পশ্চিমা ইউরোপীয়দের অতীত ইতিহাস এবং জায়নবাদের সাথে তাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বরাবরই শোষন, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা সর্বদাই ছিলো আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন। মুসলমানদের সাথে হয় নিজেরা সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে, নতুবা খ্রিস্টানদের দ্বারা ক্রুসেড পরিচালিত করেছে। কিন্তু, সময়ের সাথে সাথে তাদের আগ্রাসনের ধরনে পরিবর্তন এনেছে। ক্রুসেড শব্দটি এখন আর খ্রিস্টানদের মাঝেই শুধু সীমাবদ্ধ নেই, বরং আরো বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিমাদের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড প্রণয়ন
বর্তমান বিশ্বে পশ্চিমারা আবারো নতুন উদ্যমে আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড প্রণয়ন করেছে, যার শুরুটা হয়েছিলো ১৮০০ সালের দিকে, ইউরোপীয় খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের হাত ধরে। এভাবেই তারা তাদের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেডের সূচনা করে। তাদের কার্যক্রমকে আরো ত্বরান্বিত করতে ১৮৩৮ সালে বায়তুল মাকদিসের মাটিতে ব্রিটিশ কাউন্সিল গঠন করে। এর দুই বছরের মাথায় সেই ভূমিতে ১৮৪০ সালে কৌশলে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে। এসবকিছুই ছিলো মূলত ১৮৯৮ সালের জায়নবাদী আন্দোলন সূচনার পথটাকে মসৃণ করার নিমিত্তে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই সময় থেকেই জায়নবাদী আন্দোলনের সাথে ইউরোপ আমেরিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাদের এই আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড দুইভাবে কার্যকর করার প্রচেষ্টা দেখিয়েছে। যথা,
১. বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং তার নিরাপত্তা রক্ষা ও নিশ্চিত করা। মূল উদ্দেশ্য, ঐ অঞ্চলে “ল্যাটিন বায়তুল মাকদিস রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠা।
২. আরব ভূখণ্ডগুলোকে জোরপূর্বক দখলের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করানো এবং ভূখণ্ডের প্রতিটি অঞ্চলেই স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা। বৃটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা হবার আগে পরে আরব অঞ্চলকে আয়ত্তাধীন করার জন্য অদম্য প্রচেষ্টা চালানো। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২১ সালে পূর্ব জর্ডান ইমারত প্রতিষ্ঠা, যেটাকে পরিপূর্ণতা প্রদান করা হয়েছে ১৯৪৬ সালে হাশেমি জর্ডান রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অথচ, ঠিক তার তিনবছরের মাথায় ১৯৪৮ সালে বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়া, তাদের ঘটনা প্রবাহ এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয়ের সাথে আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড প্রণয়ন বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।
প্রথমত, ১৯১৪-১৯১৮ সাল, প্রায় চার বছরেরও অধিক সময় ধরে চলমান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাবলির সাথে জায়নবাদী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। যেমন,
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পূর্বমুহূর্তে ১৯১৭ সালে পৃথিবীবাসী আকস্মিক বেলফোর ডেক্লারেশনের সাথে পরিচিত হয় এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বৃটেনের পক্ষ সামরিক শক্তি প্রদানের আশ্বাসও দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, “বেলফোর ডেক্লারেশন”কে “ব্রিটিশ ডেক্লারেশন” এবং “বৃটেনের দায়িত্ব অর্পণ চুক্তি” নামেও ডাকা যায়।
২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর বৃটেনের সাথে কৃত চুক্তিটির ক্ষতিপূরণ/দাবি/পুরস্কার স্বরূপ বৃটেনের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২১ সালে পূর্ব জর্ডান ইমারত প্রতিষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয়ত, ১৯৩৯-১৯৪৫ সাল, দীর্ঘ ছয়টা বছর যাবত পৃথিবীর উপর শক্তি প্রদর্শনের নৃশংসতম উপমা উপস্থাপন শেষে আরববিশ্বের বিভিন্ন রাজ্য, রাষ্ট্র ও দেশ গঠন/প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করা হয়। যেমন,
১. ১৯৪৬ সালে হাশেমি জর্ডান রাজ্যের প্রতিষ্ঠা।
২. ১৯৪৮ সালে বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা।
স্বাধীন আরব ভূখণ্ডে বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ঝরেছে অসংখ্য প্রাণ। কান্না আর রোনাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিলো আকাশ বাতাস। সংঘটিত হয়েছে কয়েকটি যুদ্ধ। ১৯৪৯ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুসনি যাইম, ১৯৫২ সালে মিশর, ১৯৫৮ সালে ইরাক, ১৯৬২ সালে ইয়েমেন, ১৯৬৯ সালে লিবিয়া এবং ১৯৭০ সালে হাফেজ আল আসাদের সাথে সংঘটিত যুদ্ধগুলো প্রতিনিয়তই জায়নবাদী আন্দোলন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয়, তারা তাদের লক্ষ্য পূরণে কতোটা হিংস্র এবং নৃশংস হতে পারে।
আবার, বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড প্রণয়ন এবং জায়নবাদী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হাসিলে আরব ভূখণ্ডকে কৌশলে করায়ত্তের বিষয়টিতেও তারা সফলতার পরিচয় দিচ্ছে। যেমন, তাদেরই মদদে ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭১ সালে একইসাথে বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থান ঘটে।
আরব ভূখণ্ডে পরিচালিত তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক কার্যক্রমের গোড়া ও মূলভিত্তি
মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভূখণ্ডে পরিচালিত তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক কার্যক্রম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম শাম ও মিশরের কিছু অংশ নিয়ে বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার অন্যতম একটি কারণ হলো, যেকোনো মূল্যে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভূখণ্ডের মধ্যকার একতাকে ধূলিসাৎ করা।
১৯৯১ সালে প্রকাশিত বই এবং ২০০২ সালে লিখিত আমার একটি প্রবন্ধে আমি প্রমাণ করে দিয়েছি যে,
“আরব ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মূলত পশ্চিমা ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা। এটি যায়নবাদী আন্দোলনেরও পূর্বের একটি পরিকল্পনা। পরবর্তীতে, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভূখণ্ডে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে ইহুদিদের জাতিরাষ্ট্র গঠনের বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করে সেটার সহায়তা নেওয়া হয়। অন্যভাবে বলা যায়, ইহুদি রাষ্ট্র গঠন মূলত এই অঞ্চলে বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্যতম একটি মাইলফলক।”
পশ্চিমাদের সুদূরপ্রসারী এই পরিকল্পনার সূচনা অষ্টাদশ শতকের শেষ এবং উনবিংশ শতকের শুরুর সময়কাল থেকে। এ’সময়টায় খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও মিশনারীরা ইহুদিদেরকে তাওরাতের বাণী অনুযায়ী তাদের আকাঙ্ক্ষিত ভূমিতে পুনরায় ফেরত পাঠানোর জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করতে থাকে। পশ্চিমা ক্রুসেডীয় লক্ষ্য পূরণে ১৮৩৮ সালে উইলিয়াম ইয়ং-এর নেতৃত্বে বায়তুল মাকদিসের ভূমিতে প্রথমবারের মতো পূরণে বৃটিশ কাউন্সিল গঠন করা হয়। মূলত, তারা গোপনীয়তা ও কৌশলের সাথে উসমানীয়দের বৈদেশিক সহায়তার বিষয়টিকে ব্যবহার করে। ফ্রান্স যদি ল্যাটিন ও ক্যাথলিকদের এবং রাশিয়া যদি রোমের অর্থোডক্সদের নিরাপত্তা নিশ্চায়নে সহায়তা করতে পারে, তাহলে সিরিয়া, লেবানন, থেসালোনিকি এবং ফিলিস্তিনে বসবাসরত দ্রুজ, আরমানী, প্রোটেস্টান্টদের নিরাপত্তা নিশ্চায়ন বৃটেনও করতে পারবে। আর যদি এমন জনসংখ্যার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যায়, তৎকালীন বৃটিশ এই কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী ফিলিস্তিন, গ্যালিলি, সাফেদ এবং টাইবেরিয়াস অঞ্চলে সর্বোচ্চ নয় হাজার সাতশত-জনের বসতি স্থাপন ছিলো।
বৃটিশ বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশের এই পরিকল্পনা বা ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ছিলো শাম এবং মিশরের মাঝে বিভক্তিকরণ। মূলত, ১৮৪০ সালে বৃটেন-সহ বেশকিছু মোড়ল রাষ্ট্রের মাঝে এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। এরপর ১৮৪০ থেকে ১৯৪৮ সাল, দীর্ঘ ১০৮ বছর যাবত মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভূমিতে তাদের চিরচেনা “ডিভাইড এন্ড রুল” নীতি প্রয়োগ করে। আরব ভূখণ্ডে ঔপনিবেশিক নীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার উদ্দেশ্যে তারা ধাপে ধাপে এসব অঞ্চলে ইহুদি জনবসতি স্থাপন করে, মিশর ও শামের মধ্যকার সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরাতে শুরু করে এবং উসমানীয়দের সাথে মিশরের দূরত্ব সৃষ্টি করতে থাকে। যেনো এসব কার্যক্রম তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থের সাথে মিলে যায় এবং এই অঞ্চলটি তাদের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৮৪০ এবং ১৮৪১ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লর্ড পালমারস্টন এবং ইস্তাম্বুলে রাষ্ট্রদূতের মধ্যকার পত্রবিনিময় ব্রিটিশদের কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করে। ফলশ্রুতিতে, উসমানীয় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরেই ব্রিটিশ সুরক্ষার অধীনস্ত একটি আঞ্চলিক এলাকা সৃষ্টি হওয়া এবং আরব অঞ্চলের মধ্যকার রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধক হওয়ার সুযোগ উপস্থাপিত হয়। তবে, তারাই আবার তাদের স্বার্থেই বিভিন্ন আরব দল গঠন করেছে, একটা পর্যায়ে গিয়ে তা আবার রাজ্য, রাষ্ট্র ও দেশ হিসেবে আকৃতি লাভ করেছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লর্ড পালমারস্টনের তত্ত্ব ও কার্যক্রম ছিলো মূলত নিজেদের জন্য শক্তিশালী একটি মিত্র খুঁজে বের করা এবং ব্রিটিশ সুরক্ষার অধীনস্থ ইহুদি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে ১৮৮২ সালে ব্রিটিশদের মিশর অর্জন মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভূখণ্ডে তাদের ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করদ হয়ে থাকে।
সাম্রাজ্যের এমন যুদ্ধাবস্থার সমস্যা সমাধানে ইউরোপের সাতটি দেশের সমন্বয়ে শক্তিশালী একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয় বৃটেন। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, কৃষি, ভূরাজনীতি বা তেলসম্পদ—ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উক্ত কমিটি গঠন করা হবে। পরবর্তীতে, যাদের নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয়, তাদের কয়েকজন হলেন,
১. প্রফেসর জেমস, The Decline of the Roman Empire বইয়ের লেখক।
২. লুই ম্যাডেলিন, The Emergence of Napoleon’s Empire and its demise বইয়ের লেখক।
এরপর, ১৯০৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধাণমন্ত্রী ক্যামবেল বাটারম্যান-এর নিকট উক্ত কমিটি কর্তৃক প্রণীত রিপোর্টটি পেশ করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়,
“পশ্চিমা ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আশু বিপদের মূল উৎস হলো এই আরব রাজ্যসমূহ এবং তার জনগণ। অতএব, এসব বিপদ দূরীকরণে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যেমন,
১. আরব অঞ্চলকে সর্বদা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ব্যতিব্যস্ত রাখতে হবে।
২. পশ্চিমা নেতৃত্বে বশীভূত করার প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে।
৩. বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে তাদের অঞ্চলকে খণ্ডবিখণ্ড করতে হবে।
৪. তাদের ইতিহাস, শক্তি, চিন্তা ও একতাকে সর্বদা প্রশ্নবিদ্ধ করবে, এমন একদল লোক গঠন করতে হবে।
৫. আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সে অঞ্চলে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী একটা বাফার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা অতীব প্রয়োজন। কেননা, সেই অঞ্চলে আমাদের সকল ধরনের কার্যক্রমকে অতিদ্রুত বাস্তবায়ন করতে একটি বাফার রাষ্ট্রই সহায়তা ও সহযোগিতা করতে পারবে।”
বলার অপেক্ষা রাখে না, এই প্রতিবেদনটি পশ্চিমাদের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড বাস্তবায়নে বারুদের ভূমিকা পালন করে। তাদের কার্যক্রমকে অবিশ্বাস্য রকমের গতিময় করে তোলে। অতএব, এটাও সত্য যে, ইহুদি জাতিরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা ঔপনিবেশিক চিন্তার মাঝে শক্তিশালী একটা অবিচ্ছেদ্য বন্ধন রয়েছে। বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল আরব ভূখণ্ডের মাঝে বসেই সে অঞ্চলকে চূড়ান্তরূপে ধ্বংসের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পূর্বেও বর্ণনা করা হয়েছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কার্যতই তারা আরব ভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলেছে। তাদের ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, শাম থেকে বের করে পূর্ব জর্ডান ইমারত প্রতিষ্ঠা। এরপর, পূর্ব জর্ডান ও ফিলিস্তিনকে সিরিয়া ও লেবানন থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
ফিলিস্তিনের ভূমিতে বাফার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু হয় বেলফোর ডেক্লারেশন এবং ব্রিটিশ-ফরাসি চুক্তির মাধ্যমে। ইতোমধ্যে ১৯০৬ সাল থেকেই তারা নিজেদের মধ্যে মিশর ও ফিলিস্তিন অঞ্চলকে নিজেদের মতো করে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছিলো। ১৯২০ সালে তারা পুনরায় নিজেদের মধ্যে ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের সীমানা নির্ধারণ করে নেয়। ১৯২২ সালে তারা ফিলিস্তিন এবং পূর্ব জর্ডানের সীমানা নির্ধারণ করে। ১৯২২-১৯২৩ সালে সে সব সীমানা চূড়ান্তরূপে বাস্তবায়ন করে। অথচ, ইতোপূর্বে ফিলিস্তিন অঞ্চলের সাথে শুধু মিশরেরই সীমানা ছিলো। কিন্তু, তাদের অন্যায়, স্বার্থপর ও পরিকল্পিত ভাগাভাগির পরে ফিলিস্তিনের সীমানা এসে দাড়ায় ২৭,০০৯ বর্গকিলোমিটারে। পরবর্তীতে, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর বাফার রাষ্ট্র ইজরায়েল ফিলিস্তিনের ৭৭℅ ভূমি, ২০,৭০০ বর্গকিলোমিটার দখল করে নেয়। সাথেসাথেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি প্রদান করে। এবং পরের বছর স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইজরায়েল জাতিসংঘে যোগদান করে।
আরব ভূখণ্ডে পরিচালিত তাদের কার্যক্রমের উদ্দেশ্য
আরব ভূখণ্ডে পরিচালিত তাদের কার্যক্রমের উদ্দেশ্যকে কয়েকটা পয়েন্টে এভাবে উপস্থাপন করা যায়। যথা,
১. বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েলকে রক্ষা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চায়ন।
২. আরবের প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার।
৩. আরব ভূখণ্ডের রাজ্য, রাষ্ট্র ও দেশগুলোর মাঝে সমস্যা সৃষ্টি করে ভাঙ্গন তৈরি করা এবং তাদের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থাকে জিইয়ে রাখা।
৪. আরব ভূখণ্ডে নতুন কোনো শক্তির উত্থানকে রুখে দেওয়া।
৫. আরব-সুন্নী বিপ্লবকে সর্বদা দমিয়ে রাখা।
উদ্দেশ্যসমূহ কি এখনও বলবৎ?
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না বা এটাতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিক ক্রুসেড প্রণয়ন এবং জায়নবাদী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যসমূহ চিরন্তন। তাদের আগ্রাসী মনোভাব তাদেরকে কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হতে দেবে না। পৃথিবীতে অন্যায়, জুলুম, অবিচার, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে তারা অবিস্মরণীয়। তাদের মনোভাব কেমন বা তাদের উদ্দেশ্যর স্থায়িত্ব কতটুকু—আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির স্বরূপ উন্মোচন করা হোক।
প্রথম— বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার হীরক জয়ন্তী উপলক্ষে ২০০৮ সালে লন্ডনের ফিঞ্চলিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বৃটেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গর্ডন ব্রাউন বলেন, “ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা ছিলো বিংশ শতাব্দী উল্লেখযোগ্য সর্বশ্রেষ্ঠ একটি ঘটনা।”
দ্বিতীয়— বেলফোর ডেক্লারেশনের ১০০ বছরের মাথায় ২০১৭ সালে বৃটেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট টেরেসা মে বলেন,
“বেলফোর ডেক্লারেশনের বিপরীতে কারো প্রতি আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। বরং ইসরায়েল রাষ্ট্রের মতো একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আমরা বরাবরই গর্ববোধ করি। উক্ত অঞ্চলের সাথে ইহুদি জাতির ধর্মীয় শক্তিশালী ভিত্তি এবং ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততার কারণে সে অঞ্চলে ইহুদি জাতির জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিলো সময়ের দাবি। বিশেষ করে, দীর্ঘ একটা সময়ের অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করার পর এটা তাদের মৌলিক অধিকার যে, তাদের নিজস্ব একটি ভূখণ্ড থাকবে।”
তৃতীয়— ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের তিন মাস্টারমাইন্ডের একজন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জোস মারিয়া আযনার ১৭-৬-২০১০ তারিখে লন্ডন টাইমস পত্রিকায় একটি কলাম লেখেন, যার শিরোনাম ছিলো,
“ইসরায়েলকে সহায়তা করুন, নতুবা তাদের পতনে আমাদের পতন অনিবার্য”
এই প্রবন্ধে তিনি লেখেন,
“মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থির এবং ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে ইসরায়েল হলো আমাদের প্রথম রক্ষাকবচ। তেলের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্য আমাদের শক্তি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। আবার এই অঞ্চলটি চরমপন্থার বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। পশ্চিমের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান সুনিশ্চিত করায় জায়নবাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। অতএব, মধ্যপ্রাচ্যে যদি জায়নবাদী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে, তাহলে ইসরায়েলের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে, ফলস্বরূপ আমরাও চিরতরে হারিয়ে যাবো। ইতিহাসের এই সময়ে এসে আমরা মানি অথবা না মানি, এটা সত্য যে, পশ্চিম, জায়নবাদ এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব এখন একই সূঁতায় গাঁথা।”
এর কিছুদিন পূর্বে, একই বছরের মে মাসের শেষ দিনে, ইজরায়েল-পশ্চিম সম্পর্ক সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্যারিসে আয়োজিত একটা অনুষ্ঠানে বলেন,
“ইসরায়েলের অধিকার ধ্বংসের প্রক্রিয়া বন্ধ করা শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়, বরং বিষয়টি ইসরায়েল এবং সমস্ত পশ্চিমা দেশগুলির জন্যও অত্যাবশ্যক। কারণ, ইসরায়েলের পতন হলে আমাদের পতন অনিবার্য হয়ে পড়বে।”
উল্লেখ্য, এটি ছিলো সেই দিন, যেদিন তুর্কী জাহাজ ফ্রিডম ফ্লোটিলা গাজায় যাবার প্রাক্কালে জায়নবাদ কর্তৃক সামরিক আক্রমণের শিকার হয়।
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি জন বাল্টন, ইতালীয় সিনেট অব রিপাবলিকের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্সেলো পেরা এবং বৃটেনের হাউস অব লর্ডসের মেম্বার এন্ড্রো রবার্টস। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাদের এমন কার্যক্রম এবং বক্তব্য পৃথিবীর ভবিষ্যতকে অবধারিতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
চতুর্থ— এবার বলতে হয়, আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কথা, যিনি ধর্মীয় দিক থেকে ক্যাথলিক খ্রিস্টান। ১৯৬৫ সালে ইতিহাস ও রাষ্ট্রেবিজ্ঞানে অনার্স এবং ১৯৬৮ সালে আইনে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। ১৯৭৩-২০০৯ সার পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসের ছয়বারের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত বারাক ওবামার সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবার তাঁর জীবনের ওপরে তাঁর স্ত্রীর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, যিনি আবার ইহুদি ধর্মাবলম্বী। এসবের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা-র উপর তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রশংসনীয়। পাশাপাশি, বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রেও তিনি নজির স্থাপন করেছেন। কিছু উদাহরণ দেখা যাক,
১. ১৯৮৬ সালে তিনি বলেন, “যদি ইসরায়েলের অস্তিত্বই না থাকতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তার মার্কিনি শান্তি-নীতি প্রণয়ন করতে পারতো না।”
২. এপ্রিল ২৩, ২০১৫ তারিখে বলেন, “যদি আজ ইসরায়েল না থাকতো, তাহলে হয়তো আমাদেরকে এমনই আরেকটি রাষ্ট্র তৈরি করতে হতো।”
৩. ২০১৭ সালের এক বক্তব্যে বলেন, “ইসরায়েল হলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিতে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি। ইসরায়েল ব্যতীত একবার মধ্যপ্রাচ্য কল্পনা করে দেখুন তো? ঐ অঞ্চলে তখন কয়টা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করতে পারতো? আমাদের কতজন সৈন্য তখন তাদের ভূমিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতো?”
৪. ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় ২০১৭ এর আরেকটি বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমার বাবা আমাকে বলতেন, জায়নবাদী আন্দোলনের একজন অগ্রসেনানী হবার জন্য ইহুদি হওয়া কখনও শর্ত নয়। আমার পিতার এই বক্তব্য আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি, তাই আমি নিজেও একজন জায়নবাদী। ইসরায়েল মূলত সমগ্র দুনিয়ায় ইহুদিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”
জানুয়ারি ১, ২০২১ তারিখে ইসরায়েল থেকে প্রকাশিত ইহুদি পত্রিকা মায়ারিভ বাইডেন প্রশাসনে কর্মরত ইহুদিদের নাম প্রকাশ করেছিলো। এরমধ্যে এককজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন, এন্থনি ব্লিনকেন। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। তাঁর স্ত্রী ইভান ওবামা প্রশাসনের পর এখন বাইডেন প্রশাসনেও কর্তব্যরত। মার্কিন এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২২ সালে ত্রৈমাসিক ওয়াশিংটন পত্রিকায় “Winning the war of Ideas” শিরোনামে প্রবন্ধ লেখেন। তিনি ও তাঁর পরিবার বিশ্বাস করেন, বর্তমান এই সময়ে সামরিক শক্তি ও সামর্থ্য ব্যতীত ডিপ্লোম্যাসি সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর। বারাক ওবামার সময়ে তিনি জো বাইডেনের সাথেই কাজ করতেন। ইতোপূর্বে ২০০৩ সালে ইরাকে চালানো আগ্রাসনে তাঁর ভূমিকা ছিলো অনবদ্য। এমনকি বর্তমানে, বাইডেন প্রশাসনে থেকে ইরাক নিয়ে তাঁর তত্ত্ব হলো, ইরাককে কুর্দী, শিয়া ও সুন্নী—এসবে বিভক্ত করে তাদেরকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে হবে। কিন্তু, আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মার্কিন কংগ্রেসে এই তত্ত্বটি গৃহীত হয়নি।
২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারিতে মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে এন্থনি ব্লিনকেন পবিত্র ভূমিতে আমেরিকান দূতাবাসের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। কেননা, তাঁর মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ, সেজন্য জেরুজালেমের মাটিতেই আমেরিকান দূতাবাস স্থায়ী হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। ইতোপূর্বেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়েও বাফার রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখায় তিনি প্রশংসিত হন।
অতএব, এটা সত্য যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বের সময় বায়তুল মাকদিস যতটুকু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলো, জো বাইডেনের সময় তাঁর বিভিন্ন বিবৃতি, অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনের কার্যক্রম এটাই প্রমাণ করে যে, বায়তুল মাকদিস আরো কঠিন সমস্যায় পড়েছিলো। অপারেশন আল আকসা তুফানের পরবর্তী সময়ে গাজায় চালানো আমেরিকা ও ইসরায়েলের নৃশংসতা তারই প্রমাণ বহন করে।
অনুবাদঃ মিফতাহুর রহমান


