তরুণদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের মধ্যে নিজেদের ভেতরে এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিসরে যে পরিবর্তন ঘটবে, সেই পরিবর্তনের প্রতি দ্রুত আগ্রহী হওয়া এবং তার সাথে তাল মেলানোর জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চালানো একেবারেই অস্বাভাবিক বা বিস্ময়কর কিছু নয়। কারণ মানুষের মর্যাদার প্রতীক ‘আমানত’ বহনের যোগ্যতা এবং সময়ের প্রবাহ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা-উভয়ই তরুণদের মধ্যে বিদ্যমান। যে সমাজ তার তরুণদের প্রকৃত মূল্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না, সে সমাজ অবধারিতভাবে পতনের দিকে ধাবিত হয় এবং অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে পারে না। ছাত্রজীবনে তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের আকল এবং চিন্তার নবায়ন, অর্থাৎ ‘আকল’-কে নতুনভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি। এর মূল কারণ হলো, সে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে এ চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারলেই সমাজ গভীর অন্ধকার থেকে জীবনের আলোর দিকে এগিয়ে যাবে।

পোশাক যেমন জরাজীর্ণ হয়ে যায় আকলও তেমনিভাবে পুরাতন হয়ে যায়।  তবে আকলের পুরাতন হওয়া মাত্রাগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন হয়। এর প্রাথমিক স্তর হলো-তার শক্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কিন্তু পরক্ষণেই আবার দ্রুততার সাথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষমতা ফিরে পাওয়া। এটা হলো উন্নত সমাজগুলোর অবস্থা। তবে এ স্তরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হলো- আকলী শক্তির দীর্ঘকাল যাবৎ স্থবির হয়ে থাকা। শুধু তাই নয় এটা এমন পর্যায়ে পৌঁছা যে, তার পুনর্জাগরণের আশা পর্যন্ত হারিয়ে যায়। অন্যান্য সমাজের অবস্থা অনেকাংশেই এরকম। যুগে যুগে এ অবস্থার উত্তরণের জন্য চিন্তাশীল তরুণরাই এগিয়ে এসেছে। তারা যেখানেই থাকুক না কেন, চেষ্টা ও সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজে বিরাজমান এই বুদ্ধিবৃত্তিক জীর্ণতাকে (যা সমাজভেদে ও সময়ভেদে ভিন্ন হয়) দূরীভূত করেছে ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করেছে।

মুসলিম উম্মাহর ওপর যে সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত পশ্চাৎপদতা আপতিত হয়েছে, তার মূল কারণ হলো চিন্তার জীর্ণতা এবং জ্ঞানসন্ধানীদের মধ্যে বিস্তার লাভ করা অলসতা ও উদাসীনতা। ‘আমরা কেন পিছিয়ে পড়লাম, আর অন্যরা কেন এগিয়ে গেলো?’ যখনই কেউ এই স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নটি উত্থাপন করে, তখনই একের পর এক উত্তর আসতে থাকে এবং মতামতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এ উত্তর ও মতামতগুলোও পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য এত গভীর যে, মতামত প্রদানকারী এসব মানুষদের দেখে মনে হয় যেন তাঁরা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বা একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নন। যে বিদেশি চিন্তা ও সংস্কৃতির দ্বারা তারা প্রভাবিত, সেখানকার বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতাকে অনুকরণ করতে গিয়ে তারা নিজেরাই বিভাজিত হয়ে পড়েছে। উত্তরের কারণে যে অশোভন বিভাজন (মতভেদ) দেখা দিয়েছে, তার আংশিক কারণ স্বয়ং প্রশ্নটির ধরনও হতে পারে। কারণ প্রশ্নটির বাক্যগঠন এমন প্রকৃতির, যা অর্থকে সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট করে তোলে। কারণ এই বাক্যটি থেকে এমন ধারণা পাওয়া যেতে পারে যে, আমাদের বর্তমান পিছিয়ে পড়ার কারণগুলো যেন তাদের পূর্বের পশ্চাৎপদতার কারণগুলোর মতই, আর আমাদের অগ্রগতিও সম্পূর্ণভাবে তাদের অগ্রগতির মতো হওয়া উচিত। এ কারণে কেউ কেউ মনে করেছেন যে, নিজের ব্যক্তিত্ব ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যের সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বে আত্মবিলয় না ঘটালে উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। আর এভাবেই তারা এক অদ্ভুত প্যারাডক্সে পতিত হয়েছেন।

তাদের মতে, পরম দাসত্ব স্বীকার না করলে কোনো উন্নতি বা অগ্রগতি অর্জন করা যায় না। এ ধরনের চিন্তাধারা থেকে প্রণোদিত (অনুপ্রাণিত) হয়ে তারা বিলম্ব না করেই এমন সব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প ও বিশ্বদর্শন নির্মাণে লিপ্ত হয়েছে, যা আমাদের শিকড়হীন, ঠিকানাহীন এক ধরনের সাংস্কৃতিক ‘ভূত’-এ পরিণত হওয়ার আহ্বান জানায়। অন্যদিকে, কেউ কেউ আবার মনে করেছেন যে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য (তুরাস)-এর ভেতর থেকেই এমন কিছু উপাদান বেছে নেওয়া সম্ভব, যা আমাদের অন্যদের মতো হয়ে ওঠাকে সহজতর করবে; আর এ পথেই অগ্রগতি অর্জন করা যেতে পারে। এরাও অন্যদের মতোই সমানভাবে এক প্যারাডক্সে পতিত হয়েছে। সেটি হলো-অন্যদের মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা ছাড়া কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তারাও এমন সব প্রকল্প ও চিন্তাধারা বিকাশে উদ্যোগী হয়েছে, যা আমাদেরকে পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন মানসিক সত্তায় পরিণত হওয়ার আহ্বান জানায়।

একটি দাসসুলভ আনুগত্যের দিকে, অন্যটি অন্ধ অনুকরণের দিকে – এই দুই ভয়ংকর আহ্বান নিয়ে চিন্তা করতে করতে এবং তাঁদের চিন্তাগুলো উম্মতের সন্তানদের মধ্যে যে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাগত দীনতার সৃষ্টি করেছে তা হৃদয়ে গভীর বেদনা জাগানোর ফলে, আমি আমার সমস্ত জ্ঞান ও প্রচেষ্টা নিয়ে এ প্রবণতাগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারিনি। কারণ আমি এটা নিশ্চিতভাবেই জানি যে, অন্যের অন্ধ অনুকরণ উম্মতের আকলকে না নবায়ন করবে আর না পুনর্জীবিত করবে। কারণ এই উম্মত আখিরাতে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী ও সম্মানিত একটি উম্মত। যদি সে তার এই দুটি দিককে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, তবে তাকে বস্তুবাদী জীবনদর্শন নয়; বরং এমন একটি রূহানী জীবনদর্শন গ্রহণ করতে হবে, যা তার আকলকে পূর্ণ শক্তিতে বিকশিত ও নির্মিত করে। রিসালাতের দাবি অনুযায়ী এই উম্মতের সৃষ্টিই তার ফিতরাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নির্ধারিত। অথচ অপর জীবনদর্শন বস্তুগত সৃষ্টিতেই সন্তুষ্ট থেকে এই ফিতরাতকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এসকল কারণে আমি আমার একটিমাত্র বেদনাকে বহু বেদনায় রূপান্তরিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পাইনি। এই তাড়নাগুলোর প্রথমটি হলো, আমি আমার অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছি যাতে উম্মত তার দীর্ঘকাল ধরে হারিয়ে ফেলা দুটি মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে পুনরায় অর্জন করতে পারে। এই দুটির একটি হলো, ‘পারিভাষিক শক্তি’ আর অপরটি হলো, ‘ইসতিদলালের শক্তি’। এর মধ্যে প্রথমটি উম্মতকে অর্থবহতা আর তাসাউউর (Perspective) – এর ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেয় আর দ্বিতীয়টি দলীল ও নসকে বুঝার ক্ষেত্রে স্বাধীন করে তোলে।

এই তাড়নাগুলোর দ্বিতীয়টি হলো, উম্মতকে গভীর চিন্তা ও নান্দনিক বিষয়ের গুরুত্বকে অনুধাবন করানো এবং এগুলোকে তৈরি করার পন্থা ও উপায়সমূহকে বাতলে দেওয়া। একই ভাবে সে তার নিজের ফিতরাতের মৌলিক উপাদানসমূহকে সংরক্ষণ করে কিভাবে অন্যের কাছ থেকে উপকৃত হতে পারবে সেটাও ব্যাখ্যা করা।   

আমার তাড়নাগুলোর মধ্যে তৃতীয়টি হলো, উম্মতের সন্তানদের জন্য মৌলিক সৃজনশীলতার একটি আদর্শ মডেল উপস্থাপন করা-যাতে আমি যে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছি তার সত্যতা প্রমাণ করতে পারি। আমি যে মডেলটি উপস্থাপন করেছি, তা একটি ইসলামী দর্শন হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। আর এই দর্শনের মূল কথা হলো: প্রথমত, উম্মতকে নবায়ন করতে হলে মানুষকে নবায়ন করতে হবে; দ্বিতীয়ত, মানুষকে নবায়ন করতে হলে তার রূহকে নবায়ন করতে হবে।

মহান আল্লাহ এই চিন্তাশীল প্রচেষ্টাকে বরকতময় করুন এবং আমার ও আপনাদের জন্য উম্মতকে পুনর্জাগরিত করা ও উম্মতের আকলকে নবায়ন করার পথকে সহজ করে দিন। নিশ্চয়ই তিনি শ্রবণকারী ও দোয়া কবুলকারী।

৮২৮ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান (জন্ম ১৯৪৪) সমকালীন মুসলিম উম্মাহর বহুমাত্রিক একজন আলেম, মুতাফাক্কির ও দার্শনিক। তাঁর দার্শনিক সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাগত বহুমাত্রিকতার কারণে চিন্তকেরা তাকে যুগের গাজ্জালী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মরক্কোর আল জাদিদায় জন্মগ্রহণকারী আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান, রাবাতের মুহাম্মদ পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে প্যারিসের সোরবোনে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ইসলাম ও পাশ্চাত্য উভয় দার্শনিক ঐতিহ্যের উপর প্রগাঢ় অধিকারের ফলশ্রুতিতে তিনি বিগত অর্ধশতাব্দীর চিন্তাগত জীবনে দ্বীন, আখলাক, দর্শন, রাজনীতি, ফিকহ, ভাষা ও আধুনিকতার মতো বিস্তৃত বিষয়ে ত্রিশটিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর চিন্তাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময়। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ/চব্বিশ বছর এবং সাহিত্য ও কবিতার প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ। যুদ্ধের বিপর্যয় তাকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: দৃশ্যমানভাবে হলেও মুসলমানদের আকলকে বিপর্যস্ত করে এমন আকলের প্রকৃতি কী?, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আমাদের জন্য কী বয়ে এনেছে এবং এর মাধ্যমে আমরা কোন অবস্থায় উপনীত হলাম? এ প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষিতে তিনি ‘আমরা কারা এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অপর’ই বা কারা’? তিনি এই আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়ান এবং এই মৌলিক পাঁচটি প্রশ্নকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর চিন্তাজগতকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিন্তাগত সফরের ভেতর দিয়েই তিনি আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান হয়ে ওঠেন।   পরবর্তী জীবনে তার প্রায় সমগ্র চিন্তাপ্রকল্পই এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এ কারণেই তার রচনাগুলো বিচ্ছিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা স্বতন্ত্র গ্রন্থমাত্র নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত ও আখলাকী পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ প্রকল্পের অংশ। ত্বহা আব্দুর রহমানের কাছে মুসলিম সমাজের সংকট নিছক রাজনৈতিক ক্ষমতার সংকট নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে এবং তার গভীরে প্রয়োজন আকল, আখলাক ও মানুষের রূহানী পরিবর্তন। এ জায়গা থেকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী ও সংস্কারবাদী আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন এবং শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে উম্মাহর পুনর্জাগরণ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। একইসঙ্গে পাশ্চাত্যায়নকে তিনি কেবল বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব হিসেবে দেখেননি; মুসলিম সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, চিন্তাপদ্ধতি ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে দেওয়া একটি গভীর প্রক্রিয়া হিসেবে বিচার করেছেন। তার কাছে মুক্তির অর্থ তাই পশ্চিমকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং নিজস্ব আকল, ভাষা, আখলাক ও ঈমানের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য ফিরে পাওয়া। এই অনুসন্ধান থেকেই তার দর্শনে ‘আল ফালসাফাতুত তাদাভুলিয়্যাহ’ এবং বিশেষত ‘আল ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, দর্শন কোনো একটি সভ্যতা বা ভাষার একচেটিয়া সম্পদ নয়। গ্রিক বা আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাতেই কেবল দর্শন সম্ভব, এমন ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং আরবীকে স্বতন্ত্র দার্শনিক নির্মাণের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। একইভাবে ঈমানকে তিনি চিন্তার বিপরীতে স্থাপন করেন না; বরং ঈমান, আকল ও আখলাকের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন। তার ই’তিমানী দর্শনে ‘আমানত’ মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান ও কর্মকে বোঝার কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়। আধুনিকতার নৈতিক সংকটের বিপরীতে আখলাকের নিজস্ব ভিত্তি থেকে একটি বিকল্প দার্শনিক ভাষা নির্মাণই তার দীর্ঘ চিন্তাসাধনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে: • العمل الديني وتجديد العقل • تجديد المنهج في تقويم التراث • فقه الفلسفة: الفلسفة والترجمة • الحق العربي في الاختلاف الفلسفي • سؤال الأخلاق: مساهمة في النقد الأخلاقي للحداثة الغربية • روح الحداثة: المدخل إلى تأسيس الحداثة الإسلامية • روح الدين: من ضيق العلمانية إلى سعة الائتمانية • بؤس الدهرانية: النقد الائتماني لفصل الأخلاق عن الدين • دين الحياء সমকালীন মুসলিম চিন্তায় ত্বহা আব্দুর রহমানের স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি পশ্চিমা দর্শনের প্রশ্ন ও পরিভাষাকে কেবল ইসলামী ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেননি; বরং মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব জ্ঞান, ঈমান, ভাষা ও আখলাকের ভিত থেকে নতুন দার্শনিক প্রশ্ন এবং পরিভাষা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, এবং এ প্রকল্পকে সামনে রেখে শতশত পরিভাষা তৈরি করেছেন। তার কাছে ইসলামী ঐতিহ্য অতীতের কোনো স্থির স্মারক নয়, আবার আধুনিকতাও অনিবার্যভাবে অনুসরণীয় কোনো চূড়ান্ত মডেল নয়। ঐতিহ্যের গভীরতা ধারণ করে বর্তমানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো একটি ‘স্বাধীন ও সৃষ্টিশীল মুসলিম আকল নির্মাণ’ই তার প্রকল্পের কেন্দ্র। এই সুবিশাল ও সুসংহত চিন্তাপ্রকল্পের কারণে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কণ্ঠগুলোর একজন।
Picture of আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান

আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান (জন্ম ১৯৪৪) সমকালীন মুসলিম উম্মাহর বহুমাত্রিক একজন আলেম, মুতাফাক্কির ও দার্শনিক। তাঁর দার্শনিক সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাগত বহুমাত্রিকতার কারণে চিন্তকেরা তাকে যুগের গাজ্জালী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মরক্কোর আল জাদিদায় জন্মগ্রহণকারী আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান, রাবাতের মুহাম্মদ পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে প্যারিসের সোরবোনে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ইসলাম ও পাশ্চাত্য উভয় দার্শনিক ঐতিহ্যের উপর প্রগাঢ় অধিকারের ফলশ্রুতিতে তিনি বিগত অর্ধশতাব্দীর চিন্তাগত জীবনে দ্বীন, আখলাক, দর্শন, রাজনীতি, ফিকহ, ভাষা ও আধুনিকতার মতো বিস্তৃত বিষয়ে ত্রিশটিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর চিন্তাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময়। তখন তার বয়স মাত্র তেইশ/চব্বিশ বছর এবং সাহিত্য ও কবিতার প্রতিও ছিল গভীর আগ্রহ। যুদ্ধের বিপর্যয় তাকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: দৃশ্যমানভাবে হলেও মুসলমানদের আকলকে বিপর্যস্ত করে এমন আকলের প্রকৃতি কী?, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল আমাদের জন্য কী বয়ে এনেছে এবং এর মাধ্যমে আমরা কোন অবস্থায় উপনীত হলাম? এ প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষিতে তিনি ‘আমরা কারা এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অপর’ই বা কারা’? তিনি এই আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়ান এবং এই মৌলিক পাঁচটি প্রশ্নকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর চিন্তাজগতকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিন্তাগত সফরের ভেতর দিয়েই তিনি আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান হয়ে ওঠেন।   পরবর্তী জীবনে তার প্রায় সমগ্র চিন্তাপ্রকল্পই এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এ কারণেই তার রচনাগুলো বিচ্ছিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা স্বতন্ত্র গ্রন্থমাত্র নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত ও আখলাকী পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ প্রকল্পের অংশ। ত্বহা আব্দুর রহমানের কাছে মুসলিম সমাজের সংকট নিছক রাজনৈতিক ক্ষমতার সংকট নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে এবং তার গভীরে প্রয়োজন আকল, আখলাক ও মানুষের রূহানী পরিবর্তন। এ জায়গা থেকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী ও সংস্কারবাদী আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন এবং শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে উম্মাহর পুনর্জাগরণ সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। একইসঙ্গে পাশ্চাত্যায়নকে তিনি কেবল বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব হিসেবে দেখেননি; মুসলিম সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, চিন্তাপদ্ধতি ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে দেওয়া একটি গভীর প্রক্রিয়া হিসেবে বিচার করেছেন। তার কাছে মুক্তির অর্থ তাই পশ্চিমকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং নিজস্ব আকল, ভাষা, আখলাক ও ঈমানের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য ফিরে পাওয়া। এই অনুসন্ধান থেকেই তার দর্শনে ‘আল ফালসাফাতুত তাদাভুলিয়্যাহ’ এবং বিশেষত ‘আল ফালসাফাতুল ই’তিমানিয়্যাহ’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, দর্শন কোনো একটি সভ্যতা বা ভাষার একচেটিয়া সম্পদ নয়। গ্রিক বা আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাতেই কেবল দর্শন সম্ভব, এমন ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং আরবীকে স্বতন্ত্র দার্শনিক নির্মাণের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। একইভাবে ঈমানকে তিনি চিন্তার বিপরীতে স্থাপন করেন না; বরং ঈমান, আকল ও আখলাকের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন। তার ই’তিমানী দর্শনে ‘আমানত’ মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান ও কর্মকে বোঝার কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়। আধুনিকতার নৈতিক সংকটের বিপরীতে আখলাকের নিজস্ব ভিত্তি থেকে একটি বিকল্প দার্শনিক ভাষা নির্মাণই তার দীর্ঘ চিন্তাসাধনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে: • العمل الديني وتجديد العقل • تجديد المنهج في تقويم التراث • فقه الفلسفة: الفلسفة والترجمة • الحق العربي في الاختلاف الفلسفي • سؤال الأخلاق: مساهمة في النقد الأخلاقي للحداثة الغربية • روح الحداثة: المدخل إلى تأسيس الحداثة الإسلامية • روح الدين: من ضيق العلمانية إلى سعة الائتمانية • بؤس الدهرانية: النقد الائتماني لفصل الأخلاق عن الدين • دين الحياء সমকালীন মুসলিম চিন্তায় ত্বহা আব্দুর রহমানের স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি পশ্চিমা দর্শনের প্রশ্ন ও পরিভাষাকে কেবল ইসলামী ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেননি; বরং মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব জ্ঞান, ঈমান, ভাষা ও আখলাকের ভিত থেকে নতুন দার্শনিক প্রশ্ন এবং পরিভাষা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, এবং এ প্রকল্পকে সামনে রেখে শতশত পরিভাষা তৈরি করেছেন। তার কাছে ইসলামী ঐতিহ্য অতীতের কোনো স্থির স্মারক নয়, আবার আধুনিকতাও অনিবার্যভাবে অনুসরণীয় কোনো চূড়ান্ত মডেল নয়। ঐতিহ্যের গভীরতা ধারণ করে বর্তমানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো একটি ‘স্বাধীন ও সৃষ্টিশীল মুসলিম আকল নির্মাণ’ই তার প্রকল্পের কেন্দ্র। এই সুবিশাল ও সুসংহত চিন্তাপ্রকল্পের কারণে আল্লামা ত্বহা আব্দুর রহমান বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক কণ্ঠগুলোর একজন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top