মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণবাদী কৌশল

রাজনৈতিক জায়নবাদের সম্প্রসারণবাদী লক্ষ্য কেবল ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল কিংবা ইসরায়েলের সীমানা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোকেও নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করার আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করা, তাদের অভ্যন্তরীণ জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজনকে কাজে লাগানো এবং ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের অনুকূল একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করা ছিলো এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লেবাননের ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনার একটি প্রাথমিক ও স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়।

১৯৮২ সালে বেগিনের নতুন মন্ত্রী প্রফেসর নিম্যান (উগ্র ডানপন্থী ধর্মীয় দল ‘তেহিয়া’ থেকে আসা) বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে দিয়েছিলেনঃ “তাই লেবাননে এক ‘নতুন ব্যবস্থা’ কায়েম করার চমৎকার সুযোগ এখন ইসরায়েলের হাতে। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সকে (আইডিএফ) লেবাননে দীর্ঘ সময় অবস্থানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এর মধ্যবর্তী সময়ে ইসরায়েল পার্শ্ববর্তী এই অঞ্চলে আর্থ-সামাজিক বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে-যা ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ‘এরৎজ ইসরায়েল’*-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটাও হয়তো সম্ভব যে, ইসরায়েল লিতানি নদীর দক্ষিণের উপত্যকাও নিজের সাথে একীভূত করে নিতে পারবে।”

স্বাভাবিকভাবেই, প্রতিটি উত্তেজনার পর যেমন হয়, এবারও ইসরায়েলি নেতারা সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন যে, রাজনৈতিক জায়নবাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আরও সামনে এগোতে হবে। এবার অ্যারিয়েল শ্যারন বললেন যে, ইসরায়েল “এখনও কাজের খুব সামান্য অংশই করেছে।”

এই যুদ্ধটিও ইসরায়েলের অন্য সব যুদ্ধের মতোই। ১৯৮২ সালের ১৪ জুন জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রফেসর লেইবোভিটজ সাহসের সাথে ঠিক যা বলেছিলেন: “এই যুদ্ধের লক্ষ্য হলো পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।”

মনে হচ্ছে জায়নবাদী নেতারা জশুয়ার বইয়ের সেই শ্লোকটি একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে, যেখানে বলা হয়েছে: “যে যে স্থানে তোমাদের পায়ের পাতা পড়বে, আমি তা তোমাদের দিয়েছি” (জশুয়া ১:৩)।

এটিই হলো রাজনৈতিক জায়নবাদের স্থায়ী লক্ষ্য “বৃহত্তর ইসরায়েল”-এর ধারণা। বেন-গুরিয়ন ইউনিভার্সিটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং রিজার্ভ জেনারেল শ্লোমো গাজিত ইসরায়েল-আরব সংঘাতের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই বিষয়টিতেই জোর দিয়েছিলেন: “প্রথম লক্ষ্য হলো ঐতিহাসিক এরৎজ ইসরায়েল যাতে আর ভাগ না হয়, তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো ঐতিহাসিক এরৎজ ইসরায়েল যাতে সম্পূর্ণ ইহুদি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং এটি যাতে মৌলিকভাবে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকে, তা নিশ্চিত করা। তৃতীয় লক্ষ্য হলো ঐতিহাসিক এরৎজ ইসরায়েলের আরবদের সমস্যার পূর্ণ সমাধান। তাদের জন্য সমাধান অবশ্যই ঐতিহাসিক এরৎজ ইসরায়েলের বাইরে খুঁজতে হবে।”

আরবদের ফিলিস্তিন থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং অন্যান্য আরব দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করে ভেঙে দেওয়া-এটাই হলো জায়নবাদী কর্মসূচির দুটি মূল স্তম্ভ।

১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেরুজালেম থেকে বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত ‘কিভনিম’ (দিকনির্দেশনা) ম্যাগাজিনের ১৪তম সংখ্যায় ওডেড ইয়ননের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে “১৯৮০-এর দশকে ইসরায়েলের কৌশল” তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রবন্ধটি সেই কর্মপদ্ধতি বা মেকানিজম ফাঁস করে দেয়, যার মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্র আগের সব আগ্রাসনকে ছাড়িয়ে গিয়ে প্রতিবেশী সমন্ত আরব রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্য এক পদ্ধতিগত ও সর্বাত্মক হস্তক্ষেপ চালানোর পরিকল্পনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যে নিঃশর্ত ও অসীম সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অনিবার্যভাবেই কেবল আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে নয়, বরং পুরো তৃতীয় বিশ্বে এক বিশাল জোয়ার তুলবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে না।

তাই এই পরিকল্পনাটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। যেখানে পারমাণবিক আঘাত – প্রত্য়া যাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা পুরো পৃথিবীর জন্য আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যখন বিষয়টিকে এর চরম পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয় (এবং আলোচ্য প্রবন্ধটি দেখায় যে জায়নবাদী নেতারা তাদের মতবাদের যুক্তিতে ও উন্মাদানায় এ বিষয়ে বেশ সচেতন), তখন জায়নবাদী পরিকল্পনা আর কেবল বিশ্বের একটি নির্দিষ্ট অংশের বিষয় থাকে না-বরং তা সমস্ত জাতিসমূর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

এই সর্বগ্রাসী লক্ষ্যগুলো আরও বেশি বিপজ্জনক এই কারণে যে, এখন পর্যন্ত জায়নবাদী রাষ্ট্র তার সবচেয়ে পাগলাটে পৌরাণিক জল্পনা- কল্পনাতেও যা যা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে, তার প্রতিটি কাজই তারা বাস্তবায়ন করেছে।

তাই আমরা বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা থেকে প্রকাশিত এই প্রবন্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলো নিচে তুলে ধরছি। এটি আজকের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক জায়নবাদের লালিত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর সেই শতাব্দী প্রাচীন স্বপ্নের সাথে মিলে যায় এমন লক্ষ্যগুলো উন্মোচন করে :

“সিনাই উপদ্বীপ এবং এর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পদ পুনরুদ্ধার করা হলো একটি প্রথম শ্রেণির রাজনৈতিক লক্ষ্য, যা ক্যাম্প ডেভিড এবং শান্তি চুক্তির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তেল এবং তা থেকে আসা আয় ছাড়া, এবং আমাদের বর্তমান বিশাল ব্যয়ের কথা বিবেচনা করে-আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে সিনাইয়ের পরিষ্কৃতি সাদাতের সফরের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় এবং ১৯৭৯ সালের মার্চে তার সাথে যে ভুল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো, তা বাতিল করা যায়।

মিশরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, তাদের শাসনের ধরন এবং প্যান-আরব নীতির কারণে এমন এক পরিষ্কৃতির সৃষ্টি হবে যে, সিনাইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ইসরায়েল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।

অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে মিশর কোনো সামরিক-কৌশলগত সমস্যা তৈরি করে না এবং মাত্র এক বা দুই দিনের মধ্যেই একে ১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থায় ঠেলে দেওয়া সম্ভব। আরব বিশ্বের শক্তিশালী নেতা হিসেবে মিশরের যে মিথ ছিলো, তা ১৯৬৭ সালের পর আর টিকে থাকেনি। ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল এবং বাকি আরব বিশ্বের তুলনায় মিশরের শক্তি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

স্বল্প মেয়াদে, সিনাই ফিরে পাওয়ার কারণে মিশর আমাদের বিনিময়ে কিছুটা লাভবান হবে, কিন্তু তা শক্তির ভারসাম্য তাদের অনুকূলে আনতে পারবে না। বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চিত্রের বিচারে মিশর ইতিমধ্যেই একটি লাশ। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফাটল বিবেচনা করলে তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৮০-র দশকে ইসরায়েলের পশ্চিম ফ্রন্টের রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো-মিশরকে আঞ্চলিকভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আলাদা ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভক্ত করা।”

“যদি মিশর ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, তবে লিবিয়া আর সুদানের মতো দেশগুলো, এমনকি আরও দূরের রাষ্ট্রগুলোও তাদের বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকবে না। তারাও মিশরের পতন ও বিলুপ্তির অংশীদার হবে।

মিশরের উপর দিকে একটি ‘খ্রিস্টান কপটিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা এবং তার পাশাপাশি দুর্বল ও খুবই স্থানীয় ক্ষমতার অধিকারী কয়েকটি রাষ্ট্র তৈরি করা-যাদের কোনো কেন্দ্রীয় সরকার থাকবে না (যেমনটা এখন পর্যন্ত ছিলো)-এই ভিশনটাই হলো ঐতিহাসিক অগ্রগতির চাবিকাঠি। শান্তি চুক্তির কারণে এটা কিছুটা পিছিয়ে গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটা অনিবার্য মনে হচ্ছে।

যদিও পশ্চিম ফ্রন্ট বা রণাঙ্গন আপাতদৃষ্টিতে বেশি সমস্যাসংকুল মনে হচ্ছে, কিন্তু পূর্ব ফ্রন্টের চেয়ে এটি আসলে কম জটিল। লেবাননের পাঁচটি প্রদেশে সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়াটা পুরো আরব বিশ্বের জন্য একটি নজির হিসেবে কাজ করে।

সিরিয়া এবং পরবর্তীতে ইরাককে জাতিগত বা ধর্মীয়ভাবে সমজাতীয় এলাকায় ভেঙে ফেলা হলো ইসরায়েলের প্রাথমিক দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। আর স্বল্পমেয়াদে প্রাথমিক লক্ষ্য হলো সেই রাষ্ট্রগুলোর সামরিক শক্তি ধ্বংস করা।

সিরিয়া তার জাতিগত ও ধর্মীয় কাঠামো অনুযায়ী ভেঙে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এর উপকূলে হবে একটি শিয়া আলাভী রাষ্ট্র; আলেপ্পো এলাকায় একটি সুন্নি রাষ্ট্র এবং দামেক্ষের আশেপাশে আরেকটি সুন্নি রাষ্ট্র (যা তার উত্তরের প্রতিবেশীর প্রতি শক্রভাবাপন্ন হবে)। আর দ্রুজরা তাদের নিজেদের একটি রাষ্ট্র গঠন করবে-হয়তো আমাদের গোলানে, তবে নিশ্চিতভাবেই হাওয়ান এবং উত্তর জর্ডানে। এই রাষ্ট্রটি দীর্ঘমেয়াদে এই এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা হবে। এবং এই লক্ষ্য আজ আমাদের হাতের নাগালেই আছে।

ইরাক, একদিকে যেমন তেলে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জর্জরিত-তাই এটি ইসরায়েলের শ্যেনদৃষ্টিতে আছে। সিরিয়া ভেঙে ফেলার চেয়ে ইরাক ভেঙে ফেলা আমাদের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরাক সিরিয়ার চেয়ে শক্তিশালী এবং স্বল্পমেয়াদে ইরাকি শক্তিই ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ, ইরাককে টুকরো টুকরো করবে এবং আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল ফ্রন্টে যুদ্ধ সংগঠিত করার আগেই এর অভ্যন্তরীণ পতন ঘটাবে। যেকোনো ধরনের আঙ্গুলী সংঘাত স্বল্পমেয়াদে আমাদের সহায়তা করবে এবং ইরাককে ভেঙে ফেলার সেই উচ্চতর লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ আরও কাছে নিয়ে আসবে।

তাই, তিনটি প্রধান শহর-বসরা, বাগদাদ এবং মসুলকে কেন্দ্র করে তিনটি (বা তার বেশি) রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। যেখানে দক্ষিণের শিয়া এলাকাগুলো উত্তরের সুন্নি ও কুর্দি এলাকা থেকে আলাদা হয়ে যাবে। হতে পারে বর্তমান ইরান-ইরাক সংঘাত এই মেরুকরণকে আরও গভীর করবে।

ভেতর ও বাইরের চাপে ভেঙে পড়ার জন্য পুরো আরব উপদ্বীপ খুব স্বাভাবিক একটি জায়গা। বিশেষ করে সৌদি আরবে এটি ঘটবেই। তেলের ওপর ভিত্তি করে দেশটির অর্থনৈতিক শক্তি অটুট থাকুক বা শেষ পর্যন্ত কমে যাক-তাতে কিছু যায় আসে না। অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ভেঙে পড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর কারণেই ঘটবে।

জর্ডান নিকট ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত টার্গেট, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের জন্য নয়। কারণ বাদশাহ হোসেনের দীর্ঘ রাজত্বের অবসান এবং ফিলিস্তিনিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এটি আমাদের জন্য আর বাস্তব হুমকি থাকবে না।

শান্তি ও যুদ্ধ-উভয় ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের নীতি হওয়া উচিত বর্তমান জর্ডান সরকারকে উৎখাত করা এবং সেখানে ফিলিস্তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। জর্ডান নদীর পূর্ব তীরের সরকার পরিবর্তন করলে নদীর পশ্চিম তীরের ঘনবসতিপূর্ণ আরব এলাকার সমস্যারও সমাধান হবে।

যুদ্ধ বা শান্তি-যে অবস্থাতেই হোক, এই এলাকাগুলো থেকে দেশত্যাগ এবং ভেতরে একটি অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত “স্থবিরতা” বজায় রাখা হলো জর্ডানের উভয় তীরের আসন্ন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি এবং খুব নিকট ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আমাদের সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়া উচিত।

স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। একই সাথে এই এলাকাগুলো নিয়ে আপস বা ভাগাভাগির যেকোনো পরিকল্পনাও বাতিল করতে হবে।

বর্তমানে এই দেশে যেভাবে বসবাস চলছে, সেভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আরবদের জর্ডানে এবং ইহুদিদের পশ্চিম তীরে দুই জাতিকে আলাদা না করে উপায় নেই। এই ভূমিতে প্রকৃত সহাবস্থান এবং শান্তি তখনই বিরাজ করবে, যখন আরবরা বুঝতে পারবে যে-জর্ডান নদী এবং সাগরের মাঝখানে ইহুদি শাসন ছাড়া তাদের কোনো অস্তিত্বও নেই, নিরাপত্তাও নেই।”

পারমাণবিক যুগে আমরা শীঘ্রই প্রবেশ করতে যাচ্ছি। এই অবস্থায় মোট ইহুদি জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশকে ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় রেখে বেঁচে থাকা আর সম্ভব নয়। তাই জনসংখ্যা ছড়িয়ে দেওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি অভ্যন্তরীণ কৌশলগত লক্ষ্য।

জুডিয়া, সামারিয়া এবং গ্যালিলিই হলো আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের একমাত্র গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা। যদি আমরা এই পার্বত্য এলাকাগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে না পারি, তবে আমরা এই দেশ শাসন করতে পারবো না, বরং ক্রুসেডারদের মতোই হারিয়ে যাবো, যারা এই দেশ হারিয়েছিলো।

জনতাত্ত্বিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিকভাবে দেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই আজ আমাদের সর্বোচ্চ ও কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। বিরশেবা থেকে আপার গ্যালিলি পর্যন্ত যে অববাহিকা, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আমাদের পার্বত্য এলাকায় বসতি স্থাপনের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যের জন্য অপরিহার্য-যে এলাকাটি বর্তমানে ইহুদিশূন্য।”

রাজনৈতিক জায়নবাদের এই ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী পরিকল্পনা-প্রথমে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কার, লুটপাট ও দমনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিলো। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক আগ্রাসী যুদ্ধ এবং এখন সমস্ত আরব রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হুমকি-ভবিষ্যতে বিশ্ব শান্তির জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভৌগোলিক আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে এত ছোট একটি দেশ বিশ্ব রাজনীতিতে এমন ভূমিকা পালন করতে পারে-এটা শুনতে স্ববিরোধী মনে হতে পারে।

কেন এমনটা হচ্ছে তা বোঝার জন্য কেবল দেশটির কৌশলগত অবস্থানের (তিনটি মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও) দিকে তাকালেই চলবে না, যদিও এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খাইম ওয়াইজম্যান তার ব্রিটিশ সংযোগকারীদের সাথে তর্কে ঠিকই বলেছিলেন যে, “একটি ইহুদি ফিলিস্তিন ইংল্যান্ডের জন্য, বিশেষ করে সুয়েজ খালের ক্ষেত্রে একটি রক্ষাকবচ হবে।”

সত্যিই, পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক পথের “চাবি” ইসরায়েলের হাতেই রয়েছে। যদিও এক পরাশক্তির হাত থেকে অন্য পরাশক্তির হাতে আধিপত্য চলে যাওয়ায় আজ আর ব্রিটেনের স্বার্থে নয়, বরং এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত।

ইরানে শাহের পতনের পর থেকে আমেরিকা আর তাদের ঘাঁটির ওপর ভরসা করতে পারছে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের “পুলিশ” হিসেবে ইসরায়েলের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একমাত্র ইসরায়েলই পারে সুয়েজ খাল এবং তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলের ওপর নজর রাখতে। তাছাড়া পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিরাপদ ঘাঁটির ব্যবস্থাও তারা করতে পারে।

 

* ‘এরৎজ ইসরায়েল’ বলতে Land of Israel বা ইসরায়েলের ভূমি বুঝানো হয়, যেটিকে জায়নিস্টরা নিজেদের ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। 

অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান

৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রজার গারাউডি

রজার গারাউডি

রজার গারাউডি (১৯১৩-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক, লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং পরবর্তীকালে ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। ফ্রান্সের মার্সেইয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও ইনসাফের প্রশ্ন তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষায় দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার আখলাকী সংকট, উপনিবেশবাদী মানসিকতা এবং সভ্যতার রূহানী শূন্যতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়ন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের আখলাক, সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবমুক্তির উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন। তার রচিত Promises of Islam, Islam and the Future of Humanity, The Founding Myths of Israeli Politics প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সভ্যতার সংকট, ধর্মের ভূমিকা এবং পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনায় তার লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণী ও আপসহীন। রজার গারাউডির জীবনব্যাপী সংগ্রাম ইউরোপীয় দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এক গভীর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক পাশ্চাত্যের আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প সভ্যতাগত বয়ানের আলোচনায় তিনি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
Picture of রজার গারাউডি

রজার গারাউডি

রজার গারাউডি (১৯১৩-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক, লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং পরবর্তীকালে ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। ফ্রান্সের মার্সেইয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও ইনসাফের প্রশ্ন তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষায় দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার আখলাকী সংকট, উপনিবেশবাদী মানসিকতা এবং সভ্যতার রূহানী শূন্যতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়ন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের আখলাক, সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবমুক্তির উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন। তার রচিত Promises of Islam, Islam and the Future of Humanity, The Founding Myths of Israeli Politics প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সভ্যতার সংকট, ধর্মের ভূমিকা এবং পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনায় তার লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণী ও আপসহীন। রজার গারাউডির জীবনব্যাপী সংগ্রাম ইউরোপীয় দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এক গভীর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক পাশ্চাত্যের আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প সভ্যতাগত বয়ানের আলোচনায় তিনি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top