সীরাত সাহিত্যে বাংলা ভাষার অবদান

বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় নিরুপণ করা বেশ মুশকিল বটে। তেরো শতকের প্রারম্ভকালে বাংলা অঞ্চলে মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিষেক ঘটলেও এ অঞ্চলে ইসলামের প্রভাব বিস্তার লাভ করে অষ্টম শতক থেকেই। ইতিহাসের নিরক্ষণে পাওয়া যায়, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা. এর যুগেই বাংলা অঞ্চলে ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে সীরাতচর্চারও শুরুয়াত ঘটে। সেইসময় ওমর রা. একদল সাহাবীকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রেরণ করেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আগত সাহাবীগণ রাসূল স. এর তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত জীবনীও বর্ণনা করেন এখানকার জনগোষ্ঠীর মাঝে। এরপর এক শতাব্দীকালের মাঝেই উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে উপকূল অঞ্চল এবং বাংলাতেও পৌঁছে যায় ইসলামের বার্তা।

আরবের সাথে বণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় অন্যান্য মুসলিম বণিকদেরও আগমন ঘটে এখানে। এই সম্পর্ক যে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা হলফ করেই বলা যায়। বণিকরা একইসাথে ইসলামের আখলাক, আধ্যাত্মিকতা ও সুমহান বার্তাও বয়ে নিয়ে আসেন বদ্বীপে। নদী বিধৌত এই বঙ্গভূমিতে রাসূল (স.) এর জীবনী চর্চার অনানুষ্ঠানিক সূত্রপাতও বলা যায় এভাবে।

রাসূল (স.) এর সীরাত নবদীক্ষিত মুসলিমদের বেশ যুগান্তকারী প্রভাব ফেলে। অনেকের ইসলাম গ্রহণের নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এই সীরাত। চৌদ্দ শতকে লিখিত রূপে সীরাতচর্চা শুরুর আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা।

বাংলা ভাষার বিকাশ সাধনে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপক হলেও মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে সাহিত্য জগতে কেবল পদ্য, কবিতা বা ছন্দের হদিস পাওয়া যায়। লিখিত ভাষায় সীরাত চর্চার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় শাহ মুহাম্মদ সগীরকে (মৃ. ১৪০৯)। ১৪শ শতকে রচিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “ইউসুফ-জুলেখা”য় উল্লেখযোগ্য একটা অংশ জুড়ে স্থান পেয়েছে রাসূল স. এর জীবনী। ১৫শ ও ১৬শ শতকে সীরাতচর্চায় অবদান রাখেন দুজন খ্যাতিমান কবি- যয়নুদ্দিন (মৃ. ১৪৮১) ও শাহ বাইরিদ খান (মৃ. ১৫৫০)। “রসূল বিজয়” নামে পৃথক দুটি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয় তাদের হাতে।

অপর একজন কবি সৈয়দ সুলতান (মৃ. ১৬৪৮), যিনি “রসূল চরিত”“ওয়াফাত-এ-রসূল” নামে দুটি সাহিত্য রচনা করেন রাসূল স. এর জীবন ও কর্মের উপর। জনশ্রুতিতে প্রচলিত বর্ণনাসমূহ লেখায় রূপদান করতে জুড়ি ছিল না সৈয়দ সুলতানের। ১৭শ শতকে বিখ্যাত কবি আলাওল তাঁর কালজয়ী কাব্য “পদ্মাবতী”র পুরো এক খণ্ড জুড়ে স্থান দেন সীরাতকে। সমসাময়িক আরেকজন সাহিত্যিক সৈয়দ হামজা (মৃ. ১৮১৫) রাসূল স. এর উল্লেখযোগ্য কিছু হাদীস অনুবাদ করেন বাংলা ভাষায়। এভাবে দেখা যায় ক্ল্যাসিকাল যুগ থেকেই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে সীরাত সাহিত্য। 

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে এসে সীরাতচর্চা নতুন একটি মাত্রা পায়। পূর্বতন ধারাবাহিকতায় পদ্য ও কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও শুরু হয় সীরাত সাহিত্য। বহু সংখ্যক কবি, লেখক ও সাহিত্যিকদের শৈল্পিক লেখনীতে সমৃদ্ধ হয় বাংলা ভাষায় সীরাতচর্চার ভাণ্ডার। এই সময়ে যাঁরা অবদান রাখেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন- মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, শেখ জমিরুদ্দিন, শাহাদাত হোসাইন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, বেনজীর আহমেদ, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আল মাহমুদ। রাসূল স. এর শানে তাঁরা রচনা করেন সংগীত, গীতিকাব্য, পদ্য সাহিত্য, প্রবন্ধ ও বই।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবুল খায়ের সাইফুদ্দিন “ইসলামী কবিতামালা”  নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন, যেখানে বিখ্যাত সব প্রাচীন কবিদের কবিতাকে জড়ো করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বেনজীর আহমেদ সম্পাদিত এমন একটি সংকলন গ্রন্থ “খাতামুন নাবিয়্যিন”। এছাড়াও আরও কিছু সংকলন গ্রন্থ রয়েছে যেমন- ইশরাফ হোসাইনের “রাসূলকে নিবেদিত কবিতা”, মুকুল চৌধুরীর “রাসূলের শানে কবিতা” এবং আসাদ বিন হাফিজের “নির্বাচিত নাতে রাসূল’’ ইত্যাদি। 

কবিতার জগতে সীরাতকে অনন্য একটি অবস্থানে নিয়ে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রাসূল স. এর স্তুতি ও শানে অন্তত শ’খানেক কবিতা ও সংগীত রচনা করেন নজরুল, যেগুলো আজও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এমনকি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছে কালের বিবর্তনে। “মরুভাস্কর” নামে সীরাত গ্রন্থ রচনা করে নবীপ্রেমে নিজেকে উৎসর্গের নজরানা যেন ষোলকলায় পূর্ণ করেন তিনি।

উনিশ শতকের শেষের দিকে খ্রিস্টান মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো নবী মুহাম্মদ (স.) এর জীবনীর উপর বই লিখতে শুরু করে এবং লিফলেট ছাপায়, যেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তাঁর জীবনীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি মুসলিম চিন্তক ও লেখদের ভাবিয়ে তুলে এবং রাসূল (স.) এর জীবনী নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার ভাবনা জাগিয়ে তুলে তাদের মাঝে। এইক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং সীরাত সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (মৃ. ১৯০৭)। সেইসময় বাংলা মুসলিম সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে সীরাত সাহিত্য। বাস্তবিকার্থে বাংলা মুসলিম সাহিত্যে গদ্যরীতির সূচনাই হয় সীরাতের মাধ্যমে। চমকপ্রদ বিষয় হলো, বাংলায় রাসূল (স.) এর সম্পূর্ণ জীবনচরিত রচনা করেন একজন হিন্দু লেখক, গিরিশচন্দ্র সেন, মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবন চরিত (১৮৮৬) নামে। সর্বপ্রথম মুসলিম লেখক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সীরাত লিখেন শেখ আব্দুর রহীম। তাঁর রচিত সীরাত গ্রন্থের নাম হযরত মোহাম্মদের জীবনচরিত ও ধর্মনীতি। যেটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। সীরাত সাহিত্যে অপর একটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম হচ্ছে মোস্তফা চরিত (১৯২৫)। মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁ (মৃ. ১৯৬৮) রচনা করেন এটি। কবি গোলাম মোস্তফার সীরাতকর্ম বিশ্বনবী-ও বেশ সমাদৃত হয় বাংলা ভাষায়। 

শুধুমাত্র বাংলা মৌলিক সাহিত্যের মাধ্যমেই নয়, অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমেও আরবী ও অন্যান্য ভাষায় রচিত ক্ল্যাসিকাল সীরাত গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলার সীরাতচর্চা। সীরাত গ্রন্থের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন আকর গ্রন্থ হিসেবে প্রসিদ্ধ ইবনে ইসহাকের সীরাতে রাসূলুল্লাহ-এর অনুবাদ নিয়ে আসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। এছাড়াও অগণিত প্রকাশনা সংস্থা থেকে সীরাতের অনুবাদকর্মসমূহ প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে অহরহ।

রাসূল স. এর বন্দনায় রচিত ফার্সী ভাষার কতক কবিতা ও সাহিত্যও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। এই পর্যায়ে মওলানা রুমী, মির্জা মাজহার, ওমর খৈয়াম, আব্দুর রহমান জামী, শেখ সাদী, আমীর খসরু, ফতেহ আলী ওয়াসী সহ ফার্সী ভাষার খ্যাতিমান কবিদের সীরাতকর্ম অনূদিত হয় বাংলায়।

উর্দূ ভাষার সীরাত গ্রন্থসমূহও বাংলায় অনুবাদ হওয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় সীরাত সাহিত্য। উর্দূ থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছে- ইদরীস কান্দল্ভীর মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লামা শিবলী নোমানীর সীরাতুন্নবী, সোলায়মান নদভীর পয়গামে মোহাম্মদী, আশরাফ আলী থানভীর খাতামুল আম্বিয়া, আবুল কালাম আজাদের বেলাদাতে নববী, মুফতী মোহাম্মদ শফীর সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া, ক্বারী মোহাম্মদ তায়্যিবের আফতাবে নবুয়্যত, এবং সাইয়্যেদ আবুল হাসান নদভীর নবী রহমত। কেবলমাত্র এই সকল গ্রন্থই নয়, পাশাপাশি উর্দূ সাহিত্যের প্রসিদ্ধ অনেক ছোট ছোট প্রবন্ধ, কবিতা ও গীতিও অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। বাঙালী স্কলারদের নিকট আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী, মির্জা গালিব বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মওদূদীর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সীরাতে সরওয়ারে আলমএর বাংলা অনুবাদও বেশ পঠিত বাংলা ভাষায়।

এছাড়াও ইংরেজি থেকে অনূদিত সীরাত গ্রন্থের মাঝে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর রণাঙ্গণে রাসূল স. এবং আফজালুর রহমানের মোহাম্মদ: এনসাইক্লোপিডিয়া অফ সীরাত প্রণিধানযোগ্য। 

শিশুদের উপযোগী করে সীরাতচর্চাও নেহাত কম হয়নি বাংলা ভাষায়। শিশুদের কোমল মানসে রাসূল স. এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি, আদর্শের দীক্ষা ও সচ্চরিত্রবান করে গড়ে তোলার মহান প্রয়াসকে সামনে রেখে কবি সাহিত্যিকগণ শিশুতোষ সীরাত রচনায় উদ্যত হন। এমনই একটি শিশুতোষ সীরাত হচ্ছে- নূরনবী। ইয়াকুব আলী চৌধুরী রচিত এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। সহজ ও সাবলীল ভাষায় রচিত নূরনবী শিশুসাহিত্য এবং সীরাতসাহিত্যে প্রশংসা কুড়ায় বেশ। নবীকরিম স. কে উপজীব্য করে একজন আদর্শ পুরুষ হয়ে উঠার জন্য দারুণ সহায়ক গ্রন্থটি। সেইসাথে, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর বিনির্মাণেও ভূমিকা রাখে ইয়াকুব আলী চৌধুরীর লেখনী। পরবর্তীতে তোরাব আলী রচিত ছোটদের মোস্তফা (১৯৩৬) এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর লেখা ছোটদের হযরত মোহাম্মদ (১৯৪১) – এই সকল গ্রন্থও প্রসিদ্ধি লাভ করে বিপুল পঠিত হয় বাংলার মুসলিমদের ঘরে ঘরে।

এভাবে বাংলা ভাষার বেশ শক্তিশালী একটি ধারা গড়ে উঠেছে রাসূল (স.) এর সীরাতকে কেন্দ্র করে। সেই ধারা অব্যহত রয়েছে এখনো। কখনো কখনো সামগ্রিক সীরাত না লিখে সীরাতের বিশেষায়িত কোনো অংশ নিয়ে কেউ লিখছেন সীরাত। আবার অনেকেই রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, দার্শনিক এবং মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তুলে ধরছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবের জীবনাচারকে। আর সেই সাহিত্য প্রভাবও ফেলেছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এবং বাঙ্গালী মুসলিম জাতিসত্তার বিনির্মাণে।

 

হদিসঃ

১। বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব।

২। বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা, মো: আবুল কাসেম ভুঁইয়া।

৩। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, মোহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান।

৪। বাংলা ভাষায় সীরাত বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি, নাসির হেলাল (সম্পাদিত)।

৪ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।
Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top