বৃহত্তর ইসরায়েলঃ জায়নবাদী সম্প্রসারণবাদের রাজনৈতিক যুক্তি

“আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ‘বৃহত্তর ফিলিস্তিন কর্মসূচি’র দিকে ফিরে আসুন। বাসেল কর্মসূচিতে অবশ্যই ‘বৃহৎ ফিলিস্তিন’ বা ‘ফিলিস্তিন ও তার প্রতিবেশী ভূখণ্ড’ শব্দগুলো থাকতে হবে, নতুবা এটি অর্থহীন হয়ে পড়বে। কারণ মাত্র ২৫,০০০ বর্গকিলোমিটার জায়গায় আপনি এক কোটি ইহুদিকে জায়গা দিতে পারবেন না।”

১৮৯৯ সালের ২৯ অক্টোবর থিওডোর হার্জেলকে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও উপদেষ্টা ডেভিড ট্রিটশ এই চিঠিটি লিখেছিলেন। চিঠিটি জায়নবাদী পররাষ্ট্রনীতির অভ্যন্তরীণ যুক্তিকে একেবারে নিখুঁত স্পষ্টতার সাথে প্রকাশ করে।

জায়নবাদের মূলনীতিই হলো-ইহুদি ধর্মকে আর কেবল একটি ধর্ম হিসেবে না দেখে একটি জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা; বিশ্বের সমস্ত ইহুদিকে সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত মনে করা; এবং তাদের সেই রাষ্ট্রে নিয়ে আসার জন্য সংগ্রাম করা। এই নীতিটি অনিবার্যভাবেই জায়নবাদী রাষ্ট্রকে “বাসযোগ্য স্থান” (হিটলারের ভাষায় ‘লেবেনস্রাউম’ বা Lebensraum) দখলের জন্য একের পর এক সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং দখলের পুরো ইতিহাস রাজনৈতিক জায়নবাদের এই অমোঘ যুক্তি মেনেই চলেছে।

ইসরায়েলের এই সামরিক ও সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনের সাথে নাৎসিদের একমাত্র পার্থক্য হলো- ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এর সাফাই গাইতে গিয়ে যে মতাদর্শ ও মিথলজি ব্যবহার করা হয়, সেখানে কেবল ‘জাতিগত মিথ’-এর ওপর জোর দেওয়া হয় না। বরং তার চেয়েও বেশি জোর দেওয়া হয় ‘প্রতিশ্রুতি’র এক ছদ্ম-বাইবেলীয় মিথের ওপর। আর এই প্রতিশ্রুতিকে ব্যাখ্যা করা হয় সম্পূর্ণ উপজাতীয় অর্থে-মসিহী ‘ঈশ্বরের রাজত্বে’র আধ্যাত্মিক অর্থে নয়, বরং ‘ভূমি’র বস্তুবাদী ও আঞ্চলিক অর্থে।

আদিপুস্তকের (১৫:১৮) সেই শ্লোকটি-“তোমার বংশধরদের আমি এই ভূমি দিয়েছি, মিশরের নদী থেকে সেই মহান নদী, ইউফ্রেটিস পর্যন্ত”-একে দেখা হয় একটি রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মসূচি হিসেবে। যেন এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং জমির মালিকানার দলিল!

যেন ইবরাহীম (আ.)-এর ‘বীজ’ বা বংশধরদের সংজ্ঞা বিশ্বাসের ঐক্যের ভিত্তিতে নয়, বরং রক্তের ধারাবাহিকতা দিয়ে নির্ধারিত হবে!

যেন এই ‘বীজ’ থেকে (এমনকি রক্তমাংসের অর্থে ধরলেও) আরবদের বাদ দেওয়া হবে-যারা আদিপুস্তক অনুসারেই ইবরাহীম (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর। পাশাপাশি মানবজাতির সেই বিশাল অংশকেও বাদ দেওয়া হবে, যারা ইবরাহীম (আ.)-এর কোরবানিকে তাদের বিশ্বাসের আদি প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে।

তাছাড়া, যেন আমাদের আজকের ইহুদিদের সেই কাল্পনিক বংশতালিকাকেই সত্য বলে মেনে নিতে হবে যে তারা প্রাচীন কেনানবাসীদের বংশধর! অথচ জীববিজ্ঞানের অযৌক্তিক ভিত্তি এবং ইতিহাসের সাক্ষ্যমতে, আজকের ইহুদিরা-ক্রিমিয়া থেকে ইয়েমেন এবং ইথিওপিয়া থেকে স্পেন পর্যন্ত-অন্য সবার মতোই বহু ভিন্ন ভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে উদ্ভূত হয়েছে। তাই তাদের সেই ‘পূর্বপুরুষদের’ উত্তরাধিকার দাবি করার কোনো অধিকার নেই, যারা আসলে তাদের পূর্বপুরুষই নন।

এর মাধ্যমে তারা স্থানীয় মুসলিম ও খ্রিস্টান আরব জনগোষ্ঠীকে বাদ দিতে চায়-যারা পোলিশ, রাশিয়ান, রোমানিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, ইয়েমেনি বা উত্তর আফ্রিকান অভিবাসীদের চেয়ে দাউদ (আ.)-এর রাজ্যের বাসিন্দাদের জাতিগত ও আঞ্চলিক উত্তরাধিকার বহন করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি নিশ্চিত দাবিদার। এই অভিবাসীদের কেবল জঘন্যতম নাৎসি প্রোপাগান্ডাই শারীরিক (মাথার খুলি বা নাকের গঠন) বা মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি একক ‘ইউনিট’ বা জাতি হিসেবে দেখাতে পারে।

তবুও তাদের কথিত পূর্বপুরুষদের প্রতিশ্রুত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর এই মিথ এবং বাইবেলের একপেশে পাঠের মাধ্যমেই ইসরায়েলি নেতারা তাদের সম্প্রসারণবাদী নীতিকে অবিরত ‘ন্যায্যতা’ দিয়ে চলেছে। এই সব রূপকথার নামেই তারা আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে।

১৯৬৭ সালের আগস্টে মোশে দায়ান বলেছিলেন: “আপনার যদি ‘বাইবেলের কিতাব’ থাকে এবং ‘কিতাবি জাতি’ থাকে, তবে আপনার বিচারক ও কুলপিতাদের ভূমি জেরুজালেম, হেবরন, জেরিকো এবং এর আশেপাশের সেই বাইবেলীয় ভূমিও থাকতে হবে।”

কিন্তু এই ধরনের ‘নীতিমালা’র ভিত্তিতে সীমান্তগুলো সম্প্রসারণযোগ্য হয়ে পড়ে: “উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার কথা ধরুন। এতে কোনো আঞ্চলিক সীমার উল্লেখ ছিলো না। আমরাও আমাদের রাষ্ট্রের সীমানা ঘোষণা করতে বাধ্য নই।”

বেন-গুরিয়নের এই আমেরিকান ‘নজির’ টানাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সেখানে সত্যিই পুরো এক শতাব্দী ধরে সীমান্ত পশ্চিম দিকে সরতে সরতে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছেছিলো। আর এই প্রক্রিয়ায় আগন্তুকরা যেসব জমি চেয়েছিলো, সেখান থেকে রেড ইন্ডিয়ানদের তাড়ানোর জন্য তাদের ওপর ক্রমাগত নিপীড়ন চালানো হয়েছিলো।

২ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রজার গারাউডি

রজার গারাউডি

রজার গারাউডি (১৯১৩-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক, লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং পরবর্তীকালে ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। ফ্রান্সের মার্সেইয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষায় দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার নৈতিক সংকট, উপনিবেশবাদী মানসিকতা এবং সভ্যতার আত্মিক শূন্যতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দীর্ঘ বৌদ্ধিক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়ন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের নৈতিকতা, সভ্যতাগত ভারসাম্য এবং মানবমুক্তির সম্ভাবনাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন। তার রচিত Promises of Islam, Islam and the Future of Humanity, The Founding Myths of Israeli Politics প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সভ্যতার সংকট, ধর্মের ভূমিকা এবং পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনায় তার লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণী ও আপসহীন। রজার গারাউডির দীর্ঘ বৌদ্ধিক জীবন ইউরোপীয় দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এক গভীর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক পাশ্চাত্যের আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প সভ্যতাগত কল্পনার আলোচনায় তিনি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
Picture of রজার গারাউডি

রজার গারাউডি

রজার গারাউডি (১৯১৩-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক, লেখক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং পরবর্তীকালে ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ। ফ্রান্সের মার্সেইয়ে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষায় দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার নৈতিক সংকট, উপনিবেশবাদী মানসিকতা এবং সভ্যতার আত্মিক শূন্যতা তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দীর্ঘ বৌদ্ধিক অনুসন্ধান, ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়ন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের নৈতিকতা, সভ্যতাগত ভারসাম্য এবং মানবমুক্তির সম্ভাবনাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন। তার রচিত Promises of Islam, Islam and the Future of Humanity, The Founding Myths of Israeli Politics প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সভ্যতার সংকট, ধর্মের ভূমিকা এবং পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনায় তার লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণী ও আপসহীন। রজার গারাউডির দীর্ঘ বৌদ্ধিক জীবন ইউরোপীয় দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এক গভীর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক পাশ্চাত্যের আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প সভ্যতাগত কল্পনার আলোচনায় তিনি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top