মিশকাতুল আনওয়ার গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়বস্তু হল সূরা নূরের ৩৫ নম্বর আয়াত। ইমাম গাজ্জালী উক্ত গ্রন্থে, ‘ আল্লাহ হলেন আসমানসমূহ ও যমিনের নূর” – এই আয়াতকে বাহ্যিক দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করার পর আয়াতের তাসাউফি ও দার্শনিক ব্যাখ্যাকে মিশকাত, যুজাজা, মিসবাহ, যয়তুন তেল এবং গাছের উপর ভিত্তি করে করে আমাদের সামনে পেশ করেছেন।
উক্ত গ্রন্থে উজুদ /সত্ত্বাতত্ত্ব /অন্টোলজি সংক্রান্ত ব্যাখ্যাকে সিস্টেম্যাটিকভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই চিন্তাটি অনেক বেশী গুরুত্বের দাবীদার।
কেননা সোহরাওয়ার্দী, ইবনে আরাবী এবং উসমানী ধারার সকল আলেমগণ উজুদ /সত্ত্বাতত্ত্ব /অন্টোলজি – এর মত বিষয়টিকে ইমাম গাজ্জালীর এই সিস্টেম ও এই পরিভাষার উপর ভিত্তি করে দাঁড় করিয়েছেন।
এখানে ব্যবহৃত পরিভাষাটি ইমাম গাজ্জালী কর্তৃক উদ্ভাবিত কোন পরিভাষা নয়। মানুষের সামনে উজুদ বা সত্ত্বাতত্ত্বকে বোধগম্যভাবে তুলে ধরার জন্য তিনি এটাকে সুশৃঙ্খলভাবে তুলে ধরেছেন। গ্রন্থটির কলেবর ছোট হলেও এতে আলোচিত বিষয়সমূহ অনেক বেশী গভীর।
ইমাম গাজ্জালী তাঁর এই গ্রন্থে উজুদ /সত্ত্বাতত্ত্ব /অন্টোলজি- কে তিনটি পর্যায়ে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথমে তিনি সেই আয়াতের বাহ্যিক অর্থকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন, দ্বিতীয়ত তিনি সেই বিষয়টিকে কিছুটা দার্শনিক ও তাসাউফি দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে পেশ করেছেন। সবশেষে নূর ও জুলুমাত – এর বিভাজনকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে অসাধারণ একটি দর্শন পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
এই গ্রন্থে মূল পরিভাষা হল, ‘নূর’। এটাকে সহজভাবে বুঝার জন্য আমরা নূর শব্দের পরিবর্তে উজুদ বা সত্ত্বাতত্ব শব্দটিকে ব্যবহার করতে পারি। তখন আমরা ইমাম গাজ্জালী যা বুঝাতে চেয়েছেন সেটার মুল বিষয়বস্তুকে ধরতে পারব।
নূরের মেটাফিজিক্স নামে উল্লেখিত মিশকাতুল আনওয়ার- এর আলোকে হাকিকী নূর হলেন আল্লাহ তায়ালা। নূর নামটি কেবলমাত্র অন্যকে রূপক অর্থে দেওয়া যেতে পারে হাকিকী অর্থে নয়। এই বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে প্রথম পর্যায় হল; নূরকে সাধারণ মানুষদের বোধগম্যতার পর্যায়কে সামনে রেখে ব্যাখ্যা করা, দ্বিতীয় পর্যায় হল; খাওয়াস তথা চিন্তাগত দিক থেকে একটু উপরে অবস্থানকারীদের বোধগম্যতার পর্যায়কে সামনে রেখে ব্যাখ্যা করা আর তৃতীয় পর্যায়ে এসে এটাকে খাওয়াসসুল খাওয়াস তথা চিন্তাগতভাবে যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করেন তাঁদের বোধগম্যতার পর্যায়কে সামনে রেখে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পর্যায়ে এসে হাকিকত সর্বোচ্চ নূর হিসেবে উদ্ভাসিত হবে।
নূরের ব্যাখ্যা
সাধারণ জনসাধারণ মূলত ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করে থাকে। ইন্দ্রিয়-ই হল তাদের নিকট উপলব্ধির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আর এই ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হল দৃষ্টিশক্তি। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ তাঁর দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে উপলব্ধি বা বুঝার চেষ্টা করে। আর এই দৃষ্টির শক্তির সাথে সম্পর্কিত বস্তু/উপাদান/obejcts সমূহ হল তিন প্রকার,
১। এমন বস্তু যা খালি চোখে দেখা যায় না, দেখার জন্য অন্য একটি আলোর মুখাপেক্ষী।
২। নিজেই নিজেই দৃশ্যমান তবে সেটার দ্বারা অন্য কোনকিছুকে দেখা যায় না। যেমন, তারকারাজি ও বিভিন্ন গ্রহ।
৩। নিজেও দৃশ্যমান আবার একই সাথে সেটার বদৌলতে অন্য বস্তুকেও দেখা যায়। যেমন, সূর্য, চন্দ্র, বাতি ও আগুন। এই তৃতীয় গ্রুপে উল্লেখিত উজুদ বা বিষয়কে ‘নূর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাহলে আমরা এ কথা বলতে পারি যে; ‘ চারপাশকে আলোকিতকারী উপাদান সমূহ হল নূর, আর সেই উপাদানকে তৈরিকারী উজ্জ্বলতাও হল নূর।
কোন একটি বস্তুর কিংবা রঙের দৃশ্যমান হওয়ার জন্য যেমন আলোর প্রয়োজন একই সাথে চোখেরও প্রয়োজন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান মতে, কোন বস্তুকে দেখার অর্থ হলো ঐ বস্তুর উপর আছড়ে পড়া নির্দিষ্ট আলোক রশ্মির নির্দিষ্ট ঘনত্ব ও কোণে প্রতিফলিত আলোক প্রতিবিম্ব।এই একই বিষয় সাউন্ড বা শব্দের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কথা কিংবা আওয়াজ বা সাউন্ড আমাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। মূলত যদি আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় না থাকে তাহলে অস্তিত্ব, অনস্তিত্ব, রং, গন্ধ, স্বাদ এবং কোমলতার মতো কোনো বৈশিষ্ট্যেরই কোনো অর্থবহতা থাকে না ।
অর্থাৎ, কোন অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ মূলত মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তির উপর নির্ভর করে থাকে এবং তারা যে অনুপাতে এই ইন্দ্রিয়গুলি ব্যবহার করে তার উপর।
তবে এই বিষয়টি সমগ্র মানবতার প্রশ্নে আসলে সকল মানুষের নিকট মুতলাক/শর্তহীন –ভাবে প্রতিভাত হওয়া সম্ভবপর নয়। কেননা যাহির বা প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক একটি বিষয়। কোন একটি বিষয় একজনের নিকট সুস্পষ্ট হলেও অন্যজনের নিকট অস্পস্ট হতে পারে। পরিবর্তনশীলতার এই বিষয়টি সম্বোধিত ব্যক্তির যোগ্যতার উপর নির্ভরশীল। এখানে কোন কিছুকে সুস্পষ্ট করার ও একে অপরের সাথে পার্থক্য করার যোগ্যতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। একজন ব্যক্তি অনেক অর্থকে একে অপরের থেকে যতটুকু পৃথক করতে পারে এবং সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিষয়কে যতবেশী বের করে আনতে পারে সে তত বেশী জ্ঞানী। যেমন, একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী একটি বনের গাছসমূহকে ও সেই সকল গাছের বিশেষত্বকে অনেক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে পারবে, এটা তার মধ্যেকার পার্থক্য করার যোগ্যতাকে প্রকাশ করে থাকে। এটা হল তার জ্ঞানের গভীরতা ও বিস্তৃতির প্রমাণ।
এখানে মজার বিষয় হল, এই মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তা মানুষের থেকে স্বতন্ত্রভাবেই আছে। তাঁদের অস্তিত্ব মানুষের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল নয়। তবে মানুষ তার নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতা আলোকে সেই সকল বিষয়কে একে অপরের থেকে আলাদা করে থাকে। এই অবস্থাটি মানুষের পার্থক্য করার যোগ্যতার আলোকে গভীরতা ও বিস্তৃতি লাভ করে।
এই বিষয়টিকে আমরা যদি মনীষীদেরকে সামনে রেখেও পরখ করতে পারি। বস্তুজগতে অস্তিত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ যেমন ব্যক্তির যোগ্যতার আলোকে গভীরতা লাভ করে, ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনুরূপ। আমরা যদি মানব সভ্যতার ইতিহাসকে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে, এক এক সমাজে এক এক ধরণের মনীষীগণ রয়েছেন। তারা যে সমাজে জন্ম নিয়েছেন বা বসবাস করেছেন তারা সেই সমাজে বা অঞ্চলে সমধিক পরিচিত। তবে সেই সকল মনীষীদের তুলনায় সমগ্র মানব ইতিহাসে আমরা যে ব্যক্তিকে সবচেয়ে বেশী ভালো জানতে পারি তিনি হলেন মুহাম্মদ (সঃ)। সমগ্র মানবতা তাঁকে চিনে ও চিনতে পারে। শুধু তাই নয় একই সাথে তিনি সমগ্র মানবইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যিনি সমগ্র মানব ইতিহাসেকে পরিবর্তন ও প্রভাবিত করে ভিন্ন এক দিকে ধাবিত করেছেন। হযরত পয়গাম্বর হলেন এমন একটি সৃষ্টি যিনি একই সাথে কামিল তথা পরিপূর্ণ আবার একই সাথে অন্য মানুষদের পূর্ণতার বিষয়টিও তাঁর অনুসরণের সমানুপাতিক। অর্থাৎ অন্য মানুষরা ততটুকুই পূর্ণতা লাভ করবে যতটুকু তাঁকে অনুসরণ করবে।
অর্থাৎ আমরা এই কথা বলতে পারি, হযরত পয়গাম্বর (সঃ) আমরা উপরে নূরের যে ত্রিমাত্রিক একটি শ্রেণীবিন্যাস করেছি সেই তিনটি-ই তার মধ্যে আছে। অর্থাৎ একই সাথে তিনি দৃশ্যমান আবার তাঁর মাধ্যমে অন্য কিছুও দৃশ্যমানকারী নূরের সমানুপাতিক। আমরা আমাদের নবীকে নূর সমূহের নূর হিসেবে নামকরণ করতে পারি। এর অর্থ হল, ইসলামী সভ্যতা যদি সামাজিক জীবনে অস্তিত্ববান থেকে থাকে তাহলে সেটার রূপদানকারী হলেন হযরত পয়গাম্বর (সঃ)। তাঁর প্রচারিত নূরের আলোতেই ইসলামী সভ্যতা সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রেও অস্তিত্ব লাভ করতে পেরেছে।
তুলনাসমূহ
এখন আসুন এমন উচ্চ পর্যায় নিয়ে আলোচনা করি যা চোখে দেখা যায় না,
কোন একটি বস্তুকে দেখার জন্য একই সাথে চোখ ও আলোর প্রয়োজন। যদি আলো না থাকে তাহলে চোখ দেখতে পায় না। আর যদি চোখ না থাকে তাহলে আলো দেখাতে পারবে না। সৃষ্টি বা অস্তিত্ত্বের উদ্ভাসিত বা বহিঃপ্রকাশ হওয়ার জন্য চোখ এতটুকু গুরুত্ত্বপূর্ণ কিন্তু চোখেরও অনেক ঘাটতি রয়েছে। যেমন চোখ অন্যকে দেখতে পেলেও নিজেকে দেখতে পারে না। দূরের কিংবা পর্দার আড়ালের কোন কিছু দেখতে পারে না, কোন কিছুর উপরিভাগ দেখতে পারে কিন্তু অভ্যন্তরীণ দিককে দেখতে পায় না। সৃষ্টির সকল কিছুকে নয় তবে এক অংশকে দেখতে পারে। সসীম বস্তুকে দেখতে পারে কিন্তু অসীমকে পরিগ্রহ করে দেখতে পারে না। শুধু তাই নয় মাঝে মধ্যে ভুলও দেখে। বড়কে ছোট হিসেবে, দূরের জিনিসকে নিকটের হিসেবে এবং স্থির বিষয়কে চলমান বিষয় হিসেবেও দেখতে পারে। এগুলো হল আমাদের চোখের সম্পূর্ণতা বা ঘাটতি। যদি এই সকল ঘাটতি ও অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত কোন চোখ থাকে আর সেটাকে যদি ‘নূর’ বলা হয় তাহলে কি সেটা সঙ্গতিপূর্ণ হবে না?
আমাদের জুমহুর বা অধিকাংশ চিন্তাবিদ এটাকে আকল বলে অভিহিত করেছেন আমিও তাঁদের সেই চিন্তাকে মেনে নিয়ে আকল-ই বলছি। চোখের তুলনায় আকল নূর নামে অভিহিত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশী হকদার। কেননা আকল, চোখের তুলনায় সমগ্র সৃষ্টিতত্ত্বকে বুঝার ক্ষেত্রে সামগ্রিক একটি মাধ্যম। কেননা এর মাধ্যমে আমরা সৃষ্টিতত্ত্বের এমন অগণিত বিষয়কে জানতে ও বুঝতে পারি যার কোন তুলনাই হয় না।
এখন আসুন এর পরবর্তী ধাপ নিয়ে পর্যালোচনা করি,
উপরের আলোচনায় বুঝতে পারলাম যে, চোখের তুলনায় আকল আরও বেশী পরিমাণে উপলব্ধি করতে পারে। তবে এমন অনেক বিষয় আছে যা আকলও উপলব্ধি করতে পারে না। এই কারণে এই ক্ষেত্রে আকলও সেই বিষয় নিয়ে চিন্তা ও বিশ্লেষণের মুখাপেক্ষী। যেমন, অর্থবহতা ও আধ্যাত্মিকতার সাথে সম্পর্কিত এমন অনেক বিষয় আছে আকল অনেক সময় যেটাকে উপলব্ধি ও অনুধাবন করতে পারে না। বুঝতে পারলেও বাহ্যিক কিছু বিষয় বুঝতে পারে গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। এই ক্ষেত্রে পদপদবী ও ক্যারিয়ারের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
আমাদেরকে মূলত যে বিষয়টি বুঝতে হবে সেটা হলঃ অস্তিত্ব তত্ত্ব বা অন্টোলজি বলতে আমরা যেটাকে বুঝি সেটা ফিজিক্যাল অন্টোলজির চেয়ে সামাজিক অন্টোলজিকে বেশী পরিগ্রহ করে। এই ক্ষেত্রে আমরা শহরের উদাহরণ দিতে পারি। শহর বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত একটি জায়গা। যেমন, সুলেইমানিয়া মসজিদ একটি উদাহরণ হতে পারে। সুলেইমানিয়া মূলত পাথরের একটু স্তুপ। কিন্তু মহাস্থপতি সিনান এই পাথরের স্তুপকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে যেন দেখতে সুন্দর দেখায় এবং মানুষ যেন সেটা দেখে পরিতৃপ্ত হয়। এই উপমা থেকে বুঝা যায় যে, স্থাপত্য বলতে আমরা যা বুঝি সেটা মূলত এরকম কিছু নির্দিষ্ট সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি বিষয়। এই বিশ্লেষণকে আমরা শহর এমনকি সামাজিক অস্তিত্ব (অন্টোলজি)-এর উপরও প্রয়োগ করতে পারি।
সৃষ্টিতত্ত্ব
আমাদের মুতাফাক্কির ও আলেমগণ সৃষ্টিকে দুইভাগে বিভক্ত করেছেনঃ
১। মানুষের কোন প্রকার হস্তক্ষেপ ব্যতিত মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক তৈরিকৃত বস্তু জগত।
২। মানুষ কর্তৃক তৈরি করা জগত। যেমন, ভালো ও মন্দ, সুন্দর ও অসুন্দর, পদ–পদবীর মত মানুষের কাজের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র। একটি সমাজও মূলত এই সকল বিষয় নিয়েই গঠিত হয়।
এই ভাবে মানুষ ফিজিক্যাল বা বস্তুগত দুনিয়ার উপর নিজেদের কর্মের মাধ্যমে দ্বিতীয় একটি জগত তৈরি করে থাকে। মানুষের তৈরি করা এই জগত বস্তুগত জগতের মত পদার্থ দ্বারা তৈরি নয়।
অন্য কথায় বলতে গেলে, তাকবিনি আমর (আদেশ) হল, বস্তু জগত (ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ড)। আর তাকলিফি আমর (আদেশ) হল মানুষকে দেওয়া আখলাকী দায়িত্ত্ববোধ সমূহ। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে এই দায়িত্ত্বসমূহ বা এই আদেশ ও নিষেধসমূহকে দেওয়া হয়েছে মানুষের অস্তিত্বকে সংরক্ষণ করার জন্য। কেননা দ্বীনের উদ্দেশ্য হল; মানুষের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। এর আদেশ ও নিষেধসমূহ বা তাকলিফি আদেশ হল মানুষের প্রয়োজন। এই জন্য সমগ্র তাকলিফি আমর-ই কল্যাণকর।
সংক্ষেপে বলতে গেলে; অস্তিত্ব হল মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলীর) –এর দাবীর প্রতিফলন মাত্র। আর এগুলো জনসাধারণ কর্তৃক নামকরণকৃত আলো ও নূর অর্থে সমগ্র বস্তুজগতে প্রতিফলিত হয়। এরপর আকলী সৃষ্টি হিসেবে মানুষের জীবনে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও বিধান হিসেবে অস্তিত্বের জগতে প্রকাশিত হয়। মূলগত দিক থেকে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও বিধানের মূলবিষয় সমূহও ওহী কর্তৃক গঠিত। মানুষ যখন ওহীর নির্দেশনার কারণে পয়গাম্বরকে অনুসরণ করে, তখন সেই অনুসরণের ফলে তারা একটি নির্দিষ্ট সংহতিতে প্রবেশ করে।
ইমাম নাসাফির ভাষায়, “ মুসলমান শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য কাজ করে না বরং সে তাঁর আশেপাশের মানুষের (যেমন পরিবার, প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধব) নিরাপত্তা ও অধিকারের জন্য কাজ করে। আর তাঁদের দায়িত্ত্ব হল আপনার নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। মুসলমান হওয়ার অর্থ যখন অপরের অধিকার ও নিরাপত্ত্বা নিশ্চিত করা হয়, তখন দেখা যাবে যে পরিকল্পনা না করলেও এমনিতেই সমাজের মধ্যে শক্তিশালী একটি সংহতি সৃষ্টি হবে।
এখানে আমরা দুইটি নূরের প্রতিফলন দেখতে পাব। একটি হল সাহাবায়ে কেরাম। তারা ইসলামকে গ্রহণ করে নিজেদের অস্তিত্বের মধ্যে আল্লাহর রাসূলের নূরের প্রতিফলন ঘটিয়েছে এবং এইভাবে একটি সমাজ তৈরি হয়েছে। এই সমাজ হযরত পয়গাম্বর থেকে যা শিখেছে সেটাকে হুবুহু নিজেদেরকে সমাজে বাস্তবায়ন করেছে এবং শাহাদাত (দেখানো)– এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছে।
দ্বিতীয় যে পর্যায়ে এসে আমরা নূরের প্রতিফলন দেখতে পাই সেটা হল দ্বীনকে সঠিকভাবে বুঝা সংক্রান্ত জ্ঞানের ক্ষেত্রে। এই জ্ঞান সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ হল, রাসূল (সঃ) ও সাহাবীগণ কিভাবে বসবাস করেছেন সেটাকে বুঝা। আর এটাকে বুঝতে গিয়ে আমাদের আলেমগণ সেই বুঝ বা উপলব্ধিকে পারিভাষিক ভাবে তুলে ধরে দ্বীনী জ্ঞানের উৎপত্তি ঘটিয়েছেন।
এই বিষয়গুলোকে যদি ইমাম গাজ্জালীর পূর্বের কথার সাথে সম্পর্কিত হিসেবে চিন্তা করি তাহলে দেখা যায় যে, এমন একটি বস্তু জগত রয়েছে যেটাকে আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করি আর একটি আধ্যাত্মিক জগত রয়েছে যেটাকে আমরা আকলের মাধ্যমে উপলব্ধি করি। এই দুনিয়া আকল ও অর্থের মাধ্যমে গঠিত একটি দ্বিমাত্রিক দুনিয়া।
আমরা যদি এই দুনিয়াকে শুধুমাত্র পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করি তাহলে সেটাকে বলা হয় পজিটিভিজম। এর এই পজিটিভিজম সকল ঘটনা প্রবাহকে বস্তুগত জগতের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এবং সমাজকে জাগতিক কিছু মূলনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করে থাকে। কিন্তু মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গী অনেক বেশী বিস্তৃত। এই দৃষ্টিভঙ্গী পজিটিভিজমকে পরিগ্রহ করার পাশাপাশি আরও অনেক গভীরে নিয়ে যায়। এখানে একজন মুসলিম জানে এই জগত বহুমাত্রিক। সে এটাও জানে যে মানুষ তার যোগ্যতাকে বিকশিত করার মাধ্যমে এই সকল বহুমাত্রিকতাকে জানতে পারে।
মহান আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহ বস্তুজগতে সসীম কিন্তু মানুষের মধ্যে অসীম পরিমাণে প্রতিফলিত হয়। আর এই প্রতিফলন মানুষের মধ্যে মূলত আখলাকী পূর্ণতা (কামাল) হিসেবে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। যে যতবেশী প্রচেষ্টা চালাবে সে ততবেশী পরিমাণে সেই অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। এই অবস্থাকে আমরা বস্তুজগত ও আধ্যাত্মিক জগত উভয়কে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে চিন্তা করতে পারি। এই ক্ষেত্রে একজন উদ্ভিদতত্ত্ববিদের উদাহরণকে বিবেচনায় নেওয়া যায়, সে একটি গাছকে কতটুকু বুঝতে পারে সেটা গাছের সাথে তার সম্পর্কের সমানুপাতিক। অনুরূপ ভাবে মহান আল্লাহর তাজাল্লীও সর্বস্থানে বিস্তৃত। আমি সেটার সাথে কতটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পারব সেটা আমার অবস্থা ও যোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত। আমি আমার নিজের অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করে এটা বুঝতে পারি। এটা সকল ক্ষেত্রেই এমন।
সবশেষে, কাসরাত থেকে ওয়াহদাতের দিকে তথা বহুত্ত্ব থেকে একত্বের দিকে উপনীত হওয়া আর সেই ওয়াহদাতের দিকে যাওয়ার সময় সকল কাসরাতকে আমরা নিজেরা সংগ্রহ করার পাশাপাশি বাস্তবায়ন করে থাকি। কাসরাতকে ওয়াহদাতে উপনীত করার সময় যে বিষয়টি বুঝতে হবে সেটা হল, হাকিকী নূর হলেন আল্লাহ তায়ালা। তাঁর বাহিরে সকল কিছুই আপেক্ষিক, আংশিক ও ধ্বংসশীল।
ইমাম গাজ্জালী সূরা নূরের ৩৫ নম্বর আয়াতের যে দার্শনিক ব্যাখ্যা দাড় করিয়েছেন সেখান থেকে আমরা এই সকল বিষয়কে জানতে পারি।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ