ইসলামি শরীয়া ও মানবাধিকার বিষয়ে ওয়ায়েল হাল্লাক

[এই সাক্ষাৎকারটি ডেইলি ফিলোসফি(DP)-কে ২০২১ সালে দেয়া একটি সাক্ষাৎকার। ]

[অধ্যাপক ওয়ায়েল বি. হাল্লাক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী আইন, ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একজন শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, এই সাক্ষাৎকারে, আমরা শাসন মানবাধিকারের পশ্চিমা এবং ইসলামী ধারণার মধ্যে বিতর্ক সম্পর্কে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করছি। ]

DP: প্রফেসর ওয়ায়েল বি. হাল্লাক, আজ আপনাকে আমাদের সাথে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত এবং সম্মানিত। আপনি ইসলামী আইন এবং ইসলামী ইতিহাসের উপর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের একজন, এবং আপনি আমাদের কাছে শরীয়ার কিছু জটিলতা ব্যাখ্যা করার জন্য অত্যন্ত উদারভাবে সম্মত হয়েছেন।

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: এখানে এসে খুশি হলাম। আপনার আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ।

 

DP: আপনার “দ্য ইম্পসিবল স্টেইট” বইটিতে আপনি যুক্তি দিয়েছেন যে আধুনিক অর্থে, ‘একটি ইসলামী রাষ্ট্র অসম্ভব’। আপনি বলেছেন যে এমনকি আধুনিক মুসলমানদেরও পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্রের মৌলিক অনুমিতিগুলি মেনে নিতে অসুবিধা হবে। আপনি  কি আমাদের পাঠকদের জন্য খুব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে পারবেন, এটা কেন? 

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: আমি ধরে নিচ্ছি যে, আধুনিক রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট নৈতিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, এ ব্যপারে আমরা একমত। আমার যুক্তি হল যে, এটি  ইসলামের সামগ্রিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

এতে সন্দেহ নেই যে, ইসলাম মানে অনেক কিছু। এটি শরীয়া এবং তাসাউফ এবং আরও অনেক কিছু। কিন্তু আমাদের জন্য, বিশেষ করে আজকাল, শরীয়া ব্যবস্থা ও সুফি তরিকার বৈচিত্র্য এবং বহুত্বকে হৃদয়ঙ্গম করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ হবে। শরীয়াতে রয়েছে বিভিন্ন মাযহাব, যার প্রত্যেকটিতে আছে অভ্যন্তরীণ কিন্তু নানামুখী ব্যাখ্যা। একইভাবে, সুফিবাদও শরিয়ার মতই ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং বৈচিত্র্যময়, এবং সত্য বলতে আরও বেশি। 

তবুও, এই সমস্ত বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতার দীর্ঘ পরিসরে, ইসলামে একজন নাগরিক-সত্তাকে কোথাও লালন-পালন করার কোনো আয়োজন নেই। একজন নাগরিক হওয়া মানে জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা, মনস্তাত্ত্বিকভাবে, চূড়ান্ত অস্তিত্বগত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে। রাষ্ট্র ও জাতি জীবন ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু রাষ্ট্র ও জাতি একজন মুসলিম ব্যক্তির বিশ্বাস ও আনুগত্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র ও জাতি এমন একটি নৈতিক আদর্শের কেন্দ্রস্থল নয় এবং হতে পারে না যেখানে মুসলমানদের জন্য জীবনের অর্থ, আবাস নিহিত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদেরকে বুঝতে হবে কেন নবীজীর (সা) উদাহরণ শরিয়া এবং সুফি উভয় মতবাদের ক্ষেত্রেই এত কেন্দ্রীয় ছিল, যা প্রায়শই এক ও অভিন্ন। আসলে নবীজী (সা) নিজেই এই ধরনের নীতিগত অনুকরণের গুরুত্ব এবং কেন্দ্রীয়তা অর্জন করেননি। বরং এর কারণ হল, কোন এক সত্তার উপাসনা করার জন্য, সেই সত্তাকে নিজের আত্মগঠনের প্রযুক্তির উদাহরণ হতে হবে, যেভাবে ব্যক্তিসত্তা নিজেকে একজন নৈতিক সত্তা হিসেবে গঠন করবে। এই সচেতন এবং সুচিন্তিত প্রযুক্তি ব্যতীত কোনো ইসলাম হতে পারে না, এবং মিশেল ফুকো তাঁর College de France এর বক্তৃতায় আমাদেরকে বারবার দেখিয়েছেন যে, এই প্রযুক্তিগুলো বিদ্যমান জীবনযাত্রার আধুনিক পদ্ধতি থেকে উধাও হয়ে গেছে – যার জন্য আমরা চড়া মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছি। 

আধুনিক রাষ্ট্র জবরদস্তি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে বাইরে থেকে ব্যক্তিকে গঠন করে। ইসলাম তাদের ভেতর থেকে গঠন করে, নিজের উপর সচেতনভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আত্মদর্শন এবং আত্ম-শৃঙ্খলার একটি প্রক্রিয়া, নৈতিক আত্ম-শিক্ষার একটি প্রক্রিয়া। 

তাই ইসলামে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কিন্তু বিপরীতে, আধুনিক রাষ্ট্রে এটি সমষ্টিগত এবং এতে স্ব-ক্ষমতার  অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার অভাব রয়েছে।

 

DP: যদি আমি আপনাকে স্পষ্ট করে বুঝতে পারি আপনি বলছেন যে, আমরা প্রায়শই ইসলামী আইন এবং পশ্চিমা সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যে বিরোধ হিসাবে যা দেখি তা আসলে ইসলামের সমস্যা নয়। তাহলে এটি ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সমাজের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য? আপনি কি মনে করেন যে, ধরুন, একটি খ্রিস্টান বা কনফুসিয়ান সমাজের সেক্যুলার রাষ্ট্রের ছাঁচে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য একই রকম সমস্যা থাকবে?

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক:  যে কোনো সমাজ যদি নৈতিক মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাদের অস্তিত্বকে ধর্মনিরপেক্ষ পদ্ধতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়া গভীরভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। আসুন আমরা মনে রাখি ধর্মনিরপেক্ষতা কী, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল ধর্মীয় জীবনকে ব্যক্তিগত জীবনে বিভক্ত করে না। বরং এটি ধর্ম কী এবং কোথায় ও কীভাবে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে তা নির্ধারণ করে দেয়। রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, সেক্যুলারিজম হল রাষ্ট্র কর্তৃক ঈশ্বরকে হত্যাতুল্য (secularism is the murder of God by state)। রাষ্ট্র যেকোনো ধর্মীয় অনুশীলনকে সীমাবদ্ধ, সীমিত, বাতিল বা হ্রাস করতে পারে, এবং এইভাবে ধর্মীয় ক্ষেত্রের মান এবং পরিমাণ নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে, যেমনটি এটি উপযুক্ত মনে করে। এর কারণ রাষ্ট্র হলো চূড়ান্ত সার্বভৌম, যার অস্তিত্বের নিজস্ব কারণ রয়েছে – যাকে আমরা রাষ্ট্রের যুক্তি বা raison d’etat বলি, মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে এটি একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ধারণা।

এখন আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গেলে, আমি বলব যে ধর্ম যদি নীতিগত মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক ব্যবস্থা হয়, তাহলে হ্যাঁ, আধুনিক রাষ্ট্রের হাতে সকল ধর্মই প্রায় একই ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। 

 

 

DP:পশ্চিমা সংবেদনশীলতা এবং মূল্যবোধের জন্য বিশেষ উদ্বেগের দুটি ক্ষেত্র হল জাতিসংঘ ধাঁচের মানবাধিকার এবং ইসলামী রাষ্ট্রগুলিতে নারীর অধিকার। আপনি কি মনে করেন যে একটি ইসলামী সমাজের অবশ্যই এই অধিকারগুলিকে উপেক্ষা করা উচিত, নাকি আমরা এমন একটি মধ্যপন্থী ইসলামী রাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে পারি যা সত্যিকার অর্থে এবং সৎভাবে একই সাথে ইসলামিক এবং অধিকারের এই পশ্চিমা ধারণাগুলিকে সম্মান করতে পারে?

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: নিঃসন্দেহে এই জটিল প্রশ্নগুলোর জন্য উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর জটিল এবং দুর্গম ইতিহাসে প্রবেশ করা প্রয়োজন, যে সময়ে মুসলিম বিশ্ব কার্যত উপনিবেশিত ছিলো এবং এর সামাজিক কাঠামো, এর প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোসহ, ভেঙে ফেলা হয়েছিল। গত দুই শতাব্দীতে কী ঘটেছিল তা না বুঝে মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কারও কথা বলা উচিত নয়।

সংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং মানবাধিকারের ইসলামী ধারণার মধ্যে ব্যবধান ততটা বিশাল নয় যতটা আমরা কল্পনা করি। বিভিন্ন ধরণের ইসলামোফোবিয়া রয়েছে যা ইসলামের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে বিকৃত করেছে, এবং এটি তেমনই একটি ধরণ। আইনী ইতিহাসবিদদের গবেষণায় এখন অনেক সম্মানজনক যুক্তি উঠে এসেছে যে যুদ্ধ আইনসহ ইউরোপীয় আন্তর্জাতিক আইন, অন্যান্য আইনি বিধান এবং এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলিও ইসলামের আইনি ঐতিহ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এই ঐতিহ্য যুদ্ধবন্দীদের অবস্থা এবং যুদ্ধকালীন আচরণের প্রতি নিবিড়ভাবেবে সংবেদনশীল, যা অনেক আধুনিক মনকে অবাক করে দিতে পারে। কিছু “সর্বজনীন অধিকার” ডিক্রির (decree) বিরুদ্ধে কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরোধ নীতিগত বিষয় নয়, বরং এটি অধিকারের বিশেষভাবে পশ্চিমা ধারণার প্রত্যাখ্যান।

নারীদের বিষয়টি আরও জটিল। প্রথমত, পশ্চিমা আইনগুলি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নারীদের পূর্ণ আইনি মর্যাদা স্বীকৃতি দিতে শুরু করে (অন্যান্যের মধ্যে, বৈবাহিক সম্পত্তি আইন এবং ভোটাধিকার ইত্যাদি)। বিপরীতে, শরীয়া সপ্তম শতাব্দী থেকে নারীদের পূর্ণ আইনি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

ইসলামে নারী ও পুরুষের আইনি ক্ষমতা একই, এমন একটি পরিস্থিতি যা এখন এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। সমস্যা হল, নারীরা একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো, যেখানে তারা মূলত সুরক্ষিত ছিল, এখান থেকে সরে একটি আধুনিক, পুঁজিবাদী সামাজিক কাঠামোতে এসেছে। এখানে তাদের নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইতোমধ্যে অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে ঊনবিংশ শতকের পূর্ববর্তী শরিয়া ব্যবস্থার অধীনে নারীরা একটি সংবেদনশীল আইনি ম্যাট্রিক্সে সুরক্ষিত ছিল এবং ব্যাপকভাবে ইউরোপীয় আইন নির্ভর তথাকথিত আধুনিক আইনি সংস্কারের তুলনায় আইনি অধিকারের দিক থেকে অনেক ভালোভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল। 

এসবের সাথে আরও যুক্ত করলে, মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশগুলিতে মাঝে মাঝে নারীর মর্যাদার অতিরিক্ত উদারীকরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেখানে খণ্ডিত এবং অস্থিতিশীল পশ্চিমা পরিবার তাদের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক মডেল তৈরি করতে পারেনি। অনেকেই বুঝতে পেরেছেন যে নারীর উদারীকরণ কাঠামোগতভাবে পুঁজিবাদের সাথে সম্পর্কিত, যা সমাজের সামাজিক কাঠামোকে কার্যকরভাবে ধ্বংস করার জন্য দায়ী (এবং পশ্চিমা পারিবারিক কাঠামোর উপর ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছে)।

এবং আমি এখানে জোর দিয়ে বলতে চাই যে ইসলামে ‘উম্মাহ’ ধারণাটি, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ স্তরে (অর্থাৎ, স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালেবান এবং তাদের মতো গোষ্ঠীগুলোর (যারা সকলেই ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু, এবং মূলত মূলধারার মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছন্ন) স্পষ্ট মৌলবাদ এবং ধর্মান্ধতা ছাড়াও অনেক কিছু বিবেচনা এবং ভাবার আছে। শুধু মুসলিম সমাজ নয়, পুরো বিশ্ব কিভাবে নারী অধিকার, পুঁজিবাদ, অধিকারের ধারণার মধ্যকার কাঠামোগত সংযোগ – অর্থাৎ, এই অধিকারগুলি আসলে কী কাজ করে, পারিবারিক মূল্যবোধের উপর কীভাবে তারা প্রভাব ফেলে – ইত্যাদি মোকাবেলা করতে পারে তা নিয়ে ভাবতে হবে। 

অন্য কথায়, নারীর দুর্দশার সমাধান (মুসলিম বিশ্ব এবং অন্যত্র) নিজে নিজেই হবে না, বরং এটি আমাদের সকলের কাছে আমাদের নিজেদের জন্য তৈরি ব্যবস্থার কাঠামোগত এবং প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি করে। নারী অধিকারের প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি যেন এটি একটি বিচ্ছিন্ন এবং সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত বিভাগ, একটি বিশাল পদ্ধতিগত (methodological) ভুল।

 

DP: শরীয়া আইন, অন্যান্য আইনী ব্যবস্থার মতো, প্রক্রিয়া তৈরি করেছে যা সময়ের সাথে অভিযোজনের অনুমোদন দেয়। কুরআন এবং নবীর (সা) বাণী যা অকাট্য তার পাশাপাশি, ইসলামী আইনে আদর্শের উৎস হিসেবে কিয়াস বা সাদৃশ্যমূলক যুক্তি এবং ইজমা বা আইনগত ঐক্যমত্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো কি আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের আইনি ব্যবস্থায় ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়? পশ্চিমা রাষ্ট্রীয় আইন এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী আইনের মধ্যে পার্থক্য কি কেবল নিয়মের বিষয়বস্তু, নাকি এই নিয়মগুলো কীভাবে বিকশিত এবং প্রয়োগ করা হয় তার মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে যা শরিয়াহের উপর ভিত্তি করে একটি আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব করে তোলে?

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: শরীয়া প্রকৃতপক্ষে নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে আইনি পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করেছিল, যেমনটি আমি এবং আমার অন্যান্য সহকর্মীরা দুই দশকেরও বেশি সময় আগে অনেক লেখায় দেখিয়েছি। বিষয়টি পরিবর্তনের সক্ষমতা সম্পর্কে নয় বরং এটি গুণগত এবং অমীমাংসাযোগ্য পার্থক্যের সমস্যা। অন্য কথায়, সমস্যাটি হল নৈতিক শক্তির একটি অপূরণীয় ফাঁক। 

আমি যদি আপনাকে একটি উদাহরণ দেই, যা আধুনিক মুসলিমদের মধ্যে শরিয়া এবং এর কার্যকারিতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এটি হল ইসলামী ব্যাংকিং এবং ইসলামী ‍ফিন্যান্স বা অর্থায়ন। প্রশ্ন হল: মুসলিমরা কীভাবে তাদের আর্থিক লেনদেন “শরিয়া-পদ্ধতিতে” একটি প্রভাবশালী এবং বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করবে। আমি মনে করি আমরা একমত হতে পারি যে, পুঁজিবাদ বিশেষভাবে একটি নীতিগত ব্যবস্থায় আবদ্ধ নয়, সম্পত্তি এবং সম্পদের সমতাভিত্তিক বন্টনের নীতির উপর তো দূরের কথা। পুঁজিবাদ এবং এর কর্পোরেশনগুলো কাছে মৌলিক সত্য হল যে, অর্থ অর্থের জন্যই তৈরি করা উচিত। ইসলামী ব্যবস্থা, শরিয়া-তাসাউফের বিভিন্ন ধারার মধ্যে, পুঁজিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা ধর্মীয় অনুশীলনের একটি গভীর ম্যাট্রিক্স দ্বারা পরিবেষ্টিত। অর্থ এবং অর্থ উপার্জন তাই সৃষ্ট জগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, অর্থাৎ এগুলো দৈনন্দিন অনুশীলনের নৈতিক ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় অনুশীলনের অপরিহার্য উপাদান। ইসলামে অর্থ নীতিশাস্ত্রের একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্য কথায়, অর্থ ছিল একটি নৈতিক ক্ষেত্র।

আধুনিক ইসলামী ফিনান্স সাধারণত পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের উপর আধিপত্য বিস্তারের আগে সহস্রাব্দ ধরে প্রচলিত শরিয়া ঐতিহ্য অনুসরণ করার অর্থ কী তা বোঝার ক্ষেত্রে কারিগরি ধাঁচের এবং ভাসা ভাসা । আধুনিক ইসলামী ফিনান্স মনে করে যে, সুদ এবং ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব এই বিভ্রম তৈরি করে এমন কিছু কৌশলই সমস্যা চিরতরে সমাধান করে দেবে।

এটা আত্মপ্রতারণা বৈ কিছু নয়। আধুনিক পুঁজিবাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে ইসলামী ফিনান্সকে অন্তর্ভুক্ত করার কোন উপায় নেই, কারণ ইসলামী “অর্থনীতিতে” একটি শক্তিশালী নৈতিক মাত্রা এবং উপাদান রয়েছে যা অবাধ আধুনিক পুঁজিবাদের নেই। আমি আমার বিভিন্ন লেখায় এ বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি এবং ব্যাখ্যা করেছি; উদাহরণস্বরূপ, কেন শরিয়া কর্পোরেশনের ধারণায় ‘সীমিত দায় কোম্পানি’র (limited liability company) উত্থানের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। (আমার বই “Restating Orientalism”– দেখতে পারেন এ বিষয়ে)

ইসলামী আইন ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের ১২শ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নিষেধাজ্ঞার  উপর জোর দেওয়া হয়েছিল, যদিও কর্পোরেশন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি উপকরণ শরিয়ার অনুশাসনের ভাণ্ডারে বিদ্যমান ছিল। শরিয়া ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে এবং নিবিড়ভাবে জনহিতকর, এবং মূলধনের পুনর্বণ্টন এবং পুনর্বিনিয়োগ পদ্ধতিগুলো সেই ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য এবং জোরালো অংশ ছিল। 

শরিয়া আইনগত ব্যক্তিত্বকেও (juristic personality) প্রত্যাখ্যান করে কারণ এটি প্রতিটি (মানুষ) ব্যক্তি মুসলিমকে এমন যেকোনো আচরণের জন্য দায়ী করে যা অন্যের সম্পত্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই যুক্তি আমাদের অর্থনীতির পদ্ধতির সাথে এবং অবশ্যই আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রার পদ্ধতির সাথে বেশ অপরিচিত। এর অর্থ হল, উনিশ শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি মুসলিম দেশগুলির বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে শরিয়া এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করার জন্য আগ্রাসীভাবে একটি নীতি অনুসরণ করেছিল। শরিয়া ছিল মুক্ত-বাজার অর্থনীতির পরিপন্থী, অত্যন্ত জনহিতকর এবং দরিদ্রদের পক্ষে পরিচালিত হত এমনভাবে যা আধুনিক পুঁজিবাদ গ্রহণ করতে পারে না।

 

DP: কোনো কোনো পণ্ডিত বলেছেন যে, ইসলামী আইনের যে জানালাটি এখনও সহজলভ্য এবং ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ছিল (ইজতিহাদ) তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বন্ধ হয়ে আসছে এবং আজ তা খুবই সংকীর্ণ, যদি আদৌ বিদ্যমান থেকে থাকে। কিন্তু আপনি এই মূল্যায়নের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আপনি কি সংক্ষেপে আমাদের বলতে পারেন কেন?

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: ইসলামী আইনের বন্ধাত্য এবং অপরিবর্তনশীলতার ধারণা ছিল একটি প্রাচ্যবাদী মিথ যা অনেক আগেই খণ্ডন করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তি এবং তাদের শিক্ষাবিদদের বাহিনী (armies of academicians) মুসলিম বিশ্বে আইনের পরিবর্তন এবং পুনর্গঠনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এটি প্রচার করেছিল।

 শরিয়াহ অপরিবর্তনীয় কিনা, প্রশ্ন সেটা এই নয়। প্রশ্ন হলো, শরিয়া তার নৈতিক শক্তি না হারিয়ে—অর্থাৎ, তার পরিচয় না হারিয়ে—আধুনিকতা, আধুনিক পুঁজিবাদ এবং তাদের শাখা-প্রশাখা এবং আধিপত্যবাদী প্রভাবকে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে।

 ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে আমি যে উদাহরণটি দিয়েছি তা আমার বক্তব্যকে ভালোভাবে তুলে ধরে এবং গত দুই শতাব্দী ধরে আমাদের জীবনকে পরিচালিত করে আসা – আমাদের মনে রাখতে হবে – সেই ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত অসুবিধাগুলো সামনে আসে – যা আমাদের পরিবেশগত, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আধুনিক প্রকল্পের ব্যর্থতা এতটাই যে, তারা বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষকে – মুসলিম এবং অমুসলিম উভয়কেই – বিরতি দিচ্ছে, ভাবতে বাধ্য করছে যে আসন্ন বিপর্যয়ের ছায়ায় বসবাসকারী তাদের জীবন পুনর্বিবেচনা করার জন্য তারা তাদের পুরানো ঐতিহ্য থেকে কী শিক্ষা নিতে পারে।

 

DP:  আচ্ছা মানবাধিকার কি সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন ধারণা, সে সম্পর্কে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে হয়। আপনি কি মনে করেন যে জাতিসংঘের মতো মানবাধিকার একটি পশ্চিমা ধারণা? এটি কি নৈতিকভাবে সঠিক যে পৃথিবীর সমস্ত সমাজ এই অধিকারগুলোকে সম্মান করবে, নাকি আমাদের মেনে নিতে হবে যে অন্যান্য সংস্কৃতিগুলি তাদের নিজস্ব, কখনও কখনও অতুলনীয়, মূল্যবোধ ব্যবস্থার উপর জোর দিতে পারে?

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: আমি মনে করি না যে ক্ষমতা ব্যবস্থার একটি অংশ বা একটি দিক বুঝা সম্ভব, যদি না বুঝতে পারি যে সেই দিক বা অংশটি কীভাবে বৃহত্তর সমগ্রের দ্বারা গঠিত, সংযুক্ত, প্রভাবিত, অথবা কাঠামোগত এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে আচ্ছন্ন। আজকের তথাকথিত সার্বজনীন মানবাধিকার আর যাই হোক সার্বজনীন নয়, কারণ এগুলো বেশিরভাগই আধিপত্যকারী পশ্চিমা শক্তিগুলোর অভিজ্ঞতার ফসল। আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকার এবং আরও অনেক কিছু ক্ষমতাবানদের দ্বারা গঠিত হয়, আর বাকিগুলি সে লাইন ধরে চলে।

প্রতিটি সমাজ বা সংস্কৃতিকে যদি তার নিজস্ব ধারায় ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা তৈরি হবে, এবং এর সাথে সাথে, প্রতিটি সমাজকে আবার যদি তার নিজস্ব শর্তে বিকাশ হতে দেওয়া হয়, তাহলে মানবাধিকারের নিজস্ব ধারণা তৈরি হবে।

সমস্যা দেখা দেয় যখন একটি সমাজ বা সংস্কৃতির “বাস্তুতন্ত্র” (ecology) ধ্বংস হয়ে যায়, যেমনটি ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে ইসলামের ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদী ইউরোপের হাতে ঘটেছিল। ১৯শ শতাব্দী শেষ হয়ে যাওয়ার পর, পূর্বের ব্যবস্থার কোনও কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। শরিয়াকে কার্যত ধ্বংস করা হয়েছিল, একইভাবে সুফিবাদ এবং আরও অনেক কিছুকেও; এবং যে কয়েকটি ক্ষেত্র বেঁচে গিয়েছিল (যেমন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন), সেখানে মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি সান্ত্বনায় (lip service) রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, মুসলিমরা কীভাবে মানবাধিকারের (এবং আরও অনেক কিছুর) ক্ষেত্রে শরীয়ার প্রকৃত চেতনা পুনরুদ্ধার করবে এবং এমন ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করবে যা এখন কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি মাত্র। 

অতএব, প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে আমাদের অন্যান্য সংস্কৃতির মানবাধিকার ধারণা গ্রহণ করা উচিত কিনা। সত্যিকার অর্থে উদ্বেগজনক প্রশ্ন হল, এই সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট অধিকারগুলি কী কী যা পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে? আমরা কীভাবে এগুলি পুনরুদ্ধার করব, যা এমন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠেছে যা আজ আর চলনসই নয়?

নিঃসন্দেহে, অতীতের এই ধরণের ব্যবস্থাগুলি বিরাট সাফল্য অর্জন করেছিল, কিন্তু তাদের চেতনা কিংবা আমাদেরকে আজকের মানুষের অবস্থার উন্নতিতে সাহায্য করবে এমন চেতনা পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা কোন ধরণের অনুসন্ধানমূলক পদ্ধতি (heuristic methodology) ব্যবহার করব?

আমাদের বর্তমান অত্যন্ত সমস্যা জর্জরিত, সারা বিশ্ব জুড়ে এত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, এবং ভবিষ্যৎ আমাদের অজানা। আমাদের যা করার আছে, তা হলো আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে যা কিছু ভালো এবং খারাপ হয়েছে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া। ইতিহাস কেবল ঘটনার একটি ধারাবাহিকতা নয়,  কিংবা একটি অগ্রসরমান একরৈখিকতা নয় যা মৃত মানুষ এবং ঘটনাগুলিকে পিছনে ফেলে যায়। ইতিহাসও একটি নীতিগত সময়, আর নীতিগত সময় চিরন্তন। 

DP: প্রফেসর হাল্লাক, সাক্ষাতকারটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ওয়ায়েল বি. হাল্লাক: আপনাকে স্বাগতম।

 

অনুবাদঃ মোনায়েম খান।

৩৪ বার পঠিত

শেয়ার করুন

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top