১৬ হিজরীর জমাদিউস সানির ৪ তারিখ, অর্থাৎ ৪ জুলাই, ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানদের প্রথম বায়তুল মাকদিস বিজয় ইতিহাসের কোনো অতি সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এই ঘটনার প্রভাব আজও আমাদের বর্তমান সময় পর্যন্ত স্থায়ী। এই অঞ্চলে বসবাসকৃত মানুষের ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও এই স্থানকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিলো এই বিজয়। এছাড়াও, ইতঃপূর্বে এই স্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হওয়া ধ্বংস, হত্যা এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা থেকে মুসলমানদের এই বিজয় ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনা।
১৬ হিজরী/৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মের প্রথম দিকে বায়তুল মাকদিসে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), যিনি সেই সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা অথোরিটি ছিলেন, তাঁর প্রবেশ ছিলো নতুন এবং স্বতন্ত্র একটি যুগের সূচনা। এ সময়ে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের সাথে মুসলিমদের এক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা ইতিহাসে ‘উমরী চুক্তি’ নামে পরিচিত।
প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মধ্যে তাবারী ছাড়া মোটামুটি সবাই উমরী অঙ্গীকারনামার সংক্ষিপ্ত পাঠ উল্লেখ করেছেন। আল-ইয়াকুব, যিনি ছিলেন একাধারে ভ্রমণকারী, ইতিহাসবিদ এবং ভূগোলবিদ, তিনি নিম্নলিখিত পাঠটি উল্লেখ করেছেন-
“এটি বায়তুল-মাকদিসের লোকদের কাছে উমর ইবনুল খাত্তাবের চিঠি, আপনাদের রক্ত এবং সম্পদ নিরাপদ। আপনাদের গির্জা বা বসতি ধ্বংস হবে না, তবে শর্ত হলো আপনারা একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন।”
সাইদ বিন আল-বাত্রিক অনুরূপ একটি নস বা পাঠ উল্লেখ করেছেন যে-
“আল্লাহর নামে, উমর ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে ইলিয়াবাসীদের জন্য ঘোষণা করা হলো, তাদের রক্ত, তাদের সন্তান, তাদের অর্থ এবং তাদের গির্জা নিরাপদ। তারা নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে।”
এমন অনেক ইতিহাসবিদই ইলিয়া বা তত্কালীন ফিলিস্তিনের লোকদের নিরাপত্তা এবং তাদের ধর্মীয় অধিকার প্রদানের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত, আবার কেউ বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তবে তাদের বর্ণনাভঙ্গি এবং লেখন শৈলীতে পার্থক্য রয়েছে।
এবার আসা যাক বড় একটি বর্ণনায়। তাবারী কর্তৃক বর্ণিত উমর (রা.)-এর বড় অঙ্গীকারনামাটি হলো,
“বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। ঘোষণাটি আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর পক্ষ থেকে ইলিয়াবাসীর জন্য নিরাপত্তা। তিনি ইলিয়াবাসীর জীবন, তাদের অর্থ, তাদের গির্জা, তাদের ক্রুশ, অসুস্থ ও নিরপরাধ লোক এবং তাদের সম্প্রদায়ের অন্যান্যদের নিরাপত্তার নিশ্চায়ন করছেন।
তাদের গির্জা মুসলমানদের দ্বারা আক্রান্ত হবে না। তাদের স্থান হ্রাস করা হবে না, তাদের ক্রুশ বা তাদের সম্পদে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাদেরকে ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হবে না। সর্বোপরি তাদের কেউই ক্ষতিগ্রস্থ হবে না।
ইলিয়াবাসীগণ মাদায়েনবাসীদের মতো জিজিয়া প্রদান করবে। এবং এখান থেকে রোমের অধিবাসী এবং লুটেরাদের (চোর) বের করে দিতে হবে। তারা তাদের জান এবং মাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত নিরাপত্তা পাবে। আর রোমের অধিবাসীদের মধ্যে যারা ভালো, তারা নিরাপদ। তারা ইলিয়াবাসীদের মতো জিজিয়া দিবে। আর ইলিয়াবাসীদের মধ্যে যে বা যারা নিজ গির্জা এবং সন্তান-সন্ততি ছেড়ে তার অর্থকড়ি নিয়ে রোমানদের সাথে যেতে চায়, তারা তাদের নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত জন্য নিরাপদ। আর উদ্বাস্তু বা শরণার্থীদের মধ্যে যারা ইলিয়াবাসীদের সাথে থাকতে চায়, তারা থাকতে পারবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের থেকে জিজিয়া নেওয়া হবে না, যতক্ষণ না তারা সম্পদের মালিক হবে। মালিক হলে ইলিয়াবাসীদের মতো জিজিয়া দিবে। আর যারা চায়, রোমবাসীদের সাথে তারা চলে যেতে পারবে।
এই কিতাবে দলীলটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, খলিফা এবং মুমিনদের পক্ষ থেকে ওয়াদানামা, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা জিজিয়া দিবে।
এই ওয়াদানামার সাক্ষী: খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান।”
খলিফা উমর (রা.) হিজরী পঞ্চদশ বর্ষে বায়তুল মাকদিসে এসেছিলেন এবং এই ওয়াদানামাতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তাবারী কর্তৃক উল্লিখিত এই দলিলটি হিজরী পনেরোতম বছরের। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এটি সবচেয়ে দীর্ঘ এবং স্পষ্ট দলিলগুলোর মধ্যে একটি; এমনকি সবচেয়ে দীর্ঘ এবং বিশদ দলীল হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
উমরী চুক্তির ফলাফল, গুরুত্ব ও তাৎপর্য
বায়তুল মাকদিসে সংঘাতের সমাধান ও আন্ত:সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং ইলিয়াবাসীর পুনর্গঠনে সহায়তা করার জন্য উমর (রা.) মৌলিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর জোর দিয়ে থাকে ইসলাম। একজন বা এক জাতির উপর অন্য জাতির আধিপত্যের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি মানব জীবনের একটি স্বাভাবিক চাওয়া হলো, সে আধিপত্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। কোরআন ও সুন্নাহ বৈচিত্র্য এবং বহুত্ববাদের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এটি সুন্নাতুল্লাহ। বিজয়ীরা তার জনগণের স্বাধীনতাকে কোনো ধরণের জবরদস্তি ছাড়াই রক্ষা করবে। ইলিয়াবাসীদের জন্য মুসলমানরা এটি নিশ্চিত করে।
তাই মুসলমানরা ইলিয়ায় বসবাসকারী সকলকে নিরাপত্তা দিয়েছে, তাদের জান এবং মালের হেফাজত করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কারো উপর বৈষম্য করেনি। এই ওয়াদানামার মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাদের গির্জা এবং ক্রুশ নিরাপত্তা পেয়েছে।
এছাড়াও এই ওয়াদানামার মাধ্যমে তাদের পবিত্র স্থানগুলোর সাথে সম্পর্কিত সমস্ত কিছু সংরক্ষণ ও সুরক্ষা করা হয়েছে। ‘তাদের গীর্জা মুসলমানদের দ্বারা দখল কিংবা ধ্বংস করা হবে না’ মর্মে ওয়াদা দেওয়া হয়েছে। তাদের স্থান বা তাদের ক্রুশ বা তাদের অর্থ কোনোটিই ক্ষতি করা হবে না বলে কথা দেওয়া হয়েছে।
উমর (রা.)-এর অঙ্গীকারনামার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের পুনঃপঠন এবং এর ব্যাখ্যা এই দৃঢ় বিশ্বাসে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে যে, আরব মুসলিম বিজয়ীরা ইলিয়ার জনগণের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি অবলম্বন করেনি। অর্থাৎ, উমরী অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে ইলিয়ার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো।
উসমান আত্তাল অঙ্গীকারনামার ভাষাগত দিকটি বিবেচনায় নিয়ে বলেছেন যে, ইলিয়াতে প্রতিটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিলো। এবং এটি সুস্পষ্ট যে, ওয়াদানামাতে যে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে এর অর্থ বিভিন্ন গীর্জার অনুসারী।
তাবারীর দলীলটি যেমন ইলিয়ার বাসিন্দাদের প্রতি আরব মুসলিম বিজয়ীদের দায়িত্বকে সংজ্ঞায়িত করেছিলো, তেমনি এটি ইলিয়াতে নতুন শাসনের প্রতি এর বাসিন্দাদের বাধ্যবাধকতাও নির্দেশ করে। তাদের প্রথম দায়িত্ব ছিলো জিজিয়া প্রদান করা।
বায়তুল মাকদিসের জনগণের উপর এই কর আরোপ করা হয়েছিলো দুটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য। একটি রাজনৈতিক অপরটি অর্থনৈতিক। এর মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে গভীর একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। এবং উভয়পক্ষের মধ্যে সাধারণ সম্পর্ক সুসংহত হয়। তাদের অঞ্চলের মঙ্গল ও উন্নয়নে আর্থিক অবদানের মাধ্যম এটি। এই অঙ্গীকারনামা নিশ্চিত করে যে, তারা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদেরকে রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত করার একটি উপায়।
এর বিনিময়ে তারা তাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা পেয়েছে। ওয়াদানামার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো। নিরাপত্তা শব্দটি এবং এর কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করে এমন শব্দ দলিলটিতে আটবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, এই গুরুত্বপূর্ণ দলীলে ‘নিরাপত্তা’ ছিলো প্রধান বিষয় এবং সেই সময়ে বায়তুল মাকদিসের জনগণের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার গুরুত্ব সম্পর্কে উমর (রা.) খুব ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল ছিলেন।
অঙ্গীকারনামায় মূল পাঠে যে পদ্ধতিগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা নির্দেশ করে যে, উমর (রা.) এই নিরাপত্তার ইস্যুটির সমাধান করতে কতটা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। শুধুমাত্র স্থানীয়দের জন্য নয়, বরং অন্যদের জন্যও। যারা বায়তুল মাকদিসের জমি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের কথাও অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে।
বলা যায় যে, নিরাপত্তা ছাড়া এই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থান অর্জন করা কঠিন, এমনকি অসম্ভব।
অমুসলিমদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিনিময়ে সাধারণভাবে জিজিয়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। আমাদের বর্তমান সময়েও এর প্রচলন আছে। তবে ভিন্ন পরিভাষায়। নাগরিকদের কাছ থেকে সামরিক পরিষেবার বিনিময়ে এই অর্থ নেওয়া হয়। উল্লেখ্য যে, প্রত্যেক অমুসলিমদের উপর কর আরোপ করা হয়নি। কর ব্যবস্থায় শিথিলতা ছিলো।
মাহের আবু মিনশার জিজিয়ার নিয়ম এবং এর হার সম্পর্কে তার আলোচনা শেষ করে বলেছেন যে, “এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট হার ছিলো না, তবে সময়, স্থান এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুসারে নমনীয়তার নীতি ছিলো।”
সংক্ষেপে, জিজিয়া ব্যবস্থা অমুসলিমদের জন্য বোঝা ছিলো না, বরং বাইজেন্টাইন (আগের রোমান) কর ব্যবস্থা থেকে রেহাই পেতে এটি একটি যথোপযুক্ত পদক্ষেপ ছিলো। উপরন্তু, মুসলিমরা যে যাকাত দিতো জিজিয়া কর তার চেয়ে কম ছিলো। সংক্ষেপে বলা যায়, জিজিয়া লাভের উদ্দেশ্যে বায়তুল মাকদিসে অভিযান পরিচালিত হয়নি।
আর যদি ইলিয়াবাসী প্রথম বাধ্যতামূলক জিজিয়া কর প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে করা হয়েছিলো। এই দ্বিতীয় পয়েন্টটি ছিলো বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর কারা থাকতে পারবে আর কারা চলে যেতে বাধ্য-এই অধিকার নির্ধারণের একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
ইলিয়ার প্রথম বিজয়ের সময় বিদেশী দখলদাররা সেখানে বাস করতো, যারা ইলিয়ার বাসিন্দাদের মতো একই সভ্যতা, সংস্কৃতি বা ধর্মীয় পটভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। ইসাম সাখনিনি ইবন আল-মারজি আল- শাকদিসি থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, ইলিয়ার প্রথম বিজয়ের প্রাক্কালে ইলিয়াতে রোমানদের সংখ্যা প্রায় বারো হাজার এবং স্থানীয় লোকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার ছিলো।
এ কারণেই অঙ্গীকারনামায় রোমানদের দুটি গ্রুপের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। প্রথম দলটি দখলকারী রোমান সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত যারা রোমান কর্তৃত্ববাদী লুটেরাদের পক্ষে যুদ্ধ করছিলো। দ্বিতীয় দলটি রোমান দর্শকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো যারা ইলিয়া ভ্রমণে গিয়েছিল-ইবাদতের জন্য অথবা বিজয়ের সময় তাদের আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য।
এই শ্রেণিবিভাগটি অঙ্গীকারনামায় বেশ স্পষ্ট ছিলো। অঙ্গীকারনামাটি ইলিয়ার কাছ থেকে অত্যাচারীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয় এবং তারপরের নির্দেশটি দ্বিতীয় দল সম্পর্কে দেওয়া হয়েছে যাতে উভয় দলের মধ্যে বিভ্রান্ত তৈরি না হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিবিন্যাস না হলে, দলিলটি আমাদের সামনে এমনভাবে উপস্থিত হতো, যার ফলে ভূমিকার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতো।
পরবর্তীকালের বায়তুল মাকদিস
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডবাহিনী আল-আকসা-সহ পুরো সিরিয়া দখল করে নেয়। পবিত্র আল-আকসা দখল করে ক্রুসেডাররা সেখানে গণহত্যা চালায়। মসজিদগুলোর কোনটিকে গির্জা, কোনটিকে আস্তাবলে পরিণত করে।
প্রায় নব্বই বছর পর্যন্ত আল-আকসা মুসলমানদের বেদখল থাকে। পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা সুলতান গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবীকে বায়তুল মাকদিস পুনরুদ্ধারের মহাসৌভাগ্য দান করেন। ১১৮৭ সালে আল আকসায় পুনরায় মুসলমানের নামাজ পড়ার তাওফিক হয়। অথচ, তিনি কাউকে অযথা আঘাত করেনি। কিন্তু পূর্বের ঘটনাবলি থেকে তিনিও পারতেন প্রতিশোধ স্বরূপ ক্রুসেডারদের উপর গণহত্যা চালাতে!
এ সময় সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী বিজয়ের স্মৃতিস্মারক হিসেবে আল-আকসা কমপ্লেক্সে একটি মিম্বার নির্মাণ করেন। মামলুক সুলতানদের শাসনামলে এখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। আল-আকসা আবারও ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
ষোলো শতকের শুরুর দিকে আল-আকসা উসমানীয় খলিফাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। উসমানীয় শাসকরা মক্কা, মদীনায় অবস্থিত পবিত্র দুই মসজিদের মতোই আল-আকসার পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ তৎপর ছিলেন। আল-আকসার প্রতি সুলতান সুলাইমান আল-কানুনীর বিশেষ নির্দেশনা ছিলো। শেষ স্বাধীন উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদও ইহুদিদের নানামুখী কূট-ষড়যন্ত্র এবং প্রলোভনের মুখে আল-আকসা রক্ষায় অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও অনমনীয় ছিলেন।
সর্বশেষ উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্তির পর আল-আকসাবাসীর ভাগ্যে নেমে আসে নতুন দুর্যোগ। সে দুর্যোগ এখনও চলমান। এখন আল-আকসায় দুই রাকাত নামাজ পড়তেও প্রয়োজন হয় ইহুদি সেনাদের ছাড়পত্র।
১৯১৭ সালে বেলফোর ডেক্লারেশন ও ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের মাঝেই ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আল-আকসার নিয়ন্ত্রণ হারায় মুসলমানরা। এর আগে এটি জর্ডানের শসকদের কর্তৃত্বাধীন ছিলো। বর্তমানে আকসা কমপ্লেক্স ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মসজিদ পরিচালিত হয় জর্ডান-ফিলিস্তিনের একটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে। যদিও এর প্রবেশপথগুলোতে মোতায়েন করা থাকে ইহুদি দখলদার সেনাদের। তারা অনেক তল্লাশির পরে মুসল্লিদেরকে মসজিদে আকসায় প্রবেশ করতে দেয়।
এখান থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, আকসার প্রাঙ্গণ কেবল তখনই সুরক্ষিত থাকে, যখন তা থাকে মুসলমানদের করতলে। হযরত উমর (রা.)-এর সময় আর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহ.)-এর ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে এটাই উঠে আসে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন- অষ্টম অধ্যায়, মসজিদে আকসাকে মুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা, প্রফেসর ড. আব্দুল ফাত্তাহ আল-ওয়াইসি।


