বায়োফিলিক ডিজাইন: নতুন আবিষ্কার নাকি প্রাচীন ধারণার আধুনিক রূপ?

বর্তমান স্থাপত্যচর্চায় “বায়োফিলিক ডিজাইন (Biophilic Design)” একটি বহুল আলোচিত ধারণা। ১৯৮০-এর দশকে জীববিজ্ঞানী ই. ও. উইলসন (E. O. Wilson) এর মাধ্যমে এই আইডিয়া পরিচিতি লাভ করে।  এর মৌলিক প্রতিপাদ্য খুবই সহজ-মানুষের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি সহজাত প্রবণতা বিদ্যমান, আর আমাদের নির্মিত পরিবেশের নকশা এমন হওয়া উচিত যা এই সম্পর্ককে বরং লালন করে, বিচ্ছিন্ন নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বায়োফিলিক ডিজাইন এক ধরনের জনপ্রিয় ধারায় পরিণত হয়েছে। স্থপতিরা এটা নিয়ে  আলোচনা করছেন, ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা একে কেন্দ্র করে তাদের কাজের পোর্টফোলিও সাজাচ্ছেন আর রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা এটিকে ব্যবহার করছেন বিপণনের উপকরণ হিসেবে। এর মূল নীতিমালাও এখন সুপ্রতিষ্ঠিত—প্রাকৃতিক আলোর সর্বোত্তম ব্যবহার, গাছপালাকে ডিজাইনের অংশ হিসেবে সংযোজন, স্থানীয় ও প্রাকৃতিক নির্মাণ উপকরণের প্রয়োগ, বাইরের প্রকৃতির সাথে দৃশ্যমান সংযোগ তৈরি এবং অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত বায়ুপ্রবাহের সুযোগ নিশ্চিতকরণ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঐতিহাসিকভাবে এই আইডিয়া মোটেও নতুন নয়।

আপনি যদি Alhambra-এর প্রাঙ্গণে হাঁটেন, মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী রিয়াদ বা আন্দালুসীয় ভিলার অঙ্গন অতিক্রম করেন, কিংবা Generalife-এর উদ্যানসমূহে বিচরণ করেন, তাহলে এমন স্থাপত্যের মধ্য দিয়েই চলবেন, যা বায়োফিলিক ডিজাইনের ধারণাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে থেকেই উপলব্ধি করেছিল। আর এগুলো কেবল তাত্ত্বিক নীতিমালা ছিল না; বরং স্থাপত্য কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত—সেই সম্পর্কে মৌলিক ধারণার অংশ ছিল।

মাগরেব এবং আন্দালুসিয়ার মানুষ একে ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’ (প্রকৃতিবান্ধব স্থাপত্য) নামে অভিহিত করেননি; তারা একে স্রেফ ‘জীবনযাপন’ বলতেন।

চিত্রঃ মারাকেশের একটি ‘রিয়াদ’

 

বায়োফিলিক ডিজাইন আসলে কী বোঝায়?

আরও ঐতিহাসিক উদাহরণ আলোচনার আগে বায়োফিলিক ডিজাইন আসলে কী, তা স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন; কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধারণাটি ভুলভাবে বোঝা হয়।

“বায়োফিলিক ডিজাইন মানে মানে ঘরে একটি শৌখিন গাছ রাখা কিংবা দেয়ালে গাছের ছবি ঝুলিয়ে দেওয়া নয়। এটিকে স্রেফ ঘরের ‘সাজসজ্জা’  বা ‘ডেকোরেশন’ হিসেবে না দেখে, জীবনের সাথে প্রকৃতির  সংযোগ বা ‘ইন্টিগ্রেশন’ হিসেবে ভাবা উচিত।”

প্রকৃত ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’ (প্রকৃতি-বান্ধব স্থাপত্যশৈলী) বলতে চারপাশের পরিবেশ এমনভাবে গড়ে তোলাকে বোঝায়, যেখানে প্রকৃতি আপনার জীবন যাপনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হয়ে ওঠে—এমন কিছু নয় যা আপনি কেবল মাঝেমধ্যে উপভোগ করবেন। অর্থাৎ এমন আলোর ব্যবস্থা; যা দিনের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়;  বায়ুর এমন প্রবাহ যা মুক্তভাবে সম্পূর্ণ পরিসরে বয়ে বেড়ায়; এমনসব উপাদানের ব্যবহার যা সময়ের সাথে সাথে পরিপক্ব হয় ও প্রাণবন্ত থাকে; এমন সব উদ্ভিদ—যা ঋতুর আবর্তনে বাড়ে ও রূপ পরিবর্তন করে; এবং পানির এমন স্পর্শ যা পরিবেশকে শীতল ও আর্দ্র রাখে এবং ছন্দময় ধ্বনির মাধ্যমে সেই স্থানের অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে। এটি এমন এক স্থাপত্যশৈলী যা প্রকৃতিকে কেবল বাহ্যিক অনুষঙ্গ বা অলংকার হিসেবে নয়, বরং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করে।

আর ঠিক এই পদ্ধতিই নিখুঁতভাবে অনুকরণ করা হয়েছিল ‘মুরিশ স্থাপত্যশৈলীতে’ (Moorish architecture)।

 

অন্তঃপ্রাঙ্গণ উদ্যান

মুরিশ স্থাপত্যে প্রাঙ্গণ বা উঠানকে কেবল বাইরের খোলা স্থান হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিই ভবনের প্রাণকেন্দ্র। কক্ষ, বারান্দা, যাতায়াতের পথ, আলো ও বাতাস—সবকিছুই এই প্রাঙ্গণকে ঘিরে বিন্যস্ত হয় এবং একে কেন্দ্র করেই  সম্পূর্ণ স্থাপত্যে গড়ে ওঠে।

ফেজ কিংবা মারাকেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো ‘রিয়াদ’-এর (ঐতিহ্যবাহী মরক্কোন বাড়ি) প্রাঙ্গণে পা রাখলেই চারপাশের সবুজে আপনি ঘেরাও হয়ে যাবেন। কমলালেবু গাছ, জুঁইফুল এবং নানা ধরনের লতানো উদ্ভিদ সেই পরিবেশকে সজীব করে তোলে। এই গাছগুলো কিন্তু নান্দনিকতা বাড়াতে কোনো সুনির্দিষ্ট মাপে টবে সাজিয়ে রাখা হয়নি; বরং সরাসরি মাটিতে রোপণ করা হয়েছে। তারা গভীরভাবে শিকড় গেড়ে স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রাঙ্গণটি প্রথমত একটি বাগান, আর দ্বিতীয়ত একটি স্থাপত্যিক পরিসর।

চিত্র: মারাকেশের একটি ‘রিয়াদ’ (ঐতিহ্যবাহী মরক্কোন বাড়ি)

 

একই ধারণার (concept) প্রতিফলন দেখা যায় আলহামব্রাতেও। কোর্ট অব দ্য লায়ন্স এবং কোর্ট অব দ্য মার্টলস তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই প্রাঙ্গণগুলো ছায়া তৈরি করে এবং ভেতরের গরম বাতাসকে উপরে উঠে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। উদ্ভিদগুলো প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাতাসকে শীতল করে, আর প্রাঙ্গণের বিন্যাস ও জ্যামিতিক গঠন বাতাসের প্রবাহকে পরিচালিত করে।

আলহামব্রা প্রাসাদের সাথে যুক্ত গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদ ‘জেনারালাইফ’ (Generalife)-তে এই ভাবনাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আরও উঁচুতে। সেখানে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া উদ্যান, বৃক্ষরোপিত বাগানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জলধারা আর ফলের বাগানের মধ্যে স্থাপিত ছোট ছোট প্যাভিলিয়ন; প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মধ্যে যেন এক অপূর্ব সমন্বয়।

এখানেই বায়োফিলিক ডিজাইন সবচেয়ে পরিপূর্ণ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ এমন এক স্থাপত্যধারা যা প্রকৃতিকে কেবল দর্শনের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং প্রকৃতির মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব গড়ে তোলে।

চিত্র: জেনারালাইফ, আলহামব্রা।

 

জীবন্ত উপাদান হিসেবে পানি/ জীবনের স্পন্দন হিসেবে পানি

মুরিশ স্থাপত্যে পানি সর্বত্রই উপস্থিত। তবে তা কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং স্থাপত্যের মূল অবকাঠামোর কার্যকর ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাঙ্গণগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফোয়ারা, চলাচলের পথের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সরু জলধারা, আর স্থির জলাধারগুলো আকাশ ও আলোর প্রতিচ্ছবি ধারণ করেছে। কিন্তু এসবের ভূমিকা কেবল নান্দনিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে এগুলো বাতাসকে শীতল করে, শুষ্ক আবহাওয়ায় আর্দ্রতা বৃদ্ধি করে, চারপাশের কোলাহলকে মৃদু পানির সুরে প্রশমিত করে, দৃষ্টিকে প্রশান্তি দেয় এবং সর্বোপরি মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর ইন্দ্রিয়গত সম্পর্কে যুক্ত করে।

আলহামব্রার ‘কোর্ট অব দ্য লায়ন্স’-এ বারোটি মার্বেল পাথরের সিংহ একটি জলাধারকে পিঠে ধারণ করে আছে, যেখান থেকে চার দিকে চারটি জলধারা প্রবাহিত হয়েছে। এখানে পানি অবিরাম প্রবাহিত হতে থাকে, এবং তার শব্দ চারপাশে স্পষ্টভাবে শোনা যায়। অনেক সময় জলাধার দেখার আগেই তার উপস্থিতি অনুভূত হয় অর্থাৎ এর কলকল ধ্বনিই আগে কানে পৌঁছায়। এই শব্দটাই চারপাশের পরিবেশে এক বিশেষ আবহ সৃষ্টি করে, আর পানির এই অবিরাম প্রবাহই যেন সেখানে প্রাণস্পন্দন জাগিয়ে তোলে।

চিত্রঃ কোর্ট অব দ্য লায়ন্স, আলহামব্রা

 

গ্রানাডা কিংবা মারাকেশের মতো উষ্ণ ও শুষ্ক জলবায়ুর অঞ্চলে পানি অত্যন্ত মূল্যবান একটি  সম্পদ। কিন্তু মুরিশ স্থাপত্য একে আড়াল করে রাখেনি বা কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেনি। বরং পানিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছে। ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত এর সংস্পর্শে আসে—এর শব্দ শোনে,  সৌন্দর্য দেখে এবং বায়ুপ্রবাহের ফলে এর শীতল প্রভাব অনুভব করে।

আধুনিক স্থাপত্য পানিকে সাধারণত পাইপের ভেতরে চোখের আড়ালে রেখে পরিচালিত করা হয়; এর প্রবাহ চোখে পড়ে না এবং উপস্থিতিও অনুভূত হয় না। কিন্তু মুরিশ স্থাপত্য পানিকে দৃশ্যমান, অনুভবযোগ্য ও পরিবেশে অংশগ্রহণকারী এক উপাদানে রূপ দিয়েছে। সেখানে পানি কেবল ব্যবহারের বস্তু নয়; বরং পরিবেশের সক্রিয় উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

 

প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস

মুরিশ স্থাপত্যে আলো কোনো অপরিবর্তনীয় বা নিষ্ক্রিয় উপাদান নয়। বরং সুপরিকল্পিতভাবে এর উপস্থিতি ও গতিপথ পরিচালনা করা হয়। এখানকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ বা আঙিনাগুলো ওপর থেকে সূর্যালোককে ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, একই সঙ্গে চারপাশের বারান্দাগুলোকেও ছায়াবৃত রাখে। মাশরাবিয়া (কাঠের তৈরি জালি পর্দা) তীব্র সূর্যালোক ছেঁকে মেঝে ও দেয়ালের ওপর সূক্ষ্ম ও জটিল নকশাময়  আলো-ছায়ার বিন্যাস সৃষ্টি করে, যা দিনের পরিক্রমায় পরিবর্তিত ও স্থানান্তরিত হতে থাকে এবং অভ্যন্তরীণ পরিসরে এক কোমল ও  স্নিগ্ধ আবহ তৈরি হয়। আবার কৌশলগতভাবে জানালাগুলোকে এমনভাবে স্থাপন করা; একদিকে যেমন বাইরের চমৎকার দৃশ্যকে ফ্রেমবন্দি করে, অন্যদিকে তেমনি রোদের তীব্র চোখধাঁধানো আলোকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

চিত্রঃ আলহামব্রার জালিশিল্প

 

যে স্থাপত্যে দক্ষতার সাথে আলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় সেখানে বাতাসের প্রবাহকেও একইভাবে পরিচালনা করা হয়। এখানকার প্রাঙ্গণগুলো প্রাকৃতিকভাবেই বায়ু চলাচলের (ভেন্টিলেশন) অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে: শীতল বায়ু নিচের স্তরে জমা হয়, আর উষ্ণ বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে বাইরে বেরিয়ে যায়।

পুরো ভবনের নকশার পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয় অভ্যন্তরীণ পরিসরে যেন সবসময় আড়াআড়িভাবে বাতাস (ক্রস-ব্রিজ) প্রবাহিত হতে পারে। কক্ষগুলো বারান্দার দিকে উন্মুক্ত, আর বারান্দাগুলো আবার খোলা প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত; ফলে পুরো ভবনজুড়ে বায়ুপ্রবাহের জন্য একটি ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক গতিপথ তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য কোনো জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে না। এটি মূলত জলবায়ুর সঙ্গে স্থাপত্যের এক সৃজনশীল সমন্বয়ের উদাহরণ।

আধুনিক পরিভাষায় একে আমরা বলি প্যাসিভ কুলিং (যান্ত্রিক সাহায্য ছাড়াই ঘর ঠান্ডা রাখা), ডে-লাইটিং (দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার) এবং প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহের নিশ্চিতকরণ (ন্যাচারাল ভেন্টিলেশন)। বর্তমান যুগের টেকসই স্থাপত্যশিল্প (সাসটেইনেবল ডিজাইন) আজ যে নীতিগুলো নতুন করে শেখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, মুরিশ স্থাপত্যে তা শুরু থেকেই মিশে ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে।

 

প্রাকৃতিক উপাদান

মানুষের ব্যবহৃত এসব উপকরণই মানুষকে সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করে। যেমন— খোদাইকৃত দেবদারু কাঠের (Cedar wood) বিম, যা সময়ের সাথে সাথে আরও পরিপক্ব হয়ে ওঠে। তাদেলাক্ট (Tadelakt plaster) প্লাস্টার, যা চুন থেকে প্রস্তুত এবং হাতে ঘষে মসৃণ করা হয়। জেলিজ (Zellij) টাইলস, যা মাটি থেকে তৈরি এবং মৃত্তিকাবর্ণ রঙের প্রলেপে আবৃত। পাথরের মেঝে, যা পায়ের তলায় শীতল অনুভূতি জাগায়। বোনা কাপড়, যা উদ্ভিদজাত রঙে রাঙানো হয়।

এসব উপকরণ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। এরা শ্বাস নেয়, বয়স বাড়ার সাথে পরিণত হয়, এবং সময়ের সাথে সাথে এদের গায়ে পরিণতির স্বাভাবিক ছাপ(Patina) ফুটে ওঠে। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দেয়। এই অর্থে তারা জীবন্ত—যা কৃত্রিম উপকরণে অনুপস্থিত।

আর যেহেতু এগুলো নষ্ট বা ক্ষয় হওয়ার বদলে সময়ের সাথে সাথে পরিপক্ব হয়, তাই দিন দিন এদের সৌন্দর্য কেবল বাড়তেই থাকে। দেবদারু কাঠের ছাদ সময়ের সাথে সাথে আরও গাঢ় ও গভীর রঙ ধারণ করে। প্লাস্টারের টেক্সচার বা গঠন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রমাগত হাঁটাচলার ফলে পাথরের মেঝে মসৃণ ও চকচকে হয়ে ওঠে।

এটি সেই আধুনিক উপকরণগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত—যেগুলোকে এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে তারা অপরিবর্তিত থাকে, পরিবর্তন প্রতিরোধ করে এবং চিরকাল ‘নতুন’ দেখায়। কিন্তু মুরিশ স্থাপত্যের উপকরণগুলো সময়ের প্রবাহে সক্রিয়ভাবে ভুমিকা রাখে।

 

প্রকৃতি অনুপ্রাণিত নকশা

এমনকি মুরিশ স্থাপত্যের অলঙ্করণগুলোও প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত।

আরাবেস্ক (Arabesques)—প্লাস্টারের ওপর খোদাই করা লতা-পাতা ও ফুলের জটিল, পরস্পর-সংযুক্ত নকশা। জ্যামিতিক নকশাগুলো প্রকৃতির মেনে চলা গাণিতিক নিয়মাবলীর আলোকে করা; যেমন প্রতিসাম্য (symmetry), পুনরাবৃত্তি (repetition) এবং ফ্র্যাক্টাল বিন্যাস (fractals)। একইভাবে, মুকারনাস (Muqarnas) খিলান বা ছাদগুলোর গঠন যেন স্ট্যালাক্টাইট (গুহার ছাদ থেকে ঝুলে থাকা পাথরের স্তর), মৌচাক কিংবা প্রকৃতির স্বাভাবিক জৈবিক বৃদ্ধি বা বিকাশের অণুরূপ।

চিত্রঃ আলহামব্রায় জেলিজ টাইলসের ওপরের অংশে থাকা সূক্ষ্ম আরাবেস্ক নকশা ও ক্যালিগ্রাফির একটি দৃশ্য।

 

আলহাম্বরার জেলিজ টাইলসের ওপর খচিত সূক্ষ্ম আরাবেস্ক নকশা ও ক্যালিগ্রাফির দিকে তাকালে এই প্রকৃতি-প্রণোদিত শিল্পভাষার এক অপূর্ব প্রকাশ দেখা যায়।

ইসলামি ঐতিহ্যে ধর্মীয় ক্ষেত্রে মানব বা প্রাণীর অবয়বচিত্রের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হওয়ায় অলংকরণ ধীরে ধীরে বিমূর্ত রূপ নেয়। তবে এই বিমূর্ততা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতার নাম নয়। বরং এসব নকশা এখনও প্রকৃতির বিকাশ, শৃঙ্খলা এবং দৃশ্যমান কাঠামোগত বিন্যাসের প্রতিই ইঙ্গিত করে।

যখন দেয়াল, ছাদ ও মেঝেজুড়ে বিস্তৃত এসব নকশা দ্বারা আপনি পরিবেষ্টিত থাকেন, তখন আসলে আপনি প্রকৃতিক দৃশ্যগত রূপের প্রতিধ্বনির মধ্যেই অবস্থান করেন। প্রকৃতির প্রত্যক্ষ উপস্থিতি সেখানে না থাকলেও তার ছন্দ, বিন্যাস ও সৃষ্টির সৌন্দর্য  সর্বত্র প্রতিফলিত হয়। এক অর্থে, এটি বায়োফিলিক ডিজাইনেরই আরেক রূপ—তবে এখানে প্রকৃতি প্রকাশিত হয়েছে জ্যামিতির ভাষায়, নকশার ছন্দে এবং প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সুশৃঙ্খল বিন্যাসের মাধ্যমে।

 

আধুনিক বাসস্থান যা হারিয়েছে

এসব বৈশিষ্ট্যের সাথে একটি সাধারণ আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ির তুলনা করে দেখুন।

বন্ধ জানালা, যান্ত্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (HVAC), কৃত্রিম আলো এবং এমন সব সিন্থেটিক বা কৃত্রিম উপাদান যা শ্বাস নিতে পারে না অর্থাৎ প্রাণহীন। আর গাছপালা থাকলেও ,সেগুলো হয়তো তাকের ওপর টবে সাজানো—কেবলই সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে, যা স্থাপত্যের মূল কাঠামোর সাথে সামগ্রিকভাবে সম্পর্কহীন বা কখনো একেবারেই বিচ্ছিন্ন।

এখানে ঘরের ভেতর আর বাইরের জগতের মধ্যকার এই ব্যবধানটা প্রায় চূড়ান্ত। কেননা প্রকৃতি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী নয়; এমন এক জিনিসে পরিণত হয়েছে যা মানুষ কেবল অবসরে দেখতে যায়।

আমরা উঠোন বা আঙিনাকে বদলে ফেলেছি লিভিং রুমে। বাগানকে রূপ দিয়েছি লন-এ (অথবা কোনো খোলা জায়গাই রাখিনি। প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ করে এনেছি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (air conditioner)। দিনের আলো ব্যবহারের পরিবর্তে এনেছি ছাদের কৃত্রিম এলইডি (LED) লাইট। আর সময়ের সাথে সাথে যে উপাদানগুলো নিজস্ব মহিমায় রূপ নেয়, সেগুলোকে বদলে আমরা ব্যবহার করছি এমন সব উপাদান যা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।

আর এরপর আমরা অবাক হয়ে ভাবি, আমাদের ঘরবাড়িগুলোকে কেন এত প্রাণহীন মনে হয়।

আজ যে বায়োফিলিক ডিজাইনকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে, তা মূলত আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাণবন্ততা এবং সেই জীবন্ত স্থাপত্য-দর্শনকে পুনরুদ্ধারেরই একটি প্রয়াস।

 

কীভাবে সেই হারানো সংযোগ পুনরুদ্ধার করা যায়?

এই নীতিমালা গুলোকে আপনার বাসস্থানে ফিরিয়ে আনতে  কোনো রাজপ্রাসাদের প্রয়োজন নেই। সত্যি বলতে, একটি খোলা প্রাঙ্গণ (courtyard) থাকাও অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন শুধু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—ঘরের ভেতর ও বাইরের সম্পর্ককে, স্থাপত্য ও জীবনের সম্পর্ককে নতুনভাবে চিন্তা করার মানসিকতা।

·       প্রথমে আলো দিয়ে শুরু করুন:

পর্দা সরিয়ে দিন। দিনের আলোকে আপনার বসবাসের পরিসরে প্রবাহিত হতে দিন। সম্ভব হলে আসবাবপত্র এমনভাবে সাজান, যাতে আপনার দৈনন্দিন ব্যবহারের স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো পৌঁছায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোর এই পরিবর্তন লক্ষ্য করুন এবং তার স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হতে দিন।

·       জীবন্ত উদ্ভিদকে আপনার পরিসরের অন্তর্ভুক্ত করুন, তবে অলংকরণ হিসেবে নয়; কার্যকর উপাদান হিসেবে:

শুধু তাকের ওপর একটি সাক্যুলেন্ট বা ক্যাকটাস গাছ রেখে দায়িত্ব শেষ করবেন না। ভাবুন, গাছগুলো আপনার পরিসরে কোথায় সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে—জানালার পাশে, যেখানে তারা আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে; ঘরের কোণগুলোতে, যেখানে তারা শব্দের প্রতিফলন ও প্রতিধ্বনি প্রশমিত করে কক্ষের ধ্বনি-প্রকৃতিকে কোমল করে তুলবে। অথবা এমন কোনো দৃষ্টিসীমায়—যেখানে প্রতিদিন আপনার চোখ পড়বে। এমন গাছ নির্বাচন করুন, যা ঋতুর পরিবর্তনে সাড়া দেয়, বেড়ে ওঠে এবং আপনার যত্ন ও মনোযোগ দাবি করে।

  • বাতাস চলাচলের সুযোগ দিন:

যদি ঘরের জানালা খোলার সুযোগ থাকে, তবে তা খুলে দিন। এমন ব্যবস্থা করুন যেন বাতাস একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হতে পারে  (cross-ventilation) । আপনার ঘরটিকে শ্বাস নিতে দিন। যদি আপনি কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বা চারপাশ বন্ধ ভবনে থাকেন, তবে কীভাবে কৃত্রিম উপায়ে এই আবহ তৈরি করা যায় তা ভাবুন—যেমন ফ্যান চালিয়ে বাতাস সচল রাখা, অথবা মাঝে মাঝে ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বাতাসের প্রবাহ তৈরি করা।

  • যতটুকু সম্ভব প্রকৃতিজাত উপকরণ ব্যবহার করুন:

কাঠ, পাথর, লিনেন, সুতি কাপড় বা পোড়ামাটি। এমন সব উপাদান বেছে নিন যা পুরনো হলেও তার সৌন্দর্য হারায় না, বরং একটি নিজস্ব আভিজাত্য পায়। যখন আপনি ঘরের কোনো জিনিস—যেমন গালিচা, কাটিং বোর্ড বা জিনিসপত্র রাখার কোনো ঝুড়ি পরিবর্তন করবেন, তখন এমন কিছু বেছে নিন যা একসময় জীবন্ত কোনো উপাদান থেকে তৈরি হয়েছিল।

  • আপনার পরিসরে পানিও অন্তর্ভুক্ত করুন, এমনকি তা প্রতীকী হলেও:

বারান্দায় বা টেবিলের ওপর ছোট একটি পানির ফোয়ারা বা জলাধারও সুন্দর ও প্রশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। পানি শুষ্ক বাতাসকে আর্দ্র করে, বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঘরকে শীতল রাখে এবং ঘরের পরিবেশে একটা প্রাণবন্ত অনুভূতি এনে দেয়।

  • প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ তৈরি করুন:

আপনার যদি একটি জানালা থাকে, তবে সেটিকে একটি ছবির ফ্রেমের মতো বিবেচনা করুন। জানালার কার্নিশে একটি গাছ রাখুন, কিংবা আসবাবগুলো এমনভাবে বসান যাতে বসার পর বাইরের যতটুকু সবুজ আছে তা আপনার চোখে পড়ে। যদি একটি বারান্দা থাকে, তবে সেটিকে আপনার বসার ঘরেরই একটি অংশ বানিয়ে তুলুন, কেবল জিনিসপত্র জমিয়ে রাখার গুদাম বানাবেন না। আর আপনি যদি কোনো জানালাবিহীন ঘরে থাকেন, তবে আপনার জন্য জীবন্ত গাছপালা আরও বেশি জরুরি; কারণ এগুলোই প্রকৃতির অনুপস্থিত উপাদানকে কিছুটা পূরণ করতে পারে।

চিত্রঃ একটি সমসাময়িক বা আধুনিক অন্দরমহল (interior), যা প্রাকৃতিক আলো, উদ্ভিদ ও উপকরণের সমন্বয়ের মাধ্যমে বায়োফিলিক ডিজাইন এর নীতিগুলোকে সফলভাবে ধারণ করতে পারে।

 

আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি, এর কোনোটির জন্যই বিপুল সম্পদের প্রয়োজন নেই। বড় ধরনের কোনো সংস্কারকাজও দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সামান্য মনোযোগ—আলো কীভাবে চলাচল করে, বাতাস কেমন অনুভূত হয় এবং জীবনের প্রাণস্পন্দন কিভাবে আপনার পরিসরে প্রবেশ করতে পারে, সে বিষয়ে সচেতনতা।

 

প্রাণস্পন্দিত আবাস

অনেকেই ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’ বা প্রকৃতিবান্ধব স্থাপত্যশৈলীকে হয়তো সাময়িক একটি ট্রেন্ড বা ফ্যাশন মনে করেন। কিন্তু আসলে তা নয়। এটি মূলত আমাদের এমন এক বাস্তবতার পুনঃস্বীকৃতি, যা মানুষ বরাবরই জানত, কিন্তু আধুনিক নির্মাণশৈলীর প্রভাব তা ভুলিয়ে দিয়েছে: আর তা হলো, বাসস্থানে প্রাণ থাকা উচিত।

এখানে ‘প্রাণ’ শব্দটি কোনো রূপক অর্থে নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই সত্য। এমন এক আবাস, যেখানে উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে; বাতাস সচল থাকে; দিনের পরিক্রমায় আলোর গতিশীলতা থাকে এবং যেখানে প্রতিটি নির্মাণ-উপকরণ সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবে পরিণত ও পরিপক্ব হয়; এবং যেখানে থাকবে পানির কলতান যা চারপাশে একইসাথে শীতলতা ও আর্দ্রতার মাধ্যমে প্রাণের সঞ্চার করবে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থপতি ও নির্মাতারা এই বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন— শিল্পায়নের বহু আগে, যখন স্থাপনাগুলোকে বদ্ধ কাঠামোয় আবদ্ধ করা হয়নি এবং অন্দরমহল ও বহির্জগতের স্বাভাবিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি, তখন তারা ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে এমন স্থাপত্য নির্মাণ করতেন যা প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় সহাবস্থানের ভিত্তিতে গড়ে উঠত।

এই আলোচনায় আমি বারবার আলহামব্রার উদাহরণ ব্যবহার করেছি, কারণ আমার কাছে এটি বায়োফিলিক ডিজাইনের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ। তবে একটি আবাসকে প্রাণময় করে তুলতে তার প্রাসাদ হওয়া জরুরি নয়। তার জন্য একটি প্রাঙ্গণ, একটি ফোয়ারা কিংবা হাতে খোদাই করা সিডার কাঠের ছাদেরও প্রয়োজন নেই।

কিন্তু তার শ্বাস নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রাকৃতিক আলোর উপস্থিতি। প্রয়োজন এমন কিছু উপাদান, যার মধ্যে জীবনের স্পন্দন বিদ্যমান।

আর যখন আপনি একটি স্থানে এই উপাদানগুলো প্রদান করবেন, প্রকৃতিকে কেবল সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে না দেখে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করবেন। তখন সেই পরিসর সম্পূর্ণই বদলে যায়। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়, বরং মৌলিকভাবেও পরিবর্তিত হয়।

অর্থাৎ তখন এটি এমন এক জায়গায় পরিণত হয় যেখানে জীবন যাপন করা যায়, জীবনকে কেবল বন্দি করে রাখা হয় না।

আর এই প্রাণময়তাই একটি স্থানকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর করে তোলে।

 

২২ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।
Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top