ব্রিটিশ উপনিবেশ-পূর্ব বাংলাদেশ প্রায় দীর্ঘ দুইশত বছর ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন জুলুম, গণহত্যা ও নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে। এই দীর্ঘ সময়ের পর ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর যে স্বাধীনতা আমরা লাভ করি, এবং ১৯৭১ সালে নতুন করে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়, এসব বৃহৎ স্বাধীনতার পরও উপনিবেশ নানা রূপে আমাদের মধ্যে রয়ে গিয়েছেছে। একে আমরা নয়া উপনিবেশ বলে আখ্যায়িত করে থাকি। এ অঞ্চলে মুক্তির জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যতগুলো সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, ফকির মজনু শাহর আন্দোলন, কারামত আলী জৈনপুরীর আন্দোলন, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীরের সংগ্রাম, তরিকতে মুহাম্মাদিয়া, মাদরাসায়ে রহীমিয়া; প্রতিটি উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। এর বাইরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ, নানা ধরনের ওয়াকফ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ সংগ্রাম আজকের দিন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু ১৯৪৭-এর পর নয়া উপনিবেশের মাধ্যমে বহু বিষয় আমাদের মধ্যে স্থায়ীভাবে বিদ্যমান হয়ে গেছে। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া আইন ও প্রশাসন, তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতি তথা ব্রিটিশ একাডেমির প্রতিটি School of Thought এখনো আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। উদারপন্থার স্লোগানের আড়ালে তারা লিবারেলিজম নামক এক ধরনের ‘ধর্ম’ আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। পুঁজিবাদী দাসত্বের এক নতুন শৃঙ্খলে আমাদের আবদ্ধ করা হয়েছে, ফ্রি মার্কেটের নামে কৃষি, সব ধরনের পণ্য, পরিবেশ ও খনিজ সম্পদে লাগামহীন শোষণ চলছে।
লিবারেলিজম এমন এক ধর্ম, যার গণ্ডি থেকে বাংলাদেশে আমরা কোন অর্থেই বের হয়ে আসতে পারছি না। পুঁজিবাদ এমন এক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মানুষ ক্রমাগত নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছে। তাদের প্রতিটি School of Thought; যেমন- অ্যাংলো-সেকশন ধারা, ওরিয়েন্টালিস্ট ধারা, মিশনারি ইভাঞ্জেলিক্যাল ধারা, লিবারেল ইউটিলিটারিয়ান ধারা, জাতীয়তাবাদী ও সংস্কারবাদী কিছু ধারাসহ তাদের একাডেমিয়া আমাদের চিন্তার জগৎ ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলশ্রুতিতে উপনিবেশিক মানসিকতার এই চিন্তাধারার মধ্য দিয়েই অধিকাংশ মিডিয়া তাদের সংস্কৃতিক ও প্রচারকার্য অব্যাহত রেখেছে।
প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও একই চিত্র বিদ্যমান। যে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল, সেই প্রযুক্তিই আজ অর্থনৈতিক শোষণ, চিন্তা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই নয়া উপনিবেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম সমাজ। আমাদের সাংস্কৃতিক আবহ পাশ্চাত্যের আকাশছোঁয়া সংস্কৃতির কাছে পরাজিত হচ্ছে। মিলাদ, আমাদের উৎসবসমূহ, রুহানি দিবস, আধ্যাত্মিক মিলনমেলাগুলো ক্রমে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ওয়াকফভিত্তিক সমাজকাঠামো, ন্যায়ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা, উৎপাদন ও সুষ্ঠু বণ্টননীতির ভয়াবহ সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এর ফল হিসেবে বেকারত্ব, অনিরাপত্তা, হতাশা, পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা, জমি নিয়ে বিরোধ এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ভেঙে পড়ার মতো সংকট প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় বড় মার্কেট, কোম্পানি ও হাসপাতাল গড়ে উঠলেও মাত্র ৫–৬ শতাংশ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারছে। অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না।
ধর্মীয় অঙ্গনেও পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্যের তৈরি রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে গত একশ বছর ধরে বিশেষ করে ওরিয়েন্টালিজম ও ব্রিটিশ সালাফিজমের প্রভাবে এমন পরিস্থিতি হয়েছে, যার ফলে আমাদের ধর্মীয় আধ্যাত্মিক প্রভাব, আখলাকি দৃষ্টিভঙ্গি, উসূল ও মাকাসিদভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো, সুফি ও আলেমদের সামাজিক কর্মসূচি এবং ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের সিলসিলাসমূহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর বিপরীতেও বহু আন্দোলন, বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বহু ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগ মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু একটি সূক্ষ্ম বিষয় আমাদের নতুন করে অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় আমাদের সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতা না দিলেও, স্বাধীনতার সংজ্ঞা আমাদের শিখিয়ে গেছে তাদের মতো করে। তারা বোঝাতে চেয়েছে, স্বাধীনতা মানেই রাজনৈতিক কিছু কর্মকাণ্ডের সফলতা। কিন্তু অর্থনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও চিন্তার ধারায় উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ তারা রেখে গেছে।
ফলস্বরূপ আমরা ভুলে গেছি প্রকৃত স্বাধীনতা কী। উপনিবেশ আমলে অর্থনৈতিক শত্রু, শিক্ষা ও ধর্মীয় সংকট, আইন ও প্রশাসনের প্রকাশ্য শত্রু চিহ্নিত করা যেত। কিন্তু নয়া উপনিবেশে শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন, কৃষি, প্রতিরক্ষা; সব ক্ষেত্রে শত্রুকে আড়াল করা হয়েছে ব্রিটিশ-জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মাধ্যমে। ফলে আমরা ধরে নিয়েছি, শুধু রাজনৈতিক কিছু কর্মসূচির সফলতাই মুক্তির পথ- যা আমাদের বারবার ভুল পথে চালিত করেছে।
এই অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত ও সমাজনির্ভর। আমাদের সমাজ, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের রাষ্ট্রকাঠামোতে সে অর্থে সমাজ নেই, তাদের আছে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাই তাদের সাংস্কৃতিক এজেন্ডা সমাজবিচ্ছিন্ন ও অশ্লীলতায় ভরপুর। অথচ আমাদের সংস্কৃতি মানুষকে কাছে টানে, ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে, আখলাক, আদব, ইনসানিয়াত, পারিবারিক বন্ধন ও আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এবং এসব কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পও নয়।
মানুষকে আদব শেখানো, ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এসব কাজ রাজনীতি দিয়ে সম্ভব নয়। এগুলো ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান, আলেম, শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। রাজনীতির বাইরেও আমাদের বিশাল দায়িত্ব ও কর্মযজ্ঞ রয়েছে, যা মুসলিম সমাজের জন্য অপরিহার্য। সুতরাং কেবল রাজনৈতিক পরিসরে সব পরিবর্তন সম্ভব; এই ধারণা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ জায়োনিস্ট শক্তি।
তবু প্রশ্ন থাকে, রাজনৈতিক আত্মপরিচয় কি থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। রাজনীতি আবশ্যকীয় এবং রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও যুগযুগ ধরে চলে আসা গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। তবে আমরা রাজনীতি করব ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী, পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী নয়। এরিস্টটল বলেছিলেন এবং যা আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার মূলনীতি! তাহল, Homo est animal politicum (মানুষ স্বভাবগতভাবেই রাজনৈতিক প্রাণী)। জন পিলিটকন ভাষ্যমতে, Man is essentially a political being (মানুষ মূলত একটি রাজনৈতিক সত্তা)।
কিন্তু ইসলামী সভ্যতার দার্শনিক আলেমগণের কথা হল, “الإنسانُ مَدَنِيٌّ بِالطَّبْعِ” (মানুষ স্বভাবগতভাবেই সভ্যতা-নির্ভর, অর্থাৎ সভ্যতা গড়ে তুলে চায়) মানুষ মাত্রই সভ্যতা নির্মাণকারী। রাজনীতি সেই সভ্যতার একটি অংশ মাত্র; পরিবার, সমাজ ও ভ্রাতৃত্বও তার অংশ। সুতরাং সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজনীতিকে আমরা একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করি, রাজনীতিকেই ইসলাম বা সম্পূর্ণ সভ্যতা মনে করা ইসলামের চিন্তাধারায় কখনোই ছিল না।
এখন আমাদের লক্ষ্য এই সভ্যতার জাগরণ। জ্ঞান ও চিন্তা, আখলাক, পরিবার, সমাজ, আইন, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতি সবই এই জাগরণের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের পথে আমাদের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা কতটুকু এবং কীভাবে হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। তাই রাজনীতির সংজ্ঞায়নের শুরুতেই যে বিষয়টি আসে—
- রাজনীতি হল, জাতির আত্মবিশ্বাস গঠনের একটি প্রক্রিয়া এবং জাতীয় স্বপ্নকে সকল মানুষের নিকটে পৌঁছানোর মাধ্যম। এগুলো মূলত রাজনৈতিক সচেতনতার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে, তবে এ জাতীয় স্বপ্নের পাঠাতন তৈরি হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতিক ভিত্তিমূল থেকে।
- একইভাবে মুক্তি সংগ্রাম, অর্থাৎ জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সংগ্রামও রাজনীতি। জাতীয় সংকট নিরসন, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও রাজনীতি।
- রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনাকারী নেতৃত্বের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাকেও রাজনীতি বলা হয়।
আর উপরোক্ত বিষয়সমূহ দুনিয়ার সকল স্থানে, সকল সংস্কৃতিতে একইভাবে প্রযোজ্য। রাজনৈতিক পন্থা অঞ্চলভেদে, দেশভেদে, প্রেক্ষাপট ও বয়ানভেদে ভিন্ন হলেও মূলনীতি ও লক্ষ্যসমূহ একই।
উপনিবেশ উত্তর দেশগুলি কিংবা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ মূলনীতিগুলো যেভাবে প্রযোজ্য, সৌদি-আরবের মতো রাজতান্ত্রিক দেশেও এ মূলনীতিগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। আবার কমিউনিজম দ্বারা প্রভাবিত চীনের ক্ষেত্রে এই মূলনীতি যেমন প্রযোজ্য, তেমনি দারিদ্র্য পীড়িত বিভিন্ন দেশেও এই একই মূলনীতিগুলো প্রযোজ্য।
আবার যদি আমরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড অথবা ভারতের কোনো সাধারণ রাজ্যের কথা বলি, সকল জায়গাতে একই মূলনীতি প্রয়োগ করে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এখন এ মূলনীতিগুলো যদি নির্ধারণ করতে পারি, তাহলে প্রেক্ষাপটগত কারণেই বাংলাদেশের পরিস্থিতির আলোকে আমাদের সামনে প্রশ্ন আসবে, এ দেশের ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা কী হবে? বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে আমার মুক্তি সংগ্রামের পন্থা কী হবে? আমাদের করণীয় দিকসমূহই-বা কী? ইত্যাদি।
আমরা যুগ-যুগ ধরে চলে আসা সংগ্রামের প্রেক্ষিতে একটি সংগ্রামী জাতি, অর্থাৎ বাংলা অঞ্চলের মানুষ, বাংলার ভূখণ্ড মূলত একটি মুক্তি সংগ্রামের ফসল। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় যাবৎ এ অঞ্চলের মানুষ স্ব-স্ব সংকট ও পরাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরে প্রতিটা সময়েই এ সংগ্রাম অব্যাহত ছিলো।
আবার যখন ইসলামী সভ্যতার পতন হয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীর শোষনের উত্থান হয়, তখনও সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ এ বাংলা অঞ্চল থেকেই গড়ে উঠেছিলো। এ বাংলা অঞ্চলের মাটি সে মাটি, যে মাটির এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে কাফন বিহীন শহীদেরা ঘুমায় না! পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, পাকিস্তান আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন– প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা মুক্তির জন্য রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে লড়াকু সৈনিক হিসেবে আত্মবিশ্বাসের সাথে সংগ্রাম পরিচালনা করেছি।
তাই এ সময়ে এসে আমাদেরকে ঠিক করতে হবে যে, আমরা মূলত কিসের মুক্তি চাচ্ছি এবং কিসের ভিত্তিতে মুক্তি চাচ্ছি!
মুক্তির এ সুনির্দিষ্ট বয়ান হাজির করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আবশ্যকীয় কাজ।
আর এটি নির্ধারণ করতে গেলেই প্রশ্ন এসে যায়, মুক্তির বয়ানকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তুত করবো?
তা হল, আমাদের দেশ ও জাতিকে পর্যালোচনা করে নতুন একটি ইশতেহার নিয়ে আসতে হবে, যা গোটা জাতির ভিশন হিসেবে প্রস্ফুটিত হবে। এবং সে অনুযায়ী কর্মপন্থা তুলে ধরতে হবে।
এক্ষেত্রে প্রথম কাজই হলো–
এ বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান ও চিন্তা থাকতে হবে, আর এ জ্ঞান ও চিন্তা হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, অর্থাৎ ব্রিটিশ একাডেমিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত। কারণ এ স্বাধীনতা যদি না থাকে, আমরা মূল আলাপের দিকে অগ্রসর হতে পারবো না।
আর আমরা ইসলামী সভ্যতার সন্তান হিসেবে জ্ঞানকে কখনো অব্জেক্টিভ কোনো বিষয় হিসেবে চর্চা ও প্রয়োগ করবো না, বরং জ্ঞানকে অনেকগুলো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চর্চা ও প্রয়োগ করবো। যেমন– মা’রেফাতুল্লাহ, তাযক্বিয়াতুন নাফস, আমলে সালেহ ইত্যাদি।
পাশ্চাত্য যেভাবে রাজনীতির উদ্দেশ্যে, বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জ্ঞানকে ব্যবহার করে এবং বিশ্ববাসীর উপরে নিজেদের সুবিধার্থে রচিত জ্ঞানের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেয় ও সে আলোকে চিন্তা করতে বাধ্য করে, তা করা যাবে না। আমাদের জ্ঞানকে কোনোভাবেই নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সম্পদের পরিণত করা যাবে না। যেমন– কেউ যদি তাসাউফ অর্জন করতে চায় বা তাসাউফের মাধ্যমেই নাফসের তাড়না থেকে মুক্তি পেতে চায়, তাহলেও সে জ্ঞান আর পন্থা অবলম্বন করতে হবে, যে জ্ঞান আর পন্থা মুক্তি লাভের জন্য আবশ্যক।
আবার একইভাবে বলা যায়, মাযহাব ইসলামী সভ্যতার অন্যতম একটি বিষয়। মাযহাব হল, দ্বীনের বসবাসকৃত একটি রূপ। অর্থাৎ, আমি দ্বীনকে কীভাবে বাস্তবে রূপান্তরিত করবো তার একটি লিখিত ভাষাই মাযহাব। এক্ষেত্রে ফিকাহ, কালাম, উসূল ইত্যাদি জ্ঞান এর অন্তর্ভূক্ত। জ্ঞান এসব ক্ষেত্রে উপরিভাগে থেকে মুক্তির দিশা দিচ্ছে, সেদিকে সঞ্চালিত করছে, সমাজকে বসবাস উপযোগী করার রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং যুগোপযোগী যথেষ্ট জ্ঞান ও চিন্তা আমাদের সামনে হাজির থাকা আবশ্যক।
এবং এ আবশ্যকীয়তার সাথে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, আমরা মুক্তি আন্দোলন বলতে যা বুঝে থাকি, তা এককেন্দ্রিক কোনো বয়ান দিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, বরং জ্ঞান, আখলাক, রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ এ জাতীয় সকল বিষয়ে মুক্তির বয়ান হাজির করতে হবে।
সুতরাং এ মুক্তি আন্দোলন বিষয়টির ব্যাখ্যা মূলত আপেক্ষিক। কারো কাছে স্বাধীনতা আন্দোলন মানে মুক্তি, কারো কাছে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা মানে মুক্তি, কারো কাছে তার দলকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় আনাটাই মুক্তি, কারো কাছে সবাই ইবাদাত করবে– এটিই মুক্তির একমাত্র মূলমন্ত্র, কারো কাছে সহীহ আকিদা প্রচারই মুক্তি। আবার শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে, ১৯০০-এর দিকে ব্রিটিশ আমলে যে প্রভাবশালী ধারাগুলো ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল- অ্যাংলো-সেকশন ধারা, ওরিয়েন্টালিস্ট ধারা, মিশনারি ইভাঞ্জেলিক্যাল ধারা, তথা লিবারেল ইউটিলিটারিয়ান ধারা, অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ও সংস্কারবাদী কিছু ধারা; এই প্রত্যেকটি ধারাই কিন্তু ব্রিটিশ জায়োনিস্টদের সৃষ্ট ধারা এবং এসবের আলোকেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশ একাডেমিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে ইসলামী সভ্যতার মিরাসের আলোকে গড়ে উঠবে, উসূল ও মাকাসিদের আলোকে একটি মুক্তি নিয়ে আসবে, এটিও একটি মুক্তি আন্দোলন।
দ্বিতীয় কাজ হলো–
কিছু প্রশ্নের ব্যাখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।
এ মুক্তি আন্দোলন বিষয়টির আপেক্ষিক তত্ত্বের সাথে রাজনৈতিক আইডেন্টিটির সম্পর্ক কী? এবং রাজনীতি করার মাধ্যমে যে মুক্তি চাওয়া হচ্ছে, এটিই কি একমাত্র মুক্তি? ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলাই কি মুক্তির একমাত্র উপায়? তাহলে সমাজসহ অনান্য ক্ষেত্রে মুক্তি কিভাবে আসবে? রাজনীতি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থা নেই? যদি থাকে, সে পন্থাটা কী?
এক্ষেত্রে প্রথম কথা হল, মুক্তির অনেক পন্থা রয়েছে এবং সবগুলিই স্বতন্ত্র ও আবশ্যক, একেকজনকে একেকটি নিয়ে সংগ্রাম চালাতে হবে, রাজনীতি তার একটি। আবার এ রাজনীতি প্রচলিত ধারার রাজনীতি নয়, বরং পূর্বে উল্লেখিত স্থায়ী মূলনীতির আলোকে পরিচালিত রাজনীতি। এক্ষত্রেও প্রশ্ন আসে, আমাদের দেশে আমরা যারা রাজনীতি করছি, তারা কি সত্যিই স্থায়ী মূলনীতির আলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি? আমাদের অর্থনীতি, গার্মেন্টস, কৃষি, বেকারত্ব, খনিজ সম্পদ, নগর, বন্দর থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগনের রাজনৈতিক দলের কাছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে যে চাহিদা, সেটি কি আমরা পূরণ করতে পারছি? নাকি শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতি কিংবা দলীয় কিছু কার্যক্রমকেই আমরা রাজনীতি মনে করছি? তাহলে কি অবস্থা এ রকম নয় যে, রাজনীতিতে সবই আছে, শুধু রাজনীতিই নেই! রাজনীতি অন্তঃসারবিহীন একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি আলাপ প্রাসঙ্গিক এবং জরুরী।
- নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলে না থেকেও স্থায়ী মূলনীতির আলোকে পরিচালিত রাজনৈতিক কার্যক্রম ভালোভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে এবং অনেকে তা করছেও।
তাই কেউ তা করতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া যাবে না, বরং সবার জন্য এ পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। কারণ চিন্তা করার বহু ক্ষেত্র রয়েছে, মুক্তি সংগ্রামের কাজের জন্য বহু ক্ষেত্র রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের কোনো বিষয় অথবা ভাষাকেন্দ্রিক কোনো বিষয়ে কাজ করেও একজন ব্যক্তি মুক্তির উছিলা খুঁজে পেতে পারে ও সমাজে বহু অবদান রাখতে পারে, এবং সে আলোকে যদি সে বহু ব্যক্তি তৈরি করে, প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, একটি প্রজন্ম তৈরি করে, তাহলে সেটিও অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং মুক্তির সংগ্রামের কাজের ক্ষেত্রে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় বলে আমি মনে করি।
- রাজনীতি মানেই শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতি কিংবা বিপ্লব বা সশস্ত্র যুদ্ধ; এগুলো আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে না। স্থায়ী মূলনীতির আলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে শুরুতে যে আলাপ করেছি, সেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য একটি মাধ্যম হতে পারে– ভোট, বিপ্লব বা সশস্ত্র আন্দোলন। কিন্তু এগুলোকে একমাত্র পন্থা হিসেবে দাঁড় করালে তা মূলত জাতির চিন্তাধারাকেই গুলিয়ে ফেলা হয়। রাজনীতির বাইরের বিশাল অংশকে অলস, কাজহীন ও সংগ্রামহীন করে তুলে; এক ধরনের আধুনিক বৈরাগী গোষ্ঠী তৈরি হয়। একই সঙ্গে সকল দায়িত্ব ও দায়ভার রাজনৈতিক নেতাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এক ধরনের অবাস্তব মানসিক তৃপ্তি খুঁজে ফেরে! এবং নিজেকে রিলাক্স করে নিজের কাজ খুজে পায়না। অথচ এসকল মানসিকতাই এ অঞ্চলের আধ্যাত্মিকতা, ব্যক্তি গঠন, ওয়াকফ আন্দোলন এবং শক্তিশালী সমাজ গঠনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
- রাজনীতি মূলত একটি উপায়, একটি পন্থা এবং সমাজের অনান্য ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল।
এটিই জাতির একমাত্র ও সামগ্রিক উদ্দেশ্য বা ভিশন নয়। কেউ যদি মনে করে, আমি একটি দলের নেতা, আমার দল ক্ষমতায় আসীন হলেই দেশ আমূল পরিবর্তন হয়ে যাবে, সব কিছু সংস্কার হয়ে যাবে, তা মূলত চিন্তার বাতুলতা ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়! কারণ এ-ই বইরে বিশাল সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান, যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক ভুল ব্যাখ্যা ও চিন্তার বাতুলতার জন্মই হয়েছে ব্রিটিশ আমলে, এরপূর্বে সুলতানী আমলে আমরা সবকিছুই সমান গুরুত্ব দিয়েছি। ব্রিটিশরাও আমাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে স্বাধীনতা মানে হচ্ছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আর, এই বিষয়টিকে আত্মস্থ করার কারণে ৪৭, ৭১, ৯০ এবং ২৪ সালে একই রকম ভুল করেছি যে, রাজনীতির বাইরে গিয়ে যে বিষয়গুলো প্রয়োজন, জাতির ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করবে, সে বিষয়ে আলাপ করতে পারিনি।
১৯৪৭ এর স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ০৬ টি অভ্যুত্থান ঘটেছে, ভাষা আন্দোলন হয়েছে, এবং নানাবিধ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শিক্ষা; বাংলা ভাষার জাগরণ ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণের যে আহ্বান, তা আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণের সংগ্রামও আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাকিস্তান আমলের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে কিছুটা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা একাত্তরের পরেও বৃটিশদের মেথড অনুযায়ী একই ধরনের প্রশাসন, আইন ও অর্থনৈতিক কাঠামো বহাল থাকায় বিষয়গুলো নিয়ে কোনো মৌলিক সংস্কার বা পুনর্গঠন হয়নি। এর ফলেই আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো ক্রমশ দুর্বল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
যেমন, সমাজের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল– ব্যক্তির গঠন; এটা সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির উর্ধ্বে। এবং এ গঠন প্রক্রিয়া, এটি ব্যতীত কিন্তু কখনো একটি রাষ্ট্র বা একটা সমাজ দাঁড়াতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শিক্ষকদের ভূমিকা, আলেম এবং সমাজ চিন্তকদের ভূমিকা। এসব ভূমিকা রাখার জন্য প্রয়োজন প্রচুর প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষ গঠনের জন্য কাজ করবে, পেট্রোনাইজ করবে, উদ্যোগ গ্রহণ করবে, নানাভাবে কর্মসূচি দিবে। এর মধ্যদিয়ে আলেমগণ, শিক্ষকগণ, চিন্তাবিদগণ মানুষকে গড়ার জন্য, প্রজন্মকে একটি আলোকদীপ্ত রাস্তার দিকে এগিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাবে। আর, এখান থেকেই মূলত সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব, আখলাকের বিনির্মাণ হয়। সুন্দর সংস্কৃতির জন্ম দেয়।
এ প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ কখনোই দাঁড়াতে পারে না। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শিক্ষকদের ভূমিকা, আলেম ও সমাজচিন্তকদের ভূমিকা অপরিহার্য।
তাহলে এটাই স্পষ্ট যে- জ্ঞান, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির গঠন; এই তিনটি বিষয় পরস্পরের পরিপূরক। রাজনীতি এখানে সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু এসব রাজনীতির মুখাপেক্ষী নয়, বরং রাজনৈতিক সকলকিছুই জ্ঞান, ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির গঠন এর উপর নির্ভরশীল।।
কিন্তু বৈশ্বিক বাস্তবতা ও এককেন্দ্রিক দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে, দুনিয়া জোড়া সমাজ পরিবর্তন করার জন্য যে রাজনীতি ছাড়া অন্য কোনো পন্থা নেই– এটি একটি ধ্রুব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা৷ মানুষকে আজ বোঝানোই যাচ্ছে না যে, রাজনীতি ছাড়া অন্য পন্থায়ও সমাজ পরিবর্তন করা যেতে পারে, আরো অনেক অনেক পন্থা রয়েছে যা মুক্তির দিকে, জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দিকে ধাবিত করে। এ অর্থে ইসলামী সভ্যতার মহান দার্শনিক আলেমদের ভাষ্যানুযায়ী আমাদের উপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো বর্তমান মুসলিম সমাজকে এই চিন্তা থেকে বের করে নিয়ে আসা, অর্থাৎ পাশ্চাত্য সভ্যতার শোষণ থেকে যদি আমরা মুক্তি পেতে চাই, তাহলে শুধুমাত্র ছোট এবং খণ্ডিত আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের চিন্তাগত আখলাকী আন্দোলনকে সঠিকভাবে সকল স্তরে পৌঁছে দিতে হবে এবং এর কোনোই বিকল্প নেই। এ এক বিষয়ের মধ্য থেকেই মূলত অন্যান্য বিষয় উৎসারিত হয়। এজন্য উস্তাজ ত্বহা আব্দুর রহমান মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক জাগরণ চিন্তাগত ও আখলাকী আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। এবং তিনি বলেছেন, “আমরা যদি বর্তমান মুসলিম উম্মাহর দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই যে, ইসলাহ বা শোষণের বিরুদ্ধে যে সংগ্রামগুলো রয়েছে, সেগুলোকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।”
সেই সাথে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহকে সামগ্রিক বয়ান হাজির করা, মৌলিক চিন্তাসমূহ ও আখলাকী আন্দোলনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা এবং এসবের প্রসার ঘটানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমান বাংলাদেশের চিত্র যদি দেখি, বিদ্যমান আন্দোলনগুলোর বা ব্যক্তিদের কেউ সেক্যুলার পন্থায়, কেউ জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যে এগুচ্ছে। আবার কেউ সকল সমস্যার সমাধান শাসক গোষ্ঠীর মধ্যেই দেখে, অর্থাৎ তার বা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হল, নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন ঘটানো এবং তাদের বিশ্বাস, এটি হলেই সব পরিবর্তন হয়ে যাবে! আবার কেউ-বা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে “খেলাফত আসছে, বাতিল কাঁপছে” ধরনের স্লোগান দিয়ে সব মুক্তি আন্দোলনকে এককেন্দ্রিক করে ফেলছে! কেউ-বা আবার পাশ্চাত্যের আদলে চিন্তা করে সেটিকে মডেল হিসেবে নিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে! আবার কেউ কেউ শক্তি প্রয়োগ করে, জোরপূর্বক তথা অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে– এ ধরনের চিন্তা লালন করে চরমপন্থাকে ধারণ করছে।
সার্বিক প্রেক্ষিতে আমাদের কাজ হলো আমরা চিন্তাগত আখলাকী একটি আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তি সংগ্রামের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবো, যার মাধ্যমে নিজস্ব জাতিসত্তার আলোকে জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতিসহ সকল কিছুর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মেথড জাতিকে উপহার দিতে পারবো।
আমরা যখন চিন্তা ও শিক্ষা আন্দোলনের কথা তুলে ধরছি, তখন আমাদের সামনে পাশ্চাত্যের মডার্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার আদলে গড়ে উঠা নানাবিধ ধর্মীয় চিন্তাগুলোও নানাভাবে ব্যাঘাত ঘটানোর মাধ্যমে আমাদেরকে বাধাগ্রস্থ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
পাশ্চাত্যের এই মডার্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মূলত তাদের লালিত চিন্তাকেই একমাত্র মেথড হিসেবে আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, তাদের আইডিওলজি এবং পরিভাষা আমাদেরকে গিলতে বাধ্য করে। পাশ্চাত্যের এমন মনোভাব আমাদের কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় কায়েমী গোষ্ঠীসহ অনেকের মধ্যেই বিরাজমান। তারা যা বুঝছে, তাই অন্যদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এমন করতে গিয়ে তারা ভুলে যায় যে, ইসলামী সভ্যতায় শত শত মাজহাব আর ধারা গড়ে উঠেছিলো! তারা যে দল করছে, যে চিন্তা লালন করছে, যে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করছে, যে ধারা লালন করছে, সেটিকেই একমাত্র ভাবে। আর তাদের চেয়ে ভিন্ন চিন্তা লালন করলেই তাকে খারিজ হয়ে গেছে, দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে, তা’গুতে হয়ে গেছে– এ ধরনের তকমা দেয়। এ ধরনের মানসিকতা ব্রিটিশ সালাফিজমের মাধ্যমে এসে আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আমাদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সৃষ্টি করছে৷ আর এর গোড়া হলো পাশ্চাত্যের এই মডার্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন– পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় দর্শন বলতে বুঝায় গ্রিক দর্শনকে। ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্যের সকল দার্শনিক উঠে এসেছেন। আপনি হেগেল, দেকার্তে, বার্ট্রান্ড রাসেলকে পড়াকেই দর্শন চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা যদি আমাদের ইলমুল-কালাম পড়ি, ইমাম মাতুরীদিকে পড়ি, ইমাম গাজ্জালীকে পড়ি, সেটি কি দর্শন চর্চা নয়? এ দর্শনের উপর ভিত্তি করেই তো ইসলামী সভ্যতা বারশত বছর গোটা দুনিয়াকে আলোকিত করেছিলো! পাশ্চাত্য এটিকে সমস্ত সিলেবাস থেকে আলাদা করে দিচ্ছে এবং শুধুমাত্র গ্রিক দর্শন ও তার আলোকে গড়ে উঠা কিছু চিন্তাধারাকেই আমাদের সামনে বারবার জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করছে। অর্থাৎ তাদের যে ফরমেট, পরিভাষা, একাডেমিক পদ্ধতি, এর বাহিরে গিয়ে যদি আমরা কাজ করি, সে কাজকে তারা কাজ হিসেবেই গণ্য করবে না। তাহলে আমাদের আল্লামা ইকবাল যে পাশ্চাত্যের চিন্তাধারাকে খণ্ডন করেছেন, এটিকে আমরা কীভাবে দেখবো? একইভাবে ইমাম শাতিবী যে স্বতন্ত্র জ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা, এটিকে আমরা কীভাবে দেখবো?
আবার এখানে যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অথবা মুক্তি সংগ্রামের দিক থেকে প্রশ্ন করি, তাহলে প্রশ্ন আসছে, ইমাম শাতিবী, আল্লামা ইকবাল যে জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করলেন, তা কি তাদের মুক্তি সংগ্রাম নয়? জিহাদের অংশ নয়? এটি আমরা কয়জন পারছি অথবা মানবসভ্যতায় কয়জন-ই বা পেরেছে? এর থেকে বড় সংগ্রাম আর কী হতে পারে?
এ মহামানবগণ পাশ্চাত্যের আদলে চিন্তা না করার কারণে, তাঁদের কাজ জ্ঞানের উৎস হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে না। কিন্তু আমরা মুসলমানরাও কেন এটিকে মর্যাদা দিচ্ছি না? কেন আমরা এটিকেও একটি শ্রেষ্ঠ সংগ্রাম হিসেবে এবং তাদের প্রত্যেকটি ধারাকে আমাদের সামনে মডেল হিসেবে গ্রহণ করছি না? যদি আমরা গ্রহণ করতে পারতাম, তাহলে আমাদের মধ্যে সংকীর্ণ চিন্তা, এককেন্দ্রিক মানসিকতার যে বীজ রোপিত হয়েছে, তা আদৌ জায়গা পেতো না। যদি আমরা তখনি এই বলে প্রশ্ন করতাম যে, পাশ্চাত্যের দর্শন মানে যদি স্বাধীনতা হয়, তাহলে ইমাম আল-মাওয়ার্দী, ইমাম ইবনে সিনা এবং ইমাম ইবনে খালদুনকে পড়লেও কেন স্বাধীনতা হবে না? বরঞ্চ এগুলোই মানবতার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাধীনতম জ্ঞান। এ প্রশ্ন যেমন রাখতাম, একইভাবে ব্যক্তিকে, ধারাকে আলাদা আলাদাভাবে দেখে সকলকে উম্মাহর সম্পদ মনে করতাম, তারই প্রেক্ষিতে বর্তমানে যারা ইসলামের জন্য কাজ করছে, তাদের প্রত্যেককেও ইসলামের সম্পদ মনে করতাম। কিন্তু আজ আমরা এক্ষেত্রে ব্যর্থ!
এবার আসি আমরা কেন স্বতন্ত্র আন্দোলনের কথা বলছি? এ মুক্তি আসলে কিসের মুক্তি?
মুক্তির ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে আসতে পারে। আমি যদি বাঙ্গালী হই, বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে মুক্তির কথাই তুলে ধরি, তাহলে আমার নেতার কেমন হওয়া উচিত? এক্ষেত্রে যদি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি, জহির-উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের কথা ধরি, তারা তো বাঙ্গালী ছিলেন না। আবার গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ, তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহ থেকে শুরু করে অনেকে বাংলাতেই গড়ে উঠেছেন। তাই নেতার জাতীয়তা বা বংশ এখানে মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো–
- স্থায়ী মূলনীতি তথা আদালত ঠিক আছে কিনা।
- জাতির ভবিষ্যৎ মর্যাদা এবং ইজ্জত সম্পন্ন বিষয়াদি গড়ে উঠছে কিনা।
- মাদ্রাসা বা স্কুল যেখানেই পড়ি না কেন, ব্রিটিশ একাডেমিয়ার চিন্তাগত দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামী সভ্যতার চিন্তার মিরাসকে ধারণ করতে পারছি কিনা।
এ সকল বিষয়কে যদি আমরা সামনে রাখি, তাহলে আমাদের মুক্তির সংজ্ঞাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর এ আলোকে চিন্তা করলেই আমরা এতটুকু অর্থবহতা খুঁজে পাই যে–
- আমাদেরকে স্বতন্ত্র জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের বয়ান হাজির করতে হবে।
- চিন্তাগত ও আখলাকী আন্দোলনের বয়ান হাজির করতে হবে।
- সামগ্রিকভাবে একটি শিক্ষাগত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, সে আন্দোলনকে গ্রহণযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হবে এবং এ গ্রহনযোগ্য চিন্তা, পরিভাষা এবং মেথডকে যেন সকলপন্থী মানুষ আপন করে নিতে পারে, এমন একটি বয়ানের ক্ষেত্র আমাদেরকে হাজির করতে হবে।
এ আলোকে জ্ঞান এবং চিন্তা যদি দিতে পারি, তাহলেই কেবল মানুষ, যে কোনো প্রতিষ্ঠান ও ধারাগুলো বুঝতে পারবে, জাতির কল্যাণে সামাজিক পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত। আর তখন আদর্শিক দ্বন্দ্বসমূহ, ইতিহাসের বিভিন্ন পরিভাষা, সমাজকে বুঝার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় ইত্যাদি নীতিনির্ধারক ব্যক্তিত্বদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো আমরা কি এত বড় দায়িত্ব পালন করতে পারবো?
হ্যাঁ, এটি আসলেই অনেক বড় দায়িত্ব যা আমাদের একার পক্ষে পালন করা কখনোই সম্ভবপর নয়। এ দায়িত্ব বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে, স্ব স্ব অবস্থান থেকে বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখার মতো একটি বিষয়। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? করণীয়র প্রেক্ষিতে জ্ঞানের বিষয় নিয়ে যদি উদাহরণ দিই–
আমরা যদি জ্ঞানের বেসিক বিষয়গুলো, ভাষা ও পরিভাষাগুলো, মৌলিক গ্রন্থসমূহ বুঝতে পারি, ক্লাসের মাধ্যমে উসূল ও মেথোডলজি অনুধাবন করতে পারি, শিখতে পারি, তাহলে পরবর্তীতে যে ব্যক্তিত্বগণ উঠে আসবেন এবং তারা এ মেথোডলজিকে ফাংশনাল করার কার্যকরী ও প্রায়োগিক জ্ঞান হিসেবে যখন প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করবেন, সেই সাথে পরবর্তীতে মানুষের সাথে ইন্টারেকশন এর জায়গাগুলোতে কাজ করতে পারবেন, তখন সমাজে একটি প্রভাব সৃষ্টি হবে এবং আত্মবিশ্বাসের একটি জায়গা তৈরি হবে, সেই সাথে চাহিদার জায়গাও তৈরি হবে। আত্মবিশ্বাস এবং চাহিদার জায়গা তৈরি হলে সেখান থেকে এমন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি হবে, যারা ঠিকই আমাদের জাতিকে শক্তিশালী করার জন্য স্বাধীনভাবে একটি লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে।
আর এই জ্ঞান, চিন্তা, আখলাক যখন কারো হৃদয়-মননে প্রবেশ করে, তখন সে আগুনের মতো হয়ে যায়। আগুনের ধর্ম যেমন আলোকজ্জ্বল করা, ঠিক সেভাবে এ চিন্তাবিদ, আখলাক সম্পন্ন মানুষদের কাজই হলো সমাজকে আলোকিত করা, কার্যকরী জ্ঞান সমাজে প্রয়োগ করা। সর্বোপরি এই দীর্ঘমেয়াদি কাজের প্রভাব সমাজে পড়তেই থাকবে।
আর এ জ্ঞানের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ার কারণ হলো আমরা মূলত শিকড়ে হাত দিয়েছি।
এ শিকড় যদি মাটিতে শক্তভাবে গেঁড়ে বসে, তাহলে পুষ্ট গাছ থেকে ফুল, ফল এবং পাতা ছড়াবেই। আর এ মূল বা শিকড় হলো হাকীক্বত অন্বেষী এক জ্ঞানের বিনির্মাণ, চিন্তা ও ভাষার বিনির্মাণ। আমরা এ হাকীকত সম্পন্ন জ্ঞানের দিকে ধাবিত হওয়ার পাশাপাশি তা নিজেদের সমাজ ও আশেপাশে সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করাচ্ছি। চিন্তাবাদী আন্দোলনের কাজই হলো চিন্তা প্রবেশ করানো। চিন্তা একবার প্রবেশ করানো হলে তা পরবর্তীতে প্রভাব ছড়াবেই। এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম।
এ পর্যায়ে আলোচ্য বিষয় হলো আমাদের, তথা যুবসমাজের রাজনীতির উপরিভাগে অবস্থানের মানে কী। এর মানে হলো আমরা, তথা যুবসমাজ রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজ পরিচালনা, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে প্রভাব রাখাসহ সকল স্তরে প্রভাব রাখতে সক্ষম, আমরাই সে যুবসমাজ, যারা সকল কিছুর উপরিভাগে থেকে ভবিষ্যত বিনির্মাণ, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত হতে পারি, জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের জন্য এগিয়ে যেতে পারি। সেই সাথে যুবক শ্রেণি থেকে এ ধরনের কাজে ব্যক্তিত্ব উঠিয়ে আনতে পারি। প্রশ্ন আসে, এক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক লক্ষ্যসমূহ কী কী?
১। চিন্তাকে ইঞ্জেক্ট করা
আল্লামা ইকবালের “ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন” গ্রন্থটি ১০০ বছর আগে লেখা কয়েকটি বক্তব্যের সংকলন, কিন্তু সেটি আজও গোটা দুনিয়াকে আলোকিত করছে। তার মানে হলো সঠিক চিন্তাকে সঠিকভাবে প্রচার-প্রসার করতে পারলে তা প্রভাব সৃষ্টি করতে বাধ্য, তা হাজার মাইল দূরে হোক বা হাজার বছর পরে হোক। আমাদের সমাজ যদি মার্ক্সিজম দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, লেলিনের মত দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, এডাম স্মিথ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, তাহলে তাদের থেকে অনেক গুণ শক্তিশালী আল-মাওয়ার্দী, ইবনে খালদুন, আল্লামা ইকবালকে যদি আমরা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, সেসব চিন্তাকে ইঞ্জেক্ট করতে পারি, এটি নিশ্চিত যে আমাদের সমাজও তা গ্রহণ করবেই। কারণ আমরা এখনো একই কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি, একই আজান প্রতিদিন পাঁচবার এই জাতিকে আহ্বান করে, আলো ছড়ায়। আর এই চিন্তা শুধু জ্ঞান নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ সংস্কৃতি মানুষ দেখে দেখেই গ্রহণ করে। বারবার বলতে বলতে, লিখতে লিখতে, ক্লাস করতে করতে, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অতীত পর্যালোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যত ইশতেহার দেওয়ার মাধ্যমেই সমাজে সিম্বল হিসেবে এ চিন্তাগুলো ছড়িয়ে পড়বে। আর তার দ্বারা সমাজ, রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা প্রভাবিত হতে বাধ্য; কারণ এর বাহিরে তখন ভিন্ন কোনো মেথড দ্বারা এই সমাজকে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।
২। শিক্ষা দানের সিলসিলা
ইমাম আবু হানিফা হলেন এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নববী মেথড এর অনন্য সৌন্দর্য হলো মানুষ গড়ে তোলা। সেই সাথে আমরা আমাদের সভ্যতার জন্য কতটুকু অবদান রাখছি তার অন্যতম মানদন্ডও হলো আমরা কতজন মানুষকে গড়ে তোলার জন্য কতটুকু চেষ্টা চালাচ্ছি তা। এই শিক্ষাদানের যে সিলসিলা এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্ম গড়ে উঠবে, গড়ে তুলবে; মূলত এই সিলসিলাটা আমরা জারি করতে চাই। এটি করতে পারলে রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রেই বড় ব্যক্তিত্বগণ নিজেরা শিক্ষক হয়ে যার যার ক্ষেত্রের লোকজনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। আর শিক্ষকগণ যদি সংকট, সংকট থেকে মুক্তির জন্য যুবমননের যে হৃদয়ের কথা– সেটি বলতে পারেন, ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বলতে পারেন, যুবমননে লুকায়িত যে হাজারো প্রশ্ন, সেগুলোর আদলে জবাব দিতে পারেন, তাহলে অবশ্যই তাদের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠবে। একইসাথে শিক্ষকগণ যখন কাজের পর্যালোচনাগুলোর মূল্যায়ন করবেন, এই মূল্যায়নগুলোকে হতাশার দলিল হিসেবে না দেখিয়ে আত্মবিশ্বাস এবং ভিশনারী সংগ্রামের দিকে ধাবিত করার জন্য উৎসাহিত করবেন। এই শিক্ষকদের ছাত্ররাই পরবর্তী সভ্যতাকে বিনির্মাণ করবে। আমরা এই শিক্ষা দানের সিলসিলাই তৈরি করতে চাই।
৩। ব্রিটিশ একাডেমীয়া থেকে মুক্ত একটি শ্রেণি
আমরা যদি আমাদের সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণিত (ম্যাথমেটিক্স), ফিলোসোফিসহ প্রত্যেকটি বিষয়কে এভাবে পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখবো, আমাদের একাডেমীয়া মূলত ব্রিটিশ একাডেমীয়ার আবদ্ধ একটি শিক্ষাব্যবস্থা। এটির বিপরীতে একটি স্বাধীন রূহ সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
৪। যুবকদের রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা
আমরা যুবকদের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে চাই, অর্থাৎ একটি সচেতন নাগরিক শ্রেণি তৈরি করতে চাই। এই সচেতন নাগরিক শ্রেণি মূলত সমাজের প্রতিটি বিষয় নিয়ে কাজ করে তাদের স্ব-স্ব অঙ্গন থেকে সমাজকে গতিশীল করবে, নিজস্ব কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করবে, নিজস্ব কিছু প্রতিবাদ, প্রস্তাবনা হাজির করবে, হোক তা ছোট একটি পত্রিকা বা ছোট একটি ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে। যুবকরা এ জাতির রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে ভাবলে তার মাধ্যমেই মূলত একটি সমাজ গতিশীল হয়। নির্দিষ্ট একটি দল, একটি প্রতিষ্ঠান সমাজকে গতিশীল করতে পারে না। যুবসমাজের মধ্যে এ সকল বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করে ফ্যাশন আকারে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের অন্যতম একটি লক্ষ্য এটি, অর্থাৎ ইতিহাসের মেলবন্ধন ও যুগের আবু বকর তৈরি করার চেষ্টা করা।
যেমন– আবু বকর (রা.)। আল্লাহর রাসূল (সা.) মারা যাওয়ার পরে তিনি সে ঘোষণা দিয়েছেন এবং দৃঢ়তার সহিত নেতৃত্ব দিয়ে আবার উম্মতকে গোছালো একটি অবস্থায় নিয়ে এসেছেন।
আজ আমাদের মাঝে এ দুই শতাব্দীর বড় বড় ব্যক্তিগণ, ইমাম শাহ ওয়ালী-উল্লাহ দেহলভী, আল্লামা ইকবাল, শাইখুল হিন্দ, আল্লামা শিবলী নোমানী, আবুল হাসান আলী নাদভীরা জীবিত নেই। তাদের অবর্তমানে আমাদেরকেও আবু বকর (রা.) এর মতো হাল ধরতে হবে এবং যুগের আল্লামা ইকবাল তৈরির জন্য নিজেদেরকে হাজির করতে হবে। এভাবে সমাজের সাথে পূর্বের মিরাসকে সম্পৃক্ত করে, পূর্বের সভ্যতার সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে হবে।
৫। ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটানো ও একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করা
ইসলামী সভ্যতার গৌরবোজ্জল ইতিহাসের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে আমরা মূলত যুবসমাজের মাঝে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চাই। আর এর মাধ্যমে মূলত একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে উঠবে। এই আত্মবিশ্বাসী প্রজন্মের কাজ হলো তারা যুগের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে সকল চিন্তাবিদদের মেথডকে, চিন্তাকে হাজির করবে।
আমাদের সকল কথা, ডায়লগ, ইতিহাস নিয়ে কাজ, চিন্তা নিয়ে কাজ, বড় বড় মনীষীদের আহ্বানকে যুবক সম্প্রদায়ের মাঝে হাজির করার মিশন– এ রকম যত ধরনের কাজ রয়েছে, সবই মূলত একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করার জন্য। কারণ উম্মাহর সামনে যদি আমরা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস ও শ্রেষ্ঠত্বকে, বর্তমান মুক্তির দিশা ইসলামকে বারবার উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। চিন্তাবিদ ও শিক্ষক শ্রেণি তৈরি করলেও আমাদের মূল লক্ষ্য সর্বাগ্রে আখলাক এবং আধ্যাত্মিকতা। এটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়েই আমাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ফল স্বরূপ, যে দল বা যে পন্থীরাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সর্বাগ্রে আখলাক এবং আধ্যাত্মিকতার ধারণা যদি তাদের এক-দুইজন যোগ্য নেতাও গ্রহণ করে নেন, তবে তিনি বা তারাই গোটা জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারবেন।
৬। উম্মতের ঐক্য
এমনভাবে আমাদের কাজ, চিন্তা, আহ্বান তুলে ধরতে হবে এবং প্রতিটি কার্যক্রমের মধ্যে এগুলোকে স্থাপন করতে হবে, যাতে সকল ধারার লোকজন নিজস্ব খোরাক, উপকরণ খুঁজে পায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে কাজ করতে হবে, যেমন– সুদ থেকে মুক্তির জন্য কাজ করা, সুদমুক্ত অর্থনীতির উপর কার্যক্রম পরিচালনা করা। উম্মতের আখলাকের আন্দোলনের উপর কাজ করতে হবে, মুসলিম উম্মাহর ক্রাইসিস জোন আরাকান, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন নিয়ে কাজ করতে হবে। ঠিক মেথোডলজির ক্ষেত্রেও আমাদের এমনভাবে সব কিছুকে হাজির করা, যেখানে উম্মত তার ঐক্যের একটি ক্ষেত্র খুঁজে পাবে, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নানাবিধ চিন্তার খোরাক খুঁজে পাবে।
৭। ভাষাকে বিনির্মাণ
আমাদের সমস্যাগুলোর একটি হলো ভাষাগত সমস্যা। কারণ আমরা আমাদের ভাষায় চিন্তা করতে পারি না, আমাদের ভাষা আমাদের জ্ঞানের উৎস না। আমাদের চিন্তা ও শেখার ভাষা হলো ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া একটি ভাষা। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসকরা যে অঞ্চলেই গিয়েছে, সে অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উপর তাদের ভাষাকে চাপিয়ে দিয়ে সে ভাষার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান এবং চিন্তা, জাতীয় মুভমেন্টকে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে।
আরবী আমাদের দ্বীনের ভাষা এবং বাংলা আমাদের মাতৃভাষা ও মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষা। এ ভাষাগুলোকে বিশ্বজনীনভাবে মুসলমানদের ভাষা হিসেবে তুলে ধরতে হবে এবং সকল পরিভাষাকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করার মতো যোগ্যতা অর্জনের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মাতৃভাষায় আমরা কীভাবে আমাদের জ্ঞানকে হাজির করবো, ফিলোসোফিকে (দর্শন) হাজির করবো সে ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। আমাদের জ্ঞানের উৎস হিসেবে বাংলা ভাষাকে হাজির করার চেষ্টা যেমন চালাবো, একইসাথে অনুবাদ, পরিভাষার রূপান্তরসহ সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বারোপ করবো। কারণ ভাষাই হলো ধর্ম ও সংস্কৃতির অন্যতম বাহন। তাই বাংলা ভাষা বিনির্মাণ আমাদের মূল দায়িত্বগুলোর একটি।
৮। ইসলামের কাজকেই মূলধারার কাজ হিসেবে প্রস্তুত করা
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশ একাডেমীয়ার অধীনস্থ থাকার কারণে ইসলামের কোনো কাজই মূলধারার কাজ হিসেবে বিবেচিত হয় না। আমাদের বইমেলা, আমাদের রাজনৈতিক দল সবক্ষেত্রেই ইসলামপন্থীগণ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে থাকেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় ও শিক্ষাব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে যেসকল গবেষণা, কার্যক্রম, সেমিনার, প্রতিষ্ঠানিকতা ইত্যাদি, যেগুলিকে আমরা দেশের মূলধারার কার্যক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি, আর এসকল মূলধারার কার্যক্রমে ইসলামী ঘরণার কোন কাজই মূল্যায়ন পায়না। এক্ষেত্রে আমরা যদি নিজস্ব চিন্তা ও প্রভাবের মাধ্যমে মূলধারায় পরিণত হতে পারি, তাহলে এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আত্মবিশ্বাসের জায়গা হিসেবে কাজ করবে।
আর, এজন্য হৃদয়ের কথা, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি সকল বিষয়গুলোর মৌলিক দিকগুলো জনগণের ভাষায় তুলে ধরে রাষ্ট্র এবং সংবিধানসহ নানাবিধ কার্যপ্রণালী, এজেন্ডাগুলোকে যদি আমরা বারবার হাজির করতে পারি, তাহলে রাষ্ট্র এবং সাংবিধানিক দিক থেকেও আমরা একটি মূলধারার আন্দোলন হিসেবে ইসলামী সভ্যতার জাগরণী চিন্তাকে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।
০৯। জাতিকে বা উম্মতকে শক্তিশালী করা
আমাদের কেউ প্রশাসনে যাবে, কেউ রাজনীতিবিদ হবে, কেউ শিক্ষক হবে, কেউ সৃংস্কৃতিবিদ হবে ইত্যাদি। পেশাগত অবস্থানে যাওয়ার প্রচেষ্টার পাশাপাশি আমরা আমাদের পড়াশোনা, লেখালেখি, ক্লাস সবই যদি সমানভাবে পরিচালনা করতে পারি, তাহলে পেশাগত অবস্থানে গিয়ে আমর স্ব স্ব অঙ্গন থেকে মূলনূতির আলোকে কাজ করে আমাদের জাতিকে, উম্মতকে শক্তিশালী করতে পারবো। নির্দিষ্ট কোনো দলকে নয়, নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে নয়, বরং গোটা জাতিকে শক্তিশালী করার জন্য আমরা ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও আমৃত্যু চেষ্টা চালাবো।
১০। স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে উঠে আসা
আমাদোর মধ্য থেকে বড় বড় চিন্তাবিদ, আখলাক সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, যদি উঠে আসতে পারে, অর্থাৎ শক্তিশালী চিন্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বে যদি আমরা উঠে আসতে পারি, তাহলে এটি স্বতন্ত্র একটি ধারায় পরিণত হবে। এর উদাহরণ উপমহাদেশে দেওবন্দী ধারা, আলীগড় আন্দোলন। দেওবন্দী ধারা নির্দিষ্ট কারো উপর হস্তক্ষেপ করেনি, এখান থেকে অনেক বড় রাজনীতিবিদ উঠে এসেছেন, এখান থেকে উঠে এসে অনেকে শুধুমাত্র হাদিস নিয়ে কাজ করেছে, অনেকে বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন, অর্থাৎ নানাবিধ কার্যক্রমের সাথে জড়িত হয়েছেন, কিন্তু দেওবন্দী ধারা একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে এখনো আলো ছড়াচ্ছে। আমরাও যদি নিজেদেরকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে আমরাও উসূল ও মাকাসিদী ধারা হিসেবে জাতির সামনে নিজেদেরকে প্রস্ফুটিত করতে পারবো।
১১। যুব চিন্তায় জাতীয় স্বপ্নকে তুলে ধরা, সেদিকে ধাবিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখা
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সংকটের একটি হল, আমাদের কোনো জাতীয় স্বপ্ন নেই। যে কোনো সফল বা শক্তিশালী সভ্যতার ভিত্তিমূলে সবসময় জাতীয় স্বপ্ন বিদ্যমান থাকে। আমরা যদি বর্তমানে ইরানের দিকে তাকাই, দেখব তাদের কাছে এই ধরনের স্পষ্ট স্বপ্ন রয়েছে। আমেরিকার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, তারা লিবারেলিজমকে ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাদের জাতীয় স্বপ্ন– বিশ্বশাসনের দিকে পরিচালিত। ব্রিটিশরাও একইভাবে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে। তার্কিশরাও মধ্য এশিয়া ও ককেশাসে তাদের প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন দেখে। চীনও তাদের জাতীয় স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আমরা পারছিনা!
তাই আমাদের যুব চিন্তায় জাতীয় স্বপ্নকে তুলে ধরা, সেদিকে ধাবিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে। আর সেটি হল, দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সফট পাওয়ারে এবং জ্ঞানের রাজধানী হিসেবে আমরা প্রস্তুত করব, এটাই আমাদের জাতীয় ভিশন।
বৃহৎ বাংলাদেশের জাতীয় স্বপ্ন, অর্থাৎ বাংলাদেশকে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সভ্যতানির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নকে সামগ্রিকভাবে যুবসমাজের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করব। কেননা এগুলিই আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় স্বপ্ন।।
এই ১১ টি বিষয়কে সামনে রেখে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি, অল্প পরিসরে হলেও কাজ করতে পারি, তাহলে এ বিষয় কি প্রমাণিত হয় না যে, আমরা রাজনীতির ভেতরে নয়, বরং রাজনীতির উপরিভাগে থেকে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রভাব রাখতে পারবো, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকে প্রভাবিত করতে পারবো এবং এখান থেকেই বড় বড় ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব উঠে আসবেন? ইনশাআল্লাহ! কারণ আমাদের রাজনৈতিক আইডেন্টিটিই হলো রাজনীতির উপরিভাগে থেকে জাতিকে, দেশকে, বাংলা অঞ্চলকে শক্তিশালী করার আইডেন্টিটি।
পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই, আমরা আমাদের জায়গা থেকে নিজেদেরকে এমন মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যেন আমরা আমাদের আলামিয়্যাত এবং সকল কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারি। কারন এ ধরনের ব্যক্তিরাই মূলত দুনিয়া ইমারত ও মানবতার ভবিষ্যৎ বিনির্মানের জন্য কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে আল্লামা ইকবাল খুব সুন্দর একটি পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি হলো ‘আল্লাহর সহকর্মী’। তিনি তার কবিতাতেও তুলে ধরেছেন,
“তুমি তৈরি করেছো রাত্রি
আমি তো জ্বেলেছি আলোক,
মাটি তোমার, তাই দিয়ে রচলাম পান পাত্র।
তোমার ছিলো মরুভূমি, পর্বত, অরণ্য,
আমার তৈরি ফুলের কানন।
আমি সে, যে পাথরকে করে আয়না,
বিষ হতে যে বানায় মধু।”
এই ইমারতের ধারণার ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে বলেছেন,
واستعمركم فيها
আর এ ইস্তেমার শব্দ থেকেই মূলত ইবনে খালদুন তার উমরান তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, যা তিনি তার আল-মুকাদ্দিমাতে আলোচনা করেছেন। সমাজের ক্ষেত্রে আমাদের উমরান কেমন হবে তা ইবনে খালদুন তুলে ধরেছেন। আল্লামা রাগেব আল ইস্পাহানি ‘উমরানুন নাস’ পরিভাষা তুলে ধরেছেন, অর্থাৎ সমাজকে বিনির্মাণের জন্য নিজেকে তুলে ধরা, নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্নের কথা বলা। এক কথায় এই শোষণের বিপরীতে এমন এক ব্যবস্থা তুলে ধরা, যা জোরপূর্বক নয়, বরং সত্যিকারের মানবধর্ম হিসেবে ইসলামী সভ্যতাকে তুলে ধরতে পারবে। যেখানে ধনী-গরীবের মর্যাদাহীনতা, অধিকারহীনতা থাকবে না, যেখানে শোষণের ত্রাসের প্রাসাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়ে নতুন সভ্যতার দুয়ার উন্মোচন করে দিতে হবে। আল্লামা ইকবালের এই পরিভাষার আলোকে আমরা যদি আল্লাহর সহকর্মী হই, তাহলে আমরা দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকি না কেন, শুরুতেই রাজনীতির যে মূলনীতি উল্লেখ রয়েছে, সেই মূলনীতির আলোকেই কাজ করবো। আমরা এখন বাংলাদেশে আছি, এই মুহুর্তে আমাদের পন্থা যাই হোক না কেন, আমরা সেই মূলনীতির আলোকেই কাজ করবো। তখন একক কোন পন্থীদের পন্থাই একমাত্র মুক্তির পন্থা, একটা গোষ্ঠীই সঠিক– এসব চিন্তা কার্যকরী থাকবে না। আমরাও তখন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী ও শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে পারবো, দারুল আরকাম, দারুল হিকমাহ, নিজামিয়া মাদ্রাসা, দারসবাড়ির কি তখন কোনো পলিটিক্যাল ভিউ দরকার ছিলো? এসবের রাজনৈতিক আইডেন্টিটি কী ছিলো?
বাস্তবতা হলো এগুলো রাজনীতির উপরিভাগে থেকে সভ্যতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। কারণ এগুলো ছিলো জ্ঞান এবং আখলাকী আন্দোলন। আব্বাসীদের আটশো বছর, উসমানী খেলাফতের ছয়শো বছর, উপমহাদেশীয় ৭০০ বছরসহ সামগ্রিকভাবে গোটা মুসলিম সালতানাতে চিন্তার চর্চা ছিলো, বড় বড় শিক্ষা আন্দোলন, ধারা ও প্রতিষ্ঠান ছিলো। সে সকল পরিপ্রেক্ষিতেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো, ধারাগুলো মূলত উপরিভাগে থেকেই সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে, যোগ্য যোগ্য ব্যক্তি উপহার দিয়েছে। আর এভাবেই মূলত ইসলামী সভ্যতা ১২০০ বছর আলো ছড়িয়েছে।
এজন্য আমরা আমাদের মূলনীতির আলোকে মূল ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে একটি চিন্তা ও আখলাকের আন্দোলন, একটি জ্ঞান ও সভ্যতার পুনর্জাগরণের আন্দোলনের ইশতেহার দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে আমরা মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পরিসর থেকে হলেও কিছু কাজ করে যেতে পারবো, ইনশাআল্লাহ। আর এটিই হলো আমাদের মূল আত্মপরিচয়।।


