মিশর সফরে গিয়ে আমি পিরামিডগুলো পরিদর্শন করেছিলাম। পিরামিড দেখার সময় আমি গভীর আগ্রহ ও উৎসাহের সঙ্গে গাইডের কথাগুলো শুনছিলাম। গাইডটি বলছিলেন, এই পিরামিডগুলো নির্মাণের জন্য অসংখ্য দাসকে দূর-দূরান্ত থেকে কোটি কোটি পাথর পরিবহণ করতে হয়েছিলো। আর এসব পাথর বহন করা হয়েছিলো কেবল ফেরাউনদের সমাধি নির্মাণের উদ্দেশ্যে।
দেয়ালের মধ্যে ছোট ছোট পাথরের দানা চোখে পড়ছিল। আমি গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কী। প্রথমে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, “কিছুই না,” তবে পরে তিনি জানালেন যে, এগুলো আসলে দাসদের হাড় চাপা দেওয়ার স্থান। দাসদের এতটাই তুচ্ছ ও অবমাননা করা হতো যে, শত শত মানুষকে একসঙ্গে একটি খাদে দাফন করা হতো। আর যারা বেঁচে থাকতো, তাদেরকে পাথর বহন করতে বাধ্য করা হতো। তারপর আমি দাসদের গণকবরের সামনে দাঁড়ালাম। গাইড বললেন:
তাদের রূহগুলোকেও যেন শরীরের ন্যায় দাস হিসেবে ব্যবহার করা যায়—এ কারণেই এমন করা হয়েছিলো।
এরপর আমি গাইডকে বললাম, “আমাকে একটু একা থাকতে দিন।” তারপর কবরগুলোর পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। সেই খাদগুলোতে দাফন করা মানুষের প্রতি এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো- যেন তারা আমার এত কাছে, যেন আমরা একই জাতির অংশ ছিলাম।
আমি আবার পিরামিডগুলোর দিকে তাকালাম। তাদের সমস্ত জাঁকজমক ও মহিমা সত্ত্বেও, আমার কাছে সেগুলো ছিল এক অচেনা ও দূরের বিষয়। আমার পূর্বপুরুষদের অস্থিমজ্জা ও হাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই তথাকথিত সভ্যতার বিশাল নিদর্শনগুলোর প্রতি আমার মনে এক ভয়ানক ঘৃণা জন্ম নিলো।
আমার পূর্বে যারা এসেছিল, তারা চীনের প্রাচীরও নির্মাণ করেছিলো। যাদের পিঠে ভারী পাথর বহনের শক্তি ছিলো না, তারা সেই পাথরের নিচে পিষ্ট হয়ে দেয়ালের ভেতরেই চাপা পড়েছিলো। সভ্যতার এই নিদর্শনগুলো এমন এক নির্মম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যে বাস্তবতা আমার পূর্বপুরুষদের মাংস ও অস্থির বিনিময়ে তৈরি হয়েছে।
তথাকথিত এই সকল সভ্যতাকে আমি অভিশাপ দিলাম। হাজার হাজার বছর ধরে আমার পূর্বপুরুষদের ওপর চালানো অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমার ভেতরে তীব্র এক ক্রোধ জেগে উঠলো।
এরপর চিন্তা করলাম,
এই দাসরা মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু এই দাসপ্রথা তো মৃত্যুবরণ করেনি।
ভ্রমণ শেষ হওয়ার পর, আমি তাদের একজনকে একটি চিঠি লিখলাম। গত পাঁচ হাজার বছরে কী কী ঘটেছে, তা তাকে জানানো ছিলো আমার উদ্দেশ্য।
———-
প্রিয় ভাই আমার!
তুমি তোমার মনিবকে চিনতে। তোমার গায়ে যে চাবুক পড়তো, তার যন্ত্রণা তুমি অনুভব করতে। তুমি জানতে তুমি দাস। তুমি জানতে, কে তোমাকে দাস বানিয়েছে।
কিন্তু আজ আমরা তোমার চেয়েও হতভাগা।
আমরাও আজ তোমার মত গোলাম কিন্তু আমরা জানি না আমরা কার গোলামী করছি। আমরা এমনভাবে বেঁচে আছি যে, আমরা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, এ খবরও আমরা জানি না।
আমাদের সম্পদ ও শ্রম কীভাবে লুণ্ঠিত হচ্ছে, তা আমাদের বুঝতে দেওয়া হয়নি। যে ব্যবস্থাগুলো আমাদের শাসন করছে, সেগুলোকে আমরা স্বাধীনতা মনে করছি।
আজ পৃথিবী এক বিশাল দাসত্বের ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। মানুষ উৎপাদন করছে, কিন্তু অন্যরা লাভবান হচ্ছে। মানুষ কাজ করছে, কিন্তু অন্যরা ভোগ করছে জীবন।
তোমার সময়ে মনিব ও দাসের পরিচয় স্পষ্ট ছিলো। আজকের দিনে দাসত্ব একটি গোপন বিষয়। এটি আরও অলংকৃত, আরও আধুনিক এবং আরও প্রতারণামূলক।
তুমি চাবুকের নিচে কাজ করতে।
কিন্তু আজ আমরা নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে সেই তাদেরই গোলামী করি।
তুমি তোমার শিকল দেখতে পেতে।
আমরা আমাদের শিকলও দেখতে পাই না।
ভাই আমার, পাঁচ হাজার বছর পরে পৃথিবীর অবস্থা এটাই।


