আধুনিক একটি পরিভাষা হিসেবে ইসলামী অর্থনীতির উৎপত্তি
‘ইসলামী অর্থনীতি’ পরিভাষাটি খুব বেশি প্রাচীন নয়। বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এর উদ্ভব ঘটে। সে সময়ের ইসলামী চিন্তাবিদগণ আধুনিক যুগে মুদ্রা ও পুঁজিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থব্যবস্থাকে কীভাবে ইসলামী রূপ দেওয়া যায় এবং এ বিষয়ে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা কী, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব ও চিন্তা তুলে ধরতে শুরু করেন। মূলত তাঁদের এসব চিন্তা ও তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্য দিয়েই ‘ইসলামী অর্থনীতি’ পরিভাষাটির উদ্ভব ঘটে।
দ্বীন, আইন, আখলাক ও অর্থনীতির আন্তঃসম্পর্ক
প্রতিটি সভ্যতারই নিজস্ব একটি অর্থনৈতিক তাসাউউর বা দর্শন রয়েছে। আর এই তাসাউউর বা দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে রয়েছে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। কোনো সভ্যতার অর্থনৈতিক তাসাউউরকে সেই সভ্যতার মূল্যবোধের সিস্টেম, আখলাকী ধারণা ও আইনগত ব্যবস্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করা যায় না। ফলে সেই সভ্যতার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তার নিজস্ব মূল্যবোধ, আখলাকী মূলনীতি ও আইনগত হুকুম-আহকামের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
বর্তমান দুনিয়ায় পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা মানুষের জীবনধারার গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতায় মানুষের জীবনধারা নির্ধারিত হয় ইলাহী আদেশ-নিষেধ এবং হযরত পয়গাম্বর (স.)-এর সুন্নতের ভিত্তিতে। ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে এবং কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, মানুষের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক কিংবা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কেমন হবে, এসব বিষয়ও ইলাহী আদেশ-নিষেধ ও পয়গাম্বরের সুন্নতের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।
ইসলাম শুধু আকীদা ও বিশ্বাসসংক্রান্ত বিষয়াবলিই পেশ করেনি, একই সঙ্গে সেই আকীদা ও বিশ্বাসের আলোকে কেমন একটি দুনিয়া গড়ে তুলতে হবে, সে সম্পর্কিত মূলনীতি ও হুকুমসমূহও পেশ করেছে। আর যে শাস্ত্রের মাধ্যমে এসব মূলনীতি ও হুকুম তুলে ধরা হয়েছে, তার নাম ‘ফিকহ’। আমাদের ফিকহের ‘মুয়ামালাত’ অধ্যায়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও এর মূলনীতিসমূহ আলোচনা করা হয়েছে। ইসলাম এমন এক দ্বীন, যা মুদ্রাব্যবস্থাপনা, বাজারব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ও বণ্টনসহ অর্থনৈতিক জীবনের সকল ক্ষেত্রেই বিভিন্ন নীতিমালা পেশ করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী সভ্যতার নিজস্ব ও স্বতন্ত্র একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে।
ফিকহ ও আধুনিক অর্থনীতির ঐতিহাসিক তুলনামূলক পর্যালোচনা
ফিকহ ও অর্থনীতির মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফিকহ এমন এক জ্ঞানশাস্ত্র, যা বিগত তেরোশ বছর ধরে মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনধারাকে পরিচালনা করে আসছে। আধুনিক সময়ে মানুষের জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে ফিকহ যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারলেও মুসলমানদের জীবনের একটি বড় অংশ এখনো ফিকহের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। ফিকহ যাতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে আমাদের মাকাসিদপন্থী আলেমগণ মাকাসিদের আলোকে ফিকহকে পুনর্বিন্যাস ও নবায়ন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রকাশনা বিভাগ থেকে প্রকাশিত, প্রফেসর ড. জাসের আওদার ‘মাকাসিদের আলোকে উসূলে ফিকহের পুনর্গঠন’ বইটি পড়তে পারেন।)
অন্যদিকে আধুনিক অর্থব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দ্বীন, আইন ও আখলাক থেকে স্বতন্ত্র একটি ক্ষেত্র হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়। অর্থনীতি নামে এই স্বতন্ত্র জ্ঞানশাস্ত্রটির ইতিহাস মাত্র দুইশ থেকে আড়াইশ বছরের। বর্তমানে আমাদের সামনে অর্থনীতি নামে যে জ্ঞানশাস্ত্রটিকে তুলে ধরা হয়, তা মূলত ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ। তবে এই অর্থব্যবস্থা যে সর্বজনস্বীকৃত, বিষয়টি মোটেও এমন নয়।
মূলত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটিশ এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়ন চিন্তাধারার প্রভাবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাডাম স্মিথের রচিত An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations (১৭৭৬) গ্রন্থটি আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই অর্থব্যবস্থাকে সমগ্র মানবতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে ঘিরে অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে: পুঁজিবাদ কি মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাত ও অর্থনৈতিক চাহিদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা, নাকি এটি পুঁজিপতিশ্রেণির স্বার্থে সমাজের ওপর আরোপিত একটি অর্থনৈতিক কাঠামো?
অ্যাডাম স্মিথ ও অর্থনীতিকে আখলাক থেকে পৃথককরণ
প্রাচীন সমাজব্যবস্থায় সামাজিক সম্পর্ক মূলত নির্ধারিত হতো দ্বীন এবং দ্বীনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আখলাকের আলোকে। সেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সামাজিক স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পেত। ফলে কেউ যদি কেবল নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করতো, তাহলে দ্বীনী ও আখলাকী দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে স্বার্থপর হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
কিন্তু অ্যাডাম স্মিথ তৎকালীন প্রভাবশালী এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়ন চিন্তাধারার প্রভাবে অর্থনৈতিক বিষয়াবলিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি তুলে ধরেন যে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্বীন ও আখলাকের অধীন না থেকেও নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিসরে পরিচালিত হতে পারে। এর ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থনীতিকে দ্বীন, আখলাক ও আইন থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানশাস্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
এডাম স্মিথ তাঁর ‘অদৃশ্য হাত’ বা Invisible Hand ধারণার মাধ্যমে তুলে ধরেন যে, একজন ব্যক্তি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করলেই তা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ কিংবা আখলাকের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে না।
তবে এসব পরিবর্তনের মধ্যেও অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে আখলাকী দাবির আলোকে আইনের নির্ধারক ভূমিকা বজায় থাকার কথা ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভূমিকাও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এভাবে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসে অর্থনীতি ও আনুষ্ঠানিক তথা রূপসর্বস্ব আইনব্যবস্থা। পুঁজিপতিদের স্বার্থে প্রণীত এই আইনি কাঠামোয় মুনাফা অর্জন ও ব্যক্তিস্বার্থ সাধনের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলাই হয়ে ওঠে একমাত্র শর্ত। ফলে আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে মুনাফা অর্জন ও ব্যক্তিস্বার্থ সাধনের ক্ষেত্রে কার্যত আর কোনো আখলাকী সীমারেখা অবশিষ্ট থাকলো না।
মোটকথা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বীন, সমাজ ও আখলাকের প্রতি দায়বদ্ধতা ক্রমশ গুরুত্ব হারাতে থাকলো। ‘যারা যা করতে চায়, তাদের তা করতে দাও; যা পেতে চায়, তা পেতে দাও’, অর্থাৎ Laissez-faire (লসে-ফেয়ার) দর্শনই হয়ে উঠলো প্রধান নীতি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কেবল প্রচলিত আইনি বিধিবিধান মেনে চললেই বাজারের বিকাশ ঘটবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ভালো ও মন্দের সংজ্ঞাও নতুনভাবে নির্ধারিত হতে শুরু করলো।
আধুনিক পুঁজিবাদের সামাজিক পরিণতি
আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তাধারার প্রভাবে এমন এক ধারণার উদ্ভব ঘটে, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থকে সমাজের সামগ্রিক সম্পর্কের প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে মার্কেট বা বাজারকে সামাজিক সম্পর্কের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এক সংকীর্ণ ও হ্রাসবাদী চিন্তাধারা গড়ে ওঠে। বাজার ও ব্যক্তিস্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মানসিকতায় পারস্পরিক আস্থা, শান্তি, সামাজিক কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার মতো মৌলিক সামাজিক মূল্যবোধ এবং আখলাক উপেক্ষিত হয়। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, এই ব্যবস্থায় সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান আরও গভীর হয়ে ওঠে।
বস্তুত, অতীতের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকটের মতো কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও সম্পদের কেন্দ্রীভবনের প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এ সময় ধনীদের সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সংকট ও দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়। ফলে সম্পদের কেন্দ্রীভবনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্যও আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে মূলত দুটি ভিন্ন জীবনদর্শন বা Weltanschauung মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। একদিকে এমন এক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ ও বাজারের কার্যকারিতা প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে রয়েছে ইসলামী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দ্বীন, আখলাক, সামাজিক আদালত ও সামষ্টিক কল্যাণের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়।
ইসলামী অর্থনীতিতে ফিকহ ও আখলাকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
ইসলামী অর্থনীতিবিদগণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও ফিকহ ও আখলাকের মধ্যে কোনো ধরনের বিভাজন রয়েছে বলে মনে করেন না। ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তাধারা আইন ও আখলাক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্পদের বণ্টন ও পারস্পরিক অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করে। নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পুঁজি সঞ্চয়কে উৎসাহিত করলেও এটি পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে অবাধ অনুমোদন দেয় না।
বস্তুত, ইসলামী চিন্তাধারায় সামাজিক সম্পর্ক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দ্বীন, আইন, আখলাক ও অর্থনীতির মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। বরং একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য এই চারটি ক্ষেত্রের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক জীবনকে এসব ক্ষেত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে পরিচালনা করার নীতিই ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সামাজিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বীন, আইন, আখলাক ও অর্থনীতির মধ্যকার গভীর আন্তঃসম্পর্ক এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা নিয়ে ইবনে খালদুন তাঁর ‘আল-মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তাঁর সমাজদর্শন ও ইলমুল উমরানের আলোকে বোঝা যায়, একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। বরং সামাজিক সংহতি, আখলাক, আদালত ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফিকহুল ইকতিসাদ: ‘ইসলামী অর্থনৈতিক আইনশাস্ত্র’
ইসলামী চিন্তাধারায় ফিকহ ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে প্রায়োগিক ও কারিগরি অর্থে ‘ইসলামী অর্থনৈতিক আইনশাস্ত্র’ (ফিকহুল ইকতিসাদ, فقه الاقتصاد) ধারণাটি সামনে আসে। এই ধারণার সঙ্গে মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিকহের হস্তক্ষেপের ধরন, পদ্ধতি ও সীমা নির্ধারণের প্রশ্নটি জড়িত।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিকহের হস্তক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী হুকুম-আহকাম এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণই ইসলামী অর্থনৈতিক আইনশাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয়। মৌলিকভাবে এই শাস্ত্রকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা প্রয়োজন, যাতে তা অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু সংগঠন ও পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী অর্থনৈতিক আইনশাস্ত্রের আওতায় ইসলামী চুক্তি আইন, ইসলামী বাণিজ্য আইন ও ইসলামী কর আইনসহ আইনের বিভিন্ন শাখাকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। পাশাপাশি সাংবিধানিক অর্থনীতির (Constitutional Economics) আলোকে বাজারব্যবস্থার উপযুক্ত মডেল এবং তা পরিচালনার মৌলিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণ করাও ইসলামী অর্থনৈতিক আইনশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ফিকহ ও অর্থনীতির পারস্পরিক প্রত্যাশা এবং সম্পর্কের ভারসাম্য
ফিকহের কাছে অর্থনীতির প্রত্যাশাগুলো বিবেচনার পাশাপাশি অর্থনীতির কাছে ফিকহের প্রত্যাশাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনীতি ফিকহের কাছে প্রত্যাশা করে, ফিকহ যেন সম্পত্তির অধিকার, শ্রম ও পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি, সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আয়ের ন্যায়সংগত বণ্টন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে ফিকহ অর্থনীতির কাছে প্রত্যাশা করে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন সুদ, গারার (চুক্তিগত অনিশ্চয়তা) ও জুয়ার মতো জুলুমপূর্ণ কার্যকলাপ থেকে মুক্ত থাকে এবং ঝুঁকি ভাগ করে নেবার নীতির (Risk Sharing) ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পূরণ এবং আমানতের প্রতি বিশ্বস্ততা বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাস্তব সম্পদ ও প্রকৃত পুঁজির ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও সম্পদ ভাগাভাগির নীতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বস্তুত, ফিকহের অসংখ্য হুকুম-আহকাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেওয়ানি আইনের একটি বড় অংশের পাশাপাশি বাণিজ্য, করব্যবস্থা, কোম্পানি ও অংশীদারত্বসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রেও ফিকহী হুকুম-আহকাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।
পরিশেষে বলা যায়, ফিকহ ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। একদিকে ফিকহী হুকুম-আহকামের ব্যাখ্যা এমনভাবে করতে হবে, যাতে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক বিকাশে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও এমন অবাধ পরিসরে পরিচালিত হতে দেওয়া যায় না, যেখানে ফিকহের মৌলিক নীতিমালা উপেক্ষিত হয় কিংবা সেগুলোর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘিত হয়।
সাংবিধানিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহের বাজারব্যবস্থা নির্বাচন
অর্থনৈতিক আইনশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো বাজার (Market)। সাংবিধানিক অর্থনীতির (Constitutional Economics) দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহ ও অর্থনীতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আইন ও বিধিবিধানের আওতায় পরিচালনার ক্ষেত্রে ফিকহ কোন ধরনের বাজারব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেয়? বিষয়টি নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ফিকহ সামাজিক জীবনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বাজারের বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীর কার্যক্রমকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় আইন ও বিধিবিধানের আওতায় পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। তবে ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি পুরোপুরি অবাধ বাজারব্যবস্থা কিংবা সম্পূর্ণ সমষ্টিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থা, কোনোটিকেই এককভাবে গ্রহণ করে না। বরং উভয় ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি মিশ্র অর্থনৈতিক মডেলকে প্রাধান্য দেয়।
অর্থাৎ, একদিকে ফিকহ এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার, চুক্তির স্বাধীনতা এবং উদ্যোগ গ্রহণের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে, একই সঙ্গে এই ব্যবস্থায় সামাজিক আদালত ও সাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সুতরাং, বাজারব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ফিকহ কোনো বিশুদ্ধ লিবারেল (Purely Liberal) কিংবা বিশুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক (Purely Socialist) অর্থনৈতিক মডেলকে এককভাবে অনুসরণ করে না। বরং এমন একটি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে, যেখানে নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমার মধ্যে জাতীয়করণ ও বেসরকারীকরণ উভয়েরই সুযোগ রয়েছে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকে, উদ্যোগ গ্রহণের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করা হয় এবং একই সঙ্গে সামাজিক আদালত ও সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপটে ‘ফিকহ ও অর্থনীতি’ শাস্ত্রের ভবিষ্যৎ
আইনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (Economic Analysis of Law)-এর আলোকে ফিকহ ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফিকহের বিশ্লেষণ এখনো একটি নবীন গবেষণাক্ষেত্র। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণাসাহিত্যও গড়ে ওঠেনি। অথচ অতীতে ও সমকালীন সময়ে ইসলামী অর্থনীতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন মডেলের সামাজিক কার্যকারিতা ও দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক জীবনে ফিকহি হুকুম-আহকামের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব গভীরভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ইসলামী অর্থনীতি ও ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক ব্যাংকিং (Participation Banking) এবং অন্যান্য অর্থায়নপদ্ধতি নতুন ও ক্রমবিকাশমান, এমন যুক্তি দেখিয়ে ফিকহ ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের আলোচনায় প্রায়ই ফিকহের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে আপস করার দাবি উত্থাপিত হয়। এ ক্ষেত্রে সমাধান হিসেবে জার্মান আইনবিদদের একটি মত অনুসরণ করা যেতে পারে: ‘আইনের মৌলিক নীতি ও সামাজিক কল্যাণের লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আইনের মৌলিক নীতিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ একইভাবে আমরা বলতে পারি, ফিকহের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংঘাত দেখা দিলে অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিবর্তে ফিকহের নীতিমালাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্য কথায়, ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তায় ফিকহ ও অর্থনীতির মধ্যে কোনো সংঘাত দেখা দিলে তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ফিকহের উদ্দেশ্য, আদালত ও আখলাকী নীতিমালাকেই সর্বদা মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ফিকহের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের বিকাশ থেমে থাকবে। বরং এই বিশ্লেষণকে আরও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, অপচয় রোধ, প্রতিযোগিতার নীতিমালা নির্ধারণ, বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফিকহ ও অর্থনীতির পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা সম্ভব।


