১৮৫৬ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলাত থেকে আমদানি করে এনফিল্ড রাইফেল। এই রাইফেলে যে কার্তুজ ব্যবহার করা হতো তার গায়ে দেওয়া হত চর্বির একটা বিশেষ প্রলেপ। এই চর্বির প্রলেপ দেবার কারণ ছিল, কার্তুজ যাতে পানিতে ভিজে নষ্ট না হতে পারে। এই কার্তুজ এনফিল্ড রাইফেলে ভরবার আগে ওই চর্বির আবরণ দাঁত দিয়ে কেটে ফেলে দিতে হতো। জানাজানি হয়, ওই চর্বির আস্তরণ প্রস্তুত করা হয় শূকর ও গরুর চর্বি মিশিয়ে। মুসলমান সৈন্যরা এটা জেনে ক্ষুব্ধ হন, কারণ শূকর তাদের ধর্মে খাওয়া নিষিদ্ধ (হারাম)। অন্যদিকে হিন্দু সৈন্যরাও এটা জেনে ক্ষুব্ধ হন, কারণ গো-মাংস তাদের ধর্মে খাওয়া নিষিদ্ধ। গো-চর্বি তাই তারা দাঁতে কাটতে পারেন না। প্রথমে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে এই কার্তুজ ব্যবহারের অস্বীকৃতি জানান সৈন্যরা। পরে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২৯ মার্চ বারাকপুর সেনানিবাসে মঙ্গল পাণ্ডে নামে একজন ব্রাহ্মণ সৈনিক প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েকজন ব্রাহ্মণ সৈন্য। এভাবেই বাংলায় প্রথম শুরু হয় সিপাহি অভ্যুত্থান। অবশ্য এই সৈন্যরা বাঙালি ছিলেন না। প্রথমে এই বিদ্রোহের কারণ ছিল ধর্মীয় আবেগ। কিন্তু পরে এই বিদ্রোহ পরিগ্রহ করে রাজনৈতিক রূপ। প্রথমে সৈন্যদের মধ্যে কোনো পরিকল্পনা ও সংগঠন ছিল না। কিন্তু বিদ্রোহ আরম্ভ হলে তা গড়ে উঠতে শুরু করে। কেবল তাই নয়, উত্তর ভারতের বড় বড় শহরের সর্বসাধারণ সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে সিপাহিদের। সিপাহি অভ্যুত্থান উত্তর ভারতের বড় বড় শহরে গ্রহণ করে গণআন্দোলনের বিশিষ্ট রূপ।

 

১৮৫৭ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ছিল ২,৩৮,০০০ সৈন্য। এদের মধ্যে ৩৮,০০০ ছিল ইউরোপীয় সৈন্য। বাদবাকি ছিল এই উপমহাদেশের। এসময় ইউরোপীয় সৈন্যদের মধ্যে ১৩,০০০ ছিল পাঞ্জাবে। বাংলা ও মিরাটের মাঝামাঝি অঞ্চলে কোনো ইউরোপীয় সৈন্য ছিল না। বারাকপুরে যে সৈন্যরা প্রথম বিদ্রোহ করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন উত্তর-ভারতের হিন্দিভাষী ব্রাহ্মণ। যারা গরুর চর্বি দাঁত দিয়ে কেটেছেন জেনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বাংলা থেকে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে উত্তর-ভারতের নানা জায়গায়। বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে ৮৬ বছর বয়স্ক নাম মাত্র মোগল বাদশা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে দেশের প্রকৃত বাদশা বলে ঘোষণা করেন। অর্থাৎ সিপাহিদের মাথায় যেকোনো রাজনৈতিক বুদ্ধি ছিল না, তা নয়। বাংলাদেশে এই বিদ্রোহ তেমন জোরালো না হলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও শ্রীহট্টে হতে পেরেছিল। চট্টগ্রামে এই বিদ্রোহ হতে পেরেছিল ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকায় সিপাহিরা বিদ্রোহ করেন। সিপাহি বিদ্রোহ দমিত হয়েছিল, কিন্তু তখনকার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি, ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ভেঙে পড়েছিল। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সরাসরি ব্রিটেনের রাজত্ব। মহারানি ভিক্টোরিয়াকে ঘোষণা করা হয়েছিল ভারত সম্রাজ্ঞী। শেষ মোগল বাদশা বাহাদুর শাহ (দ্বিতীয়)-কে ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহের আগেই অপসারণ করে। কিন্তু ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহিরা দিল্লি অধিকার করে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ফের সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। পরে ইংরেজরা পুনরায় দিল্লি অধিকার করে বাহাদুর শাহকে বন্দী করে। এবং নামমাত্র বিচার করে তাকে রেঙ্গুনে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করে রাখে। সেখানে বন্দী অবস্থায় ৮৬ বছর বয়সে ঘটে তার মৃত্যু।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তার The Discovery of India বইতে বলেছেন, এই বিদ্রোহ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে এ দেশবাসীর কোনো দেশপ্রেমের অভ্যুত্থান ছিল না। এর পিছনে ছিল না কোন গণসমর্থন। এটা ছিল একটা সামন্তবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ষড়যন্ত্রেরই ফল। কিন্তু আধুনিক গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সিপাহিদের পক্ষে ছিল বিরাট গণসমর্থন। আর এই অভ্যুত্থানকে বলা চলে না একটি প্রতিক্রিয়াশীল সামান্ততান্ত্রিক ষড়যন্ত্রেরই ফল। কেননা, সে সময়ের অধিকাংশ সামন্ত এই অভ্যুত্থানে কোনো অংশগ্রহণ করেননি। উপরন্ত, করেছেন কোম্পানীর শাসকদেরই সাহায্য সহযোগিতা। তখনকার বাংলায় যাদেরকে ধরা হতো প্রগতিশীল শক্তি হিসাবে, তারা অবশ্য সকলেই সমর্থন করেছিলেন কোম্পানির রাজত্বকে। কিন্তু উত্তর-ভারতের বড় বড় শহর, দিল্লি, আগ্রা, এহলাবাদ’ কানপুর, লাখৌ শহরে সর্বসাধারণ এসে দাঁড়িয়েছিলেন সিপাহিদের পাশে। কলকাতা শহর তখন ছিল সারা ভারতের রাজধানী। এখানে হিন্দু বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা বিশেষভাবেই গ্রহণ করেছিলেন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ। কবি ঈশ্বরগুপ্ত ১৮৫৭ সালের ২০ জুন সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লেখেন,

জয় জয় জগদীশ, জগতের সার।

লহ লহ লহ নাথ, প্রণাম আমার ॥

করি এই নিবেদন, দীন দয়াময়।

বাঞ্ছা ফল পূর্ণ কর, হয়ে বাঞ্ছাময় ॥

চিরকাল হয় যেন, ব্রিটিশের জয়।

ব্রিটিশের রাজলক্ষ্মী, স্থির যেন রয় ॥

বিদ্রোহী সিপাহীগণ, করি নিবেদন।

ছাড় দ্বেষ রণবেশ কর সম্বরণ ॥

কার কথা শুনে সবে, সেজেছ সমরে?

পিপীলিকার পাখা উঠে, মরিবার তরে ।

এখনই ছেড়ে দেও, মিছে ছেলে খেলা।

আকাশের উপরেতে, কেন মার ঢেলা ॥

 

সিপাহি অভ্যুত্থান হিন্দু অথবা মুসলমান সিপাহিদের অভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল সিপাহিদের একটা মিলিত অভ্যুত্থান। কিন্তু যেহেতু সিপাহিদের মধ্যে সংখ্যায় মুসলমানরাই ছিলেন বেশি, তাই এর চেহারাটা উত্তর-ভারতের অনেক জায়গায় হয়ে উঠেছিল কিছুটা মুসলমানী। বাংলাদেশে মুসলমানরা যাতে সিপাহি অভ্যুত্থানে কোনো অংশগ্রহণ না করতে পারে, সে জন্য ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা দুদু মিয়াকে গ্রেফতার করে ১৮৫৭ সালে তাকে জেলে রাজবন্দী রূপে রাখা হয়। ১৮৬০ সালে বাহাদুরপুরে হয় তার মৃত্যু। ১৮৫৭-এর সিপাহি অভ্যুত্থান মুসলিম অভ্যুত্থান ছিল না। কিন্তু ভারতে ১৯৫৭ সালে এর শতবার্ষিকী পালন করা হয় না। অনেক হিন্দু বুদ্ধিজীবী বলেন, এটা ছিল একটা মুসলিম ষড়যন্ত্র। এর লক্ষ্য ছিল মুসলিম বাদশাহীকে ফিরিয়ে আনা। যে জন্য দিল্লি দখল করে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ঘোষণা করা হয়েছিল, হিন্দুস্তানের সম্রাট হিসেবে। কিন্তু এটা করা হয়েছিল শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখার জন্য। কারণ, মোগল বাদশাহী ছাড়া দিল্লিতে তখন আর কোনো বাদশাহী ছিল না। তাই বলা চলে না, এটা ছিল একটি মুসলিম ষড়যন্ত্র। কিন্তু ১৯৫৭ সালে সাবেক পাকিস্তানে সিপাহি অভ্যুত্থানের শতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। ঢাকায় রানি ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম বদলিয়ে রাখা হয়েছিল বাহাদুর শাহ পার্ক। যে নাম আজও বদলানো হয়নি। এই দিনটি উপলক্ষে ঢাকায় করা হয়েছিল মিছিল, সভা- সমাবেশ।

১০৫৭ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ (২৯ ডিসেম্বর ১৯২৯ – ১৫ আগস্ট ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী। তাঁর রচনা ও বক্তৃতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাজীবন

১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা সংঘ বিষ্ণুপুর থেকে বি. কোর্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা সে সময়ের মাধ্যমিক শিক্ষার সমমান ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তেজগাঁও কৃষি ইনস্টিটিউট থেকে কৃষিবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপে গমন করেন এবং উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।

ফ্রান্সে চার বছর ধরে প্ল্যান্ট ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শেষে তিনি পুয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন

১৯৬৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ১১ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন এবং সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

এবনে গোলাম সামাদের পিতা মোহাম্মদ ইয়াসিন পেশায় একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন এবং তাঁর মাতার নাম নছিরন নেসা। তাঁর বড় বোন দৌলতুননেসা খাতুন ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক ও সমাজকর্মী।

লেখালিখি ও চিন্তাধারা

এবনে গোলাম সামাদ মূলত একজন কলাম লেখক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর প্রায় একশত গবেষণা প্রবন্ধ এবং প্রায় পনেরোটি গ্রন্থ দেশ ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি ছিল তাঁর লেখার প্রধান বিষয়বস্তু। তিনি দীর্ঘদিন ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

তাঁর লেখায় মুক্তচিন্তা ও প্রশ্নমুখর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বাংলা একাডেমির ভূমিকা সম্পর্কেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।

ইতিহাস বিশ্লেষণে তাঁর রচনাশৈলী পাঠকের জন্য যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনি উপভোগ্য। ভারতীয় জাতীয় সংগীত ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাস, কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল গভীর ও চিন্তাজাগানিয়া।

গ্রন্থসমূহ

উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র হয়েও তিনি শিল্পকলার ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ নিচে দেওয়া হলো—

  • বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি
  • আত্মপক্ষ
  • আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
  • বাংলাদেশ: সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি প্রতিক্রিয়া
  • মানুষ ও তার শিল্পকলা
  • নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ
  • প্রাথমিক জীবাণুতত্ত্ব
  • বায়ান্ন থেকে একাত্তরli>
  • ইসলামী শিল্পকলা(১৯৭৮)
  • শিল্পকলার ইতিকথা(১৯৬০)
  • এবনে গোলাম সামাদ রচনাসমগ্র (১–৩ খণ্ড)
পদক ও পুরস্কার

তাঁর চিন্তাচর্চা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (চট্টগ্রাম, ২০০৯) লাভ করেন।

মৃত্যু

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট রোববার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

Picture of এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ (২৯ ডিসেম্বর ১৯২৯ – ১৫ আগস্ট ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী। তাঁর রচনা ও বক্তৃতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাজীবন

১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা সংঘ বিষ্ণুপুর থেকে বি. কোর্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা সে সময়ের মাধ্যমিক শিক্ষার সমমান ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তেজগাঁও কৃষি ইনস্টিটিউট থেকে কৃষিবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপে গমন করেন এবং উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।

ফ্রান্সে চার বছর ধরে প্ল্যান্ট ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শেষে তিনি পুয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন

১৯৬৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ১১ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন এবং সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

এবনে গোলাম সামাদের পিতা মোহাম্মদ ইয়াসিন পেশায় একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন এবং তাঁর মাতার নাম নছিরন নেসা। তাঁর বড় বোন দৌলতুননেসা খাতুন ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক ও সমাজকর্মী।

লেখালিখি ও চিন্তাধারা

এবনে গোলাম সামাদ মূলত একজন কলাম লেখক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর প্রায় একশত গবেষণা প্রবন্ধ এবং প্রায় পনেরোটি গ্রন্থ দেশ ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি ছিল তাঁর লেখার প্রধান বিষয়বস্তু। তিনি দীর্ঘদিন ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

তাঁর লেখায় মুক্তচিন্তা ও প্রশ্নমুখর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বাংলা একাডেমির ভূমিকা সম্পর্কেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।

ইতিহাস বিশ্লেষণে তাঁর রচনাশৈলী পাঠকের জন্য যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনি উপভোগ্য। ভারতীয় জাতীয় সংগীত ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাস, কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল গভীর ও চিন্তাজাগানিয়া।

গ্রন্থসমূহ

উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র হয়েও তিনি শিল্পকলার ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ নিচে দেওয়া হলো—

  • বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি
  • আত্মপক্ষ
  • আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
  • বাংলাদেশ: সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি প্রতিক্রিয়া
  • মানুষ ও তার শিল্পকলা
  • নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ
  • প্রাথমিক জীবাণুতত্ত্ব
  • বায়ান্ন থেকে একাত্তরli>
  • ইসলামী শিল্পকলা(১৯৭৮)
  • শিল্পকলার ইতিকথা(১৯৬০)
  • এবনে গোলাম সামাদ রচনাসমগ্র (১–৩ খণ্ড)
পদক ও পুরস্কার

তাঁর চিন্তাচর্চা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (চট্টগ্রাম, ২০০৯) লাভ করেন।

মৃত্যু

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট রোববার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top