ইলম ও আখলাক: বিশ্বমানবতার সংকট উত্তরণের দুই পথ

বর্তমান বিশ্বমানবতা এক গভীর অর্থহীনতার সংকটের মুখোমুখি। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ অনুসন্ধানের পাশাপাশি সেই পথ বিশ্বমানবতার সামনে তুলে ধরাও আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনের জন্য কেবল ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই আদর্শকে নিজেদের জ্ঞান, চিন্তা ও জীবনাচরণের মধ্যে ধারণ করা এবং তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটানো। আমার মতে, বিশ্বমানবতাকে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে আমাদের সামনে দুটি মৌলিক কর্মপন্থা রয়েছে।
১. ইলম ও হিকমতের মাধ্যমে। আজ বিশ্বমানবতা যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তার সমাধান আমরা কেবল ইলম ও হিকমতের মাধ্যমেই করতে পারি এবং সেই সমাধান বিশ্বমানবতার সামনে তুলে ধরতে পারি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা আজ সেই অবস্থানে নেই। আমাদের কাছে সঞ্চিত জ্ঞান মুসলিম দেশসমূহে বিরাজমান মূর্খতা দূর করতে কিংবা মুসলমানদের মধ্যকার তাফরিকাত বা দলাদলি নিরসনের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট নয়।
এ অবস্থায় প্রতিটি যুবকের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (স.) বলেছেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এমন প্রত্যেক যুবকের কর্তব্য হলো নিজেকে জ্ঞানে সুসজ্জিত করা। বিশ্ববাসীর সামনে একজন আলেম হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। নিজেদের অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে যুবকদের ইলম, ফিকির তথা চিন্তা ও মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে।
আমাদের প্রজন্ম আপনাদের প্রজন্মের সামনে ইলম ও হিকমতকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারেনি। আপনারা যেন সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি না করেন। এ জন্য এখন থেকেই নিজেদের জ্ঞানে সুসজ্জিত করুন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইলম ও হিকমতকে যথাযথভাবে পৌঁছে দিন।
২. ইসলামকে বিশ্বমানবতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দ্বিতীয় কর্মপন্থা হলো ইখলাস, আমলে সালিহ ও আখলাক। বাস্তবিক অর্থে এই কর্মপন্থা প্রথমটির চেয়েও বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। কারণ জ্ঞানের মাধ্যমে ইসলামের তাবলিগ বা প্রচারের আগে আখলাকের মাধ্যমে তার তাবলিগ করতে হয়।
গোটা দুনিয়ায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে আলেম কিংবা দরবেশদের চেয়ে সৎ ব্যবসায়ীরাই অধিক ভূমিকা পালন করেছেন। কেননা সাদিক (সৎ) ব্যবসায়ীরা ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান পৌঁছানোর আগেই নিজেদের জীবনাচরণ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হালাল-হারাম এবং আখলাকের ধারণা সেসব অঞ্চলে পৌঁছে দিয়েছেন। অর্থাৎ ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান বিস্তারের আগেই তাঁরা ঈমান ও সুমহান আখলাকের শিক্ষা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দিয়েছেন।
এখন আমরা যদি নিজেদের সামনে দ্বিতীয় একটি প্রশ্ন রাখি, মুসলিম হিসেবে আমরা কি আমাদের আখলাকী অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে দেশের জনগণের কাছে ইসলামকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছি?
মুসলিম বলতে আমাদের মনে প্রথমে কেমন একজন মানুষের চিত্র ভেসে ওঠে? একজন মুসলিম অবশ্যই আদিল (ন্যায়পরায়ণ), উত্তম আখলাকের অধিকারী, মুত্তাকী এবং ফাদিল (মর্যাদাপূর্ণ) হবেন। রাসূল (স.) বিভিন্ন হাদীসে বলেছেন, ‘দ্বীন হচ্ছে উত্তম আখলাক’ এবং ‘আমি উত্তম আখলাককে পরিপূর্ণ করার জন্য এসেছি।’
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আজ মুসলিম দেশসমূহে আখলাকী বৈশিষ্ট্যের চেয়ে আখলাকবিহীনতার প্রাধান্যই বেশি লক্ষ করা যায়। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, আমরা দ্বীন ও আখলাককে পরস্পর থেকে পৃথক করে ফেলেছি। অথচ এই বিভাজন মোটেও সঠিক নয়। দ্বীন হচ্ছে আখলাক এবং আখলাকই হচ্ছে দ্বীন।
দ্বিতীয়ত, আমরা কোরআনুল কারিমকে যেভাবে ইবাদত ও আহকামের গ্রন্থ হিসেবে দেখি এবং অধ্যয়ন করি, সেভাবে আখলাকের গ্রন্থ হিসেবে দেখি না কিংবা অধ্যয়নও করি না।
তৃতীয়ত, আমরা রাসূল (স.)-এর হাদীস ও সীরাতগ্রন্থগুলোকে আহকাম ও ইবাদতের জ্ঞান অর্জনের জন্য যতটা গুরুত্ব দিয়ে অধ্যয়ন করি, আখলাকের উৎস হিসেবে ততটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি না। সেভাবে দেখি না কিংবা পড়িও না।
চতুর্থত, আমরা ইবাদত ও আখলাকের মধ্যে পার্থক্য করি, ঈমান ও আমলের মধ্যে বিভাজন তৈরি করি এবং তাকওয়া ও আখলাককেও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। অথচ এটিও সঠিক নয়। কারণ ইবাদত হচ্ছে আখলাকের উসিলা (মাধ্যম), আর আখলাক হচ্ছে ইবাদতের উদ্দেশ্য।
নামাজ হচ্ছে সবচেয়ে বড় ইবাদত, মুমিনের মি’রাজস্বরূপ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।’
একইভাবে রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন। এই উদ্দেশ্যেই আমরা রোজা পালন করি। কিন্তু তাকওয়া কেবল নফল ইবাদতের নাম নয়। তাকওয়া হচ্ছে সমগ্র মহাবিশ্বকে রহমতের দৃষ্টিতে দেখা। তাকওয়া হচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের সঙ্গে মারহামাতের (ভালোবাসা) সম্পর্ক গড়ে তোলা।
কোরআনে তাকওয়া শব্দটি দুইশ বারেরও বেশি এসেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ আখলাকসম্পর্কিত বিষয়ে এবং বাকি মাত্র ১০ শতাংশ ইবাদতসংক্রান্ত প্রসঙ্গে এসেছে।
এ ছাড়া আমাদের সামগ্রিক আচার-আচরণে যে আখলাকী বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য, সেই মহান মূল্যবোধও আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে ফেলেছি মূল্যবোধের ক্রমবিন্যাস। ফলে আমরা ‘উদ্দেশ্য’ সম্পর্কিত মূল্যবোধের সঙ্গে ‘মাধ্যমগত’ মূল্যবোধকে একীভূত করে ফেলেছি।
এ প্রসঙ্গে কাবা শরীফের একটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চাই।
হজের সময় হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করা সুন্নত। রাসূল (স.)-এর ওফাতের পর হযরত উমর (রা.) হাজরে আসওয়াদকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন,
أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ وَلَوْلَا أَنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ
‘তুমি একটি পাথরমাত্র। তোমার কোনো উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু আমি রাসূল (স.)-কে তোমাকে চুম্বন করতে দেখেছি বলেই তোমাকে চুম্বন করছি।’
সুতরাং যাঁরা কাবা তাওয়াফ করেন, তাঁদের জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা একটি নববী সুন্নত।
কিন্তু আমরা কী দেখতে পাই? অনেকেই হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার জন্য অন্য মানুষকে পা দিয়ে মাড়িয়ে, ধাক্কা দিয়ে, গায়ের জোরে সামনে এগিয়ে যান। এমনকি নারী ও শিশুদের আহত করে, অন্যদের কষ্ট দিয়েও হাজরে আসওয়াদে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এরপর তাঁরা মনে করেন, এর মাধ্যমে অনেক সওয়াব অর্জন করেছেন।
অথচ কেবল একটি সুন্নত আদায় করার জন্য আমরা নির্দ্বিধায় মানুষকে কষ্ট দেওয়ার মতো স্পষ্ট হারামে লিপ্ত হচ্ছি। মূলত উদ্দেশ্যগত মূল্যবোধের সঙ্গে পদ্ধতিগত মূল্যবোধকে একীভূত করে ফেলার কারণেই এমন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
তিরমিযি শরিফে বর্ণিত আছে, রাসূল (স.) একদিন হাজরে আসওয়াদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,
‘তুমি কতই না উত্তম! তোমার ঘ্রাণ কতই না মিষ্ট! কিন্তু সেই আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তোমার চেয়েও মুমিনের কলব অধিক মর্যাদাসম্পন্ন।’
এই বক্তব্য থেকে ইলহাম (চিন্তার উপাদান) গ্রহণ করে মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি ও মাওলানা জামি বলেছেন,
‘কাবা তো আজরের পুত্র ইবরাহীমের নির্মিত একটি বিনা (নির্মাণশৈলী)।
কিন্তু মুমিনের কলব হলো মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি করা এক অস্তিত্ব।’
মুসলিম উম্মাহর মাঝে দ্বীন ও আখলাকের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ফিতরাত ও হাকীকতকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
আখলাক কেবল কিতাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানব-ফিতরাতের মধ্যেও আল্লাহ তায়ালা আখলাককে সমুন্নত করেছেন। তাই ‘খালক’ ও ‘খুলক’-এর মধ্যে বিভাজন তৈরি করার কোনো অধিকার আমাদের নেই।
‘খালক’ মূলত মানুষের বহিঃসত্তাকে নির্দেশ করে, আর ‘খুলক’ মানুষের অন্তঃসত্তা ও আধ্যাত্মিকতাকে নির্দেশ করে।
রাসূল (স.) আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সময় একটি দোয়া পড়তেন,
اللَّهُمَّ كَمَا حَسَّنْتَ خَلْقِي فَحَسِّنْ خُلُقِي
অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে আমার খালককে সুন্দর করেছ, সেভাবে আমার খুলককেও সুন্দর করে দাও।’
অনুবাদ: বুরহান উদ্দিন আজাদ



মতামত প্রকাশ করুন