পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো ও মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা

পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো ও মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা

পাশ্চাত্য সভ্যতাই মুসলমানদের স্থবির সভ্যতাকে নব জীবন দান করার মতো একমাত্র শক্তি মনে করে মুসলিমরা যতদিন সেদিকে তাকিয়ে থাকবে, ততোদিন তারা তাদের আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করবে  এবং পরোক্ষভাবে এই পাশ্চাত্য মতবাদকে সমর্থন করে যাবে যে, ইসলাম হচ্ছে একটি ‘ক্ষয়িত শক্তি’ (Spent force)।

ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতা সম্পূর্ণরূপে বিপরীতধর্মী জীবন-দর্শনের ভিত্তিযুক্ত বলেই প্রাণবস্তুর দিক দিয়ে সুসমঞ্জস নয়। সুতরাং কি করে আমরা আশা করবো যে, পাশ্চাত্য ধারায় মুসলিম যুব সম্পদায়ের শিক্ষা-সম্পূর্ণ ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তিযুক্ত শিক্ষা ইসলাম বিরোধী প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে?

এরূপ প্রত্যাশা করা আমাদের পক্ষে সংগত হবে না। যে-সব বিশেষ ক্ষেত্রে শক্তিশালী মন শিক্ষাগত ব্যাপারের ওপর বিজয়ী হতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে ব্যতীত মুসলিম তরুণ সম্পদায়ের পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের ফলে রাসূলে করিম (সঃ)-এর শিক্ষার প্রতি তাদের ঈমান অক্ষুন্ন রাখার ইচ্ছা, বিচিত্র ইসলামী ধর্মীয় সভ্যতার প্রতিনিধি হিসাবে তাদের নিজেদেরকে পরিচিত করার ইচ্ছা ব্যাহত হতে বাধ্য। পাশ্চাত্য ধারায় শিক্ষিত ‘সুধীসমাজের’ ওপর ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না। এতে অবশ্যি একথা বুঝায় যে, বাস্তব ধর্ম হিসাবে ইসলাম তার বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে কেবল অশিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে; কিন্তু যে কারণেই হোক, ইসলামের আহ্বান পাশ্চাত্য-ভাবাপন্ন ‘সুধীসমাজ’ অগেক্ষা তাদের মধ্যে সত্য-উপলদ্ধির আদিম পদ্ধতির মাধ্যমে বহুগুণে অধিক সাড়া জাগাচ্ছে; তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ইসলামের প্রতি সুধীসমাজের এই বিরোধী মনোভাব বিশ্লেষণ করলে এ-কথা বলা চলে না যে, যে- পাশ্চাত্য বিজ্ঞান তাদের মনকে প্রভাবিত করেছে, তা আমাদের ধর্মীয় শিক্ষার সত্যের বিরুদ্ধে তাদের সামনে কোনো সংগত যুক্তি পেশ করেছে; বরং আধুনিক পশ্চিমী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিগত আবহাওয়াই এমন তীব্র ধর্মবিরোধী যে তা আমাদের মুসলিম যুব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সম্ভাবনার ওপর এক ভারী বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও অবিশ্বাস খুব কম ক্ষেত্রেই নিছক যুক্তির ব্যাপার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের মূলে থাকে সহজাত বৃত্তি, অখবা আমরা বলতে পারি অন্তর্দৃষ্টি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের কাছে তা পৌছে সাংস্কৃতিক পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে। এমন একটি শিশুর কথা মনে করা যেতে পারে, যে জীবনের শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চাংগ সংগীতের ধ্বনির সংগে পরিচিত। তার কর্ণ ধ্বনি, ছন্দ ও সুর বুঝতে অভ্যন্ত হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী জীবনে সে জটিলতম সংগীত রচনা করতে না পারলেও তা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়। কিন্তু যে বালক তার প্রথম জীবনে কখনো সংগীত জাতীয় কোনো কিছু শ্রবণ করেনি, পরবর্তী জীবনে তার পক্ষে সংগীতের উপাদান উপলব্ধি করাও কঠিন। ধর্মীয় সংযোগের ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থা। যেমন, সম্ভবতঃ এক শ্রেণীর লোক আছে, প্রকৃতি যাদেরকে ‘সংগীত’ উপলব্ধির কর্ণ থেকে বঞ্চিত করেছে। তেমনি অসম্ভাব্য হলেও হয়তো এমন সব ব্যক্তি রয়েছে, যারা ধর্মের আহ্বানের কাছে সম্পূর্ণ বধির। কিন্তু অধিকাংশ স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের বিকল্প মনোভাব তারা যে আবহাওয়ায় পালিত, তা অনুযায়ীই গড়ে ওঠে। এ কারণেই রাসূলে করিম (সঃ) বলেছেনঃ

مَا مِنْ مَوْلُودٌ الْأَيْتُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبُواهُ يُهَوِّدُ إِنَّهأَوْ يُنَصِّرْ أَنِهِ، أَوْ يُمَجِّسْنَاهُ

“প্রত্যেক শিশুই জন্মলাভ করে মৌলিক ‘পবিত্রতায়; তার বাপ-মা’ ই তাকে পরিণত করে ইহুদী, খৃষ্টান অখবা মূর্তিপৃজকে। (সহীহ্ আল-বুখারী)

উপর্যুক্ত হাদীসে ব্যবহৃত ‘বাপ-মা’ ন্যায়শাস্ত্রমতে সম্প্রসারিত হ’য়ে পারিবারিক জীবন, বিদ্যালয়, সমাজ প্রভৃতি সাধারণ পারিপার্শ্বিকতা বুঝাতে পারে, যার ভিতরে শিশুর প্রাথমিক বিকাশ সম্ভব হয়। এ-কথা অস্বীকার করা চলে না যে, বর্তমান পতনমূখী অবস্থায় বহু মুসলিম পরিবারেই ধর্মীয় আবহাওয়া এমন নিম্ন স্তরের ও বৃদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে অধঃপতিত ধরনের যে, বর্ধিষ্ণু তরুণ-মনে তা প্রথম উৎসাহ যোগায় ধর্মবিমুখ হবার। এরূপ সম্ভাবনা অনেকখানি নিশ্চিত; কিন্তু পাশ্চাত্য ধারায় শিক্ষা প্রাপ্ত হলে এ সব তরুণ মুসলিমের পরবর্তী জীবনে ধর্মবিমুখতার মনোভাব সৃষ্টি হবার কেবল যে সম্ভাবনা রয়েছে তাই নয়, বরং সেটাই হচ্ছে অবশ্যম্ভাবী।

কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্নের অবতারণা করতে হয়ঃ আধুনিক শিক্ষার প্রতি আমাদের মনোভাব কি হওয়া উচিত?

মুসলিমদের পাশ্চাত্য শিক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অর্থ মোটেই এ নয় যে, ইসলাম শিক্ষার বিরোধী। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই অভিযোগের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। যেনো তোমরা জ্ঞানী হতে পার‘, ‘যেনো তোমরা চিন্তা কর‘ ‘যেনো তোমরা উপলব্ধি করতে পার‘-এই ধরনের উক্তি পবিত্র কুরআনের সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়। কালামে পাকের শুরুতে বলা হয়েছেঃ

وَعَلَّمَ أَسْمَاءُ كُلَّهَا

“এবং তিনি (আল্লাহ্) আদমকে যাবতীয় নামসমূহ শিক্ষা দিলেন।” (সূরা ২:৩১)।

এর পরবর্তী আয়াতগুলোতে দেখা যায় যে, উক্ত ‘নামসমূহের জ্ঞানের দরুনই মানুষ একটি বিশেষ দিক দিয়ে ফেরেশতারও উর্ধ্বে।

নামসমূহ হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ শক্তির, সুসংবদ্ধ চিন্তাশক্তির রূপক প্রকাশ; যা মানব-চরিত্রে বিচিত্র রূপে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং কুরআনের কথায় তাকে দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দাবীদার করেছে। চিন্তাধারাকে ধারাবাহিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য মানুষকে অবশ্যি শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, এবং এই কারণেই হযরত রাসূলে করিম (সঃ) বলেছেনঃ

مَن سَلَّكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ – د

“যদি কেউ জ্ঞানের সন্ধানে পথ অতিক্রম করে, তার জন্য আল্লাহ সহজ করে দিবেন জান্নাতের পথ।” (সহিহ্ মুসলিম)

إِن فَضَلَ الْعَالَمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضَلِ الْقَمَرِ لَيْلَةِ الْبَدِرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ – د

“(নিছক) উপাসনাকারীর ওপর বিদ্বানের শ্রেষ্ঠত্ব সকল তারকা মন্ডলীর ওপর পূর্ণিমার চাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মতো।” (জামে তিরমিযী, সূনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাযা)

কিন্তু বিদ্যার্জনের প্রতি ইসলামের মনোভাবের সমর্থনে কুরআন ও হাদীস থেকে উদ্ধৃতির প্রয়োজনও হয় না। ইতিহাস সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণ করে যে, ইসলাম যেমন বিজ্ঞানে অগ্রাতির প্রেরণা দিয়েছে, অপর কোনো ধর্মই কখনো তা দেয়নি। শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইসলামী ধর্মশাস্ত্র থেকে যে উৎসাহ পেয়েছে, তার ফলে উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে এবং স্পেনে আরব শাসনের যুগে গৌরবদীপ্ত সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব অর্জন সম্ভব হয়েছিলো। এ তথ্য ইউরোপের ভালোভাবেই জানা উচিত; কারণ বহু অন্ধকার শতাব্দীর পর প্রাপ্ত রেনেসাঁর (পুনর্জন্ম) চাইতে ইসলামের কাছে তার নিজস্ব সংস্কৃতি কম ঋণী নয়। ইসলামী জাহান যখন তার নিজস্ব ঐতিহ্য ত্যাগ করে পুনরায় অন্ধত্ব ও বুদ্ধির দৈন্যে নিমজ্জিত হয়েছে, তখন ইসলামের গৌরবময় স্মৃতি নিয়ে গর্ব প্রকাশ করবার জন্যই আমি তার উল্লেখ করছি না। বর্তমান দুর্দিনে অতীতের গৌরবগাথা আবৃত্তি করে গর্ব করবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু আমাদেরকে অবশ্যি উপলব্ধি করতে হবে যে, আমাদের বর্তমান পতনের জন্য দায়ী কেবল মুসলিমদের অবহেলা, ইসলামী শিক্ষার কোনো ক্রটি নয়।

ইসলাম কখনো প্রগতি ও বিজ্ঞানের পথে অন্তরায় ছিলো না। ইসলাম মানুষের বৃদ্ধিবৃত্তি-সংক্রান্ত কার্যকলাপকে এতটা উপলব্ধি করেছে যে, তাকে স্থান দিয়েছে ফেরেশতারও উর্ধ্বে। জীবনের অন্যবিধ সর্বপ্রকার বিকাশের উর্ধ্বে যুক্তি ও শিক্ষার প্রাধান্যকে স্বীকৃতি দিবার পথে কোনো ধর্মই এতটা অগ্রসর হয়নি। ধর্মের এই নীতির সাথে আমাদের নিজেদের সামঞ্জস্য বিধান করলে আমাদের জীবন থেকে আধুনিক শিক্ষাকে বাদ দিবার কথা আমরা ভাবতেও পারি না। পাশ্চাত্য জাতিসমূহের সাথে সমতালে আমাদেরকেও শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে, অগ্রগতির আকাংখা পোষণ করতে হবে এবং বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে, পশ্চিমের দৃষ্টি দিয়ে কোনো মুসলিম কিছু দেখতে চাইবে না, পশ্চিমী ধারায় চিন্তা করবে না; মুসলিম হয়ে থাকতে চাইলে তারা পশ্চিমের জড়বাদী পরীক্ষার সাথে ইসলামের আত্মিক সভ্যতার বিনিময় করতে চাইবে না।

জ্ঞান প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য কোনোটাই নয়-সে হচ্ছে সর্বজনীন, যেমন সর্বজনীন প্রাকৃতিক তথ্য। কিন্তু যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সে তথ্য বিবেচনা ও পেশ করা যায়, জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক প্রবণতা অনুসারে হয় তার ব্যতিক্রম। প্রাণীবিদ্যা, শরীরবিদ্যা অথবা উদ্ভিদবিদ্যার কোনোটিই সম্ভাবনা ও উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে জড়বাদী অথবা অধ্যাত্মবাদী নয়; তথ্যসমূহের পর্যবেক্ষণ, সংগ্রহ ও সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং তা থেকে সাধারণ বিধি নির্ধারণ হচ্ছে তাদের কাজ। কিন্তু এই সব বিজ্ঞান থেকে লব্ধ অনুমানভিত্তিক দার্শনিক সিদ্ধান্ত অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক দর্শন কেবল তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিযুক্ত নয়; বরং তার ওপর রয়েছে খুব বেশী করে জীবন ও তার সমস্যাসমূহের প্রতি আমাদের পূর্ব-প্রবণতা বা সহজাত মনোভাবের প্রভাব। বিখ্যাত জ্ঞার্মান দার্শনিক কান্ট (Kant) মন্তব্য করেনঃ “প্রথমে এটা বিশ্বয়কর মনে হয়; কিন্তু এতে মোটেই অনিশ্চয়তা নেই যে আমাদের যুক্তি প্রকৃতি থেকে তার সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে না, বরং তার ওপর চাপিয়ে দেয়।” সোজা কথায়, কল্পিত দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে কাজ করে যায়; কারণ এতে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। এইভাবে যে বিজ্ঞানী নিজে জড়বাদী বা অধ্যাত্মবাদী কোনোটাই নয়, তা আমাদেরকে চালিত করতে পারে বিশ্বজগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ ব্যাখ্যার দিকে; সে ব্যাখ্যা আমাদের পূর্ব ধারণা অনুযায়ী অধ্যাত্মবাদী বা জড়বাদী হতে পারে। অত্যন্ত সুরুচিসংগত বৃদ্ধিবৃত্তি সত্ত্বেও পাশ্চাত্য দেশ জড়বাদী পূর্বধারণা সম্পন্ন এবং ধারণা ও মৌলিক অনুমানের দিক দিয়ে ধর্মরিরোধী, এবং পাশ্চাত্য শিক্ষাপদ্ধতিও সামগ্রিকভাবে অনুরূপ হতে বাধ্য। অন্য কথায়, কেবল আধুনিক ভূয়োদর্শনসজ্জাত বিজ্ঞান অধ্যয়নই নয়, বরং পশ্চিমী সভ্যতার যে ভাবধারার মাধ্যমে আমরা এই সকল বিজ্ঞান পাঠে প্রবৃত্ত হই, তা হচ্ছে ইসলামের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার বিরোধী।

এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে যুগ যুগ ধরে আমাদের ঔদাসীন্য ও অবহেলা আমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানের পাশ্চাত্য উৎস সমূহের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। ইসলামের যে নীতি প্রত্যেক মুসলিমের ওপর বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের কর্তব্য চাপিয়ে দিয়েছে, তা‘ সর্বদা পালন করলে আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য আমাদেরকে পাশ্চাত্যের দিকে তাকাতে হতো না, ঠিক যেমন করে মরুভূমিতে মরণ পথযাত্রী পিপাসাতুর ব্যক্তি দিগন্তের মরীচিকার দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিন্তু মুসলিমরা দীর্ঘকাল তাদের নিজস্ব সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেই অজ্ঞতা ও দৈন্যে নিমজ্জিত হয়েছে এবং ইউরোপ শক্তিশালী পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে বহুদূর। তাদের মধ্যে এ পার্থক্য দূর করতে বহু সময় লাগবে। ততদিন স্বাভাবিকভাবেই আমাদেরকে আধুনিক বিজ্ঞানকে গ্রহণ করতে হবে পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু এর একমাত্র অর্থ হয় এই যে, আমরা কেবল বৈজ্ঞানিক বিষয় ও পদ্ধতিই গ্রহণ করতে বাধ্য হবো, আর কিছুই নয়। অন্য কথায়, পাশ্চাত্য ধারায় সঠিক বিজ্ঞান (exact science) অধ্যয়ন করতে আমাদের দ্বিধা করা উচিত নয়, কিন্তু মুসলিম তরুণের শিক্ষায় আমরা তাদের দর্শনের কোনো অংশ স্বীকার করে নেবো না। অবশ্যি কেউ বলতে পারেন যে, বর্তমান সঠিক বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে অনেক গুলোই-দৃষ্টান্ত স্বরূপ আণবিক পদার্থবিদ্যা, নিছক ভূয়োদর্শন সংক্রান্ত অনুসন্ধানের সীমা অতিক্রম করে দার্শনিক ক্ষেত্রে প্রবিষ্ট হয়েছে; এবং বহু ক্ষেত্রে ভূয়োদর্শনসজ্জাত বিজ্ঞান ও কল্পনাভিত্তিক দর্শনের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখাটানা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। একথা সত্য। কিন্তু অপর দিকে ঠিক এই ক্ষেত্রেই ইসলামী সংস্কৃতিকে তার নিজস্ব সত্তা প্রমাণ করতে হবে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা যখন একবার বৈজ্ঞানিক গবেষণার এই সীমান্তরেখায় উপনীত হবেন, তখনই পাশ্চাত্য দার্শনিক সূত্রের পরিবর্তে স্বাধীনভাবে নিজস্ব কল্পনাভিত্তিক যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা প্রয়োগের কর্তব্য ও সুযোগ তাঁদের সামনে আসবে। তাঁদের নিজস্ব ইসলামী মনোভাব থেকে তাঁরা সম্ববতঃ এমন সব সিদ্ধান্তে পৌছবেন, যা আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীদের অধিকাংশই সিদ্ধান্ত থেকে হবে আলাদা ধরনের।

কিন্তু ভবিষ্যতে যাই হোক, আজকের দিনেও পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিগত মনোভাবের কাছে দাসসূলভ আত্মসমর্পণ না করে বিজ্ঞান অধ্যয়ন ও শিক্ষাদান নিশ্চিতরূপে সম্ভর। ইসলামী দুনিয়ার সব চাইতে জরুরী প্রয়োজন যে জিনিসটির, তা নতুন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং তা হচ্ছে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও কার্যকরী উপকরণ।

ইসলামী বিবেচনা দ্বারা চালিত কোনো আদর্শ শিক্ষাবোর্ডের কাছে প্রস্তাব পেশ করতে গেলে আমি দাবী করতাম যে, পাশ্চাত্যের সর্বপ্রকার জ্ঞান-সম্পদের মধ্যে কেবলমাত্র প্রকৃতি-বিজ্ঞান (উল্লিখিত নিয়ন্ত্রিত মনোভাবসহ) ও গণিতশাস্ত্র মুসলিম বিদ্যালয়সমূহে অধীত হওয়া উচিত এবং বর্তমানে শিক্ষণীয় বিষয়াবলীর মধ্যে ইউরোপীয় দর্শন সাহিত্য ও ইতিহাস যে মর্যাদা লাত করেছে, তা হ্রাস প্রাপ্ত হওয়া প্রয়োজন। ইউরোপীয় দর্শনের প্রতি আমাদের মনোভাব কি হওয়া উচিত, ওপরের আলোচনায় তা’ স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। ইউরোপীয় সাহিত্যের কথা বলতে গেলে তাকে উপেক্ষা করা উচিত হবে না; কিন্তু তাকে শুধু ভাষাশিক্ষা সংক্রান্ত মর্যাদাই দিতে হবে। বর্তমানে মুসলিম দেশসমূহে যে ভাবে তা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্টতঃ পক্ষপাতমূলক। পাশ্চাত্য সভ্যতার নেতিবাচক দিক যথেষ্ট পরিমাণে উপলব্ধি করবার আগেই তার সীমাহীনভাবে অতিরঞ্জিত মূল্যবোধ অপরিপক্ক যুব-মনকে সর্বান্তঃ করণে পাশ্চাত্য সভ্যতার ভাবধারা গ্রহণে প্ররোচিত করে। সূতরাং কেবল পাশ্চাত্য সভ্যতার প্লেটোবাদী উপাসনা নয়, বাস্তব অনুকরণের ক্ষেত্রও তৈরী হয়ে যায়, যা ইসলামী ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে না। শিক্ষার্থীদের ইসলামী তমদ্দুনের গভীরতা ও সম্পদ সম্পর্কে ওয়াকেফহাল করে তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের নতুন আশা-উদ্দীপনা সঞ্চারের উদ্দেশ্যে মুসলিম বিদ্যালয়সমূহে ইসলামী সাহিত্যের যুক্তিসংগত বাছবিচারপূর্ণ শিক্ষা দ্বারা ইউরোপীয় সাহিত্যের বর্তমান স্থান পূরণ করা প্রয়োজন।

বর্তমানে বহুসংখ্যক মুসলিম বিদ্যালয়ে ইউরোপীয় সাহিত্য যে রূপে প্রচলিত রয়েছে তা যদি তরুণ মুসলিম-মনকে ইসলামের বিরোধী করে তোলার সহায়তা করে তা হলে বিশ্ব ইতিহাসের ইউরোপীয় ভাষ্যের বেলায় সে কথা আরো বহুগুনে বেশী সত্যি। তার ভিতরে রোমান বনাম বর্বর এর পুরাতন মনোভাব অত্যন্ত সুস্পষ্টরূপে প্রতিফলিত হয়। স্বীকার না করলেও তাদের ইতিহাস বর্ণনার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই তথ্য প্রমাণ করা যে, দুনিয়ায় যত রকম সভ্যতা এসেছে ও আসতে পারে, তার মধ্যে পাশ্চাত্য জ্ঞাতিসমূহ ও তাদের সভ্যতাই শ্রেষ্ঠ; সূতরাং তাতে দুনিয়ার বাকী অংশের ওপর পাশ্চাত্যের আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াসের স্বপক্ষে নৈতিক যৌক্তিকতার মতো একটা কিছু খাড়া করা হয়। রোমানদের আমল থেকে ইউরোপীয় জাতিসমূহ প্রাচ্যও পাশ্চাত্যের সর্বপ্রকার পার্থক্যকে কাল্পনিক ইউরোপীয় আদর্শের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের যুক্তি এই কল্পনার ওপরই কাজ করে যায় যে, মানবতার ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বিচার করা যায় কেবলমাত্র ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এই ধরনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিকভাবে একটি বিকৃত চিত্রের অবতারণা করে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের সীমানা অভ্যন্ত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি থেকে যত দূরবর্তী হয়, ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের পক্ষে তার বিবেচ্য ঐতিহাসিক লক্ষ্যবস্তুর স্বরূপ ও কাঠামো উপলব্ধি তত বেশী কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয়দের এই আত্মকেন্দ্রিক মনেভাবের দরুন তাদের রচিত বর্ণনাত্মক বিশ্ব ইতিহাস সাম্প্রতিক-কাল পর্যন্ত পাশ্চাত্যের পরিবর্ধিত ইতিহাসের বেশী কিছুই হয়নি। অ-ইউরোপীয় জাতিসমূহকে কেবল তখনই হিসাবে ধরা হয়েছে, যখন তাদের অস্তিত্বও বিকাশ ইউরোপের ভাগের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে। যদি ইউরোপীয় জাতিসমূহের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে সালংকারে বর্ণনা করা যায় এবং বাকী দুনিয়া সম্পর্কে এখানে সেখানে ছিটে ফোঁটা বর্ণনা দেয়া যায়, তা হলে পাঠককে বাধ্য হয়ে এই ধারণাই মেনে নিতে হবে যে, ইউরোপের মহৎ কৃতিত্ব সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তি সংক্রান্ত দিক দিয়ে বাকী দুনিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে সকল অনুপাতের বাইরে। এমনি করে অনেকটা এই ধারণারই সৃষ্টি হবে, যেনো ইউরোপ ও তার সভ্যতার জন্যই দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছিলো এবং অন্যান্য সকল সভ্যতার কার্য হচ্ছে কেবল পাশ্চাত্য মহিমার যোগ্য অবস্থানস্থল গড়ে তোলা। এই ধরণের ইতিহাস শিক্ষায় অ-ইউরোপীয় তরুণ মনের ওপর একমাত্র ফল হতে পারে তাদের নিজস্ব তমদ্দুন, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভবনা সম্পর্কে একটা হীম্মন্যতার ধারণা সৃষ্টি। তাদেরকে ক্রমাগত শিক্ষা দেওয়া হয় তাদের নিজস্ব ভবিষ্যতকে অবজ্ঞা করতে-যতোক্ষণ না সে ভবিষ্যৎ হয় পাশ্চাত্য আদর্শের কাছে আত্মসমর্পিত।

এই কুফল প্রতিরোধের জন্য ইসলামী চিন্তাধারার দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দের কর্তব্য হচ্ছে মুসলিম বিদ্যালয়সমূহে ইতিহাস শিক্ষার ধারা সংশোধনের জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করা। এ কর্তব্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন এবং মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন করে বিশ্ব-ইতিহাস প্রণয়নের পূর্বে প্রয়োজন হবে আমাদের ইতিহাস শিক্ষার ধারায় ব্যাপক সংস্কার সাধন। কিন্তু কঠিন হলেও এ কর্তব্য পালন করা সম্ভব এবং সর্বোপরি অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায় আমাদের তরুণ সমাজ ইসলাম বিদ্বেষের গোপন স্রোতধারায় ক্রমাগত প্রবাহিত হতে থাকবে এবং ফলে তাদের হীনম্মন্যতা আরো বেশী করে দৃঢ় বদ্ধমূল হবে। এই হীনম্মন্যতাকে জয় করা নিঃসন্দেহে সম্ভব হবে, যদি মুসলিমরা ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে ইসলামকে তাদের জীবন থেকে নির্বাসন দিতে রাজী হয়। কিন্তু তাতে কি তারা রাজী?

আমরা বিশ্বাস করি এবং পাশ্চাত্য দেশসমূহের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দ্বারা সে বিশ্বাস সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলামী নীতিশাস্ত্র, ইসলামের সামাজিক ও ব্যক্তিগত নীতিবোধ, বিচার ও স্বাধীনতার ধারণা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুরূপ ধারণা ও আদর্শ থেকে বহুগুণে পূর্ণতর। ইসলাম জাতি বিদ্বেষের মূলোচ্ছেদ করেছে এবং মানব-ভাতৃত্ব ও সাম্যের পথ উন্নুক্ত করেছে, কিন্তু পাশ্চাত্য সভ্যতা এখনো বর্ণগত ও জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সীমানার বাইরে দৃষ্টি প্রসারিত করতে অক্ষম। ইসলামী সমাজে কখনো শ্রেনীবিভাগ ও শ্রেনীবিরোধের অস্তিত্ব নেই; কিন্তু গ্রীস ও রোমের আমল থেকে শুরু করে আমাদের কাল পর্যন্ত ইউরোপের সমগ্র ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রাম ও সামাজিক বিদ্বেষে পরিপূর্ণ।

বারংবার আমাদেরকে এই কথাই বলতে হয় যে, পাশ্চাত্যের কাছ খেকে কোনো মুসলিম লাভজনকভাবে একটি জিনিসই মাত্র শিখতে পারে এবং তা হচ্ছে অবিমিশ্র ও ফলিতরূপে সঠিক বিজ্ঞান (exact science in their pure and applied forms)। বাইরে থেকে বিজ্ঞানের সন্ধান করার প্রয়োজন যেনো কোনো মুসলিমকে এ কথা ভাবতে প্ররোচিত না করে যে, পশ্চিমী সভ্যতা তার নিজ সভ্যতা খেকে শ্রেষ্ঠ, তা হলে সে ইসলামের উদ্দেশ্য উপলব্দি করতে পারবে না। কোনো জ্ঞানের ক্ষেত্রে অধিকতর অগ্রসরতার ওপর নির্ভর করে না (যদিও তা বাঞ্জনীয়); বরং তা নির্ভর করে নৈতিক উদ্যমের ওপর, মানব-জীবনের সকল দিকের ব্যাখ্যা ও সমন্বয় সাধনের বৃহত্তর সম্ভবনার ওপর। এদিক দিয়ে ইসলাম অন্য সকল সংস্কৃতিকে ছাড়িয়ে গেছে। মানব-জীবনের সর্বোত্তম কৃতিত্ব অর্জনের জন্য আমাদেরকে কেবল ইসলামের বিধিসমূহ অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু যদি আমরা ইসলামী মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রাখতে ও পুনরুজ্জীবিত করতে চাই, তা হলে আমরা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণ করতে পারি না ও করবো না। পশ্চিমী সভ্যতার অনুকরণ দ্বারা আমাদের যে বস্তুবাদী লাভের সম্ভবনা আছে, তার তুলনায় সে সভ্যতার বৃদ্ধিবৃত্তিগত প্রভাবের আনীত অকল্যাণ ইসলামী সমাজ-দেহে হবে অধিকতর ক্ষতিকর।

অতীতে মুসলিমরা যদি বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে অবহেলা প্রদর্শন করে থাকে, আজ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে তারা সে ভুলের ক্ষতিপূরণ করতে পারে না। পাশ্চাত্য শিক্ষার কাঠামো অন্ধভাবে অনুসরণের ফলে মুসলিম জাহানের ধর্মীয় সম্ভবনার ক্ষেত্রে যে মারাত্মক পরিণতি আসবে, তার সাথে আমাদের সর্ববিধ বৈজ্ঞানিক পশ্চাদগতি ও দৈন্যের তুলনা করা চলে না। যদি আমরা সংস্কৃতিক উপাদান হিসাবে ইসলামের বাস্তবতা অক্ষুন্ন রাখতে চাই, তা হলে আমাদেরকে পশ্চিমী সভ্যতার, যে সভ্যতা আজ আমাদের সমাজ ও আমাদের প্রবণতার ওপর বিজয় লাভ করতে এগিয়ে আসছে-বুদ্ধিবৃত্তিগত আবহাওয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। পাশ্চাত্যের আচার-ব্যবহার ও জীবন পদ্ধতি অনুকরণের ফলে মুসলিমরা ক্রমে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ বাইরের রূপের অনুকরণ অনুরূপভাবে ধীরে ধীরে মানুষকে চালিত করে সে রূপের মূলীভূত দৃষ্টিভঙ্গিকে আত্মস্থ করার পথে।

 

অনুবাদঃ সৈয়দ আবদুল মান্নান 

২ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of মুহাম্মদ আসাদ

মুহাম্মদ আসাদ

মুহাম্মদ আসাদ (১৯০০-১৯৯২) আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, লেখক, কুরআন ব্যাখ্যাকার এবং ইসলামী পুনর্জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের লেমবার্গে (বর্তমান ইউক্রেনের লভিভ) এক ইহুদি পরিবারে তার জন্ম। তার পূর্বনাম ছিল লিওপোল্ড ওয়েইস। ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আসাদ অল্প বয়সেই দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ করতে গিয়ে তিনি মুসলিম সমাজের জীবন, কুরআনের ভাষা এবং ইসলামের নৈতিক-আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। দীর্ঘ অনুসন্ধান, অধ্যয়ন ও আত্মিক অনুধ্যানের পর ১৯২৬ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুহাম্মদ আসাদ নাম ধারণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি আরব বিশ্ব, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রাথমিক কূটনৈতিক দায়িত্বেও তিনি নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু তার মূল পরিচয় গড়ে ওঠে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যাকার হিসেবে। তার রচিত The Road to Mecca আত্মজৈবনিক সাহিত্য হিসেবে যেমন বিশ্বখ্যাত, তেমনি The Message of the Qur’an আধুনিক ইংরেজি ভাষায় কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া Islam at the Crossroads গ্রন্থে তিনি মুসলিম সমাজের আত্মবিস্মৃতি ও পশ্চিমা অনুকরণের সমালোচনা করেছেন। পূর্ব ও পশ্চিমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ আসাদ এমন এক চিন্তাবিদে পরিণত হন, যিনি আধুনিক মানুষের কাছে ইসলামের বৌদ্ধিক গভীরতা, নৈতিক সামঞ্জস্য এবং আধ্যাত্মিক আবেদনকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছেন।
Picture of মুহাম্মদ আসাদ

মুহাম্মদ আসাদ

মুহাম্মদ আসাদ (১৯০০-১৯৯২) আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, লেখক, কুরআন ব্যাখ্যাকার এবং ইসলামী পুনর্জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের লেমবার্গে (বর্তমান ইউক্রেনের লভিভ) এক ইহুদি পরিবারে তার জন্ম। তার পূর্বনাম ছিল লিওপোল্ড ওয়েইস। ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আসাদ অল্প বয়সেই দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ করতে গিয়ে তিনি মুসলিম সমাজের জীবন, কুরআনের ভাষা এবং ইসলামের নৈতিক-আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। দীর্ঘ অনুসন্ধান, অধ্যয়ন ও আত্মিক অনুধ্যানের পর ১৯২৬ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুহাম্মদ আসাদ নাম ধারণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি আরব বিশ্ব, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রাথমিক কূটনৈতিক দায়িত্বেও তিনি নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু তার মূল পরিচয় গড়ে ওঠে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যাকার হিসেবে। তার রচিত The Road to Mecca আত্মজৈবনিক সাহিত্য হিসেবে যেমন বিশ্বখ্যাত, তেমনি The Message of the Qur’an আধুনিক ইংরেজি ভাষায় কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া Islam at the Crossroads গ্রন্থে তিনি মুসলিম সমাজের আত্মবিস্মৃতি ও পশ্চিমা অনুকরণের সমালোচনা করেছেন। পূর্ব ও পশ্চিমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ আসাদ এমন এক চিন্তাবিদে পরিণত হন, যিনি আধুনিক মানুষের কাছে ইসলামের বৌদ্ধিক গভীরতা, নৈতিক সামঞ্জস্য এবং আধ্যাত্মিক আবেদনকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top