সংগ্রামী মহানায়কঃ আলীয়া আলী ইজ্জেতবেগভিচ

এক

উনিশ শতকের শেষার্ধে-ই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই পরিবর্তনের আলামত সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠছিলো। আসন্ন পরিবর্তন বিশ্বব্যস্থাকে অস্থির করে তুলছিলো। ইউরোপীয় রেনেসাঁ, কয়েকটি বড়বড় সাম্রাজ্যের পতন, বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শাসন প্রভৃতি গোটা দুনিয়াকে আগাগোড়া পালটে দেয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দার্শনিকগণ নতুন চিন্তাগত ধারা তৈরী করেন। আমরা কি নিশ্চিত সত্য (হাকীকত) লাভ করতে পারি’? ‘সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস স্থাপনের কোন আবশ্যকতা আছে কি?’ কিংবা ‘ধর্ম কি এ সময় প্রাসঙ্গিক?’ এ প্রশ্নগুলো তাদের আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ইউরোপীয় মানস তাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

বিশেষত, পাশ্চাত্য সভ্যতার তিন জনক-

  • চার্লস ডারউইন
  • সিগমুণ্ড ফ্রয়েড
  • কার্ল মার্ক্স

এদের হাত ধরে চিন্তাগত ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। পাশ্চাত্যের সমান্তরালে প্রাচ্যেও এ ধাক্কা লাগে। রাজনৈতিক আধিপত্যের পরিবর্তে এবার চিন্তাগত আধিপত্য বিস্তার পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমা বিশ্বের একাধিপত্যকে সুস্পষ্ট ভাষায় জাহির করে তার বিখ্যাত ‘End of History’ তত্ত্বকে সামনে নিয়ে আসেন প্রখ্যাত ইউরোপীয় চিন্তক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা। এর মূলকথা হলো ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে। পশ্চিমা একাধিপত্যই দুনিয়ার নিয়তি। দার্শনিক ফ্রেডরিক নীটশে (Friedrich Nietzsche) বলেন ‘স্রষ্টা হচ্ছে দরিদ্রদের তৈরি। বর্তমান সময়ে তার কোন প্রয়োজন নেই। স্রষ্টা এখন মৃত”।  ইউরোপীয় চিন্তকগণ এভাবেই ধর্মকে ঘোষণা করেন কুসংস্কারের সমষ্টি, আর ইসলামকে ঘোষণা করেন বর্তমান সময়ে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে। ঠিক এ সময়েই ইসলামী ঐতিহ্যের মহান সম্ভাবনায় প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে নতুন সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মুসলিম উম্মাহর মহান নেতা, প্রখ্যাত চিন্তক ও দার্শনিক আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচ নিয়ে আসেন ‘মানবতার মুক্তি’র একমাত্র সম্ভাবনা। সময়ের স্রোতের বিপরীতে ঘোষণা করেনঃ 

“ওই চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি যতদিন প্রদীপ্ত থাকবে, ততদিন আল্লাহর এই জমীনে ইসলাম টিকে থাকবে”।

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে ইসলামকে পশ্চিমারা অপাংক্তেয় ঘোষণা দিয়ে দূরে সড়িয়ে রেখেছিলো, আলীয়ার চোখে তাই ছিলো মানবমুক্তির একমাত্র সম্ভাবনা। তাই ইসলামকে আলীয়া দেখেছেন এমন এক কাঠামো রূপে যা সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সকল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। নতুনভাবে ইসলামকে জীবনসমস্যার সমাধানের অত্যুজ্জ্বল সম্ভাবনা রূপে পেশ করিয়ে আলীয়া হয়ে উঠেছিলেন মুসলিম উম্মাহর আশার প্রতীক।  তাই উম্মাহ তাকে অভিনন্দিত করেছে ‘মহান মুজাহিদ ও জ্ঞানসম্রাট’ হিসেবে। 

 

দুই  

 ১৯২৫ সালের ৮ই আগস্ট বসনিয়ার বেসান্সকি সামাকে আলীয়া জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে ওঠেন সারায়েভোয়। সেখানে আইনে ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি নিজেকে ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত করে তুলেন। আলীয়া যখন মাত্র ১৬ বছর বয়সী, তখনি বসনিয়ায় ‘ইয়ং মুসলিম’ নামক একটি ইসলামী সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। ‘ইয়ং মুসলিমে’র ভিশন ও কর্মপন্থা ছিলো অন্যান্য সকল দল থেকে ভিন্ন, যা বসনিয়ান মুসলিমদের আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ১৬ বছরের আলীয়া ‘ইয়ং মুসলিমে’ যোগ দেন এবং এভাবেই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। মেয়েদের জন্যই একটি পৃথক সংগঠন গড়ে তোলা হয়।  

তরুণদের নিকট আলীয়া জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ‘ইয়ং মুসলিম’ যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ব্যাপক কাজ করে। জার্মান বাহিনী বসনিয়ায় ১ লাখেরও বেশি মুসলিমকে হত্যা করে। এসময় ‘ইয়ং মুসলিম’ ত্রাণ বিতরণ, দুস্থদের সহায়তা, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনসহ বহু কাজ করে, যা তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।

বিশ্বযুদ্ধের পর বসনিয়ায় মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে কট্টর একনায়কতন্ত্রী কমিউনিস্ট শাসন শুরু হয় ইয়ং মুসলিম  শাসক দলের কোপানলে পড়ে, এবং সাধারণ মুসলিমরা ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হয়। এসময় দলের অন্যান্য নেতাদের সাথে আলীয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। ৫ বছর পর যখন আলীয়া জেল থেকে বের হন, তখন তিনি ২৫ বছরের তরুণ।

আলীয়া বিশ্বাস করতেন- পশ্চিমা আধিপত্যকে মোকাবেলা করতে হলে আমাদের জ্ঞানগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে কোন ফাঁক রাখা যাবেনা। তাই শত ঝামেলার মধ্যেও তিনি তাঁর পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনবিদ্যায় ডিগ্রি লাভ করেন। এসময় ‘ইয়ং মুসলিম’  এর নেতৃত্বও চলে আসে তাঁর হাতে। আলীয়া একে নতুনভাবে সংগঠিত করে তোলেন, এবং প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে কমিউনিস্ট সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেন। মুসলিম তরুণদের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে ঠেকাতে কমিউনিস্ট সরকার রক্তবন্যা বইয়ে দেয়। অসংখ্যা নেতা-কর্মীকে হত্যা করে, চারজন শীর্ষ নেতাকে প্রকাশ্যে ফাসি দেয়। যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয় আরো কয়েকশো নেতাকে।  বাধ্য হয়ে আলীয়া তখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সড়ে যান। প্রায় একদশক আলীয়া আত্মগোপনে থাকেন। এসময় তিনি অধ্যয়নে রত থাকেন।  সমালোচকদের মতে রাজনীতিবিদ আলীয়া এসময়ই উম্মাহর মহান পথনির্দেশক ও জ্ঞানসম্রাট হয়ে ওঠেন। 

 

তিন

উপনিবেশবাদী শাসন থেকে মুক্তির জন্য একে একে প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রই হাটছিলো স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে। মুসলিম অধ্যুষিত বসনিয়াও একই পন্থা গ্রহণ করে। কিন্তু স্বাধীনতার এ চাওয়া তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

পাশ্চাত্য বরাবরের ন্যায় তাদের দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করে বসনিয়াতে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। সার্ব ও ক্রোয়েটদের কে পাশ্চাত্য পৃষ্ঠপোষকতা করে বসনীয় মুসলিমদের সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য। তাঁর পরের চিত্র শুধু নৃশংসতার।

বসনিয়ার ৭০ ভাগ ভূমি অবরোধ করে ফেলা হয়। পুরো দেশটাকে ভূতুড়ে বানিয়ে ফেলে। পুরো দেশটাই পরিণত হয় “কন্সান্ট্রেশন ক্যাম্প” এ। সুদীর্ঘ চার বছর একটি রাতও একজন বসনীয় শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। কিন্তু পাশ্চাত্যের মানবিকতা (!!) এখানে নীরব! ইউরোপীয় কোন দেশই জোরদার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কেবল দায়সারা গোছের কিছু বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলো মানবতার ফেরিওয়ালাদের কাজ! আলীয়ার ভাষায়ঃ

“এটা ছিলো দুর্বলকে জিম্মি রেখে, এক নীতিহীন আপোসের পথে শান্তি ক্রয়ের প্রচেষ্টা”। 

সময়ের এই সংকটময় মূহুর্তে আলীয়া খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন, পাশ্চাত্যের কাছ থেকে কোন কিছু আশা করাটা বৃথা। তাদের একপেশে মানবতা কেবল ইউরোপীয়দের জন্যই নির্দিষ্ট, মুসলিমদের জন্য তাঁর কোন ভূমিকা নেই। এ গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিমদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, এবং তাদের পুনরুত্থানের সকল সম্ভাবনা কে গুড়িয়ে দেওয়া। 

 আলীয়া বুঝতে পারছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনই এখন একমাত্র পন্থা ।  আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে  আলীয়া প্রকাশ্য রাজনীতিতেও নতুনভাবে আগমন করেন। কারণ আলীয়া বুঝতে পারছিলেন, বসনীয় মুসলিমদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবশ্যই তাঁকে মাঠে নামতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। এজন্য তিনি গঠন করেন SDA।

আলীয়ার প্রজ্ঞা বসনীয় মুসলিমদের নতুনভাবে উজ্জীবিত করে তোলে। আলীয়া পাশ্চাত্যের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের এই দ্বিমুখী নীতি (তাদের ভাষায় রাজনীতি) -র নির্লজ্জ প্রয়োগেই আলীয়া ধৈর্যহীন হননি। নিজ জাতি ও উম্মাহর এই আত্মত্যাগী মুজাহিদ তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও প্রতিরোধ যুদ্ধের শেষ বাতিটি তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন। 

বসনীয়দের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আলীয়া ইজ্জেতবেগভিচ কে দেখেছি এক ধীমান নেতা হিসেবে, যিনি একইসাথে গোটা পশ্চিমা বিশ্বের চ্যালেঞ্জ কে মোকাবিলা করে নেতৃত্ব দিয়েছেন একটি জাতির আত্মপরিচয় ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জনসংগ্রামে। এ সংকটের সময় আলীয়ার প্রজ্ঞা, অসম সাহসিকতা, প্রবল ব্যক্তিত্ব, ক্ষুরধার লেখনী শুধুমাত্র বসনীয়দের মুক্তির জন্যই দিকনির্দেশনা দেয়নি, বরং গোটা উম্মাহর মুক্তি ও ইসলামী সভ্যতার পুনরুত্থানের অনুপ্রেরক হিসেবে কাজ করেছে।

কারণ আলীয়ার চিন্তাগত ও কার্যগত ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি ছিলো ইসলাম, যাকে উপজীব্য করেই পরিচালিত হয়েছে আলীয়ার সকল কার্যক্রম। 

আলীয়া অনুভব করেছিলেন ইসলাম কে উপজীব্য না করে বসনীয়দের মুক্তি অসম্ভব। কারণ দিনশেষে যা পরিগ্রহ করবে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে, যা কিনা পাশ্চাত্যের মানসিক দাসত্বের নামান্তর। আলীয়ার চিন্তানুযায়ী- গোটা মানবতাকে সত্যিকার মুক্তি একমাত্র ইসলামই দিতে পারে। মুসলিম রা যখনই তাদের শেকড় বিচ্যুত হয়েছে, ইসলামকে ছেড়ে অন্য জায়গায় সমাধানের জন্য, তখনই তারা সংকটের ঘূর্ণাবর্তে পতিত হয়েছে। মুসলিমরা যখন পল্লবগ্রাহিতা থেকে পুনরায় শেকড়মুখী হবে, একমাত্র তাই তাদেরকে মুক্তির পথ বাৎলে দিতে পারে।  

 

চার

আত্মগোপনের একদশক পর সত্তরের শতকে আলীয়া নতুনভাবে পৃথিবীর সামনে আবির্ভূত হন। দুনিয়া প্রত্যক্ষ করে এক নতুন ও অধিকতর প্রাজ্ঞ আলীয়াকে। এসময় তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ  Islamic Declaration যা কিনা গোটা দুনিয়াকে নাড়িয়ে দেয়। এ গ্রন্থের অবিশ্বাস্য প্রভাব ও অসাধারণ যৌক্তিক উপস্থাপনা দেখে বিমুগ্ধ হয়ে পাশ্চাত্যের এক মনীষী বলেছিলেন,

“যদি মুসলিমদের নতুনভাবে পুনর্জাগরণ হয়, নিঃসন্দেহে এ বইটি হবে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অনুপ্রেরক”।

আলীয়া লক্ষ্য করছিলেন, মুসলিম জাতি অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে এখনো এই মতটা প্রভাবশালী, ‘ইসলাম যেহেতু শ্রেষ্ঠ, তাই আমরাও শ্রেষ্ঠ’। এ আত্মতৃপ্তির মধ্যে পড়ে তারা নিজ দায়িত্ব বিস্মৃত হয়ে গেছে। আলীয়া মুসলিমদেরকে বৃথা আত্মতৃপ্তিতে না ভুগে নিজস্ব মৌলিক কাজ করা এবং ইসলামের মৌলিক উৎসের উপর ভিত্তি করে নিজেদের অগরসরতার পথ তৈরীর আহ্বান জানান। এ বিষয়ে তিনি বলেন-

“Islam is the best – this is the truth – but we are not the best. Those two are different things and we always switch them, instead of hating the West, we should compete with it. Did not the Quran order us to do that: ‘Strive to achieve the virtue of deeds……’ with the help of religion and science, we can create the power that we need. It is a long and hard road, it is the Quran talks about, but there is no other way.”

“ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ, এটাই মহান সত্য। কিন্তু আমরা শ্রেষ্ঠ হতে পারিনি। দুটি পুরোপুরি ভিন্ন জিনিস অথচ আমরা একটিকে অন্যটির সাথে গুলিয়ে ফেলি। পাশ্চাত্যকে শুধু ঘৃণা নয়, এর সাথে প্রতিযোগিতায় আসা উচিত। কোরআন কি আমাদের সেটা করতেই বলেনি যে ভালো কাজের জন্য তোমরা প্রতিযোগিতা করো? এটি একটি দীর্ঘ ও কঠিন পথ, আর কোরআন আমাদের এসম্পর্কেই বলেছে। কিন্তু এ পথেই আমাদের হাটতে হবে, এর কোন  বিকল্প নেই”।

পাশ্চাত্যের মোকাবিলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপন করতে হলে আমাদের জ্ঞানগত অবস্থানকে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হবে, অন্যথায় পাশ্চাত্যের মোকাবিলা অসম্ভব। 

পাশ্চাত্যের সাথে ইসলামের তুলনামূলক আলোচনায় আলীয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ হচ্ছে তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ “Islam Between East & West” এ। এখানে আলীয়া তিনটি বিশ্বদর্শন নিয়ে আলাপ করেছেন। তাঁর মতে বিশ্বধারণার তিনটি ধারা রয়েছে।

  • ধর্মীয়
  • বস্তুবাদী
  • ইসলামী

আলীয়া মূলত দুটি প্রান্তিক ধারা হিসেবে ‘বস্তুবাদী’ ও ‘ধর্মীয়’ ধারাকে চিহ্নিত করেছেন এবং ইসলামকে মধ্যবর্তী ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আলীয়া লেখেন- 

“ইসলামের মধ্যবর্তী অবস্থানকে বোঝা যেতে পারে এভাবে- ধর্মের দিক থেকে বলা হয়েছে ইসলাম অতিরিক্ত জাগতিক, আবার বিজ্ঞানের দিক থেকে তা বিশেষভাবে রহস্যগন্ধী, স্বর্গমুখী। অন্যকথায় বস্তুবাদীরা ইসলামকে দেখেছে ডানপন্থী হিসেবে, আর খ্রিষ্টানরা দেখেছে শুধু সমাজ রাজনৈতিক আন্দোলক তথা বামপন্থী প্রবণতার ধারক হিসেবে। এদিকে ইসলামের অভ্যন্তরে এ জাতীয় মেরুকরণ দুর্লক্ষ্য নয়। রহস্যবাদীরা বা সুফীরা সবসময় ইসলামের ধর্মীয় তথা পরমার্থিক দিকটিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন কিন্তু বুদ্ধিবাদীরা গুরুত্ব দিয়েছেন ঠিক এর বিপরীত দিকটিকে।

কিন্তু উভয় পক্ষই অসুবিধায় পড়েছেন এ কারণে যে তাদের নির্বাচিত অবকাঠামোর কোনতিতেই ইসলাম প্রবিষ্ট হয়না। আমরা যদি অযুকে উদাহরণ হিসেবে ধরি তাহলে দেখবো- রহস্যবাদীরা একে ধর্মীয় পবিত্রকরণের মাধ্যমে হিসেবে দেখেন। অপরদিকে বুদ্ধিবাদীরা একে বিবেচনা করেছেন শুধু দৈহিক পরিচ্ছন্নতার ব্যাপার হিসেবে। এখানে দুপক্ষই সঠিক, কিন্তু আংশিকভাবে। অন্যান্য আরো প্রেক্ষাপটে দেখা যায় দৈহিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, ও সামাজিক অনুষঙ্গ প্রত্যাখ্যান করে রহস্যবাদীরা ইসলামকে একটি ধর্মভিত্তিক উপপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চেয়েছেন। অপরদিকে বুদ্ধিবাদীরা ইসলামের খাঁটি ধর্মীয় দিককে অবজ্ঞা করে শুধু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করতে চেয়েছেন, যার নাম দেয়া হয়েছে ইসলামী জাতীয়তাবাদ। কিন্তু তা এসেছে নৈতিকতা ও ধর্মের সারাংশ বিবর্জিত হয়ে এবং তা অপরাপর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ন্যায়ই সারশূন্য হয়ে পড়েছে”।

আলীয়া সামনে অগ্রসর হয়ে লেখেন-

“বস্তুত ইসলাম শুধু একটি জাতি নয়, বরং নৈতিক মিশনের প্লাটফর্ম, যেখানে অন্যায় ও অসত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ন্যায় ও সত্যের দিকে আহবান জানানো হয়। আমরা যদি ইসলামের রাজনৈতিক আলেখ্যকে অশ্রদ্ধা করি এবং ধর্মীয় রহস্যবাদ গ্রহণ করি তাহলএ নিঃশব্দে নির্ভরশীলতা ও দাসত্বকে স্বীকার করে নেই। পক্ষান্তরে যদি ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো উপেক্ষা করি তাহলে নৈতিক শক্তিমত্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি”।

এভাবে আলীয়া ইসলামের সামগ্রিকতাকে উপস্থাপন করে বলেন-

“ইসলামী ব্যবস্থার চূড়ান্ত সংজ্ঞা হলো- ধর্ম ও আইন, শিক্ষা ও শক্তি, আদর্শ এবং স্বার্থ, আধ্যাত্মিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। ইসলাম গ্রহণ করার পর কোন মুসলিম ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন আদর্শের মুখাপেক্ষী হতে পারেনা। ঠিক এ কারণেই তাঁর জীবনের সামগ্রিকতাকে ইসলামের মাধ্যমে পরিব্যাপ্ত করা তাঁর দায়িত্ব। এখানেই ইসলামী ব্যবস্থার চূড়ান্ত পূর্ণতা।” 

 

পাঁচ

আলীয়ার জীবনদর্শন ছিলো ইসলাম, যা ছিলো তাঁর সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু। আলীয়া যেমন তাঁর গ্রন্থ “Islam Between East & West” এ তাত্ত্বিকভাবে ইসলামকে দুটো প্রান্তিক প্রপঞ্চের বাইরে একটি মধ্যবর্তী ও সামগ্রিক ধারণা হিসেবে দেখিয়েছেন, তেমনি কার্যগতভাবেও আলীয়া বিশ্বাস করতেন ইসলামই মানবতার মুক্তির একমাত্র প্রকল্প, যাকে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আনার মধ্যেই রয়েছে সত্যিকার মুক্তি।

ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য আলীয়া রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Islamic Declaration” । এ গ্রন্থে আলীয়া যা বলতে চেয়েছেন, তাঁর মূল প্রতিপাদ্য হলো- একমাত্র ইসলামই মুসলিম উম্মাহকে উজ্জীবিত করতে সক্ষম। তাদের অন্তরকে পুনরায় আশায় উদ্বেলিত করতে সক্ষম, এবং তাদের ভবিষ্যৎ ইতিহাস বিনির্মাণের অনুঘটক হিসেবে রাখতে পারে সক্রিয় ভূমিকা। পাশ্চাত্য চিন্তাধারা দ্বারা মুসলমানদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আলীয়া মুসলিমদের কে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের প্রতি প্রত্যাবর্তনের আহবান জানান। আলীয়ার “Islamic Declaration” লেখার উদ্দেশ্যই ছিলো মুসলিমদের পুনরুত্থানের রাস্তা দেখানো। সত্যিকারার্থে এটি পরবর্তীতে পরিণত হয় মুসলিমদের মুক্তিমন্ত্রে।

আলীয়া লক্ষ্য করছিলেন মুসলিমদের পতনের একমাত্র কারণ ইসলামের সুমহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া। তাঁর ভাষ্য উদ্ধার করছি-

“মুসমানদের পশ্চাদপদতার মূল কারণ হল ইসলামের অনুপস্থিতি এবং সেই পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য মুসলিম বিশ্ব আজ প্রস্তুত নয়”।

ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য আলীয়ার উপস্থাপিত ব্যবস্থাপত্র-

“ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের সকল স্তরে ইসলামী চিন্তা চেতনাকে নতুন করে সাজানো এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত ইসলামী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

এই লক্ষ্য অনেক দূর এবং অবাস্তব মনে হতে পারে কিন্তু প্রচেষ্টা চালালে এটা অবশ্যই সম্ভব এবং এটা আমাদের নাগালের বাহিরে নয়।

ইসলাম, মানুষের সাথে ইসলামের সম্পর্ক, পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান, মানব জীবনের উদ্দেশ্য, মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক এবং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ব্যাপারে মনোভাব, মুসলিম জনগনের অবস্থার উন্নতির জন্য সত্যিকারের সমাধান হিসাবে চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয় চরিত্র, দর্শন, চিন্তা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসাবে অবশিষ্ট আছে।

এটা সুস্পষ্ট যে আমাদের সামনে বিকল্প কিছু নেই।হয়ত ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য সংগ্রাম করা অথবা অবক্ষয় ও অবনতি মেনে নেওয়া। মুসলমানদের জন্য তৃতীয় কোন পথ নেই”। 

সময়ই বলে দিচ্ছে আজ থেকে অর্ধশতাব্দীকাল আগে বলে যাওয়া আলীয়ার কথাগুলো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি এতটুকুও। আলীয়া আমাদের সামনে সংগ্রামের মডেল উপস্থাপন করে গিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যঃ “সংগ্রাম ছাড়া জীবনের কোন অর্থ নেই”। মুসলিম উম্মাহ যদি সত্যিকারার্থেই তাদের অবস্থাকে পরিবর্তন করতে চায়, আলীয়ার মডেল অনুসরণ করা ছাড়া তাঁর কোন বিকল্প নেই। সময়ের কন্ঠস্বর আজ সে কথাকেই উচ্চকিত করে তুলছে। 

২৯৭ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of সা'দ মুসান্না

সা'দ মুসান্না

পড়াশুনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে। নিয়মিত পড়াশুনা ও চিন্তাচর্চার বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত আছেন। আগ্রহ ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও সভ্যতা অধ্যয়নে। ত্রৈমাসিক মিহওয়ারের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Picture of সা'দ মুসান্না

সা'দ মুসান্না

পড়াশুনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে। নিয়মিত পড়াশুনা ও চিন্তাচর্চার বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত আছেন। আগ্রহ ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও সভ্যতা অধ্যয়নে। ত্রৈমাসিক মিহওয়ারের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top