ট্রাম্পের পরিকল্পনা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের অধিকার কেড়ে নিয়ে দখলদারিত্ব বজায় রাখা

(গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের জন্য ট্রাম্পের “Day After” পরিকল্পনার পর্যালোচনা ও এই কুটিল পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে এই প্রবন্ধে।)

হামাস কিংবা তথাকথিত কর্তৃপক্ষ – কেউই অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাখে না। এই কুটিল পরিকল্পনা (Day After) মূলত মধুতে বিষ মেশানোর মতো।

প্রথমত, মধু হচ্ছেঃ

যুদ্ধ বন্ধ করা।
ত্রাণ বিতরণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহের গাজায় প্রবেশের অনুমতি।
বন্দি বিনিময় ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্তদের মুক্তি। এছাড়া যারা দীর্ঘ সময় যাবৎ বন্দি আছে এবং যারা “আকসা ফ্লাড” (Aqsa Flood) এর পরবর্তী সময়ে বন্দি হয়েছে তাদেরও মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা।
গাজাকে পুনঃনির্মাণ ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি; যদিও এই শর্তটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কেননা এই কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটি আশঙ্কণীয়।

দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনার অন্য সব শর্তই মূলত মারাত্মক বিষ, যার লক্ষ্য হচ্ছে যায়নবাদীরা এতদিন যা পারেনি তা রাজনৈতিক চালের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করাঃ

  • প্রতিরোধ আন্দোলনের সমাপ্তি ও সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ।
  • ইসরায়েলি সেনা পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাহার না করেই বন্দিদের মুক্তি।
  • গাজার নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ।
  • আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চাপিয়ে দেওয়া।
  • গাজাকে ‘ফিলিস্তিন ইস্যু’ থেকে আলাদা করে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করা।
  • গাজা ইস্যুকে ইসরায়েলের সমরিক দখল, গণহত্যা অভিযান, জাতিগত নিধন, যুদ্ধাপরাধ ও চলমান আগ্রাসনের ফল হিসেবে না দেখিয়ে ইসরায়েলি সংজ্ঞায়নে “ইসরায়েলের নিরাপত্তা” ইস্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা।

আর তৃতীয় কথা হচ্ছে, ট্রম্পের এই কুটিল পরিকল্পনার উপযুক্ত জবাব কি হতে পারে?
এর উত্তর দুই দিক থেকে দেওয়া যায়ঃ

ক) হামাস কিংবা ইসলামিক জিহাদ মুভমেন্ট এর দিক থেকে – যাদের কাছে ইসরায়েলি বন্দিরা রয়েছে।
খ) ভবিষ্যতে গাজার শাসনব্যাবস্থা, তথাকথিত “Day After” পরিকল্পনা, দখলদারিত্বের অবসান ও ইসরায়েলি অথবা আন্তর্জাতিক কোনো আধিপত্য ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কেমন হবে সেই দিক থেকে।
এই সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী মানসিকতার দ্বারা তৈরীকৃত পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখান করা উচিত।

 

একইভাবে, এই জবাবের আবার দুইটি দিক রয়েছেঃ
১) প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য, তাদের বন্দি বিনিময়ের ক্ষেত্রে নিজেদের দেওয়া শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করার অধিকার আছে। এই শর্তগুলো ছিল-

– স্থায়ীভাবে যুদ্ধ, হত্যা ও খাদ্য সংকটের অবসান।
– গাজা থেকে পূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার।
– খাদ্য, ওষুধ, বাসস্থান, জ্বালানি সহায়তার অবাধ প্রবেশ।
– ইসরায়েলি বন্দিদের বিনিময়ে সমস্ত ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি।
– গাজার পুনর্গঠন।

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় এই শর্তগুলোর কয়েকটি থাকলেও, বাকিগুলো অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পুণরায় যুদ্ধ যে শুরু হবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিপূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার এর কথা নেই। পরিকল্পনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তির কথা বলা হয়েছে যাদের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদী সাজাপ্রাপ্ত এবং ৭ অক্টোবরের পর পশ্চিম তীর থেকে বন্দি হওয়া অনেকেই থাকবেন। এক্ষেত্রে আকসা ফ্লাডের পর গ্রেফতারকৃত সকল বন্দিরা মুক্তি পাবেন কিনা তা অনিশ্চিত। পরিকল্পনায় গাজা পুনর্গঠণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা হবে বিদেশী হস্তক্ষেপে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে মূলত নতুন রূপে ‘ডিল অফ দ্যা সেঞ্চুরী’র (Deal of the Century) আলোচনা চলছে যার মাধ্যমে জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি ও মুসলিমদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে।

পরিপূর্ণভাবে যুদ্ধ বন্ধ আর সমস্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির নিশ্চয়তা ছাড়া প্রতিরোধ আন্দোলন কখনোই ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তি দিতে পারে না। বন্দি বিনিময় ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হবে যেন পরিপূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার ও যুদ্ধ বন্ধ নিশ্চিত হয়। কেননা এই বন্দী বিনিময়ই হচ্ছে প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

২) ভবিষ্যতে গাজার কর্তৃত্ব, গাজার সাথে পশ্চিম তীরের সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে অস্পষ্টতা, আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিরোধ সংগ্রামের ভবিষ্যৎ সহ “Day After”- এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় – এসব কেবল হামাস বা প্রতিরোধ আন্দোলন কিংবা মিলিটারি বা রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে কেউ এককভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। সমস্ত ফিলিস্তিনবাসীকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র তারা এই সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার রাখে না, এমনকি এ অধিকার রামাল্লাহর অকার্যকর কর্তৃপক্ষেরও নেই। এই বিষয়গুলোতে প্রত্যেক ফিলিস্তিনির (ফিলিস্তিনের ভেতরের ও বাইরের) মতামত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়া, ফিলিস্তিনিদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, তাদের মুক্তি, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা সহ যেকোনো অধিকারকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং বিদেশি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা গাজা, পশ্চিম তীর, জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সকল প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে হামাস এবং প্রতিরোধ আন্দোলনকে দৃঢ় থাকতে হবে। এই সমস্ত বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ফিলিস্তিনের ভেতরের বাইরের সমস্ত ফিলিস্তিনিদের; কেবলমাত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের নয়, যদিও কোনো কোনো বিষয়ে তাদের আপত্তি থাকে।

আরব দেশগুলো এবং অন্যন্য ইসলামি রাষ্ট্র এবং পৃথিবীর স্বাধীন মানুষদের ইসরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে। ইসরায়েলের ঔদ্ধত্য আর ফিলিস্তিনিদের অধিকার, স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়াতে আমেরিকার একতরফা সহায়তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমেরিকার ভূমিকাকে সমর্থন না করে গাজায় গণহত্যা, ও গণহত্যার নিমিত্তে চালিয়ে যাওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।

এরকম না হলে ফিলিস্তিনি জনগণ কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না, প্রতিরোধ আন্দোলনও পরাজয় মেনে নেবে না। আর যায়নবাদী শত্রুরা গণহত্যা চালিয়েই যাবে। তাহলে গণহত্যা কিভাবে বন্ধ হবে?? শুধুমাত্র গণহত্যাকারী আর তাদের সহযোগী সমর্থকদের উপর চাপ প্রয়োগ করেই এই গণহত্যা বন্ধ করা সম্ভব; নির্যাতিতদের চাপ প্রয়োগ কিংবা তাদেরকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে নয়। আর এটি প্রত্যেকটি মানুষের একটি নৈতিক, আদর্শিক এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব।

 

উপসংহারঃ
এই পরিকল্পনাটি (Day After) গণহত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল যা করতে পারেনি তা রাজনৈতিকভাবে সম্পন্ন করার একটি ধূর্ত প্রচেষ্টা। হামাস, কর্তৃপক্ষ, কিংবা অন্য কোনও দলেরই ফিলিস্তিনিদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। এর সমাধান হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতার অধিকারকে সমর্থন করে আন্তার্জাতিক আইন প্রণয়ন ও আইনি বৈধতার বাস্তবায়ন করে গণহত্যা ও খাদ্য সংকটের অবসান ঘটানো। এটাই হচ্ছে এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকরী রাজনৈতিক পন্থা, যা বাস্তবায়নের উপর সবার জোর দিতে হবে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না যার মাধ্যমে দখলদারিত্ব আর আধিপত্যকে বজায় রাখা হবে, আর গণহত্যা ও জাতিগত নিধনকে বৈধতা দেওয়া হবে।

 

অনুবাদঃ নাজমুস সাকিব নাঈম।

৩৯ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।
Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top