সভ্যতার মানদণ্ডে শহরের আদর্শ ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা

আজকের আধুনিক শহরগুলো সাধারণত বিশ্বব্যাপী এক রকম। দুবাই, লন্ডন, ইস্তাম্বুল—এসব শহরের চেহারা ও নগর পরিকল্পনা প্রায় একই রকম হয়ে থাকে। আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, শহরের এই একরকম চেহারা আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, ইসলামী সভ্যতার আদর্শে কি শহর পরিকল্পিত হতে পারে? এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এর সাথে বাজার, রিয়েল এস্টেটের দাম, চাহিদা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ও যুক্ত থাকে।

নগর পরিকল্পনা করার প্রথম বিষয়টি হলো “স্কেল” বা আকার। যত বড় হবে শহর, তত কম আমাদের একে অপরের সাথে সম্পর্ক থাকে। বড় শহরে বাস করলে, আপনার প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কিত হওয়া কঠিন। একটি ভবনে যদি ১৫টি ফ্ল্যাট থাকে, আপনি কী সব প্রতিবেশীর সাথে একইরকম ভাবে মিশতে পারবেন? একই ভবনে বাস করেও মানুষ একে অপরের সাথে সেলাম দেয় না, একে অপরকে অদৃশ্য মনে করে। এখানে মানুষ একে অপরের সাথে সহজে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় না, কারণ তারা জানে যে সম্পর্কগুলো অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল।

এটি একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক সমস্যা, যা আমাদের সভ্যতার মানদণ্ড ও মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শহরে বাস করার জন্য আমাদের কি কিছু নতুন মানদণ্ড তৈরি করা উচিত। এটি শুধু আবাসন কিংবা জীবনযাত্রার মান নয়, বরং এটি আমাদের “সফলতা” এবং “সুখ” কীভাবে মাপি, তার ওপর নির্ভরশীল।

সভ্যতাকে বিচার করা যেতে পারে দুটি বিষয় দিয়ে—একটি হলো সফলতার সংজ্ঞা, এবং অন্যটি হলো সুখের সংজ্ঞা। সফলতা কী? আমরা আজকের সমাজে সফলতা মাপি বাইরের দৃশ্যমান উপাদান দিয়ে—গাড়ি, বাড়ি, ইত্যাদি নিয়ে শো-অফ। কিন্তু, আমরা জানি যে, প্রকৃত সফলতা কোনো কিছু অর্জনে নয়, বরং একজন মানুষের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং সমাজের প্রতি তার ভালোবাসা, সদাচার ও সদাসম্ভাবনা প্রকাশে নিহিত। 

একটি শহরের প্রকৃত সফলতা এবং সুখের মাপকাঠি হতে পারে, সেই শহরের বাসিন্দারা কতটা একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছে, কতটা মানবিকভাবে একে অপরকে সহায়তা করতে পারছে। এটা একটি নতুন প্রজন্মের আদর্শ, যা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। আমাদের শহরের পরিকল্পনায় এই মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেখানে একজন মুসলিম শুধু নিজের জীবনের মধ্যে নয়, বরং তার আশপাশের মানুষের জীবনেও সুখ এবং উন্নতি নিশ্চিত করতে চায়।

নগর পরিকল্পকদের জন্য একটি বিশেষ পরামর্শ হলো—তাদের শুধু “অর্ডার” বা নিয়মে আটকে না থেকে “ডিজাইনিং ডিসঅর্ডার” এর দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। অর্থাৎ, শহরগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে সেখানে মানুষ একত্র হতে পারে, আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারে, এমনকি প্রতিবাদও করতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে তেহরির স্কয়ারের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে পুলিশ যদি আক্রমণ করত, তবে মানুষ পালানোর জন্য উপযুক্ত রাস্তা পেতো। এটি শহরের ডিজাইন সম্পর্কে এক নতুন ধারণা দেয়, যা মানুষের স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতার ক্ষেত্র তৈরি করে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এটা কি শুধুমাত্র ইসলামী বিষয় হবে, নাকি এটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো? মূলত এটি ইসলামী হতে অথবা নাও হতে পারে, বরং এটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা অপরিহার্য। উদাহরণ হিসেবে জাহা হাদিদের কথা উল্লেখ করা যায়, যিনি নিয়ম ভেঙে নতুনভাবে ভবন ডিজাইন করতে শুরু করেছিলেন এবং পরে সেই নিয়ম তাকে খ্যাতি এনে দেয়। আমাদের উচিত ভবিষ্যতের স্থপতিদের প্রতি এমন চ্যালেঞ্জের মনোভাব গড়ে তোলা, যাতে তারা কোনো সিস্টেমের অধীনে না থেকে নিজের পথ তৈরি করতে পারে।

একটি বিশেষ বিষয় হলো, ঐতিহাসিক ক্ষত বা collective trauma নিয়ে আলোচনা। বিশেষত, মুসলিম বিশ্বের যেখানে অনেক রাজনীতি, যুদ্ধ এবং সংঘাতের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি হয়েছে, সেখানকার জনগণের মধ্যে একটি মানসিক ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের উচিত সেই ক্ষতকে মাথায় রেখে, কিন্তু তা দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করতে দিয়ে, সামনে এগিয়ে চলা। বিশেষত, আমরা যদি ইসলামী সভ্যতা এবং সমাজ গড়তে চাই, তবে আমাদের ঐতিহাসিক ক্ষতগুলোকে অতিক্রম করতে হবে, এবং সেই সঙ্গে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

যখন আপনি স্থান পরিবর্তন করেন, আপনি নতুন কিছু শিখতে পারেন এবং নতুন কিছু করতে পারেন। তবে সেই ঐতিহাসিক ক্ষত আমাদের ভবিষ্যতের পথে বাধা হতে পারে না।”

জাতীয়তাবাদ ইসলামী পরিচয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধী নয়। মানুষের একটি গোষ্ঠী বা জাতির প্রতি যে বৈশিষ্ট্য এবং গর্ব রয়েছে, তা তাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। এটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য, যদি আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের মানবিক স্বার্থ এবং ঐতিহ্যকে সম্মান দিয়ে আমরা সামগ্রিকভাবে মানবতার সেবা করতে পারি।

এবং, শহর পরিকল্পনা বা ইসলামী সভ্যতার পুনর্গঠন নিয়ে গবেষণা একটি তাত্ত্বিক দিকেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বাস্তব নীতি প্রণেতাদের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। গবেষণা এবং নীতির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে এটি বাস্তবে কার্যকর হয়ে ওঠে। পলিসি মেকার, প্রকৌশলী, মিডিয়া পেশাজীবী, এবং অন্য সকল পেশাজীবী একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে ইসলামী সভ্যতার মূলনীতি বাস্তবায়িত হয়।

 

অনুবাদ: সাবিহা শুচি 

৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত

প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত

প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত (জন্ম ১৯৬৫) সমকালীন আরব বিশ্বের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, গবেষক, লেখক এবং মুসলিম নারী-বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। মিসরের কায়রোতে তার জন্ম। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার বৌদ্ধিক জীবনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দর্শন, ইসলামী সমাজভাবনা, নাগরিকতা, রাষ্ট্র এবং নারী-অভিজ্ঞতার প্রশ্নে তিনি আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মুসলিম সমাজের নৈতিক কাঠামো, জনপরিসর, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং পরিবার ও নারীর সামাজিক অবস্থানের প্রশ্ন। তিনি পশ্চিমা নারীবাদী তত্ত্বের সরল অনুসরণে আগ্রহী নন; বরং ইসলামী সভ্যতার নৈতিক ও জ্ঞানগত ভেতর থেকে নারী, সমাজ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি আরব বিশ্বের নানা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষত আরব বসন্ত-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর, রাষ্ট্রীয় সংকট এবং নাগরিক সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বিশ্লেষণ আরব জগতে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। রাষ্ট্র, নৈতিকতা, পরিবার, ইসলামী সামাজিক কল্পনা এবং জনপরিসরের সম্পর্ক নিয়ে তার বহু প্রবন্ধ আরব বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার লেখায় একই সঙ্গে বিশ্লেষণী কঠোরতা, নৈতিক সংবেদন এবং সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার এক বিরল সমন্বয় লক্ষ করা যায়। সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত এমন এক কণ্ঠ, যিনি আধুনিকতার জটিল প্রশ্নগুলোকে ইসলামী নৈতিক বোধের আলোকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।
Picture of প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত

প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত

প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত (জন্ম ১৯৬৫) সমকালীন আরব বিশ্বের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, গবেষক, লেখক এবং মুসলিম নারী-বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। মিসরের কায়রোতে তার জন্ম। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার বৌদ্ধিক জীবনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দর্শন, ইসলামী সমাজভাবনা, নাগরিকতা, রাষ্ট্র এবং নারী-অভিজ্ঞতার প্রশ্নে তিনি আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মুসলিম সমাজের নৈতিক কাঠামো, জনপরিসর, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং পরিবার ও নারীর সামাজিক অবস্থানের প্রশ্ন। তিনি পশ্চিমা নারীবাদী তত্ত্বের সরল অনুসরণে আগ্রহী নন; বরং ইসলামী সভ্যতার নৈতিক ও জ্ঞানগত ভেতর থেকে নারী, সমাজ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি আরব বিশ্বের নানা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষত আরব বসন্ত-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর, রাষ্ট্রীয় সংকট এবং নাগরিক সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বিশ্লেষণ আরব জগতে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। রাষ্ট্র, নৈতিকতা, পরিবার, ইসলামী সামাজিক কল্পনা এবং জনপরিসরের সম্পর্ক নিয়ে তার বহু প্রবন্ধ আরব বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার লেখায় একই সঙ্গে বিশ্লেষণী কঠোরতা, নৈতিক সংবেদন এবং সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার এক বিরল সমন্বয় লক্ষ করা যায়। সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রফেসর ড. হেবা রউফ ইযযেত এমন এক কণ্ঠ, যিনি আধুনিকতার জটিল প্রশ্নগুলোকে ইসলামী নৈতিক বোধের আলোকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top