আদালত কী?

দ্বীনে মুবীন ইসলামে ‘আদালত’ পরিভাষাটি কেবল মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত একটি পরিভাষাই নয়, আদালত একই সাথে বিশ্বজগৎ ও সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত একটি পরিভাষা। শুধু তাই নয়, এই মহাবিশ্বের মহান সৃষ্টিকর্তার সাথেও এ পরিভাষাটির সম্পর্ক রয়েছে। বিচারক ও আইনজীবীগণ ‘আইন’ ও ‘আদালত’ শব্দ দুটি একসাথে ব্যবহার করেন। আইনের আরবী হলো ‘হুকুক’। حُقُوْق শব্দটি حَقٌّ শব্দ থেকে, আর عَدَالَةٌ শব্দটি عَدْلٌ শব্দ থেকে উৎসারিত। আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দুটি গুণবাচক নাম হলো আল-হক্ব ও আল-আদিল।

ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাওহীদ, ইবাদত, আদালত ও আখলাক। এসকল পরিভাষাকে আমাদের উসূলবিদগণ আসলুল উসূল নামে অভিহিত করেন। এ পরিভাষাগুলোর মধ্য থেকে আদালত ও আখলাক নিয়ে আলোচনা করবো।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আদালতের উপর সৃষ্টি করেছেন। আদালত হলো, প্রত্যেকটি বস্তু বা বিষয়কে তার যথার্থ স্থানে স্থাপন করা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনা করতে গিয়ে فَعَدَلَكَ  শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ তিনি মানুষকে সুষম করে গড়েছেন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে হক্ব ও আদালত পরিভাষাদ্বয়কে আমরা একসাথে দেখতে পাই। তিনি এই পরিভাষাদ্বয়কে কোথাও তাঁর সিফাত, আবার কোথাও এ মহাবিশ্বের ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ‘কিতাব’ শব্দের এর সাথে অসাধারণ একটি পরিভাষা ‘মীযান’ ব্যবহার করা হয়েছে। শাব্দিকভাবে ‘মীযান’ শব্দের অর্থ দাঁড়িপাল্লা। যার অর্থ হলো, ভারসাম্য, ব্যালান্স। সূরা রহমানেও মহান আল্লাহ বলেছেন—

وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ

অর্থ : “আসমানকে তিনিই সুউচ্চ করেছেন এবং মীযান কায়েম করেছেন।”

অর্থাৎ, ‘আদালত’ আসমান ও যমীন উভয় স্থানেই রয়েছে। পাহাড়, পর্বত, নদী-নালা, খাল-বিলসহ সকল সৃষ্টিতেই আদালত রয়েছে।

এরপরের আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন—

 أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ

এর দাবি হলো, “তোমরা মীযানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না।” 

আসমানে স্থাপনকৃত মীযানের সাথে সমাজের জন্য পাঠানো মীযানের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একটি সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছেন। এই দুই মীযানের সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার অর্থ হলো, পৃথিবীতে আদালত প্রতিষ্ঠা হওয়া।

 

কিতাব, মীযান ও হাদীদের মধ্যকার সম্পর্ক

আপনারা সকলেই জানেন যে, পবিত্র কোরআনে হাদীদ নামে একটি সূরা রয়েছে। হাদীদ অর্থ লোহা। সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ

অর্থ : “আমি আমার রাসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত দিয়ে পাঠিয়েছি। তাদের সাথে ‘কিতাব’ ও ‘মীযান’ নাযিল করেছি যাতে মানুষ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর লোহা নাযিল করেছি যার মধ্যে রয়েছে বিরাট শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। এটা করা হয়েছে এজন্য যে, আল্লাহ জেনে নিতে চান, কে তাঁকে না দেখেই তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ অত্যন্ত শক্তিধর ও মহাপরাক্রমশালী।”

এ আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিতাব ও মীযানের সাথে সাথে হাদীদ নাযিলের কথা বলেছেন। যারা কোরআনের বৈজ্ঞানিক তাফসীর করেন, তারা বলেন, আকাশ থেকে বিভিন্ন ধরনের পাথর এসে দুনিয়ায় পড়েছে এর সাথে সাথে লোহাও দুনিয়াতে এসেছে। আমি এ ধরনের তাফসীরকে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করি না।

আমার মতে, এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কিতাব বলতে তার অবতীর্ণ আসমানী কিতাবের কথা বুঝিয়েছেন, মীযান বলতে আদালত বুঝিয়েছেন, আর লোহা বলতে শক্তি ও ক্ষমতার কথা বুঝিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে বলেছেন,

কিতাববিহীন মীযান হবে না, আবার লোহাবিহীন মিযান হবে না। কেননা লোহাবিহীন মীযান কিতাবকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এবং কিতাববিহীন লোহা মীযানকে অদৃশ্য করে দেয়। আরও সুস্পষ্টভাবে বললে, কিতাব হলো আদালতের উৎস, মীযান হলো আদালত নিজে আর লোহা হলো শক্তি ও ক্ষমতা। এই তিনটি বিষয় অর্থাৎ- কিতাব, মীযান ও লোহা একসাথে না হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যেখানে কিতাব নেই সেখানে শক্তি ও ক্ষমতা ‘মীযানকে’ (আদালত) নিয়ন্ত্রণ করে। আর এক্ষেত্রে আদালতের শক্তি নয়, শক্তি ও ক্ষমতার আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি মীযান না থাকে তাহলে শক্তি ও ক্ষমতা; কিতাবকে তার নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং কিতাবকে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কিতাব যখন শক্তি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণাধীন হয়, তখন সেটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। পূর্বের পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত দ্বীনসমূহ হলো এর জ্বলন্ত উদাহরণ। শক্তি ও ক্ষমতা না থাকলে মীযান শুধুমাত্র থিওরি হিসেবে থেকে যায়, সমাজে ও রাষ্ট্রে যার কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। কিতাবকে মীযানের সাথে এক হয়ে সামাজিক জীবনে প্রভাবশালী হওয়ার জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, একটি শক্তির প্রয়োজন, যে শক্তি কিতাবের আইনসমূহ বাস্তবায়ন করবে।

সূরা হাদীদের এই আয়াতের আলোকে আমরা বলতে পারি যে, কিতাব, মীযান এবং হাদীদ তথা রাষ্ট্রক্ষমতা যখন একসাথে হবে, তখনই কেবল পৃথিবীতে আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে।

আমি পাঠকদেরকে অনুরোধ করবো, কোরআনকে একবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘আদালত’ এর একটি কিতাব হিসেবে পড়ুন। ‘আদালত’ এর চিন্তাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে যদি সূরা ফাতিহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সমগ্র কোরআন অধ্যয়ন করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, কোরআন একইসাথে ‘আদালত’-এরও একটি গ্রন্থ। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন কেবল আইনের গ্রন্থই নয়; বরং আদালতেরও গ্রন্থ। অর্থাৎ আমরা আইনকে যে অর্থে গ্রহণ করি কোরআন সে অর্থে আইনের কোনো গ্রন্থ নয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, কোরআন কোনো সংবিধান নয়। আমি যখন এই কথা বলি, তখন অনেকেই আমার উপর রাগ করেন। মুসলিম বিশ্বে বিখ্যাত একটি স্লোগান আছে। আমাদের সংবিধান হলো কোরআন, আমাদের আইন হলো কোরআন। আমি এটা সঠিক মনে করি না।

মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ‘আদালত ও আইন’ এর সবচেয়ে বড় উৎস। একইসাথে তাকবীনের (বিশ্বসৃষ্টি) সাথে তানযীল (অবতীর্ণ)-কে একত্রকারী একটি মহা উৎস। অর্থাৎ মহাবিশ্বের আয়াতসমূহের সাথে মহাগ্রন্থের আয়াতসমূহ একসাথে ‘আদালত’ নামক একটি মৌলিক বিষয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। কিন্তু সেখান থেকে আইন-কানুন বের করার দায়িত্ব মানুষকে দেওয়া হয়েছে। আর মানুষ যখন এই কাজ করবে তখন তা উসূল অনুযায়ী করবে। উসূলুল ফিকহ নামক জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ এই শাখাটি এর উসূল শেখানোর জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে।

কেউ কেউ ইলমুল ফিকহকে, ‘ইসলামী আইন’ নামে অনুবাদ করেন। ‘ইসলামী আইন’ এই পরিভাষাটি ব্যবহার করতে পারেন, তবে ফিকহের অনুবাদ হিসেবে কিংবা ফিকহের সমার্থক হিসেবে নয়। কারণ ফিকহ শুধুমাত্র আইনকে বুঝার জন্য এবং আইন-কানুনকে ব্যাখ্যা করার জন্যই নয়। ফিকহের অর্থ হলো, গভীর উপলব্ধি। ফিকহ এমন একটি ধারণার নাম, যা তাকবীন ও তানযীলকে, আকল ও ওহীকে, কাদীম (পুরাতন) ও জাদীদ (নতুন)-কে একত্রিত করে।

আমরা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনকে যেমন আখলাক ও আইনের গ্রন্থ হিসেবে যেমন পড়ি, তেমনি আদালতেরও একটি গ্রন্থ হিসেবে পড়া উচিত। কোরআনে আদালত সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে। যারা রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত আছেন, আমি মনে করি তাদের সকলের উচিত এই আয়াতটি অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ আত্মস্থ করা। আয়াতটি হলো—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

অর্থ : “হে ঈমানদারগণ ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও, তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের ব্যক্তিসত্তার অথবা তোমাদের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও। উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে অনেক বেশি কল্যাণকামী। কাজেই নিজেদের কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে বিরত থেকো না। আর যদি তোমরা বক্র কথা বলো অথবা সত্যকে পাশ কাটিয়ে চলো, তাহলে জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু করছো আল্লাহ তার খবর রাখেন।”

আমি মনে করি, এই আয়াতের সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবেন একজন আইনবিশারদ। এই আয়াতে শুধু ‘হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও…’ এই কথাই বলা হয়নি। এখানে আরও বলা হয়েছে যে, এই কাজ করার সময়, আল্লাহ যে তোমাদেরকে সব সময় দেখছেন এ বিষয়টি ভুলে যেও না। তোমরা হলে আল্লাহর সাক্ষী আর আল্লাহও হলেন তোমাদের সাক্ষী|

মহান আল্লাহর সাথে মানুষের দুটি মীসাক রয়েছে।

১. মীসাকুল আমানাহ।

২. মীসাকুশ শাহাদাহ।

মীসাকুশ শাহাদাহ হলো, আল্লাহ সবসময় আমাকে দেখছেন আর আমিও তাঁকে সব সময় দেখছি। আর মীসাকুল আমানাহ হলো, আমার যা কিছু আছে সব কিছুই মহান আল্লাহর। তিনি সবকিছুই আমাদেরকে আমানত হিসেবে দিয়েছেন। আর আমিও আল্লাহ প্রদত্ত এসকল আমানতকে গ্রহণ করে নিয়েছি। এ বিষয়দুটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য ভিন্ন একটি আলোচনার প্রয়োজন তাই আমি আর সেদিকে যাচ্ছি না।

 

কোরআন ও হাদীসে আদালত

মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আদালতকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার নজীর আর কোথাও নেই। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আদালতকে উচ্চ স্থানে আসীন করেছে। যাবুরেও আদালত সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে। তবে তা কোরআনের মত এত বিস্তৃত ও ব্যাপক নয়।

মহান আল্লাহ সূরা মায়েদার ৮ নং আয়াতে বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! সত্যের ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হও এবং ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও। কোনো দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেনো এমন উত্তেজিত না করে দেয়, যার ফলে তোমরা ইনসাফ থেকে সরে যাও। ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করো। এটি আল্লাহভীতির সাথে বেশি সামঞ্জস্যশীল। আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন।”

বিচারবিভাগের সাথে সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি কী কী কারণে ন্যায়বিচার করা থেকে দূরে সরে যেতে পারে এটা আল্লাহ তায়ালা জানেন এবং সেই সব বিষয় তিনি এসকল আয়াতে উল্লেখ করেছেন।

আমি হাদীসের একজন ছাত্র হিসেবে এই আয়াতগুলোর পাশাপাশি আদালত সম্পর্কিত একটি হাদীস উল্লেখ করতে চাই।

আমরা সকলেই জানি যে, রাসূলে আকরাম (স.) একজন নবী ও রাসূল হওয়ার পাশাপাশি ইমাম (নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান) এবং বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। মদীনার সকল মামলা মোকাদ্দমার মীমাংসা করতেন স্বয়ং রাসূল (স.) নিজে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনও এ আদেশ দিয়েছে। কোরআনে বর্ণিত আছে—

تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

অর্থ : “যদি তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যাপারে বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তাকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও| যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান এনে থাকো।”

সূরা নিসার ৬৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে—

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থ : “না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ এদের পারস্পরিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্যে কোনো প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।”

আমি যেই হাদীসটি পাঠ করবো সেই হাদীসটি উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির প্রেক্ষাপট হলো, দুপক্ষ একটি মোকাদ্দমা নিয়ে রাসূল (স.)-এর নিকটে আসেন। রাসূল (স.) তাদের দুপক্ষের যুক্তি- তর্কই শোনেন। তবে একপক্ষ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুন্দর ভাষায় তাদের কথা তুলে ধরেন। অপর দিকে অপর পক্ষ ছিলো দুর্বল, নিজের যুক্তি বা অধিকারকে তুলে ধরার ব্যাপারে মোটেই পারঙ্গম ছিলো না। উভয় পক্ষের যুক্তি তর্ক শোনার পর রাসূলে আকরাম (স.) বিশ্বমানবতার বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই কথাটি বলেন—

 

بحُجَّتِهِ مِنْ بَعْضٍ؛ فأَقْضِي لَهُ عَلَى نَحْوِ مَا أَسْمَعُ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ مِنْ حَقِّ أَخِيهِ شَيْئًا فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ

অর্থ : “হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা মুকাদ্দমা নিয়ে আমার কাছে আগমন করো এবং তোমাদের একজন অপরজন অপেক্ষা অধিক বাকপটু হয়ে যুক্তি খাটিয়ে স্বীয় দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করো। আমি কথা শুনে তার অনুকূলে রায় প্রদান করি। সুতরাং এতে যদি তার ভাইয়ের হকের কিছু তাকে প্রদান করি (বাস্তবে হয়তো এতে তার কোনো অধিকারই নেই) তখন তার কর্তব্য হবে তা গ্রহণ না করা। কেননা, এতে যেনো আমি তাকে জাহান্নামের এক খণ্ড আগুন প্রদান করলাম|”

এই হাদীসটির আধুনিক ব্যাখ্যা এরকম, ‘ধরা যাক একজন উকিল (অ্যাডভোকেট) একটি মামলা নিবেন। যে ব্যক্তি তার কাছে আসল তার কাছ থেকে সকল ঘটনা শোনার পর উকিল সাহেব বুঝতে পারলেন, যে লোক এসেছে সে একশত ভাগ দোষী বা অন্যায় কাজ করেছে। এখন এই লোকের এই অন্যায়কে সমর্থন করে তার পক্ষে এই উকিলের লড়া জায়েজ কিনা? এ বিষয় নিয়ে আলেমগণ নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করেছেন।

পাঠকদের মধ্যে অনেক ব্যক্তিবর্গই আইন বিভাগের সাথে জড়িত আছেন। এখন এই একই প্রশ্ন যদি আমি আপনাদেরকে করি, অন্যায়কারী কিংবা জুলুমকারী লোকের পক্ষে আইনী লড়াই করা জায়েজ, নাকি নাজায়েজ?

উত্তরে হয়তো এ কথা আসবে, খুনীরও তো একটি অধিকার রয়েছে। কারণ উকিল বা বিচারকগণ আইনের যে সব বই পড়ে উকিল বা বিচারক হয়েছেন, সেখানে গুরুত্ব দিয়ে এ কথাটি বলা হয়েছে।

তবে হ্যাঁ, খুনীকে কিংবা চোর বা অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য নয়, নির্ধারিত আইনগত শাস্তির বাইরে খুনী যেনো আলাদা কোনো জুলুমের শিকার না হয় এই জন্য তাকে সাহায্য করা যেতে পারে।

এই হাদীস থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, উকিল বা অ্যাডভোকেট যেনো তার মক্কেলকে এমনভাবে সমর্থন না করে যে, তার বাগ্মীতা কিংবা যুক্তির কারণে আদালত প্রভাবিত হয় এবং বিচারক ন্যায়বিচার করতে অপারগ হয়ে যান। আমাদের ফিকহের গ্রন্থসমূহে এই বিষয় নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। সুতরাং আমি সেদিকে যাচ্ছি না এবং কোনো ফতোয়াও দিচ্ছি না।

তবে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এ বিষয়ে একটি আয়াত রয়েছে। আয়াতটি হলো—

وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا

প্রখ্যাত মুফাসসির এলমালি হামদি ইয়াজার এই আয়াতের অনুবাদে বলেন, “হে প্রিয় বন্ধু! তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষে ওকালতি করতে পারবে না।”

উস্তাদ এলমালি হামদি ইয়াজার আরবী خَصِيمً শব্দটির অনুবাদ করেন উকিল বা অ্যাডভোকেট।

এ আয়াতের শানে নুযুল প্রথম যখন পড়ি, তখন আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখনো যখন পড়ি ভীতসন্ত্রস্ত হই। ইলাহী আদালতের সামনে কে না ভীত হয়!

ঘটনার নায়ক হচ্ছে আনসারদের যুফার গোত্রের তা’মাহ বা বশীর ইবনে উবাইরিক নামক এক ব্যক্তি। এই লোক একদিন এক ঘর থেকে আটা ও বর্ম চুরি করে। চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পথে বর্মকে আটার বস্তার ভেতরে রাখে। পথিমধ্যে বস্তায় থাকা বর্মের কারণে বস্তা ছিদ্র হয়ে যায়। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখে, তার বস্তা ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে সে যে পথ দিয়ে যাচ্ছে সে পথে আটা পড়ে পড়ে চিহ্ন হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে চালাকি করে চুরিকৃত আটা এবং বর্মকে নিজের বাসায় না নিয়ে এক ইহুদী প্রতিবেশীর বাসায় যায় এবং চুরিকৃত মাল তার কাছে আমানত রাখে। সকাল বেলা যে সাহাবীর ঘর থেকে বর্ম ও আটা চুরি যায় সে আটা পড়ার পথ অনুসরণ করে সেই ইহুদীর বাড়ি পর্যন্ত যান।

বর্ম ও আটার মালিক সাহাবী রাসূলে আকরাম (স.)-এর কাছে এসে অভিযোগ দায়ের করেন। রাসূলে আকরাম (স.) এ ঘটনা নিষ্পত্তি করার জন্য সেই ইহুদীকে ডেকে পাঠান। রাসূল (স.) ইহুদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায়, এগুলো আমার না। তা’মাহ আমার নিকট আমানত রেখেছে। এই কথা শুনে রাসূল (স.) তা’মাহ কে ডেকে পাঠান। তা’মাহ কে জিজ্ঞাসা করলে সে শপথ করে বলে, আমি এবিষয়ে কিছুই জানি না!  তা’মাহ ও তার পক্ষপাতীরা তার সমর্থনে খুব জোড়ালো ভূমিকা রাখে। তারা বলে বেড়ায় : এ শয়তান ইহুদী, সে সত্যকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরি করে। তার কথা কেমন করে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। বরং আমাদের কথা মেনে নেওয়া উচিত, কারণ আমরা মুসলমান। এই মোকাদ্দমার বাহ্যিক ধারা বিবরণীতে প্রভাবিত হয়ে নবী করীম (স.) ইহুদীটির বিরুদ্ধে রায় দিতে প্রায় উদ্যত হয়েছিলেন। এমন সময় সমস্ত ব্যাপারটির প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে মহান আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করে বলেন—

إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ۚ وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا

অর্থ : “হে নবী! আমি সত্য সহকারে এই কিতাব আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ আপনাকে যে সঠিক পথ দেখিয়েছেন সে অনুযায়ী আপনি লোকদের মধ্যে ফয়সালা করতে পারেন। আপনি খেয়ানতকারী ও বিশ্বাস ভংগকারীদের পক্ষে বিতর্ককারী হবেন না।”

وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا

অর্থ : “আর আল্লাহর কাছে ক্ষমার আবেদন করুন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়।”

চিন্তা করে দেখুন তো, একজন ইহুদী অবিচারের শিকার হবে বলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করেন এবং সেসব মুসলমানদের কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেন, যারা নিছক গোত্র ও অন্ধ স্বজনপ্রীতির কারণে অপরাধীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলো। অন্যদিকে সাধারণ মুসলমানদের এই মর্মে শিক্ষা দান করা হয়েছে যে, ন্যায় ও ইনসাফের প্রশ্নে কোনো প্রকার অন্ধ বিদ্বেষ ও গোত্রপ্রীতির অবকাশ নেই। নিজের দলের লোকেরা বাতিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের অযথা সমর্থন করতে হবে এবং অন্য দলের লোকেরা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করতে হবে-এ নীতি কখনো ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।

আমি জানি আপনারা সকলেই এই সব বিষয় আমার চেয়ে ভালো জানেন। শুধুমাত্র আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এ বিষয়ের অবতারণা করলাম।

 

আখলাক ও আদালতের মধ্যকার সম্পর্ক

এখন আমি আমার মৌলিক আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। আমার বিষয় হলো, আখলাক এবং আদালতের মধ্যে সম্পর্ক।

আমাদের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে আদালতের সাথে চারটি পরিভাষার সম্পর্ককে আলাদা আলাদা গ্রন্থ কিংবা অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো—

১. আদালতের সাথে আখলাকের সম্পর্ক।

২. আদালতের সাথে (مَرْحَمَةٌ) মারহামাত বা দয়ার সম্পর্ক।

৩. আদালতের সাথে ইহসানের সম্পর্ক এবং

৪. আদালতের সাথে আকলের সম্পর্ক।

ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমায় আদালতের সাথে রহমতের সম্পর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে আগে জুলুমকে বর্ণনা করেছেন। আদালত এবং জুলুম নামক পরিভাষা দুইটি, হক্ব ও বাতিলের মতো বিপরীত অর্থবহনকারী দুটি পরিভাষা হিসেবে কোরআনে কারীমে ও হাদীসে বিবৃত হয়েছে।

ইবনে খালদুন মুকাদ্দিমায় বলেন—

أَنَّ الظُّلْمَ مُؤَذِّنٌ بِخَرَابِ الْعُمْرَان

অর্থ : “জুলুম সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনে।”

এরপর তিনি বলেন, আদালত কেবলমাত্র বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত কোনো বিষয় নয়। বিচার বিভাগ আদালতের খুব সামান্য অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে। আদালতের উপরে যদি জুলুম বিজয় লাভ করে তাহলে মানুষের নিয়তের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়, মুয়ামালাত বিনষ্ট হয়ে যায়, সর্বত্র হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, অবাধ্যতা ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে, জিনিসপত্রের দাম, চুরি ডাকাতি এবং দরিদ্রতা বেড়ে যায়। মানুষ বিভিন্ন ভাগে বিভাজিত হয়ে পড়ে, বিভিন্ন দল ও উপদলের সৃষ্টি হয় এবং তারা একে অপরের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে দেশ ও সমাজ থেকে শান্তি-শৃঙ্খলা বিদায় নেয়। জুলুমের কারণেই মূলত এসব হয়ে থাকে।

মাঝে মধ্যে আমি নিজেই নিজের কাছে অনেক প্রশ্ন করি। এর মধ্যে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি করি সেটি হলো, ‘মুসলিম উম্মাহ কেন আজকের এই অবস্থায়?’ কোরআন আমাদের কাছে, সুন্নত আমাদের কাছে, হাদীস আমাদের কাছে, ইসলাম আমাদের কাছে, ইযযত ও সম্মান আমাদের কাছে, সকল প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের কাছে। এক কথায় বলতে গেলে সবকিছুই আমাদের কাছে। এত কিছু থাকার পরেও মুসলিম উম্মাহ এই অবস্থায় কেনো?

আমার কাছে মনে হয় এর একটি জবাব রয়েছে। আর সেটি হলো, মুসলিম দেশসমূহে ‘আদালত’ নেই। যেখানে আদালত প্রতিষ্ঠিত থাকে না, ইসলাম সেখানে আমানত হিসেবে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে মাত্র। ইসলামের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো সমগ্র দুনিয়াতে আদালত প্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত না থাকলে ইসলামের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থেকে যায়। সে উদ্দেশ্যটি যদি পূর্ণ না হয়, আমরা সকলে হাফেজ হয়ে সারাদিন কোরআন তেলাওয়াত করলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না।

আমাদের প্রাচীন বই-পুস্তকে ও সাহিত্যে খুব সুন্দর একটি ইখতিলাফ রয়েছে, সেটা হলো আদালত বড় নাকি মারহামাত বড়? এটি একইসাথে ভুল আবার সঠিক।

এর সঠিক জবাব হলো শর্তহীন আদালত মারহামাতের চেয়ে বড় নয়, একইভাবে শর্তহীন মারহামাত আদালতের চেয়ে বড় নয়। কিছু কিছু স্থান আছে যেখানে মারহামাত আদালতের চেয়ে বড় বা আদালতের উপর প্রাধান্য পাবে। আবার কিছু কিছু স্থান আছে যেখানে আদালত মারহামাতের চেয়ে বড় এবং এর উপর প্রাধান্য পাবে।

আমরা প্রতি জুমুয়া’র খুতবায় আদালত ও ইহসানের মধ্যকার সম্পর্ক শুনে থাকি। জুমুয়া’র খুতবায় আদালত ও ইহসান সম্পর্কিত একটি আয়াত পড়ার প্রথা চালু করেন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র.)। অর্থাৎ দ্বিতীয় ন্যায়পরায়ণ উমর এই ধারা চালু করেন। তার সময় থেকে আজ পর্যন্ত দুনিয়ার যত স্থানে জুমুয়া’র নামাজ আদায় করা হয় প্রতিটি স্থানে জুমুয়া’র খুতবায় এই আয়াতটি পড়া হয়। আয়াতটি হলো—

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ

অর্থ : “আল্লাহ আদালত ও ইহসানের নির্দেশ দিয়েছেন।”

এই আয়াতের তাফসীরে দেখা যায়, এমন অনেক স্থান রয়েছে যেখানে ইহসান আদালতের উপর প্রাধান্য পায় আবার আদালতও ইহসানের উপর প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে, ভাই-বোনদের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ আদালতের উপর প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ এসকল ক্ষেত্রে আদালতের চেয়ে ইহসান বড়। কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদালতই হবে মূলভিত্তি। এই সকল ক্ষেত্রে আদালত ইহসানের উপর প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ এখানে ‘আদালত’ দয়ার্দ্রতা ও ইহসানের চেয়ে বড়। এর অর্থ এই নয় যে, এখানে দয়ার্দ্রতা মোটেই থাকবে না।

এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে আদালত প্রতিষ্ঠা জায়েজ নয়, ক্ষেত্রবিশেষ হারামও। আপনারা হয়তো বলবেন আদালত আবার হারাম হয় কী করে? যেমন ধরুন, আপনার মা অথবা বাবা অন্যায় ভাবে আপনাকে থাপ্পড় দিলো, আপনি কি আদালত প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাকে আঘাত করা তো দূরের কথা হাত তোলার কথা কি কল্পনাও করতে পারবেন?

এই জন্য পারিবারিক ব্যাপারে, বন্ধুদের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পারিক আচরণের ক্ষেত্রে ‘ইহসান’ হলো মূল ভিত্তি। এসব ক্ষেত্রে আদালতের চেয়ে ইহসান ও মারহামাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমন, আদালতের প্রয়োগ সম্পর্কিত আয়াতসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি আয়াত হলো—

 وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا 

অর্থ : “খারাপের প্রতিদান সমপর্যায়ের খারাপ।”

এ আয়াতের দিকে গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, দ্বিতীয় খারাপকে আদালতের স্থানে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ফলাফলের দিক থেকে আদালত প্রতিষ্ঠা হয়, কিন্তু সেই ঘটনাটিকে যদি ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যায় যে, এটিও একটি খারাপ বিষয়। যেমন, কিসাসের কথাই ধরুন। কোনো লোক যদি কাউকে হত্যা করে তাহলে তাকেও হত্যা করা হয়। এটা আদালতের দাবি, কিন্তু ফলাফলের দিক থেকে যার উপর কিসাস প্রয়োগ করা হচ্ছে সেই লোক অন্য একজনকে হত্যা করার কারণে তাকেও হত্যা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফলাফলের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, একজন মানুষকে মারা হচ্ছে। তবে এখানে কিসাস প্রয়োগ জায়েজ হওয়ার কারণ হলো, আরও খারাপ বিষয় তথা অন্যান্য হত্যাকাণ্ডকে প্রতিহত করার জন্য। এই জন্যই আল্লাহ বলেছেন—

 وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ

অর্থ : “তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে।”

একইভাবে একজন মানুষের কথা চিন্তা করুন, সে এক জায়গায় চাকরি করে। কিন্তু সে তার উপর অর্পিত দায়িত্বকে সঠিকভাবে পালন করে না। সে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার কারণে এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার কারণে, এই প্রতিষ্ঠান পরিচালকের দায়িত্ব হলো সেই লোককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা। আদালতের দাবিও এটাই। কিন্তু যদি দেখা যায় যে, তাকে যদি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় তাহলে তার সন্তানরা অভুক্ত থাকবে, সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে ইত্যাদি। এমতাবস্থায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যাবে কিনা? এই বিষয় নিয়ে আমাদের ফিকহের কিতাবসমূহে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে এই ক্ষেত্রে ইহসান বা দয়ার্দ্রতাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে সেই অনুযায়ী ফয়সালা করতে হবে। তবে যদি দেখা যায় যে, তাকে চাকরিতে রাখলে তার পরিবারের যতটুকু না ক্ষতি হবে তার চেয়ে সমাজ বা দেশের ক্ষতি বেশি হবে তাহলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এ কাজ করতে পারবোনা। যতক্ষণ সম্ভব তাকে চাকরিতে বহাল রাখার চেষ্টা করবো।

রাসূলে আকরাম (স.) যখন মক্কা বিজয়ের লক্ষ্যে মক্কায় যাচ্ছিলেন, তখন সবার মনেই প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিলো। কারণ এই মক্কাবাসীরাই দশ বছর আগে তাদের সকল সম্পদ দখল করে নিয়ে সম্পূর্ণ খালি হাতে তাদেরকে মক্কা থেকে চলে আসতে বাধ্য করেছিলো। যারা তাদের সাথে এই আচরণ করেছিলো কয়েকদিন পরেই তাদের সাথে দেখা হবে।

রাসূল (স.) ইসলামের ঝাণ্ডাকে সা’দ বিন উবাদা (রা.) এর হাতে তুলে দিলেন। মক্কায় যাওয়ার পথে সা’দ বিন উবাদা তাঁর ঘোড়ার পিঠে বসে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে বলছিলেন—

اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ – اَلْيَوْمَ يَوْمُ أَذَلّ اللّهُ قُرَيْشًا- اَلْيَوْمَ يَوْمُ اَحَلَّ اللهُ دِمَاءً

অর্থ: “আজ যুদ্ধের দিন, আজকে এমন দিন যেই দিনে আল্লাহ কুরাইশদেরকে অপমানিত করবেন, আজ এমন দিন যে দিন আল্লাহ রক্তপাতকে হালাল করেছেন।”

সা’দ বিন উবাদা (রা.)-এর মুখে একথা শুনে রাসূলে আকরাম (স.) তার হাত থেকে ইসলামের ঝাণ্ডা নিয়ে নেন এবং তা আলী (রা.)-এর হাতে তুলে দিয়ে রাসূল (স.) নিজের উটের পিঠে দাঁড়িয়ে বলেন—

اَيُّهَا النَّاسُ اَلْيَوْمَ يَوْمُ الْمَرْحَمَةِ – الْيَوْمَ يَوْمُ اَعَزَّ اللّهُ قُرَيْشًا – الْيَوْمَ يَوْمُ حَرَّمَ اللهُ دِمَاءً

অর্থ: “হে মানুষ সকল! আজ দয়ার্দ্রতা দেখানোর দিন, আজ এমন দিন যেদিন আল্লাহ কুরাইশদেরকে সম্মানিত করবেন। আজ এমন দিন যেদিন আল্লাহ রক্তপাতকে হারাম করেছেন।”

অতঃপর তিনি মক্কা বিজয়ের পর সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি জানো আমি আজ তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করবো?”

এ বাক্যটা শোনার সাথে সাথে সম্ভবত কুরাইশদের চোখের সামনে তাদের কৃত জুলুম নির্যাতন, হিংস্রতা ও বর্বরতার দুই দশকের কালো ইতিহাস একটা সিনেমার ছবির মত ভেসে উঠেছিলো। তাদের বিবেক হয়তো অনুশোচনায় বিদীর্ণ হবার উপক্রম হয়েছিলো। হয়তো চরম অসহায়ত্ব ও অনুতাপের অনুভূতি নিয়েই তারা বলে উঠেছিলো—

“একজন মহানুভব ভাই এবং মহানুভব ভ্রাতুস্পুত্রের মতো।” জবাবে রাসূল (স.) ঘোষণা করলেন—“তোমাদের উপর আজ আর কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।”

আপনারা এই বিষয়ে সকলেই জানেন। সীরাত গ্রন্থসমূহে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

উল্লিখিত ঘটনা আর বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ঐতিহাসিক একটি ঘটনার সাথে দেশের বিচার বিভাগকে এক করে ফেললে চলবে না। তবে আমাদের সমাজ থেকে দয়ার্দ্রতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা যেনো উঠে যাচ্ছে। যার ফলে রহমতবিহীনতা সমাজের সকল ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে। আমি মনে করি আপনাদের কাছে যে সকল মামলা এসে থাকে তার কারণ যদি অনুসন্ধান করা হয় তাহলে দেখা যাবে, অধিকাংশ মামলার মূলে হলো ইহসান, দয়ার্দ্রতা এবং ভ্রাতৃত্ব না থাকা।

আমাদের প্রখ্যাত দার্শনিক আল ফারাবী, আইন ও বিচারবিভাগকে আখলাকের সর্বনিম্ন স্তর বলে বিবেচনা করে থাকেন। অর্থাৎ, ফজিলত  (فضيلة) ও আদালতকে যদি একে অপরের সাথে তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে, ফজিলত (فَضِيلَةٌ)  অনেক বেশি বিস্তৃত ও বিশাল। পক্ষান্তরে আদালত হলো ফজিলতের (فَضِيلَةٌ) একটি অংশমাত্র।

 

আখলাক ও দ্বীনের মধ্যকার সম্পর্ক

আখলাক ও দ্বীনের মধ্যকার সম্পর্ক বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের মুসলমানদের সমস্যা রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্ককে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি না। আমরা আখলাককে আকীদা ও ইবাদতের বাহিরের একটি বিষয় বলে গণ্য করি। আমরা মনে করি, আখলাক হলেও হবে, না হলেও হবে! এটা অনেক বড় একটি ভুল। আখলাক হলো আইনের আকল।

মরক্কোর বিখ্যাত দার্শনিক আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বলেন—

اَلْأَخْلَاقُ عَقْلُ الْأَحْكَامِ

অর্থ : “আখলাক হলো, আহকামের আকল।”

মূলত আদালতেরও মূল উদ্দেশ্য হলো, এই দুনিয়াতে আখলাকের প্রতিষ্ঠা। ‘আদালত’ যেমন শুধু মানুষ ও সমাজ সম্পর্কিত একটি পরিভাষা নয়, তেমনিভাবে আখলাকও কেবলমাত্র মানুষ ও সমাজ সম্পর্কিত একটি পরিভাষা নয়। আখলাক একই সাথে সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত। খালক হলো আমাদের জাগতিক বা ফিজিক্যাল অস্তিত্ব আর খুলক হলো আমাদের আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব। মানুষের ফিজিক্যাল অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা যতটা ক্ষতিকর মানুষের আধ্যাত্মিক অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলাটাও ততটাই ক্ষতিকর।

এজন্য আমাদের দার্শনিকগণ আদালতকে আখলাকের একটি শাখা হিসেবে বিবেচনা করেন।

আপনারা জানেন—

  • ভালো ও মন্দের মধ্যকার পার্থক্য থেকে আখলাকের সৃষ্টি হয়েছে।
  • সঠিক ও ভুলের মধ্যকার পার্থক্য থেকে আদালতের সৃষ্টি হয়েছে।
  • সুন্দর ও অসুন্দরের মধ্যকার পার্থক্য থেকে নন্দনতত্ত্ব বা এসথেটিকস এর সৃষ্টি হয়েছে।

এসব বিষয় সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা কোনোভাবেই সঠিক হবে না। যেটা সঠিক একই সাথে সেটা সুন্দর, যেটা সঠিক একইসাথে সেটা ভালো। যেটা খারাপ একই সাথে সেট ভুল, যেটা ভুল একই সাথে সেটা কুৎসিত। এই সব বিষয়কে একে অপর থেকে পৃথক করা সম্ভব নয়।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

১৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ তুরস্কের একজন প্রথিতযশা আলেম। জীবন্ত কিংবদন্তি এ আলেমে দ্বীন ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬২ সালে তুরস্কের গাজিআনতেপ শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কাছেই সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর উসমানী ধারার প্রখ্যাত আলেম, 'মেহমেদ আমীন আর' এর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ড. গরমেজ পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত উসমানী খিলাফতের সময়কালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের সময় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন উস্তাদ 'মেহমেদ আমীন আর' এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেসময় তিনি একইসাথে গাজিআনতেপ মাদরাসায়ও পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিওলজি বিভাগে ভর্তি হন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রী লাভ করার পর হাদীস বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন এবং খাতীব আল বাগদাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ شرف أصحاب الحديث-এর মুহাক্কিক প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ প্রফেসর ড. সাঈদ হাতীবওলুর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল, 'মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েফের চিন্তা ও দর্শন'।
মাস্টার্স করার সময়ে তিনি মিশরে গমন করেন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কায়রোতে অবস্থান কালে মিশরের স্বনামধন্য ফকীহ মুহাম্মদ সেলিম আল-আরওয়াহ এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস রিফাত ফাওজীর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। এক বছর কায়রোতে অবস্থান করার পর পুনরায় তুরস্কে ফিরে আসেন এবং পুনরায় আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট (PhD) শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে কৃতিত্বের সাথে তিনি তাঁর PhD শেষ করেন। তার PhD-এর থিসিস ছিলো "সুন্নত ও হাদীস বুঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সমস্যা।" PhD চলাকালীন সময়ে তিনি এক বছর লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখানে 'স্কুল অফ অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ' এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এ থিসিস ১৯৯৬ সালে তুরস্কের ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর গবেষণা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে এবং সে বছর এ গবেষণার জন্য তুর্কী সরকার তাকে গবেষণা পুরস্কার প্রদান করে। তার এ থিসিসটি আরবী ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ থিসিসের কারণে তিনি তাঁর একাডেমিক জীবনের অধিকাংশ সময় 'উসূলে ফিকহ' অধ্যয়নে ব্যয় করেন এবং এ সময়ে তিনি একজন উসূলবিদ হয়ে উঠেন।
এযাবৎকাল পর্যন্ত তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মুহাদ্দিস, উসূলবিদ, আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেছেন ও বিভিন্ন গবেষণায় তাদের থেকে বহু জ্ঞান অর্জন করেন। এছাড়াও উসমানী ধারার বড় বড় দার্শনিকদের সান্নিধ্যে দীর্ঘসময় পড়াশোনা করেন। তিনি আহমেদ ইয়েসেভি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজেত্তেপে বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন-ইসলাম শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান নেতা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান-এর সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
২০০৩ সালে তিনি Presidency of the Republic of Turkey Presidency of Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতাও জারি রাখেন এবং ২০০৬ সালে প্রফেসর হন। দীর্ঘ ৭ বছর এ Religious Affairs এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি Religious Affairs- এর প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ গুরু দায়িত্ব পালন কালেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান এবং এক মুহূর্তের জন্যও জ্ঞান গবেষণায় বিরতি দেননি। এ সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ আলেমদের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। গাজা, আরাকান, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য এশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের মুসলমানদের সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালান। Religious Affairs-এর প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অবরুদ্ধ গাজা সফর করেন এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংহতি ঘোষণা করেন। গাজাতে অবস্থানকালে তিনি অবরুদ্ধ গাজাবাসীর খোঁজ-খবর নেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে যান এবং ঐতিহাসিক এক খুতবা প্রদান করেন।
২০১৭ সালে Religious Affairs-এর দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হলো International Islamic Though: Foundation অপরটি হলো Institute of Islamic Thought. বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠান দুটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top