অবরুদ্ধ মুসলিম মানস : বিংশ শতাব্দীর যে তিনটি ঘটনা নতুন চিন্তাধারা উৎপাদনে মুসলিমদের সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছিল

বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইসলামী সভ্যতা একপ্রকার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের সামষ্টিক সীমালঙ্ঘন বা সভ্যতার ঘূর্ণাবর্তের কারণে ঘটেনাই। দীর্ঘ কয়েক দশকব্যাপী চলা তীব্র সহিংসতার প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিলো এই পরিণতি। পদ্ধতিগত আঘাতে-আঁচড়ে ১৯১৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইসলামী সভ্যতার পুরো হুলিয়া বদলে ফেলা হয়েছিল।

 

আজ আপনি যখন মুসলিম বিশ্বের যেকোনো বড় শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, হোক তা ঢাকা, ইস্তাম্বুল, রিয়াদ বা কুয়ালালামপুর, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের এক বাহ্যিক রূপ হিসেবে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা সংস্থা, গবেষণাকেন্দ্র এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দেখতে পাবেন। কিন্তু এতকিছুর পরেও কোথাও যেন একটা গলদ রয়ে গেছে। জ্ঞান উৎপাদনের আকাঙ্ক্ষার একটি বাহ্যিক রূপ হিসেবে হয়তো এসব অবকাঠামোর একটা অস্তিত্ব আছে, কিন্তু এসবের সারবস্তু নিতান্তই দুর্বল। এর প্রমাণ হচ্ছে, এসব অঞ্চলে খুব কম পরিমাণে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে, উদ্ভাবনের জন্য নোবেল পুরস্কারের অনুরূপ নামমাত্র কোনো স্বীকৃতির অস্তিত্বও নাই। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্পের জন্য উপযোগী কোনো সুদৃঢ় নগর-কাঠামোতো নাই-ই।

 

নতুন চিন্তা তৈরি করা, জীবন-জগতের জটিল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সক্ষমতা আজ এমনভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে যে, তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। আজ মুসলিমরা এবং তাদের গর্বের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক সেই একই প্রশ্নগুলো নিয়ে, সেই একই ভাষায় বিতর্ক করে, যা আমাদের পূর্বপুরুষরা এক শতাব্দী আগে করতেন। এই ডিসকোর্স-ডিসকোর্স খেলার আসলে কোনো বিবর্তন তো হয়ই নাই; বরং বলা যায় এর আরও অবনতি ঘটেছে। 

 

১৯ শতকটা ছিল মুসলমানদের জন্য ত্বরান্বিত ধ্বংসের মাঝে বিপুল সম্ভাবনার এক যুগ, যা আজ মানুষের স্মৃতি থেকেও বিস্মৃত। আজকের প্রতিটি প্রজন্ম সেই ১৯ শতকে ওঠা বিতর্কগুলোরই কিছু সস্তা সংস্করণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বলা যায়। সেই একই শরিয়াহ, ইসলাম ও আধুনিক রাষ্ট্র বিতর্ক, সেই একই ধর্মনিরপেক্ষতা, ইউরোপীয় দর্শন এবং এর সাথে ইসলামি দর্শনের সম্পর্ক ইত্যাদি পুরাতন আলাপ ঘুরে ফিরে আসছে। আজকের দিনেও এসব বিষয়ে আলোচনাগুলো মূলত সেই যুগ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। হিসাব করলে দেখা যাবে, গত এক শতাব্দীতে এগুলোতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতিই হয়নি।

আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে বর্ণনা করার জন্য ‘স্থবিরতা’ বা ‘সংকট’ শব্দগুলো মোটেও মানানসই নয়। আমরা মূলত ঐতিহ্যের আবরণে এক ধরনের স্মৃতিহীনতায় ভুগছি। এটা এমন এক চূড়ান্ত সামষ্টিক বিস্মৃতি যে, আমরা কী হারিয়েছি, বা আদৌ যে আমরা কিছু হারিয়েছি কিনা, সেটাই আর আমাদের মনে নেই।

 

প্রচলিত বয়ান, ব্যাখ্যা এবং অযুহাতগুলো এই ভয়াবহ দুর্দশার সামগ্রিক চিত্রটা একদমই তুলে ধরতে পারেনা। আমরা উপনিবেশবাদ, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, নেতাদের দুর্নীতি বা জনগণের পশ্চাৎপদতা নিয়ে কথা বলি। এগুলো সবই সত্য, কিন্তু এসব এতটাই অপর্যাপ্ত ও ধোঁয়াশাপূর্ণ যে, কাউকে জিজ্ঞেস করে মুখস্ত বুলির মত এসব কথা বলবে ঠিকই, কিন্তু ব্যাপকতর এসব সমস্যার কোনো নির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরতে পারবেনা, ভাসা ভাসা উত্তর দেবে আর আফসোস করবে।

 

১৯১৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইসলামী সভ্যতা তিনটি প্রলয়ংকরী ঘটনার সম্মুখীন হয়, যা একটি জটিল সভ্যতা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবকাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়। ১৯১৪ সালের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন; ১৯১৭ সালের পর রুশ সাম্রাজ্যের মুসলিম অঞ্চলগুলোতে কমিউনিজমের উত্থান এবং বলকানের মতো দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে এর অভিশপ্ত বিস্তার; এবং ১৯৪৭ সালের ভারতীয় উপমহাদেশে দেশভাগের ঘটনা বিশ্ব মুসলিম মানুষের জন্য একেকটি বিপর্যকর ধাক্কা।

প্রতিটি ঘটনাই এমন সব যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ছিন্ন করে দিয়েছিল, যা গড়ে তুলতে শত শত বছর সময় লেগেছিল। এসব ঘটনা রাষ্ট্র ও সভ্যতা পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একেবারে এলোমেলো করে দেয়। উসমানীয় শাসকগোষ্ঠী, তাতার মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর মতো গোটা এক-একটি সম্প্রদায় উৎখাত বা ধ্বংস হয়ে যায় ; অথচ জ্ঞান ও সংস্কৃতির উৎপাদন এবং সংরক্ষণের জন্য তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও অংশগ্রহণ ছিল অপরিহার্য। 

 

এই প্রতিটি ঘটনার পর, চরম অস্তিত্বের সংকটে ভুগে জন্ম নিয়েছিল কিছু শরণার্থী রাষ্ট্র। শুধু টিকে থাকাই হয়ে উঠেছিল তাদের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা, প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব দেশ এখনও সার্ভাইভালের পেছনেই ছুটছে রুদ্ধশ্বাসে। এভাবেই বিশ্বের সকল অঞ্চলে আমরা একত্রে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধনে ক্রমশ অক্ষম হয়ে পড়ি।

 

পতনের এই ক্রমধারায় সবচেয়ে কম অনুধাবিত বিষয়টি হলো, এই তিনটি ঘটনার প্রতিটিই একে অপরকে আরও ঘনীভূত করেছিল, বাড়িয়েছিল মুসলমানদের জাতিগত দুর্দশার মাত্রা। একটা সময় এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, ১৯ শতকে আমরা আমাদের নিজেদের শর্তে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের যে কাজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে শুরু করেছিলাম, তা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয় আর অবশিষ্ট ছিল না।

এই তিনটি বিপর্যয় কেবল আলাদা আলাদা সংস্কৃতি আর দেশগুলোর ধ্বংসই ছিল না, বরং এগুলো একটা সময় একত্রে ইসলামী সভ্যতার খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত পুনর্জাগরণের দিকে প্রথম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলো এই ধ্বংসযজ্ঞকে অনুধাবন করা। কারণ, যে ভঙ্গুর শরণার্থী রাষ্ট্র ও জাতীয়তার সংগ্রাম বিংশ শতাব্দীতে সুবিধা পারেনি, তা একবিংশ শতাব্দীতেও টিকবে না। ফলে দিনশেষে কী হারিয়ে গেছে তার হিসাব-নিকাশ না করে আমরা নতুন কিছুই গড়তে পারব না।

 

পশ্চিমা পুঁজিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিশ্ব মুসলিমের টাকায় গড়া ‘হেজাজ রেলওয়ে’র কথা মনে আছে? সেটা কিন্তু ছিল নিভে যাবার আগে উসমানী প্রদীপ দপ করে জ্বলে ওঠার একটা শেষ চেষ্টা। 

উসমানী খেলাফতের শেষ দশকগুলো ছিল ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবার মতো। ১৮৩৮ সালের বালতা লিমান চুক্তি সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। তথাকথিত “মুক্তবাণিজ্য” চাপিয়ে দেওয়ার ফলে ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের সাথে উসমানীয় দেশীয় উৎপাদন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত ছিল ভূখণ্ডের ভাঙন, বিশেষ করে বলকানে। নিছক ভূমি হারানোর কারণে নয়, বরং সেখানকার মানুষদের ওপর যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছিল, সেটাই ছিল মূল আঘাত। ইমারত নতুন করে গড়া যায়, ফসলের ক্ষেত আবার বোনা যায়, কিন্তু একটি জনপদ একবার ছিন্নমূল হলে তাদের সংস্কৃতি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

বলকান যুদ্ধ এবং এর পরিণতি আধুনিক ইতিহাসের এক বিস্মৃত গণহত্যা। ১৮৭০ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত বসনিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিসসহ পুরো বলকানে বিভিন্ন জাতিসত্তার উসমানীয় মুসলিমদের ওপর সুপরিকল্পিত জাতিগত ও ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়। লাখ লাখ মানুষ মারা পড়ে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। প্রাণে বাঁচা মানুষগুলো মুহাজির হিসেবে আনাতোলিয়ার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকা ভূখণ্ডে এসে ভিড় জমায়। ১৯২৩ সাল নাগাদ, নবগঠিত তুর্কি প্রজাতন্ত্রের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই ছিল বলকান, ককেশাস ও ক্রিমিয়া থেকে আসা এই ছিন্নমূল মুসলিমরা। চিন্তা করা যায়? প্রতি তিনজনে একজন শরণার্থী! 

 

এই মহাবিপর্যয়কে আজ নিছক পরিসংখ্যানে মাপা হয়; অথচ এই মুহাজিররাই ছিলেন আলেম, কারিগর, বণিক ও জমিদার। এরাই ছিলেন সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মূল স্তম্ভ। তাদের এই বাস্তুচ্যুতির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়, পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ছিন্ন হয়, ছাপাখানাগুলো স্তব্ধ হয়ে যায়,  পাঠাগারগুলো পড়ে থাকে পরিত্যক্ত অবস্থায়। এভাবে জ্ঞান ও অস্তিত্ত্বের পুরো একটি জগতকে সমূলে উৎপাটন করা হলো। একের পর এক ট্রমার কারণে তা আবার সামষ্টিক স্মৃতি থেকেও হারিয়ে গেল।

 

১৯ শতকে ইউরোপীয় চাপের মুখে উসমানীয়দের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়া শুরুতে ধীর হলেও শতাব্দীর শেষে এসে তা গতি পেয়েছিল। তানজিমাত সংস্কার, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং উসমানীয় তুর্কি গণমাধ্যমের বিকাশের মাধ্যমে মূলত ইসলামী শর্ত বা মূল্যবোধের ভিত্তিতেই শিল্পায়নের সাথে তাল মেলানোর এক সত্যিকার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সাঈদ হালিম পাশা ও মেহমেদ আকিফ এরসয়ের মতো চিন্তাবিদরা ‘সাবিলুর রাশাদ’-এর মতো জার্নালে ইউরোপের আধুনিকতাকে ইসলামি দর্শন, আইন ও শাসনের নিজস্ব ছাঁচে ফেলার রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন। 

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই সম্ভাবনাগুলোকে ধূলিসাৎ করে দেয়। আরব প্রদেশগুলো ব্রিটিশ ও ফরাসি ম্যান্ডেটের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়। আনাতোলিয়াও প্রায় একই পরিণতির শিকার হতে বসেছিল, তবে তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য বীরদের কল্যাণে তা রক্ষা পায়। কিন্তু এই টিকে থাকার মূল্য হিসেবে তুরস্ককে তার নিজের অতীতকেই বিসর্জন দিতে হয়। কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতার ছুরি উসমানীয় অতীতের সাথে নতুন তুরস্কের নাড়ির সংযোগ কেটে দেয়। ১৯২৪ সালে খিলাফত বাতিল, ১৯২৭ সালে আরবি হরফের বদলে ল্যাটিন চালু এবং উসমানীয় সভ্যতার ধারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে দমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—অতীতের সাথে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ।

এই ক্ষতি কেবল তুরস্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উসমানীয় কেন্দ্রের পতনের পর সাবেক সাম্রাজ্যের পুরো মুসলিম অভিজাত শ্রেণী দিশেহারা হয়ে পড়ে। আরব বিশ্বে ঔপনিবেশিক কাঠামো দেশীয় দালালদের ক্ষমতায় বসায় এবং ঐতিহ্যবাহী অভিজাতদের কোণঠাসা করে ফেলে। বলকানে অবশিষ্ট মুসলিমরা শত্রুভাবাপন্ন খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর অধীনে নিছক সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। কায়রো থেকে দামেস্ক, ইস্তাম্বুল থেকে সারায়েভো—রাষ্ট্রনায়ক, বণিক, বুদ্ধিজীবী ও স্কলারদের যে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ছিল, তা চিরতরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

 

সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, উসমানীয় পতন ঠিক তখনই ঘটল, যখন ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদন মাত্র গতি পাচ্ছিল। ১৯ শতকের ছাপাখানা, জার্নাল আর আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কের অর্জনগুলো স্রেফ মুছে ফেলা হলো। কোনো উত্তরসূরি রাষ্ট্রই এর উত্তরাধিকার পায়নি বা এই অবকাঠামো নতুন করে গড়তেও পারেনি। কায়রো ও বৈরুতে ‘নাহদা’ বা নবজাগরণ ক্ষীয়মাণ রূপে হয়তো টিকে ছিল, কিন্তু উসমানীয় ব্যবস্থার সেই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা ও পৃষ্ঠপোষকতা আর কখনোই ফিরে আসেনি।

 

জ্ঞানের সাথে উসমানী খেলাফতের শেষ দিককার রাজনৈতিক ও প্রসাশনিক অবস্থাও কিছুটা আলোচনার দাবী রাখে। কারণ আদতে উসমানীয় পতন কোনো জরাজীর্ণ কাঠামোর স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না, বরং তা ছিল পুনর্জাগরিত হতে চলা এক সম্ভাবনার অকালমৃত্যু। পতনের ঠিক আগের দশকগুলোতে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ সাম্রাজ্যকে এক অভূতপূর্ব ‘সিস্টেমিক’ প্রতিরোধের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। জামাল উদ্দিন আফগানির মতো ক্ষুরধার চিন্তাবিদদের তাত্ত্বিক রসদকে কাজে লাগিয়ে তিনি ‘প্যান-ইসলামীজম’-কে নিছক আবেগের খোলস থেকে বের করে এক ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেন।

 

ব্রিটিশদের সামরিক আগ্রাসন ঠেকাতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ; বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ইস্তাম্বুলে হামলা হলে খেলাফতের প্রতি আনুগত্যের কারণে ভারতবর্ষসহ ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠবে। ভারত থেকে শুরু করে চীনের পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সুদূর আফ্রিকার মসজিদে মসজিদে খলিফার নামে খুতবা চালু করা ছিল সেই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধেরই অংশ। পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও ঋণের জালকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কেবল সাধারণ মুসলিমদের চাঁদাতে তিনি নির্মাণ করেন ‘হেজাজ রেলওয়ে’। পাশাপাশি, পুরো সাম্রাজ্যকে ৩০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টেলিগ্রাফের তারে মুড়ে দিয়ে ‘ইলদিজ ইন্টেলিজেন্স’-এর মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক ব্যক্তিগত স্নায়ুতন্ত্র; যার ফলে সাম্রাজ্যের প্রান্তিক সীমানায় পাতা ঝরলেও তার খবর সবার আগে খলিফার কান পর্যন্ত পৌঁছাত। বিদ্যুৎ, তথ্য প্রযুক্তিতে তার সময়ে উসমানি খেলাফত ছিল সমগ্র বিশ্বের অগ্রদূত।

 

বাহ্যিক এই প্রতিরোধের পাশাপাশি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিভেদ মেটাতে তিনি দেখিয়েছিলে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক দুরন্ত কৌশল। সামরিক অভিযানের বদলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আশিরেত মেকতেবি’ বা ট্রাইবাল বোর্ডিং স্কুল; যেখানে বিদ্রোহী কুর্দি, আরব বা আলবেনিয়ান গোত্রপ্রধানদের সন্তানদের ইস্তাম্বুলে এনে রাজকীয় হালে পড়িয়ে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অনুগত আমলা হিসেবে গড়ে তোলা হতো। 

 

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো—সুলতানের পতন তার নিজস্ব কোনো কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঘটেনি। বরং সাম্রাজ্যের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে যুগোপযোগী করতে যেসব তরুণ অফিসার ও বুদ্ধিজীবীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছিল, তারাই ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষে আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসে। পশ্চিমা সেক্যুলার দীক্ষায় আচ্ছন্ন এই প্যারিস-ফেরত ‘ইয়াং তুর্কি’রাই ১৯০৯ সালে তার ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত করে। অর্থাৎ, ইসলামী সভ্যতার শেষ এই মহান স্থপতিকে ধ্বংস করেছিল ফরাসি সেক্যুলারিজমের গর্ভে জন্ম নেওয়া এক বুদ্ধিবৃত্তিক মহামারী, যা উসমানীয় সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে তাকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছিল। সুলতান আব্দুল হামিদ ক্ষমতায় থাকলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানদের পরিণতি নিশ্চিতরূপেই ভিন্ন হতো।

যে সমাজতন্ত্র বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের সভ্যতা ধসিয়ে দিল, তার কাছেই আমাদের কিছু আলেম খুঁজছিলেন মুক্তির পথ!

 

উসমানী খেলাফত যখন বাইরের চাপ আর ভেতরের ক্লান্তিতে ধসে পড়ছিল, তখন রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা মুসলিম জনপদগুলো মুখোমুখি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিভীষিকার। তাদের উপর নেমে এসেছিল সুপরিকল্পিত এক আদর্শিক ধ্বংসযজ্ঞ। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব এমন এক সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক নিধনের সূচনা করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ক্রিমিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল অঞ্চল থেকে একটি জীবন্ত সভ্যতা হিসেবে ইসলামের নাম-নিশানা চিরতরে মুছে ফেলা। টানা সাত দশক ধরে চলেছিল এই শিকড় উপড়ে ফেলার কাজ।

 

১৯১৭ সালের আগে রুশ অঞ্চলের মুসলিমরা নিজেদের মতো করে এক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ক্রিমিয়ায় জন্ম নেওয়া এবং তাতার-ভাষী অঞ্চল ছাড়িয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ‘জাদিদ’ আন্দোলন ছিল আধুনিক মুসলিম সংস্কৃতি গড়ে তোলার এক দুর্দান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। মূসা জারুল্লাহ বিগিয়েফ, ইসমাইল গাসপ্রালির মতো চিন্তাবিদরা ইতিহাস, ফিকহ, ধর্মতত্ত্বের পুনর্গঠন থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, ইসলামি বিদ্যালয়গুলোর আধুনিকায়ন, আধুনিক বিজ্ঞান চর্চা এবং স্থানীয় ভাষায় মুসলিম গণমাধ্যম গড়ে তোলার পক্ষে লড়েছিলেন। 

 

বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য জাদিদ মাদ্রাসা, ফুলে-ফেঁপে ওঠে তাতার ভাষার পত্রপত্রিকা। কাজান, বাখচিসারাই, সমরকন্দ আর বুখারাকে কেন্দ্র করে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের এমন এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব উসমানী এবং ইন্দো-ইসলামি পরিমণ্ডলেও গিয়ে পড়েছিল।

জাদিদরা কিন্তু পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণকারী কোনো সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ছিলেন না। তারা ছিলেন মূলত সংস্কারপন্থী মুসলিম। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে ইসলামী শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটিয়ে শিল্পযুগে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম এক মুসলিম প্রজন্ম তৈরি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তাদের এই মিশন উসমানী ও মিসরীয় সংস্কারবাদের সমান্তরালেই চলছিল, যা আদতে বৃহত্তর প্যান-ইসলামীক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণেরই একটি অংশ ছিল।

 

বলশেভিকদের উত্থান এই পুরো সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। শুরুতে যদিও আশার একটা ঝিলিক দেখা গিয়েছিল। মিরসাইদ সুলতান-গালিয়েভের মতো কিছু জাদিদ নেতা ভেবেছিলেন, হয়তো সমাজতন্ত্রের অধীনেই মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আধুনিকায়নের স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু খুব দ্রুতই তাদের এই ভুল ভেঙে যায়। 

 

১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জোসেফ স্ট্যালিন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পর মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নামিয়ে আনেন এক ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। জাদিদ স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। বাজেয়াপ্ত করা হলো ইসলামি ওয়াকফ সম্পত্তি। আরবি হরফ পাল্টে প্রথমে ল্যাটিন, এরপর সিরিলিক বর্ণমালা চাপিয়ে দেওয়া হলো, যাতে নতুন প্রজন্মের সাথে তাদের নিজস্ব সাহিত্য-ঐতিহ্যের নাড়ির টান চিরতরে কেটে যায়। মসজিদগুলো গুড়িয়ে দেওয়া হলো অথবা গুদাম বানিয়ে ফেলা হলো। জাদিদদের সংস্কারের ডাককে যে আলেম সমাজ একসময় তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, সেই আলেমদেরও হয় কারাবন্দি করা হলো, নয়তো নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।

 

খোদ স্ট্যালিন একাই সোভিয়েত ইউনিয়নে যে ৬০ থেকে ৯০ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন, তার প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশই, অর্থাৎ অন্তত ২০-৩০ লাখ ছিলেন মুসলিম! এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ আমাদের সেই শীতল প্রবচনটিকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়—”একজনের মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি, কিন্তু লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু নিছক একটি পরিসংখ্যান মাত্র।” 

 

স্ট্যালিনের এই ‘পরিসংখ্যানের’ আড়ালে নিঃশব্দে চাপা পড়ে গেছে আমাদের আস্ত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জগত। আর সভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, চরম এই স্মৃতিহীনতায় আজকের মুসলিমরা নিজেরাও জানে না তারা ঠিক কোথায়, কীভাবে এবং ঠিক কী হারিয়েছে!

যাইহোক, সেই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল রাজনৈতিক বা আদর্শিক নিপীড়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কমিউনিস্ট আদর্শের মূল দাবিই ছিল মানুষের জীবন থেকে ধর্মের ধারণাকেই সমূলে উৎপাটন করা। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইসলামকে অন্তত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় টিকে থাকার সুযোগ দিত, সেখানে কমিউনিজম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসটুকুও ছিনিয়ে নিতে চাইল। 

 

শিশুদের এমন সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বড় করা হতে লাগল, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ‘নাস্তিক নাগরিক’ তৈরি করা। ইসলামি জ্ঞানচর্চা তো দূরে থাক, একে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হলো। ইউরেশিয়া জুড়ে তাতার মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের যে নেটওয়ার্ক ছিল, তা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ১৯৫০-এর দশক আসতে আসতে এমন এক প্রজন্মের জন্ম হলো, যারা মাত্র কয়েক দশক আগে টিকে থাকা তাদের নিজস্ব ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সম্পর্কে আক্ষরিক অর্থেই কিছুই জানত না।

 

এর পরিণতি কেবল সোভিয়েত সীমান্তের ভেতরেই আটকে থাকেনি। উসমানী, পারসিক এবং ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে তাতার মুসলিমরা এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতেন। তাদের প্রকাশিত জার্নালগুলো ইস্তাম্বুল থেকে কলকাতা পর্যন্ত পঠিত হতো। তাদের আলেমরা কায়রো ও বুখারায় পড়াশোনা করতেন, আবার কাজান ও কাশগড়ে গিয়ে পড়াতেন। সোভিয়েতদের এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যখন ইসলামি সভ্যতার এই উত্তরের সীমান্তটিকে অবরুদ্ধ করে দিল, তখন তা বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বকেও একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। শত শত বছর ধরে চলে আসা যে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান ইসলামী সভ্যতাকে প্রাণবন্ত রেখেছিল, তাতে চরম বিচ্ছেদ ঘটে গেল।

মুসলিম ইউরোপে কমিউনিস্ট ধ্বংসযজ্ঞ কতটা সর্বগ্রাসী ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আলবেনিয়ার পরিণতি। মুসলিম বলকানের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই অঞ্চলটি কমিউনিস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে চরম ধর্মবিদ্বেষী অভিযানের শিকার হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে আনওয়ার হোজার সরকার আলবেনিয়াকে বিশ্বের প্রথম ‘নাস্তিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিটি মসজিদ ও খানকাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে মুসলিম জমিদার শ্রেণী শত শত বছর ধরে সুফি তরিকা ও ইসলামি শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিল, তাদের আক্ষরিক অর্থেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। যে সভ্যতা পাঁচ শতাব্দী ধরে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য আলেম, কবি আর রাষ্ট্রনায়ক, মাত্র দুই প্রজন্মের ব্যবধানে তা পরিণত হলো অন্ধকারে ফিসফিস করে বলা নিছক রূপকথায়!

 

ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ইসলামী সভ্যতার যে ক্ষতি আংশিকভাবে করেছিল, কমিউনিস্টদের আঘাত তার ষোলকলা পূর্ণ করে বৈকি! ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যতই শোষণ করুক না কেন, তারা অন্তত ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো না কোনো আকারে টিকে থাকার সুযোগ দিয়েছিল। তারা হয়তো এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, এর ওপর কর বসিয়েছে বা কোণঠাসা করেছে, কিন্তু কখনোই পাইকারি হারে সব মুছে ফেলার চেষ্টা করেনি। কমিউনিজম সেই ছাড়টুকুও দেয়নি।

১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল, দীর্ঘ সাত দশক শাসিত হওয়া মুসলিম জনপদগুলো তখন বেরিয়ে এল সম্পূর্ণ ট্রমাগ্রস্ত ও শূন্য একটা খোলস নিয়ে। তাদের প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা—সবকিছু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল। আজ যা অবশিষ্ট আছে, তা কেবলই কিছু ভগ্নাংশ, আর তা পুনর্গঠনের কাজ এখনও যেন শুরুই হয়ে ওঠেনি।

 

কমিউনিজমের এই দু:সহ দু:স্বপ্নের সাথে আমাদের অঞ্চলের একটি চরম ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি বা প্যারাডক্স লুকায়িত আছে। যে সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট আদর্শ মধ্য এশিয়া, ক্রিমিয়া ও বলকানে পুরো ইসলামী সভ্যতাকে সমূলে ধ্বংস করে দিল, সেই একই সমাজতন্ত্রের ভেতরেই সেসময় আমাদের উপমহাদেশের আলেমরা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা খুঁজে ফিরেছেন! 

 

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদিপুরুষ মওলানা ভাসানী কিংবা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ‘’ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানের প্রবর্তক মওলানা হাসরাত মোহানির মতো প্রাজ্ঞ আলেমরাও ভেবেছিলেন যে কমিউনিজম হলো ইসলামের সবচেয়ে কাছের আদর্শ। 

 

মওলানা মোহানি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, “আমি একজন মুসলিম কমিউনিস্ট। আমাদের ইসলামি সাম্যবাদের সাথে মার্ক্সবাদের মূল পার্থক্য শুধু এক জায়গায়—আমাদের সাম্যবাদ আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল, আর তাদেরটা খোদাহীন।” 

 

একই সুরে মওলানা ভাসানীও ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ বা খোদাহীনতা-বর্জিত সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি চীনপন্থী বামদের সাথে গভীর জোট করেছিলেন এবং প্রকাশ্যেই সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সাম্যের প্রশংসা করতেন। তার বহুল প্রচলিত একটি দার্শনিক অবস্থান ছিল:

 

​”তোমরা যে সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রের কথা বল, আল্লাহর রবুবিয়াত (সৃষ্টিকুলের লালন-পালন ও সাম্য) বা ইসলামী সমাজতন্ত্রের মধ্যেই তা নিহিত আছে। শুধু এর থেকে খোদাহীনতা বাদ দিতে হবে।”

 

তাদের এই অবস্থান হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বা জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কৌশলগত হাতিয়ার ছিল, কিন্তু এই ঘটনা আমাদের একটি ভয়াবহ সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

 

আমাদের নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ও চিন্তার দুর্দশা কতটা প্রকট হলে, নিজেদের মুক্তির রূপরেখা আঁকতে গিয়ে আমাদের এমন এক মতবাদের আশ্রয় নিতে হয়, যে মতবাদটি বিশ্বের অন্য প্রান্তে মুসলিমদের সর্বাত্মক ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠেছিল!

৪৭শের দেশভাগে মুসলিমদের যে ‘শরণার্থী রাষ্ট্র’ জন্ম নিল, তা কি আসলেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ছিল? 

 

এক ধরণের আশু আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দেশভাগ বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ হলেও, সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল একটা আস্ত সভ্যতার অপমৃত্যু।

 

উসমানী খেলাফতের পতন যদি ইসলামী সভ্যতার পশ্চিমা নোঙ্গর উপড়ে ফেলে থাকে, কমিউনিজম যদি এর উত্তরের সীমানাকে ছিন্নভিন্ন করে থাকে, তবে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন ছিল এই সভ্যতার কফিনে মারা শেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর পেরেক।

 

শত শত বছর ধরে ভারতবর্ষ ছিল ইসলামি সভ্যতার সবচেয়ে উৎপাদনশীল কেন্দ্রগুলোর একটি। মুঘল সাম্রাজ্য তার স্বর্ণযুগে ধন-সম্পদ ও উৎকর্ষে খোদ উসমানীদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনেও মুঘলদের উত্তরসূরি ছোট ছোট প্রিন্সলি স্টেট এবং ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণী এমন এক শক্তিশালী জ্ঞান ও পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রেখেছিল, যা পুরো উপমহাদেশের সাথে বৃহত্তর ইসলামি বিশ্বের নাড়ির টান অটুট রেখেছিল।

১৮ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা দখল এবং পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে মুঘল সালতানাতের চূড়ান্ত পতন এই জগতটাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমরা এর সাথেও দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। ইসলামী জ্ঞান ও নিজস্ব পরিচিতি অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তারা আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। উর্দু ভাষাকেন্দ্রিক এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরিতে তারা বিশাল ভূমিকা রাখে। কায়রো কিম্বা ইস্তাম্বুলে তারা নিজেদের আলেমদের পাঠাত, আবার পুরো মুসলিম বিশ্ব থেকে শিক্ষার্থীরাও এখানে আসত। 

 

ব্রিটিশদের অধীনস্থ হওয়া সত্ত্বেও, ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণী ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণপ্রবাহে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন ও রসদ ধরে রেখেছিল। ভারতবর্ষের এই বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রবিন্দু এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ১৯২৪ সালে উসমানী খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর এই খেলাফতের কেন্দ্র খোদ ভারতের হৃদপিণ্ড হায়দরাবাদে স্থানান্তর করার একটি মাস্টার-প্ল্যানও করা হয়েছিল। শেষ ‘নামেমাত্র স্বাধীন’ মুসলিম শাসক হিসেবে হায়দরাবাদের নিজাম পরিবারের সাথে উসমানী রাজপরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনকে তখন খিলাফত টিকিয়ে রাখার অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।

 

কিন্তু দিনশেষে ব্রিটিশদের নকশা অনুসারে খোদ ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিপ্রসূত দেশভাগই এই পুরো ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করে দেয়। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম দিলেও আস্ত একটি সভ্যতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে। প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়—যা আক্ষরিক অর্থেই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জোরপূর্বক দেশান্তরের ঘটনা। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নির্মমভাবে খুন হয় অন্তত ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ! চিন্তা করা যায়? এই রক্তবন্যায় ভেসে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের একটি বিশাল ‘শরণার্থী রাষ্ট্র’ হিসেবে।

 

ভারত থেকে লাখ লাখ মুহাজির এমন এক ভূখণ্ডে আছড়ে পড়ে, যাদেরকে ধারণ করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ওই নতুন রাষ্ট্রের ছিল না। রাষ্ট্রের পুরো শক্তিই তখন ব্যয় হচ্ছিল স্রেফ টিকে থাকার লড়াইয়ে: শরণার্থীদের খাওয়ানো, একটি ন্যূনতম প্রশাসন দাঁড় করানো এবং ভারতের সাথে অবশ্যম্ভাবী এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ায়। বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রতিষ্ঠান গড়ার মতো কোনো সুযোগ বা শ্বাস ফেলার ফুরসতই তাদের ছিল না। 

জন্মলগ্ন থেকেই অস্তিত্বের সংকটে ভোগা পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আজ পর্যন্ত তার নিজস্ব বৈধতা ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য নিয়ে ধুঁকছে; তারা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় আদর্শের মধ্যে এমনভাবে দুলছে যে, আজ অবধি এর কোনো কার্যকরী মডেল দাঁড় করাতে পারেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে সৃষ্ট বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত তার জাতীয় পরিচয়ই ঠিকমতো চিহ্নিত করে উঠতে পারছেনা।

 

দেশভাগের পর উপমহাদেশের বেশিরভাগ অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান ভারতের ভাগে পড়ে যায়, অন্যদিকে এর মুসলিম জনসংখ্যা হয়ে পড়ে চরম ট্রমাগ্রস্ত ও ক্ষয়িষ্ণু। যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি অভিজাত শাসক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী তৈরি করেছিলেন—সেই ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণীকে প্রায় সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। যারা ভারতে রয়ে গেলেন, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে তারা পরিণত হলেন এক চরম অরক্ষিত সংখ্যালঘুতে, ভারত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রমাণেই যাদের জীবন হলো ওষ্ঠাগত। 

 

আর যারা পাকিস্তানে পাড়ি জমালেন, তারা পেছনে ফেলে গেলেন শত শত বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা তাদের বাড়িঘর, পাঠাগার, ওয়াকফ সম্পত্তি আর প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক। হজের সফর, জ্ঞানচর্চা আর বাণিজ্যের ওপর ভর করে ভারতীয় মুসলিমদের সাথে কায়রো, ইস্তাম্বুল ও মক্কার যে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, সেখানেই তার সলিল সমাধি ঘটল।

এই ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি ছিল ‘সামষ্টিক সভ্যতার স্মৃতি’ হারিয়ে ফেলা। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় মুসলিমরা নিজেদেরকে প্রায় হাজার বছর আগের দিল্লি সালতানাত এবং তারও আগের এক মহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবেই বিবেচনা করে আসছিলেন। কিন্তু দেশভাগ এই পরিচিতিকে এমনভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য করল যে, পাকিস্তান একটি গভীর সভ্যতাকেন্দ্রিক ভিত্তির বদলে কেবল ‘ইসলাম’ নামের ওপর ভর করে একটি জাতীয়তাবাদী পরিচয় দাঁড় করাতে বাধ্য হলো। ফলে এটা পরিণত হলো শেকড়হীন, স্লোগান-সর্বস্ব এক অগভীর ইসলামে, যার সাথে মুসলিম ভারতের প্রকৃত আইনি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনো সম্পর্কই ছিল না। 

 

অন্যদিকে, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ভেতরে থাকা মুসলিমদের প্রতিনিয়ত হিন্দু-গরিষ্ঠ রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের আনুগত্যের প্রমাণ দেওয়ার চাপে পড়ে নিজেদের ইসলামী পরিচিতিকে গুটিয়ে নিতে বা একান্তই চার দেয়ালের মাঝে লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হলো। উভয় ক্ষেত্রেই ইন্দো-ইসলামী সভ্যতার সেই সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য চরমভাবে ক্ষুণ্ন হলো; জীবন্ত অনুশীলনের বদলে তা নিছক কিছু প্রতীক আর স্লোগানে পরিণত হলো।

 

দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশকে বৃহত্তর ইসলামী বিশ্ব থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও দেখা যায়নি। পাকিস্তানের চিরস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা এবং সংঘাত তাদের সকল সম্পদ ও মনোযোগকে গিলে খেয়েছে, যা হয়তো সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে কাজে লাগতে পারত। অন্যদিকে, ভারতে মুসলিমদের সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার মানে হলো—যারা একসময় ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তারাই আজ পরিণত হয়েছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে। একটা সময় জাভা থেকে মরক্কো পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অন্বেষণে দিল্লি ও লখনৌতে ছুটে আসত, ইন্দো-ইসলামী জ্ঞানচর্চার সেই স্বর্ণযুগের চিরতরে অবসান ঘটল।

যখন একটি সভ্যতার বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, তখন পড়ে থাকে কেবলই কিছু সস্তা স্লোগান আর ইতিহাস ভুলে যাওয়ার ব্যাধি।

 

আমাদের খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে, মাত্র ১০০ বছর আগের পরপর ধাক্কায় ইসলামী সভ্যতায় কীভাবে ঘটে গেল এক পুঞ্জীভূত মহাবিপর্যয়।

 

ইসলামী সভ্যতার পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর ফ্রন্টিয়ারের সর্বগ্রাসী পতনগুলো আলাদা আলাদাভাবে ঘটলে হয়তো এর যেকোনো একটি বিপর্যয় সামলে ওঠা যেত। ভূখণ্ড হারানো, ভিনদেশি দখলদারিত্ব এবং জনসংখ্যার বিশাল পতনের পরও সভ্যতাগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। খোদ ইসলামী সভ্যতাই মোঙ্গল আগ্রাসন থেকে কেবল টিকেই থাকেনি, বরং আক্রমণকারীদের নিজেদের সংস্কৃতির স্রোতে মিশিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে উসমানী, সাফাভি ও মুঘল সাম্রাজ্যের মত সুবিশাল গানপাউডার পরাশক্তির ছত্রছায়ায় উৎকর্ষের নতুন এক শিখরে পৌঁছেছিল। 

 

এমনকি ১৯ শতকেও চারপাশের আগ্রাসী উপনিবেশবাদ আর সামরিক পরাজয়ের মাঝেও এক সত্যিকারের ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক রেনেসাঁ বা নবজাগরণের উন্মেষ ঘটেছিল। ছাপাখানার বিকাশ আর প্রকাশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক তখন জানান দিচ্ছিল যে, নিজেদের নতুন করে গড়ার সক্ষমতা তখনও ফুরিয়ে যায়নি। মহীষুরের টিপু সুলতান ছিলেন আধুনিকতা ও বিক্রমের এক তেজস্বী উদাহরণ।

 

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই তিনটি মহাবিপর্যয় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এগুলো একে অপরকে আরও ঘনীভূত করেছিল, প্রতিটি আঘাত ইসলামী সভ্যতার অবকাঠামোর একেকটি ভিন্ন ভিন্ন স্তম্ভকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উসমানী খেলাফতের পতনের সাথে সাথেই ভেঙে পড়ে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তির ছাদ। ফলে আরব ও তুর্কি-ভাষী অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার যে বিশাল পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ছিল, তা একেবারে মুছে যায়।

 

​অন্যদিকে, কমিউনিস্টদের নিপীড়ন ইসলামী সভ্যতার উত্তরের সীমানাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব থেকে মধ্য এশিয়া ও ককেশাস পুরোপুরি আলাদা হয়ে পড়ে। এখানেই চরম আক্রোশে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয় ‘জাদিদ’ সংস্কার আন্দোলনকে। অথচ এই আন্দোলনটিই হতে পারত ইসলাম ও আধুনিকতার মাঝে মেলবন্ধন ঘটানোর এক অসাধারণ মডেল।

 

​আর দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশকে আক্ষরিক অর্থেই টুকরো টুকরো করে ফেলে। জন্ম নেয় দুটি চরম ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র। মুসলিম ভারত একসময় গোটা বিশ্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতির বাতিঘর ছিল। কিন্তু অস্তিত্বের সংকটে ভোগা এই নতুন রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে সেই সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়া আর কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

 

এসব ঘটনা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেই ধ্বংস করেনি; বরং এগুলো টিকিয়ে রাখার পেছনে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক শ্রেণীটি মূল কারিগর ছিল, তাদেরও সমূলে বিনাশ করেছিল। উসমানী শাসকগোষ্ঠী, তাতার মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং ইন্দো-মুসলিম অভিজাত শ্রেণী—এরাই ছিলেন সেই পৃষ্ঠপোষক, যারা বইপত্র লেখাতেন, মাদ্রাসায় ওয়াকফ করতেন এবং আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এভাবেই তারা এমন এক নেটওয়ার্কের অংশীদার ছিলেন, যা ইসলামী সভ্যতাকে নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন বিশ্বাসীর দল থেকে এক বিশাল ক্যানভাসে পরিণত করেছিল। এই শ্রেণীটিকে ছাড়া জ্ঞান উৎপাদন ধসে পড়ল। মুসলিম সমাজ হয়তো কেবল মসজিদ আর বুনিয়াদি ধর্মীয় শিক্ষাটাই ধরে রাখতে পেরেছিল, কিন্তু ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্ভাবনের জন্য যে জটিল ও সমন্বিত ইকোসিস্টেমের দরকার ছিল, তা চিরতরে হারিয়ে গেল।

 

এই পতনের মাত্রাকে সবচেয়ে বেশি ত্বরান্বিত করেছে ‘শরণার্থী-সংকট’। শেষ দশকগুলোতে উসমানী সাম্রাজ্য নিজেই একটি শরণার্থী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, চারপাশ থেকে বাস্তুচ্যুত মুসলিমরা এসে আনাতোলিয়ায় ভিড় জমিয়েছিল। আর পাকিস্তান তো আক্ষরিক অর্থেই জন্ম নিয়েছিল শরণার্থীদের দ্বারা এবং শরণার্থীদের জন্য। এজন্যই ১৯৫০ সাল নাগাদ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কায়েদে আজম জিন্নাহ আর লিয়াকত আলি খানের পরপর ইন্তেকাল হয়ে গেলে বেসামরিক কোনো নেতা খুঁজে পায়নি পাকিস্তান। 

 

চরম ট্রমা আর সর্বস্ব হারানো এই জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক বিনিয়োগের জন্য কোনো স্থিতিশীলতা বা সম্পদ অবশিষ্ট ছিল না। অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রগুলো বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে পারে না, গবেষণায় ফান্ড দিতে পারে না, অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা দরকার, তারও জোগান দিতে পারে না।

 

সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো, ১৯ শতকে শুরু হওয়া আধুনিকায়নের চেষ্টাগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই অকালে গলা টিপে মারা হলো। উসমানীদের তানজিমাত সংস্কার, জাদিদ আন্দোলন এবং আলীগড়—এগুলো ছিল পশ্চিমা মডেলের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ না করে, শিল্পায়িত সভ্যতার সাথে ইসলামের এক মেলবন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে নিজস্ব ‘ইসলামিক আধুনিকতা’ গড়ার সত্যিকারের প্রচেষ্টা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হলো, বুদ্ধিজীবীদের হয় হত্যা করা হলো নয়তো মুখ বন্ধ করে দেওয়া হলো, এবং আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কগুলো ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হলো। যা কিছু অবশিষ্ট রইল, তা কেবলই কিছু ভগ্নাংশ, যা সময়ের সাথে সাথে প্রতিটি প্রজন্মের হাত ধরে কেবল আরও ক্ষয়ে গেছে।

 

এরই চূড়ান্ত ফলাফল হলো সমকালীন ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের এই চরম দেউলিয়াত্ব। আমরা আজ ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের শুরুর দিকের তৈরি হওয়া ধারণাগুলোর ওপরই নির্ভর করে আছি—এই কারণে নয় যে ওই চিন্তাগুলো আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য খুব যথেষ্ট, বরং এই কারণে যে, নতুন চিন্তা উৎপাদনের সক্ষমতাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। পূর্বের সেই উদ্যোগগুলোকে সমালোচনা, পরিমার্জন এবং তার ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু গড়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগেরই আজ কোনো অস্তিত্ব নেই। 

 

আল-আজহারের মতো একসময়ের গর্বের প্রতিষ্ঠানগুলো আজ তাদের সোনালী অতীতের নিছক নিষ্প্রাণ কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যারা চালাতেন, সেই প্রাজ্ঞ শ্রেণীটিকেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের হাতে এখন কেবল পড়ে আছে আগের ধারণাগুলোর ক্ষয়ে যাওয়া সস্তা সংস্করণ, না বুঝে আওড়ানো কিছু মুখস্ত স্লোগান, আর এমন এক চরম স্মৃতিভ্রষ্টতা—যেখানে আমরা টেরই পাই না যে, আমরা আসলে কী হারিয়েছি!

আধুনিক জাতিরাষ্ট্র আর আইডেন্টিটি নিয়ে আজ আমাদের এত দৌড়ঝাঁপ, অথচ এই পরিচয়ই ইতিহাসের বুকে মুসলিম উম্মাহর কবর রচনা করেছে। 

 

আজকের মুসলিম দেশগুলোতে আমরা যে অসীম গহ্বরে ঢুকে গেছি, তা কি আসলে কোনোভাবেই বিশ্ব মুসলমানের শ্রম, সংগ্রাম ও স্বপ্নের মঞ্জিল হবার যোগ্য? 

 

ইতিহাসের সঠিক বিন্দু থেকে শুরু করলে কিন্তু পালটে যায় আমাদের জয় পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আজ আমরা যাকে মুক্তি ও স্বাধীনতার রূপ দিচ্ছি, সেটা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয় ছিলনা। ওর মধ্যে আমাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের কোন সম্ভাবনাই বিদ্যমান ছিলনা।

 

ইসলামী সভ্যতার সন্তান হিসেবে আমরা আমাদের পরাজয়কে ঘিরে খুব সযত্নে কিছু বয়ান দাঁড় করিয়েছি। এর মূল কেন্দ্রে থাকে উপনিবেশবাদের অবিচার আর পশ্চিমা বিশ্বাসঘাতকতার ফিরিস্তি। কেউ কেউ তো এই ডাহা পরাজয়কে এক ধরনের অদ্ভুত বিজয়ে রূপান্তর করে ফেলেন! বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী সভ্যতার এই চরম পতন নাকি আমাদের ‘নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের’ প্রমাণ! আমরা নাকি এই কলুষিত আধুনিকতার জন্য বড্ড বেশিই পবিত্র ছিলাম; আমরা নাকি এতটাই নীতিবান ছিলাম যে, ক্ষমতার জন্য আপস করে নিজেদের কলঙ্কিত করতে চাইনি! মানে, আমরা যে হেরে গেছি, এটাই নাকি প্রমাণ করে যে আমরাই সঠিক ছিলাম!

 

এটা আসলে পরহেজগারির ছদ্মবেশে এক চূড়ান্ত আত্মপ্রবঞ্চনা। অতীতের নস্টালজিক রূপকথায় ডুব দিয়ে মুসলিম মানসের যে রুদ্ধদ্বার দশা, এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নিজেদের এই সর্বনাশের বিশালতাকে মেনে নেওয়ার সাহস না থাকায়, আমরা নিজেদের সব দায়ভার থেকে মুক্ত করে নিয়েছি। পরাজয়টাকে আমরা নিছক ‘আল্লাহর পরীক্ষা’ বা ‘পশ্চিমা ষড়যন্ত্র’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে রাজি নই। আর এই কাজটা করতে গিয়ে, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি যা দরকার ছিল, সেই ‘এজেন্সি’, খুদী, কর্তাসত্তা বা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকেই আমরা স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছি।

 

আচ্ছা, পরাজয়কে মেনে নেওয়া মানেই কি আত্মসমর্পণ? অথচ বাস্তবতাকে স্বীকার করা ছাড়া নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সক্ষমতা বা এজেন্সিকে পুনরুদ্ধার করা কি সম্ভব? আমার তা মনে হয়না।

 

আমরা যখন নির্দ্বিধায় মেনে নিতে পারব যে আমরা সর্বাত্মকভাবে মার খেয়েছি—আমাদের সামরিক শক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের শিকড় উপড়ে ফেলা হয়েছে—ঠিক তখনই আমাদের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটির দরজা খুলে যাবে যে, “কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে এমনটা আর কখনো ঘটবে না?”

 

কিন্তু আমরা যদি পরাজয়কে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাই, যদি গোঁ ধরে বসে থাকি যে এটা আসলে অন্য কিছু (পরীক্ষা, রহমত বা আমাদের পবিত্রতার প্রমাণ), তাহলে আমরা কখনোই এই মূল প্রশ্নটি করতে পারব না। আমরা সময়ের ফাঁদে আটকা পড়ে থাকব, আর নিজেদের ঈমানি দৃঢ়তার পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে বারবার কেবল পরাজয়ের স্বাদই গ্রহণ করতে থাকব। মুসলিম মানসকে আটকে রাখা এই মেকি কাঁচের দেয়াল ভাঙতে হলে পরাজয়কে পুরোপুরি চিনতে হবে, মানতে হবে এবং তা আত্মস্থ করতে হবে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি বসে এর পুরো ভার বা যন্ত্রণাটুকু অনুভব করতে পারলেই কেবল আমরা বুঝতে পারব—কীভাবে আমরা আজকের এই দুর্দশায় এসে পৌঁছালাম, আর পুনর্গঠনের জন্য আমাদের ঠিক কী কী মূল্য চোকাতে হবে।

 

শুধু বসে বসে অতীত বেদনায় হা-হুতাশ করাটা আমাদের এক জনপ্রিয় বিনোদন হয়ে উঠেছে। এভাবে কেবল হিসাব-নিকাশ কষলেই কাজ হবে না। কোনো কিছু বুঝতে হলে জ্ঞান প্রয়োজন, অথচ নিজেদের এই সাম্প্রতিক ইতিহাসটুকু বোঝার মতো জ্ঞানই আমাদের নেই। উমাইয়া, আব্বাসীয় বা অন্য যেকোনো সোনালী অতীত—যার ওপর আমরা অনায়াসে নিজেদের ফ্যান্টাসি চাপিয়ে দিতে পারি—সেগুলো নিয়ে আমরা যতটা সিরিয়াস, ১৯ ও ২০ শতকের ইতিহাসও আমাদের ঠিক একই একাডেমিক সিরিয়াসনেস দিয়ে পাঠ করতে হবে। 

 

ইতিহাসকে কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিক্রমা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং একে দেখতে হবে বস্তুগত পরিস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং শাসকগোষ্ঠীর নেওয়া সিদ্ধান্তের ফসল হিসেবে। আমাদের ইতিহাসের এমন এক নিখুঁত তত্ত্ব দরকার, যা মানবসমাজের উত্থান-পতনের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে পারে। একইরকম অবস্থানে থাকা দুটো রাষ্ট্রের পরিণতি কেন দুই রকম হয়, কেন কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কিছু ধারণা বিকশিত হয় আর অন্য প্রেক্ষাপটে তা মরে যায়, এবং ঠিক কোন মেকানিজমের মাধ্যমে আস্ত একটি শ্রেণী বা জাতি হয়তো শীর্ষে পৌঁছায় অথবা তলিয়ে যায়—সেই ডায়নামিক্সগুলো আমাদের গভীরভাবে বুঝতে হবে।

 

আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা পশ্চিমা উপনিবেশবাদের দখলদারিত্ব, শোষণ এবং সাংস্কৃতিক ঔদ্ধত্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ফোকাস করেছিলেন। সেই কাজের দরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু এর ফলে আমরা আমাদের ধ্বংসের প্রকৃত ‘টাইমলাইন’ বা সময়কালকে ভুলভাবে নির্ণয় করেছি।

 

এটা ঠিক যে উপনিবেশবাদ আমাদের দুর্বল করেছিল, কিন্তু ১৯ শতকের সেই সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারের ধীরগতির প্রক্রিয়ায় আমরা একেবারে ভেঙে পড়িনি। আমাদেরকে মূলত চুরমার করে দিয়েছে ২০ শতকের প্রথমার্ধের তিনটি সুনির্দিষ্ট মহাবিপর্যয়: উসমানী খেলাফতের পতন, উত্তরের সীমানায় কমিউনিজমের উত্থান, এবং ভারত বিভাজন। ১৮ বা ১৯ শতকের ঔপনিবেশিক চাপের চেয়েও বরং এই তিনটি ঘটনাই আমাদের সমাজব্যবস্থা, রাজনৈতিক কাঠামো এবং শত শত বছর ধরে জ্ঞান উৎপাদন টিকিয়ে রাখা আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কগুলোকে পাইকারি হারে ধ্বংস করে দিয়ে আমাদের সভ্যতার ধারাবাহিকতাকে চিরতরে ছিন্ন করে দিয়েছিল।

 

সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, আজকে দেশে দেশে সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যেসব ‘’স্বাধীনতা” ও জাতীয়তা নিয়ে গর্বের বুলি ছুঁড়ি, মুক্তির স্বাদ নিতে চাই, সেই জাতীয়তা আর আইডেন্টিটিই ইতিহাসের বুকে মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের কবর রচনা করেছে। এই জাতিরাষ্ট্রের ধারণা, কোত্থেকে আসল আমাদের অঞ্চলে? ১৬৪৮ সালে ইউরোপের ওয়েস্টফেলিয়ায় জন্ম হলো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের, ১৯২০ শের পরে প্রায় আড়াইশো বছর পরে সেই রাষ্ট্র কেন জন্ম নিল মুসলিম অঞ্চলগুলোতে? যার জন্য এত সংগ্রাম, এত সংকল্প, একটি বারও কি প্রশ্ন করেছি আমরা?

 

অথচ এই রাষ্ট্রগুলো প্রতিষ্ঠা হবার আগের চেয়ে পরের মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক দশা আরো করুন। এটা একাধারে যেমন উৎসাহব্যঞ্জক, তেমনি চরম হতাশাজনক যে—ব্রিটিশ বা রুশ সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও আলীগড় বা জাদিদ আন্দোলনের মতো সংস্কারকরা এক ধরনের সৃজনশীল সংস্কার ও মেলবন্ধনের কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। অথচ আজ উপনিবেশবাদ স্বনামে আর কোনো প্রভাবক না হওয়া সত্ত্বেও, আমরা সেই পরিমাণ বুদ্ধিবৃত্তিক তেজ দেখাতে হিমশিম খাচ্ছি। এই স্থবিরতা আসলে আমাদের নিজেদেরই ডেকে আনা এক ব্যাধি।

 

নিজেদের ধ্বংসের এই সঠিক টাইমলাইনটা বুঝতে পারলে তবেই আমরা সঠিক প্রশ্নগুলো করতে পারব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা স্রেফ বিমূর্ত তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে এসে আমরা আমাদের কাজগুলোকে নিরেট ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ওপর দাঁড় করাতে পারব। আমাদের ঠিক ঠিক বুঝতে হবে আসলে কী ধ্বংস হয়েছিল: কোন প্রতিষ্ঠানগুলো হারিয়ে গেছে, কোন নেটওয়ার্কগুলো ছিঁড়ে গেছে, পৃষ্ঠপোষকতার কোন সিস্টেমগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক উৎপাদনকে বাঁচিয়ে রাখত, আর কোন সামাজিক ব্যবস্থা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে সচল রেখেছিল। এগুলো বুঝতে পারলেই কেবল আমরা মৃত কাঠামোগুলোকে কবর থেকে খুঁড়ে তোলার বৃথা চেষ্টার বদলে, আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানানসই নতুন কোনো সিস্টেম বা কাঠামো ডিজাইনের কথা ভাবতে পারব।

 

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নিজেদের ইতিহাসের সাথে এই সৎ হিসাব-নিকাশটুকু করার মতো, এবং আমাদের নিষ্ক্রিয়তাকে জায়েজ করার জন্য বানানো ওই স্বস্তিদায়ক রূপকথাগুলোকে ছুড়ে ফেলার মতো সাহস কি আমাদের আছে?

 

এখানে কোনো শর্টকাট নেই। আকাশ থেকে কোনো গায়েবী সাহায্য এসে আমাদের হারানো অতীত ফিরিয়ে দেবে না। আমাদের সামনে এখন একটাই পথ—পরিশ্রম। আর তার শুরুটা হতে হবে সবকিছুকে একদম স্পষ্ট ও নির্মোহভাবে দেখার মধ্য দিয়ে।

 

আমাদের শক্তিমান হয়ে উঠতে হবে। চিন্তায়, চেতনায়, মগজে, মননে। কেননা আল্লামা ইকবাল বলেছেন – সভ্যতা হলো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের রূপায়ন।

 

৩১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of হিশাম আল নোমান

হিশাম আল নোমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়ন করছেন। রোয়াক ব্লগে মৌলিক ও অনুবাদ প্রবন্ধে অবদান রাখেন। ভূরাজনীতি, ফিলিস্তিন, ডি-৮ এবং বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদদের জীবনী ও চিন্তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
Picture of হিশাম আল নোমান

হিশাম আল নোমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়ন করছেন। রোয়াক ব্লগে মৌলিক ও অনুবাদ প্রবন্ধে অবদান রাখেন। ভূরাজনীতি, ফিলিস্তিন, ডি-৮ এবং বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদদের জীবনী ও চিন্তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top