রাষ্ট্রীয় জাতি হিসাবে আমরা নতুন। মাত্র আঠার বৎসর আগে [১] আমাদের পয়দায়েশ। যত বিভ্রান্তি এইখানেই। আমাদের চিন্তার যত অস্বচ্ছতা, যত অপরিচ্ছন্নতা, সব শুরু হয় এইখানে। আমরা ভুলিয়া যাই, রাষ্ট্রীয় জাতি হিসাবে আমরা নতুন হইলেও সভ্য মানুষ ও কৃষ্টিমান জাত হিসাবে আমরা শিশু নই। আমাদের মাতৃভূমির নাম পাক বাংলা [২]। এটা প্রাচীন সমতট দেশ। হঠাৎ জলধি হইতে ভাসিয়া-উঠা চরভূমি নয়। অন্তত দুই হাজার বছরের প্রাচীন কাহিনী ইহার ইতিহাসের পৃষ্ঠা উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে।
আধুনিকতম ধর্মের উম্মত হিসাবে, তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সভ্য জাতি হিসাবে, আমরা প্রায় সাতশ’ বছর এই দেশ পার্শ্ববতী দেশসমূহ কৃতিত্বের সংগে শাসন করিয়াছি। সে শাসন বিদেশী বিজয়ীর বেশে উচ্চাসনে বসিয়া করি নাই। এ দেশকে মাতৃভূমি জ্ঞান করিয়া জনগণের সাথে মিশিয়া তাদের মধ্য হইতে তাদেরই নেতা হিসাবে খাদেম হিসাবে সে শাসন করিয়াছি। জীবন শেষে জনগণের সাথেই মাতৃভূমির মাটিতে মিশিয়া আছি।
এই মুদ্দতে বাংলাদেশ ছিল শিক্ষা-সভ্যতার পীঠস্থান-শিল্প-বাণিজ্যের কেন্দ্র কৃষ্টি-স্থপতির লীলাভূমি। চীন-আরব-গ্রীক-রোমান প্রভৃতি সভ্য জাতির পণ্ডিতগণের তীর্থক্ষেত্র। আজ হইতে মাত্র তিনশ’ বছর আগেও পাক-বাংলা তৎকালীন সভ্য জগতের দরবারে উচ্চ আসনের অধিকারী ছিল। নবাব শুজা শায়েস্তা খাঁর আমলে ফরাসী চিকিৎসক বার্নিয়ার ও ব্যবসায়ী টেভানিয়ার এবং ইংরাজ পরিব্রাজক রালফ্ ফিশ্ ব্যাপকভাবে পাক-বাংলা পরিভ্রমণ করিয়া এদেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়াছিলেন। তারা দেখিয়াছিলেন, পাক-বাংলা তৎকালে বিভিন্ন দেশে চাউল, চিনি, সুতি কাপড়, রেশমী কাপড়, জবক্ষার, আফিম ও লবণ রফতানি করিত। ঐসব জিনিস এ দেশে এত সরস ও সস্তা ছিল যে, বিদেশ হইতে বড়-বড় সওদাগর বিশাল-বিশাল জাহাজে করিয়া এসব জিনিস নিতে আসিতেন। ষোল শতকের মাঝামাঝি ভিনিশীয় পরিব্রাজক সিযার ফ্রেডরিক পাক-বাংলা ভ্রমণ করিয়া লিখিয়াছিলেন: “এখানকার সন্দ্বীপ বন্দর জন-বহুল এক বিশাল বাণিজ্য-কেন্দ্র। এই বন্দরে প্রতিদিন গড়ে দুইশ’ জাহাজ লবণ বোঝাই হইয়া বিদেশ গমন করে। এখানকার জাহাজে নির্মাণ-কৌশল এত সুন্দর ও কাঠ এত মজবুত যে, ইস্তাম্বুলের সুলতান আলেকযান্দ্রিয়ার বদলে এখন তাঁর রাজ্যের প্রয়োজনীয় সমস্ত জাহাজ এইখান হইতে তৈয়ার করাইয়া থাকেন।”
আমাদের কালচার
পাক-বাংলার সভ্যতা ও শিল্প-বাণিজ্যিকে আমরা মুসলমানরা এতখানি উন্নত করিয়াছিলাম। সেই সংগে পাক-বাংলার কালচারকেও আমরা নানা ফুলে-ফলে ও রূপে-গন্ধে সুসজ্জিত ও সুরভিত করিয়াছিলাম। এটা আমরা একদিনে করি নাই। বাংলার মাটির সাথে আমাদের সম্পর্ক হাজার বছরেরও বেশি কালের। পুরা সাড়ে ছয়শ’ বছর আমরা এই দেশের শাসক ছিলাম। তার মধ্যে প্রায় তিনশ’ বছর আমরা স্বাধীন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা শাসন করিয়াছি। এই মুদ্দতে আমরা বাংলাকে নিজস্ব জাতি-নাম, ভাষা ও সাহিত্য দিয়াছিলাম। সে ভাষা ও সাহিত্যের মধ্য দিয়া বাঙ্গালীত্বকে নতুন মর্যাদা, তার ভাষায় নতুন সুর, তার গলায় নতুন জোর দিয়াছিলাম। কৃষ্টি সভ্যতা শিল্প-বাণিজ্য ও শিক্ষা-সাহিত্যে সত্য জগতের দরবারে বাংলাদেশকে করিয়াছিলাম সুপ্রতিষ্ঠিত। পাক-বাংলার শিল্প-সাহিত্যে ও কৃষ্টি-সভ্যতার হাজার বছরের এই মুসলিম ছাপ সুস্পষ্ট দীপ্তিমান।
প্রাকৃতিক আনুকূল্যও মুসলমানদের এই সাফল্যের সহায়ক ছিল। কি নৃতত্ত্বের দিক হইতে, কি ভাষা-কৃষ্টির দিক দিয়া পাক-বাংলা আর্য-ভারত হইতে বরাবরই ছিল পৃথক। আর্যরা কোনও দিন পারে নাই বাংলা জয় করিতে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ হইতেই এ দেশ দ্রাবিড়দের দখলে ছিল। দ্রাবিড়রা বর্ণাশ্রম-ধর্মী। আর্য ধর্মের চেয়ে বর্ণ-বিরোধী সাম্যবাদী বৌদ্ধধর্মের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়। বাংলার পাল রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন। তাঁদের আমলে এ দেশের জনসাধারণের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম, দ্রাবিড়ী কৃষ্টি ও বৌদ্ধসংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল। পাল রাজারা বাংলাদেশকে শুধু আর্য-কৃষ্টি ও সংস্কৃতভাষার হাত হইতেই বাঁচার নাই, তাঁদের কেউ-কেউ মগধ পর্যন্ত দখল করিয়া আর্য- ধর্ম ও সংস্কৃত ভাষাকে বাংলার সীমানার বাহিরে বহুদূরে ঠেলিয়া দিয়াছিলেন।
পাল রাজাদের পরে সেন রাজারা যখন বাংলার নিজস্ব ভাষা ও কৃষ্টি দমন করিয়া ইহার উপর আর্য-কৃষ্টি ও সংস্কৃত ভাষা চাপাইবার অপচেষ্টা শুরু করেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ণাশ্রমবিরোধী বৌদ্ধধর্ম সাম্যবাদী ইসলামের সাহায্য ও সহযোগিতায় চূড়ান্ত ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা পায়। ইসলামী ছাপ লইয়া বাংলায় নয়া কৃষ্টি-জীবন গড়িয়া উঠা শুরু হয়। মুসলিম আমলে একটানা সাড়ে ছয়শ’ বছর ধরিয়া চলিতে থাকে এই নয়া কৃষ্টি জীবন সৃষ্টির কাজ। তা এমন দানা বাঁধে যে মুসলিম শাসনের অবসানের পরেও উনিশ শতকের শেষ দিন অবধি দীর্ঘ একশ’ বছর ধরিয়া সে কৃষ্টি-সাহিত্যের প্রভাব অক্ষুণ্ণ থাকে।
নবাগত ইংরাজ শাসকরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী কূটনৈতিক তাকিদে ও দেশ শাসনের সুবিধার খাতিরে হিন্দু-মুসলিম-বিরোধ সৃষ্টি প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে প্রচলিত ভাষা-কৃষ্টি-সাহিত্যের বিরুদ্ধে হিন্দুদের উস্কানি দেয়। বাংলা কৃষ্টি-সাহিত্যকে ইসলামী ছাপমুক্ত এবং বাংলা ভাষাকে আরবী ফারসী শব্দ বর্জিত বিশুদ্ধ আর্য ভাষা করিবার পরামর্শ দেয়। বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের কন্যা সাজাইবার অলঙ্কারাদির নির্মাণ-কার্য শুরু হয় এই সময় হইতে। এ কাজ শুরু করে ইংরাজরা একাই। সরকার ও মিশনারীদের সমবেত শক্তি নিয়োজিত হয় এই শুদ্ধিকরণে।
পুরা একশ’ বছরের অবিশ্রান্ত চেষ্টায় বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিষময় ফল ফলিতে শুরু করে। প্রচলিত বাংলা ভাষা ও হাজার বছরের কৃষ্টি-সাহিত্যের বিরুদ্ধে এ্যাংলো-হিন্দু অভিযান সফল হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পিতা, বাংগালী জাতির মেজরিটি মুসলমান এই অভিযানের মোকাবেলায় রুখিয়া দাঁড়ায়। ক্রমে মুসলিম-কৃষ্টির সাথে রিভাইভ্যালিস্ট হিন্দু-কৃষ্টির এবং প্রচলিত বাংলা যবানের সাথে সংস্কৃতীকৃত নব্য বংগ ভাষার সংঘাত বাধে। এই সংঘাতের শেষ পরিণাম পাকিস্তানের সৃষ্টি। পাক-বাংলার কৃষ্টির ইহাই পটভূমি।
তিনটি মুদ্দা কথা
একটি আলোচনার গোড়াতেই তিনটা মুদ্দা কথা বুঝিতে হইবে:
এক, সাড়ে ছয়শ’ বছরের মুসলিম শাসন বাংলায় কৃষ্টি-সাহিত্যের যে গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করিয়াছিল, তার সবটুকুই শাহী-নবাবী কালচার ছিল না। তার বেশির ভাগেরই একটা জাতীয় প্রাণ ও গণরূপ ছিল। বাদশাহি যাওয়ার পরও একশ’ বছর এইটাই বাঁচিয়া ছিল।
দুই, বিদেশী শাসকরা স্বদেশী প্রতিবেশীদের সহায়তায় দেড়শ’ বছর ধরিয়া যে কৃষ্টি- সাহিত্যের বিরুদ্ধে সমবেত অভিযান চালাইয়াছিল, সেটা ছিল এরই বিরুদ্ধে।
তিন, এই অবলুপ্ত জাতীয় কৃষ্টির রেনেসাঁ সাধনে তাকে যুগোপযোগী করিয়া আমাদের জাতীয় ব্যক্তিত্বকে সঞ্জীবিত করার দুর্নিবার তাকিদেই, পাকিস্তানের সৃষ্টি। আরও সংক্ষেপে তিনটি কথা এই আমরা কি ছিলাম? কি হইয়াছি? কি হইব?
আমরা নির্ভয়ে দাবি করিতে পারি, বাঙালী মুসলমানরা একটি সমৃদ্ধশালী ঐতিহাসিক কালচারের উত্তরাধিকারী প্রাচীন সভ্য জাতি। কালচার ঐতিহ্যহীন একটা ভূঁইফোঁড় জাতি আমরা-এমন কথা পরম শত্রুও বলিতে পারিবে না। নয়া রাষ্ট্রীয় জাতিত্বের দোহাই দিয়া অমন অজুহাত আমরা নিজেরাও দিতে পারি না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দিতেছে, বাংগালী মুসলমানরা ধর্ম ও সমাজ-জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাসে-ঈমানে, আচারে-অনুষ্ঠানে, আদবে-কায়দায়, খোরাকে-পোশাকে, জন্মে-মৃত্যুতে, শাদি-গমিতে, পরবে-উৎসবে, আমোদে-প্রমোদে, খেলায়-ধূলায়, নাচে-গানে, আর্টে-সাহিত্যে, শিল্পে-বাণিজ্যে, বীরত্বে-মহত্ত্বে, যুদ্ধে-শান্তিতে, কামানে- বন্দুকে, অস্ত্রে-শস্ত্রে, দালানে-ইমারতে, ইনসাফে-আদালতে, আইনে-কানুনে একটা ব্যাপক ও সামগ্রিক, উদার ও উন্নত কালচার গড়িয়া তুলিয়াছিল।
সে কালচার শুধু মুসলমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। অমুসলমান বাংগালীর মধ্যেও পরিব্যাপ্ত হইয়াছিল। ফলে তা পাইয়াছিল একটা জাতীয় সত্তা ও সার্বজনীন রূপ। যুগের দাবিতে দেশজ পরিবেশে জাগরণের প্রেরণায় সামাজিক কল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের তাকিদে ন্যাচারেল গ্রোথের মতোই সে কালচার ধীরে-সুস্থে গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই জন্যই তা পাইয়াছিল জাতীয় রূপ। ইতিহাস এও সাক্ষ্য দিতেছে যে, বিদেশী শাসকরা তাদের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই আর্য রিভাইভ্যালিযমের উস্কানি দিয়া আমাদের হাজার বছরের প্রতিবেশীকে শত্রুভাবাপন্ন করিয়া তুলিয়াছিল এবং তাদেরই সহায়তায় রাজশক্তির দমন-নিষ্পেষণের দ্বারা সে কালচারের ধ্বংসাভিযান চালাইয়াছিল। এমনিভাবে রাজ-রোষে আমাদের কালচারের অপমৃত্যু ঘটে; বার্ধক্যের দরুন তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নাই।
সে নিধন-যজ্ঞের কথা ইতিহাস-পাঠকরা জানেন। শাসকরা কেমন করিয়া কলমের এক খোঁচায় প্রচলিত রাষ্ট্র-ভাষার পরিবর্তন করিয়া যুগ যুগান্তের শাসক- বিচারকদেরে অফিস-আদালত হইতে বাহির করিয়া রাস্তার ধূলায় নামাইয়া দেয়, শিক্ষা-নীতি পাল্টাইয়া কেমন করিয়া তারা হাজার বছরের ইন্টেলিজেনশিয়াকে নিরক্ষর মূঢ়ের জাতে পরিণত করে, রিযাম্পশন পলিসির নামে কিরূপে তারা এক কালের সম্পদশালী অভিজাত সম্প্রদায়কে দীনহীন পথের কাংগালে রূপান্তরিত করে, ইতিহাসের ছাত্ররা তার সব খবরই রাখেন। এটা কালচার রক্ষার পরিবেশ ছিল না। মুসলমানদের আত্মরক্ষাই যখন একরূপ অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছিল, তখন কালচার রক্ষার প্রশ্নই উঠে না।
আজিকার প্রশ্ন
কিন্তু আজ? আজিকার কৈফিয়তটা কি? এত বড় সম্পদশালী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী প্রাচীন জাতি হইয়াও যদি আমরা আজ কালচারে গরীব হই, আঠার বছরের স্বাধীনতার পরেও যদি আমরা কৃষ্টির স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত হইতে না পারিয়া থাকি, তাবে সে দোষ দিব আমরা কাকে? বাদশাহি যাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের কালচারের শাহী রূপটুকু যে গিয়াছে, সেটা বড় কথা নয়। বাদশাহি থাকিবার জিনিসও নয়। এ যুগের অন্ত্রও সেটা নয়। আমরা সবাই নবাব-বাদশাও ছিলাম না। সবাই আমরা নবাব-বাদশার বংশধরও নই। আমরা মুসলিম জনসাধারণ মুসলিম শাসনামলেও আর দশজনের মতোই প্রজাসাধারণই ছিলাম। কাজেই মুসলিম আমলের কালচারের শাহী রূপ নয়, গণরূপটাই বড় কথা। ঐ রূপেই ছিল সেটা আমাদের কালচার। ওটারই আমরা উত্তরাধিকারী। তারই রক্ষণ ও বিকাশনই আমাদের দায়িত্ব। কাজেই আমাদের বুঝা দরকার, সেটার রূপ কি ছিল, কি হইয়াছে, আর কি হইতে হইবে।
আগের আলোচনা হইতে এইটুকু নিশ্চয় পরিষ্কার হইয়াছে যে, মানুষের ধর্মোৎসবে, আচারে-অনুষ্ঠানে, নামে-নিশানায়, খোরাকে-পোশাকে আর্টে-সাহিত্যে, নাচে-গানে ও আদবে-কায়দায়ই তাদের কালচারের গণরূপ প্রতিফলিত ও বিকশিত হয়। কাজেই আমাদেরও কালচারের ঐতিহ্য ও বর্তমান এ সবের মধ্যেই সন্ধান করিতে হইবে।
প্রথমেই ধরুন ধর্মোৎসবের কথা। ধর্মোৎসবই সকল জাতির কৃষ্টিজীবনের সবচেয়ে প্রশস্ত ও উর্বর ক্ষেত্র। ধর্ম ও কৃষ্টির সম্পর্ক যে গাছ ও ফলের সম্পর্কের মতোই ঘনিষ্ঠ, সে কথা আগেই বলিয়াছি। বস্তুত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের স্কেলিটন ঘেরিয়া সামাজিক আচার-আচরণ ও আমোদ-প্রমোদের যে লহ-গোশত ও রগ-রেশা গড়িয়া উঠে, তার সমষ্টির নাম ধর্মোৎসব। এই ধর্মোৎসবের বিকাশ ও বিস্তৃতিই কালচারের ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এই সব উৎসবের প্রথম গুণ এই যে, এতে পূণ্যার্জন ও আনন্দ উপভোগ এক সংগে করা চলে। শেষ পর্যন্ত ধর্মোৎসবের ধর্মটুকু যে উৎসবের মধ্যে তলাইয়া যায়, তাতেও মানবজাতির লোকসান হয় না। কারণ ধর্মের দিক হইতে তারা যা হারায়, কৃষ্টির দিক হইতে লাভ করে তার চেয়ে অনেক বেশি। বস্তুত স্থপতি-ভাস্কর্য শিল্প-সংগীত ও কাব্য সাহিত্যের জন্মই এইখানে। ওদের দ্বিতীয় গুণ এই যে, ওসবের আয়োজন করে অবশ্য মুষ্টিমেয় ধনী-লোক, কিন্তু আনন্দটা ভোগ করে ধনী-নির্ধন সকলে। তৃতীয় গুণ এই যে, এই সব উৎসবে অন্য ধর্মের লোকদেরেও আকৃষ্ট করে এবং তাদের ভোগেও লাগে। ফলে তারা-পরিণত হইতে পারে জাতীয় উৎসবে। মসজিদ মন্দির গির্জার বাইরে যে উৎসব যতটা প্রসারিত হয়, জাতীয় রূপ পাইবার সম্ভাবনা হয় তার তত বেশি।
টীকাঃ
১. এ প্রবন্ধটি ১৯৬৫ সালে লিখিত। স্বাধীনতা বলতে ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের দিকে লেখক ইঙ্গিত করেছেন।
২. স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে লেখা হওয়ায় লেখক বাংলাদেশ বুঝাতে পাক-বাংলা শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। এর ব্যাখ্যা তিনি ভূমিকাতেও দিয়েছেন। লেখার রূপ অক্ষুণ্ণ রাখতে এখানেও হুবহু পাক-বাংলা রাখা হলো।


