সভ্যতা ও আধুনিকায়নঃ মানবতার প্রতিচ্ছবি

‘কে সভ্য আর কে আধুনিক’, এই বিতর্ককে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সবচেয়ে ভালোভাবে আলোচনা করতে পারেন মুসলিম সমাজের শিক্ষিত ও চিন্তাশীল শ্রেণির মানুষেরা, যাঁদের ওপর উম্মাহকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ‘চাপিয়ে দেওয়া আধুনিকতা’ ও ‘প্রকৃত সভ্যতা’র মধ্যকার সম্পর্ক। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের মতো অ-ইউরোপীয় দেশগুলোতে সভ্যতার ছদ্মাবরণে আধুনিকতাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিভাষার সংজ্ঞা তুলে ধরতে চাই।

১. বুদ্ধিজীবী (Intellectual): একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যিনি নিজের ‘মানবিক অবস্থান’ সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাঁকেই আমরা বুদ্ধিজীবী বলতে পারি। এই আত্মসচেতনতা তাঁর ওপর এক বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করে। সেই দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে তিনি নিজ জনগণকে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পথে পরিচালিত করেন। (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ড. শরীয়তির ‘আমরা কোথা থেকে শুরু করবো’ (From Where Shall We Begin) এবং ‘বুদ্ধিজীবী ও তাঁর সামাজিক দায়িত্ব’ (The Intellectual and His Social Responsibilities) প্রবন্ধ দুটি দেখুন।)

২. আত্মীকরণ (Assimilation): আত্মীকরণ বলতে এমন এক ব্যক্তির আচরণকে বোঝায়, যিনি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যের চালচলন ও আচার-আচরণ অনুকরণ করতে শুরু করেন। এই প্রবণতা যার মধ্যে দেখা দেয়, তিনি ধীরে ধীরে নিজের পরিবেশ, জাতীয় আখলাক ও সংস্কৃতিকে ভুলে যেতে থাকেন। এমনকি সেগুলো স্মরণ করলেও অবজ্ঞার চোখে দেখেন। কোনো দ্বিধা ছাড়াই তিনি নিজের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করেন এবং তা পরিবর্তনের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালান। অন্যের মধ্যে যে স্বাতন্ত্র্য ও মহিমা তিনি দেখতে পান, তা অর্জনের আশায় নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত সবকিছু মুছে ফেলতে সচেষ্ট হন। কারণ, নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির এসব বৈশিষ্ট্য তাঁর কাছে লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

৩. বিচ্ছিন্নতা (Alienation): বিচ্ছিন্নতা হলো নিজের আত্মসত্তাকে ভুলে যাওয়া কিংবা তার সঙ্গে অপরিচিত হয়ে পড়ার প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, ব্যক্তি নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করে।

তাহলে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা বলতে কী বোঝায়? আমরা জানি, বিচ্ছিন্নতা এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে নিজের প্রকৃত অবস্থায় উপলব্ধি না করে অন্য কিছুকে নিজের স্থানে উপলব্ধি করতে শুরু করে।

এবার প্রশ্ন হলো, সংস্কৃতি কী? সংস্কৃতিকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, এর মধ্যে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক, ধর্মীয় ও আবেগীয় অভিব্যক্তির সমষ্টি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এসব অভিব্যক্তির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চিহ্ন, ঐতিহ্য ও প্রথা, যা ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় সঞ্চিত হয়ে একটি অনন্য ও স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে।

যখন আমি নিজের ধর্ম, সাহিত্য, আবেগ, প্রয়োজন ও যন্ত্রণাকে নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে উপলব্ধি করি, তখন নিজের সত্তাকেও সেই সামাজিক ও ঐতিহাসিক সত্তার সঙ্গে একাত্ম বলে অনুভব করি, যেখান থেকে আমার সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু অনেক সময় সমাজে এমন কিছু কৃত্রিম উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটে, যেগুলোর প্রকৃতি সন্দেহজনক এবং চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব উপাদান মূলত এমন এক সমাজের সৃষ্টি, যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সমাজ থেকে আলাদা। এই কৃত্রিম উপাদানগুলো ধীরে ধীরে আমাদের প্রকৃত সংস্কৃতিকে মুছে ফেলে এবং তার জায়গায় এমন এক সংস্কৃতি প্রতিস্থাপন করে, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন ঐতিহাসিক পর্ব এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর উপযোগী করে গড়ে উঠেছে।

ফলে যখন আমি নিজের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করতে চাই, তখন আবিষ্কার করি, আমার নিজস্ব সংস্কৃতির জায়গা দখল করে নিয়েছে অন্য এক সমাজের সংস্কৃতি। আমি এমন সব দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা নিয়ে পেরেশান হয়ে পড়ছি, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আমার নিজের নয়। একপর্যায়ে আমি নিজেকে এমন সব আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ ও যন্ত্রণার ধারক হিসেবে আবিষ্কার করি, যেগুলোর উৎপত্তি আমার সমাজে নয়, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

এ অবস্থায় নিজের সম্পর্কে আমার ধারণা আর ‘আমি প্রকৃতপক্ষে কে’ বা ‘আমি আসলে কেমন’, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং আমি নিজেকে দেখতে শুরু করি ‘তাদের’, অর্থাৎ পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। সহজ কথায়, আমি তখন নিজের সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন বা পরবাসী (Alienated) হয়ে পড়ি।

একটি সমাজ যখন চরম অনাহার ও অভাবের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, অথচ সেই সমাজের মানুষ আজকের আমেরিকান, ইংরেজ ও ফরাসিদের মতো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছে এবং তাদের মতো আচরণ করছে, তখন বিষয়টি কি আপনাদের কাছে একটুও অদ্ভুত মনে হয় না?

এভাবেই ইউরোপীয় সমাজের প্রভাবে অ-ইউরোপীয় সমাজগুলো নিজেদের সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এসব সমাজের বুদ্ধিজীবীরা তখন আর নিজেদের ‘প্রাচ্যবাসী’ বলে মনে করেন না। তাঁরা প্রাচ্যের মানুষের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না, এমনকি প্রাচ্যবাসী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাও তাঁদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে না। নিজেদের সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলো তাঁদের বিচলিত করে না। বরং তাঁরা এমন এক ‘ইউরোপীয়ানের’ দুঃখ-কষ্ট, তকলিফ, অনুভূতি ও চাহিদাকে নিজের বলে কল্পনা করেন, যে পুঁজিবাদী ও বস্তুগত সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে আনন্দ ও ভোগবিলাসে মত্ত।

ফলে আজ অ-ইউরোপীয় দেশগুলোতে যে ভয়াবহ মানসিক সংকট ছড়িয়ে পড়েছে, তার সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, এসব দেশের মানুষ নিজস্ব, স্বতন্ত্র ও স্বকীয় সত্তার অধিকারী হয়েও সেই সত্তাকে অস্বীকার করছে। নিজের হৃদয়ে তারা লালন করছে এক বিজাতীয় সত্তাকে। অন্য কাউকে নিজের জায়গায় কল্পনা করে অন্ধভাবে তার অনুকরণ করে চলেছে।

অথচ আজ থেকে দুইশ বছর আগে, বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতার উত্থানের পূর্বে, ইউরোপের বাইরের এসব দেশের প্রত্যেকটিরই নিজস্ব, মৌলিক ও সুদৃঢ় সভ্যতা ছিলো। উদাহরণস্বরূপ, আমি যদি ভারত কিংবা আফ্রিকার কোনো দেশে যেতাম, তাহলে দেখতে পেতাম, সেখানকার মানুষের নিজস্ব রুচিবোধ ও স্বতন্ত্র স্থাপত্যরীতি রয়েছে। তারা নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনন্য সব কবিতা রচনা করতো। তাদের নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি ও ধর্মবিশ্বাস ছিলো। যা কিছু তাদের ছিলো, সবই ছিলো একান্তই তাদের নিজস্ব। তারা অসুস্থ ছিলো না। হয়তো তারা দরিদ্র ছিলো, কিন্তু দারিদ্র্য আর অসুস্থতা তো এক বিষয় নয়।

কিন্তু আজ পশ্চিমা সমাজগুলো তাদের দর্শন, চিন্তাধারা, আকাঙ্ক্ষা, ধারণা, রুচি ও আচার-আচরণ অ-ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এসব দেশে নিজেদের সভ্যতার প্রতীক হিসেবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোকে যতটা বিস্তৃত করতে পেরেছে, ততটাই বিস্তার ঘটিয়েছে নিজেদের চিন্তা ও জীবনধারার। অ-ইউরোপীয় দেশগুলো নতুন নতুন পণ্য ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহার করছে ঠিকই, কিন্তু ইউরোপীয় আচার-আচরণ, আকাঙ্ক্ষা, রুচি ও চিন্তাধারার সঙ্গে নিজেদের কখনোই পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারবে না।

আমরা এমন এক আধুনিক অথচ নিরবয়ব সমাজ গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন অংশ ও উপাদান একত্র করতে শুরু করলাম, যার কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই। এর বিকৃত পরিণতি হিসেবে সমাজের সর্বত্র বিচিত্র সব উপাদানের সংমিশ্রণ দেখা দিতে লাগলো। এর কিছু দেশীয়, কিছু ইউরোপীয়, কিছু সেকেলে, আবার কিছু আধুনিক। কিন্তু এসব উপাদানের সমন্বয়ে কোনো সুসংহত সমাজ গড়ে ওঠেনি, বরং সৃষ্টি হয়েছে এক নিরাকার ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তি। এরই পরিণতিতে গড়ে উঠেছে এমন এক নিরবয়ব ও উদ্দেশ্যহীন সমাজব্যবস্থা। মূলত গত শতাব্দীজুড়ে অ-ইউরোপীয় সমাজগুলো ‘সভ্যতা’র নামে পাশ্চাত্য থেকে নিজেদের সমাজ গঠনের বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করেছে। আর এভাবেই এসব সমাজের বর্তমান রূপ তৈরি হয়েছে।

অ-ইউরোপীয় দেশগুলোতে এই অসংজ্ঞায়িত ও লক্ষ্যহীন ‘মোজাইক’ সভ্যতার উদ্ভব ঘটলো কীভাবে? সপ্তদশ, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের পুঁজিপতি ও বিত্তবানদের হাতে যন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। যন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, উৎপাদন শুরু হওয়ার পর তা ক্রমাগত উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি তৈরি করে। ফলে উৎপাদিত পণ্য যাতে অবিক্রীত অবস্থায় জমে না থাকে, সে জন্য ক্রমাগত ভোগের চাহিদাও সৃষ্টি করতে হয়। কিন্তু মানুষের ভোগক্ষমতা কিংবা ভোগের হার কোনোভাবেই যন্ত্রের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সমানতালে বাড়তে পারে না। তাহলে এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত পণ্যের কী হবে? এর জন্য প্রয়োজন হলো ভোগের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা। ইউরোপীয় দেশগুলোর জনসংখ্যা তখন সর্বসাকল্যে চার থেকে ছয় কোটির বেশি ছিলো না। অথচ সেখানে উৎপাদনের হার এত দ্রুত ও তীব্রভাবে বাড়তে থাকে যে, তা মানুষের ভোগের চাহিদাকেও ছাড়িয়ে যায়। সুতরাং, যন্ত্র যখন অনিবার্যভাবেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য উৎপাদন করতে শুরু করলো, তখন সেসব পণ্যের জন্য জাতীয় সীমানা অতিক্রম করা জরুরি হয়ে পড়লো। আর এভাবেই ইউরোপের উদ্বৃত্ত পণ্যগুলো এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে পৌঁছাতে শুরু করলো।

কিন্তু প্রাচ্যের দেশগুলোতে কি এসব পণ্যের আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিলো? সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ও চাহিদার সঙ্গে এসব পণ্যের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও কি জোর করে সেগুলো তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব? মোটেও নয়! আপনি কোনো এশীয় সমাজে গেলে দেখতে পাবেন, সেখানকার মানুষের পোশাক সাধারণত তাঁদের স্ত্রীরা তৈরি করেন কিংবা স্থানীয় কোনো কারখানায় উৎপাদিত হয়। তাঁরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকই পরিধান করেন। ফলে ইউরোপের কারখানায় উৎপাদিত ‘হাই ফ্যাশন’ পোশাক কিংবা ‘আধুনিক’ কাপড়ের প্রতি তাঁদের কোনো চাহিদা নেই।

একইভাবে একজন আফ্রিকান কিংবা এশীয় নারীর নিজেকে সুন্দর করে তোলা বা সাজসজ্জার জন্য ইউরোপীয় প্রসাধনী ও অলংকারের কোনো প্রয়োজন ছিলো না। তাঁর নিজস্ব প্রসাধনী, সাজসজ্জার উপকরণ ও রূপচর্চার সামগ্রী ছিলো। তিনি সেগুলোই ব্যবহার করতেন এবং সবাই তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসা করতো। নিজেকে অন্যরকম করে তোলার কোনো প্রয়োজনই তিনি অনুভব করতেন না।

এই মনোভাবের কারণে পুঁজিপতিদের উৎপাদিত পণ্য অবিক্রীত থেকে গেলো। যেসব মানুষের নিজস্ব চাহিদা ও রুচি, স্বতন্ত্র জীবনধারা রয়েছে এবং যাঁরা নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিজেরাই উৎপাদন করেন, তাঁরা অষ্টাদশ শতাব্দীর পুঁজিপতিদের পণ্যের উপযুক্ত ভোক্তা ছিলেন না। তাহলে উপায় কী? মূল সমস্যাটি ছিলো এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষকে ইউরোপীয় পণ্যের ভোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। তাদের সমাজকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তারা ইউরোপীয় পণ্য কিনতে বাধ্য হয়। এর অর্থ হলো, আক্ষরিক অর্থেই একটি জাতিকে আমূল বদলে ফেলা। একটি জাতির মানুষের পোশাক-আশাক, ভোগবিলাসের ধরন, সাজসজ্জা, বাসস্থান থেকে শুরু করে নগরজীবন পর্যন্ত সবকিছু বদলে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিলো এক ব্যাপক রূপান্তর। কিন্তু এই পরিবর্তনের জন্য সবার আগে কোন বিষয়টিকে লক্ষ্যবস্তু করতে হবে? মানুষের নৈতিকতা ও চিন্তাভাবনাকে। অ-ইউরোপীয়দের মন, রুচি ও জীবনধারাকে বিকৃত করার বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করাই ছিলো তথাকথিত আলোকিত ও সভ্য (!) ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের কাজ। তাঁদের প্রকল্প ছিলো দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে একই ছাঁচে ঢেলে সাজানো, যাতে সবার জীবনযাপন ও চিন্তাধারা অভিন্ন হয়ে ওঠে।

একজন মানুষ কিংবা একটি জাতির ব্যক্তিত্ব ও সত্তা কোন কোন উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে? ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি, অতীত সভ্যতা, শিক্ষা ও ঐতিহ্য, এসবই একজন ব্যক্তি এবং বৃহত্তর অর্থে একটি জাতির সত্তা গঠনের মৌলিক উপাদান। এসব উপাদান প্রতিটি সমাজেই স্বতন্ত্র। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন সমাজে এগুলো ভিন্ন ভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু এখন এসব স্বাতন্ত্র্য মুছে দিয়ে সবাইকে একই রকম করে তোলার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। মানুষকে একই ছাঁচে ঢালার জন্য বিভিন্ন জাতির চিন্তাধারা ও সত্তার মধ্যকার পার্থক্যগুলো দূর করতে হবে। মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, তাকে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচ বা আদল অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু সেই ধাঁচটি কী? এটি মূলত ইউরোপীয়দের তৈরি একটি ধাঁচ, যা প্রাচ্যের মানুষ তথা এশীয় ও আফ্রিকানদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে চিন্তা করতে হবে, কী ধরনের পোশাক পরতে হবে, কী আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে হবে, কীভাবে শোক প্রকাশ করতে হবে, কীভাবে স্থাপত্য নির্মাণ করতে হবে, কীভাবে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, কীভাবে ভোগ করতে হবে, কীভাবে মতামত প্রকাশ করতে হবে এবং সর্বোপরি কী পছন্দ করতে হবে, এমনকি কীভাবে পছন্দ করতে হবে। খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘আধুনিকায়ন’ (Modernization) নামে এক নতুন সংস্কৃতি সমগ্র দুনিয়ার সামনে হাজির করা হয়েছে।

ইউরোপীয়রা বুঝতে পেরেছিলো, প্রাচ্যের মানুষের মনে ‘আধুনিকায়নের’ তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারলে তারা নিজেরাই নিজেদের অতীতকে অস্বীকার করতে শুরু করবে। এমনকি নিজেদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ধর্ম ও ব্যক্তিত্ব গঠনের উপাদানগুলোকে নিজ হাতে কলঙ্কিত ও ধ্বংস করার কাজে ইউরোপীয়দের সহযোগিতা করবে। ফলে দূরপ্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, নিকটপ্রাচ্য এবং ইসলামী ও কৃষ্ণাঙ্গ দেশগুলোতে ‘আধুনিকায়নের’ এই প্রলোভন ও আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া হলো। একই সঙ্গে আধুনিক হয়ে ওঠার অর্থ দাঁড়ালো ইউরোপীয়দের মতো হয়ে ওঠা।

সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এখানে ‘আধুনিকায়ন’ বলতে মূলত ভোগের আধুনিকায়নকেই বোঝানো হচ্ছে। একজন মানুষ যখন আধুনিক হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর রুচি এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যে, নিজের চাহিদা পূরণের জন্য তিনি ‘আধুনিক’ পণ্যসামগ্রীর প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেন। অন্য কথায়, তিনি ইউরোপ থেকে জীবনযাপনের নতুন ধরন ও আধুনিক পণ্যসামগ্রী আমদানি করেন। অথচ নিজের ঐতিহ্য ও জাতীয় অতীত থেকে গড়ে ওঠা জীবনধারা এবং স্থানীয় পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে চান না। অর্থাৎ, অ-ইউরোপীয়রা মূলত ভোগের খাতিরেই আধুনিক হয়ে ওঠে।

পশ্চিমারা সরাসরি অন্যদের বলতে পারেনি যে, তারা তাদের বুদ্ধিবৃত্তি, মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বকে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়। কারণ, এমন ঘোষণা দিলে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতো। এ কারণেই ইউরোপীয়রা অ-ইউরোপীয়দের কাছে ‘সভ্যতা’ ও ‘আধুনিকায়ন’কে সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ভোগবাদী ধারণা এসব সমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কেননা সভ্য হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। ফলে ‘আধুনিকায়ন’কে সভ্যতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার পর মানুষ নিজের অজান্তেই ইউরোপীয়দের এই পরিকল্পনায় সহযোগিতা করতে শুরু করলো। অন্যদিকে অ-ইউরোপীয়রা যেহেতু এসব নতুন পণ্য নিজেরা উৎপাদন করতে পারতো না, তাই যে প্রযুক্তি এসব পণ্য উৎপাদন করে এবং উৎপাদিত সব পণ্য বিক্রি হওয়ার দাবি তৈরি করে, তার ওপর তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নির্ভরশীল হয়ে পড়লো।

এই ‘আধুনিকায়ন’ মানুষের ঐতিহ্য, ভোগবিলাসের ধরন ও বস্তুগত জীবনকে পুরোনো অবস্থা থেকে নতুন রূপে পরিবর্তিত করছে। কিন্তু সমস্ত অ-ইউরোপীয় মানুষকে ‘আধুনিক’ করে তোলার জন্য প্রথমেই তাদের জীবন থেকে ধর্মের প্রভাব দূর করা প্রয়োজন ছিলো। কারণ, ধর্ম প্রতিটি সমাজকে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান করে। ধর্ম স্বাভাবিকভাবেই এমন এক উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর ধারণা দেয়, যার সঙ্গে সমাজের মানুষ নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যুক্ত বলে অনুভব করে। ফলে এই বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে ধ্বংস করা হলে কিংবা অপমানিত করা হলে, যাঁরা নিজেদের সেই সত্তার সঙ্গে একাত্ম বলে মনে করেন, তাঁরাও ব্যক্তিগতভাবে সেই আঘাত অনুভব করেন। তাই স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা ‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘অন্ধবিশ্বাসের’ বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।

ফ্রান্তজ ফানোঁর ভাষায়, “ইউরোপ চেয়েছিলো যন্ত্রের মাধ্যমে অ-ইউরোপীয়দের বশীভূত করতে। কিন্তু কোনো মানুষ বা সমাজের ব্যক্তিত্ব কেড়ে না নিয়ে কিংবা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তন না করে কেবল যন্ত্র বা ইউরোপীয় পণ্যের মাধ্যমে কি তাকে দাসে পরিণত করা সম্ভব?”

না, তা সম্ভব নয়। এর জন্য সবার আগে সেই ‘ব্যক্তিত্ব’কেই মুছে ফেলতে হয়।

তারা অ-ইউরোপীয়দেরকে তাদের ব্যক্তিত্ব হতে বঞ্চিত করতে চায়। তার ভেতরে যে ‘আমি’-সত্তাগুলো রয়েছে, সেগুলোর প্রত্যেকটি হতে তাকে বিচ্যুত করতে চায়। তাকে এমনটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে, সে এক নিম্নতর সভ্যতা ও সামাজিক কাঠামোর অংশ; আর তাকে মেনে নিতে হবে যে, ইউরোপীয় সভ্যতা, পশ্চিমা সভ্যতা ও পশ্চিমা জাতিগোষ্ঠী হল শ্রেষ্ঠ। আফ্রিকানদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, তারা অসভ্য-যাতে তারা ‘সভ্য’ হওয়ার প্রলোভনে স্বেচ্ছায় ইউরোপীয়দের হাতে নিজেদের তুলে দেয়, যারা কিনা তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। সেই বেচারা বুঝেই উঠতে পারে না যে তাকে আসলে ‘সভ্য’ করা হচ্ছে না, বরং পশ্চিমা ধাঁচে ‘আধুনিক’ করে তোলা হচ্ছে। ঠিক এই কারণেই দেখা যায় যে, ১৮ ও ১৯ শতাব্দীতে হঠাৎ করেই আফ্রিকানদের ‘বর্বর’ ও ‘নরখাদক’ হিসেবে চিত্রিত করা শুরু হল। অথচ যেই আফ্রিকানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ইসলামী সভ্যতার সংস্পর্শে ছিল, তাদের কখনোই নরখাদক হিসেবে গণ্য করা হয়নি। হঠাৎ করেই আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গরা হয়ে উঠল নরখাদক; তাদের গায়ে বিশেষ গন্ধ আছে বলে দাবি করা হল, তাদেরকে আলাদা এক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হল। বলা হল যে, তাদের মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর অংশ কাজ করে না(!) এবং এশীয়দের মতোই তাদের মস্তিষ্কের  সামনের অংশটি পশ্চিমাদের তুলনায় ছোট!

এরপর আমরা দেখি যে, ‘পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের সভ্যতা ও জনগণের শ্রেষ্ঠত্ব’– এর ভিত্তির ওপর একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। তারা আমাদেরকে এবং পুরো বিশ্বকে এটা বিশ্বাস করিয়েছিল যে, ইউরোপীয়রা বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অসাধারণ প্রতিভাবান; অন্যদিকে প্রাচ্যের মানুষের রয়েছে অদ্ভুত সব আবেগীয় আর আধ্যাত্মিক প্রতিভা, আর কৃষ্ণাঙ্গরা কেবল নাচ, গান, চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেই উপযুক্ত।

এরপর চিন্তার এই ধারাটি-যা অ-ইউরোপীয় জাতিগুলোকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণের উদ্দেশ্যে দুনিয়ায় প্রবর্তিত হয়েছিল-সেটি অ-ইউরোপীয় অভিজাত শ্রেণির চিন্তারও ভিত্তি হয়ে উঠল! কীসের আধুনিকায়ন? কেবলই ভোগের, মননের ক্ষেত্রে নয়। সভ্যতার নামে আধুনিকায়নের এই অভিযান চলতে থাকল এবং পরবর্তী ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অ-ইউরোপীয় সমাজগুলো তাদের ‘পরিশীলিত’ বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে নিজেরাই আধুনিক হয়ে ওঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাল।

চলুন, বুদ্ধিজীবীদের এই শ্রেণিটির উদ্ভব ও গঠন নিয়ে আলোচনা করা যাক। জ্য-পল সার্ত্রে তার ‘পৃথিবীর অভিশপ্তেরা’ (The Wretched of the Earth) নামক বইটির ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন: “আমরা আফ্রিকা বা এশিয়ার কিছু তরুণকে আমস্টারডাম, প্যারিস বা লন্ডনের মতো শহরগুলোতে কয়েক মাসের জন্য নিয়ে আসতাম, তাদের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে দেখাতাম, তাদের নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার ব্যবস্থা করে দিতাম, শিষ্টাচার ও সামাজিক আদবকায়দা শেখাতাম এবং সাথে সাথে আমাদের ভাষার কিছু কিছু অংশও শেখাতাম। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমরা তাদের ভেতর থেকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসমূহকে মুছে ফেলে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতাম। তারা তখন আর এমন মানুষ থাকত না যে নিজেদের মনের কথা নিজেরা বলতে পারে; বরং তারা হয়ে উঠত আমাদেরই মুখপাত্র। আমরা যখন মানবতা ও সমতার স্লোগান দিতাম, তখন তারাও আফ্রিকা ও এশিয়াতে আমাদের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি তুলে বলত-‘মানবতা’, ‘সমতা’।”

এরাই ছিলেন সেই ব্যক্তিরা, যারা মানুষকে তাদের রক্ষণশীলতা ত্যাগ করতে, ধর্ম বর্জন করতে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণ পেতে প্ররোচিত করেছিলেন-কারণ এসবই নাকি তাদেরকে আধুনিক ইউরোপীয় সমাজের তুলনায় পিছিয়ে রেখেছিল-এবং তাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরোপুরি পশ্চিমা ধাঁচে গড়ে তুলেছিলেন!

রপ্তানি ও বিনিময়ের মাধ্যমে ইউরোপীয়করণ কীভাবে সম্ভব? সভ্যতা কী এমন কোন পণ্য যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আমদানি-রপ্তানি করা যায়? অবশ্যই তা নয়; তবে আধুনিকতা হল আধুনিক পণ্যসামগ্রীর এক সমাহার, যা কোনো সমাজ এক, দুই বা পাঁচ বছরের মধ্যেই আমদানি করে নিতে পারে। কোন সমাজ কয়েক বছরের ব্যবধানেই পুরোপুরি আধুনিক হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, একজন ব্যক্তিও পুরোপুরি আধুনিক হয়ে উঠতে পারেন-এমনকি একজন আধুনিক ইউরোপীয়র চেয়েও বেশি। আপনি যদি তার ভোগ-বিলাসের পদ্ধতি বদলে দেন, তবেই তিনি আধুনিক হয়ে ওঠেন। ইউরোপীয়রা ঠিক এটাই প্রত্যাশা করেছিল।

তবে কোনো জাতি বা সমাজকে সভ্য করে তোলা মোটেও সহজ কোনো বিষয় নয়। সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইউরোপের তৈরি কোনো পণ্য নয় যে, সেগুলোর মালিকানা অর্জন করলেই কোনো জাতি সভ্য হয়ে উঠবে। অথচ ইউরোপীয়রা আমাদের বিশ্বাস করিয়েছে যে, আধুনিকীকরণের নামে যত প্রলাপ আর ছাইপাঁশ হাজির করা হয়েছে, তার সবই নাকি সভ্যতার বহিঃপ্রকাশ! আর আমরাও তথাকথিত আধুনিকতার অমৃত পান করার আশায় এতটাই উদগ্রীব হয়ে উঠলাম যে, নিজেদের যা কিছু ছিলো, এমনকি সামাজিক ইজ্জত ও মর্যাদা, নৈতিকতা, বুদ্ধিবৃত্তি, সবই অবলীলায় বিসর্জন দিয়ে দিলাম। এটাই হলো আধুনিকতার প্রকৃত অর্থ।

এভাবেই জন্ম নিলো এমন এক সত্তা, যার কোনো নিজস্ব পটভূমি নেই, যে নিজের ইতিহাস ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের জাতি, ইতিহাস ও পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা সমস্ত কিছুর সঙ্গেই অপরিচিত। এমনকি নিজের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো থেকেও সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সে এখন এক কৃত্রিম ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যার ভোগবিলাসের ধরন বদলে গেছে, মনোজগৎ পরিবর্তিত হয়েছে। যে নিজের অতীতের মূল্যবান চিন্তা, গৌরবময় ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলেছে এবং নিজের ভেতর থেকেই সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে পড়েছে। জ্যাঁ-পল সার্ত্রের ভাষায়, “এসব সমাজে এমন এক আত্মীকৃত (Assimilated) সত্তার জন্ম হয়েছে, যারা বাহ্যিকভাবে চিন্তাবিদ বা শিক্ষিত মানুষের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নয়। অর্থাৎ তারা প্রকৃত চিন্তাবিদ বা বুদ্ধিজীবী নয়।”

প্রকৃত বুদ্ধিজীবী হলেন তিনি, যিনি নিজের সমাজকে চেনেন, সেই সমাজের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতন, তার ভাগ্য নির্ধারণের সক্ষমতা রাখেন, নিজের সমাজের অতীত সম্পর্কে পূর্ণরূপে ওয়াকিফহাল এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। অথচ আগের অনুচ্ছেদে উল্লিখিত এই তথাকথিত বা আপাত বুদ্ধিজীবীরা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে সফল হয়েছিলেন।

ইউরোপ ও আমেরিকায় কেউ যখন এমন কোনো জায়গায় যান, যেখানে জ্যাজ (Jazz) সংগীত বাজছে, আর সেই সংগীত তাঁর ভালো না লাগে, তখন তিনি অকপটে ও উচ্চস্বরে নিজের অপছন্দের কথা জানিয়ে দেন। কিন্তু প্রাচ্যের দেশগুলোতে কারও যেন এমন সাহস নেই যে, তিনি বলবেন, ‘জ্যাজ সংগীত অত্যন্ত বাজে এবং আমার তা পছন্দ নয়।’ কেন? কারণ, এসব মানুষের ব্যক্তিত্ব ও মানবিক মর্যাদাকে এতটাই ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে যে, নিজেদের পোশাকের রং কিংবা খাবারের স্বাদের মতো সাধারণ বিষয়গুলোও তাঁরা স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারেন না।

ফানোঁর ভাষায়, “প্রাচ্যের দেশগুলোকে ইউরোপের অনুসারী করে তোলা এবং বানরের মতো তাদের অনুকরণে অভ্যস্ত করার জন্য অ-ইউরোপীয়দের কাছে এটি প্রমাণ করা প্রয়োজন ছিলো যে, ইউরোপীয়দের মতো মানবিক গুণাবলি তাদের মধ্যে নেই। তাদের ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্ম ও শিল্পকলাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে হতো, যাতে তারা এসব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আমরা দেখতে পাই, ইউরোপীয়রা ঠিক এটাই করেছে।”

তারা এমন এক জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে, যারা নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুই জানে না, অথচ সেই সংস্কৃতিকে ঘৃণা করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। তারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না, তবুও এর সমালোচনা করে। নিজেদের ইতিহাস বোঝে না, অথচ সেই ইতিহাসের সমালোচনা করতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে ইউরোপ থেকে আগত যেকোনো কিছুরই তারা নিঃসংকোচে প্রশংসা করে।

এভাবে এমন এক সত্তার জন্ম হয়েছে, যে প্রথমে নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীকালে সেগুলোকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে থাকে যে, ইউরোপীয়দের তুলনায় সে নিকৃষ্ট! আর এই বিশ্বাস যখন তার মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যায়, তখন সে নিজের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করতে চায়। নিজের সমস্ত পরিচয় ও সংযোগ ছিন্ন করে যেকোনো উপায়ে একজন ইউরোপীয়র মতো হয়ে উঠতে চায়, যাকে কেউ ঘৃণা করে না কিংবা অবজ্ঞার চোখে দেখে না। তখন সে স্বস্তির সঙ্গে বলতে পারে, “সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে, আমি আর প্রাচ্যবাসী (Easterner) নই। কারণ, নিজেকে আধুনিক করে আমি পাশ্চাত্যবাসীদের (Westerner) পর্যায়ে উন্নীত করতে পেরেছি।”

আর অ-ইউরোপীয় কোনো ব্যক্তি যখন নিজেকে ‘আধুনিক’ ভেবে আনন্দে আত্মহারা হন, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ইউরোপীয় পুঁজিপতি ও বুর্জোয়ারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। কারণ, তাঁরা সেই ব্যক্তিকে নিজেদের উদ্বৃত্ত পণ্যের ক্রেতায় পরিণত করতে সফল হয়েছেন!

অনুবাদঃ সালমান মাহফুজ          

৫৭ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of ড. আলী শরীয়তি

ড. আলী শরীয়তি

ড. আলী শরীয়তি (১৯৩৩-১৯৭৭) মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, লেখক এবং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী। ইরানের খোরাসান প্রদেশের মাজিনানে তার জন্ম। তার পিতা মুহাম্মদ তাকী শরীয়তি ছিলেন একজন মুতাফাক্কির ও মুজাদ্দিদ। পারিবারিক পরিবেশেই ইসলামী জ্ঞান, সাহিত্য ও সমাজ-সচেতনতার প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন। মাশহাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পর তিনি ফ্রান্সে যান এবং প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনের ওপর উচ্চতর অধ্যয়ন করেন। ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলন, অস্তিত্ববাদ, সমাজতত্ত্ব এবং তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিসংগ্রামের নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ফ্রানৎস ফ্যানন, জাঁ-পল সার্ত্র ও আলজেরীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তার চিন্তার জগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দেশে ফিরে তিনি ইসলামের ইতিহাস, ইরফানমুখী সংস্কৃতি এবং মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে নতুন ভাষায় পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেন। মাশহাদের হুসাইনিয়্যে ইরশাদে প্রদত্ত তার বক্তৃতাগুলো অল্প সময়েই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলামকে কেবল আচারনির্ভর ধর্ম নয়, বরং ইতিহাস-সচেতন, মুক্তিমুখী ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন এক জীবনদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে হজ, ফাতিমা ইজ ফাতিমা, শহীদ, ম্যান এন্ড ইসলাম, রেড শিয়িজম অ্যান্ড ব্ল্যাক শিয়িজম বিশেষভাবে সমাদৃত। ইসলামের বিপ্লবী তাৎপর্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নে তার রচনা মুসলিম বিশ্বের নতুন প্রজন্মকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। ১৯৭৭ সালে ইংল্যান্ডে তার জীবনাবসান ঘটে। ইসলামের সামাজিক তাৎপর্য ও মুসলিম আত্মমুক্তির প্রশ্নে ড. আলী শরীয়তি আজও এক অনিবার্য নাম।
Picture of ড. আলী শরীয়তি

ড. আলী শরীয়তি

ড. আলী শরীয়তি (১৯৩৩-১৯৭৭) মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, লেখক এবং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী। ইরানের খোরাসান প্রদেশের মাজিনানে তার জন্ম। তার পিতা মুহাম্মদ তাকী শরীয়তি ছিলেন একজন মুতাফাক্কির ও মুজাদ্দিদ। পারিবারিক পরিবেশেই ইসলামী জ্ঞান, সাহিত্য ও সমাজ-সচেতনতার প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন। মাশহাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পর তিনি ফ্রান্সে যান এবং প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনের ওপর উচ্চতর অধ্যয়ন করেন। ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলন, অস্তিত্ববাদ, সমাজতত্ত্ব এবং তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিসংগ্রামের নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ফ্রানৎস ফ্যানন, জাঁ-পল সার্ত্র ও আলজেরীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তার চিন্তার জগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দেশে ফিরে তিনি ইসলামের ইতিহাস, ইরফানমুখী সংস্কৃতি এবং মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে নতুন ভাষায় পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেন। মাশহাদের হুসাইনিয়্যে ইরশাদে প্রদত্ত তার বক্তৃতাগুলো অল্প সময়েই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলামকে কেবল আচারনির্ভর ধর্ম নয়, বরং ইতিহাস-সচেতন, মুক্তিমুখী ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন এক জীবনদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে হজ, ফাতিমা ইজ ফাতিমা, শহীদ, ম্যান এন্ড ইসলাম, রেড শিয়িজম অ্যান্ড ব্ল্যাক শিয়িজম বিশেষভাবে সমাদৃত। ইসলামের বিপ্লবী তাৎপর্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নে তার রচনা মুসলিম বিশ্বের নতুন প্রজন্মকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। ১৯৭৭ সালে ইংল্যান্ডে তার জীবনাবসান ঘটে। ইসলামের সামাজিক তাৎপর্য ও মুসলিম আত্মমুক্তির প্রশ্নে ড. আলী শরীয়তি আজও এক অনিবার্য নাম।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top