ইসলামী শরীয়তের আলোকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

ইসলামী শরীয়তের আলোকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

“নবী (স.) যিনি তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেবেন, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করবেন এবং তাদের জন্য জীবনের ভালো জিনিস হালাল করবেন এবং খারাপ জিনিস হারাম করবেন এবং তাদের উপর থেকে তাদের বোঝা অপসারণ করেন এবং তাদের উপর থাকা শিকল খুলে দেবেন।” (কোরআন-৭: ১৫৭)

যদিও শরীয়ত শব্দের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অনুবাদ হলো ‘ইসলামী আইন’, তবু এটিও অপর্যাপ্ত। কারণ, মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠন, জায়েয ও নাজায়েজ, বাণিজ্যিক লেনদেন, আধ্যাত্মিক ও মানসিক আচার-আচরণের নিয়ম-কানুন পর্যন্ত জীবনের সকল দিক ও বিভাগই শরীয়তের আওতাভুক্ত। শরীয়তের বিধি-বিধানের অনেকগুলো অর্থনৈতিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত।

ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস হলো সুন্নত, অর্থাৎ নবী (স.) বা তাঁর সাহাবীদের কথিত বাণী ও কাজ। শরীয়তের মৌলিক উৎস থেকে জীবনের ব্যবহারিক বিষয়ে বিধি-বিধান তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করে ফিকহ।

শরীয়তের উদ্দেশ্য

শরীয়তের মূল উৎস হচ্ছে কোরআন ও সুন্নাহ। এতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য উপদেশ ও নির্দেশনা রয়েছে এবং এটি জীবনের সকল কার্যকলাপকে মোটাদাগে ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক), মুবাহ (অনুমতিপ্রাপ্ত) এবং হারাম (নিষিদ্ধ) এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করে। প্রতিটি বিভাগের মধ্যে পরিমার্জন, সূক্ষ্মতা এবং জটিলতা রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, ওয়াজিব এর মধ্যে আবার বাধ্যতামূলক থেকে শুরু করে সুপারিশকৃত পর্যন্ত ক্রমবিন্যাস রয়েছে। একইভাবে, হারাম এর মধ্যে আমরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থেকে অননুমোদিত পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসর খুঁজে পাই।

কোরআনে বলা হয়েছে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করেছি, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে তোমাদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে বেছে নিয়েছি”। (কুরআন-৫:৩)

তাই এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, মানুষের সকল কাজ ইসলামের আওতার মধ্যে পড়ে। শরীয়তের প্রয়োগকে নতুন পরিস্থিতিতে সম্প্রসারিত করাকে ইজতিহাদ বলে। মৌলিক উৎস থেকে বিধি-বিধান আহরণকে ফিকহ বলা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ইতিহাসের নানা পটভূমিতে মুসলমানরা যেসব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শরীয়তকে যেভাবে প্রয়োগ করেছেন, সেখান থেকে অনেক হুকুমের সৃষ্টি হয়েছে। আমি এই হুকুমগুলোর সমষ্টিকে ইসলামী ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করবো। এর মধ্যে অনেক বিস্তৃত ইস্যু অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে কিছু বিষয়ে তীক্ষ্ণ বিতর্ক এবং মতানৈক্য রয়েছে। বৈচিত্র ও মতানৈক্য সত্ত্বেও এটি সামগ্রিকভাবে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে মুখোমুখি হওয়া বিস্তৃত পরিস্থিতির জন্য ইসলামের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিধি-বিধানের একটি ঐকতান তৈরি করে।

ইসলামে ভিন্নমতের ক্ষেত্রে সহনশীলতার একটি ঐতিহ্যও রয়েছে, যাতে একটি সমস্যার সমাধানকল্পে একই সাথে দুটি বিরোধপূর্ণ মতামত গ্রহণযোগ্য ইসলামী সমাধান হিসেবে ধরা যেতে পারে। শরীয়ত এর নির্দেশনা মোতাবেক দুনিয়াতে আদালত ও মাসলাহাত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে (জিহাদ) নিযুক্ত হওয়া আমাদেরকে স্রষ্টার কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং আমাদের আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটাবে। এর ফলে আমরা আমাদের মধ্যকার মানবিক সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে পারবো এবং আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। শরীয়াত মানুষের বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ উভয় দিককে বিবেচনায় রাখে।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলেই কেবল সে দান গ্রহণযোগ্য হবে। উদারতার জন্য প্রশংসিত হওয়ার অভিপ্রায়, নিজেকে গরীবদের থেকে উচ্চতর বোধ করা বা অন্যকে সেজন্য অবজ্ঞা করা একজনকে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করে। দৃশ্যমান কাজ এবং নিয়‍্যাতের মধ্যে এ মেলবন্ধন ইসলামের ইতিহাসের অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণত আমাদের আলেমগণ বাহ্যিক দিক বা কাজের ধরন নিয়ে চিন্তিত এবং নিয়তের বিষয়টি আল্লাহর হাতে দেয়ার পক্ষে। এর বিপরীতে সুফীরা হৃদয় বা কলবের কাঙ্ক্ষিত অবস্থার দিকে মনোনিবেশ করেছেন, কখনও কখনও বাহ্যিক কাজকে অবহেলা করেছেন। এ দুই ধারা মাঝে মাঝে একে অপরের সাথে মতবিরোধ করেছে, আবার এমন অনেকে আছেন যারা উভয় ধারার মধ্যে সমন্বয় করেছেন। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কোনো একটি দিকের উপর একচেটিয়া মনোযোগ ভারসাম্যহীনতা এবং ক্ষতিকারক ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়।

আধুনিক অর্থনীতি এবং সাধারণভাবে আধুনিক জীবনের জটিলতা, আমাদেরকে এমন অনেক পরিস্থিতির দিকে পরিচালিত করেছে, যেগুলোর সাথে আমরা অতীতে পরিচিত ছিলাম না। সুতরাং, অর্থনৈতিক জীবনের এ নতুন জটিলতাকে মোকাবেলা করার জন্য ইজতিহাদ হলো ইসলামী অর্থনীতির (এবং সাধারণভাবে আধুনিকতার জন্য একটি উপযুক্ত জবাব তৈরি করার ক্ষেত্রেও) একটি কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়। ইজতিহাদের পদ্ধতি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট আলোচনা ও বিতর্ক চলে আসছে। আধুনিকতাবাদী মুসলমানরা মনে করেন যে, ফিকহের প্রচলিত নিয়মগুলো বর্তমান জটিলতার সাথে মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত নয় এবং মৌলিক উৎসসমূহকে আধুনিক অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সজনশীলভাবে নতুন করে ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা চান (প্রথাগত বিধানের মধ্যে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে)। অন্যদিকে, সনাতনবাদীরা মনে করেন যে, বিদ্যমান ফিকহ নতুন পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট এবং তারা এ-ও মনে করেন যে, অত্যধিক স্বাধীনতা ইসলামী শরীয়তকে সম্পূর্ণরূপে ছুঁড়ে ফেলে আধুনিকতার সাথে গা ভাসানর দিকে ধাবিত করবে।

‘শাতিবীর ফিকহ দর্শন’ নামে একটি মৌলিক গ্রন্থে মুহাম্মদ খালিদ মাসুদ একটি মধ্যম পথের প্রস্তাব করেছেন, যা একইসাথে ইসলামী ঐতিহ্যের এবং আধুনিকতাবাদীদের দাবিকৃত নমনীয়তার অনুমতি দিয়েছে। ইমাম আবু ইসহাক ইব্রাহীম আল-শাতিবী ছিলেন মুসলিম স্পেনের প্রখ্যাত আলেম ও উসূলবিদ, যিনি পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সময়ের (৮ম/১৪শ শতাব্দী) প্রতিনিধিত্ব করেন। ফিকহের ঐতিহ্যগত কাঠামো অপর্যাপ্ত মনে করে তিনি শরীয়তের অন্তর্নিহিত দর্শনকে ফুটিয়ে তোলার জন্য ইসলামী শরীয়তকে বিশ্লেষণ করেন। আল-শাতিবী উল্লেখ করেছেন যে, এটি সর্বজনস্বীকৃত মত যে, শরীয়ত সাধারণভাবে নির্বাচিত একগুচ্ছ নিয়ম-কানুনের সমষ্টিমাত্র নয়, বরং সর্বোত্তম উপায়ে মানুষের বস্তুগত এবং আধ্যাত্মিক সা’দাতের জন্য এর নকশা করা হয়েছে। এই উদার লক্ষ্যকে বিশ্লেষণ করার জন্য বিদ্যমান ঐতিহ্য ব্যবহার করে কেউ একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীয়তের বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে প্রসারিত করতে পারে। এ উদ্দেশ্যর মধ্যে রয়েছে জীবন ও সম্পত্তির সংরক্ষণ এবং বংশধরদের কল্যাণ। প্রকৃতপক্ষে, শাতিবী প্রচলিত ফিকহের সাথে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেন, যা ইসলামী শরীয়তকে নবোদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রসারিত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

শরীয়তের আরো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল বিধি-বিধানের সাথে শরীয়তের উদ্দেশ্যসমূহকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ইসলামী অর্থনীতির অনেক মূলনীতি প্রণয়ন করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ইসলামের মৌলিক উৎসসমূহে হয়তো রাজস্ব ও মুদ্রানীতি নিয়ে সরাসরি কোনো বিধান পাবো না, অন্তত ফিকহের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। যাইহোক, আমরা মৌলিক উৎসসমূহের ভিত্তিতে জানতে পারি যে, নবী (সা.) বিভিন্ন উপায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ সুগম করেছেন এবং বেকারদের জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যদি আমরা উপসংহারে পৌঁছাই যে, বেকারত্ব হ্রাস করা শরীয়তের একটি উদ্দেশ্য, তাহলে আমরা অনুমান করতে পারি যে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব ও মুদ্রানীতি ইসলামী শরীয়ত অনুসারে গ্রহণযোগ্য। একইভাবে কেউ যুক্তি দিতে পারে যে, মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীলতা ইসলামী শরীয়তের আওতার মধ্যে পড়ে। ইসলামী অর্থনীতিসহ অন্যান্য অনেক বিষয়ের অসংখ্য স্কলারগণ এই পদ্ধতির/ মেথডোলজির পক্ষে কথা বলেছেন।

সম্পত্তির অধিকার

পুঁজিবাদ এবং কমিউনিজমের মধ্যে একটি প্রধান বিরোধ ছিলো উৎপাদনের উপায় ব্যক্তিগত বা সরকারী মালিকানাধীন হওয়া উচিত কি-না তা নিয়ে। তদনুসারে, ইসলামী অর্থনীতির প্রাথমিক যুগের লেখকরা সম্পত্তির অধিকারের একটি ইসলামী তত্ত্ব বর্ণনা করতে এবং এটিকে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব থেকে আলাদা করতে অনেক সময় ব্যয় করেছিলেন। সিদ্দিকী (১৯৮০) প্রয়োজনীয় রেফারেন্সসহ এর একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন। মওদুদী (১৯৬৯) যুক্তি দেন যে, পুঁজিবাদে পুঁজিপতিদের হাতে সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়ে যায়, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং ইসলামী নীতির বিরুদ্ধ। সমাজতন্ত্র কোনো সমাধান প্রদান করে না: কেননা, বাস্তবে সবকারি মালিকানাও একটি ছোটো বা সীমিত গোষ্ঠীর মালিকানায় পরিণত হয় এবং এরা প্রায়শই পুঁজিপতিদের চেয়ে বেশি অত্যাচারী হয়; এদেরকে সরকার সে অর্থে নিয়ন্ত্রণ করে না। ইসলাম সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার অনুমতি দেয়, কিন্তু একইসাথে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত সম্পদের মালিকদের সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করে। অনেক লেখকই অনুরূপ প্রচুর গ্রন্থপঞ্জিতে অনেক সোর্স উদ্ধৃত করেছেন, যা পদ্ধতিগতভাবে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন, আকরাম খান (১৯৮৩, ১৯৯১, এবং ১৯৯৮) তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামের সাথে তুলনা করে।

স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে, ইসলামী অর্থনীতিবিদরা অন্যান্য অনেক দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পত্তির ইসলামী ধারণা সাধারণ পশ্চিমাদের থেকে আলাদা এবং এ পার্থক্য কীভাবে অনেক আর্থ-সামাজিক বিষয়কে প্রভাবিত করে। কাহফ (১৯৯৮ এ) এবং মাহমুদ এ. গুলাইদ (১৯৯১) এ বিষয়ে বিস্তারিত সমাধান এবং আরও তথ্যসূত্র দেন। UN-Habitat দ্বারা পরিচালিত একটি প্রকল্পে সাইত এবং লীম (২০০৫) দরিদ্রদের জন্য জমিতে নিরাপদ প্রবেশাধিকার প্রদানের উপায় হিসেবে ভূমি অধিকারের ইসলামী ধারণা নিয়ে গবেষণা করেন। তারা দেখতে পান যে, সম্পত্তিতে ইসলামী ধারণা প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়মের একটি পরিশীলিত বিকল্প তৈরি করে।

ইসলাম সকল সম্পদকে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে কল্পনা করে, কিন্তু একটি পুনঃবণ্টনমূলক নীতিকে সাথে নিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানার অনুমতি দান করে। ভূমির সাথে সম্পৃক্ত ইসলামী ধারণাগুলো সম্ভবত মুসলিম সমাজে ভূমি অধিকারের উদ্যোগকে সমর্থন করতে পারে এবং ভূমি প্রশাসন, ভূমি নিবন্ধন, নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব (environmental sustainability) সম্পর্কিত কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে।

আমরা এখন এ সংক্ষিপ্ত কিন্তু সঠিক নকশাটিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবো। যদিও সকল সৃষ্টি মূলত এবং চিরকালের জন্য স্রষ্টার সম্পত্তি, তিনি এগুলো মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। যে লোকেরা মুনাফা অর্জনের জন্য সম্পত্তি ব্যবহার করে তারা মালিকানা লাভ করে এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি তৈরি করে। এই ব্যক্তিগত সম্পত্তি আল্লাহর কাছ থেকে বান্দার নিকট আমানত ও পরীক্ষাস্বরূপ এবং এ ধারণাটি বর্তমান পশ্চিমা দর্শনের সাথে ইসলামের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য সৃষ্টি করে। যেহেতু সম্পত্তি একটি আমানত, তাই মালিককে অবশ্যই সম্পত্তিটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে জনসাধারণের স্বার্থকে মাথায় রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, এমন কোনো উপায়ে সম্পত্তি ধ্বংস বা ব্যবহার করা উচিত নয়, যা জনসাধারণের ক্ষতি করে। কোরআনে বিশেষভাবে এবং স্পষ্টভাবে বৈধ মালিকানার অধিকারি একজন ব্যক্তিকে সম্পদ হয়েছে (১১:৮৭)। একইভাবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদকে একটি নিজের খেয়ালখুশিমত ভোগ করার নিরঙ্কুশ অধিকার দেয়ার নিন্দা করা পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, মানুষ এটিকে অন্যের কল্যাণের জন্য বা স্বার্থপর/ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে কি-না তা দেখার জন্য। কোরআন দৃঢ়ভাবে সমাজের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করাকে উৎসাহিত করেছে এবং সঞ্চয় ও মজুদকরণকে সমানভাবে নিরুৎসাহিত করেছে (যা পুঁজিবাদী সমাজে উৎসাহিত ‘অন্তহীন সঞ্চয়’-এর বিপরীত)। ইসলামের সম্পত্তির মালিকানা তত্ত্বের এই মৌলিক বিষয়গুলো অনেক উৎস থেকে যথেষ্ট পরিমাণে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়। বিস্তারিত জানতে দেখুন কাফ (১৯৯৮ এ), তাসিন (১৯৯৮) এবং সাইত ও লীম (২০০৫)।

উপরে উল্লিখিত সম্পত্তির অধিকারের মৌলিক ইসলামী ধারণার সুদূরপ্রসারী নৈতিক ও আখলাকী ফলাফল রয়েছে। যেহেতু বিশ্ব মানবতার কল্যাণের জন্য এ বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে, তাই নির্দিষ্ট কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে মালিকানাধীন হতে পারে না, কারণ ব্যক্তিগত মালিকানা জনগণকে অভীষ্ট সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবে। বেশিরভাগ স্কলাররা মনে করেন যে, সাধারণ জমি, বন, হ্রদ, নদী এবং খনিজ সম্পদ (তেল সহ) এ বিভাগে পড়ে। সরকারকে অবশ্যই এই জাতীয় সম্পত্তিকে আমানতস্বরূপ রাখতে হবে এবং পুরো জনসাধারণকে এর থেকে উপকৃত করার জন্য ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, পানি একটি জনসম্পদ যা ঘন ঘন এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়।

অন্যায় ও নিপীড়নের একটি প্রধান উৎস হলো সম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখা। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রে অনেক ব্যক্তির বৃহদাকার জমির মালিকানা রয়েছে, কখনও কখনও এগুলো উপনিবেশকারীদের কাছ থেকে (সম্ভবত অন্যায়ভাবে) অনুদানের ফলে প্রাপ্ত সম্পত্তি, যার ফলে ইসলামী শরীয়তে সম্পত্তির অধিকার এবং এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সষ্টি হয়েছে। হামিদ হোসেইনি সমসাময়িক ইরানের প্রেক্ষাপটে একটি সাহিত্য পর্যালোচনা প্রদান করেছেন। মুফতি মুহাম্মদ শফী’ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির আলোকে ভারত ও পাকিস্তানে সম্পত্তির মালিকানার তত্ত্ব এবং বৈধতা উভয় বিষয়েই আলোচনা করেছেন। এ আলোচনাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত হলো যে, সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার ক্ষেত্রে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই, তবে সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্র প্রয়োজনে জমি পুনরুদ্ধার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যোগ্য লোকদের জরুরি প্রয়োজনে বা সামাজিক চাহিদার চাপ পূরণে অন্যায়ভাবে অধিগ্রহণ করা জমি সরকার পুনরুদ্ধার করতে পারে। সিদ্দিকী এই বিতর্কে গৃহীত প্রধান অবস্থানগুলোর রূপরেখা তুলে ধরেন। সম্পত্তি এবং বাসস্থানে নিরাপদ প্রবেশাধিকারের মৌলিক মানবাধিকার প্রদানের প্রেক্ষাপটে সাইত ও লীম (২০০৬) মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে ইসলামী শরীয়তের ভূমিকা নিয়ে গবেষনা করেন। তারা দেখতে পান যে, এটিতে অভাবীদের ক্ষমতায়ন করার এবং ভূমির অধিকার, নিরাপত্তা ও দখলের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক সমস্যার সমাধান প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে, যেগুলো সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল। তারা আরও দেখতে পান যে, মুসলমানরা শরীয়তের মূলনীতিসমূহকে সৃজনশীলতার সাথে আধুনিক সমস্যাগুলোর মোকাবেলায় সমাধান হিসেবে প্রয়োগ করার জন্য গঠনমূলকভাবে প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।

পশ্চিমা মডেল সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার আদর্শ সমাধান প্রদান করে এমন আত্মবিশ্বাস প্রায়শই প্রচলিত কাঠামোকে উপেক্ষা করার দিকে ধাবিত করে। একজন বিদেশী বিশেষজ্ঞ, ‘পশ্চিমা মডেল গ্রহণ’-কে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “স্থানীয় অবস্থা এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছু জানার প্রয়োজনবোধ না করে পশ্চিমা পদ্ধতির (মিচেলে, ২০০২)। অনুসরণ। কারণ এসব কেবলমাত্র অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে।

ঐতিহ্য, ধর্মীয় আদর্শ এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিল মিথস্ক্রিয়া থেকে উদ্ভূত হয় এবং প্রায়শই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে স্থানীয় সমস্যার সমাধানকে মূর্ত করে তোলে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে সাইত ও লীম ( ২০০৬) লেখেন যে,

” ইসলামী বিশ্বের মধ্যে জমির দখলদারিত্বের ধারণা, শ্রেণিকরণ এবং ব্যবস্থাপনা সাধারণত বহুমুখী, স্বতন্ত্র ও অবশ্যই বৈচিত্র্যময়। এই প্রবন্ধটি সমসাময়িক মুসলিম সমাজে ভূমি মালিকানার দিকে পরিচালনাকারী ইসলামী নীতিমালার সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিকাশ অনুসন্ধান করে। মুসলিম সমাজে ভূমি মালিকানার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর কাঠামোগত পরিসরের বোঝাপড়া ভূমি এবং ভূমি অধিকারের এক্সেস বৃদ্ধিতে নির্ভরযোগ্য এবং উদ্ভাবনী কৌশল/স্ট্রাটেজির ক্রমবিকাশের দিকে ধাবিত করে।” [১]

ব্যবসার ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান

বাণিজ্যের জন্য অনুমোদিত লেনদেন, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং ব্যবসার আখলাক সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, যা ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী দিক। চুক্তিভিত্তিক প্রতিশ্রুতি পূরণের সুস্পষ্ট আদেশ, চুক্তি লিখে রাখার সুপারিশ এবং বিশ্বস্ততার সাথে সাক্ষ্য দেওয়ার উপদেশ-এর উপর ভিত্তি করে ইসলামী বিধানসমূহ প্রণীত হয়েছে। মুশতাক আহমদ রচিত Business Ethics in Islam বইয়ে ইসলামের আধ্যাত্মিক লক্ষ্যের দিকে ধাবিতকারী ব্যবসার আখলাকের ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে একটি বিস্তৃত আলোচনা প্রদান করা হয়েছে, যেখানে ফেলিক্স পোমরেঞ্জ এই বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। মুহম্মদ জাকারিয়া কান্দলভি’র গবেষণাপত্রে ব্যবসার আধ্যাত্মিক দিকটা খুব ভালোভাবে উঠে এসেছে। নিম্নোক্ত কোরআনের আয়াতটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, একটি বাণিজ্যকে বৈধ করার জন্য উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ক্ষেত্রে ইনসাফ এবং সুবিচারকে সবকিছুর উপরে রাখতে হবে,

” হে ঈমানদারগণ! একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করবে না-এমনকি পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে বাণিজ্যের মাধ্যমেও নয়। ” (কুরআন-৪:২৯)

ইসলামী এবং পশ্চিমা ব্যবসায়িক আখলাকের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপীয় ধারণায়, আখলাককে ব্যক্তি ‘স্বাধীনতা’ অর্জনের উপকরণ হিসেবে দেখা হয়; স্বাধীনতাকে সম্পদ দ্বারাও প্রতিনিধিত্ব করা হয় (যা ব্যক্তিকে তার ইচ্ছা/নফসের অনুসরণ করার স্বাধীনতা দেয়)। আরও খোলাখুলিভাবে বললে, “ভালো আখলাক হলো ভালো বাণিজ্য।” বিপরীতে, আখলাক বা সৎ কর্মের সাধনা একটি ইসলামী সমাজের লক্ষ্য এবং ব্যবসা পরিচালনাও এ লক্ষ্যের অধীনস্থ। ইসলামে যেকোনো কাজের মূল্যমান তার নিয়ত দ্বারা বিচার করা হয়। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এবং পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে নাটকীয় বৈসাদৃশ্য নিম্নলিখিত হাদীস দ্বারা চিত্রিত করা যেতে পারে,

“ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে কিয়ামতের দিন তার কৃতকর্মের হিসাব নেওয়া হবে। সে বলবে যে, আমি (আপনার প্রদত্ত সম্পদ) এমন সব উপায়ে ব্যয় করেছি যা আপনার পছন্দনীয়। আল্লাহ তাকে বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি সম্পদ দান করেছো এই উদ্দেশ্যে যাতে লোকেরা তোমাকে ‘উদার’ (বা ‘পুণ্যবান’ বা ‘দানশীল’) বলবে। এবং তোমাকে তাই বলা হয়েছিলো (এবং এখানে তোমার জন্য কোন পুরস্কার নেই)।’ তারপর লোকটিকে জাহান্নামে পাঠানো হবে।”

সৎপন্থা অবলম্বন, দাতব্য কাজ এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ-এগুলোকে কোম্পানির সুনাম বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে নেয়া এবং সেজন্য ব্যবসার মূল বিষয়কে এর দ্বারা প্রভাবিত করাকে ইসলামী শিক্ষায় স্পষ্টভাবে নিন্দা করা হয়েছে। সৎকর্মকে মুনাফার অধীন হওয়া উচিত নয়। নৈতিকতাকে যদি অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এক পর্যায়ে অধিক সম্পদ উপার্জনের নিমিত্তে অনৈতিক আচরণকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ প্রবণতাকে কিছু পশ্চিমা ব্যবসার আখলাক দ্বারা চিত্রিত করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফোর্ড পিন্টোর নকশার ত্রুটির ফলে পিছনের প্রান্তের সংঘর্ষে পুড়ে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হবে জানার পরে ফোর্ড কোম্পানি হিসেব করে দেখেছে যে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফলে যে বাড়তি খরচ হবে তা মৃত্যু এবং সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পূরণের অনুমানকৃত আর্থিক খরচের চেয়ে বেশি হবে। (তাই তারা নকশার ত্রুটি দূর করেনি।)

ঘারার (একটি বড় পরিমাণ অনিশ্চয়তা বা অস্পষ্টতা) লেনদেন ইসলামে নিষিদ্ধ। সিদ্দিক আল-দারির (১৯৯৭) এই ধারণা এবং এর প্রয়োগ সম্পর্কে একটি বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, যেসব স্থানে তেলের পরিমাণ সম্পর্কে প্রচুর অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেখানে তেলের ড্রিলিং অধিকার বিক্রি করা ইসলামী শরীয়তে জায়েজ নয়।

একই কারণে, জুয়া এবং লটারি জায়েজ নয়। আতিক (২০০৭, পৃ. ৬৯৪) এর তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম স্কলারদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত হলো যে, বীমাও একই শ্রেণিভুক্ত। যাইহোক, বীমার অর্থনৈতিক উপযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে, অল্প কিছু চিন্তাবিদ এ মত দিয়েছেন যে, এ ধরণের চুক্তি ইসলামী শরীয়তের মধ্যে গ্রহণযোগ্য। অন্যরা ইসলামী শরীয়ত মেনে চলে বীমার এমন বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করেছেন এবং এটিকে তাকাফুল নাম দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী ও প্রচলিত অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্যের একটি প্রধান ক্ষেত্র হলো সুদের নিষেধাজ্ঞা। তহবিলের মালিকদের অতিরিক্ত অর্থ প্রদান অন্যায্য; কারণ এটি কোনো উৎপাদনশীল কার্যকলাপকে পুরস্কৃত করে না। এই ইস্যুতে প্রচুর পরিমাণে সাহিত্য রয়েছে। সিদ্দিকী (২০০৪) একটি সাম্পতিক সমীক্ষায় প্রচুর রেফারেন্স তালিকাভুক্ত করেছেন। ২০০১-এর একটি লেখায় আমি সুদের ক্ষতিকর প্রভাব এবং এটি নিষিদ্ধ করার সুফলগুলোর একটি বড় তালিকা তুলে ধরেছি। ইসলামী আদেশের সঠিক সুযোগ এবং এটি আধুনিক বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা তা এটি ইউরোপের সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ, যেখানে একই বিতর্ক ঘটেছে এবং নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি করা হয়েছে যা সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রযোজ্য; বিপরীত পদ্ধতিতে সমাধান করা হয়েছিল। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের শরীয়ত আপিল বেঞ্চ কর্তৃক লিখিত বাণিজ্যিক সুদ নিষিদ্ধ করার রায়টা পাঠ্যের জন্য উসমানী (১৯৯৯) দেখুন, যেখানে সুদের পক্ষে বিদ্যমান প্রধান প্রধান যুক্তিগুলো পর্যালোচনা এবং খণ্ডন করা হয়েছে। লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে-কীভাবে সুদমুক্ত এমন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আইয়ুব (২০০২), জাহের এবং হাসান (২০০১) এ বিষয়ে ব্যাপক সমীক্ষা প্রদান করেন। মূল ধারণাটি হলো যে, ঋণদাতাদের মুনাফা অর্জনের জন্য অবশ্যই ব্যবসার ঝুঁকিতে শরিক হতে হবে। সুতরাং, ব্যবসায়িক ঋণের জন্য যে জামানত নেওয়া হবে, ব্যবসায় ব্যর্থতার ক্ষেত্রে তা বাজেয়াপ্ত করা যাবে না; অর্থাৎ, আন্তোনিওর জাহাজ ডুবে গেলে শাইলক তার পাউন্ড মাংস পেতে পারে না। প্রাসঙ্গিক সাহিত্যগুলোতে ইসলামী শরীয়তের প্রায়োগিক দিক; প্রচলিত ব্যাংকিং কার্যাবলী, উপযুক্ত আর্থিক উপকরণ (financial instrument) তৈরি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মূল বিষয়টিকে ঢেকে দেয়; যেটি হলো, ইসলামী শরীয়ত ও প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জনের জন্য নয় বরং আখলাকী ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এ দিকটি সাইত ও লীম (২০০৬), এফ. আর. ফরিদি (১৯৯৪), আর. টি. নেইলর (২০০৭), আবদুল আযীয (এ.ডি.) এবং অন্যান্যরা আলোচনা করেছেন। ভাদিলো (এন.ডি.), তাসিন (২০০১) আনসারির (২০০০) মতো কিছু মুসলমান যুক্তি দেন যে, ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং আধুনিক ব্যাংকের ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা তৈরির ধারণার মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয় না।

যদিও বাণিজ্যিক ঋণ তুলনামূলকভাবে সহজে পরিচালনা করা যায়, তবুও ক্ষুদ্রঋণ, ভোক্তা ঋণ, বন্ধকী, সরকারি প্রকল্প এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ এড়িয়ে চলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। প্রতিটি পৃথকভাবে পরিচালনা করা আবশ্যক। ইতোমধ্যে সবগুলো নিয়েই কাজ শুরু হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং এবং ক্ষুদ্রঋণের সম্প্রসারণের ফিকহ অংশীদারিত্বের উপর জোর দিয়ে এবং সম্প্রদায়ের কল্যাণের পাশাপাশি শহুরে দরিদদের প্রয়োজন পূরণে সৃজনশীল সমাধান প্রদানের সক্ষমতা রাখে।

শরীয়ত দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ব্যয় করতে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সামাজিক প্রয়োজন পূরনের উদ্দেশ্যে ব্যয় করতে উৎসাহিত করে, তবে সংরক্ষণ বা আরও অর্থ উপার্জন এর জন্য ব্যবহার করাকে নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনের অসংখ্য আয়াতে এবং রাসূল (স.)-এর হাদীসে এর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, “…তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তারা কতটা ব্যয় করবে। বলুন, ‘যা আপনার প্রয়োজনের বাইরে”। (কুরআন-২:২১৯)

এভাবে শরীয়ত অভাবগ্রস্তকে ঋণ দিতে উৎসাহিত করে এবং শোধ করার জন্য চাপ না দেয়া, অতিরিক্ত সময় দেওয়া বা প্রয়োজনে ঋণ মওকুফ করে দেওয়ার উপদেশ দেয় (কোরআন ২:২৮০)। অভাবগ্রস্থদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমাজে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলার জন্য এই সকল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিপরীতে, ব্যক্তিসত্ত্বাহীন ও আত্ম-স্বার্থ ভিত্তিক লেনদেন, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি, তার অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে জামানত এর উপর প্রতিষ্ঠিত সুদ-ভিত্তিক ঋণব্যবস্থা ঋণদাতা এবং ঋণগ্রহীতার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে। সুদকে শরীয়ত অনুমোদিত সার্ভিস চার্জ দ্বারা প্রতিস্থাপন করার জন্য ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করার মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তের বিধান প্রতিষ্ঠিত হলেও এর রূহ অনুপস্থিত থাকবে। বর্তমানে সকল ইসলামী সমাজে বিভিন্ন ধারার মধ্যে সাধারণ মানুষের সমাজে বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগযোগ্য আবার ইসলামী শরীয়তের রূহকে ধারণ করে এমন উপযুক্ত সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা চলছে।

 শ্রম

তোসিফ আযিদ (২০০৫) শ্রমের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জরিপ করেছেন। টি. এগামি (১৯৯০) এবং এ আর এ রহমান (১৯৯৫) শ্রমকে ইবাদত হিসেবে আলোচনা করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন পুজিবাদী ব্যবস্থায় সৃষ্ট অশান্তি ও বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে কীভাবে শ্রমের এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজের জন্য অর্থবহতা ও প্রেরণা তৈরি করতে পারে। এছাড়াও কারেন ফাইফার (২০০৬) ইসলামী শ্রম আইন এবং কীভাবে তা মুসলিম বিশ্বের সাম্প্রতিক উন্নয়নের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তার উপর একটি বিস্তৃত সমীক্ষা প্রদান করেন। তিনি দেখতে পান যে, শ্রম সম্বন্ধে যেসব বিধান রয়েছে-সেসব এবং মিশর, পাকিস্তান ও সৌদি আরবে যেভাবে তা কার্যকর করা হয়েছে, তা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এটি আধুনিক পশ্চিমা অর্থনীতির কেন্দ্রীয় প্রতিযোগিতামূলক ধারণার বিপরীত। ম্যানিকাস (১৯৮৭) যুক্তি দিয়েছেন যে, পশ্চিমে একটি সমবায় মতাদর্শ (যাকে তিনি polis বলেছেন) থেকে একটি প্রতিযোগিতামূলক (societas নামে অভিহিত) মতাদর্শে উত্তরণ আধুনিকতার অন্যতম প্রধান রূপান্তর।

মানবজাতির সাথে সম্পৃক্ত সকল ক্ষেত্রের মতো শ্রম সম্পর্কিত ইসলামী নীতিমালাগুলো পরস্পর সম্পর্কিত এবং একে অপরের পরিপূরক অধিকার; এবং এটাকে দায়িত্বের সমষ্টি হিসেবেও পেশ করা হয়েছে। প্রয়োজনের সময় সমাজের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার অধিকার একজন ব্যক্তির নিজের জন্য তার সর্বোত্তম চেষ্টা করার দায়িত্ব থেকে উদ্ভূত হয়; (তাসিন, ১৯৯৮)।

“ইসলামের শ্রমনীতি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যে, অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা জায়েজ নয়। শিরক এর সাথে সম্পৃক্ত কোনো কাজ থেকে প্রাপ্ত মজুরি হারাম। কাজের জন্য এ প্রেরণা ম্যাক্স ওয়েবারের (১৯০৫) প্রোটেস্ট্যান্ট কাজের নীতি থেকে আলাদা। শ্রমিকদের সাথে মর্যাদা ও সম্মানের সাথে আচরণ করা উচিত এবং নিয়োগকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তাদের সামাজিক অবস্থানের (বিশেষ করে, পোশাক, বাসস্থান এবং খাদ্য) ভিত্তিতে সমতা বজায় রাখা উচিত”।

বিপরীতে, পুঁজিবাদী সমাজে একজন নিয়োগকর্তা সাধারণত শ্রমিকদের চেয়ে উচ্চ মর্যাদা পেয়ে থাকেন। পুঁজিবাদের সমালোচনায় পুঁজিপতিকে একজন শোষক হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি কোনো কাজ না করেই আর্থিক পুরস্কার পান। ইসলামী মতাদর্শে নিয়োগকর্তা এবং কর্মচারীকে একটি কাজের ভেতরেই বিভিন্ন ধরনের/স্তরের কাজে নিযুক্ত হিসেবে দেখে, কিন্তু সকলকে সমান সম্মান দেওয়া হয়। অর্থাৎ ইসলামে উদ্যোক্তার দক্ষতা যথাযথ স্বীকৃতি পায়, কিন্তু কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। শ্রমিকদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ, তাদের সময়মতো বেতন প্রদান, সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ না করানো বা তাদের শোষণ না করা এবং তাদের সাথে কোনোভাবে দুর্ব্যবহার না করার উপর অনেক জোর দেওয়া হয়েছে। কাজের পরিবেশ দুর্ঘটনা থেকে নিরাপদ হওয়া এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক না হওয়া উচিত। শ্রমিকদের এই ন্যূনতম অধিকারের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে, যেখানে কিছু আধুনিক লেখক ইসলামী শিক্ষায় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য অনেক সুবিধা-সহ শ্রমিকদের অধিকারের আরও বিস্তৃত বিবরণ খুঁজে পেয়েছেন। তবে এগুলো বিতর্কিত। আব্দুল আজিজ (১৯৯২) যুক্তি দিয়েছেন যে, সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কর্মী নিয়োগ করা প্রয়োজন, এমনকি যদি সেই ব্যক্তিটি সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীরও হয়।

ইসলামে মুনাফা ভাগাভাগি পদ্ধতির একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি রয়েছে, যদিও ভাগাভাগি করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কিছু বিতর্ক রয়েছে। ইকবাল এবং মিরাখোর (২০০৪) যুক্তি দিয়েছেন যে, শ্রম-মালিকানাধীন সংস্থা ইসলামের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া উচিত। অন্যদের মতামত হলো যে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য মডেল পছন্দের ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তা অনুমোদিত। যদিও বিশদ বিষয়ে বিরোধ রয়েছে, তবুও এই নীতিতে কোনো মতবিরোধ নেই যে, ইসলামী আদর্শের জন্য একটি ফার্মকে তার কর্মীদের সাথে ভালো সময় ভাগাভাগি করে নেওয়া প্রয়োজন, ঠিক যেমনভাবে ফার্ম তার খারাপ সময়ে শ্রমিকদের ত্যাগ স্বীকার করার আহ্বান জানায়।

রাসুল (স.)-এর প্রথম স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী। ইসলামের ইতিহাস জুড়ে অনেক মুসলিম মহিলা সম্পত্তির মালিক হয়েছেন এবং অর্থ উপার্জনের অধিকার পেয়েছেন। ইসলামী শরীয়ত তাদের উত্তরাধিকারের হকও দিয়েছে, যে অধিকার ইউরোপীয় নারীরা অতি সম্প্রতি অর্জন করেছেন।

ইরান সম্পতি একটি আইন পাশ করেছে, যাতে নারীরা গৃহস্থালির কাজ (শিশু যত্ন, রান্না ইত্যাদি) করার জন্য ক্ষতিপুরণ পাওয়ার অধিকার রাখে বলে দাবি করা হয়েছে-বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্বামীকে এগুলো হিসাব করে অর্থ প্রদান করতে হবে; (পোয়া, ১৯৯৯ এবং মোঘাদম, ২০০৪)। এটি নবী (সা.)-এর আদর্শ, যিনি গহস্থালির কাজ করবেন এবং সন্তানের দেখভাল করবেন, তাকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, যদিও কিছু আলেম ইরানী ব্যাখ্যার সাথে মতবিরোধ করেছেন।

ফাইফার (২০০৬) এই অধ্যায়ে আলোচিত বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করেন এবং মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানে শ্রম আইনের পরিমণ্ডলে তত্ত্ব ও শ্রমব্যবস্থাপনা কীভাবে কার্যকর করা হয়েছে, তার উপর একটি বিশদ গবেষণা করেন। এই ধরনের গবেষণায় যথারীতি তিনি দেখতে পান যে, এসব দেশে শ্রমব্যবস্থাপনা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ইসলামী শরীয়তের তত্ত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কারেন ফাইফার (২০০১) দেখান যে, মিশরের ইসলামী সংস্থাগুলো আসলে অ-ইসলামী সংস্থা, যাদের বেশি লাভ হওয়া সত্ত্বেও তারা কম মজুরি দিয়ে থাকে। যাইহোক, তবে এটা সত্য যে আদর্শ সর্বদাই নীতিমালাকে প্রভাবিত করে থাকে, যদিও বাস্তববাদী চিন্তা ও মানুষের ব্যর্থতা সেই আদর্শকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করতে পারে।

 

টীকাঃ

[১] বিস্তারিত জানতে দেখুন ‘ইসলামী অর্থনীতি: পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকল্প প্রস্তাবনা’ গ্রন্থটি।

অনুবাদঃ নাজিয়া তাসনিম

 (লেখাটি প্রফেসর ড. আসাদ জামান কর্তৃক রচিত ও নাজিয়া তাসনিম কর্তৃক অনুবাদকৃত ‘ইসলামী অর্থনীতি: পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকল্প প্রস্তাবনা’ গ্রন্থ হতে সংগৃহীত)

৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান সমকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। পাকিস্তানে তার জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। আধুনিক অর্থনীতির গাণিতিক কাঠামো, উন্নয়ন তত্ত্ব এবং সামাজিক বাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক তার বৌদ্ধিক সাধনার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি আধুনিক মূলধারার অর্থনীতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তা নতুন মোড় নেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে আধুনিক অর্থনীতি বহু ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক সত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সভ্যতাগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি অর্থনীতিকে কেবল সম্পদ বণ্টনের কারিগরি বিদ্যা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও নৈতিক দায়িত্বের আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষত International Institute of Islamic Economics-এ তার দীর্ঘ একাডেমিক জীবন ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সমকালীন উন্নয়ন অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং বিকল্প ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তার প্রবন্ধ ও গবেষণায় আধুনিক অর্থনীতির জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা, উপনিবেশিক মানসিকতা এবং মানবকল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রফেসর ড. আসাদ জামান এমন এক চিন্তক, যিনি অর্থনীতিকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার আলোকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।
Picture of প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান সমকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। পাকিস্তানে তার জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। আধুনিক অর্থনীতির গাণিতিক কাঠামো, উন্নয়ন তত্ত্ব এবং সামাজিক বাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক তার বৌদ্ধিক সাধনার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি আধুনিক মূলধারার অর্থনীতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তা নতুন মোড় নেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে আধুনিক অর্থনীতি বহু ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক সত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সভ্যতাগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি অর্থনীতিকে কেবল সম্পদ বণ্টনের কারিগরি বিদ্যা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও নৈতিক দায়িত্বের আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষত International Institute of Islamic Economics-এ তার দীর্ঘ একাডেমিক জীবন ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সমকালীন উন্নয়ন অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং বিকল্প ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তার প্রবন্ধ ও গবেষণায় আধুনিক অর্থনীতির জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা, উপনিবেশিক মানসিকতা এবং মানবকল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রফেসর ড. আসাদ জামান এমন এক চিন্তক, যিনি অর্থনীতিকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার আলোকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top