ইবনে বতুতা: জ্ঞান, ভ্রমণ ও উম্মতের এক সংযোগরেখা

ইবনে বতুতা মাত্র ২১ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন, একটি ফরজ ইবাদত তথা হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে। তৎকালীন সময়ে হজ্জ পালন ও শেষ করে ফিরতে ১৬ মাস সময় লাগত। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এই সফর শেষ হয় ২৯ বছর পর। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রায় ১,১৭,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ভ্রমণগুলোর একটি। এটি শুধু একজন মানুষের সাহসিকতার কিসসা নয়; বরং এক বিস্তৃত ও সুবিশাল ইসলামী সভ্যতার জীবন্ত প্রতিফলন।

১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, মরক্কোর ট্যানজিয়ারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছিলেন আইনবিদ ও বিচারকদের পরিবারে বেড়ে ওঠা এক মেধাবী মুখ। যদিও তার জীবন ছিল উম্মাহর ভূগোল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস। তিনি মূলত ছিলেন একজন কাজী বা বিচারক, এবং উচুমাপের একজন ফকিহ। এই পরিচয়ই তাকে বিশ্বজুড়ে দরজা খুলে দেয়।

তার যাত্রা শুরু হয় একা, একটি গাধায় চড়ে। মক্কার পথে তিনি ভয়াবহ জ্বরে আক্রান্ত হন, এমনকি নিজেকে বেঁধে রাখতে হয়েছিল যাতে গাধার পিঠ থেকে পড়ে না যান। তবুও তিনি থামেননি। এই দৃঢ়তা ছিল ঈমান, দায়িত্ববোধ এবং অভিযাত্রিক মানসিকতার এক অনন্য সমন্বয়।

মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় এক সুফি আলেম শায়েখ বুরহানউদ্দিন, তাকে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন, তিনি ভারত, সিন্ধ ও চীন সফর করবেন এবং নির্দিষ্ট কিছু আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আশ্চর্যের বিষয়, পরবর্তীতে তিনি ঠিক সেটাই করেন। এ ঘটনা থেকে ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানজগতের আন্তঃসংযোগ এবং আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতার দিকটি ফুটে উঠে।

 

১৩২৬ সালে তিনি হজ্জ সম্পন্ন করেন। এখানেই তার যাত্রা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বুঝে ফেলেন, এই ভ্রমণ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি এক উন্মুক্ত বিশ্ব, এক জ্ঞান ও সভ্যতার দরজা।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ, বহুমাত্রিক ভ্রমণ, কাফেলা থেকে কাফেলায়, শহর থেকে শহরে। কিছু কাফেলা ছিল চলমান শহরের মতো, যেখানে দরিদ্রদের জন্য বিশাল পাত্রে খাবার রান্না হতো, বাজার বসত, জ্ঞানচর্চা/দারস চলত। রাতের অন্ধকার মশালের আলোয় দিন হয়ে উঠত। সবই হত বিভিন্ন ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এর ছত্রছায়ায়। প্রতিটি অঞ্চলে ছিল মুসাফির খানা, খানকা ও দরগা; অর্থাৎ বর্তমান প্রযুক্তিগত ব্যাপার না থাকলেও ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মানবতার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

এই চিত্রটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামী সভ্যতা স্থির নগরকেন্দ্রিক বা বর্তমানের আধুনিক বস্তি টাইপের ছিলোনা, বরং আমাদের শহর ছিল গতিশীল, সামাজিক ও সমন্বিত সংস্কৃতি নির্ভর, যা আধ্যাত্মিক সুমহান মাত্রা ছিল।

এরপর তার ভ্রমণ বিস্তৃত হয়,

পারস্য, ইরাক, আজারবাইজান, ইয়েমেন, আফ্রিকার শিং অঞ্চল, মোগাদিশু, কেনিয়া-তানজানিয়ার উপকূল, ক্রিমিয়া, কনস্টান্টিনোপল, মধ্য এশিয়া, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সুমাত্রা, চীন এবং মালি পর্যন্ত। তিনি সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করেন, চীনের গ্র্যান্ড ক্যানাল পাড়ি দেন, এবং বেইজিং, হাংজু ও গুয়াংজু সফর করেন।

তার মোট ভ্রমণ দূরত্ব ঝেং হে (৫০,০০০ কিমি) এবং মার্কো পোলো (২৪,০০০ কিমি)-এর তুলনায় অনেক বেশি। অথচ তার কোনো সাম্রাজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বা নৌবাহিনী ছিল না।

তার আসল শক্তি ছিল, একটি বিস্তৃত ইসলামী সভ্যতার বিশ্বব্যবস্থা। তৎকালীন ইসলামি সভ্যতা মরক্কো থেকে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বিশাল ভূখণ্ডে আরবি ভাষা ছিল জ্ঞান ও প্রশাসনের সাধারণ মাধ্যম, আদালত, নিরাপত্তা, ওয়াকফ, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি ছিল একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য, এবং আলেমরা ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত।

এ কারণে একজন কাজী সহজেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে আতিথ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেতেন। এটিই ছিল সকল মানুষের জন্য এক ধরনের “সিভিলাইজেশনাল পাসপোর্ট”, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আগেই কার্যকর ছিল বা মানুষমুখী এক দুনিয়া ছিলো।

ইবন বতুতা সকল বাস্তবতাকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি বিভিন্ন রাজদরবারে কাজী হিসেবে নিযুক্ত হন, উপহার গ্রহণ করেন, জ্ঞানচর্চায় যুক্ত থাকেন, সামাজিকভাবে অবদান রাখেন এবং আবার নতুন পথে যাত্রা করেন।

এটি দেখায়, ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান ছিল চলাচলের মাধ্যম, আর আলেমরা ছিলেন বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত একটি শ্রেণি।

 

তার লেখায় বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্যু ও শোকপালনের রীতি উঠে এসেছে, কোথাও ৪০ দিনের শোক, কোথাও উৎসবমুখর জানাজা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ভিন্নতা ও কুসংস্কার। তিনি এগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা তাকে এক অর্থে প্রাক-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীর পর্যায়ে নিয়ে যায়।

ভারতীয় উপমহাদেশে আসেন এবং দিল্লিতে তিনি প্রধান কাজী নিযুক্ত হন। তিনি আসেন অর্থনৈতিক হাব এবং জ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র বাংলা সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলে। ভ্রমণ করেন এই সবুজে ঘেরা জান্নাতাবাদে।

পরবর্তীতে দিল্লি থেকে তাকে চীনে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়, জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে তিনি জাহাজ মিস করেন, এবং সেই জাহাজগুলো ঝড়ে ডুবে যায়। এতে তার জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু এই ঘটনার পর তিনি দিল্লিতে ফিরে আসতে ভয় পান এবং মালদ্বীপে চলে যান।

মালদ্বীপে তিনি আবার কাজী হন, রাজপরিবারে বিবাহ করেন এবং রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি সুলতান হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু কিছু ঝুঁকির কারণে তিনি সরে যান।

তার জীবনে বিপদের শেষ ছিল না, ডাকাতি, জাহাজডুবি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। একবার ডাকাতরা সবকিছু লুট করে নেয়, শুধু তার পরনের কাপড় ছাড়া। তবুও তিনি হেঁটে কাফেলায় ফিরে যান।

তার ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘রিহলা’ (যার পূর্ণ নাম تحفة النظار في غرائب الأمصار وعجائب الأسفار) তে ৬০ জনের বেশি সুলতান এবং ২০০০-এর বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ রয়েছে।

বিস্ময়কর বিষয় হল, তিনি কোনো ডায়েরি রাখেননি; বহু বছর পর সম্পূর্ণ স্মৃতির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল কাহিনি বর্ণনা করেন।

যদিও কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, বিশেষ করে চীন সম্পর্কিত অংশে, তিনি হয়তো পূর্ববর্তী লেখকদের তথ্য ব্যবহার করেছেন, কারণ তার বর্ণনার সঙ্গে মার্কো পোলো-এর লেখার মিল পাওয়া যায়। তবুও তার অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি ইতিহাসে অনন্য।

জীবনের শেষদিকে মরক্কোর সুলতানের নির্দেশে তিনি এই কাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। এরপর তিনি আবার কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইতিহাসের আড়ালে চলে যান। ১৩৬৮ বা ১৩৬৯ সালে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তার কাজ মুসলিম বিশ্বের বাইরে অজানাই ছিল।

 

তৎকালীন ইসলামী সভ্যতার অবস্থান ও শ্রেষ্ঠত্ব

ইবন বতুতার ভ্রমণ আমাদের সামনে যে বাস্তবতা তুলে ধরে, তা হল, চতুর্দশ শতাব্দীর ইসলামী সভ্যতার বিশ্বব্যবস্থা ছিল একটি বিস্তৃত, সংযুক্ত এবং জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা।

  • ভাষাগত ঐক্য: আরবি ছিল জ্ঞান, ধর্ম ও প্রশাসনের সাধারণ ভাষা, যা বিভিন্ন জাতি ও অঞ্চলের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখত। ফারসি, উসমানী, বাংলা ভাষীরাও জ্ঞানগত কারণে আরবি জানতেন।
  • আইনি কাঠামো: আদালত ও মারহামাত নির্ভর অভিন্ন আইনব্যবস্থা ছিল, ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিচার ও সামাজিক কাঠামো পরিচিত ছিল।
  • জ্ঞান ও আলেমের মর্যাদা: আলেম, কাদি ও জ্ঞানচর্চাকারীরা সর্বত্র সম্মানিত ছিলেন, যা জ্ঞানকে বৈশ্বিকভাবে চলাচলযোগ্য করে তোলে।
  • আতিথ্য ও সামাজিক অবস্থা: মাদ্রাসা, খানকাহ ও দরগা, মসজিদ ও ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ভ্রমণকারীদের আশ্রয় ও সহায়তা দিত। যা সকলের জন্যই উন্মুক্ত ছিল।
  • বাণিজ্য ও যোগাযোগ: তৎকালীন ইসলামী সভ্যতার অর্থনীতি ও বাণিজ্য ছিল সবচেয়ে উন্নত, অর্থাৎ স্থল ও সমুদ্রপথে বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক পুরো সভ্যতাকে অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত রেখেছিল।
  • আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য: বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক আবহ পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে যুক্ত করে রেখেছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই ইবন বতুতার ভ্রমণ সম্ভব হয়েছিল। তিনি একা ছিলেন না, বরং তার পেছনে ছিল একটি আদিল সভ্যতা।

 

পরিশেষে বলা যায়,

ইবন বতুতা অভিযাত্রী হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হননি, তিনি বের হয়েছিলেন একটি ফরজ ইবাদত পালনের জন্য, কিন্তু এই যাত্রা তাকে এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে একটি সভ্যতা জ্ঞান, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ। যে উপলব্ধিই পরবর্তী প্রজন্মকে অনেক দলীল উপহার দিয়েছে।

তার ‘রিহলা’ শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়; এটি একটি সভ্যতার জীবন্ত দলিল, মুসলিম উম্মাহর সমাজ, বৈশ্বিক সংযোগ এবং আখলাকী শক্তির প্রতিচ্ছবি।

কেননা মার্কো পোলো-এর ছিল পৃষ্ঠপোষকতা ও বাণিজ্যপথ, ঝেং হে-এর ছিল সাম্রাজ্যিক নৌবহর। কিন্তু ইবন বতুতার ছিল, এক উম্মাহ, এক জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা, আদালতনির্ভর বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য, এবং ইস্তেকামাতের শক্তি।।

 

১৩১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of হাসান আল ফিরদাউস

হাসান আল ফিরদাউস

সংগঠক এবং সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক হাসান আল ফিরদাউস-এর জন্ম টাংগাইল জেলায়। পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উসূল, ফিকহ এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর বড় শিক্ষকদের সাহচর্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্কলার ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে নানাবিধ গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। একইসাথে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সম্পাদকও।
Picture of হাসান আল ফিরদাউস

হাসান আল ফিরদাউস

সংগঠক এবং সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক হাসান আল ফিরদাউস-এর জন্ম টাংগাইল জেলায়। পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইসলামী সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উসূল, ফিকহ এবং রাজনৈতিক দর্শনের উপর বড় শিক্ষকদের সাহচর্যে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্কলার ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে নানাবিধ গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। একইসাথে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ও নবধারার কাগজ ত্রৈমাসিক মিহওয়ার-এর সম্পাদকও।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top