আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫) জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সংগতি রেখে। মানুষ বাস করে স্থলে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ জাতির অধিকারের ব্যাপার হতে পারে না। সমুদ্রে থাকতে হবে সব জাতির জাহাজ চলাচলের সমান অধিকার। কিন্তু একটা দেশের কাছে অবস্থিত সমুদ্রে কিছু দূর পর্যন্ত থাকা উচিত সে দেশের কর্তৃত্ব। কারণ তা না থাকলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশটির নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। প্রত্যেকটি জাতি চায় তার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা চাওয়া হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। যেকোনো আইনে তাই একে নিতে হবে বিশেষ বিবেচনায়।

গ্রোশিয়াসের এই প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা নিয়ে সূত্রপাত ঘটে সমুদ্র আইনের। ঠিক হয় একটা সমুদ্র তীরবর্তী দেশ, সেই দেশ থেকে কামানের গোলা ছুড়লে তা যত দূর গিয়ে পড়বে, সেই দূরত্বের মধ্যে সমুদ্র সীমানা হবে তার নিজের। সেখানে থাকবে তার কর্তৃত্ব। সে সময় কামানের গোলা খুব বেশি দূর যেত না। সাধারণত কামানের পাল্লা ছিল পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু ক্রমেই কামানের পাল্লা বাড়তে থাকে। আর সমুদ্র আইনে দেখা দেয় জটিলতা। এখন একটা দেশের সমুদ্র নিয়ে হয়েছে অনেক সুস্পষ্ট আইন। আইন না বলে একে আসলে বলা উচিত কনভেনশন বা প্রথা। গঠিত হয়েছে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল “International Tribunal for the Law of the Sea”, সংক্ষেপে (ITLOS)। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই এই ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত। এই দুই দেশই মেনে নিয়েছে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের অধিকার।

বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার জন্য এই ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল মিয়ানমারের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবরে। মামলার রায় এখন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বিরোধ ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার। আর মিয়ানমার পেয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। এই রায়ে এই দুই দেশের কেউ-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হারজিত হয়নি কারো। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে বলছে, এই রায়ে বাংলাদেশ জিতেছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
সমুদ্রতীরবর্তী একটা দেশের ভূমির কিছুটা অংশ থাকে সমুদ্রের পানির মধ্যে। এখানে সমুদ্রের গভীরতা সাধারণত থাকে ১৮০ মিটারের কাছাকাছি। সমুদ্রের পানির মধ্যে একটা দেশের ডুবে থাকা এই অংশকে বলে মহীসোপান (Continental Shelf)।

মহীসোপান ঢালুভাবে নেমে যায় সমুদ্রের মধ্যে। এই ঢালু জায়গাকে বলা হয় মহীঢাল (Continental Slope)। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে দু’ভাবে। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়। বিশেষ করে ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ ডাঙার যে অংশে এসে আছড়ে পড়ে সেই অংশে। কারণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ডাঙার এই অংশ ক্ষয় হয়। এখানে এসে জমতে পারে সমুদ্রের পানি অগভীরভাবে। আবার মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে জমে। আমাদের দেশে সমুদ্র উপকূলে মহীসোপান বেড়ে চলেছে। এটা হতে পারছে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে এসে জমার ফলে। পলিমাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে সমুদ্র। ফলে বাড়ছে বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ। বাংলাদেশ সমুদ্রের যে অংশ পেল, নদীবাহিত পলিমাটি জমে সমুদ্র ভরাট হয়ে একদিন সেখানে জেগে উঠবে মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি। সেটা হবে বাংলাদেশেরই অংশ। আপাতত সমুদ্রের যে এলাকা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ পেতে পারল, সেখানে বাংলাদেশের জেলেরা গিয়ে অবাধে মাছ ধরতে পারবে, যা অনেক পরিমাণে পূরণ করবে বাংলাদেশের মৎস্যের চাহিদা। সমুদ্রের পানির নিচে এখন যে অংশ আছে, সেখানে পাওয়া যেতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল, যা উঠাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে পারবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

ভারতের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেনি। কারণ ভারত চায়নি এই ট্রাইব্যুনালে যেতে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হেগে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। এই আদালত যে রায় দেবে ভারত তা না-ও মানতে পারে। কারণ কোনো দেশ এই আদালতের সালিশ মানতে সেভাবে বাধ্য নয়। বাংলাদেশ তাই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার সমুদ্রের ওপর অধিকার যেভাবে পেতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে তা পেতে পারবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে গিয়ে ভুল কাজ করেনি। কারণ তার নৌবহর এমন শক্তিশালী নয় যে, সে সামরিক শক্তিবলে ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের তাই নির্ভর করতে হবে আন্তর্জাতিক সালিস আদালতেরই ওপর।

মিয়ানমার ও ভারতের ইতিহাস ভিন্ন। মিয়ানমার বা বার্মা একসময় ছিল ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। যেমন প্রদেশ ছিল বাংলা। মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ-ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কিন্তু মিয়ানমার ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। থাকে না আর ব্রিটিশ-ভারতের একটি প্রদেশ হয়ে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ-ভারত থেকে হতে পেরেছিল পৃথক। যদি সে এভাবে পৃথক হতে না পারত তবে ভারত হয়তো এখন দাবি করত মিয়ানমারকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। যেমন সে দাবি করছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে।

মিয়ানমারের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমানা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশকে যেমন ভারত তিন দিক থেকে ঘিরে আছে, মিয়ানমার সেভাবে ঘিরে নেই। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ নেই। কিন্তু ভারতের সাথে বাংলাদেশের আছে ঐতিহাসিক বিরোধ। মিয়ানমারের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের চার গুণের বেশি। কিন্তু মিয়ানমার তা বলে চাচ্ছে না বাংলাদেশকে দখল করে তাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু ভারত স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। তাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে উঠছে কঠিন। ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা হওয়াও তাই যে সহজ হবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। সেখানেও দু’টি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ বাধার সৃষ্টি করতে পারে।

মিয়ানমারের যে প্রদেশকে আমরা বলি আরাকান, আর মিয়ানমার এখন বলে রাখাইন, তার সাথে আমাদের আছে সাধারণ সীমানা। কিন্তু এই সীমানা নিয়ে এখন আর কোনো বিরোধ নেই। এটা নিষ্পত্তি হতে পেরেছে পাকিস্তান আমলে। আরাকানি মুসলমানদের সাধারণভাবে বলা হয় রোহিঙ্গা। সাধারণ বৌদ্ধ আরাকানি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের ফলে ১৯৯১ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, যাদের অনেকে এখনো আরাকানে ফিরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে এদের যাপন করতে হচ্ছে খুবই করুণ জীবন। তবে বার্মার সাথে এ নিয়ে বাংলাদেশ জড়াতে চাচ্ছে না বিবাদে। ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের দোহাজারী রেলস্টেশন থেকে আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ স্থাপনের একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান মিয়ানমারকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে। আরাকানসহ সমস্ত মিয়ানমার ১৯৪২ সালে চলে যায় জাপানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকেছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। এরপর বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের। এ রকম রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে ভৌগোলিক কারণে বাড়বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমাণ। আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

আরাকানের সাথে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এখনো সহজ হতে পারেনি। বাংলাদেশের সাথে আরাকানের রেল যোগাযোগ হলে আরাকানে ব্যবসায়-বাণিজ্য তাই বাংলাদেশের সাথে বেড়ে যেতেই চাইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য সৃষ্টি করবে উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর বিশেষ পরিবেশ। ভারত সম্ভবত চাচ্ছে না এ রকম মৈত্রীর বন্ধন গড়ে ওঠা। তাই বাংলাদেশে ভারতঘেঁষা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিল, মিয়ানমার মানতে ইচ্ছুক নয় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়। মিয়ানমার সৈন্যসমাবেশ করছে আরাকান-বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন্তু আরাকানে এ রকম সৈন্যসমাবেশ মিয়ানমার ঘটায়নি। এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমরা মিয়ানমারের সাথে কোনো সংঘাত চাই না। আমরা কোনো সংঘাত চাই না ভারতেরও সাথে।

তাই আমরা মামলা করেছি আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে। আইনের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আসতে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন আসলে কোনো আইন কি না তা নিয়ে আছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক। কারণ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারী দেশকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শাস্তি প্রয়োগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আইনের পক্ষে শক্তির সমর্থন না থাকলে আইনের বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হতে বাধ্য। সমুদ্র আইন আছে, কিন্তু সমুদ্র আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তি প্রদানের কোনো ব্যবস্থা এখনো নেই।

৭৮১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ (২৯ ডিসেম্বর ১৯২৯ – ১৫ আগস্ট ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী। তাঁর রচনা ও বক্তৃতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাজীবন

১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা সংঘ বিষ্ণুপুর থেকে বি. কোর্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা সে সময়ের মাধ্যমিক শিক্ষার সমমান ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তেজগাঁও কৃষি ইনস্টিটিউট থেকে কৃষিবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপে গমন করেন এবং উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।

ফ্রান্সে চার বছর ধরে প্ল্যান্ট ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শেষে তিনি পুয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন

১৯৬৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ১১ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন এবং সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

এবনে গোলাম সামাদের পিতা মোহাম্মদ ইয়াসিন পেশায় একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন এবং তাঁর মাতার নাম নছিরন নেসা। তাঁর বড় বোন দৌলতুননেসা খাতুন ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক ও সমাজকর্মী।

লেখালিখি ও চিন্তাধারা

এবনে গোলাম সামাদ মূলত একজন কলাম লেখক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর প্রায় একশত গবেষণা প্রবন্ধ এবং প্রায় পনেরোটি গ্রন্থ দেশ ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি ছিল তাঁর লেখার প্রধান বিষয়বস্তু। তিনি দীর্ঘদিন ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

তাঁর লেখায় মুক্তচিন্তা ও প্রশ্নমুখর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বাংলা একাডেমির ভূমিকা সম্পর্কেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।

ইতিহাস বিশ্লেষণে তাঁর রচনাশৈলী পাঠকের জন্য যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনি উপভোগ্য। ভারতীয় জাতীয় সংগীত ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাস, কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল গভীর ও চিন্তাজাগানিয়া।

গ্রন্থসমূহ

উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র হয়েও তিনি শিল্পকলার ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ নিচে দেওয়া হলো—

  • বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি
  • আত্মপক্ষ
  • আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
  • বাংলাদেশ: সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি প্রতিক্রিয়া
  • মানুষ ও তার শিল্পকলা
  • নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ
  • প্রাথমিক জীবাণুতত্ত্ব
  • বায়ান্ন থেকে একাত্তরli>
  • ইসলামী শিল্পকলা(১৯৭৮)
  • শিল্পকলার ইতিকথা(১৯৬০)
  • এবনে গোলাম সামাদ রচনাসমগ্র (১–৩ খণ্ড)
পদক ও পুরস্কার

তাঁর চিন্তাচর্চা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (চট্টগ্রাম, ২০০৯) লাভ করেন।

মৃত্যু

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট রোববার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

Picture of এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ (২৯ ডিসেম্বর ১৯২৯ – ১৫ আগস্ট ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী। তাঁর রচনা ও বক্তৃতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাজীবন

১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা সংঘ বিষ্ণুপুর থেকে বি. কোর্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা সে সময়ের মাধ্যমিক শিক্ষার সমমান ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তেজগাঁও কৃষি ইনস্টিটিউট থেকে কৃষিবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপে গমন করেন এবং উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।

ফ্রান্সে চার বছর ধরে প্ল্যান্ট ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শেষে তিনি পুয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন

১৯৬৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ১১ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন এবং সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

এবনে গোলাম সামাদের পিতা মোহাম্মদ ইয়াসিন পেশায় একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন এবং তাঁর মাতার নাম নছিরন নেসা। তাঁর বড় বোন দৌলতুননেসা খাতুন ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক ও সমাজকর্মী।

লেখালিখি ও চিন্তাধারা

এবনে গোলাম সামাদ মূলত একজন কলাম লেখক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর প্রায় একশত গবেষণা প্রবন্ধ এবং প্রায় পনেরোটি গ্রন্থ দেশ ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি ছিল তাঁর লেখার প্রধান বিষয়বস্তু। তিনি দীর্ঘদিন ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

তাঁর লেখায় মুক্তচিন্তা ও প্রশ্নমুখর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বাংলা একাডেমির ভূমিকা সম্পর্কেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।

ইতিহাস বিশ্লেষণে তাঁর রচনাশৈলী পাঠকের জন্য যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনি উপভোগ্য। ভারতীয় জাতীয় সংগীত ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাস, কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল গভীর ও চিন্তাজাগানিয়া।

গ্রন্থসমূহ

উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র হয়েও তিনি শিল্পকলার ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ নিচে দেওয়া হলো—

  • বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি
  • আত্মপক্ষ
  • আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
  • বাংলাদেশ: সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি প্রতিক্রিয়া
  • মানুষ ও তার শিল্পকলা
  • নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ
  • প্রাথমিক জীবাণুতত্ত্ব
  • বায়ান্ন থেকে একাত্তরli>
  • ইসলামী শিল্পকলা(১৯৭৮)
  • শিল্পকলার ইতিকথা(১৯৬০)
  • এবনে গোলাম সামাদ রচনাসমগ্র (১–৩ খণ্ড)
পদক ও পুরস্কার

তাঁর চিন্তাচর্চা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (চট্টগ্রাম, ২০০৯) লাভ করেন।

মৃত্যু

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট রোববার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top