বলা হয়ে থাকে, যুবসমাজই হচ্ছে মানব সভ্যতার প্রাণ। তাই বাহবা দেওয়া হয় সেই সভ্যতাকে যার যুবকগণ সংখ্যায় বেশি, বুদ্ধিমান, শিক্ষিত এবং পরিশ্রমী। শান্ত মনে বহমান অশান্ত এ পৃথিবীতে কেমন আছে আজকের এ যুবসমাজ? সভ্যতা উন্নয়নের আলাপে এ প্রশ্ন আজ খুবই যুক্তিসঙ্গত।
ব্যক্তিগত জীবন, ক্যারিয়ার, পারিপার্শ্বিকতা, সোশ্যাল মিডিয়া, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বিশ্বায়ন – প্রতিটি জিনিসের অসহায় বাহকে পরিণত হয়েছে আজকের যুবক-যু্বতীগণ। যৌবনের এ সময়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‘আমিত্ব, ব্যক্তিত্ব ও পরিচয়’ সম্পর্কে জানার কথা থাকলেও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, নিজেকে এ প্রশ্ন করার আর এর সঠিক উত্তর জানার মত পর্যাপ্ত সময় তারা পাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে তারা শুধুই রূহহীন এক শরীরে পরিণত হচ্ছে। যা কেবল যুবসমাজে তাদের সংখ্যাই বৃদ্ধি করছে বটে, কিন্তু দুনিয়া বিনির্মাণের যুবশক্তিতে পরিণত করছে না। সকল সভ্যতার জন্যই তা ক্ষতির অসহনীয় সংকেত। বিশেষ করে ইসলামী সভ্যতার জন্য।
এই দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে মুসলিম উম্মাহ-র প্রখ্যাত আলেম, শিক্ষাবিদ ও উসূলবিদ উস্তায প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ এক অসাধারণ কাজ হাজির করেছেন। যেখানে তিনি যুবসমাজকে তার ভিতর থেকে পাঠ করার চেষ্টা করেছেন, তাদের হৃদয়ের স্পন্দনকে শোনার চেষ্টা করেছেন। বাস্তবতা অনুযায়ী দিন কে দিন যেখানে আলেমদের থেকে যুবকরা তাদের স্নেহের বন্ধন বিচ্ছিন্ন করায় ব্যস্ত, সেখানে মুসলিম উম্মাহ-র অন্যতম প্রখ্যাত আলেম নিজে যুবকদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি হাজির হয়েছিলেন বিভিন্ন সেমিনার ও কনফারেন্সে। যেখানে তিনি যুবকদের হয়ে, তাদের পক্ষ নিয়ে, ভারাক্রান্ত মনের মাঝে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। প্রশ্নের ধরণ, প্রদেয় উত্তরের উপযোগিতা এবং বিশ্বব্যাপী যুবসমাজের অভিন্ন সংকটকে সামনে রেখে উস্তায তাঁর বক্তব্যসমূহ সংকলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। “বিশ্বায়নের যুগে যুবজিজ্ঞাসা” গ্রন্থটি সেই চিন্তারই পরিণত ও সুসংগঠিত রূপ।
বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উস্তায যুবক-যুবতীদের মনের কোণে জমে থাকা প্রশ্নের অনুসন্ধান করেছেন, তাদের বুঝতে চেষ্টা করেছেন, চাহিদার আলোকে উত্তর হাজির করার চেষ্টা করেছেন, দ্বীন ইসলাম থেকে দূরে সরে নয় বরং দ্বীনকে আপন করে নিয়ে ইলাহিয়্যাতের মধ্যেই প্রশান্তি খোঁজার আহ্বান তিনি তাদের করেছেন। যেমনটি কোরআনে আল্লাহ বলেছেন-
فَاَقِمۡ وَجۡہَکَ لِلدِّیۡنِ حَنِیۡفًا ؕ فِطۡرَتَ اللّٰہِ الَّتِیۡ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیۡہَا ؕ لَا تَبۡدِیۡلَ لِخَلۡقِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ٭ َلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٭ۙۙۙ
অর্থাৎ, “কাজেই তুমি একনিষ্ঠ হয়ে তোমার সকল কিছু নিয়ে তোমার দ্বীনের দিকে মনোনিবেশ করো। আল্লাহ মানুষকে যে ফিতরাতের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন সেই দিকে ধাবিত হও। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো ধরণের পরিবর্তন হতে পারে না। মূল্যবোধের মাধ্যমে সজ্জিত সঠিক দ্বীন এটাই।“
অসাধারণ এ বইটির প্রথম অংশ পাঠ করার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব তিনি যুবকদের কতটুকু ভালোবাসেন। যুবকদেরকে তিনি স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করতে চান। এবং এভাবেই তাদের বলতে চান-“ প্রিয় তরুণ ভাই ও বোনেরা, এই কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমরা মুরুব্বী হিসেবে তোমাদের জন্য একটি বসবাসযোগ্য দুনিয়া তৈরি করতে পারিনি। যদি আজকের দুনিয়ায় আদালত ও মারহামাতের কোনো অভাব হয়ে থাকে এবং যুলুম ও নির্যাতন চলতে থাকে তাহলে এর কারণ তোমরা নও। ……… কেননা এই দুনিয়া তোমরা গড়ে তোলোনি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই দুনিয়া তোমাদের জন্য আমরা প্রস্তুত করেছি।“ ঠিক এভাবেই নিজের উপর দায় চাপিয়ে নিয়ে, উস্তায যুবকদের বলতে চান, “ তোমাদেরও একই ভুলে নিপতিত হওয়া যাবে না। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তোমাদের প্রয়োজন। তাই তোমরা নিজেদের গড়ে তুলবে এবং সুন্দর একটি দুনিয়া বিনির্মাণ করবে।“
হাজারো হতাশার ভিড়ে, আমি কে, কি আমার পরিচয়, আমি কেমন একজন মানুষ, কোন ইতিহাস, কোন সভ্যতা, কোন সংস্কৃতি, কোন উম্মতের সন্তান আমি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া খুবই জরুরী। কেননা আত্নপরিচয় জানার মাধ্যমেই কেবল আত্নবিশ্বাসী হওয়া সম্ভব।
বইয়ের বাকি পুরোটা অংশে উস্তায এ প্রশ্নের উত্তরগুলোই হাজির করার চেষ্টা করেছেন।
অর্থবহতার প্রশ্নে মানবতার অনুসন্ধান শিরোনামে উস্তায মেহমেদ গরমেজ বইটির দ্বিতীয় অংশে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের দিকে আলোকপাত করেছেন। তা হলো বর্তমান যুবসমাজ আজকে অর্থবহতার সংকটে নিপতিত। তারা তাদের জীবনের, পারিপার্শ্বিকতার, এ মহাসৃষ্টির অর্থ দাঁড় করাতে পারছে না। যা তাদের হীনমন্যতায় ভুগাচ্ছে। উস্তায এ অংশে মূলত কিভাবে যুবক-যুবতীরা এ সংকট থেকে মুক্তি পেতে পারে, তার সূচনা আলাপ করেছেন।
সূচনা আলাপ পরবর্তী তৃতীয় অংশে, উস্তায একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চেয়েছেন। তা হল দ্বীনের সাথে ফারাক সম্পর্ক নিয়ে তরুণদের একটা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। দ্বীন ইসলামের মতো সামগ্রিক একটি পথ থাকতেও কেন এমন হচ্ছে? তার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ তিনি এ অংশে হাজির করার চেষ্টা করেছেন। সেগুলো হচ্ছে –
১- দ্বীন ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক
২- দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক
৩- দ্বীন ও আকলের মধ্যকার সম্পর্ক
৪- দ্বীন ও বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্ক
৫- দ্বীন ও সংস্কৃতির মধ্যকার সম্পর্ক
৬- দ্বীন ও আখলাকের মধ্যকার সম্পর্ক
৭- মানুষ ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ক
উপরের এ কারণগুলোতে তিনি তুলে ধরেছেন, দ্বীনের সাথে প্রত্যেকটি বিষয়ের যে তুলনামূলক আলাপ, তা সামগ্রিকতার বিপরীতে কিছু নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বর্তমানে যুবসমাজের কাছে প্রচলিত। যা দ্বীনকে কেবল তাদের মাঝে সংকীর্ণ ‘ধর্মীয় বার্তা’ হিসেবে হাজির করে। বর্তমান যুবসমাজের জন্য যা একটি অপছন্দনীয় ব্যাপার।
উস্তায গরমেজ এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এবং সামগ্রিকতার আলোকে তবে সংক্ষেপে তা বইয়ের এ অংশে তুলে ধরেন।
রবের সাথে মানুষের তিন মীসাক, চতুর্থ অংশ– এখানে উস্তায গরমেজ আমাদের একটি ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তা হল রবের সাথে বান্দার কৃত অঙ্গীকার। যার উপর ভিত্তি করেই মূলত রবের সাথে মানুষের সম্পর্কের প্রাচীর নির্মিত হয়েছে। কোরআনে রব ও বান্দার মধ্যে কৃত এরকম তিনটি অঙ্গীকার বা মীসাকের উল্লেখ রয়েছে।
সেগুলো হচ্ছে-
১- মীসাকুশ শাহাদা
২- মীসাকুল আমানা
৩- মীসাকুর রিসালা
জীবনের অর্থবহতা খুঁজে পেতে এই মীসাক বা চুক্তিসমূহ একটি নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে উস্তায এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। উস্তাযের সাবলীল ভাষায় সাজানো এ প্রবন্ধ পাঠ করলে আমি বিশ্বাস করি বান্দা তার রবকে খুঁজে পাবে।
মানবেতিহাসের সূচনাকাল থেকে নিয়ে আজকে পর্যন্ত মানুষ তাঁর নিজস্ব সত্ত্বা, মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্যকে নিয়ে বহু চিন্তা ও দর্শন দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু কোনো চিন্তা-দর্শনই স্থিতিশীলতে পায়নি । বইটির পঞ্চম অংশে উস্তায ইলাহী দৃষ্টিকোণের আলোকে অসাধারণ একটি চিন্তা হাজির করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ তার নিজস্ব স্বত্তাকে খুঁজে পেতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি মানুষকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলোঃ-
১- বাশারিয়্যাত
২- আদামিয়্যাত
৩- ইনসানিয়্যাত
এখানে মানুষ প্রথমে তার বাহ্যিক রুপ সম্পর্কে অবগত হবে অর্থাৎ রক্ত, মাংস ও চামড়ায় সৃষ্ট একটি জীব হিসেবে। পরবর্তী পর্যায়ে সে নিজেকে অভ্যন্তরীণ ভাবে চিনতে পারবে এবং নৈতিক হিসেবে গড়ে ওঠবে। তবে বাশারিয়্যাত থেকে আদামিয়্যাতের স্তরে উন্নীত হতে ৫টি মূল্যবোধের প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। পর্যায়ক্রমে ইনসানিয়্যাতের পর্যায়ে উপনীত হওয়ার মাধ্যমে সে কেবল তাঁর নিজকে আবিষ্কার করবে না বরং একই সাথে এমন একটি সত্ত্বায় পরিণত হবে যে সত্ত্বা তাঁর আধ্যাত্নিক অস্তিত্বকে আবিষ্কার করবে। এ পর্যায়ে উন্নীত হতেও লেখক ৫টি মূল্যবোধের উল্লেখ করছেন। প্রতিটি মানুষের উচিত এভাবে নিজেকে চিন্তা করা, চেনার চেষ্টা করা। আমি বিশ্বাস করি এই চিন্তা আর চেষ্টা তাকে কখনো হতাশ করবে না বরং আত্নপরিচয়ে পরিচিত করে তুলবে।
বইটির ষষ্ঠ অংশে উস্তায তুলে ধরেছেন হাকীকত অনুসন্ধানকরীর পথনির্দেশিকা। একজন হাকীকত অনুসন্ধানকারীর জন্য কোন পথে আগানো উচিত? আলেমগণ ও মুতাফাক্কিরগণ অনুসন্ধানী এ জীবনকে ৩টি ভাগে বিভক্ত করেছেন। যেমনঃ-
১- মা’রেফাতুল্লাহয় উপনীত হওয়া।
২- তাযকিয়াতুন নাফসের অধিকারী হওয়া।
৩- তাহহিহ-ই আমলের মাধ্যমে হাকীকতে পৌঁছানো ।
এ পথ অবলম্বন করার মাধ্যমে কিভাবে একজন মানুষ আল্লাহকে চিনবে, তাঁর সাথে সম্পর্ক ভালো করে তুলবে, সকল খারাপ থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তুলবে এবং এ পথে টিকে থাকার মাধ্যমে রহমানী আখলাকের অধিকারী হয়ে, কিভাবে সমগ্র সৃষ্টি জগতকে আপন করে নিবে, তারই বর্ণনা উস্তায এখানে হাজির করেছেন।
আলেমগণের মাঝে ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যবস্থার এহেন পরিস্থিতিতে, ধর্ম নিয়ে অযথা তর্ক বিতর্ক খুবই অপ্রত্যাশিত একটি কাজ। এটা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করছে। যুবক-যুবতীরা যেই সৌন্দর্য দেখে ইসলামের তার প্রতি আকৃষ্ট হবে, অহেতুক তর্ক বিতর্ক সেই সৌন্দর্য্যকে নষ্ট করছে। আলেমগণের উপর সাধারণ মানুষের বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হচ্ছে। উস্তায এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে বইটির সপ্তম অংশে, অযথা বিতর্ক থেকে বিরত থাকা, পাশাপাশি সেই ইখতেলাফকে আখলাকে পরিণত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এবং তা কিভাবে সম্ভব তার যথাযথ উপস্থাপনা তিনি এখানে করেছেন।
পাশ্চাত্য সভ্যতার এই আগ্রাসী ব্যবস্থাপনাময় বিশ্বে, মুসলিম যুবক হিসেবে নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকাটা খুবই চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতে যুবক-যুবতীদের সামনে উপযুক্ত মডেল হাজির করতে না পারলে এরা হতাশায় নিমজ্জিত হবে। ভেঙে পড়বে। যুবকদের মাঝে তৈরি বিস্তৃত এ হতাশা যেকোনো সভ্যতার জন্য একটি ভয়ানক ব্যাপার। উস্তায এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে আসহাবে কাহাফ, সাহসী যুবকদের সেই কাহিনী তিনি বইটির অষ্টম অংশে তুলে ধরেছেন । উস্তায তাদেরকে বর্তমান যুবক-যুবতীদের জন্য মডেল হিসেবে হাজির করেছেন। যারা নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে রক্ষা করবে বলে ঐ সময়ের পরাশক্তি রাজার সামনে নিজেদের মাথা নত করেনি। বরং নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং একান্ত সাহায্যকারী রুপে আল্লাহকে পেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে যাদের কাহিনী সমগ্র মানবতার জন্য আজও শিক্ষনীয়।
ইসলামের অনেকগুলো বিষয় ভুল ভাবে অথবা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সমাজে প্রসিদ্ধি লাভ করায়, যুবক-যুবতীদের বড় একটি অংশ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বা যেতে চায়। এসব বিষয়গুলোর মধ্যে প্রথম সারির একটি হল পর্দা সংক্রান্ত বিষয়।
সুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় পর্দা খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি অংশ। একে অনীহা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এত গুরুত্ত্ব বহতা সত্ত্বেও পর্দা নিয়ে রয়েছে হাজারো বিতর্ক । যাকে ইসলামবিদ্বেষীরা নিজেদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে।
তার কারণ একটাই সেটা হচ্ছে পর্দাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উপস্থাপন । যে, পর্দা শুধু মেয়েদের জন্যই ফরয, ছেলেদের জন্য তেমন প্রয়োজন নেই বা ফরয নয়, মেয়েদের বাহিরে বের হওয়া নিষেধ, বাহিরের কারো সাথে কথা বলা প্রয়োজনহীন, তাই তাদের উচিত ঘরে থাকা, ইত্যাদী বিভিন্ন একঘেয়েমির আলোকে পর্দাকে হাজির করে মেয়েদের উপর একধরণের চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে । যা সম্পুর্ণ ইসলাম গর্হিত কাজ।
বইটির নবম অংশে উস্তায পর্দাকে কোনো নারী-পুরুষের পালনীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করে বরং ‘মানুষ’ এর উপর ভিত্তি করে আলোচন করেছেন । বর্তমান সময়ে প্রচলিত চিন্তা থেকে অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক অর্থবোধক আকারে এখানে তুলে ধরেছেন । যা তিনি ৫টি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে ৫টি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পেশ করেছেন । যেমন-
১- পর্দার ব্যাপারে ফিতরাতী দৃষ্টিকোণ ।
২- পর্দার ব্যাপারে কালামী দৃষ্টিকোণ ।
৩- পর্দার ব্যাপারে ফিকহী দৃষ্টিকোণ ।
৪- পর্দার ব্যাপারে আখলাকী দৃষ্টিকোণ ।
৫- পর্দার ব্যাপারে এস্থেটিক বা নান্দনিক দৃষ্টিকোণ ।
উপরের ৫টি দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে তিনি পর্দার সামগ্রিকতা, প্রয়োজনীতা এবং পর্দাকে আমাদের কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত, তার উপর অসাধারণ বয়ান হাজির করেছেন।
বইটির সর্বশেষ অংশে উস্তায কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। প্রশ্নগুলোর সারাংশ করলে দাঁড়ায়: ইসলামের জন্য কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বা ভবিষ্যতের ব্যাপারে ইসলামের রূপরেখা কী? ইসলাম নিজেকে কীভাবে তুলে ধরতে চায়?
ইসলামের ভবিষ্যৎ আলোচনায় হতাশাগ্রস্ত হওয়াটা বর্তমান প্রেক্ষিতে স্বাভাবিক ব্যাপার। উস্তাযের ভাষায় যেকোনো সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ভবিষ্যতের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়া। এটাই ওনাকে অনেক বেশি ভাবিয়ে তুলেছে । তাঁর এই ভাবনার আলোকে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে পতিত হওয়ার প্রধান কিছু কারণ তিনি তুলে ধরেছেন। বহির্গত ও অভ্যন্তরীণ অনেক কারণই রয়েছে, তবে উস্তায এখানে গুরুত্ত্ব দিয়েছেন এর পিছনে আমাদের দায়ী থাকার কারণসমূহের দিকে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, মুসলিম উম্মাহ যদি এই বিচ্যুতিগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে, তবে সমগ্র মানবজাতি যে আদর্শিক ইসলামের প্রতীক্ষায় দিন গুণছে, তার পুনর্জাগরণ নিশ্চিতভাবে সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে বলা যায়, “বিশ্বায়নের যুগে যুবজিজ্ঞাসা” গ্রন্থটির একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা হল উস্তায শুধু নির্দিষ্ট বিষয় আলোচনা করেননি; বরং কেন এসব বিষয় সামনে এসেছে এবং এতে আমাদের দায় কতটুকু, তা বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি এর কারণসমূহ ও উত্তরণের সম্ভাব্য উপায়ও উপস্থাপন করেছেন। একজন পাঠকের যে প্রত্যাশা উস্তায সে অনুযায়ী তা যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে বইটি একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে।


