বাইবেলের ইসরায়েল থেকে জায়নবাদী ইসরায়েল: ধর্ম, রাষ্ট্র ও আগ্রাসনের রাজনীতি

আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের ইতিহাসে জায়নবাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ নিয়েছে। একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলেও, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সামরিক শক্তি, ভূখণ্ড দখল ও সম্প্রসারণ ক্রমেই এর রাজনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে ওঠে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ধারাবাহিক যুদ্ধ, দখলদারিত্ব এবং সীমানা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টার সঙ্গে জায়নবাদের এই দখলদার চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই সম্প্রসারণবাদী রাজনীতিকে নৈতিক ও ঐতিহাসিক বৈধতা দেওয়ার জন্য বারবার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে বাইবেলের বিভিন্ন বর্ণনা, ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’র ধারণা এবং প্রাচীন ইসরায়েলের ভূখণ্ডসংক্রান্ত দাবির।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল তার বাজেটের ৫০ শতাংশেরও বেশি খরচ করে যুদ্ধের পেছনে। এরিয়েল শ্যারন জায়নবাদী আন্দোলনের যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তার উদ্দেশ্য কেবল ইসরায়েলকে রক্ষা করা নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করাই হলো এই সামরিকীকরণের আসল উদ্দেশ্য। এখন তারা নিজেদের সীমানা বাড়ানো, গণহত্যা এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে জায়েজ করার জন্য বাইবেলের উদ্ভৃতি ব্যবহার করছে।

এই প্রবণতা কিন্তু নতুন নয়। ১৯৩৭ সালে বেন-গুরিয়ন বাইবেলের কথা তুলেই ইসরায়েলের সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন। তার মতে, ইসরায়েলের সীমানায় পাঁচটি অঞ্চল থাকবে: লিতানি নদী পর্যন্ত দক্ষিণ লেবানন, দক্ষিণ সিরিয়া, ট্রান্সজর্ডান (বর্তমান জর্ডান), ফিলিস্তিন এবং সিনাই। উত্তরের সীমানা হবে সিরিয়ার হামা শহর পর্যন্ত। কারণ বাইবেলের গণনা পুস্তকে (Numbers ৩৪:১-৮) বর্ণিত কেনানের উত্তর সীমান্ত ‘হামাথ’ বলতে তিনি এই শহরটিকেই বুঝিয়েছেন।

নিজেদের স্বার্থে রাতারাতি “বাইবেল পণ্ডিত” বনে যাওয়া অন্যান্য জায়নবাদীরা আলেপ্পো শহরকে হামাথ হিসেবে দাবি করেছে। কেউ কেউ তো এই সীমানাকে সোজা তুরস্কে নিয়ে ঠেকিয়েছে! জ্যা পল সার্ত্রের আয়োজিত এক আলোচনা সভায়, শেলি পার্টির ঘনিষ্ঠ রাব্বি আদিন স্টেইনসালজ তো সাইপ্রাসের ওপরও ইহুদিদের “ইতিহাসিক অধিকার” দাবি করে বসেছিলেন!

১৯৫৬ সালে সুয়েজ আক্রমণের সময় বেন-গুরিয়ন দাবি করেছিলেন যে, সিনাই হলো “দাউদ ও সোলায়মানের রাজ্যের” অংশ। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বাধার কারণে এই “বাইবেলীয় ভূগোল” সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে এই ধারণাকে আবার সামনে আনা হয়।

একইভাবে, ‘প্রতিশ্রুত ভূমির’ সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে “মিশরের নদী” (গণনা পুস্তক ৩৪:৫) বলতে কখনো কখনো নীল নদকে বোঝানো হয়েছে (কিন্তু নীল নদের কোন শাখাকে, তা বলা হয়নি)। আবার কখনো সিনাইয়ের ওয়াদি আল-আরিশকে বোঝানো হয়েছে।

ইসরায়েল সংঘাত শুরুর আগে সেই আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই অস্পষ্ট সীমানার ধারণা ব্যবহার করে। আবার কোনো এলাকা দখলের পরও সেটাকে জায়েজ করার জন্য তারা ঠিক একই কাজ করে।

বর্তমান জায়নবাদী সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় দলের রাব্বিদের উগ্র চিন্তাভাবনাকে খুব কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব চিন্তা দিয়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ন্যায্যতা দেওয়া হচ্ছে। লেবানন আক্রমণের সময় বেগিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, ইহুদিদের পবিত্র সাপ্তাহিক দিন ‘সাবাথ’- এর সম্মানে শনিবার ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উড়বে না। এটি কোনো দুর্ঘটনা বা হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিলো না।

কট্টর ও উগ্রপন্থীদের এভাবেই আদর্শের মোড়কে উৎসাহ দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, লেবাননের দখল করা অঞ্চলগুলোকে “আশের গোত্রের ভূমি” বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি সেখানকার গণহত্যাগুলোকেও “পবিত্র উদ্দেশ্য” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

টায়ার ও সিডন শহরের ধ্বংসযজ্ঞ, বৈরুতের ওপর হামলা এবং সাবরা ও শাতিলার হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলো না। এগুলো ছিলো ১৯৪৮ সালে দেইর ইয়াসিনে বেগিনের ইরগুন বাহিনীর চালানো গণহত্যারই একটি ধারাবাহিকতা। একইভাবে এটি ছিলো কিবিয়া ও কাফর কাসেমের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এবং এরিয়েল শ্যারনের “ইউনিট ১০১”-এর রক্তাক্ত ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি।

এই সব হত্যাকাণ্ডকে একটি বিশেষ অর্থ ও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র আসলে বাইবেলের ইসরায়েলের মিশন বা পবিত্র কাজটাই নতুন করে করছে। অতীতে বাইবেলের ইসরায়েল যেভাবে কেনানীয়দের সমূলে ধ্বংস করেছিলো, ঠিক একইভাবে আজ আরবদেরও লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

বাইবেলে বলা হয়েছে: “কিন্তু তোমার খোদা তোমাকে উত্তরাধিকার হিসেবে এই জাতিগুলোর যে ভূমি দিয়েছেন, সেখানে কোনো জীবিত প্রাণকে বাঁচতে দিও না। তুমি তোমার খোদার আদেশ অনুসারে তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করবে-হিত্তীয়, অ্যামোরি, কেনানী, পেরিজি, হিভি এবং জেবুসি জাতিসমূহকে।”

বাইবেলে আরও বলা হয়েছে: “এখন যাও এবং আমালেকদের আঘাত করো; তাদের যা কিছু আছে, সব ধ্বংস করো এবং কাউকে রেহাই দিও না। পুরুষ, নারী, শিশু এবং স্তন্যপায়ী শিশু, এমনকি গরু, ভেড়া, উট এবং গাধাকেও হত্যা করো।”

বাইবেলের এই গণহত্যার বৈধতাকে পুঁজি করেই বর্তমান জায়নবাদীরাষ্ট্র ইসরায়েল তাদের ধারাবাহিক আগ্রাসন এবং জমি দখলকে জায়েজ করতে চায়। তারা নিজেদের বাইবেলের ইসরায়েলের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করে। এর ফলে প্রবাসী ইহুদিরা এবং অনেক খ্রিস্টান সহজেই এই অমানবিক কাজগুলো মেনে নেয়। তারা না বুঝেই এই জায়নবাদী মিথ বা কল্পকাহিনিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কারণ ক্যাথলিক চার্চের শিক্ষা এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের রবিবারের পাঠশালাগুলোতে এই মিথগুলোই প্রচার করা হয়। অথচ গত এক শতাব্দীর গবেষণায় (বিশেষ করে সাম্প্রতিক গবেষণায়) এই মিথগুলোর অসারতা পুরোপুরি প্রমাণিত হয়েছে।

এই মিথ বা কল্পকাহিনিগুলো মানুষকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তার একটি বড় প্রমাণ আমরা দেখতে পাই। ‘নেকুদাহ’ পত্রিকায় রাব্বি এলিয়েজার ওয়াল্ডম্যান একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধের নাম “কাজ শেষ করার শক্তি” (The power to finish the job)।

এই প্রবন্ধে তিনি এরিয়েল শ্যারন এবং বেগিনের সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পগুলোকে “ধর্মতাত্ত্বিক” সমর্থন যুগিয়েছিলেন। তিনি বাইবেলের বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, লেবানন দখল করার মাধ্যমে ইসরায়েল প্রমাণ করেছে তারা মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরেও একটি “নতুন ব্যবস্থা” তৈরি করতে সক্ষম। আর এটাই নাকি বিশ্বের জন্য “মুক্তির সূচনা”! তার মতে, যুদ্ধ কেবল আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং যুদ্ধ নিজেই একটি মহৎ মূল্যবোধ।

তিনি বলেন, এই “মুক্তির” পথে ইসরায়েল এখন ছয় দিনের যুদ্ধের চেয়েও অনেক উন্নত অবস্থানে আছে। তিনি দম্ভভরে বলেন, “এই যুদ্ধে আমরা আমাদের সশস্ত্র শক্তি দেখিয়েছি। আমরা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং পুরো বিশ্বেই শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বে আছি।”

ইসরায়েলি জাতীয়তাবাদ এবং সামরিক উন্মাদনা আজ যে পর্যায়ে পৌছেছে, তা দেখে একজন প্রবীণ জায়নবাদীর অতীত সতর্কতা খুব বেশি মনে পড়ে যায়। ১৯৫৮ সালে তিনি ষাট বছর আগে নিজের এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা স্মরণ করে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

মার্টিন বুবার ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। তিনি The Kingdom of God, The Knowledge of Man, On the Bible এবং Israel and the World-এর মতো বিখ্যাত বই লিখেছেন। ১৯৫৭ সালে জেরুজালেমে তিনি বেন-গুরিয়নকে একটি কড়া জবাব দিয়েছিলেন।

বেন-গুরিয়ন তখন বলেছিলেন, মসিহী বা ত্রাণকর্তার ধারণা এখনো বেঁচে আছে। আর মসিহ আসার আগ পর্যন্ত তারা এভাবেই টিকে থাকবেন।

এর জবাবে বুবার তাকে প্রশ্ন করেন : “কেবল নির্বাসিতদের ফিরে আসার এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ধারণার বাইরে কি মসিহী ধারণার আর কোনো রূপ বেঁচে আছে? যদি থেকেও থাকে, তবে এই প্রজন্মের কতজনের হৃদয়ে তা আছে?”

আসলে মানবজাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছাড়া মসিহী ধারণার কোনো মূল্য নেই। এই মুক্তির কাজে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা না থাকলে, তা আর ইসরায়েলের নবীদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মেলে না।

ইসরায়েলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বুবার সারা জীবন ধরে একটি বিষয়ের নিন্দা করে গেছেন। তা হলো-ধর্মীয় জায়নবাদের রাজনৈতিক এবং জাতীয়তাবাদী বিকৃতি।

তিনি বলেছিলেন : “আমরা ইসরায়েলের চেতনার কথা বলি। আমরা ধরে নিই যে, আমরা অন্য সব জাতির মতো নই। কিন্তু এই চেতনা যদি আমাদের কাছে কেবলই একটি কৃত্রিম রূপ হয়? যদি এটি আমাদের সম্মিলিত অহংকারের একটি সুন্দর অজুহাত হয়? আমরা শপথ করেছিলাম যে, সমগ্র বিশ্বজগতের খোদা ছাড়া আর কাউকে আমরা শাসক হিসেবে মানব না। কিন্তু এরপরও যদি আমাদের রাজাদের মূর্তি বানাতে হয়, তবে আমরাও নিশ্চিতভাবে অন্য সব জাতির মতোই। তখন আমরাও আসলে তাদের সাথে একই পাত্র থেকে মদ খাচ্ছি।”

জাতীয় আদর্শ এবং জাতীয়তাবাদের চেতনা ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ তা কেবল নিজেকেই একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে না ধরে। ইহুদিবাদ মানে শুধু একটি জাতি হওয়া নয়। তারা একটি বিশ্বাসী সম্প্রদায়। এই অনন্য সংযোগের কারণেই তারা একটি সাধারণ জাতির চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

রাজনৈতিক জায়নবাদের এই বিকৃতি আসলে ইহুদি ধর্ম থেকে আসেনি। এর শেকড় লুকিয়ে আছে উনবিংশ শতকের ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যে। আজ এটি একটি ধর্মের বদলে রীতিমতো ‘রাষ্ট্রপূজায়’ পরিণত হয়েছে। আর এই রাষ্ট্রটি নিজেকে “ইসরায়েল রাষ্ট্র” বলে দাবি করে।

এ বিষয়ে বুবার লিখেছেন: “১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইহুদি জাতীয়তাবাদের উখান ঘটে। এই রোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ইহুদি ধর্মকে তার শেকড় থেকে উপড়ে ফেলা। পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ থেকে আধুনিক ইহুদি জাতীয়তাবাদ অনেক কিছু ধার করেছে। সব ছদ্মবেশের আড়ালে সেই আদি লোভটাই লুকিয়ে আছে।”

এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। তাহলে ইসরায়েলের “নির্বাচিত জাতি” হওয়ার ধারণার সাথে এর সম্পর্ক কী?

বুবারের মতে, এই ধারণাটি আসলে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার নয়। বরং এটি হলো এক বিশাল দায়িত্ববোধ। অন্য জাতির সাথে তুলনা করে নিজেকে বড় ভাবা এর উদ্দেশ্য নয়। একটি বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্যই তাদের এই মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো।

নবীরা সেই দায়িত্বের কথা বলে গেছেন এবং তারা সবসময় সতর্কও করেছেন। তারা বলেছেন, “যদি তোমরা নির্বাচিত হওয়ার গর্ব করো, কিন্তু দায়িত্ব পালন না করো; যদি এই মর্যাদাকে শুধু একটি অলংকার বানিয়ে রাখো এবং খোদার আদেশ হিসেবে না মানো, তবে তোমরা এই মর্যাদা হারাবে।”

রাজনৈতিক জায়নবাদের এই “জাতীয়তাবাদী সংকট” সম্পর্কে বুবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন : “আমরা ইহুদি জাতীয়তাবাদকে একটি মূর্তি বানানোর ভুল থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা সফল হইনি।”

মার্টিন বুবার জায়নভূমির প্রতি গভীর ও আবেগময় ভালোবাসা অনুভব করতেন। ১৯৩৯ সালে মহাত্মা গান্ধীকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি এ কথা জানিয়েছিলেন।

গান্ধী তাকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, জায়নবাদীরা যে দেশে জন্মোছে, সেখানে তারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না কেন? কেন তারা অন্য জায়গায় একটি “জাতীয় আবাস” খুঁজছে?

এর উত্তরে বুবার বলেছিলেন যে, ইহুদি বিশ্বাস কেবল একটি সম্প্রদায় হিসেবে পূর্ণতা পায়। নিজেদের আইন মেনে এবং নিজস্ব ভূখণ্ডে বসবাস করার মাধ্যমেই তা সম্ভব।

তিনি লিখেছিলেন : “আমাদের কাছে আসল বিষয় কেবল ভূমির প্রতিশ্রুতি নয়। আসল বিষয় হলো সেই দাবি, যার পূর্ণতা এই ভূমির সাথে জড়িত। আর এই দেশে একটি স্বাধীন ইহুদি সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের মাধ্যমেই তা সম্ভব।”

গান্ধী তখন তাকে মনে করিয়ে দেন যে, ফিলিস্তিন আসলে আরবদের। তাদের ওপর ইহুদিদের আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়াটা হবে চরম অন্যায় এবং অমানবিক।

এর উত্তরে বুবার বলেছিলেন : “আমরা তাদের উচ্চেদ করতে চাই না; আমরা তাদের সাথেই বাস করতে চাই।”

১৯৫৮ সালে নিউইয়র্কে একটি বক্তৃতা দেন মার্টিন বুবার। সেখানে তিনি আরবদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে তার অবস্থান একদম পরিক্ষার করেন।

তার মতে, “ইহুদি জনগণের পুনর্জন্ম” কেবল তখনই সম্ভব, যখন তারা “নিকট-প্রাচ্যের একটি অংশ” হয়ে উঠবে। আর এই কাজটা গায়ের জোরে বা শক্তি প্রয়োগ করে করা যাবে না। তিনি বলেছিলেন, “ইতিহাসের পথ কেবল শক্তি দিয়েই নির্ধারিত হয়”-এই ধারণাটি ভয়ংকর ক্ষতিকর। এটি আসলে “মানবিকতার ওপর অমানবিকতার বিজয়” এবং “বিশ্বাসের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।”

বুবার বিশ্বাস করতেন, ইসরায়েলকে “পশ্চিমা বিশ্বের একটি উপনিবেশ” হিসেবে ভাবাটা সবচেয়ে বড় ভুল। ১৯৫৮ সালে তিনি তার পুরোনো একটি প্রস্তাবের কথা স্মরণ করেন। ১৯২১ সালে তিনি “নিকট-প্রাচ্য ফেডারেশনে আমাদের অংশগ্রহণের” একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

কিন্তু তখন দ্বি-জাতি রাষ্ট্রের প্রস্তাব বা নিকট-প্রাচ্য ফেডারেশনের ধারণা বাতিল করে দেওয়া হয়। এর বদলে ফিলিস্তিন ভাগের দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্তটি মেনে নেওয়া হয়। এর ফলে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ফাটল আরও বাড়ে এবং শুরু হয় যুদ্ধ।

বুবার অবশ্য পুরোপুরি অহিংস নীতির সমর্থক ছিলেন না। তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের অন্তিত্বকেও অস্বীকার করেননি। তবে প্রথম দুটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তিনি একটি জোরালো কথা বলেছিলেন।

তিনি বলেন, “কেবল যুদ্ধ থামিয়ে রাখাকেই ইহুদি ও আরবদের মধ্যে শান্তি বলা যায় না। একে অপরের সাথে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে যে শান্তি আসবে, সেটাই প্রকৃত শান্তি।”

তিনি আরও বলেছিলেন: “আজ হয়তো নিকট-প্রাচ্য ফেডারেশনে ইসরায়েলের যোগ দেওয়ার কথা ভাবলে অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু আগামীকাল যদি বিশ্বরাজনীতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন এই সম্ভাবনাটি একটি ইতিবাচক সমাধান হিসেবে সামনে আসতে পারে।”

আজকের দিনে কেউ এমন কথা বললে কী হতো? বেগিন বা তার অন্ধ অনুগত জায়নবাদীরা সাথে সাথেই তাকে “ইসরায়েল-বিরোধী” এবং “ইহুদিবিদ্বেষী” বলে গালি দিতো। অথচ এই বুবারই ছিলেন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেখানকার সবচেয়ে মহান ইহুদি দার্শনিক।

ইসরায়েলের স্কুলগুলোতে শিশুদের মগজধোলাই করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর রাব্বিরা (যাজক) সৈন্যদের উসকে দিচ্ছেন। আর সরকারি প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে পুরো দেশবাসীকে উগ্র জায়নবাদী আদর্শে গড়ে তোলা হচ্ছে।

তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো, এত কিছুর পরও ইহুদিদের সেই মহান ঐতিহ্য একেবারে হারিয়ে যায়নি। ছোট একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে তা এখনো টিকে আছে।

এর একটি বড় প্রমাণ হলো ১৯৮২ সালের ৮ জুন লেখা একটি চিঠি। তখন লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও গণহত্যা চলছিলো। সেই সময় তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেঞ্জামিন কোহেন তার বন্ধু পি. ভিদাল-ন্যাকুয়েটকে একটি হৃদয়স্পর্শী চিঠি লিখেছিলেন।

চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন: “আমি রেডিও শুনতে শুনতে আপনাকে এই চিঠি লিখছি। রেডিওতে বলা হচ্ছে যে, ‘আমরা’ নাকি লেবাননে ‘আমাদের লক্ষ্য অর্জনের’ কাজে ব্যস্ত। অর্থাৎ, গ্যালিলির বাসিন্দাদের জন্য ‘শান্তি’ নিশ্চিত করতে ব্যস্ত। হিটলারের মন্ত্রী গোয়েবলসের মিথ্যার মতো এই ডাহা মিথ্যা কথা আমাকে পাগল করে তুলেছে।

এটি আগের যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে বেশি নৃশংস এবং বর্বর যুদ্ধ। লন্ডনের হত্যাচেষ্টার সাথে বা গ্যালিলির নিরাপত্তার সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। ইবরাইম (আ.)-এর সন্তান ইহুদিরা তো নিজেরাই যুগে যুগে বহু নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। তারা কীভাবে এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে? তাহলে জায়নবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য বোধহয় এটাই: তারা ইহুদিদের ‘অ-ইহুদি’ করে দিয়েছে।

প্রিয় বন্ধু, যা কিছু সম্ভব করুন। বেগিন এবং শ্যারনদের দ্বৈত লক্ষ্য হলো-ফিলিস্তিনের জনগণকে পুরোপুরি নির্মূল করা এবং ইসরায়েলিদের মানবিক সত্তা মুছে ফেলা। কোনোভাবেই যেন তারা এই লক্ষ্যে সফল হতে না পারে।”

একজন ইসরায়েলি অধ্যাপকের এই নিন্দা অনেকটা বাইবেলের নবীদের নিন্দার মতোই কঠোর। যেমন নবী যিরমিয়াহ বলেছিলেন: “যারা আমার নামে তোমাদের মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী শোনায়, তারা ইসরায়েলে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে।” (যিরমিয়াহ ২৯:২১-২৩)।

অথবা নবী মীখার সেই কঠোর নিন্দার কথা ভাবুন: “শোনো, ইয়াকুবের পরিবারের প্রধান এবং ইসরায়েলের শাসকেরা! তোমরা ন্যায়বিচারকে ঘৃণা করো এবং সমস্ত সৎকর্মকে বিকৃত করো। তোমরা রক্ত দিয়ে জায়নকে এবং অন্যায় দিয়ে জেরুজালেমকে নির্মাণ করছ।” (মীখা ৩:৯-১০)

আজ যারা ইসরায়েলের এই “শাসকদের” নীতির সমালোচনা করে, যারা জায়নবাদী রাষ্ট্রের কাজের প্রতিবাদ করে-তাদের সবাইকেই “ইহুদিবিদ্বেষী” ট্যাগ দেওয়া হয়।

এই মাপকাঠিতে বিচার করলে তো আমোস, ইশাইয়া, মীখা, যিরমিয়াহ-সব মহান নবীই আজ “ইহুদিবিদ্বেষী” বলে বিবেচিত হতেন!

এর কারণ হলো, ইহুদিবাদের মহান ঐতিহ্য থেকে বর্তমান জায়নবাদী নেতারা কেবল ততটুকুই নেয়, যতটুকু দিয়ে তারা নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করতে পারে।

তারা আরব, ফিলিস্তিনি এবং লেবাননের মানুষের ওপর চালানো গণহত্যাকে জায়েজ করতে চায়। এর দলিল হিসেবে তারা জশুয়ার কেনানীয়দের গণহত্যার কাহিনি বেছে নিয়েছে। কিন্তু যিরমিয়াহ বা মীখার কঠোর নিন্দাকে তারা গ্রহণ করেনি। তারা এজরার বর্ণবাদী আইনকে সানন্দে গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইজেকিয়েল বা ইশাইয়ার সেই বিশ্বজনীন মসিহী দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা ছুড়ে ফেলেছে।

আসলে, তারা তাদের “সেই পূর্বপুরুষদেরই বেছে নিয়েছে, যারা নবীদের হত্যা করেছিলো।”

জায়নবাদী রাষ্ট্রের নীতির যেকোনো সমালোচনাকেই তারা “ইহুদিবিদ্বেষ” বলে চালিয়ে দেয়। এই প্রতারণার মাধ্যমে তারা আসলে প্রকৃত ইহুদিবিদ্বেষ সৃষ্টির এক মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

অগ্রাসন এবং রক্তপাতের নীতির সমালোচনা করলে ইহুদিবিদ্বেষ তৈরি হয় না। বরং এই নীতিগুলোকে অন্ধভাবে এবং বিনা শর্তে সমর্থন করলেই ইহুদিবিদ্বেষ উসকে ওঠে।

মেনাহেম বেগিন, এরিয়েল শ্যারন বা ইৎজাক শামির কেবল নিজেদের অত্যাচার দিয়েই ইহুদিবিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে না। এরা হলো দীর্ঘদিনের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী। লেবাননের গণহত্যাগুলো ছিলো এদের মতাদর্শ, কল্পকাহিনি এবং ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণনীতির এক অনিবার্য ফল। কিন্তু কেউই এই অপরাধীদের সাথে সাধারণ ইসরায়েলি জনগণকে এক করে দেখবে না। বিশেষ করে আমাদের যেসব সহনাগরিক ইহুদি ধর্ম বা ঐতিহ্য মেনে চলেন, তাদের সাথে এই অপরাধীদের মেলানোর কোনো সুযোগ নেই।

ইহুদিবিদ্বেষের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে কিছু তথাকথিত “প্রতিনিধিত্বশীল” সংগঠনের নেতারা। এরা ইসরায়েলের জায়নবাদী সরকারের অন্ধ দালালের মতো কাজ করে। তারা নির্লজ্জভাবে ইসরায়েলের সব অপরাধ আর মিথ্যার পক্ষে সাফাই গায়। তারা সরকারের স্লোগানগুলোকে লুফে নেয় এবং দাবি করে যে, তারা নাকি “সমগ্র ইহুদি সম্প্রদায়ের” পক্ষে কথা বলছে। অথচ এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ, এমনকি স্বয়ং ইসরায়েলের লাখ লাখ মানুষ এই অপরাধ ও অপরাধীদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।

নিঃসন্দেহে ধর্মীয় দলগুলোর উগ্র রাব্বিদের সমর্থনপুষ্ট হয়ে বেগিন এবং তার সহযোগীরা একটি “পবিত্র যুদ্ধ” ঘোষণা করেছে। তারা অত্যন্ত গোঁড়া মানসিকতা নিয়ে বাইবেলের ব্যাখ্যা করে। “নির্বাচিত জাতি” এবং “প্রতিশ্রুত ভূমি”-র মতো ধারণাগুলোকে তারা ভুলভাবে ব্যবহার করে। এভাবেই তারা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিভ্রান্ত করছে। তারা তথাকথিত এক ‘ঐশ্বরিক অধিকার’-এর দোহাই দিয়ে এই রক্তাক্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হত্যাযজ্ঞকে জায়েজ করার চেষ্টা করে।

ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রকৃত সেবা করতে হলে এই পবিত্র বিষয়গুলোর অপব্যবহার ঠেকাতে হবে। এর মানে হলো-ইহুদি ধর্ম এবং জায়নবাদের বর্ণবাদী চরমপন্থাকে কিছুতেই এক করে ফেলা যাবে না। ইহুদি ধর্ম হলো ইবরাহীম (আ.) ও মূসা (আ.)-এর বিশ্বাস এবং নবীদের মহান বিশ্বজনীনতার ধর্ম। অন্যদিকে, যারা হাদ্দাদের মতো লোকদের হয়ে কাজ করে এবং তেল আবিব সরকারের সব নোংরা কাজের দোসর হয়, সেই অত্যাচারীদের কোনোভাবেই “লেবানিজ খ্রিস্টান” বলা যাবে না।

আমাদের লক্ষ্য হলো এই বিভ্রান্তিগুলোর বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্টভাবে লড়াই করা। আমাদের উদ্দেশ্য হলো-ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং তার আগ্রাসী নীতি থেকে সাধারণ ইসরায়েলি জনগণকে আলাদা করা। কারণ সাধারণ জনগণ এখন ধীরে ধীরে তাদের শাসকদের প্রতারণা বুঝতে শুরু করেছে। আমাদের কাজ হলো ইহুদি ধর্ম এবং জায়নবাদী কল্পকাহিনির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা। কারণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই ইহুদি ধর্মকে বিকৃত করা হয়েছে। আমাদের আরেকটি কাজ হলো ইসরায়েলের বর্ণবাদী এজেন্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসকে প্রত্যাখ্যান করা। এরা পুরো পৃথিবীকে ‘জায়নবাদী’ এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষী’-এই দুই শিবিরে ভাগ করতে চায়। ঠিক যেমন আগের বর্ণবাদীরা পৃথিবীকে ‘ইহুদি’ ও ‘অ-ইহুদি’-এই দুই ভাগে ভাগ করেছিলো।

আমরা রাজনৈতিক জায়নবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করি, কারণ আমরা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। জায়নবাদের সমালোচনা করলে ইহুদিবিদ্বেষের জন্ম হয় না, বরং জায়নবাদ নিজেই এই বিদ্বেষের জন্ম দেয়।

আমরা সেই জায়নবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করি, যা নিজেদের একটি নোংরা নীতিকে পবিত্র বানানোর জন্য ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

ধর্মীয় জায়নবাদ ও রাজনৈতিক জায়নবাদ, ইহুদি ধর্ম ও জায়নবাদ এবং বাইবেলের ইসরায়েল ও বর্তমানের জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল-এসবের মধ্যে অনেক মারাত্মক বিভ্রান্তি রয়েছে। এই বিভ্রান্তিগুলো থেকে মুক্তি পেতেই আমরা রাজনৈতিক জায়নবাদকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো। আমরা এর মূলে থাকা সব পৌরাণিক এবং মিথ্যা বাইবেলীয় ধারণাগুলোকে খণ্ডন করবো। একই সাথে আমরা এর বাস্তব রাজনৈতিক ফলাফলগুলোও পর্যবেক্ষণ করবো। এর মধ্যে রয়েছে:

১. বর্ণবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অভ্যন্তরীণ নীতি।

২. একটি বৈদেশিক নীতি, যা অগ্রাসন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্যের “বাসযোগ্য স্থান” (living space) দখল করতে চায়। এর উদ্দেশ্য হলো একটি কল্পিত অভিবাসনের জন্য জায়গা তৈরি করা।

৩. এবং একটি রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি, যা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

 

অনুবাদঃ হিশাম আল নোমান

৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রজার গারাউডি

রজার গারাউডি

রজার গারাউডি (১৯১৩-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক, লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং পরবর্তীকালে ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। ফ্রান্সের মার্সেইয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও ইনসাফের প্রশ্ন তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষায় দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার আখলাকী সংকট, উপনিবেশবাদী মানসিকতা এবং সভ্যতার রূহানী শূন্যতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়ন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের আখলাক, সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবমুক্তির উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন। তার রচিত Promises of Islam, Islam and the Future of Humanity, The Founding Myths of Israeli Politics প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সভ্যতার সংকট, ধর্মের ভূমিকা এবং পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনায় তার লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণী ও আপসহীন। রজার গারাউডির জীবনব্যাপী সংগ্রাম ইউরোপীয় দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এক গভীর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক পাশ্চাত্যের আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প সভ্যতাগত বয়ানের আলোচনায় তিনি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
Picture of রজার গারাউডি

রজার গারাউডি

রজার গারাউডি (১৯১৩-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক, লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং পরবর্তীকালে ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। ফ্রান্সের মার্সেইয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও ইনসাফের প্রশ্ন তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষায় দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার আখলাকী সংকট, উপনিবেশবাদী মানসিকতা এবং সভ্যতার রূহানী শূন্যতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়ন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের আখলাক, সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবমুক্তির উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন। তার রচিত Promises of Islam, Islam and the Future of Humanity, The Founding Myths of Israeli Politics প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সভ্যতার সংকট, ধর্মের ভূমিকা এবং পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনায় তার লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণী ও আপসহীন। রজার গারাউডির জীবনব্যাপী সংগ্রাম ইউরোপীয় দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এক গভীর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক পাশ্চাত্যের আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প সভ্যতাগত বয়ানের আলোচনায় তিনি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top