মানব ইতিহাসে হক ও বাতিল সভ্যতা সমূহের একটি চিত্র

১,৯৪৩ বার পঠিত

এক অর্থে বলতে গেলে, মানব জাতির ইতিহাস সত্য এবং মিথ্যার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। মানব ইতিহাসে যখন ‘হক্ব’ বা সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছিলো। কিন্তু যখন অসত্য ও বাতিল পৃথিবীকে শাসন করার সুযোগ পেয়েছিল সেই সময়ে পৃথিবী যেন এক অশান্তির স্থানে পরিণত হয়েছিলো। বাতিল যখন পৃথিবীর ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়, তখন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বাড়তে থাকে। মানুষের উপর চালানো হয় নির্যাতনের স্টীমরোলার। যুদ্ধ ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সকল স্থানে। যখন হক্ব পৃথিবীকে শাসন করেছে আমরা সেই সময়কে ❝সত্যকে সর্বোচ্চ তুলে ধরার সময়❞ বলে আখ্যায়িত করে থাকি। আর যখন বাতিল বা মিথ্যা পৃথিবীকে শাসন করে সে সময়কে আমরা ❝শক্তিকে সর্বোচ্চে স্থানে প্রতিস্থাপনকারী ব্যক্তিদের শাসন❞ বলে গণ্য করে থাকি। এই দুইটি দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসে কত সময় ধরে মানবতাকে শাসন করেছে তার একটি চিত্র দেখানো হয়েছে।

পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন, ইতিহাস লেখার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। তারা বলেন, সর্বপ্রথম মেসোপটেমিয়াতে লেখার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এই জন্য আমরা যখন মেসোপটেমিয়ার দিকে যাই তখন দেখতে পাই, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ বছর পূর্বে সেখানে বিভিন্ন ধরণের গোত্র ছিল। তারা ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী জাতিতে রূপান্তরিত হয়। এদের মধ্য থেকে ফেরাউন ও নমরুদদের জন্ম হয়। এই নমরুদরা যখন পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রহমান নামের উসিলায় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন এবং তার নেতৃত্বে পৃথিবীতে ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়। মানুষ তার সত্যিকারের অধিকার ফিরে পায় এবং সুখে শান্তিতে বসবাস শুরু করে। চিত্রে এ সবুজ অংশ হল হক্ব কেন্দ্রীক সভ্যতাসমূহের সময়কাল; আর লাল অংশ হল বাতিল কেন্দ্রীক সভ্যতাসমূহের সময়কাল।

এইভাবে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক ও সত্যকে সর্বোচ্চে স্থান দানকারী একটি সময় মানুষ পায়। কিন্তু এই সময়কাল যখন চলছিল তখন মিশরে ধীরে ধীরে ফেরাউনরা শক্তিশালী হতে শুরু করে। আপনারা আমাদের চিত্রে দেখতে পাচ্ছেন, ফেরাউনরা যখন শক্তিশালী হচ্ছে তখন এই পয়েন্টে এসে একজন আরেকজনের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এখানে কাদেশ যুদ্ধ (Battle of Qadesh) সংগঠিত হয়।এই যুদ্ধে মিশরের ফেরাউনরা বিজয় লাভ করে।

ফেরাউনদের যুদ্ধে জয়ের কারণ ছিল, তারা তৎকালীন সময়ের প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত অবস্থানে ছিল। প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদের ভালো অবস্থান তাদেরকে বিজয়ের জন্য সামনে এগিয়ে দেয়। মিশরীয়দের যুদ্ধের গাড়ি সমূহ ছিল লোহার চাকার এবং ঘোড়া এই গাড়িকে টেনে নিয়ে যেত। তাদের লোহার চাকার এই ঘোড়ার গাড়ির দুই জন করে সৈন্য থাকতো।

আর মেসোপটেমিয়ানদের (হিতিতদের) গাড়ি চাকা ছিল পাথরের তৈরি। এটা টেনে নিত একটি ঘোড়া আর এই পাথরের চাকার গাড়িতে মাত্র একজন সৈন্য উঠতে পারত। এই একজন মাত্র লোককে একই সাথে গাড়ি চালাতে হতো আবার তীরও মারতে হত।

অপরদিকে মিশরীয়রা গাড়িতে ২ জন থাকার কারণে একজন গাড়ি চালাত আর অপরজন তীর নিক্ষেপ করতো। এ কারণে মিশরীয়রা বিজয় লাভ করে। এভাবে শক্তিকে সর্বোচ্চে স্থানদানকারী এবং বাতিল একটি চিন্তা বা সভ্যতা মিশরে অনেক বড় একটি বিজয়ী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ফেরাউনরা যখন মিশরে তাদের শক্তিমত্তার সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয় তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসা (আঃ) কে দুনিয়াতে পাঠান এবং তার মাধ্যমে পুনরায় পৃথিবীতে সত্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া শুরু করে। মুসা (আঃ) এর হক্বের উপরে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতাকে চিত্রে সবুজ রঙে দেখানো হয়েছে। মুসা (আঃ) এর প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা যখন পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতায় ছিল, তখন শক্তিকে উচ্চে স্থানদানকারী অর্থাৎ বাতিলকে প্রতিনিধিত্বকারী গ্রীক সভ্যতা ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করে এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে দখল করে নেয়।

গ্রীক সভ্যতা যখন শক্তিমত্তার দিক থেকে চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছে তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে পুনরায় হক্বের উপর ভিত্তি করে একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য হযরত ঈসা (আঃ) কে পাঠান এবং তিনি পৃথিবীতে সত্যের উপর ভিত্তি করে নতুন একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত ঈসা (আঃ) এর প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা যখন পৃথিবীতে সত্যের পতাকাবাহী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছিল তখন রোমকরা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হওয়া শুরু করে এবং ৬২২ সালে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের সকল শক্তির বিপরীতে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) কে নবুওয়াত দান করেন।

চিত্রঃ ১ এ আপনারা যেমন দেখতে পাচ্ছেন ৬২২ সালে ইসলামের জন্ম লগ্ন থেকে ইসলামী সভ্যতা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকবে। সবুজ অংশ চলতেই থাকবে।

এখন ৩৫০ বছর ধরে অর্থাৎ ১৬৮৩ সাল থেকে বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা জাগতিক শক্তিকে তাদের দখলে নিয়েছে, সারা পৃথিবীতে তাদের শাসন কায়েম করেছে। এই বাতিল সভ্যতা যখন থেকে দুনিয়াকে শাসন করছে সেই অংশটিকে আমাদের চিত্রে লাল রঙে দেখানো হয়েছে।

আজ আমরা বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতিষ্ঠিত একটি দুনিয়ায় বসবাস করছি। আজকের দুনিয়া তাদের মূলনীতির আলোকে গড়ে উঠেছে। এ পয়েন্টটি আমাদের চিত্রে দেখানো হয়েছে।

বাতিল শক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্য সভ্যতা যে সময়কাল ধরে দুনিয়াকে শাসন করছে সে সময়কাল এবং বৃত্তের ভেতরে যে বিন্দু রয়েছে সেই বিন্দুটি একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সময়কে বুঝাচ্ছে। এই জন্য আজ আমরা ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি।

প্রশ্ন হলো, বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা কি তাদের শাসন ব্যবস্থা চালিয়ে যাবে? নাকি ন্যয়ভিত্তিক ব্যবস্থা আসবে? নাকি মিল্লি গুরুশ (ইসলাম) আসবে? বিশ্বমানবতা কি তাদের বহুল প্রতীক্ষিত সুখ ও শান্তির একটি দুনিয়া ফিরে পাবে? আজ আমারা যে সময়ে এসে পৌঁছেছি তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। আমরাই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো। কারণ ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণে আজ আমরা দাঁড়িয়ে।

অনুবাদকঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ

লেখাটি শেয়ার করুন

মতামত প্রকাশ করুন

অনুদান দিন
Scroll to Top