একুশ শতকের বাংলাদেশে সিনেমা ও মিউজিক অঙ্গন

এক.

আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনকে বৃহদাকারে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা- সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানা এবং ইসলামী ঘরানা। এখানে ইসলামী ঘরানা বললেও ইসলামী ঘরানার মাঝেও আছে আবার কয়েকটি ভাগ; যেমন- ক্বওমী-কেন্দ্রিক ধারা, পীর-কেন্দ্রিক ধারা, ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতের ধারা ইত্যাদি।

তবে এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই দু’টোর বাইরে যে আর কোনো ঘরানা নেই, তা নয়। যেমন, মধ্য ডানপন্থী ঘরানা-টাও আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনের বড় একটা অংশ; কিন্তু, আমরা যখন যুবমানসের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলবো, তখন আসলে এই ঘরানা ততোটা প্রভাবশালী হতে পারে না। এক পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় যে, এই চিন্তাঙ্গনে হয় সেকুলার-লিবারেল-বাম ঘরানার প্রভাব বেশি পড়েছে আর নাহয় ইসলামী ঘরানার প্রভাব বেশি পড়েছে।

আমাদের দেশের চিন্তাঙ্গনের এভাবে দুইভাগ হওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে দেখিয়েছেন লেখক ও গবেষক ফাহমিদ-উর-রহমান। তিনি তার ‘বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ বিতর্ক’ বইয়ে এই বিষয়টা ঐতিহাসিকভাবে টেনেছেন। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও চিন্তাঙ্গনকে একত্রে টেনে নিয়ে তিনি আলাপ তোলেন যে, ১৭৫৭-এর ইংরেজ-মুসলিম দ্বন্দ্বটা ১৯৪৭-এর সময় হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে রূপ লাভ করে; এবং ১৯৭১-এর পর তা সময়ে সময়ে কলকাতা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীতার অকল্যাণে আজকের এই পর্যায়ে এসে রূপ নেয়। আর এখানে সেকুলার, বাম ও লিবারেল ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ হলেও তাদের চিন্তাগত কমন শত্রু ইসলাম হওয়ার কারণে তারা ইসলামের বিপরীতে একত্রে জোটবদ্ধ হয়েছে।

আর এর প্রভাবের কারণেই আমাদের দেশের বিনোদন সেক্টর এবং যুবমানসের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গেলে উপরোক্ত দুইটি ধারাকে সামনে রাখতে হবে। এজন্যই হয়তো বিগত তিন দশকের যুবমানসে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনয়নের ফ্যাক্টর বা ক্ষেত্রগুলোয় কখনও ইসলামী ঘরানা আবার কখনও সেকুলার-বাম ঘরানার পাল্লা ভারী হয়েছে; যদিও ইসলামী ঘরানার পাল্লা ভারী হওয়ার ক্ষেত্র খুবই কম।

যাইহোক, বিনোদন মানেই তো আর সংস্কৃতি নয়, কিন্তু আমাদের দেশে এটাই যেহেতু সংস্কৃতির বড় একটি অংশ, তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিনোদন সেক্টর নিয়ে আলাপ তোলা প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে বিনোদন সেক্টরের দিকে নজর দিলে দুইটি দিককে সামনে রাখতে হয়। যথা- সিনেমা অঙ্গন এবং সঙ্গীত অঙ্গন।

 

দুই.

প্রথমেই আসা যাক সিনেমা অঙ্গনের ক্ষেত্রে…

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস নতুন নয়। অবাক করার বিষয় হলো, পুরো ভারতবর্ষের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির হাতেখড়ি হয় বাঙালিদের হাত ধরেই। কলকাতার প্রভাব বাংলায় পড়লে নবাবদের তত্ত্বাবধানেই ঢাকায় সিনেমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এজন্য ইংরেজ আমলেই এদেশে মুভি হয়েছে এবং থিয়েটারেও চলেছে। পাকিস্তান আমলেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনকি একাত্তরের সেই যুদ্ধের সময়েও সেই বছর বাংলাদেশে ৮টি সিনেমা মুক্তি পায়। একাত্তরের পর সিনেমা অঙ্গন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। যদি সেই সময়টায় জহির রায়হান বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো আজকের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসটাই ভিন্ন হতে পারতো।

একাত্তরের পর থেকে আমজাদ হোসেন ও চাষী নজরুল ইসলামের হাত ধরে বাংলাদেশের সিনেমা অঙ্গন ঘুরে দাঁড়ালে তৈরি হতে থাকে অসংখ্য সিনেমা হল। আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ভালো পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। এমনকি বলিউডকে টেক্কা দেওয়ার পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। যুবসমাজ-সহ সব বয়সীই তখন সিনেমার প্রতি ভালো রকমের আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

কিন্তু তারপর থেকে এটাকেই পুঁজি করে ব্যবসা করা শুরু হয়; শুরু হয় কাটপিস ও নোংরা মুভি নির্মাণ। সেজন্য নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে পড়ে যেতে বাংলার সিনেমার সুসময়। মূলত নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে সালমান শাহের মৃত্যু এই অঙ্গনে খারাপ সময়ের সূচনা করে দেয়। যাইহোক, সবমিলিয়ে মানুষ তখন হল বিমুখ হতে শুরু করে, যার প্রভাব আজও এদেশের সিনেমা অঙ্গন পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

নব্বইয়ের দশকের সিনেমার সেই স্বর্ণযুগের সময়ে বছরে ৭০-৮৫টি মুভি রিলিজ হলেও ২০১৫-১৬ সালে তা ১৫-তে এসে ঠেকে; এগুলোর ভেতর আবার ৯০ভাগই ছিলো অখাদ্য। কিন্তু, বর্তমানে রায়হান রাফি, তানিম নূর, রেদওয়ান রনি, মেজবাউর রহমান সুমন, শিহাব শাহীন-এর মতো পরিচালকের হাত ধরে বিগত কয়েক বছর ধরে এই খড়া কাটতে শুরু করেছে।
আবার প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে এদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিলো ১৪৩৫টি; ২০১৯ সালে এর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১৭৪-এ।

 

তিন.

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যখন কেবল-টিভি ও সিডি-ডিভিডি প্রচলিত হতে শুরু করে, তখন থেকে এদেশের জনসাধারণ আর সিনেমামুখী হতে চায়নি। আর সেই সময়টায় যেহেতু উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে টিভি ও সিডি-ডিভিডির প্রচলন হয়, আবার যেহেতু যুবসমাজ বরাবরই আধুনিকতাকে গ্রহণ করে থাকে, সেজন্য সেই সময় সিনেমা অঙ্গনের দিকটা যুবসমাজকে ভালোই প্রভাবিত করে। আর নয়া প্রযুক্তির সিনেমা-নাটকে তারাই বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে।

যখন বাংলাদেশে সিনেমার দুর্দিন চলছিলো, সেই সময় এখানে হাত দেন লেখক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ। তার হাত ধরেই বিএফডিসি-র বাইরেও ভালো ভালো সিনেমা আসতে থাকে। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ অনেককেই আবার তখন তিনি হলে টানতে শুরু করেন। এসময় হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও সামনে এগিয়ে আসেন। কিন্তু, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আসলে আর সেই অর্থে ঘুরে দাঁড়ায়নি। আশি-নব্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পীরা তখন হয় অন্যদিকে সরে যেতে শুরু করে আর নাহয় এই অঙ্গন থেকেই বেরিয়ে যায়।

যখন থেকে বিনোদনের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির এমন পতন হতে থাকে, তখন থেকে শুরু হয় নাটক-টেলিফিল্মের যুগ। হুমায়ূন আহমেদ একা হাতে তখন দায়িত্ব নিয়ে এই বিনোদন অঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা করেন। এক পর্বের নাটক থেকে শুরু করে ধারাবাহিক—সবখানেই তিনি পারদর্শিতা ও মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন।

সেই সময় হুমায়ূন-ফারুকীর পাশাপাশি আদনান আল রাজীব, রেদওয়ান রনি, ইফতেখার আহমেদ ফাহমি-এর মতো আরো অনেক পরিচালক এদিকে হাত দেন। তারা আর্বান কালচারকে সামনে তুলে আনেন; মিডল ক্লাসের সংগ্রাম ও জীবনধারাকে তুলে ধরতে শুরু করেন; সমাজে নিম্নবিত্ত পরিবারের অবস্থান নিয়ে কাজ করেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করেন। এর ফলে এই অঙ্গনটা স্বভাবতই যুবসমাজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।

একদিকে যে-ই সিনেমা সকল বয়সী মানুষের কাছেই পৌঁছতো, সে-ই সিনেমার দুর্দিন চলায়, দেশে টিভি-ক্যাসেট আসায় এবং সিনেমার পরিবর্তে এমনতর কন্টেন্টের প্রচলন বেশি হওয়ায় সকল বয়সী মানুষ থেকে সরে এসে এই পুরো অঙ্গনটাই যুবসমাজ-কেন্দ্রিক হয়ে যায়। আর এভাবেই যুবমানসের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারার সূচনা হয়।

যদি কেউ বিগত তিন দশকে বিনোদন জগতের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করেন, তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন বিনোদন জগতের এই নাটক অঙ্গনটা কীভাবে যুবসমাজের মাঝে প্রভাব বিস্তার করেছে। নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের শুরুর দশকের নাটক-টেলিফিল্মগুলো যুবসমাজকে কতোটা বুঁদ করে রেখেছিলো, তা বলার বাইরে। গত দশকের ঈদ ও বিভিন্ন উৎসব মানেই ছিলো বিভিন্ন জনরার নাটক-টেলিফিল্মের প্রচারণা। বিগত কয়েকবছর যেমন ঈদ এলেই সিনেমার একটা সাজ-সাজ রব পড়ে যায়, নাটক-টেলিফিল্ম নিয়ে ঠিক তেমনটাই হতো গত দশকে। যদিও বর্তমানে নাটক-টেলিফিল্মের মাঝেও ভালো গল্পের অভাব দেখা গেছে; তবে আবার ক্ষেত্রবিশেষে নাটকের অধঃপতন হয়েছে বললেও ভুল হবে না।

আর এসব দিয়েই যুবসমাজের মানসপটে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ এবং আধুনিকতার বার্তা দেওয়া হতো; আর সেই বার্তাতেই তারা প্রভাবিত হয়ে পড়তো। আধুনিক প্রযুক্তি এতোটা সহজলভ্য না হওয়ার পরেও যুবসমাজ যে তখন আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো, তার নেপথ্যে ছিলো এসব নাটক-টেলিফিল্ম।

 

চার.

আর অন্যদিকে, এসবের বিপরীতে তখন ইসলামী ঘরানায় টেলিভিশন বিষয়টাই হারামে সীমাবদ্ধ ছিলো; যদিও এই সিদ্ধান্ত দেওয়া তাদের অনেকেই এখন নিয়মিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান করে থাকে। আবার, সেই সময়ে টেলিভিশনকে হারাম করে দেওয়ার এমন সিদ্ধান্তও আসলে বৃহদাকারে যুবসমাজে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। শুধুমাত্র ইসলামী ঘরানার নির্দিষ্ট কিছু মতাদর্শের অনুসারীদের মাঝেই এমন ফতোয়া সীমাবদ্ধ ছিলো।

সিনেমার মতো মিউজিক অঙ্গনও ইসলামী ঘরানায় নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের শুরুর দশকে হারামে সীমাবদ্ধ ছিলো; এমনকি এখনও আমাদের দেশে মিউজিককে হারাম হিসেবেই দেখা হয়। অথচ, ইসলামের দৃষ্টিতেই মিউজিক কখনই সত্তাগতভাবে হারাম নয়; এটি একটি জ্ঞানের ধারা; এটি একটি প্রাচীন শিল্প। আমাদের দেশে মিউজিককে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয় বিধায় সতর্কতা হিসেবে আলেমগণ হারাম ফতোয়া দিতেই পারেন, এতে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই; তবে এর উপর ভিত্তি করে পুরো মিউজিক শিল্পকেই হারামে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।

এসব কারণে আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশকে ইসলামী ঘরানার রাজনৈতিক দলের ধারা সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর বাইরে তেমন কোনো সঙ্গীতই দেখা যায়নি। বলতে গেলে এই দিকটা কবি মতিউর রহমান মল্লিক একা হাতে দেখেছিলেন। এরপর এই শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে আইনুদ্দিন আল আজাদের হাত ধরে কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা হয়। এটা অনেকটা কওমী ধারার প্রতিষ্ঠান।

সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং কলরব শিল্পীগোষ্ঠী এই শতকের শুরুর দশকে ইসলামী ঘরানার সঙ্গীত অঙ্গনকে প্রজ্বলিত রেখেছিলো। এসময় এবং এর পরবর্তী সময়টায় সাইফুল্লাহ মানসুর, নওশাদ মাহফুজ ও মশিউর রহমান লিটন ইসলামী ঘরানায় যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এছাড়াও, গত এক দশকে কলরবের জনপ্রিয় শিল্পীদের বাহিরে ইসলামী ঘরানায় ওবায়দুল্লাহ তারেক, মোনায়েম বিল্লাহ, গাজী আনাস, আবু ওবায়দা, ইকবাল হোসাইন জীবন, মাহমুদ হুযাইফা, মাযহারুল ইসলাম এই অঙ্গনে অবদান রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে, কলরব ও সাইমুমের সমকক্ষ পর্যায়ের আরো কিছু শিল্পীগোষ্ঠী তৈরি হওয়ায় তাদের অবস্থান আর পূর্বের মতো নেই।

যাইহোক, কলরব আর সাইমুমের সঙ্গীতগুলোয় মিউজিকের কোনো অংশই ছিলো না। অথচ, সেই সময়টায় কাফেলা এবং এই জাতীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোয় মিউজিক সমৃদ্ধ সঙ্গীতই ব্যবহার করা হতো; এক্ষেত্রে বিখ্যাত শিল্পী সামী ইউসুফের ‘আল-মুয়াল্লিম’ এলবামের সঙ্গীতগুলোর সাহায্য নেওয়া হতো। একদিকে ঠিকই জনমানসে পৌঁছার জন্য তৎকালীন ইসলামী টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে মিউজিক সমৃদ্ধ ইসলামী সঙ্গীতের ব্যবহার হতো, অথচ অন্যদিকে মিউজিকের সঠিক ব্যবহার না করে এটাকেই হারামে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিলো।

যদিও বর্তমানে এসব থেকে বেরিয়ে এসে অনেকেই এখন তাদের সঙ্গীতে মিউজিক কম্পোজ করছে, কিন্তু এসব কারণেই সঙ্গীত অঙ্গনেও ইসলামী ঘরানা বৃহদাকারে যুবমানসে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিলো। কিন্তু, এর বিপরীতে ঠিকই অন্যান্য ধারার সঙ্গীত অঙ্গন পুরো দেশের বৃহৎ যুবসমাজকে মাতিয়ে রেখেছিলো।

 

পাঁচ.

গত তিন-সাড়ে তিন দশকে সেকুলার অঙ্গনে এই ঘরানায় এতো ধরনের কাজ হয়েছে, তার হিসেব বলার বাইরে। তবে আলোচনার সুবিধার্থে ব্যান্ড দল আর দুয়েকজন শিল্পীর কথা তুললেই আশা করি এর একটা চিত্র পাওয়া যাবে।

বর্তমান সময়ের অন্যতম মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডগুলোর মধ্যে আর্টসেল, ব্ল্যাক, অর্থহীন, শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ-এর নাম উল্লেখযোগ্য। বর্তমানের মিউজিক-প্রিয় তরুণ সমাজের কাছে এসব নাম খুবই পরিচিত। এখানে আর্টসেলের একটা উদাহরণই যথেষ্ট। আর্টসেল ব্যান্ড ১৯৯৯ সালে কলেজ পড়ুয়া ৪জন তরুণের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। তাদের প্রথম এলবামেই তারা বাজিমাত করে দিয়ে একেবারে মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডে পরিণত হয়েছিলো। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে একবার কনসার্ট হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেই তারিখে কনসার্টের স্থানে সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার পরেও সেখানে প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলো শুধুমাত্র তাদের জন্য। অথচ, ব্যান্ড কনসার্টে শুধুমাত্র একটি ব্যান্ডের এমন আয়োজনে, তাও আবার বৃষ্টি-বাদলের দিনে, এতো মানুষের উপস্থিতি সাধারণত অকল্পনীয় বিষয়।

এছাড়াও, হারিয়ে যাওয়া এই শতকের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ব্যান্ডগুলোর মধ্যে আছে ২০০৫ সালের ‘আইকনস’, ২০০০ সালের ‘দ্যা ওয়াটসন ব্রাদার্স’, ২০০১ সালের ‘ভাইব’ ইত্যাদি।

 

ছয়.

ব্যান্ডের পাশাপাশি কয়েকজন শিল্পীও গত তিন-সাড়ে তিন দশকে এই ঘরানার মিউজিকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছে- ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিৎ, হাবিব ওয়াহিদ, খালিদ হাসান মিলু, শায়ান চৌধুরী অর্ণব, তাহসান খান, নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, দিলশাদ নাহার কনা, প্রীতম হাসান ইত্যাদি।

এখানে জেমসের পরিচয়ের জন্য তার নামটাই যথেষ্ট। সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশার একটি পরিবার থেকে উঠে এসে রক-মেটাল মিউজিক শিল্পের গুরু হয়ে ওঠাটা মোটেও সহজকিছু ছিলো না। কিন্তু, তিনি তা করে দেখিয়েছেন। উপরের কয়েকটি ব্যান্ড তো এই শতকের শুরুর দিকে এসেছে, কিন্তু জেমস তার প্রতিভা দেখানো শুরু করেছে সেই নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে। তিনি গ্রাম বাংলার গানগুলোকে রক জনরায় পরিচিত করানোর চেষ্টা করেন। আবার, এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের গানকে রক জনরায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন দেখেই হয়তো তার জনপ্রিয়তা বেড়েছিলো।

এমনকি, চলচ্চিত্র নায়ক মান্না নিজেই একবার জেমসকে মুভির জন্য গান তৈরি করতে অনুরোধ করেছিলেন; অথচ রক জনরা আর মুভির গানের মাঝে থাকে আকাশ-পাতাল তফাত। বাংলাদেশের মুভিতে গান গাওয়ার পাশাপাশি বলিউডেও গান গেয়ে মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।

জেমস বিভিন্ন এলবামে কাজ করতে গিয়ে পরিচিত হন প্রিন্স মাহমুদের সাথে, যাদের কাছে থেকেই এসেছে ’মা’ ও ‘বাবা’ গান। ২০০০ সালে এই প্রিন্স মাহমুদই রক জনরার তৎকালীন শ্রেষ্ঠ দুই শিল্পী জেমন ও আইয়ুব বাচ্চুকে এক এলবামে নিয়ে আসেন। এখান থেকেই এসেছে জনপ্রিয় সেই ‘বাংলাদেশ’ গানটি, যে গান এখনও যুবসমাজের ফোনে ফোনে বাজে। এজন্যই হয়তো রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে কর্পোরেট জবহোল্ডারও তাকে পছন্দ করে।

রক জনরায় জেমসের পাশাপাশি আইয়ুব বাচ্চুর নামও আসবে এখানে। আইয়ুব বাচ্চুর একটা ঘটনা এখানে বর্ণনা করলেই মনে হয় যথেষ্ট হবে। বাংলা সিনেমার বিখ্যাত ‘আম্মাজান’ গানটি তারই গাওয়া। যেদিন স্টুডিওতে এই গান রেকর্ড হবে, সেদিনের খবরটি কোনোভাবে চাউর হয়ে যায়, এজন্য সেদিন স্টুডিওর সামনে আমজনতার ভিড় জমে গিয়েছিলো শুধুমাত্র আইয়ুব বাচ্চুকে দেখতে। কেননা, সেই সময়টায় জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু ছিলো সঙ্গীত অঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ।

 

সাত.

এই দুইজনের সাথে আরো আসবে হাবিব ওয়াহিদের নাম; যিনি বাংলার সঙ্গীত অঙ্গনকে একাই ২০-৩০ বছর সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। তৎকালীন কালচারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছিলো, সেগুলোর প্রায় সবই হাবিব ওয়াহিদ ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। তিনি একাই বাংলা মিউজিকে অসংখ্য কমার্শিয়াল খাত তৈরি করে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালের দিকে মাত্র ২০ বছর বয়সে হাবিব ওয়াহিদ উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সাথে কাজ করেছিলেন। এভাবেই তার যাত্রার সূচনা হয় অনেকটা। এরপর থেকে পরের এক দশকে তিনি তার অঙ্গনে অসাধারণ সব এলবাম বের করতে থাকেন। আর এসব এলবাম তখন থেকে শুরু করে এখনও জনপ্রিয় হয়ে আছে।

শাহ আব্দুল করিমের গান-সহ বাংলাদেশের অনেক লোকসঙ্গীতকে আধুনিকভাবে সামনে আনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি; যেমন- বন্দে মায়া লাগাইসে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গড়ে চলে না, আসি বলে গেলা বন্ধু আইলানা, বসন্ত বাতাসে সইগো ইত্যাদি।

এরপর হাবিব ওয়াহিদ সেই একুশ শতকের শুরুর দশকের বাংলার সিনেমার দুর্দিনের সময়ে বাংলায় সিনেমায় গানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ‘হৃদয়ের কথা’ এবং ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ সিনেমায় করা হাবিবের গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। বর্তমান সময়ের যুবসমাজের বড় একটা অংশ ভালো করেই জানে যে, এসব গান ছাড়া তাদের চলতো বা চলে কিনা!

এছাড়াও, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া গ্রামীণফোন, বাংলালিংক এবং নেসক্যাফে-র টিভিসি বিজ্ঞাপনের সেইসব গান ও কম্পজিশনগুলো যুবসমাজের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলো। নেসক্যাফের ‘চলো সবাই’, বাংলালিংকের ‘শুনতে কি পাও’ বা জিপি-র ‘চলো বাংলাদেশ’ ও ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’-র মতো গান ও কম্পজিশন আজও বাংলাদেশে টিভিসির জন্য তৈরি হয়নি।

হাবিব ওয়াহিদই শিরিন ও ন্যান্সির মতো শিল্পীদের খুঁজে বের করেছিলেন; যেসব শিল্পীদেরকে আজকের যুবসমাজ ভালোভাবেই চেনে। প্রীতম হাসানকেও হাবিব ওয়াহিদই তুলে এনেছে; যে প্রীতম হাসান বিগত কয়েক বছরের হিট সিনেমার গানগুলো বলতে গেলে একা হাতে কম্পজিশন করেছে। এছাড়াও প্রীতম হাসানই বাংলাদেশের সেলিব্রেশন জনরার জন্য হাত দিয়েছিলেন; যার কারণে গত দশকে বিয়েবাড়ির আয়োজনের মতো বিভিন্ন আয়োজন-অনুষ্ঠানে প্রীতম হাসানের কম্পজিশন করা উল্লেখযোগ্য তিনটি গান যুবসমাজের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিলো; এবং অবশ্য এখনও এসব গান বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনে বাজানো হয়ে থাকে। আবার কোক স্টুডিওর ‘দেওরা’ ও ‘মা-লো-মা’ গান দিয়ে এই ঘরানার মিউজিক অঙ্গনে প্রীতম তার প্রতিভার সাক্ষর রাখছে।

মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই শতকের শুরু থেকে গত দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুবসমাজের মাঝে যতগুলো গান জনপ্রিয় হয়েছে, তার অর্ধেকের সাথেই হাবিব ওয়াহিদের কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে।

 

আট.

এতোসব আলোচনার অর্থ এ-ই যে, এতোগুলো ব্যান্ড ও এতোগুলো শিল্পী তাদের ঘরানার মিউজিক শিল্পে যে পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন এবং এফোর্ট দিয়েছেন, তার ফলাফলও তারা পেয়েছেন। এজন্যই হয়তো, গত তিন-দশকে এই ঘরানার মিউজিক অঙ্গনের ধারেকাছেও আসতে পারেনি ইসলামী ঘরানার সঙ্গীত অঙ্গন। যার ফলে বিনোদন অঙ্গনটা দিয়ে যুবসমাজকে শক্তপোক্তভাবে আঁকড়ে ধরা গিয়েছিলো; যে কাজটা ইসলামী ঘরানা বৃহদাকারে করতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

(এই লেখাটি মূলত বড় একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ। মূল লেখাটি ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর দশম সংখ্যায় ‘একুশ শতকের যুবমানসে সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও বাংলাদেশ: নয়া ব্যবস্থাপনায় আমাদের ভাবনা’ শিরোনামে এসেছে। প্রবন্ধের আকার বেশ বড় হওয়ায় মূল লেখায় এই অংশটুকু সংক্ষেপ করা হয়েছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।)

 

হাওলা

আর্টিকেল (রোয়াক ব্লগ)

  • ইসলামে মিউজিক দৃষ্টিভঙ্গি – ড. ইউসুফ আল কারযাভী
  • সামি ইউসুফ: মিউজিক শিল্পে আধ্যাত্মিকতার সম্মিলন – হাসান আল ফিরদাউস
  • সিনেমা; শুধুই কি বিনোদন? – মিফতাহুর রহমান

লিংক

  • https://bn.wikipedia.org/wiki/জেমস_(সঙ্গীতজ্ঞ)
  • https://m.dailyinqilab.com/article/422321/জেমস-এক-সংগ্রামী-জীবনের-উপাখ্যান
  • https://www.deshrupantor.com/540914/জেমসের-নগরবাউল-জেমস-হয়ে-ওঠার-গল্প
  • https://bn.wikipedia.org/wiki/হাবিব_ওয়াহিদ
  • https://www.bbc.com/bengali/in_depth/2010/07/100716_mb_habib_wahid
  • https://www.prothomalo.com/entertainment/song/238v0c4p1t
  • https://www.prothomalo.com/entertainment/song/1l9z4msxp9
  • https://bn.wikipedia.org/wiki/প্রীতম_হাসান
  • https://www.prothomalo.com/special-supplement/তারুণ্যের-শিল্পী-প্রীতম-হাসান
  • https://www.bbc.com/bengali/multimedia/2015/10/151007_gangolpo_pritom_hasan
  • https://samakal.com/music/article/340861/রহস্য-আর-অ্যাকশনে-প্রীতমের-নতুন-অধ্যায়
  • https://www.jagonews24.com/probash/article/940646
১২ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of মিফতাহুর রহমান

মিফতাহুর রহমান

পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে। দীর্ঘদিন যাবত লেখালেখি ও অনুবাদের সাথে যুক্ত আছেন। তার প্রকাশিত যৌথ অনুবাদ গ্রন্থ 'মসজিদে আকসাকে মুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা'। এককভাবে অনুবাদ করেছেন, “আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মসজিদে আকসার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব"। পড়াশুনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি ও অনুবাদ চলমান রেখেছেন। অনুবাদ করছেন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। তার আগ্রহ ইতিহাস, উসূল, ধর্মতত্ত্ব, ফিকহ, রাজনীতিতে। এছাড়া ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of মিফতাহুর রহমান

মিফতাহুর রহমান

পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে। দীর্ঘদিন যাবত লেখালেখি ও অনুবাদের সাথে যুক্ত আছেন। তার প্রকাশিত যৌথ অনুবাদ গ্রন্থ 'মসজিদে আকসাকে মুক্ত করার কৌশলগত পরিকল্পনা'। এককভাবে অনুবাদ করেছেন, “আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মসজিদে আকসার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব"। পড়াশুনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি ও অনুবাদ চলমান রেখেছেন। অনুবাদ করছেন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। তার আগ্রহ ইতিহাস, উসূল, ধর্মতত্ত্ব, ফিকহ, রাজনীতিতে। এছাড়া ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top