ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (আল কুরআন-৫:৩)

ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাবার একটি উপায়, এটি নিজেই একটি লক্ষ্য নয়।[১] পুঁজিবাদের একটি সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্য হলো, সম্পদের অন্বেষণ এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে সংজ্ঞায়িত করার একটি মাপকাঠি হিসেবে সম্পদের ব্যবহার করে তারা; (আরিঘ ও ওয়েবার, ১৯৭৭: অধ্যায় ১.২) ইসলামী অর্থনীতিবিদগণ এই সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মওদূদী (১৯৬৯, পৃ. ৩৬) লিখেছেন যে, “অর্থনীতি বোঝার ক্ষেত্রে অসুবিধা এবং জটিলতা দেখা দেয় কারণ,…অর্থনৈতিক সমস্যা, যা মানব অস্তিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর সমস্যার একটি অংশ, তাকে অন্যান্য সমস্যা থেকে আলাদা করে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ প্রবণতা শেষ পর্যন্ত এমন পরিমাণে বৃদ্ধি পায় যে, অর্থনৈতিক সমস্যা মানব অস্তিত্বের কেন্দ্রীয় সমস্যা হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় ভুলটি প্রথমটির চেয়েও বড় ছিলো।”

অন্যান্য অনেক লেখক কিছু প্রচলিত অর্থনীতিবিদদের সরলীকৃত অনুমানের সমালোচনা করেন, বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সবকিছুর উর্দ্ধে স্থান দেয়া এবং সকলের জন্য কল্যাণ অর্জনের উপায় হিসেবে দেখার বিষয়টি। উদাহরণস্বরূপ, চাপড়া (১৯৯৩, পৃ. ৬) লিখেছেন: “maximization of total output একটি মুসলিম সমাজের লক্ষ্য হতে পারে না।…এর সাথে অবশ্যই… আধ্যাত্মিক সুস্থতা… ন্যায়বিচার এবং আদালতের দাবি পূরণ করতে হবে।”

ইসলামী প্রতিষ্ঠান, রীতিনীতি এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিত সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা পরবর্তীতে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করার জন্য মুসলমানদের প্রচেষ্টার ধর্মীয় সূচনাবিন্দু তুলে ধরা হয়েছে এই অধ্যায়ে। এটি ইসলামী শিক্ষার উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি সাধারণ নীতি গঠন করে এবং এর মেথডোলজিক্যাল প্রয়োগ রয়েছে যা সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। ইসলামী শিক্ষার বিশদ ব্যাখ্যা যেহেতু এ বইয়ের মূল আলোচ্য বিষয় নয়, তাই আলোচনাটি পরবর্তী অধ্যায় বোঝার জন্য পাঠকের জন্য যতটুকু অত্যাবশ্যক বলে মনে করি, ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মৌলিক ইসলামী অর্থনৈতিক নীতির বিশদ এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ আলোচনা উর্দুতে সেওহারভি (১৯৩৮, ২০১০) এবং তাসিনে (২০০১) পাওয়া যায়, কিন্তু এগুলো অনুবাদ করা হয়নি।

 

মানুষ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মানুষ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি গতিশীল এবং জটিল। এটা স্বীকৃত যে, মানুষের মধ্যে লোভ এবং অন্যান্য মৌলিক আকাঙ্খা বিদ্যমান, কিন্তু মানবতার সারমর্ম হলো, এসব মন্দ গুণগুলো দ্বারা নিজেকে পরিচালিত না করা এবং একটি উচ্চতর লক্ষ্য ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনার পথ বেছে নেওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে:

“মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল”। (কুরআন-৩:১৪)

ইসলাম মানুষকে নফসের দাসত্ব থেকে বের করে এনে উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের দিকে ধাবিত করে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের এ রূপান্তরটিই সমগ্র পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। কোরআন জোর দিয়ে বলে যে, মানুষের মধ্যে ভালো এবং মন্দ উভয়েরই প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম আকৃতিতে। অতঃপর আমরা তাকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিলাম”। (কুরআন-৯৫:৪,৫)

জীবনের উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টির সেরা, এমনকি ফেরেশতাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা অর্জনের জন্য রূহকে আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চতর অবস্থানের দিকে রূপান্তরের জন্য সংগ্রাম করা। এ সম্ভাবনা প্রতিটি মানুষের মধ্যে বিদ্যমান; এই ক্ষেত্রে, আল্লাহর কাছে তার সব বান্দাই সমান। আধুনিক নিওক্লাসিক্যাল অর্থনৈতিক তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষের ধারণার সাথে এই মতামত সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ধারণা অনুসারে, মানুষ শুধুমাত্র স্বার্থপরতা এবং লোভ দ্বারা পরিচালিত এবং অন্যদের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। আমরা ইতোমধ্যে পশ্চিমে এই মতামতের ঐতিহাসিক উৎস সম্পর্কে আলোচনা করেছি, যা পদার্থবিদ্যায় সফল পদ্ধতির অনুকরণ করার প্রচেষ্টা থেকে উদ্ভূত হয়েছিলো। ইসলামী মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ মানুষদেরকে হোমোস লেবেল দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন লেখকের দ্বারা নিওক্লাসিক্যাল অর্থনৈতিক তত্ত্বের হোমো ইকোনমিকাসের বিপরীত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, হোসেইনি (১৯৯২), কাহফ (১৯৯৬ খ), মুর্তজাভি (২০০৪), এবং জামান (২০২১) দেখতে পাবেন।

নিও-ক্ল্যাসিকাল অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুসারে আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিদের মধ্যে প্রতিযোগিতার উপর ভিত্তি করে সমাজ পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ইসলামী অর্থনীতিতে সমাজ পরিচালিত হয় অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। একটি অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতির জন্য আমাদের জানতে হবে যে, উপরে উল্লেখিত দুটি তত্ত্বের মধ্যে কোনটি অভিজ্ঞতাগতভাবে বেশি সঠিক। “মানুষ কি স্বার্থপর নাকি পরস্পর সহযোগী?” এটি জন ও. লেডইয়ার্ড (১৯৯৫) এর সার্বজনীন পণ্যের বিষয়ে মানব-আচরণের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি সমীক্ষার অন্তর্গত একটি বিভাগের শিরোনাম। তিনি উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, মানুষ এর একটিও নয়। বরং, অল্পসংখ্যক মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে পরস্পরকে সহযোগিতা করে এবং একটি বড় সংখ্যক সর্বদা স্বার্থপর থাকে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ প্রদর্শন করে।

ইসলাম এ ইস্যুতে একটি সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেয় এবং মনে করে যে, এ প্রশ্নটিই সঠিক নয়। প্রতিটি মানুষেরই সাধু হওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু এমনকি সাধুদেরও রয়েছে আবেগ এবং প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা। উপরন্তু, মানুষ মূলত স্বাধীন, তাই তাদের অতীত তাদের ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করে না। সবচেয়ে বড় পাপীও একজন সাধুতে পরিণত হতে পারে এবং এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে। এ নমনীয়তা এবং মানুষের আচরণের অপরিহার্য স্বাধীনতার কারণে পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্ব নির্মাণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সমাজকে পাঠ করার জন্য উপযুক্ত নয়। তার পরিবর্তে, যেহেতু মানুষের আচরণ প্রত্যাশা ও সামাজিক নিয়মে সাড়া দেয়, তাই আমরা যে ধরনের সমাজে বাস করতে চাই, তা বেছে নিতে আমরা স্বাধীন। যদি আমরা এ ধারণাটি প্রচার করি যে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থপর এবং এই ধরনের স্বার্থপর আচরণ সর্বোত্তম সামাজিক ফলাফলের দিকে পরিচালিত করে, তাহলে মানুষ স্বার্থপর আচরণ করতে শিখবে। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সকল শিশু তার ফিতরাতি ধর্মের (ইসলাম) উপর জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু যদি তারা সেই স্বাভাবিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তার কারণ শৈশবকালীন শিক্ষা/প্রশিক্ষণ, যা তাদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে প্ররোচিত করে। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে উঠে আসে যে, অর্থনীতিবিদদের দাবির বিপরীতে ইসলাম দাবি করে, সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং সমাজপন্থী আচরণ মানুষের ফিতরাতি বৈশিষ্ট্য। জাহন ওয়াক্সলার (১৯৯২) এর মতে, “সাধারণত শিশুদের মধ্যে অন্যকে সাহায্য করা, যেকোনো কিছু ভাগাভাগি করে নেয়া, শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য ও মৌখিক সহানুভূতি প্রদান, অন্যকে রক্ষা করা, অন্যের প্রতি হৃদ্যতা বোধ করা এ প্রবণতাগুলো দেখা যায়”।

‘মানব পুঁজি’, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে বর্তমান সময়ে উৎপাদন প্রক্রিয়ার কাঁচামাল (input of productivity) হিসেবে মানুষকে তুলে ধরে। এটি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের বিকাশই যাবতীয় তৎপরতার মূল লক্ষ্য এবং সেখানে সম্পদের উৎপাদন ইত্যাদি কেবলমাত্র সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায়। বিভিন্ন ধরণের গবেষণা থেকে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, উন্নয়ন প্রচেষ্টায় সামগ্রিক সম্পদ অর্জনের পরিবর্তে মানব জীবনের উপর দৃষ্টি দেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, সেন (১৯৯৯) যুক্তি দেন যে, উন্নয়ন হলো মানুষের স্বাধীনতা এবং সক্ষমতার বিকাশ। বারি (২০১১) বর্ণনা করেছেন কীভাবে উন্নয়নের অভিজ্ঞতা মাহবুবুল হককে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রবৃদ্ধিমুখী থেকে মানবমুখী করার দিকে পরিচালিত করেছিলো,

“অনেক দশকের উন্নয়নের পরে, আমরা স্পষ্টভাবে পুনরায় আবিষ্কার করেছি যে, জনগণই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য এবং মাধ্যম দুটোই।”

স্ট্রাইকিং ইস্টার্লিন (২০১০) প্যারাডক্স দেখায় যে, সম্পদের বৃদ্ধি মানুষের কল্যাণ এবং সুখের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে না, যা অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিমূলে (assumption) আঘাত করার সাথে সাথে ইসলামী চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। গাজ্জালীর (১৯৯৪) মতামত হলো, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নয়নের মূল লক্ষ্য মানুষের মধ্যে সম্ভাবনার বিকাশ। অর্থনৈতিক কার্যকলাপের লক্ষ্য হিসেবে আধ্যাত্মিক উন্নতির উপর দৃষ্টি দেওয়ার ফলে কীভাবে অর্থনৈতিক তত্ত্বের আমূল পরিবর্তন হবে তা ২০১৯ সালে আমার একটি লেখায় তুলে ধরা হয়েছে।

 

সম্পদ এবং স্বাধীনতা

উচ্চতর লক্ষ্যের সাথে অর্থনীতির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যগুলোকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তার মাধ্যমে কীভাবে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে-কোরআনে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট এবং ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে (২৮:৭৭); অর্থাৎ সম্পদকে আখেরাতের জন্য ব্যবহার করতে হবে (আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করা)। যেহেতু সম্পদ আমাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে দেওয়া হয়েছে, তাই অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের উদার হওয়া উচিত। এই নীতি অন্যান্য ধর্মের দ্বারা প্রচারিত নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যদিও তা প্রচলিত অর্থনীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু সম্পত্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত, তাই আমরা আমাদের ইচ্ছামত তা ব্যবহার করতে পারি না। যারা এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন, তারা দাবি করেন যে তারা তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের সম্পদ অর্জন করেছে এবং তাই তাদের ইচ্ছামত এটি ব্যয় করার অধিকার রয়েছে।

“তারা বললো, ‘হে শুয়াইব, তোমার সালাত কি তোমাকে এই নির্দেশ প্রদান করে যে, আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের ইবাদাত করত, আমরা তাদের ত্যাগ করি? অথবা আমাদের সম্পদে আমরা ইচ্ছামত যা করি তাও (ত্যাগ করি?)। “(কুরআন-১১:৮৭)

বিশেষ করে, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং দুনিয়াবী সুখ-সম্পদ উপার্জন অর্থনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। কামনা-বাসনার অনুসরণ এবং বিলাসবহুল জীবনধারার অনুসরণ উভয়কেই কোরআন নিন্দা করে। কোরআন প্রদর্শিত জীবনপদ্ধতির পেছনে সমাজের অর্থনৈতিক কল্যাণ অর্জন মুখ্য উদ্দেশ্য নয়; তা শুধুমাত্র একটি অতিরিক্ত সুবিধা। বরং, এ জীবনপ্রণালী মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে আসবে, আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে এবং নিজের মধ্যকার সম্ভাবনার বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে তাকে কামালিয়াত অর্জনের দিকে ধাবিত করবে।

নিকট অতীতে বস্তুগত সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত সাধনার ফলাফল নিয়ে বহু সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। যদিও অনেক ভিন্ন ভিন্ন পন্থা আবির্ভূত হয়েছে, তবুও সবগুলোতেই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মানুষের ভূমিকা এবং গুরুত্বের উপর জোর দেয়া হয়েছে (বস্তুগত সম্পদ বা পুঁজির সাথে সম্পর্কিত)। সম্ভবত অর্থনীতিবিদদের প্রচলিত মতামত থেকে সবচেয়ে আমূল প্রস্থান করেছেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন। তিনি ‘স্বাধীনতা রূপে উন্নয়ন’ (Development as Freedom) এর কথা বলেছেন। সেন মানুষের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নকে মূল্যায়নের পক্ষে মতামত দেন, যা মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। যাইহোক, সেনের মতামতের সাথে আশরাফ আলী থানভী (১৯৩১) একটি মৌলিক বিপরীত মত পেশ করেন। তিনি মনে করেন যে, প্রকৃত স্বাধীনতা কেবলমাত্র তারাই অর্জন করতে পারে, যারা নিজেদের স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে। অন্যরা কেবল তাদের অহংকার/আকাঙ্ক্ষার দাস এবং প্রকৃতপক্ষে মোটেও স্বাধীন নয়।

 

নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির বিপরীত নীতিসমূহ

যদিও অন্যান্য পশ্চিমা চিন্তাধারা এবং ভিন্নধর্মী অর্থনীতিবিদদের বিস্তৃত মতামত রয়েছে, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা তাদের বাজার বিশ্লেষণকে মুনাফালোভী সংস্থাগুলোর মধ্যে গলাকাটা প্রতিযোগিতার উপর ভিত্তি করে দাঁড় করায়। ইসলামের প্রাণ হলো সম্প্রদায়ের বিনির্মাণ এবং তা পরিচালনার জন্য প্রচেষ্টারত/সংগ্রামরত মানুষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। এই বৈসাদৃশ্যটি নীতিগতভাবে তিনটি মাত্রায় তুলে ধরা যেতে পারে, যা ইসলামী এবং নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। যথা:

১. সাধারণভাবে, ইসলাম পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির উপর জোর দেয় এবং এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদ ও উপকরণ ব্যয় করে। এটি মুক্তবাজারের নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ভিশনের বিপরীত, যেখানে এন্টারপ্রাইজগুলো এবং মানুষেরা সর্বাধিক সম্পদ অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে।

২. ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর সমাজের স্বার্থ প্রাধান্য পায়। ইংল্যান্ডে অবরোধের মাধ্যমে সম্প্রদায়ের স্বার্থের উপর ব্যক্তিগত স্বার্থকে এবং গরিবদের উপর ধনীদের প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে জনসাধারণের বিরোধ মীমাংসা করা হয়েছিলো। প্রথম দিকের ইসলামী যুগে একই বিরোধের মীমাংসা করা হয়েছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থায়, সাধারণের চারণভূমি বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তিদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে।

৩. অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে কর্মের জন্য ইচ্ছাশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পজিটিভিস্ট পদ্ধতিগত ভিত্তি পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর প্রতি অবিশ্বাসের দিকে নিয়ে যায়। ইতিবাচকতা/পজিটিভিজম পরামর্শ দেয় যে, শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণযোগ্য ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে আত্মিক প্রশান্তি ও অনুপ্রেরনার কোনো স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে, ইসলামী চিন্তায় সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সকল কর্ম থেকে উদ্ভূত অনুপ্রেরণা এবং আত্মিক প্রশান্তি, যা প্রচলিত পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্বে স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত।

আমি পরবর্তী বিভিন্ন আলোচনায় দেখাবো, কীভাবে এই বৈপরীত্য বিভিন্ন আঙ্গিকে অর্থনৈতিক বিষয়ে ইসলামী এবং নিওক্লাসিক্যাল বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য করে।

 

বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ বনাম প্রতিশ্রুতিশীল ভূমিকা

রুবেন (১৯৯৫) বর্ণনা করেছেন যে, কীভাবে ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং সেইসাথে বিজ্ঞানের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তনের ফলে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চরিত্র গঠনের নৈতিক মিশন বাদ দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায়, সমাজবিজ্ঞানীরা বেকনিয়ান বিজ্ঞানীর বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করতে গিয়ে একটি সমৃদ্ধ পৃথিবী বিনির্মাণের জন্য কাজ করা কর্মী এবং সংস্কারকদের ভূমিকাকে পরিত্যাগ করেছিলেন (রুবেন, ১৯৯৫; অধ্যায় ৫)। দুর্ভাগ্যবশত, নেলসন (২০০১) এবং অন্যরা মন্তব্য করেছেন, সমাজবিজ্ঞান শুধুমাত্র সেই পরিমাণে প্রাসঙ্গিক, যতটুকু মানুষের লক্ষ্য এবং মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কিত। সমাজবিজ্ঞানকে মূল্যবোধমুক্ত করার প্রচেষ্টা বিভিন্ন ছদ্মবেশে কেবল রাজনৈতিক এবং নৈতিক প্রতিশ্রুতির মুখোশের দিকে নিয়ে যায়। জামান (২০১২) দেখিয়েছেন যে “অভাব”-এর মৌলিক ধারণাটি বেশ কয়েকটি আদর্শিক রায়ের সাথে সম্পর্কিত।

দৃশ্যত, অকার্যকর গণিতের আড়ালে লুকিয়ে থাকার কারণে মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিকে বিচার করা হয়নি। অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা একটি রূপকথার জগতের কথা উল্লেখ করেন, যা সম্পূর্ণরূপে সামাজিক অনুভূতিহীন, স্বার্থপর এবং নির্জীব মানুষের দ্বারা পরিপূর্ণ। তাদের তৈরি এই পৃথিবীতে প্রত্যেকেই ছোট-খাটো প্রতিটি সম্ভাবনার পেছনে ছোটে, যেখানে কোনো লেনদেন, যোগাযোগ বা পরিবহন খরচ নেই; প্রত্যেকে নিজের স্বার্থের জন্য শেষ পয়সা পর্যন্ত গণনা করে এবং নিজের স্বার্থের বাইরে একদন্ডও পা বাড়ায় না। অর্থনৈতিক নীতি শুধুমাত্র এই কল্পিত ব্যক্তিদের সম্পদের উপর তাদের প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করা হয়, যা কখনোই বাস্তবসম্মত নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই কাল্পনিক জগতকে আদর্শরূপে তুলে ধরা হয়েছে এবং প্রচার করা হয়েছে; এ আদর্শের অনুকূলে দুনিয়াকে পরিবর্তন করার জন্য আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ প্রবর্তন ও তা কার্যকর করা হয়েছে। এটি বাস্তবে কখনোই অর্জন করা যাবে না, এটি বোঝার পরেও এই অর্থনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীরা দুনিয়াকে তাদের স্বপ্নের কাছাকাছি আনার প্রচেষ্টা থেকে নিরুৎসাহিত হয় না।

পশ্চিমা অর্থনীতির নিজেকে পজিটিভ/ইতিবাচক বলে দাবি করার কারণে ইসলামী অর্থনীতি ইতিবাচক নাকি আদর্শিক প্রায়ই এ বিতর্কটি সামনে আসে। পূর্ববর্তী আলোচনার আলোকে আমি দৃঢ়ভাবে বলব যে, এর কোনটিই নয়, বরং ইসলামী অর্থনীতি পরিবর্তনশীল। এটি সমাজকে এবং সমাজের সকল ব্যক্তিকে একটি আদর্শের দিকে পরিবর্তন করতে চায়। পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতিকে ডিস্টোপিয়ান দেখানোর মাধ্যমে ইসলামী অর্থনীতি ‘ইউটোপিয়ান’ এই অভিযোগের জবাব দেয়া হয়েছে। উপরন্তু, ইতিহাস আমাদের দেখায় যে ইউটোপিয়া এবং এর স্বপ্নদ্রষ্টারা প্রায়শই মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছেন। যেহেতু অতীতে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই সমাজ সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অবাস্তব হওয়ার অর্থে ‘ইউটোপিয়ান’ নয়। উদাহরণস্বরূপ, রবার্ট এস. লোপেজ (১৯৭৬) ইসলামী সভ্যতার গৌরবময় যুগে ইসলামী শরীয়ত দ্বারা পরিচালিত বাণিজ্যের একটি সুবিশাল এবং সমৃদ্ধ বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের দলীল তুলে ধরেন।

সকল মানুষের প্রতি সমবেদনা ও উদ্বেগ এবং তাদের উন্নতির জন্য প্রতিশ্রুতিশীল ভূমিকা ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা। নিজের ও সমাজের উন্নতির জন্য এবং নিজের নফসকে অতিক্রম করার জন্য সংগ্রাম হলো সবচেয়ে বড় জিহাদ। উপরন্তু, এটি ইসলামী শিক্ষার অংশ যে, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে দুনিয়াকে বিনির্মাণ করার সংগ্রাম থেকেই জ্ঞানের সৃষ্টি হয়, “তোমাদের মধ্যে যারা সংগ্রাম করে, আমরা অবশ্যই তাদের পথ দেখাই, এবং দেখো! আল্লাহ ভালোর সাথে আছেন” । (আল কুরআন-২৯:৬৯)

ইসলামী অর্থনীতি যে রূপান্তরমূলক এ ধারণাটি প্র্যাক্সিসের মার্কসবাদী ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ-মার্কসবাদীরা বিশ্বকে যতটা পরিবর্তন করতে চায়, বিশ্বকে এতোটা পাঠ করতে চায় না। তবে একটি মূল পার্থক্য আছে। মুসলমানরা আদালত, ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদির জন্য সংগ্রাম করে, কারণ এ ধরণের সংগ্রাম তার ভেতরে একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর নিয়ে আসবে। সুতরাং, প্রাথমিকভাবে সংগ্রামের লক্ষ্য বস্তুগত নয়, বরং আধ্যাত্মিক। মার্কসবাদীরা বস্তুগত ফলাফলের উপর জোর দেন এবং তাদের মতে আদর্শ, দর্শন ও ভিশন মানবতার বস্তুগত সম্ভাবনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

ইসলাম এটিকে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে এবং আমাদেরকে বস্তুজগতের উপর আধ্যাত্মিকতার প্রাধান্য ও কর্তৃত্বের কথা বলে। মানব ইতিহাসে এমন অনেক ভিশনারি পুরুষদের নজির রয়েছে, কোনো আপাত বস্তুগত উপায় ছাড়াই যারা দুনিয়াকে বদলে দিয়েছেন। এর একটি প্রধান উদাহরণ হলো পয়গাম্বর (সা.), যিনি মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিলেন শুধুমাত্র আরব উপদ্বীপের মানুষকে একটি মহান দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে; তাদের বস্তুগত জীবনপ্রণালীতে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এনে।

মুসলমানদের জন্য ইসলামী শরীয়ত, ফিকহ বা উসূলে ফিকহ হলো মৌলিক উৎসসমূহ থেকে আইন প্রণয়নের সহায়ক, এটি মূলনীতিসমূহকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের জন্য একটি নির্দেশনা দেয় এবং ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করে, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সকল কার্যকলাপ পরিচালনা করা উচিত। শরীয়ত প্রদত্ত ইসলামী অর্থনীতির সামগ্রিক কাঠামো চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।

টীকাঃ 

[১] ‘ইসলামী অর্থনীতি: পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকল্প প্রস্তাবনা’ গ্রন্থের অধ্যায় ২.১, মুফতী মুহাম্মদ শফীর উদ্ধৃতি। 

অনুবাদঃ নাজিয়া তাসনিম

(লেখাটি প্রফেসর ড. আসাদ জামান কর্তৃক রচিত ও নাজিয়া তাসনিম কর্তৃক অনুবাদকৃত ‘ইসলামী অর্থনীতি: পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকল্প প্রস্তাবনা’ গ্রন্থ হতে সংগৃহীত) 

৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান সমকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। পাকিস্তানে তার জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। আধুনিক অর্থনীতির গাণিতিক কাঠামো, উন্নয়ন তত্ত্ব এবং সামাজিক বাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক তার বৌদ্ধিক সাধনার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি আধুনিক মূলধারার অর্থনীতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তা নতুন মোড় নেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে আধুনিক অর্থনীতি বহু ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক সত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সভ্যতাগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি অর্থনীতিকে কেবল সম্পদ বণ্টনের কারিগরি বিদ্যা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও নৈতিক দায়িত্বের আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষত International Institute of Islamic Economics-এ তার দীর্ঘ একাডেমিক জীবন ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সমকালীন উন্নয়ন অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং বিকল্প ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তার প্রবন্ধ ও গবেষণায় আধুনিক অর্থনীতির জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা, উপনিবেশিক মানসিকতা এবং মানবকল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রফেসর ড. আসাদ জামান এমন এক চিন্তক, যিনি অর্থনীতিকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার আলোকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।
Picture of প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান

প্রফেসর ড. আসাদ জামান সমকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। পাকিস্তানে তার জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। আধুনিক অর্থনীতির গাণিতিক কাঠামো, উন্নয়ন তত্ত্ব এবং সামাজিক বাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক তার বৌদ্ধিক সাধনার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি আধুনিক মূলধারার অর্থনীতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তা নতুন মোড় নেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে আধুনিক অর্থনীতি বহু ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক সত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সভ্যতাগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি অর্থনীতিকে কেবল সম্পদ বণ্টনের কারিগরি বিদ্যা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও নৈতিক দায়িত্বের আলোকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষত International Institute of Islamic Economics-এ তার দীর্ঘ একাডেমিক জীবন ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সমকালীন উন্নয়ন অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং বিকল্প ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তার প্রবন্ধ ও গবেষণায় আধুনিক অর্থনীতির জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা, উপনিবেশিক মানসিকতা এবং মানবকল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রফেসর ড. আসাদ জামান এমন এক চিন্তক, যিনি অর্থনীতিকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার আলোকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top