জায়নবাদ ও পশ্চিমা সভ্যতা: আধিপত্যবাদী প্রকল্পের স্বরূপ উন্মোচনে আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি
ড. আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি সম্পর্কে
আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি (১৯৩৮–২০০৮) ছিলেন মিসরীয় চিন্তাবিদ, সাহিত্যসমালোচক এবং কিফায়া আন্দোলনের সাধারণ সমন্বয়ক। আধুনিক আরব বিশ্বের অন্যতম গভীর অনুসন্ধিৎসু ও সাহসী চিন্তাবিদদের একজন হিসেবে তার অবস্থান আজও গুরুত্বপূর্ণ। সুবিশাল Encyclopedia of Jews, Judaism and Zionism এবং গুরুত্বপূর্ণ Zionism and Western Civilization গ্রন্থগুলোকে তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। জায়নবাদ নিয়ে তার গবেষণা ছিলো অসাধারণ গভীরতার। তিনি জায়নবাদকে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখেননি, বরং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী যুক্তির একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। সাহিত্য, দর্শন, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও ইসলামী চিন্তাসহ বিস্তৃত ক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা তার দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিরোধের অর্থ শুধু আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, বরং আধিপত্যকে বৈধতা দেয় যে চিন্তাকাঠামো, তার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো।
২০০৮ সালে কায়রোয় তার মৃত্যু হয়। কিন্তু তার সমালোচনামুখর, নৈতিক এবং আপসহীন সেই কণ্ঠ, আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
পাঠ-টীকা
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন মানচিত্রের সীমানাগুলো আবারও বদলে যাচ্ছে। এই বদলে যাওয়া কেবল শক্তিপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে ঘটছে না; ঘটছে ন্যারেটিভ নির্মাণ ও সেসবকে স্বাভাবিকীকরণের মধ্যে দিয়েও। তবে এর বাইরেও আমরা গভীর এক উপনিবেশায়নের মুখোমুখি হচ্ছি, যার লক্ষ্য শুধু ভূখণ্ড দখলই নয়; একইসাথে চিন্তা, স্মৃতি ও পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করা।
এই প্রবন্ধে মিসরীয় চিন্তাবিদ ড. আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরির (১৯৩৮–২০০৮) বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সমালোচনামূলকভাবে বোঝাপড়ার চেষ্টা করা হয়েছে। Encyclopedia of Jews, Judaism and Zionism এর জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আধুনিকতার ভেতর প্রোথিত জায়নবাদকে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করার ক্ষেত্রেও তার কাজ গুরুত্বপূর্ণ।
এই লেখার ভিত্তি নিরেট গবেষণা, কোন ধরনের বিদ্বেষ নয়। এখানে রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে জায়নবাদ এবং ধর্ম ও পরিচয় হিসেবে ইহুদি ধর্মের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষসহ (antisemitism) সব ধরনের বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আল-মাসিরির দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে আমরা আধিপত্যের অন্তর্নিহিত যুক্তি, মানুষকে কার্যগত ভূমিকায় নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির জরুরি প্রয়োজন অনুসন্ধান করবো।
“জায়নবাদী চিন্তার মূল চরিত্র সম্পূর্ণরূপে পশ্চিমা। এর বিশ্বদৃষ্টি আধুনিক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শেরই আরেকটি রূপ। জায়নবাদীদের আত্মপক্ষসমর্থনের যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব যুক্তির মধ্য দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া এবং আগ্রাসী কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসব যুক্তিতে কিছু ইহুদি উপাদান থাকলেও, এগুলোর মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে পশ্চিমা চিন্তাধারার ভেতরেই। এই আত্মপক্ষসমর্থনের ভিত্তিতে রয়েছে নিজের এবং অপরের মধ্যে একটি অসম ধারণা। নিজের, অর্থাৎ যে ক্রিয়া সম্পাদন করে, এবং অপরের, অর্থাৎ যার ওপর সেই ক্রিয়া চালানো হয়। এই বিভাজন থেকেই অধিকারের এমন এক তত্ত্ব গড়ে উঠে, যেখানে কর্তার অধিকার স্বীকৃত হলেও অপরের কোনো অধিকার স্বীকার করা হয় না।”
আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি
চিন্তার মানচিত্র
সাইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে আরব বিশ্বকে ভাগ করে দেওয়ার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। অথচ আজও আমরা সেই বিভাজনের উত্তরাধিকার বহন করছি। তবে এই খণ্ডবিখণ্ডতা এখন আর শুধু ভৌগলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের স্মৃতি, পরিচয় ও চেতনার গভীরে। আরবরা আজ শুধু নিজের ভূমি থেকেই বাস্তুচ্যুত নয়, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে নিজের ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও অন্তর্জগৎ থেকেও।
শুধু ভূখণ্ডই নয়, নিরন্তর মুছে ফেলা হচ্ছে আত্মপরিচয়ের গোটা স্থাপত্যকেও। যে আরবের সামষ্টিক চেতনা একসময় স্মৃতি ও নৈতিক বোধের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলো, তাকে এখন সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। যারা একসময় আমাদের জয় করেছিলো, আজও নানা উপায়ে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে, তাদের চোখ দিয়েই আমাদের নিজেদের দেখতে শেখানো হচ্ছে। আমরা নিজেদের পরিমাপও করি তাদেরই নির্ধারিত মাপকাঠিতে।
এই রূপান্তর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটি শুধু যুদ্ধ কিংবা দখলদারত্বের পরিণতি নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি এক প্রকল্প, যা মূল্যবোধকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে, পরিভাষাগুলোর অর্থ ও তাৎপর্য বদলে দেয়, আত্মপরিচয় এবং ইতিহাসকে মুছে ফেলা হয় এবং স্থানীয় মানুষকে সক্রিয় কর্তার অবস্থান থেকে সরিয়ে নিছক পরিচালিত সত্তায় পরিণত করে। এই বাস্তবতার জবাবে আল-মাসিরি আরও বেশি বেশি স্লোগান তোলা কিংবা ক্রোধের প্রকাশকে সমাধান হিসেবে দেখেননি। তিনি বরং আহ্বান জানিয়েছিলেন আরও গভীর ও কঠিনতর এক মুক্তির সংগ্রামে, যে সংগ্রামের শুরু চিন্তার জগতকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে।
আল-মাসিরি ও জায়নবাদের যুক্তি
মিসরীয় চিন্তাবিদ ও সাহিত্যসমালোচক আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরির চোখে জায়নবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং পশ্চিমা আধুনিকতার অন্তিম যুক্তি। তার Zionism and Western Civilization গ্রন্থে তিনি জায়নবাদকে নিছক ইহুদি পুনর্জাগরণের আন্দোলন হিসেবে দেখেননি। বরং একে ব্যাখ্যা করেছেন ইউরোপীয় আধুনিকতার গর্ভে জন্ম নেওয়া এবং পরবর্তীকালে রপ্তানি হওয়া একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে। তার বিশ্লেষণে, এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বসতি-ঔপনিবেশিকতার এক ঘনীভূত রূপ, যার শিকড় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, নীৎশীয় দর্শন এবং সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার কাঠামোর গভীরে প্রোথিত।
আল-মাসিরির দৃষ্টিতে জায়নবাদ মানে বিশ্বাসে প্রত্যাবর্তন করা নয়, বরং বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি রূপ। এর লক্ষ্য অপবিত্র, অথচ সেই লক্ষ্যকে বৈধতা দিতে এটি আশ্রয় নেয় পবিত্রতার ভাষার। এর প্রাণশক্তি সিনাগগ থেকে আসে না, আসে বাজারব্যবস্থা ও সামরিক ঘাঁটি থেকে। এর চালিকাশক্তির ভিত্তি ঐশী অঙ্গীকার নয়, বরং কার্যকারিতা। কোনটি কাজে লাগে, কোনটি টিকে থাকার সুবিধা দেয়, সেটিই এখানে মুখ্য। এটি ধর্মের নান্দনিকতা, সমাজতন্ত্রের ভাষা এবং উদারবাদের কাঠামো- সবই আত্মসাৎ করে নেয়, তারপর একে একে প্রতিটির নৈতিক অন্তঃসার ছিনিয়ে নিয়ে শূন্য করে দেয়। শেষে যা অবশিষ্ট থাকে, তা হলো বাছাই, বিচ্ছিন্নকরণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার একটি প্রকল্প।
আহাদ হা’আম: পবিত্রতা থেকে ক্ষমতার ধর্মতত্ত্ব
জায়নবাদী চিন্তার দার্শনিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আল-মাসিরি আরও গভীরে প্রবেশ করেন। আহাদ হা’আমের মতো ব্যক্তিরা নীৎশের ‘অতিমানব’ এর ধারণাকে ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হা’আমের পুনর্ব্যাখ্যায় তালমুদের ধার্মিক মানুষ, অর্থাৎ ত্জাদ্দিক (Tzadik), এমন এক উচ্চতর ইচ্ছাশক্তির প্রতীকে পরিণত হন, যিনি সাধারণ নৈতিকতার বন্ধন থেকে মুক্ত। তিনি এক মহাজাগতিক কেন্দ্র। জনসাধারণের সেবা করা তার কাজ নয়, বরং নিজের একক নিয়তি পূরণ করাই তার লক্ষ্য।
এটি নিছক ব্যাখ্যা ছিলো না, ছিলো আমূল এক পরিবর্তন। হা’আম থিওডর হার্জেলকে মসীহসুলভ আলোয় উপস্থাপন করেন এবং একজন রাজনৈতিক কৌশলবিদকে মুক্তিদাতার মর্যাদা দেন। এর মধ্য দিয়ে জায়নবাদ সকল ধরনের ন্যায়বিচার এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আধিপত্যের মূল্যবোধে পুনর্গঠিত হয়ে হয়ে উঠে ক্ষমতার এক ধর্মতত্ত্ব। একসময় যা পবিত্র বলে বিবেচিত হতো, তার অর্থও বদলে গেলো। পবিত্রতার মানদণ্ড আর বিশ্বাস বা নৈতিকতা রইলো না, হয়ে উঠল উপযোগিতা।
কার্যগতকরণ: নিয়ন্ত্রণ থেকে নির্মূলকরণ
আল-মাসিরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “কার্যগতকরণ” (functionalization)। এর মধ্য দিয়ে মানুষের নিজস্ব মূল্য ও স্বাতন্ত্র্য মুছে দিয়ে তাকে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করা হয়। জায়নবাদী দৃষ্টিতে ইহুদি তখন আর কোনো আধ্যাত্মিক সত্তা নয়, বরং একটি সম্পদ: একটি দেহ, একজন বসতি স্থাপনকারী কিংবা সীমান্তের একজন প্রহরী। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি হয়ে ওঠে “অপ্রয়োজনীয় অপর”। এমন এক উপস্থিতি, যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, বিচ্ছিন্ন করতে হবে, মুছে ফেলতে হবে কিংবা প্রয়োজন হলে কাজে লাগাতে হবে।
আল-মাসিরি ওয়ারশ গেটো ও পশ্চিম তীরের মধ্যে এক অস্বস্তিকর সাদৃশ্য তুলে ধরেন। উভয়কেই স্বায়ত্তশাসিত বলে দেখানো হলেও, তার মতে, বাস্তবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ ও অবমাননার পরিসরে আবদ্ধ। এই দৃষ্টিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কোনো সার্বভৌম সরকার নয়, বরং আবদ্ধ জনপদ পরিচালনার একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যা বাইরের শক্তির অধীনে কাজ করে। আপাতদৃষ্টিতে যা সার্বভৌমত্ব, তা আসলে নির্ধারিত একটি ভূমিকা; আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যে চেহারা দেখা যায়, তা মূলত ঠিকাদারি ক্ষমতা অর্থাৎ অন্যের হয়ে শাসন পরিচালনার ক্ষমতা।
মূলগতভাবেই ক্রুসেডার রাষ্ট্র
আল-মাসিরির মতে, জায়নবাদ নিজের প্রকৃতিকে অস্বীকার করে না, বরং তার মধ্য দিয়েই নিজের পরিচয় নিশ্চিত করে। দায়ান, রবিন ও আভনেরির মতো ইজরায়েলি নেতারা ইজরায়েলকে ক্রুসেডার রাজ্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের তুলনায় ইজরায়েল প্রাচ্যের মাটিতে গড়ে ওঠা পশ্চিমা সভ্যতার অগ্রবর্তী ঘাঁটি, যার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরন্তর শক্তিপ্রয়োগ ও বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। ক্রুসেডারদের মতো জায়নবাদও এই ভূখণ্ডের সাথে সহজাত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। কেবল শক্তি দিয়ে তা ধরে রাখতে পারে।
এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় মানুষকে নতুন পরিচয়ে শ্রেণিবদ্ধ করতে হয়। প্রতিবেশী হয়ে ওঠে হুমকি, আরব হয়ে উঠে নতুন “অপর”: পরজীবী, সহিংস এবং পরিত্যাজ্য। আল-মাসিরির বিশ্লেষণে, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এই ‘অপর’-এর ধারণা এক জনগোষ্ঠী থেকে অন্য জনগোষ্ঠীতে স্থানান্তরিত হয়েছে: মুসলিম থেকে ইহুদি, ইহুদি থেকে আরব। ‘অপর’ কখনও বিলুপ্ত হয় না। বরং নির্বাচিত ‘নিজ’-এর বিপরীতে শত্রুর প্রয়োজন মেটাতে তার ভূমিকা কোনও না কোন জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যাকে অনায়াসে বিসর্জন দেওয়া যায়।
আধুনিক গণহত্যার যুক্তি
গণহত্যার মত ব্যাপারগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে তুলে ধরা হলেও, তা আসলে সভ্যতাগত ধারাবাহিকতার অংশ। আল-মাসিরির মতে, গণহত্যা আধুনিকতার কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং তারই ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর একটি। আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসীদের নিশ্চিহ্নকরণ, বেলজীয় কঙ্গোতে ঔপনিবেশিক নৃশংসতা, ফরাসি আলজেরিয়া ও ভিয়েতনামে সংঘটিত সহিংসতা, সবই এমন এক বিশ্বব্যবস্থার চেহারা তুলে ধরে, যেখানে গোটা জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যায়, নিঃশেষ করে ফেলা যায়, তারপর পরিত্যাগ করা যায়।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, হিটলার আমেরিকান মডেলের প্রশংসা করেছিলো। সে পশ্চিমা যুক্তি থেকে বিচ্যুত হয়নি, সেই যুক্তিকেই ইউরোপের ভেতরে প্রয়োগ করেছিলো। একইভাবে জায়নবাদও পশ্চিমা অপরাধের প্রত্যাখ্যান নয়, বরং তারই ধারাবাহিকতা। কেবল আরও পরিশীলিত রূপে এবং নতুন নামে সামনে এসেছে। এটি ইহুদিদের গেটো থেকে মুক্ত করে না। বরং সাম্রাজ্যের স্বার্থে গেটোকেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রূপ দেয়।
মুক্তি নয়, সাম্রাজ্যবাদের সেবা
সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জায়নবাদ নিজেদের সম্পর্ক কখনোই গোপন করেনি। ম্যাক্স নর্ডাউ ইহুদি রাষ্ট্রকে প্রাচ্যে ব্রিটেনের কৌশলগত প্রহরী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। চাইম ওয়েইজম্যান একে অভিহিত করেছিলেন “এশীয় বেলজিয়াম” নামে, যার কাজ হবে পশ্চিমা বাণিজ্য ও কৌশলগত পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। হার্জেলও লিখেছিলেন, পশ্চিমের স্বার্থ রক্ষায় ইহুদিরা “প্রথম প্রতিরক্ষা-সারিতে” অবস্থান করবে। এগুলো স্বাধীনতার ঘোষণা ছিলো না। বরং ছিলো কার্যগত ভূমিকার ঘোষণা।
সাম্রাজ্যবাদের আয়না: ওভাল অফিস, দক্ষিণ আফ্রিকা ও গাজা
এই যুক্তি কেবল ইতিহাসের পাতায় আটকে নেই; সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। ওভাল অফিসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে বৈঠকের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে কয়েকটি ভিডিও দেখিয়ে কথিত ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’র মিথ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্প এক্ষেত্রে তথ্য উপেক্ষা করে, বাস্তবতার সূক্ষ্মতা অস্বীকার করে এবং শ্বেতাঙ্গ ভূমিমালিকদের ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অথচ, গাজার প্রসঙ্গে কথা উঠলে তার দৃষ্টিতে কোনো ভুক্তভোগীই নেই, কোনো শিশু নেই, কোনো মুখ নেই, কোনো জানাজা নেই; আছে শুধু ধ্বংসস্তূপ।
ট্রাম্পের এই দৃষ্টিভঙ্গি সাম্রাজ্যবাদী যুক্তিরই প্রতিফলন। এখানে শ্বেতাঙ্গরা সবসময় হুমকির মুখে, অথচ অ-পশ্চিমা মানুষের যন্ত্রণা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এই নৈতিক জগতে ফিলিস্তিনিরা কোন স্বতন্ত্র সত্তা নয়, তারা কেবল লক্ষ্যবস্তু। তাদের মানবিকতা এখানে দৃশ্যমানও নয়, উপযোগীও নয়।
ফিলিস্তিনীকরণ: মানুষ থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা
মানুষকে তার স্বতন্ত্র পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিছক একটি কার্য, সমস্যা কিংবা পরিসংখ্যানে নামিয়ে আনার একটি নাম আছে, সেটি হলো ফিলিস্তিনীকরণ (Palestinization)।
ফিলিস্তিনীকরণ শুধু ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষকে যখন তার অধিকার দিয়ে নয়, বরং সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়, তখনই এই প্রক্রিয়া কাজ করতে শুরু করে। গাজায় এর সবচেয়ে নির্মম রূপ দেখা যায়: একটি জনগোষ্ঠীকে অবরুদ্ধ রাখা হচ্ছে, বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে, এবং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তাদের প্রোফাইল তৈরি করে তাদের উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। ফ্রান্সের শহরতলিতেও এর উপস্থিতি রয়েছে, যেখানে উত্তর আফ্রিকীয় তরুণদের সঙ্গে এমনভাবে পুলিশি আচরণ করা হয়, যেন তারা বিদ্রোহী। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তেও এটি দেখা যায়, যেখানে অভিবাসীদেরকে পরিবার বা স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; দেখা হয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এমন এক জনসমষ্টি হিসেবে। লেবানন ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরগুলোতেও আমরা একই অবস্থা দেখতে, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বেড়ে উঠছে।
ফিলিস্তিনীকরণ হলো জায়নবাদী যুক্তির বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া, উদ্বৃত্ত মানুষের জীবনকে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ব্যবস্থাপনার এক প্রক্রিয়া। ক্ষমতা যখন নৈতিকতার তোয়াক্কা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না, তখন মানুষকে অধিকারসম্পন্ন সত্তা হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখার এই কৌশলই হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনীকরণ।
প্রকৃত সংগ্রাম: মানসকে পুনরুদ্ধার
শেষ পর্যন্ত আল-মাসিরির সমালোচনা শুধু জায়নবাদ নিয়ে নয়। এটি আমাদের নিয়েও- কীভাবে আমাদের স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়, কীভাবে আমাদেরকে ক্ষমতার সেবায় নিয়োজিত করা হয়, আর কীভাবে সাম্রাজ্যবাদ যতটুকু দেখতে দেয়, আমরা তার বাইরে আর কিছু দেখতে শিখি না।
তাই তিনি আমাদের শুধু দখলদারত্ব নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়েরও প্রতিরোধ করতে বলেছেন। সেই প্রতিরোধ শুধু ভূমি রক্ষার লড়াই নয়, আমাদের কল্পনাশক্তি রক্ষারও লড়াই। ক্ষমতার কোডের বাইরে দাঁড়িয়ে কোনো কিছুর নাম দেওয়ার, অনুভব করার এবং স্মরণ করার ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার লড়াই।
তাই এখন আর শুধু এই প্রশ্ন নয় যে, আমরা কীভাবে দখলদারত্ব প্রতিরোধ করবো? প্রশ্ন হলো, কে মানুষ এবং কে নয়, তা নির্ধারণ করে যে দৃষ্টিকাঠামো, আমরা কি সেটি ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবো? আমরা কি এই সংগ্রামকে শুধু ভূমি নিয়ে লড়াই হিসেবেই নয়, বরং অধীনতার স্থাপত্য থেকে চিন্তাজগতকে মুক্ত করার সংগ্রাম হিসেবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারবো?
লেখকের নোট: ফিলিস্তিনীকরণ ধারণা প্রসঙ্গে
‘ফিলিস্তিনীকরণ’ ধারণাটি আমি আমার ডক্টরাল গবেষণায় গড়ে তুলেছি, খণ্ডিত পরিচয় ও কাঠামোগত অস্বীকৃতির একটি বিশেষ অবস্থা বোঝাতে। এটি শুধু দখলদারত্বের অধীনে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাপনের বাস্তবতাকে নির্দেশ করে না। বরং এটি এমন একটি বিস্তৃত সভ্যতাগত প্রক্রিয়াকেও বোঝায়, যার মাধ্যমে ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীকে পরিচালনাযোগ্য বস্তুতে নামিয়ে আনা হয়, তাদের রাজনৈতিক কর্তা-সত্তা (political subjectivity) কেড়ে নেওয়া হয়, জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার প্রয়োগে তাদের খণ্ডিত করে তোলা হয়। একপর্যায়ে তারা কার্যগতভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়।
ফিলিস্তিনীকরণ হলো মানুষকে পরিত্যাজ্য সত্তায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া। মানুষকে যখন অধিকারসম্পন্ন সত্তা হিসেবে না দেখে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা, উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠী কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখনই এই প্রক্রিয়া কাজ করে। ধারণাটি ফিলিস্তিনের স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত হলেও এটি এমন এক ধারণা হাজির করে, যা এখন সীমান্ত পেরিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের ব্যখ্যাতেও বিস্তৃত হয়েছে।
এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মানে শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করা নয়, বরং যেখানেই মানুষের পূর্ণ মর্যাদা অস্বীকার করা হয়, সেখানেই সেই মর্যাদা পুনরুদ্ধার করার লড়াই।
অনুবাদ: সাব্বির হাসান সিফাত



