করি।
ধরুন, আপনি একজন অর্থনীতিবিদ, এবং আপনি “আল-মাল” (সম্পদ/ধন) শব্দে এসে থামলেন। তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন যে কোরআনের আর কোথায় “আল-মাল” এসেছে? আগের সূরায় কি এ বিষয়ে কিছু পড়েছিলাম? গিয়ে মিলিয়ে দেখুন। সংযোগ তৈরি করুন। আমরা পড়ার সুবিধার জন্য কোরআনকে সাত ভাগে ভাগ করছি, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা এই অংশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ভেঙে ফেলবো।
তৃতীয় বিষয়টি হলো- অ্যাপোলজেটিক্স (apologism), অর্থাৎ নিজের পূর্বধারণা কোরআনের উপর চাপিয়ে দেওয়া। এই বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বের সাথে আমাদের পরিত্যাগ করা উচিত। যেমন, আপনি যদি একজন অর্থনীতিবিদ হন, তাহলে কোরআনের মধ্যে পুঁজিবাদ খুঁজবেন না। যদি আপনি মনোবিজ্ঞানী হন, তাহলে ফ্রয়েডকে কোরআনের মধ্যে বসানোর চেষ্টা করবেন না। যদি আপনি সমাজবিজ্ঞানী হন, তাহলে ডারখাইমের তত্ত্ব দিয়ে কোরআন ব্যাখ্যা করবেন না। উদাহরণ হিসেবে, ডারখাইম সমাজে মানুষের শ্রেণিবিন্যাসকে তাদের আত্মপরিচয়ের উপর ভিত্তি করে দেখেন। আজকের দিনে যেমন লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কিন্তু কোরআন এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে না।
কোরআনে দল বা গোষ্ঠীর পরিচয় তাদের নিজেদের দাবির উপর নয়, বরং নির্দিষ্ট মানদণ্ডের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। তাই আমাদের পূর্ববর্তী জ্ঞানকে কোরআনের উপর চাপিয়ে দিয়ে সেটিকে “ন্যায়সঙ্গত” প্রমাণ করার চেষ্টা করা ভীষণ কদার্য মানসিকতার পরিচয়। তাহলে কোরআন শুধু উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক চুক্তির বইয়ে পরিণত হয়ে যাবে; যা আসলে কোরআনের মূল আলোচ্য বিষয় নয়। এমনকি “সমতা” (equality) বা “স্বাধীনতা” (freedom) -এই শব্দগুলোও কোরআনে সরাসরি নেই। এর মানে এই নয় যে এসব মূল্যবোধ নেই; বরং এটি একটি গভীরতর আলোচনার বিষয়।
চতুর্থ বিষয়টি হলো বিরোধ (contradiction)। আকল (যুক্তি) ও নকল (ওহী/প্রমাণ) এদের মধ্যে বিরোধ খোঁজার চেষ্টা করা যাবেনা। কোরআনকে এদের ঊর্ধ্বে রাখুন।
কোরআন সর্বোচ্চ, এবং এটি সবকিছুকে সমন্বিত করে। এছাড়া “ডিকনস্ট্রাকটিভ” দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোরআন পড়া যাবেনা। যেমন শুরুতেই ক্ষমতার কাঠামো খোঁজা, যেমন পিতৃতন্ত্র (patriarchy)। কোরআন পুরুষের ক্ষমতা বা নারীর ক্ষমতা; কোনোটিরই বই নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা সাধারণ মানুষের ক্ষমতার বইও নয়; এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
বিশেষ করে যারা সমাজবিজ্ঞান পড়েছেন, তারা এ ধরনের বিশ্লেষণে প্রশিক্ষিত হন, কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবেনা।
এতোক্ষণ যে বিষয় গুলো আমি তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম, এগুলো ছিল “কি করা যাবে না”।
এখন আসুন আলোকপাত করা যাক কোরআন পাঠের ক্ষেত্রে “কি করতে হবে” -এই বিষয় নিয়ে।
প্রথমত, আমরা যে উপাদান সমূহ নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখি। বিশেষ করে “উদ্দেশ্য” (objectives)। চলুন প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করি, আল্লাহ কেন এটি বলছেন? কেন এভাবে বলা হলো? কেন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়নি? যেমন, কেন কোরআনে “সমতা” শব্দটি নেই? বরং এখানে স্তরভেদ (hierarchy) আছে। “ফাদ্দালাল্লাহু…” (আল্লাহ কিছু মানুষকে অন্যদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন)।
তাহলে এবার প্রশ্ন করি যে সমতার মধ্যে তবে সমস্যা কী? একইভাবে, কেন “ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি” নেই? কেন “গণতন্ত্র” নেই? এই “কেন” প্রশ্নগুলো আমাদেরকে একটি সুসংগঠিত সমালোচনামূলক চিন্তায় নিয়ে যাবে। “কেন” প্রশ্ন ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত, এবং এটি সমন্বিত চিন্তার দরজা খুলে দেয়।
দ্বিতীয়ত বিষয়টি হলো, ধারণা (concepts) বিশ্লেষণ করা। যেমন, বিয়ে (marriage) বনাম যিনা (zina)। এই দুটি ধারণার ভিত্তিতে সমাজ ও পরিবারকে বুঝার চেষ্টা করি। “ইলম” (জ্ঞান) কী আসলে কোরআনের দৃষ্টিতে? মানুষ (human) কী; এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ বা স্থপতি বা যাই হই না কেন, “মানুষ” ধারণাটি আমাদের জন্য কেন্দ্রীয়।
একজন স্থপতির জন্য যে স্থানে মানুষ বসবাস করবে, সেই স্থানে মানুষের ভূমিকা কী? এই ধারণাগুলো বিশ্লেষণ করে আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব তত্ত্বগুলোকে পুনর্গঠন করতে হবে।
তৃতীয়ত, মূল্যবোধ (values) নির্ধারণ করা। এক্ষেত্রে প্রশ্ন করা যে নৈতিকতা কী? সৌন্দর্য কী? উপকার ও ক্ষতি কী? কোরআন আমাদেরকে এই মানদণ্ডগুলো নতুনভাবে গঠন করে দেবে।
চতুর্থত, কোরআনের নির্দেশনাগুলো (commands) খুঁজে বের করার চেষ্টা করা। কি করতে হবে, আর কি থেকে বিরত থাকতে হবে। আসলে এইভাবেই কোরআন পাঠ একটি গভীর, সমন্বিত এবং সৃজনশীল জ্ঞানচর্চায় পরিণত হবে। মনে রাখা জরুরী যে, কোরআনে “করণীয়” ও “বর্জনীয়” বিষয়গুলো শুধু আহকামের জন্য নয়; শুধু হালাল-হারাম বা ওয়াজিবের বিধানও নয়। বরং এগুলো আরও বহু বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য।
কোরআন আমাদেরকে পৃথিবীতে চলতে, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পরিণতি দেখতে, আগের প্রজন্ম ও সভ্যতাগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে নির্দেশ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এটি এমন একটি নির্দেশ যা সরাসরি বাধ্যতামূলক বিধানের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু, নির্দেশনাগুলোর দিকে তাকান এবং দেখুন কীভাবে আপনি সেগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন। এটা আমাদের জন্য কোআরনের নতুন নতুন দিকগুলো উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।
এরপর রয়েছে সার্বজনীন নিয়মাবলি বা সুন্নাতুল্লাহ। যখন আল্লাহ বলেন যে এগুলো পুনরাবৃত্ত হয় কিংবা এই ধারাবাহিকতা বিদ্যমান; আমরা দেখি:
“وكذلك نجزي المحسنين”
অর্থাৎ, “এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিই।”
এরপর এই নিয়মগুলোর দিকে তাকাই। কী সেই প্যাটার্ন? ইতিহাসের প্যাটার্ন, ভূগোলের প্যাটার্ন, সমাজের প্যাটার্ন; আমরা যে ক্ষেত্র থেকেই আসি না কেন। সুন্নানুল্লাহ খুঁজুন, এখানে আল্লাহর নিয়ম কী? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ধারা কী? এরপর গোষ্ঠীগুলোর দিকে তাকাই। এবং যখন আমরা গোষ্ঠীগুলো দেখবো, তখন সেগুলোকে আমাদের ধারণার সাথে সংযুক্ত করবো।
কারণ কোরআনে এবং ইসলামে গোষ্ঠীগুলো মানুষের স্বাভাবিক ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
যেমন—
العلم والعلماء
والتجارة والتجار
والملك والملوك ইত্যাদি।
প্রতিটি গোষ্ঠীর সাথে একটি ধারণা যুক্ত থাকে। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় আমরা এই বিষয়টি ততটা পাই না। আমরা সহজেই কোনো একটি গোষ্ঠীকে “terrorists” বলে লেবেল দিই, কিন্তু “terror” কী তা সংজ্ঞায়িত করি না। অথবা আমরা কাউকে “celebrities” বলি; কিন্তু সেটার অর্থ কী, সেটাও স্পষ্ট করি না। আমরা কীভাবে এগুলো সংজ্ঞায়িত করব? ধারণাটি কী? এবং সেই ধারণার কি কোনো কর্তৃত্ব (سلطان) আছে?
আসলে আমাদের আধুনিক সমাজ ধারণাগত ও গোষ্ঠীগতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গেছে, বিশেষ করে বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে। কী সঠিক, কী ভুল, কী ভালো মূল্যবোধ; এসব নির্ধারণেও আমরা বিভ্রান্ত। এখন মূল্যবোধ মানেই যেন সংখ্যা আর সংখ্যা বেশি মানেই ভালো।
কিন্তু আল্লাহ বলেন:
“قل لا يستوي الخبيث والطيب ولو اعجبك كثرة الخبيث”
অর্থাৎ, “বলুন, অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়, যদিও অপবিত্রের আধিক্য আপনাকে মুগ্ধ করে।”
প্রমাণ (حجج) বিষয়টি নিয়েও ভাবুন। একটি শক্তিশালী প্রমাণ (برهان) ও একটি ভ্রান্ত যুক্তি (fallacy)-এর মধ্যে পার্থক্য কী? কোরআন আমাদের এই বিষয়গুলোও শেখায়।
বিশেষ করে ফিরআউনের দর্শনগুলো দেখুন, শুধুমাত্র ফিরআউনের দর্শনই আমাদেরকে যুক্তি নির্মাণের অনেক পদ্ধতি দেখাবে। তাই পড়ার সময় এগুলো খুঁজে দেখা জরুরী। এবং মনে রাখতে হবে যে এগুলো আলাদা আলাদা বিষয় নয়। যেমন, আপনি যেন এক্সেল শিট খুলে না বলেন “এটা একটি concept, এটা একটি objective।” ন্যায় (العدل، القسط) এটি একইসাথে একটি objective এবং একটি concept। আবার মসজিদ একটি গোষ্ঠী। এবং এটিও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার একটি নিয়মের সাথে সম্পর্কিত।
“قائماً بالقسط” তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। অতএব, এটি তাঁর একটি নিয়ম। এবং القسط একটি মূল্যবোধ। এবং القسط একটি নির্দেশ। “وأقسطوا” অতএব, এটি সবকিছু। তাহলে কেন আমরা এগুলোকে এতোগুলো উপাদানে ভাগ করলাম? শুধু আমাদের চিন্তাকে উন্মুক্ত করার জন্য, যাতে আমরা বিভিন্ন দিক থেকে বিষয়গুলো দেখতে ও বিবেচনা করতে পারি।
কারণ আমাদের চিন্তার প্রবণতা ভিন্ন। কেউ ধারণা-কেন্দ্রিক শব্দ ও অর্থ খোঁজে। কেউ উদ্দেশ্য-কেন্দ্রিক; সবসময় জিজ্ঞেস করে “কেন?” এবং “আমি কোথায় যাচ্ছি?”
কেউ নির্দেশনাভিত্তিক; তাদেরকে শুধু বলা হলেই হয় “اعدلوا، اقسطوا” তখনই তারা বুঝে নেয়। কিন্তু তারা “قسط” শব্দটি নিয়ে দার্শনিক বিশ্লেষণ করে না। আবার কেউ গোষ্ঠী বিশ্লেষণে আগ্রহী। এভাবে বিভিন্ন ধরণের প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আমরা মনে রাখিনা যে এই সবকিছুই পরস্পর সংযুক্ত ও আন্তঃসম্পর্কিত। প্রসঙ্গত, এখন মাকাসিদ পদ্ধতি অনুযায়ী এই অনুশীলনে আমরা দুটি ধাপ এক পাশে রেখে পুনরায় কোরআন পাঠের পদ্ধতিকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করবো।
প্রথমত রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ। এই অনুশীলনে হাদীস ব্যবহার করব না। এর মানে এই নয় যে হাদীস ভুল, বা আমি সুন্নাহর বিরুদ্ধে; কখনোই না।
আমার কোনো বই-ই এমন নেই যেখানে হাদীস নেই; এক পৃষ্ঠাতেও এক-দুটি বা পাঁচটি হাদীস না থাকে; এমন নয়।
কিন্তু হাদীস একটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়। এইবার কোরআন পড়ার সময় আমরা হাদীস অন্তর্ভুক্ত করবো না। কেন? কারণ হাদীসকে কোরআনের আলোকে প্রাসঙ্গিক করতে হয়-
“عرض الحديث على القرآن”
আমি জানি সুন্নি ও শিয়া ঐতিহ্যের মধ্যে এ বিষয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এটি আপাতত আমাদের বিষয় নয়, এমনকি আমার মতো একজন গবেষকেরও মূল বিষয় নয়।
আমি এই বিতর্কের ঊর্ধ্বে যেতে চাই। বলতে চাই, হাদীস কেন দেখবেন না? কারণ বর্ণনা (narration) অনেক সময় খণ্ডিত হয়, কিন্তু কোরআন সমন্বিত (integrative)। হ্যাঁ, একটি আয়াত কোরআনের একটি অংশ। কিন্তু আপনি একটি আয়াতকে পুরো কোরআন ছাড়া বুঝতে পারবেন না। এটিই বাস্তবতা। কিন্তু মানুষ হাদীসের ক্ষেত্রে প্রায়ই তা করে, একটি হাদীস নিয়ে নেয়, বাকি অংশ বা প্রেক্ষাপট না দেখেই তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করে।
বিশেষ করে জনপ্রিয় হাদীস গ্রন্থগুলোতে অনেক সময় হাদীস কেটে ছোট করা হয়েছে। একজন গবেষক হিসেবে এক্ষেত্রে আমার আপত্তি আছে, বিশেষ করে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের ক্ষেত্রে, তারা অনেক সময় হাদীসকে খুব বেশি সংক্ষিপ্ত করেছে।
হাদীস একটি পূর্ণ অনুচ্ছেদ, কিন্তু আপনি আমাকে পাঁচটি শব্দ দিয়ে বলছেন এটি একটি হাদীস! এমন অনেক উদাহরণ আছে। এছাড়া হাদীসের সাথে সত্যতা (authenticity) বিষয়টি জড়িত এবং সব “সহিহ” সংগ্রহের সবকিছুই সত্য নয়।
হাদীস বর্ণনাকারীর প্রেক্ষাপটের উপরও নির্ভর করে, এমনকি সাহাবির ক্ষেত্রেও। যদি আপনার বিশেষায়ন হাদীসে হয় তাহলে আপনি হাদীস দেখবেন। কারণ আপনাকে দেখতে হবে; কোরআনে সাহাবাদের যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা কি হাদীসে একইভাবে এসেছে? অবশ্যই না। কোরআনে তারা “মুহাজিরীন” ও “আনসার” -এটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট।
তাই যদি আপনি হাদীসের গবেষক হন, তাহলে কোরআনের আলোকে হাদীস বিশ্লেষণ করুন। এটি খুব জরুরী। কিন্তু যদি আপনি চিকিৎসা, ব্যবস্থাপনা, আইন, স্থাপত্য, ভাষা বা সমাজবিজ্ঞান; এই ক্ষেত্রগুলোর কোনো একটিতে থাকেন; তাহলে আজ হাদীসকে পাশে রাখুন।
শুধু কোরআনকে ঘিরে চিন্তা করি চলুন, যাতে আমরা একটি কার্যকর আলোচনার দিকে অগ্রসর হতে পারি। আমি জানি এভাবে পড়তে গিয়ে অবশ্যই আমাদের মনে আসবে “আমি তো একটি হাদীস জানি, যা এর সাথে মেলে না!” ঠিক আছে; এসব নিয়ে আমরা অন্য কোনো দারসে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
আরেকটি বিষয়, এই অনুশীলনে আমরা অন্যান্য জ্ঞান বা সমালোচনামূলক গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করবো না। অর্থাৎ আমরা যা করছি তা হলো: উদ্দেশ্য নির্ধারণ, কোরআনের উপর চিন্তা-ভাবনা, এবং একটি কাঠামো (framework) তৈরি করা; concept, objective ইত্যাদি নিয়ে।
আমরা অন্যান্য জ্ঞানের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ আপাতত বাদ দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলো কোরআন থেকে নতুন তত্ত্ব ও নীতি খুঁজে বের করা। যেমন, “কোরআনে সম্পদ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারা রয়েছে, তাই একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি সম্পদের সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে পারি।” অথবা “কোরআনে সৌন্দর্যের একটি বিশেষ ধারণা রয়েছে, তাই একজন শিল্পী হিসেবে আমি সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা দিতে পারি বা এটিকে বিশেষায়িত করতে পারি।” তাই এই পর্যায়ে সুন্নাহ ও অন্যান্য সমালোচনামূলক গবেষণা আমাদের জন্য এক পাশে রাখাটাই শ্রেয়।
আলোচনার এই অংশে এখন আমাদের উদ্দেশ্য কী? চলুন নিজেদেরকে এই চারটি শ্রেণির একটিতে স্থাপন করি:
- ১. دراسات اصولي(শাস্ত্রভিত্তিক গবেষণা)
- ২. دراسات فينومينا(ঘটনাভিত্তিক গবেষণা)
- ৩. دراسات ديسبلنري (শাখাভিত্তিক গবেষণা)
- ৪. دراسات استراتيجي (কৌশলগত গবেষণা)
যদি আমি ফিকহে বিশেষজ্ঞ হই, তাহলে কোরআনের সাথে আমাদের শেখা ফিকহ তুলনা করি। যেমন, পারিবারিক আইন। আমি নিজে ফতোয়া ও আদালতের কাজে পারিবারিক আইন নিয়ে কাজ করি এবং বড় পার্থক্য দেখি। যেমন বিয়েকে একটি “চুক্তি” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, কিন্তু কোরআনের দৃষ্টিতে এটি কেবল চুক্তি নয়। বা এটি শুধু “লাভ বিনিময়ের চুক্তি” নয়, এভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়।
এমনকি “الاحتباس” নামক একটি তত্ত্ব আছে, যেখানে বলা হয়, স্ত্রী যেন স্বামীর ঘরে বন্দি! সে বাইরে যেতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে, না হলে তার ভরণপোষণ বন্ধ হয়ে যাবে! তালাক হলে ক্ষতিপূরণও পাবে না! এগুলো কী ধরনের ধারণা? তাই যদি আমরা উসূলভিত্তিক গবেষণায় থাকি, তাহলে কোরআনের আলোকে ফিকহ, হাদীস, তাফসীর সবকিছুই চলুন পুনর্বিবেচনা করি।
এবার আমরা যদি নিজেকে কোনো শাখার (discipline) অধীনে রাখি, তাহলে আমরা মানবিক, সমাজবিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বা প্রয়োগমূলক বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ইত্যাদি। নিজেকে এই শ্রেণির একটিতে রাখুন এবং সেই অনুযায়ী আমাদের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করি।
শাখাভিত্তিক গবেষণায় মূল কাজ হলো, আমাদের শাস্ত্রের মৌলিক ধারণাগুলো পুনঃসংজ্ঞায়িত করা। যেমন, ভাষা কী? ইতিহাস কীভাবে বোঝা উচিত? কোরআন ইতিহাসকে যেভাবে উপস্থাপন করে তা প্রচলিত ইতিহাস তত্ত্বের মতো নয়। সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি আমরা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা সমস্যা (phenomena) নিয়ে কাজ করি, যেমন দারিদ্র্য; তাহলে যেন পুরো কোরআনের আলোকে সেটি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। শুধু “فقراء” শব্দ খুঁজে বের করলেই হবে না। কোরআন অনেকভাবে দারিদ্র্যের কথা বলে, এমনকি শব্দটি ব্যবহার না করেও।
আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ভাষাগত সীমাবদ্ধতায় আমরা নিজেদেরকে আটকে না ফেলি। গণনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বলে, কোরআনে “শরীয়াহ” শব্দটি মাত্র দুইবার এসেছে, তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি ভুল ধারণা। পুরো কোরআনই শরীয়াহ।
স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ হলো সংগঠনভিত্তিক বিশ্লেষণ, যেমন একটি NGO, রাষ্ট্র বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এখানে কোরআনকে বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে। আপনার সংস্থার লক্ষ্য কোরআনের উদ্দেশ্য থেকে নির্ধারণ করুন, অন্য কোনো মতবাদ থেকে নয়। আপনি গণতন্ত্রকে সমর্থন করতে পারেন, কিন্তু সেটিকে আপনার মূল লক্ষ্য বানাতে পারবেন না, যদি আপনি একটি ইসলামী সংগঠন হন।
আপনার লক্ষ্য আসবে ইসলাম থেকে, তারপর আপনি বিচার করবেন কোন অংশ গ্রহণযোগ্য। কার্যত, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে আমাদের বিশ্বদৃষ্টিও (worldview) অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত নয়। আমরা সমাজকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করবো, তা কোরআনিক কাঠামোর ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আমরা গোষ্ঠীসমূহকেও অন্যের কাঠামো দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে পারি না। আমাদের নিজস্ব কোরআনিক কাঠামো থাকতে হবে, যাতে আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে পারেন।
যেমন, সংস্কারক (reformers) ও দুর্নীতিবাজ (corruptors) এই বিভাজন আমাদেরকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবে।
সবশেষে বলতে চাই, আমরা পবিত্র কোরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে যখন নিজেদেরকে এই চারটি ক্ষেত্রের একটিতে স্থাপন করবো, তখন আমাদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেইসাথে, প্রচলিত ধারণার উর্ধ্বে উঠে কোরআনকে আমাদের সময়, যুগ, সভ্যতা, ক্রান্তি ও সংস্কৃতির আলোকে নিজেদের অবস্থান থেকেও নতুন নতুন তত্ব ও আহকাম উন্মোচিত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত পাঠ করা জরুরী।
অনুবাদঃ মুশফিকুর রহমান।


