বিভিন্ন ধর্মের বিশেষ বিশেষ মতবাদ যাই হোক, তার শিক্ষা যতো উচ্চ বা আদিমই হোক না কেন, হোক না তা একেশ্বরবাদী, বহু-ঈশ্বরবাদী অথবা সর্বেশ্বরবাদী-ইতিহাসের সর্বকালে, সকল পর্যায়ে এবং সকল সত্যতায় প্রত্যেক ধর্মীয় অভিজ্ঞতার অন্তরতম সত্য হচ্ছে প্রথমে মানুষের এই অন্তঃপ্রত্যয় যে, এই পৃথিবীর সমস্ত অস্তিত্ব ও ঘটনা একটা সজ্ঞান, সৃজনশীল, সর্বব্যাপী শক্তি অথবা আরো সোজা কথায় একটা ঐশী অভিপ্রায়ের ফল। দ্বিতীয়ত, এই অনুভূতি যে সে অভিপ্রায়ের সঙ্গে মানুষের আত্মিক ঐক্য রয়েছে বা অন্তত তা থাকা উচিত, শুধুমাত্র এই উপলব্ধি এবং প্রত্যয়ের উপর ভিত্তি করেই মানুষকে ‘ভালো’ এবং ‘মন্দের’ মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কারণ সমস্ত সৃষ্টির মূলে একটি একক পরিকল্পক অভিপ্রায় কাজ করেছে এ কথা মেনে না নিলে আমাদের কোনো লক্ষ্য এবং কাজ যে মূলতই ভালো অথবা মন্দ, নীতিসম্মত অথবা নীতি বিগর্হিত আমাদের এইরূপ ধারণার কোন মানেই হয় না। এ ধরনের একটি পরিকল্পক অভিপ্রায়ে বিশ্বাস না থাকলে আখলাক সম্পর্কে আমাদের সকল ধারণাই অনিবার্যরূপে ধোঁয়াটে এবং ক্রমেই অধিকতর সুযোগ-নির্ভর হয়ে উঠবে অর্থাৎ কোন লক্ষ্য বা কর্ম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তার সমাজের জন্য উপযোগী (শব্দটির ব্যবহারিক অর্থে) কিনা এ প্রশ্নের দ্বারাই আমাদের আখলাকের ধারণা প্রভাবিত হবে। এর পরিণাম এই যে, ‘উচিত’ এবং ‘অনুচিত’ আপেক্ষিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে এবং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজনানুসারে এই শব্দ দু’টো যথেচ্ছ ব্যাখ্যার বস্তু হয়ে উঠবে। এদিকে প্রয়োজনগুলোও আবার মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবেশে যে নিরন্তর পরিবর্তন ঘটছে সে সবেরই অধীন।
আমাদের কালের ঝোঁক নিশ্চিতভাবে ধর্ম মাত্রেরই বিরোধী। আমরা যদি তা বুঝতে পারি, তা হলে আখলাকের ক্ষেত্রে দ্বীনি চিন্তা ও অনুভূতির ভূমিকা সম্পর্কে এসব মতামত একটা অসীম গুরুত্ব অর্জন করবে। সর্বত্র এবং প্রত্যহ এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী আমাদের বলে চলেছেন, দ্বীন মানুষের বর্বর অতীতের লুপ্তাবশেষ ছাড়া কিছুই নয় – তাঁদের মতে, এখন তার স্থান গ্রহণ করতে যাচ্ছে বিজ্ঞান যুগ। তাঁরা বলেন, বিজ্ঞান আজ জরাজীর্ণ সেকেলে ধর্মীয় ব্যবস্থাগুলোর স্থান গ্রহণ করতে চলেছে; অমন গৌরবজনক ও অনিবার্যভাবে যার বিকাশ ঘটছে সেই বিজ্ঞান অবশেষে মানুষকে বিশুদ্ধ বুদ্ধির নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে শেখাবে এবং কালে কোন অতীন্দ্রিয় শক্তির অনুমোদন ব্যতিরেকেই মানুষকে আখলাকের নতুন মান উদ্ভাবনের ক্ষমতা দান করবে।
বস্তুত বিজ্ঞান সম্পর্কে এই সরল আশাবাদ মোটেই ‘আধুনিক‘ ব্যাপার নয়। পক্ষান্তরে এটা পাশ্চাত্যের আঠারো এবং উনিশ শতকের সরল আশাবাদেরই নির্বিচার প্রতিধ্বনি মাত্র। সে সময়ে (বিশেষ করে উনিশ শতকের শেষার্ধে) বহু পশ্চিমী বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, বিশ্ব-রহস্যের ফয়সালা একেবারে আসন্ন এবং এখন থেকে আল্লাহর যোগ্য স্বাধীনতা ও যুক্তি-বিচারের দ্বারা জীবনকে বিন্যস্ত করার পথে আর কিছুই মানুষকে বাধা দিতে সমর্থ হবে না। এ ব্যাপারে আমাদের কালের চিন্তাবিদরা অনেক বেশি সংযত-সংশয়বাদী, একথা না হয় নাই বলা হলো। বিংশ শতাব্দীর আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের প্রচণ্ড আঘাতের ফলস্বরূপ সমসাময়িক কালের চিন্তাবিদরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, একশ বা পঞ্চাশ বছর আগেও জড় বিজ্ঞানের সঙ্গে যে সব আধ্যাত্মিক আশা-আকাঙ্ক্ষা সংশ্লিষ্ট ছিল, এ বিজ্ঞান সেসব পূরণ করতে অসমর্থ। কারণ, তাঁরা আবিষ্কার করেছেন, আমাদের গবেষণা যতই অগ্রসর হয়, বিশ্বের রহস্যসমূহ ততোই আরো রহস্যময়, আরো জটিল হয়ে ওঠে। প্রত্যেক দিনই এটা স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে যে, বিশ্ব কী করে সৃষ্টি হয়েছে, কী করে এতে প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে এবং প্রাণেরই বা উপাদান কী, — বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক পন্থায় এসব প্রশ্নের জবাব দান হয়তো কখনো সম্ভব না-ও হতে পারে এবং সে কারণে, মানুষের সত্যিকার প্রকৃতি এবং লক্ষ্য কী সে প্রশ্ন হয়তো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। শেষোক্ত প্রশ্নের জবাব আমরা যতোক্ষণ না দিতে পেরেছি, ততক্ষণ ‘ভালো’ এবং ‘মন্দ’ প্রভৃতি নৈতিক মূল্যের সংজ্ঞা নির্ণয়ের চেষ্টা পর্যন্ত আমরা করতে পারছি না, শুধু এই কারণে। মানব জীবনের প্রকৃতি ও লক্ষ্যের জ্ঞানের সঙ্গে (বাস্তব অথবা কাল্পনিক) সম্পর্কযুক্ত না হলে এইসব শব্দের কোন অর্থই হয় না।
আমাদের সবচেয়ে অগ্রসর বিজ্ঞানীরা আজ এটাই উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। পদার্থিক গবেষণার দ্বারা পরাতাত্ত্বিক প্রশ্নের মীমাংসা সম্ভব নয় এই সত্যের সমুখীন হয়ে, বিজ্ঞানের পক্ষে নীতিশাস্ত্র ও আখলাকের ক্ষেত্রে পথনির্দেশ সম্ভবপর, গত শতাব্দীর এই সরল আশাবাদ তাঁরা ত্যাগ করেছেন। এসব উন্নত বিজ্ঞানী যে বিজ্ঞান হিসেবেই বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করেন তা নয়, বরং তাঁরা দৃঢ় বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞানের সাহায্যে মানব জাতি অধিকতর বৈষয়িক জ্ঞান ও সাফল্য অর্জন করতে থাকবে, কিন্তু যুগপৎ তাঁরা এও উপলব্ধি করেন যে, মানুষের আখলাকী এবং রূহানী জীবনের প্রসঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রয়াসের প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্ক নেই। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের চতুষ্পার্শ্বের বিশ্ব ও অন্তর্জগত সম্পর্কে প্রকৃষ্টতর ধারণা লাভে বিজ্ঞান আমাদিগকে শুধু যে নির্দেশ দিতে পারে তাই নয়, দিয়েও থাকে। কিন্তু যেহেতু বিজ্ঞানের সম্পর্ক শুধুমাত্র প্রাকৃতিক তথ্য পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এবং তথ্যগুলোর আন্তঃসম্পর্ক যেসব নিয়মের দ্বারা শাসিত মনে হয় তারই বিশ্লেষণের সঙ্গে সেজন্য জীবনের লক্ষ্য কী সে সম্পর্কে অভিমত দানের জন্য এবং এইভাবেই আমাদের সামাজিক আচরণের অনুসরণীয় বৈধ নির্দেশ প্রদানের জন্য বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করা যায় না। শুধুমাত্র পরোক্ষভাবে বিশেষ কতকগুলো প্রতিষ্ঠিত তথ্যের ভিত্তিতে অনুমানভিত্তিক যুক্তি-চিন্তার মাধ্যমে বিজ্ঞান এ ব্যাপারে আমাদেরকে পরামর্শদানের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান যেহেতু সর্বক্ষণ একটা পরিবর্তনের স্রোতে ধাবমান, নিয়তই প্রকৃতির নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কারের দ্বারা এবং পরিণামে, পূর্ব পরীক্ষিত তথ্যসমূহের নিরন্তর পুনর্ব্যাখ্যা ও পুনর্মূল্যায়নের দ্বারা প্রভাবিত, সে কারণে বিজ্ঞানের পরামর্শ দ্বিধাযুক্ত ও আকস্মিক এবং কখনো কখনো পূর্বপ্রদত্ত পরামর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। সংক্ষেপে, এটা এ কথা বলারই সমর্থক যে, ‘কল্যাণ’ এবং ‘সুখ’ পেতে হলে মানুষের কী কর্তব্য কিংবা কী কর্তব্য নয় এ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার ক্ষমতা বিজ্ঞানের কোনকালেই নেই। এবং এ-কারণেই বিজ্ঞান মানুষের মধ্যে আখলাকী চেতনার বিকাশে সহায়তা করতে পারে না (এবং আসলে সে চেষ্টাও করে না)। সংক্ষেপে, নীতিশাস্ত্র ও আখলাকের সমস্যাগুলো বিজ্ঞানের আওতাবহির্ভূত এবং বিপরীত পক্ষে এগুলো সম্পূর্ণভাবে দ্বীনের ইখতিয়ারভূক্ত।
আমাদের পরিপার্শে যেসব ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে, সেসব পরিবর্তনের নিরপেক্ষ আখলাকী মূল্যায়নের মান সঠিকভাবে হোক বা ভুল করেই হোক আমরা শুধু দ্বীনি অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই পেতে পারি। আমি ‘সঠিকভাবে’ বা ‘ভুল করে’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছি এ কারণে যে, আত্মনিরপেক্ষ যুক্তি-বিচারের সকল পদ্ধতি অনুসারে ধর্মের পক্ষে (যে কোন ধর্মের) তার পরাতত্ত্বমূলক সূত্রগুলোতে সর্বদাই ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে এবং পরিণামে ঐ সব সূত্র থেকে যেসব আখলাকী মূল্যের অনুসিদ্ধান্ত করা হয় তাতেও ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য আমরা কোন ধর্ম বা দ্বীন গ্রহণ করবো বা বর্জন করবো, পরিণামে তা আমাদের যুক্তি-বিচারের দ্বারাই নির্ধারিত হবে। কারণ, এই যুক্তি-বিচারই আমাদেরকে বলে দেয় – ঐ ধর্মটি মানুষের দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয়বিধ চূড়ান্ত চাহিদার সঙ্গে কতটুকু খাপ খায়। কিন্তু দ্বীনের শিক্ষা বিচারে আমাদের যুক্তিধর্মী বৃত্তিগুলো প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা এ মৌলিক সত্যকে সামান্য মাত্র ক্ষুণ্ণ করে না যে, শুধুমাত্র ধর্মই আমাদের জীবনকে একটা তাৎপর্য দান করতে সক্ষম এবং এভাবেই তা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাপুঞ্জের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত আখলাকী মূল্যের একটি রূপের সঙ্গে আমাদের চিন্তা ও আচরণের সামঞ্জস্য বিধানের জন্য আমাদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। ভিন্নভাবে বলতে গেলে, ভালো কী এবং মন্দ কী সে সম্পর্কে মানুষের বিভিন্ন দলের মধ্যে ঐকমত্যের জন্য প্রয়োজনীয় একটা প্রশস্ত মিলনক্ষেত্র শুধুমাত্র দ্বীনের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে। এবং মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোন প্রকার শৃঙ্খলার জন্য এ ধরনের ঐকমত্য যে একটি নিরঙ্কুশ এবং অপরিহার্য প্রয়োজন তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকতে পারে কি?
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় প্রেরণা তার রূহানী বিকাশের ইতিহাসে একটা পর্যায়মাত্র নয়, বরং তার সমস্ত আখলাকী চিন্তা এবং আখলাকের সমস্ত ধারণারই চূড়ান্ত উৎস। এটা আদি মানবের সহজ বিশ্বাসের ফল নয়, যা অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত যুগ পশ্চাতে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে; বরং সকল কালে এবং সকল পরিবেশে মানুষের প্রকৃত ও মৌলিক চাহিদার একমাত্র প্রতিকার এতেই আছে। অন্য কথায়, এটা একটা ‘সহজাত বৃত্তি।’
তাই এ ধারণা যুক্তিসঙ্গত যে, লৌকিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র অপেক্ষা ধর্মের বা দ্বীনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে জাতীয় সুখ-সমৃদ্ধির সম্ভাবনা অসংখ্য গুণে বেশি। অবশ্য তার জন্য শর্ত আছে। সে শর্ত এই যে, এ ধরনের রাষ্ট্র যে ধর্মীয় মতবাদের উপর স্থাপিত হয় এবং যা থেকে সে তার ক্ষমতা ও কৃতিত্ব পায় সেই মতবাদটিতে থাকা চাই। প্রথমত, মানুষের জৈবিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণের পূর্ব সুযোগ; দ্বিতীয়ত, মানব সমাজ সমগ্রভাবে যে ঐতিহাসিক ও মানসিক বিকাশের নিয়মধারার অধীন তার পূর্ণ স্বীকৃতি। এই দুটি শর্তের প্রথমটি শুধু তখনি পূরণ সম্ভব, যদি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসটি শুধুমাত্র মানুষের আধ্যাত্মিক প্রকৃতিকে মূল্যবান মনে না করে তার জৈবিক প্রকৃতিকেও মূল্যবান মনে করে – ইসলাম সন্দেহাতীতভাবে এ দুয়েরই মূল্য স্বীকার করে। দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ সম্ভব-সামাজিক আচরণ যে রাজনৈতিক বিধানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, তা যদি শুধু বাস্তব এবং স্বতঃসিদ্ধ না হয়ে সর্বপ্রকার অনমনীয়তা থেকেও মুক্ত হয়। কুরআন এবং সুন্নাহতে বিধৃত রাজনৈতিক বিধান সম্পর্কে আমরা আসলে ঠিক এই দাবিই করে থাকি।


