প্রফেসর ড. আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি: জীবন, দর্শন ও কর্ম

প্রফেসর ড. আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি: জীবন, দর্শন ও কর্ম

বিশ শতকের উত্তর-উপনিবেশিক মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে যে কজন চিন্তাবিদ বস্তুবাদের মোহজাল ছিঁড়ে বিকল্প দর্শনের প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি (১৯৩৮–২০০৮) অন্যতম। একাধারে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক এবং প্রখ্যাত মিশরীয় চিন্তাবিদ আল-মাসিরি মূলত পরিচিত পশ্চিমা আধুনিকতার তীক্ষ্ণ সমালোচনা এবং আধুনিকতার একটি স্বকীয় ইসলামী রূপরেখা নির্মাণের প্রস্তাবনার জন্য।

​তাঁর বিস্তৃত গবেষণা ও দার্শনিক অনুসন্ধানের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও অমর সৃষ্টি হলো ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অফ জিউস, জুডাইজম এন্ড জায়োনিজম’ নামক সুবিশাল বিশ্বকোষ। ইহুদি ধর্ম, জায়োনিস্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্কের মূল্যায়নে এটি আজও বিশ্বজুড়ে একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। সাহিত্য সমালোচনার সূক্ষ্ম দৃষ্টি আর গভীর দার্শনিক অনুসন্ধিৎসার মিশেলে তিনি সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় নিজস্ব এক ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

আল-মাসিরির জীবন 

জন্ম ও শৈশব

অধ্যাপক আল-মাসিরির জন্ম ১৯৩৮ সালের ৮ অক্টোবর। কায়রো থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে নীলনদের বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক দামানহুর শহরে। এক সচ্ছল গ্রামীণ পরিবারে আল-মাসিরির বেড়ে ওঠা। নিজ শহর দামানহুরেই তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। তাঁর বাবা ছিলেন পেশায় ব্যবসায়ী। তবে সন্তানদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। পরবর্তী জীবনে শৈশবের সেই শিক্ষার কথা আল-মাসিরি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতেন। তিনি মনে করতেন, ছোটবেলার এই শিক্ষাই তাঁকে একজন একনিষ্ঠ ও সংকল্পবদ্ধ গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

 

শিক্ষাজীবন

দামানহুরেই আল-মাসিরির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ হয়। এরপর ১৯৫৫ সালে তিনি আলেকজান্দ্রিয়া ইউনিভার্সিটির সাহিত্য অনুষদের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালে তিনি আমেরিকায় যান। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। আর সবশেষে ১৯৬৯ সালে রাটগার্স ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেন ‘ইংরেজি ও আমেরিকান তুলনামূলক সাহিত্যে’ পিএইচডি ডিগ্রি।

 

কর্মজীবন

পিএইচডি শেষ করে আমেরিকা থেকে দেশে ফেরেন আল-মাসিরি। এরপর কায়রোর আইন শামস ইউনিভার্সিটির গার্লস কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ও আমেরিকান সাহিত্য এবং ক্রিটিক্যাল থিওরি পড়াতেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে সেখানে যুক্ত ছিলেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। মিশরের বাহিরে তিনি সৌদি আরবের কিং সাউদ ইউনিভার্সিটি, কুয়েত ইউনিভার্সিটি এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে অব মালয়েশিয়াতেও অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়া ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যুক্ত ছিলেন নাসের মিলিটারি একাডেমিতেও।

অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আল-আহরাম সংবাদপত্রের পলিটিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারে তিনি ছিলেন কাউন্সিল অব এক্সপার্টস এর সদস্য এবং জায়োনিস্ট থট ইউনিটের প্রধান। এছাড়া নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে আরব লিগের কালচারাল চ্যান্সেলর হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আমেরিকার ভার্জিনিয়া ও ওয়াশিংটনের ইউনিভার্সিটি অব সোশ্যাল অ্যান্ড ইসলামিক সায়েন্সেস এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন। একই সাথে মিশর, মালয়েশিয়া, ইরান, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের বেশ কিছু গবেষণামূলক পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের সাথেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

রাজনৈতিক কার্যক্রম

আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি যৌবনকাল থেকেই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। মিশরে তৎকালীন শাসকদল এবং ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নানা রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি অংশ নেন। সে সময় বিভিন্ন নাগরিক প্রতিবাদেও ছিল তাঁর সরাসরি উপস্থিতি। ১৯৫২ সালের বিপ্লবের পর থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাড়ি জানানোর আগ পর্যন্ত তিনি রাজপথের রাজনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সে সময় ওয়াসাত পার্টি প্রতিষ্ঠা এবং এর রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরিতে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। এটি এমন একটি দল, যা আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে মিশরের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নেয় এবং তা ইসলামী দর্শনের আলোকেই। রাজপথ ও রাজনীতির ময়দানে এই ভূমিকাকে আল-মাসিরির নিজস্ব দার্শনিক চিন্তারই এক বাস্তব প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে তিনি যোগ দেন নবগঠিত দ্য ইজিপ্টিয়ান মুভমেন্ট ফর চেঞ্জ এ, যা সবার কাছে কেফায়া নামে বেশি পরিচিত। এরপর ২০০৭ সাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা

আল-মাসিরির বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার সূচনা তাঁর মাধ্যমিক স্কুলের দিনগুলোতেই। সেই সময় তিনি কমিউনিজমের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন, এমনকি কিছু সময়ের জন্য একটি মিশরীয় কমিউনিস্ট পার্টিতেও যোগ দেন। জীবনের এই শুরুর দিকে তিনি সাধারণভাবে পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদী চিন্তা এবং বিশেষভাবে কমিউনিস্ট চিন্তাধারার ওপর গভীর আস্থা রাখতেন। ষাটের দশকের শুরুতে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর এই বিশ্বাস অটুট ছিলো।

ষাটের দশকে আমেরিকায় থাকাকালীন আল-মাসিরি পশ্চিমা আধুনিকতার ভেতরে ঘটে যাওয়া মৌলিক পরিবর্তনগুলো বাস্তব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় দিক থেকেই প্রত্যক্ষ করেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁর আধুনিকতাবাদী এবং বিশেষ করে কমিউনিস্ট বিশ্বাস থেকে সরে আসার সূচনাবিন্দু। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৬৩ সাল থেকেই তাঁর চিন্তাধারা ইসলামের দিকে মোড় নিতে শুরু করে। তাঁর দর্শনের মূল কথা ছিলো- মানুষ এক অনন্য সৃষ্টি, কেবল কোনো জড় পদার্থ নয়। তাই মানুষের মাঝে সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। তার ভাষায়,

“এই মৌলিক দর্শনটিই আমার সমস্ত রচনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের মূল সূত্র। সময়ের সাথে সাথে আমার দার্শনিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল দর্শনটি একই থেকে গেছে। যদিও তা বাস্তবায়ন করার পথ ও পদ্ধতিগুলো বদলেছে। ধীরে ধীরে, দীর্ঘ ত্রিশ বছরের এক চিন্তাশীল যাত্রা শেষে আমি আবার ইসলামে ফিরে এসেছি। ইসলাম কেবল কিছু বিশ্বাস বা আচার-অনুষ্ঠান নয়; বরং মহাবিশ্ব ও জীবনকে দেখার একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শন।” (Islam online, Love is the start of my conversion to belief)

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের কাছে মিশরের পরাজয় আল-মাসিরিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই চরম বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি জায়োনিজম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা শুরু করেন। সে সময় তিনি আমেরিকায় ছিলেন। সহকর্মীদের সাথে এই জাতীয় ট্র্যাজেডি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন শত্রুকে, অর্থাৎ ইসরায়েলকে, জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে জানা ও বোঝা কতটা জরুরি। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে জায়োনিজম নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

এই গবেষণার সূত্র ধরেই ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই— ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু স্টাডিইং দ্য স্ট্রাকচার অব জায়োনিস্ট থট’। এরপর ১৯৭৫ সালে আত্মপ্রকাশ করে তাঁর ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব জায়োনিস্ট কনসেপ্টস অ্যান্ড টার্মস: এ ক্রিটিক্যাল ভিশন’। এর ধারাবাহিকতায় ইহুদিধর্ম ও জায়োনিজম নিয়ে তাঁর আরও বেশ কিছু গবেষণামূলক রচনা প্রকাশিত হতে থাকে।

নিজের এই কাজকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি জায়োনিজম সংক্রান্ত এনসাইক্লোপিডিয়াটি সংস্কার ও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেন। ভেবেছিলেন, এই কাজে হয়তো এক-দুই বছর সময় লাগবে। তবে বাস্তব কাজ শুরু করতেই তিনি এর সীমাবদ্ধতা টের পান। তিনি দেখলেন, আগের সংস্করণটি ছিলো বিশ্লেষণধর্মী—যা ছোটখাটো খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপরই বেশি জোর দিয়েছিল। তাতে জায়োনিস্ট প্রকল্পের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সামগ্রিক দিকটি অনুপস্থিত ছিল। তাই  একটি ভিত্তিমূলক ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি রূপায়ণে তিনি সিনথেটিক তথা সংশ্লেষণমূলক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এরই ফসল হিসেবে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ৮ খণ্ডের সুবিশাল ও কালজয়ী গ্রন্থ ‘জিউস, জুডাইজম অ্যান্ড জায়োনিজম: এ নিউ ইন্টারপ্রেটিভ মডেল’।

জায়োনিস্ট প্রকল্প নিয়ে গবেষণার পরিধি বাড়াতে গিয়ে তিনি এক নতুন সত্য উপলব্ধি করেন। তিনি বুঝতে পারেন, এ বিষয়ে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে হলে এর পেছনের সামাজিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং দার্শনিক পটভূমি গভীরভাবে জানা আবশ্যক। আর এর জন্য দরকার ছিল পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী চিন্তার দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নিয়ে বিস্তৃত পড়াশোনা করা।  ফলে আল-মাসিরির এই বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা কেবল জায়োনিস্ট চিন্তাধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা রূপ নেয় সমগ্র পাশ্চাত্য সভ্যতার এক বস্তুনিষ্ঠ ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে। পরবর্তীতে তাঁর এই ভাবনা আরও প্রসারিত হয় এবং  তিনি একটা সমসাময়িক ‘ইসলামিক আধুনিকতা’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।  তাঁর মতে, এই নতুন আধুনিকতা পশ্চিমা আধুনিকতার ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে সক্ষম হবে।  বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজ যখন উত্তর-আধুনিক যুগে প্রবেশ করছে।

এই সময়কালে তিনি আধুনিকতার নানা সংকট ও সমালোচনা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বহুল আলোচিত বই – ‘দ্য প্রবলেম অব পারশিয়ালিটি: এ কগনিটিভ ভিশন অ্যান্ড এ কল ফর নিউ ভিউজ’। এর ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয় ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্রম এ ওয়েস্টার্ন ভিউ’ (২০০১), ‘ম্যাটেরিয়ালিস্টিক ফিলোসফি অ্যান্ড দ্য ডিসম্যান্টলিং অব হিউম্যান বিয়িং’ (২০০২) এবং ‘মডার্নিজম অ্যান্ড পোস্টমডার্নিজম’ (২০০৩) সহ আরও অনেক গবেষণামূলক প্রকাশনা।

সাহিত্য ছিল আল-মাসিরির একাডেমিক পড়াশোনার মূল বিষয়। যাকে তিনি বলতেন তাঁর ‘প্রথম প্রেম’। তাই বিশাল এই দার্শনিক প্রজেক্টের পাশাপাশি সাহিত্যের জগতও তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল । এই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৭৯ সালে প্রকাশ করেন ‘সিলেকশনস অব দ্য ইংলিশ রোমান্টিক পোয়েট্রি’ এবং ২০০২ সালে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যালিগরি বিটুইন মনথেইজম অ্যান্ড ইউনিটি অব বিয়িং’ এবং ২০০৩ সালে ‘দ্য সংস অফ এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড ইনোসেন্স’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য নিয়ে আরবি ও ইংরেজিতে বেশ কিছু বই এবং পাশাপাশি শিশুদের জন্য ছোটগল্প ও কবিতা সংকলনও প্রকাশ করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তিনি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য রাইম অফ দ্য অ্যানশিয়েন্ট মেরিনার’ এর একটি সমালোচনামূলক পাঠও প্রকাশ করেছিলেন।

 

শিশুদের জন্য ফিকশন

আল-মাসিরি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক পথচলায় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, পশ্চিমা আধুনিকতার প্রধান দুর্বলতা হলো মানবমর্যাদা ও মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষায় এর ব্যর্থতা। তিনি আরও অনুধাবন করেন, আধুনিক মিডিয়ার প্রভাবে শৈশবেই এই নেতিবাচক বৈশিষ্টগুলো মানুষের অবচেতন মনে গেঁথে যায়। তাই শিশুদের মনে মানবিক ও ইসলামী মূল্যবোধের বীজ বুনে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি প্রকাশ করেন ‘স্টোরিজ অব দিস এরা’ নামে একটি শিশুতোষ ছোটগল্পের সংকলন। গল্পের এই ক্যানভাসেও আল-মাসিরির আধুনিকতা বিষয়ক কগনিটিভ দৃষ্টিভঙ্গির চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছে।

 

আল-মাসিরির ওপর জামাল হামদানের প্রভাব

অধ্যাপক আল-মাসিরি উল্লেখ করেন যে, তিনি প্রখ্যাত মিশরীয় ভূগোলবিদ ও ‘দ্য ক্যারেক্টার অব ইজিপ্ট’ বইয়ের লেখক ড. জামাল হামদানের চিন্তা ও মেথডোলজির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। আল-মাসিরি জানান,

জায়োনিজম সংক্রান্ত এনসাইক্লোপিডিয়া নিয়ে কাজ করার সময় আমি ড. হামদানের ‘দ্য জিউস: অ্যানথ্রোপোলজি’ বইটি পাঠ করি। জামাল হামদানের অনন্য লিখনশৈলী এবং তাঁর নিজস্ব প্রকল্পের প্রতি আজীবন নিষ্ঠা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজ সম্পন্ন করার পর আমি বুঝতে পারি আমার চিন্তা কাঠামোর ওপর জামাল হামদানের প্রভাব কতটা গভীর। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমি জামাল হামদানের কাছ থেকে একমাত্রিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান করতে শিখি। এছাড়া মানবিক বিজ্ঞানে গাণিতিক মডেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তায়  অন্তর্দৃষ্টি এবং কল্পনাশক্তির গুরুত্ব আমি হামদানের কাছ থেকেই উপলব্ধি করি। তবে হামদানের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি ছিল, ইহুদি ধর্ম ও জায়োনিস্ট ঘটনাপ্রবাহকে কেবল তাওরাত বা তালমুদের ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা। এর ফলে পুরো বিষয়টি আমার সামনে একটি বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। হাজারো পরিবর্তনশীল ও জটিল তথ্যের সমাহার থেকে কীভাবে একটি সাধারণ কাঠামো খুঁজে বের করতে হয় এবং খণ্ডিত বহু-বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মূল বাস্তবতাকে কিভাবে উন্মোচন করতে হয়— তা আমি জামাল হামদানের কাছ থেকেই শিখেছিলাম।  (The Jews: Anthropology, P 50-51)

 

আল-মাসিরির দর্শন

আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরির দর্শনের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো ওয়ার্ল্ডভিউ বা বিশ্বদর্শন। এই ধারণাটি বোঝাতে তিনি ‘হিউম্যান ভিশন অফ দ্য ইউনিভার্স’, ‘কগনিটিভ সিস্টেম’ বা ‘ফিলোসফিক্যাল সিস্টেম’ এর মতো বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাঁর চিন্তাধারার বাকি সব উপাদান এই ওয়ার্ল্ডভিউ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত। আর এই ‘ওয়ার্ল্ডভিউ’ ধারণার প্রায়োগিক ক্ষেত্র থেকেই উন্মোচিত হয় তাঁর চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক; পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামিক আধুনিকতার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যকরণ।

তাঁর দর্শনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো কগনিটিভ মডেল। যা মূলত ওয়ার্ল্ডভিউয়েরই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থাপন। এই কগনিটিভ মডেলের কাজ হলো ওয়ার্ল্ডভিউ এর বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে এবং বাস্তব তথ্যের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। আল-মাসিরির মতে, এটি এমন একটি কনসেপ্চুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক বা ধারণাকাঠামো যা নির্দিষ্ট কিছু পরিভাষা এবং ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। আর এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমেই একজন চিন্তাবিদ কোনো ঘটনার সামগ্রিক রূপটি বুঝতে পারেন।

অধ্যাপক আল-মাসিরির সামগ্রিক চিন্তাধারাকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়— তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক। তাত্ত্বিক দিকটা সেইসব মৌলিক ধারণাকে হাজির করে, যার উপর দাঁড়িয়ে তিনি আধুনিকতা এবং এর পরিণতির সমালোচনা গড়ে তোলেন। অন্যদিকে, এর ব্যবহারিক দিকটি আধুনিক চিন্তাধারারই অংশ হিসেবে জায়োনিজমের মতো জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে বিশ্লেষণ করে।

আল-মাসিরির এই চিন্তা মূলত আইডিওলজিক্যাল নয়, এপিস্টেমোলজিক্যাল বা জ্ঞানতাত্ত্বিক। কেননা এপিস্টেমোলজিক্যাল চিন্তা তার ধারণাবলিকে এমন এক তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়, যার নিজস্ব এপিস্টেমোলজিক্যাল ভ্যালু আছে। তারপর অ্যানালিটিক-সিন্থেটিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তা নিজের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে। এ ধরনের চিন্তাকেই  সাধারণত মৌলিক চিন্তা বলা হয়।  অন্যদিকে আইডিওলজিক্যাল চিন্তার যাত্রা শুরু হয় একটি পূর্বনির্মিত তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে এবং সেখান থেকেই সে তার নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে। অর্থাৎ, এর গতিপথটা ওপর থেকে নিচের দিকে ধাবমান।

এই সাধারণ কাঠামোর উপরই আল-মাসিরি তাঁর কাজের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন। এর সাথে তিনি আধুনিকতার সমালোচনা, উত্তরআধুনিকতা, উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাধারা, আর সোসিওলজি অব নলেজের বহুল প্রচলিত ধারাগুলোর সাহায্য নেন। তাই তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত গড়ে উঠেছে এমন কিছু চিন্তাধারার সমন্বয়ে, যেগুলো পশ্চিমা দার্শনিক সাহিত্যে আগেই থেকেই বিদ্যমান। আর ঠিক এ কারণেই তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে এর নিজস্ব এক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বকীয় শক্তি রয়েছে। এই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আল-মাসিরি তাঁর নিজস্ব জ্ঞানকাঠামো নির্মাণ করেন। যা একদিকে মোকাবিলা করে আধুনিকতার সহজাত সংকটকে, আর অন্যদিকে জায়োনিজমের কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে।

এই কগনিটিভ টুলগুলোর আলোকেই আল-মাসিরির চিন্তাকে বুঝা যায় দুটো জিনিস দিয়ে— পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী বিশ্বদর্শনের প্রত্যাখ্যান এবং ইসলামী বিশ্বদর্শন ভিত্তিক এক বিকল্প আধুনিকতার সমর্থন। তবে আল-মাসিরির আধুনিকতা প্রত্যাখ্যানটা কিন্তু র‍্যাডিক্যাল নয়। কারণ তিনি একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে আধুনিকতাকে পুরোপুরি নাকচ করেননি; বরং তাঁর মূল আপত্তি ছিল সেসব অমানবিক উপাদানের বিরুদ্ধে, যা বাস্তব চর্চায় আধুনিকতাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। নিজের এই অবস্থানকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি উত্তর-আধুনিকতাবাদী ও উত্তর-উপনিবেশবাদীদের বিস্তৃত গবেষণার পাশাপাশি ম্যাক্স ওয়েবার এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মতো প্রখ্যাত চিন্তাবিদদের তত্ত্ব ও যুক্তিকে কাজে লাগান। 

অর্থাৎ তাঁর মূল বক্তব্য হলো, আধুনিকতার বিমূর্ত ধারণার সাথে মানবিক উপাদান যুক্ত করতে পারলেই পশ্চিমা আধুনিকতার সংকটগুলো দূর করা সম্ভব। আর আল-মাসিরির দৃষ্টিতে এই মানবিক উপাদানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎস হলো ইসলাম। এই ভাবনার ওপর ভর করেই তিনি পশ্চিমা আধুনিকতার বিকল্প হিসেবে ইসলামী আধুনিকতা নির্মাণের প্রস্তাব করেন।

তাঁর এই দার্শনিক অবস্থান থেকে আরও দুটি বড় সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। প্রথমত, জায়োনিজম কেবল সাধারণ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি পশ্চিমা আধুনিকতার যাবতীয় মানবতাবিরোধী প্রবণতারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ফলে ফিলিস্তিনিদের সাথে জায়োনিস্টদের সংঘাত এবং ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে স্বাধীনভাবে বাঁচার মানবাধিকারকে অস্বীকার করা কেবল কোনো ভূ-রাজনৈতিক লড়াই নয়। এটি মূলত পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী বিশ্বদর্শন ও ইসলামী বিশ্বদর্শন এর মধ্যকার এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংগ্রাম। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা আধুনিকতার মোকাবিলায় যে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন, তার ভিত্তি ট্র্যাডিশনাল ইসলামী চিন্তা  হলে চলবে না; বরং তা হতে হবে একটি যুগোপযোগী ও সমসাময়িক আধুনিক ইসলামী চিন্তা।

পশ্চিমা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে জায়োনিজমের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং জায়োনিজম কীভাবে মূলত পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী বিশ্বদর্শনেরই এক বাস্তব রূপায়ন—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল-মাসিরি বলেন,

“১৯৮০ সালে যখন দুই খণ্ডে আমার ‘দ্য জায়োনিস্ট আইডিওলজি: এ কেস স্টাডি ইন সোসিওলজি অব নলেজ’ বইটি রচনা করি, তখন পুনরায় এই বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করি। এই গ্রন্থে জায়োনিজম গবেষণার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সভ্যতাগত ডাইমেনশনকে আরও গভীর ও বিস্তৃত রূপ দিই। পাশাপাশি, একই পদ্ধতিতে নাৎসিবাদের মতো ঘটনাগুলোকে বোঝার প্রয়োজনীয়তার ওপরও বিশেষ জোর দিই। যাতে জায়োনিজম ও নাৎসিবাদ—উভয়কেই পাশ্চাত্য চিন্তা ও সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনুধাবন করা যায়। তাই , পশ্চিমা চিন্তাধারার মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে এদের কোনোটিকেই আলাদাভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ নেই।  বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের ‘জায়োনিজম অ্যান্ড নাৎসিবাদ’ অধ্যায়ে আমি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছি যে, এ বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের গবেষণাগুলো রাজনৈতিক কিংবা আত্মরক্ষামূলক ব্যাখ্যার গণ্ডি খুব কমই পেরোতে পেরেছে। পশ্চিমা গবেষকরা একটি মৌলিক সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন: নাৎসিবাদ পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল দর্শন থেকে বিচ্যুত কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল এই সভ্যতারই এক অপরিহার্য ধারা। আর ঠিক একইভাবে বিকাশ ঘটেছে জায়োনিজমেরও।” (Zionism and Nazism and the end of history: 13)

 

আল-মাসিরির দার্শনিক প্রকল্প

আল-মাসিরির দার্শনিক প্রকল্পের চারটি প্রধান দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো তাঁর মেথডোলজি। যা দাঁড়িয়ে আছে ‘ওয়ার্ল্ডভিউ’ ও ‘কগনিটিভ মডেল’ ধারণা এবং দার্শনিক পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর।

দ্বিতীয়টি পশ্চিমা আধুনিকতার সমালোচনা। যা দাঁড়িয়ে আছে মডার্নিটি ক্রিটিক আর পোস্টমডার্নিজমের সমসাময়িক সাহিত্যের উপর। তবে আল-মাসিরি এসব ধারার পথটাই হুবহু অনুসরণ করেননি; বরং তিনি একটা নিজস্ব ধারা নির্মাণ করেছেন। তিনি এনলাইটেনমেন্ট চিন্তার ভিন্ন ব্যাখ্যা, আধুনিকতার বিবর্তন ও সেকুলারিজমেরে অর্থ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আধুনিকতার সামলোচনার নতুন কিছু ডাইমেনশন হাজির করেছেন।

তাঁর এই বিশাল প্রকল্পের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো জায়োনিস্ট চিন্তা ও আন্দোলনের বিশ্লেষণ। আধুনিক চিন্তা সম্পর্কে তাঁর যে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সেটিরই এক প্রায়োগিক রূপ হিসেবে তিনি এপিস্টেমোলজিক্যাল ও কগনিটিভ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে জায়োনিস্ট ভাবাদর্শ ও আন্দোলনকে বিশ্লেষণ করেন। আল-মাসিরি জায়োনিজমের এক দ্বিস্তরী বিশ্লেষণ কাঠামো হাজির করেন। যার একটি স্তর এর তাত্ত্বিক রূপ বিশ্লেষণ করে, আর অন্যটি উন্মোচন করে বাস্তব জীবনে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপটিকে।

আল-মাসিরির এই সুদূরপ্রসারী প্রকল্পের চতুর্থ ও শেষ দিকটি হলো একটি ইসলামী আধুনিকতা নির্মাণ করা। পশ্চিমা আধুনিকতার অমানবিক সংকটগুলোকে দূর করতে পারে  এমন এক সমসাময়িক ইসলামী আধুনিকতার রূপরেখা গড়ে তোলার জন্য তিনি এক সুনির্দিষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামনে পেশ করেন।

 

[১] তাঁর মেথডোলজি

আল-মাসিরির মেথডোলজি চারটা উপাদান দিয়ে গঠিত। ওয়ার্ল্ডভিউ, অ্যালিগরিক বা রূপকধর্মী মডেল, বৈজ্ঞানিক সামগ্রিকতাবাদ এবং নতুন পরিভাষা নির্মাণ। কোনো একটা ঘটনাকে খুব গভীর, ব্যাপক ও সামগ্রিকভাবে বোঝার লক্ষ্যে এই উপাদানগুলোর সমন্বয় ঘটে তার রচনায়। তাঁর নিজের লেখা থেকেই এই চারটা উপাদানের  সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:

 

ওয়ার্ল্ডভিউয়ের ধারণা

আল-মাসিরির মতে, যেকোনো ওয়ার্ল্ডভিউ বা কগনিটিভ মডেলের সবচেয়ে মৌলিক দিক হলো এর অ্যাবসোলিউট রেফারেন্স বা জ্ঞানের পরম উৎস। এই অ্যাবসোলিউট জগতের বাইরে ও স্বাধীন কোনো সত্তা হতে পারে; আবার তা জগতের মধ্যেই অন্তর্নিহিত ও সহজাত কোনো বাস্তবতাও হতে পারে। তাঁর ভাষায়—

“প্রতিটি কগনিটিভ সিস্টেম একটি অ্যাবসোলিউটকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, এর পেছনে থাকে একটি মূলবিন্দু বা চূড়ান্ত ভিত্তি। এই অ্যাবসোলিউট হলো এমন এক কেন্দ্র, যা সিস্টেমের অন্যান্য সব উপাদানকে অতিক্রম করে, কিন্তু নিজে অন্য কোনো কিছুর দ্বারা অতিক্রান্ত হয় না। এর অস্তিত্বই পুরো সিস্টেমের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সুষম সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে। এটি সেই মূল কেন্দ্র, যা সিস্টেমের ঐক্য, সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের উৎস এবং এর চূড়ান্ত মেটাফিজিক্যাল রেফারেন্স। সর্বোপরি, এই পরম কেন্দ্রবিন্দুকে সংশ্লিষ্ট চিন্তাব্যবস্থার অনুসারীরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।”  (Zionism, Nazism and the End of History: 232)

এছাড়া, প্রতিটি ওয়ার্ল্ডভিউয়ের কিছু মৌলিক উপাদান থাকে, যা তার প্রকৃত পরিচয়কে প্রকাশ করে এবং যেগুলোকে দার্শনিক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। তবে কোনো ওয়ার্ল্ডভিউকে ভাষার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ভাষার মাধ্যমে এর যে রূপায়ণ করা হয়, তা মূলত সেই ওয়ার্ল্ডভিউয়ের একটি মডেল। আর যেহেতু এই মডেলটি জগতকে জানা, ব্যাখ্যা করা ও অনুধাবনের কাজে ব্যবহৃত হয়, তাই এটি একটি কগনিটিভ মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। আল-মাসিরির ভাষায়—

“আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের প্রতিটি চিন্তা, কথা ও কাজের পেছনে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো (কগনিটিভ মডেল) সক্রিয় থাকে। এই কাঠামোই বাহ্যিক বৈচিত্র্যের অন্তর্নিহিত ঐক্যের উৎস। এটি বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তথ্যকে একটি অভিন্ন সূত্রে সংযুক্ত করে সামগ্রিক অর্থ ও রূপ প্রদান করে। মূলত এই কাঠামো হলো বিশ্বজগৎ সম্পর্কে মানুষের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি সুনির্দিষ্ট প্রকাশ, যা প্রধানত তিনটি কেন্দ্রীয় ধারণাকে ঘিরে আবর্তিত হয়: খোদা, মানুষ ও প্রকৃতি। এই তিনটির মধ্যে রয়েছে গভীর আন্তঃসম্পর্ক, কারণ এগুলো একই মৌলিক সত্যের তিনটি ভিন্ন মাত্রার প্রকাশ। খোদা, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার এই গভীর আন্তঃসম্পর্ক সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধির প্রতিফলন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। ভাষার রূপক ব্যবহার, ধর্মীয় চিন্তা, কিংবা মানুষের অভ্যন্তরীণ মানসিক উপলব্ধি—সবকিছুর মধ্যেই এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বিদ্যমান। ফলে, আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যেও একটি অন্তর্নিহিত সামঞ্জস্য ও ঐক্য খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো এই গভীর আন্তঃসম্পর্ক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোগুলোকে বিশ্লেষণ করা, যার মাধ্যমে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যকার এই অন্তর্নিহিত সংগতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”  (Language and allegory between monotheism and unity of existence: 5)

 

ওয়ার্ল্ডভিউয়ে অ্যালিগরিক মডেলের ব্যবহার

বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবদুল ওয়াহাব আল-মাসিরি একটি বিশেষ মেথডোলজিক্যাল টুল ব্যবহার করেন, যার নাম ‘অ্যানালিটিক বা বিশ্লেষণাত্মক মডেল’। এই অ্যানালিটিক মডেল হলো এমন একটি ধারণাগত কাঠামো, যা পর্যবেক্ষণাধীন ঘটনা থেকে আরোহী-সজ্ঞাত (inductive-intuitive) পদ্ধতিতে উদ্ভূত হয় এবং পরবর্তীতে গবেষণার বিশ্লেষণী উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই অর্থে, অ্যানালিটিক মডেল মূলত মানববিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হলো বস্তুজগৎ, যেখানে মানববিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো মানুষ এবং তার চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক বাস্তবতা। ফলে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষণাপদ্ধতি সরাসরি মানববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। আল-মাসিরির প্রায় সব লেখাতেই বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই মেথডোলজিক্যাল টুলের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন তিনি বলেন—

“এই গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত সেকুলারিজমের একটি সামগ্রিক সংজ্ঞায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা। এর উদ্দেশ্য হলো অসম্পূর্ণ সংজ্ঞা, ধারণা কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর গভীরে প্রবেশ করে সেগুলোর পেছনে কার্যকর মূল মডেলটিকে অনুধাবন করা। একইসঙ্গে বাহ্যিক বৈচিত্র্যের অন্তরালে বিদ্যমান ঐক্যকে উন্মোচন করা। এর মাধ্যমে দেখানো যায় যে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও আংশিক সংজ্ঞাগুলো মূলত একই মৌলিক মডেলের বিভিন্ন প্রকাশমাত্র। পরবর্তীতে এই সামগ্রিক সংজ্ঞার মডেল ব্যবহার করে বাস্তবতার অন্যান্য দিক অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ, মডেলভিত্তিক এই বিশ্লেষণী পদ্ধতি সরলরৈখিক নয়; বরং এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া, যেখানে চিন্তা ক্রমাগত বাহ্যিক ঘটনা থেকে মডেলে এবং মডেল থেকে নতুন ঘটনা ও ধারণার দিকে আবর্তিত হতে থাকে।” (Partial Secularism and General Secularism: 8-9)

একই প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন—

“এই গবেষণায় আমি যে পদ্ধতি প্রয়োগ করেছি, তাকে বলা হয় অ্যানালিটিক মডেল। মূলত একটি ‘মডেল’ হলো এমন একটি ধারণাগত কাঠামো, যা মানুষের মন অসংখ্য সম্পর্ক, বিস্তারিত তথ্য, বস্তুনিষ্ঠ সত্য এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে একটি বিমূর্ত সাররূপ হিসেবে গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়ায় গবেষক তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে অপেক্ষাকৃত অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোকে বাদ দেন এবং প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো সংরক্ষণ করেন। এরপর সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে বাস্তবতার বিভিন্ন উপাদানের মধ্যকার অন্তর্নিহিত সম্পর্ক একটি সুসংহত রূপ লাভ করে। অন্যভাবে বলা যায়, আমরা যখন কোনো মডেল তৈরি করি, তখন ধরে নিই যে এর মধ্যে বিদ্যমান সুপ্ত সম্পর্কগুলো বাস্তবতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আমাদের কাজ হলো সেগুলোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে তাদের একটি সুস্পষ্ট রূপ ও পরিচয় প্রদান করা।” (Zionism, Nazism and the End of History: 229)

সুতরাং, অ্যানালিটিক মডেল মূলত প্রতীকী প্রকাশের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পদ্ধতি, যার উদ্দেশ্য হলো বিমূর্ত মানবিক বিষয়াবলির বিভিন্ন দিককে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। মানবিক ঘটনা ও সমাজবিজ্ঞান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিগত ধারণার সঙ্গে জার্মান রোমান্টিসিজমের হার্মেনিউটিক্স (ব্যাখ্যাশাস্ত্রীয়) ধারার সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষ করে উইলহেলম ডিলথের চিন্তায় এর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, যেখানে বুঝ এবং ব্যাখ্যাবৃত্ত বা হার্মেনিউটিক সার্কেল কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এই পদ্ধতির প্রতিফলন দেখা যায় মার্টিন হাইডেগারের চিন্তায়, যেখানে তিনি প্রাত্যহিক জীবনের হার্মেনিউটিক্সের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইভাবে হ্যান্স-গেয়র্গ গাদামারের ব্যাখ্যামূলক দর্শনেও এর অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। গাদামার, ঘটনা ও সত্যের অন্টোলজিক্যাল (অস্তিত্বতাত্ত্বিক) রূপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে দেখান যে, ব্যাখ্যাকারী নিজেও ব্যাখ্যার বিষয়বস্তুর একটি অংশ।

তবে আল-মাসিরির পদ্ধতিগত গবেষণায় বাস্তবতার বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ কিংবা পর্যবেক্ষকের ধারণাসমূহের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই কেবল হার্মেনিউটিক ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং বুঝ ও বোধগম্যতা পুরো প্রক্রিয়ায় বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এবং কগনিটিভ মডেল নির্মাণের মধ্যবর্তী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ফলে এখানে তথ্য ও ভাষাগত পরিভাষাগুলোকে হার্মেনিউটিক পদ্ধতির মতো নতুন কোনো অর্থে পুনর্ব্যাখ্যা করা হয় না। বরং পর্যবেক্ষক বা গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক অবস্থায় সংগ্রহ করা হয় এবং পরবর্তীতে একটি বৃহত্তর সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। এই নতুন সামগ্রিক কাঠামোই হয়ে ওঠে সেই নতুন প্রেক্ষাপট, যার ভেতরে পূর্ববর্তী বিচ্ছিন্ন ও অসম্পূর্ণ অংশগুলো নতুন অর্থ ও তাৎপর্য লাভ করে।

অর্থাৎ আল-মাসিরির দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত হার্মেনিউটিক পদ্ধতির তুলনায় ভাষাদর্শনের কন্টেক্সচুয়ালিস্ট বা প্রসঙ্গবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অধিকতর ঘনিষ্ঠ। এখানে অর্থ কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়; বরং বৃহত্তর কাঠামো ও প্রসঙ্গের মধ্যেই তা তার পূর্ণতা লাভ করে।

 

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হোলিজম বা সামগ্রিকতাবাদ

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আল-মাসিরির মেথডোলজি মূলত রিডাক্টিভ অ্যানালিটিক মেথডের বা হ্রাসকারী বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতির প্রত্যাখ্যানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে, এই ধরনের একরৈখিক বিশ্লেষণী পদ্ধতিই পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী চিন্তাধারাকে গ্রাস করেছে। তাঁর ভাষায়—

“গবেষণার সুবিধার্থে মানবিক ঘটনাবলিকে খণ্ড খণ্ড করে ‘ডিভাইড অ্যান্ড অ্যানালাইজ’ করার যে প্রবণতা, তা বর্তমানে বহু একাডেমিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বিজ্ঞানের নামে বস্তুনিষ্ঠতার দাবি তুলে এই পদ্ধতিগুলো মানুষের জীবন ও মানবীয় কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন মাত্রার মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। আমাদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অমানবিকই নয়, বরং এক অর্থে বিজ্ঞানবিরোধীও। কারণ বিজ্ঞানের কাজ মানুষের ওপর কোনো পূর্বনির্ধারিত মূল্যবোধ বা বিধিনিষেধ আরোপ করা নয়; বরং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আমাদের চারপাশের জগৎকে যথাযথভাবে বোঝা ও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করা। এই হ্রাসবাদী ও একরৈখিক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক ঘটনাবলিকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। কারণ এটি মানুষ ও বস্তুজগতের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য স্বীকার করে না। বরং মানুষকে প্রকৃতির একটি যান্ত্রিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাকে প্রকৃতির অন্ধ ও নির্ধারিত নিয়মের অধীন করে ফেলে।” (Language and Allegory between Monotheism and Unity of Existence: 7)

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রতি এই হ্রাসবাদবিরোধী ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে তিনি সৃজনশীল গবেষক ও যান্ত্রিক গবেষকের মধ্যে একটা পার্থক্যরেখা টানেন। সৃজনশীল গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি হয় সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক। অন্যদিকে যান্ত্রিক গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি হয় হ্রাসবাদী ও একমাত্রিক। একজন সৃজনশীল গবেষক একটি সামগ্রিক ও সুসংবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলেন। যার প্রতিটি অংশ মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মৌলিক ভাবনার সাথে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে, একজন যান্ত্রিক গবেষক কেবল প্রচুর পরিমাণে আংশিক তথ্য ও উপাত্ত জড়ো করেন; কিন্তু তাঁর সংগৃহীত সেই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো কোনো স্বাধীন ও সামগ্রিক অর্থবহতা  নাও নির্মাণ করতে পারে। (Jews Anthropologically: 10)

নতুন পরিভাষা নির্মাণ

আল-মাসিরির মেথডোলজির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নতুন পরিভাষা নির্মাণ করা। যেগুলো কোনো সাধারণ ধারণা বা কগনিটিভ মডেলগুলো ব্যক্ত করার জন্য ইনডাক্টিভ-ইনটুইটিভ বা আরোহী-সজ্ঞাত পদ্ধতিতে নির্মান করা হয়। কেননা, তাঁর বিশেষ গবেষণাপদ্ধতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই নতুন নতুন ধারণার জন্ম হতো, যা যথাযথভাবে প্রকাশ করার জন্য প্রচলিত ভাষার বিদ্যমান শব্দভাণ্ডার যথেষ্ট ছিলোনা। তাই সেসব ধারণা প্রকাশের জন্য ইনডাক্টিভ-ইনটুইটিভ পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন পারিভাষিক শব্দ নির্মাণই একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।

উদাহরণস্বরূপ, তিনি Dwelled Materialism নামক একটি নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করেন। এর মাধ্যমে এমন একটি চিন্তাধারাকে বোঝানো হয়, যেখানে পরমসত্তা নিজেই বস্তুতে পরিণত হয়; অর্থাৎ, পরম বাস্তবতা বস্তুর মধ্যেই অবস্থান করে বা বস্তুর রূপ ধারণ করে। একইভাবে আধুনিকতাবাদ ও উত্তর-আধুনিকতাবাদের মধ্যকার পার্থক্য ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি Liquid Materialism-এর বিপরীতে Concrete Materialism শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। এছাড়াও Functional Groups, Partial Secularism এবং General Secularism-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাগুলো আল-মাসিরি নিজে নির্মাণ করেন তাঁর নিজস্ব ধারণাগত কাঠামো প্রকাশের উদ্দেশ্যে। তাঁর রচনায় নতুন পরিভাষা নির্মাণের এই পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায় আরবি ভাষায় حوسلة (হাওসালাহ) নামক সম্পূর্ণ নতুন একটি শব্দ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে। এই শব্দের মাধ্যমে তিনি বোঝান—“কোনো কিছুকে কেবল ব্যবহারের উপযোগী বস্তু বা কাঁচামালে পরিণত করার মানসিকতা।” (Zionism, Nazism and the End of History: 252)

 

[২] আধুনিকতার সমালোচনা

অধ্যাপক আল-মাসিরির আধুনিকতার-সমালোচনাকে আমরা দুটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। প্রথমটি তাঁর চিন্তার সূচনাবিন্দু। এটি মূলত পশ্চিমা আধুনিকতার-সমালোচনার বিভিন্ন উৎসের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ম্যাক্স ওয়েবারের লেখার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেন। তাই তাঁর রচনায় ‘পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিচারবুদ্ধি’, ‘বিচ্ছিন্নতা’ এবং ‘জ্ঞানের সামাজিক মাত্রা’-এর মতো পরিভাষা ও ধারণা বারবার ফিরে আসে। পাশাপাশি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলও তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেখান থেকেই এসেছে ‘ইনস্ট্রুমেন্টাল মাইন্ড বা যান্ত্রিক মানস’, ‘ওয়ান ডাইমেনশনাল ম্যান বা একমাত্রিক মানব’ এবং ‘অ্যালিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ’-এর মতো পরিভাষা। এ ছাড়া উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তার উপরও তাঁর নির্ভরতা রয়েছে। সেখান থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন ‘বার্ডেন অব দ্য হোয়াইট ম্যান’ ধারণার সমালোচনা, অ-পাশ্চাত্য সমাজগুলোকে অধীনস্থ ও শোষণের ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদের ভূমিকার বিশ্লেষণ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনাগুলো।

তাঁর সমালোচনার দ্বিতীয় পর্যায়টি গড়ে উঠেছে তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও তাঁর প্রণীত কগনিটিভ মডেলের  ভিত্তিতে। এখানেই দেখা মেলে তাঁর প্রবর্তিত ‘ডুয়েলিং ম্যাটেরিয়ালিজম’, ‘হার্ড ম্যাটেরিয়ালিজম’ এবং ‘লিকুইড ম্যাটেরিয়ালিজম’ ধারণাগুলোর। একই সঙ্গে সেকুলারিজম সম্পর্কেও তিনি একটি স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা নির্মাণ করেছেন। তাঁর মতে, সেকুলারিজম পার্শিয়াল সেকুলারিজম থেকে জেনারেল সেকুলারিজমের দিকে অগ্রসরমান একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আধুনিকতার প্রতি তাঁর সমালোচনার এই দুই স্তর পর্যায় নিচের সংলাপে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে—

“শুরুতে কোনো বৈপরীত্য নেই। তবে আমি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাই এবং পশ্চিমের মানবতাবাদী ও সমালোচনামূলক ধারার চিন্তাবিদেরা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আমাদের সূচনাবিন্দু একই। সমালোচনামূলক ধারা ইতোমধ্যেই বস্তুবাদী আধুনিকতার বিপদ, ভোগবাদী প্রবণতা এবং আধুনিকতার কিছু উপাদানে নিহিত অন্তর্নিহিত বিপদকে স্বীকার করে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিম্বলাইজেশন বা প্রতীকায়ন, অ্যালিয়েনেশন এবং মানুষকে একটি পণ্য কিংবা যন্ত্রের একটি উপাদানে পরিণত করার প্রবণতা। মানুষের মূল সত্তা থেকে বিচ্যুতিকে নির্দেশ করে এমন নেতিবাচক ধারণার যেন একটি সম্পূর্ণ অভিধানই তৈরি হয়েছে। এসবই আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং আধুনিকতার কারণে ও তার মধ্য দিয়ে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর প্রতি আমার দৃষ্টি উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু যখন আমি মানুষের মূল সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করি, তখন দেখি, তা বস্তুগত প্রকৃতি থেকে ভিন্ন। মানুষ বস্তু দিয়ে গঠিত ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে একটি ইলাহী অনুগ্রহও নিহিত রয়েছে।” (Dialogue: Elmessiri tries to found an Islamic modernism)

তাই এখানে আমরা আধুনিকতা সম্পর্কে আল-মাসিরির সমালোচনামূলক অবস্থানকে তাঁর চিন্তার বিকাশের ধারাবাহিকতা অনুসারে উপস্থাপন করব। প্রথমে আলোচনা করব তাঁর আধুনিকতার-ধারণা। এরপর আধুনিকতার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ এবং সবশেষে সেকুলারিজম সম্পর্কে তাঁর বিকশিত ধারণা নিয়ে আলোচনা করব। এই শেষোক্ত ধারণাটিই পশ্চিমের ক্লাসিক্যাল আধুনিকতার-সমালোচকদের থেকে তাঁর মৌলিক ভিন্নতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

 

তাঁর আধুনিকতার-ধারণা

আধুনিকতা একটি সামাজিক ধারণা। কারণ, এটি সেই ঐতিহাসিক রূপান্তরগুলোকে প্রকাশ করে, যেগুলোর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সমাজগুলো ‘মডার্ন’ বা আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে। আল-মাসিরির মতে, এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া আজও চলমান। তবে আধুনিকতা কেবল একটি সামাজিক প্রক্রিয়াই নয়; এটি বিশ্বজগৎ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ। তাঁর মতে, সমাজে আধুনিকতার বিভিন্ন প্রকাশরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে এর অন্তর্নিহিত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূল। তাই তিনি আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত করেন এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে, যার ভিত্তি এনলাইটেনমেন্টের তাত্ত্বিক চিন্তা।

তবে এনলাইটেনমেন্টের যেসব আদর্শ আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তা সামনে নিয়ে এসেছে—যেমন বুদ্ধির স্বাধীনতা, নিজের ভবিষ্যতের প্রতি মানুষের দায়িত্ব এবং মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞানের ব্যবহার—এসবই আল-মাসিরির চিন্তায় নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তাঁর মতে, সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন বাস্তবতা এই আদর্শগুলোর বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। তাই তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, সমস্যাটি মূলত এসব আদর্শের ব্যাপক প্রচার। কারণ, প্রকাশের জন্য এগুলো এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে যেন বাস্তবে সেগুলো ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে; অথচ এগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি আরও বলেন, স্বাধীন চিন্তা এবং মানবমনের ব্যবহারের অধিকারকে কেউ অস্বীকার করে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—কোন ধরনের মনের ব্যবহার হচ্ছে?  যান্ত্রিক মন নাকি এমন একটি মন, যা বস্তুকে অতিক্রম করতে সক্ষম। (The Thought of Enlightenment and Its Contradictions: 4)

এ কারণেই আল-মাসিরি এনলাইটেনমেন্টের চিন্তাকে বিশ্লেষণ করেন, যাতে এর নেতিবাচক বাস্তব ফলাফলগুলো ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর মতে, এটি বিশ্বজগৎ সম্পর্কে একটি বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা মানবমন ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট ধারণাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ইতিহাস, নীতিশাস্ত্র এবং সৌন্দর্যবোধ সম্পর্কে এর দৃষ্টিভঙ্গিও সেই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে, বিশ্বজগৎ সম্পর্কে প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠে— মানুষ, প্রকৃতি এবং খোদা। কিন্তু এনলাইটেনমেন্টে এই ত্রয়ীতে ঈশ্বরের স্থান দখল করে নেয় মানুষ ও মানুষের মন। (The Thought of Enlightenment and Its Contradictions: 12–13)

এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘র‍্যাশনালিটি’ বা যৌক্তিকতা বলতে বোঝায়, ওহীর সহায়তা ছাড়াই কেবল আকলের মাধ্যমে বাস্তবতার জ্ঞান অর্জন করাকে। এখানে বাস্তবতা বলতে বোঝানো হয় কেবল বস্তুগত বাস্তবতার স্তরকে, যা আকল ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করে। ফলে মন নিজেও বস্তুগত বাস্তবতার সীমার মধ্যেই আবদ্ধ। এই কারণেই সে বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক এবং নান্দনিক অর্থবহ সিস্টেম নির্মাণ করতে সক্ষম হয়, যার মাধ্যমে অতীত ও ভবিষ্যৎকে বোঝা এবং ব্যাখ্যা করা সম্ভব। (Zionism, Nazism, and the End of History, p. 238)

 

আধুনিকতার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য

আল-মাসিরির মতে, পশ্চিমা আধুনিকতা এমন একাধিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত তার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যে পরিণত হয়েছে। এর প্রথমটি হলো তার চিন্তার ক্রমাগত অবক্ষয়ের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে এভাবে যে, আধুনিকতা যাত্রা শুরু করেছিল মাইন্ড তথা মানবমনের কেন্দ্রীয়তার ঘোষণা দিয়ে। যা ছিল এনলাইটেনমেন্টের মূল আদর্শ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে ম্যাটার তথা বস্তুর কেন্দ্রীয়তায়, যেখানে বস্তুই চূড়ান্ত বাস্তবতা। একই প্রবণতা সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধ ক্রমে অবনমিত হয়ে এমন এক বস্তুবাদী দেহকেন্দ্রিক মূল্যবোধে রূপ নেয়, যার কেন্দ্রবিন্দু যৌন তৃপ্তি। আল-মাসিরির মতে, এই তাত্ত্বিক সংকটটি প্রতিফলিত হয়েছে ন্যাচারাল মডার্নিস্ট মডেলের দুটি রূপের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে যেগুলোর উভয়কেই যৌক্তিক বলা হয়। একটি হলো হিউম্যানিস্ট বা মানবতাবাদী মডেল, যা বস্তুর উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে; অন্যটি বস্তুবাদী মডেল, যা মানুষের উপর বস্তুর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে। (The Thought of Enlightenment and Its Contradictions, p. 28)

এই অবক্ষয়ের ধারায় মানবমন নিজেই একটি বস্তুগত সত্তায় পরিণত হয়, যা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কেবল বাহ্যিক উদ্দীপনা গ্রহণ করে। সামাজিক স্তরে এর অর্থ হলো, মানুষ তার স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে একটি বিশাল যন্ত্রের অংশে পরিণত হয়। একই সঙ্গে বস্তুবাদী প্রাকৃতিক নিয়মনীতির কাছে সে নিজের ভাগ্যের উপর নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলে। (The Thought of Enlightenment and Its Contradictions, p. 35)

আল-মাসিরি যে দ্বিতীয় সমস্যাটির কথা উল্লেখ করেন, তা হলো স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদ এবং অ্যাবসোলিউট রিলেটিভিজম বা পরম আপেক্ষিকতাবাদ। তাঁর মতে, এগুলো পশ্চিমা আধুনিকতার অন্তর্নিহিত সংকটেরই প্রকাশ। এই প্রসঙ্গে তিনি তাঁর প্রস্তাবিত একটি বিশ্লেষণাত্মক মডেল ব্যবহার করেন। সেটি হলো তাঁর উদ্ভাবিত ‘সারপাসিং মিনিং’ ধারণা, যা অর্থের সমস্যা সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বিশ্লেষণ থেকে বিকশিত হয়েছে। তিনি বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন—

“প্রতিটি বিষয়েরই একটি কেন্দ্র রয়েছে। এমন একটি কেন্দ্র যা ছাড়া কোনো কিছুর শুরু বা শেষ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এতে বিশৃঙ্খলা ও আপেক্ষিকতাবাদই প্রাধান্য পায়। ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। অন্য সব মানবীয় ফেনোমেনার মতো ভাষারও একটি কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। নইলে শব্দগুলোর অর্থ সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, যেকোনো ভাষিক প্রকাশ ধরে নেয় বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যতের অস্তিত্ব, মানবীয় ইচ্ছার অস্তিত্ব এবং কার্যকারণ সম্পর্কের অস্তিত্ব। কিন্তু এসব পূর্বধারণার সত্যতা কে নিশ্চিত করে? একমাত্র নিশ্চিত করে এমন এক বাস্তবতা, যা এসব পূর্বধারণাকে অতিক্রম করে এবং তাদের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এটিই সারপাসিং মিনিং। অর্থাৎ সমস্ত অর্থের মৌলিক ভিত্তি। এটি ডিনোটেশনের বাইরে, কিংবা তার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে; কারণ এটি ডিনোটেশনের আগেই বিদ্যমান এবং ডিনোটেশনের খেলায় অংশগ্রহণ করে না। এটি ভাষার অংশও নয়। কারণ, ডিনোটেশনের এই খেলা কোনো এক পর্যায়ে থেমে না গেলে ভাষা যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না। তাই একটি সারপাসিং ডিনোটেশনের অস্তিত্বই মানুষকে নিছক ইন্দ্রিয়, বিবর্তন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অ্যাবসোলিউটের জগৎ অতিক্রম করার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমেই ডিনোটেশনের এই অন্তহীন খেলা থামে, স্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং ফিলোসফিক্যাল, কগনিটিভ ও এথিক্যাল সিস্টেম নির্মাণ করা সম্ভব হয়।” (Language and Allegory between Monotheism and Unity of Being, p. 131)

আল-মাসিরির মতে, এই মৌলিক বৈপরীত্যগুলোর চিহ্ন জ্ঞানতত্ত্ব, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সমাজে প্রযুক্তির ভূমিকা, ইতিহাস-চিন্তা, অগ্রগতির ধারণা এবং নীতিশাস্ত্রের তত্ত্ব—সব ক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যায়। (The Thought of Enlightenment and Its Contradictions, pp. 27–60)

 

সেকুলারিজম-ধারণা

সেকুলারিজম আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য সামাজিক মূল্য। তবে এই সামাজিক মূল্যকে দুটি স্তরে সংজ্ঞায়িত করা যায়—পদ্ধতিগত বা প্রক্রিয়াগত স্তর এবং ধারণাগত স্তর। উদাহরণস্বরূপ, গণতন্ত্র যেকোনো আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য সামাজিক মূল্য। এই মূল্যকে প্রক্রিয়াগত স্তরে সংজ্ঞায়িত করা যায় নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা হিসেবে। আর ধারণগত স্তরে ‘নিজেদের শাসন করার জন্য মানুষের স্বাধীনতা’ ধারণার মাধ্যমে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণের ধারণা দিয়ে।

সেকুলারিজমের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রক্রিয়াগত স্তরে একে সংজ্ঞায়িত করা যায় ‘ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে পৃথকীকরণ’ হিসেবে। আর ধারণাগত স্তরে ‘সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মের ভূমিকা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে বাদ দেওয়া’ হিসেবে। এটি সত্য যে, সেকুলারিজম সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের মতামত রয়েছে; তারপরও এই দুটি স্তরের পার্থক্যকরণ তাত্ত্বিকভাবে ন্যায্য।

সেকুলারিজমের প্রক্রিয়াগত ও ধারণাগত স্তরের এই মৌলিক পার্থক্যকরণকেই আল-মাসিরি পার্শিয়াল সেকুলারিজম (প্রক্তিয়াগত স্তর) এবং জেনারেল সেকুলারিজম (ধারণাগত স্তর) নামে প্রকাশ করেন। তাঁর লেখায় এই দুই স্তরের ভিত্তিতে করা বিভাজনটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যেমন—

সেকুলারিজম শব্দটি বিভিন্ন কারণে একটি বিতর্কিত পরিভাষা। সাধারণত একে ‘ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে পৃথকীকরণ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে সাধারণত একে কেবল প্রয়োগগত স্তরেই ধারণায়িত করা হয়েছে। (Partial Secularism and General Secularism: 15)

আল-মাসিরির মতে, পার্শিয়াল সেকুলারিজম কোনো সমাজ বা ধর্মের জন্যই কোনো সমস্যাজনক না। ইসলাম ধর্মের জন্যও সমস্যাজনক নয়। তার ভাষায় —

সুতরাং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যকার পৃথকীকরণ এমন একটি প্রক্রিয়া, যা কোনোভাবেই শুধু সেকুলার সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং জটিল সমাজগুলোর অধিকাংশের মধ্যেই কোনো না কোনোভাবে এই প্রক্রিয়া বিদ্যমান। এখানে রাষ্ট্র বলতে বাস্তবে বোঝায় কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যেগুলোর মূলত কারিগরি প্রকৃতির । (Partial Secularism and General Secularism: 18)

এই মৌলিক পার্থক্যকরণের ভিত্তিতে আল-মাসিরি সেকুলারিজমকে তার প্রক্রিয়াগত স্তরে প্রত্যাখ্যান করেন না। বরং তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এর সর্বগ্রাসী ধারণাগত স্তরকে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসব্যবস্থাকে বাস্তবে বাদ দেওয়া হয়।  শুধু সমাজের কারিগরি ক্ষেত্র থেকে নয়, বরং উচ্চতর মূল্যবোধ, শিক্ষা, পারিবারিক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সকল ক্ষেত্র থেকেও ধর্মকে বা দেয়া হয়। এ কারণেই তিনি গত শতাব্দীতে পশ্চিমা সেকুলার সমাজগুলো যে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন, যাতে সেকুলারিজম ধারণার অন্তর্নিহিত তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক উন্মোচিত হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন—

“সেকুলারিজমের আবির্ভাব কেবল ধর্মগুরুদের দুর্নীতির কারণে ঘটেনি। একইভাবে ক্যাথলিক চার্চ ও পশ্চিমা ফিউডাল ব্যবস্থার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কিংবা সায়েন্টিফিক রেভল্যুশনের প্রতি চার্চের বিরোধিতা দিয়েও একে ব্যাখ্যা করা যায় না। সমস্যাটি আরও গভীরে নিহিত। এর সম্পর্ক পশ্চিমা সমাজগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানবজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সংঘটিত এক গভীর কাঠামোগত রূপান্তরের সঙ্গে। যারা এই রূপান্তরের শুরুতে অংশ নিয়েছিলেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেননি যে, এই পরিবর্তন মানুষ, প্রকৃতি এবং খোদা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কত গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। “(Partial Secularism and General Secularism: 22–23)

তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে আল-মাসিরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বাস্তবে ‘সেকুলারিজম’ এমন এক ধারাবাহিক পথ অতিক্রম করেছে, যাকে তিনি বলেন ‘মডেলের একটি সিকোয়েন্স’—

“পার্শিয়াল সেকুলারিজম কেবল পশ্চিমা সেকুলারিজমের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেকুলার মডেলগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ফলে এটি ক্রমে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। কারণ, সেকুলারাইজেশনের বিস্তার বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতি, রাজনীতি ও মতাদর্শের ক্ষেত্র অতিক্রম করে একটি সর্বগ্রাসী ফেনোমেননে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে স্বাধীন কোনো সাধারণ জীবনের ক্ষেত্র আর অবশিষ্ট থাকে না।” (Partial Secularism and General Secularism: 19–20)

সেকুলারাইজেশনের এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার মূলত এনলাইটেনমেন্ট চিন্তার একটি অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যের ফল। যে বৈপরীত্য উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধ থেকে নিম্নতর বস্তুগত মূল্যবোধের দিকে ক্রমাগত অবনমনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আল-মাসিরির মতে, পশ্চিমা চিন্তায় পশ্চিমা সেকুলারিজমের বিভিন্ন দিকের একটি সামগ্রিক ও সর্বাঙ্গীণ বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে। তিনি লক্ষ করেন যে, অধিকাংশ পশ্চিমা গবেষণা এই ফেনোমেননকে একটি রিডাক্টিভ বা সরলীকরণ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে, যেখানে ঘটনার বিভিন্ন প্রকাশরূপকে তার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথকভাবে অধ্যয়ন করা হয়। তবে তিনি ম্যাক্স ওয়েবারকে এই সমালোচনার বাইরে রাখেন। তাঁর ভাষায়—

“সম্ভবত ম্যাক্স ওয়েবারই একমাত্র পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানী, যিনি ‘র‍্যাশনালাইজেশন’ ধারণার মাধ্যমে এই ধারণার বিভিন্ন উপাদান ও ঘটনার মধ্যকার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন একটি সামগ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে।” (Partial Secularism and General Secularism: 43)

এই কাঠামোগত পরিবর্তনকে আল-মাসিরি ব্যাখ্যা করেন ‘সিকোয়েন্স অব মডেলস’ নামক বিশ্লেষণী টুলের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি বোঝান, আধুনিকতার রূপান্তরের ধারায় ক্রমান্বয়ে বিকশিত হওয়া একগুচ্ছ মডেলকে। আল-মাসিরির মতে, এই ধারাবাহিক মডেলগুলোকে এভাবে তালিকাভুক্ত করা যায়—

১. বিশ্বজগতের কেন্দ্রবিন্দু মানুষ থেকে সরে প্রকৃতিকেন্দ্রিক হয়ে যায়।

২. মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। ম্যাটেরিয়াল মনিজম বা বস্তুগত অদ্বৈতবাদ প্রাধান্য লাভ করে। ফলে মানুষ তার স্বতন্ত্র মর্যাদা ও বিশেষ অবস্থান হারায় এবং প্রকৃতির অন্যান্য বস্তুর মতোই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন একটি সত্তায় পরিণত হয়।

৩. মানুষ একটি একমাত্রিক সত্তায় রূপান্তরিত হয়। তাকে স্বাধীন ইচ্ছা ও সৃজনশীলতার অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর, পূর্বনির্ধারিত ও প্রোগ্রামড সত্তা হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে সে তার মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

৪. প্রকৃতি তার রহস্যময়তা ও পবিত্রতাবোধ হারায়। পৃথিবী তখন আর অর্থপূর্ণ কোনো জগৎ থাকে না; বরং শক্তিশালীর টিকে থাকার নির্মম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

৫. মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ই উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও অন্তর্নিহিত দিক থেকে অর্থহীন বলে বিবেচিত হয়। ফলে জ্ঞান কেবল নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়। যার হাতে ক্ষমতা থাকে, সে জ্ঞানকে ব্যবহার করে পৃথিবীকে জয়, নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করার সক্ষমতা অর্জন করে।

৬. শেষ পর্যন্ত সব সমাজই প্রকৃতি বা বস্তুকেন্দ্রিক মডেলের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে। প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতাই সমাজের প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে এবং ইতিহাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে, যেখানে নতুন কোনো মৌলিক বিকল্পের সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট থাকে না। যাকে আল-মাসিরি ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ বলে উল্লেখ করেন।

সবশেষে আল-মাসিরি মন্তব্য করেন, এই দীর্ঘ রূপান্তর সত্ত্বেও মানুষ সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে না। সে তার জীবনের অর্থহীনতা ও শূন্যতার সংকট অনুভব করতে থাকে। কিন্তু যদি ম্যাটেরিয়াল মনিজমের কোনো কার্যকর বিকল্প বিশ্বদর্শন গড়ে উঠতে না পারে, তবে শেষ পর্যন্ত মানুষ নিহিলিজম বা চরম অর্থহীনতার দিকে ধাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। (Partial Secularism and General Secularism: 194–196)

 

[৩] জায়োনিজম

আল-মাসিরির চিন্তায় জায়োনিজম একটি সমাজতাত্ত্বিক আন্দোলন, যা পশ্চিমা আধুনিকতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থাৎ জায়োনিজমের চিন্তাধারা মূলত পশ্চিমা এনলাইটেনমেন্ট চিন্তারই একটি প্রকাশরূপ। এ কারণে তাঁর মতে, অন্য যেকোনো সমাজতাত্ত্বিক বিষয়ের মতোই একটি অবজেক্টিভ মেথডোলজির বা বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতির মাধ্যমে জায়োনিজমের অধ্যয়ন হওয়া উচিত। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই আল-মাসিরি জায়োনিজমকে বিশ্লেষণ করেন পশ্চিমা আধুনিক সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামোর ভেতর থেকে। উপরে যেমন বলা হয়েছে, এই পদ্ধতির কারণেই জায়োনিজম সম্পর্কে তাঁর অবস্থান মূলত জ্ঞানতাত্ত্বিক, মতাদর্শগত নয়। অর্থাৎ, এর যথার্থ স্থান গবেষণার পরিসরে, শুধু  রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চে নয়। তাঁর ভাষায়—

প্রচলিত আরব বিশ্লেষণধর্মী ডিসকোর্স সাধারণত জায়োনিজমকে একটি ইহুদি আন্দোলন বা ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ফেনোমেনন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। ফলে এর বিশ্লেষণও প্রধানত তাওরাত, তালমুদ, এমনকি Protocols of the Elders of Zion-এর আলোকে হয়েছে। কিন্তু আল-মাসিরির মতে, এই শ্রেণিবিন্যাস জায়োনিজমকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাকে সীমিত করে। আমার মতে, এই শ্রেণিবিন্যাস জায়োনিস্ট ফেনোমেনন সম্পর্কে আমাদের বিশ্লেষণের ব্যাখ্যামূলক ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে। কারণ, জায়োনিজম প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার উপনিবেশ স্থাপন ও প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়ার একটি অংশ। একই সঙ্গে এটি একটি জেনারেল সেকুলার বিশ্বদর্শনের প্রকাশ। যেখানে সবকিছুকেই শোষণ ও ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করা হয়। এই অর্থে জায়োনিজম আধুনিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেকুলার ক্রিড বা ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস, যা ইহুদি পোশাকে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটি এমন একটি মতাদর্শ, যার ভিত্তি গড়ে উঠেছে আরও কয়েকটি সেকুলার মতাদর্শের ওপর—যেমন সোশ্যাল ডারউইনিজম এবং নিটশিইজম। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই মতাদর্শ পশ্চিমা সেকুলার সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। তবে একই সঙ্গে জায়োনিজম ধর্মীয় ডিসকোর্সের প্রেরণামূলক শক্তিকেও কাজে লাগিয়েছে। যদিও তা মূল ধর্মীয় অর্থে নয়; বরং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাদানকে পরিবর্তিত ও সরলীকৃত স্টেরিওটাইপে রূপান্তরিত করে ব্যবহার করেছে। এর ফলে এটি প্রাক্-রাব্বিনিক হিব্রু ঐতিহ্যের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও আখলাকবিচ্ছিন্ন হিব্রু বীরত্বের ধারণাকেও সামনে এনেছে। আবার একই সাথে বহু ক্ষেত্রে ওল্ড টেস্টামেন্টের বিভিন্ন চরিত্রকে জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদান করেছে।” (Partial Secularism and General Secularism: 397)

এ কারণে আল-মাসিরি ইহুদিদের সম্পর্কে প্রচলিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভ্রান্তি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ইহুদিদের এক ধরনের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করে, বাস্তবতার সাথে যার কোনো মিল নেই।

এ বিষয়ে তাঁর আরেকটি বই রয়েছে, যার নাম ‘দ্য হিডেন হ্যান্ড’। বইটি ইহুদিদের গোপন আন্দোলনগুলোর একটি বিশ্লেষণ। এর উদ্দেশ্য হলো, আরবরা যেন কনস্পিরেসির বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ধারণায় আবদ্ধ না হয় এবং ইহুদিদের সঙ্গে কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার সম্পর্ক স্থাপন না করে—এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা। এই বইতে তিনি যা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তা হলো—ইহুদিরাও মানুষ, এবং তাদের ঘিরে থাকা সব ফেনোমেননই মূলত মানবীয় ফেনোমেনন। (Dialogue: Consciousness of the Other Is a Necessity)

জায়োনিজম নিয়ে আল-মাসিরির গবেষণা অত্যন্ত বিস্তৃত। যা পশ্চিমা আধুনিকতা সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে করা। এই গবেষণায় একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ফেনোমেনা হিসেবে জায়নিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় ও উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রবন্ধের সীমিত পরিসরে আট খণ্ডে বিস্তৃত এই ব্যাপক গবেষণার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তবে এই গবেষণা যে কয়েকটি মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলোর প্রতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা যায়।

এখানে আমরা সংক্ষেপে জায়োনিজম কিভাবে পশ্চিমা আধুনিকতার একটি অংশ, ‘ফাংশনাল গ্রুপস’ নামে তাঁর প্রস্তাবিত অ্যানালিটিক মডেল এবং পশ্চিমা সভ্যতার একটি অংশ হিসেবে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার সমস্যা সম্পর্কে তাঁর অবস্থান উপস্থাপন করবো।

 

জায়োনিজম এবং পশ্চিমা সভ্যতা

পশ্চিমা সভ্যতার একটি অংশ হিসেবে এবং মডার্নিস্ট চিন্তার ভিত্তিতে নির্মিত জায়োনিজম সংক্রান্ত  গবেষণায় আল-মাসিরি জেনারেল থেকে পার্টিকুলারের দিকে অগ্রসর হন। কারণ, তাঁর সামগ্রিক বিশ্লেষণকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রথমত তাঁকে পশ্চিম সভ্যতাকে সামগ্রিক রূপে অধ্যয়ন করতে হয়েছে এবং এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে হয়েছে। অতঃপর তাঁকে এমন কিছু উদাহরণ নির্বাচন করতে হয়েছে, যেগুলো এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। এ কারণেই পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপনের পর আল-মাসিরি তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরেন।

আল-মাসিরির মতে, পাশ্চাত্য সভ্যতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করা। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে ঐতিহাসিক প্রকাশ দেখা যায় আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিধন, সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের স্বৈরাচারী শাসন এবং জার্মানিতে নাৎসি শাসনের মতো ঘটনায়। আল-মাসিরির দৃষ্টিতে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একই বিশ্বদৃষ্টির ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রকাশ। একই ধারা তিনি ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে বসনিয়া ও ইরাকে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও দমনমূলক কর্মকাণ্ডেও দেখতে পান। তাঁর মতে, উপনিবেশগুলোতে থাকা ভয়াবহ দাসপ্রথাও এই একই প্রবণতার অংশ। এই প্রবণতাই হোয়াইট ম্যান এর ধারাবাহিক মতাদর্শ।

এরপর আল-মাসিরি জেনারেল কেস এবং স্পেসিফিক কেস অর্থাৎ সামগ্রিক পশ্চিমা সভ্যতা ও জায়োনিজমের মধ্যে একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। জেনারেল কেসের প্রতিনিধিত্বকারী একটি মডেল হিসেবে তিনি নাৎসিজমের উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং স্পেসিফিক কেস হিসেবে জায়োনিজমকে বিশ্লেষণ করেন। এখানে উভয় ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো, কোনো একটি অযৌক্তিক আলাপের ভিত্তিতে মূল অধিবাসীদের বহিষ্কার করা। প্রথম ক্ষেত্রে এর ভিত্তি ছিল নৃতাত্ত্বিক উৎস, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ধর্মীয় উৎস। তিনি তাঁর অবস্থান এভাবে তুলে ধরেন—

এই গবেষণায় আমরা যা করার চেষ্টা করেছি তা হলো প্রথমত, নাৎসিবাদের গভীর কাঠামো বিশ্লেষণ করা। দ্বিতীয়ত, একে পশ্চিমা সভ্যতার প্রেক্ষাপটে বুঝা এবং তৃতীয়ত, জায়োনিজমের সঙ্গে এর সম্পর্ককে এর গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে বুঝা। একই সঙ্গে আমরা সাম্রাজ্যবাদকে সমস্ত আধুনিক পশ্চিমা ফেনোমেননের একটি মৌলিক অ্যানালিটিক মডেল হিসেবে পুনর্বিবেচনা করার চেষ্টা করেছি। আমরা দেখাতে চেয়েছি যে, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতাকে তার জেনারেল সেকুলারিজম, বস্তুবাদী র‍্যাশনালিজমসহ এর সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। (Zionism, Nazism and the End of History: 16)

 

জায়োনিজমসহ পশ্চিমা সভ্যতার সকল সাম্রাজ্যবাদী ঘটনার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লেখেন—

আল-মাসিরির মতে, নাৎসিবাদ, জায়োনিজম এবং সামগ্রিকভাবে পশ্চিমা সভ্যতার মধ্যে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেটি হলো উদ্দেশ্যের অযৌক্তিকতা এবং প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা। ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর লেখায় এই বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। নাৎসি জার্মানি এবং জায়নিস্ট ইসরায়েল উভয় ক্ষেত্রেই আটক ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পশ্চিমা সভ্যতার এই বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব ক্যাম্প অত্যন্ত পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালিত হতো, যেখানে লাভ-ক্ষতির হিসাবও সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষণ করা হতো। নাৎসিবাদ ও পশ্চিমা সভ্যতার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হলো ইহুদিদের জন্য নির্মিত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের প্রতি পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া। পশ্চিমা শক্তিগুলো ফিলিস্তিনিদের লাশের উপর একটি জায়োনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইহুদি সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে। যেন আউশভিৎসের অপরাধকে দেইর ইয়াসিনের হত্যাকাণ্ড কিংবা বৈরুতের গণহত্যার মাধ্যমে মুছে ফেলার চেষ্টা। (Zionism, Nazism and the End of History: 14)

 

দ্য ফাংশনাল গ্রুপস

আল-মাসিরির চিন্তায় ‘ফাংশনাল গ্রুপস’ ধারণাটি একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। যা তাঁর বিশ্লেষণের একটি বড় অংশজুড়ে বিস্তৃত। এটি মূলত একটি ‘মেথডোলজিক্যাল টুল’ ও একটি ‘কগনিটিভ মডেল’ যার মাধ্যমে তিনি ইহুদি ও জায়োনিস্ট ভূমিকা বা অবস্থানকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করেন। এখানে এই ধারণা সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত ব্যাখ্যার একটি অংশ এবং এরপর ফাংশনাল গ্রুপস এবং জুডাইজম-জায়নিজমের (ইহুদীবাদ-জায়নবাদের) মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো। এই ধারণাটি সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে তিনি লেখেন—

ফাংশনাল গ্রুপস হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানবগোষ্ঠী, যাদের প্রতি সমাজ নির্দিষ্ট কিছু ফাংশন তথা কার্যভার  অর্পণ করে। সমাজের সদস্যরা মনে করে যে, কোনো না কোনো কারণে তারা নিজেরা এসব কাজ করতে সক্ষম নয়। এই কাজগুলো সমাজের দৃষ্টিতে অবমাননাকর বা মূল্যবোধে সম্মানজনক নাও হতে পারে। যেমন জ্যোতিষিবিদ্যা, পতিতাবৃত্তি এবং সুদ। আবার এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণও হতে পারে। যেমন চিকিৎসা (বিশেষত রাজপরিবারের ক্ষেত্রে) এবং যুদ্ধ পরিচালনা। এই ফাংশনগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় এক ধরনের নিরপেক্ষতা ও চুক্তি রক্ষার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। কারণ, সমাজকে তার নিজস্ব পবিত্রতা এবং উচ্চতর মূল্যবোধের প্রতি অটল থাকতে হয়। সমাজ হয়তো ফাংশনাল গ্রুপের সদস্যদের ব্যবহার করে এমন একটি ব্যবধান পূরণ করতে, যা তার নিজস্ব প্রয়োজন এবং সেই প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতার মধ্যে তৈরি হয়। যেমন গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন বসতি স্থাপনকারীর প্রয়োজন, বিরল অভিজ্ঞতার প্রয়োজন কিংবা পুঁজির প্রয়োজন ইত্যাদি। (Partial Secularism and General Secularism: 269)

ফাংশনাল গ্রুপের সদস্যরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের বিশেষায়িত কাজের অভিজ্ঞতা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে এবং একচেটিয়াভাবে তা ধরে রাখে। এমনকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা এই ফাংশনের সঙ্গে একাত্মও হয়ে যায়। ফাংশনাল সদস্যদের কোনো সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার পর কয়েকটি ঘটনা ঘটে—

ক) একটি কনট্র্যাকচুয়াল রিলেশন বা চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
খ) তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, অ্যালিয়েনেশন এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হয়।
গ) সময় ও স্থান থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং আইডেন্টিটি সম্পর্কে একটি মিথ্যা অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
ঘ) নৈতিকতার ক্ষেত্রে দ্বৈততা ও রিলেটিভিজমের উদ্ভব ঘটে।
ঙ) স্থানান্তর ঘটে।
চ) আত্মকেন্দ্রিকতা এবং বস্তুকেন্দ্রিকতার প্রবণতা তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে ফাংশনাল গ্রুপের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন ও অ্যালিয়েনেটেড চরিত্রে পরিণত হয়। যারা ব্যবহৃত হওয়ার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু যাদের কোনো গভীর শিকড় বা আনুগত্য থাকে না। একই সঙ্গে তারা নিজেদের এবং সমাজের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে এক ধরনের ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে। আল-মাসিরির মতে, এ ধরনের গোষ্ঠীর বিশ্বদৃষ্টি সাধারণত ডুয়েলিং মনিজমের বা ‘বসবাসভিত্তিক একত্ববাদের’ দিকে ঝুঁকে থাকে। কারণ, এই দৃষ্টিভঙ্গি ফাংশনাল গ্রুপের সদস্যকে খোদার উপস্থিতির একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কল্পনা করে, যা তাকে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অনুভূতি দেয়। একই সঙ্গে এটি তাকে একটি নির্বাচিত জাতি বা চুজেন পিপল হিসেবে আত্মপরিচয় নির্মাণের সুযোগ করে দেয়। এর ফলে তার বিচ্ছিন্নতা ও কষ্টকর সামাজিক অবস্থান সহ্য করা এবং সমাজের সঙ্গে তার চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে ওঠে। (Partial Secularism and General Secularism: 270–272)

এরপর আল-মাসিরি ফাংশনাল গ্রুপস ধারণা এবং ইহুদিধর্ম ও সেকুলারিজমের আবির্ভাবের মধ্যকার সম্পর্কটি এভাবে ব্যাখ্যা করেন—

“ইহুদিরা সেকুলার চিন্তাধারা গ্রহণ করেছে এবং এর বিস্তারেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তবে জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন, এটি তারা  মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো গোপন উদ্দেশ্যে করেনি, যদিও এ ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বরং তাঁর মতে, তারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে এমন একটি পশ্চিমা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যার প্রভাব তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও প্রবণতার সীমাকেও অতিক্রম করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ তার কর্মকাণ্ডের দায় থেকে মুক্ত হয়ে যায়। কারণ, ব্যক্তি তার নিজস্ব কর্মের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়বদ্ধ থাকে। অনেক ইহুদি সেকুলারিজমের বিরোধিতা করেছে এবং এর বিস্তার রোধেরও চেষ্টা করেছে। তবে পশ্চিমা সমাজে ইহুদিরা একটি মধ্যস্থতাকারী ফাংশনাল গ্রুপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে নিজেদের খোদার পরিকল্পনার কেন্দ্র ভাবার প্রবণতা এবং সেকুলারিজমের প্রতি একটি বিশেষ অনুকূলতা গড়ে উঠেছে। এখানে আরও উল্লেখ করা যায় যে, আল-মাসিরির মতে, এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা গ্রহণ করাই পশ্চিমা সমাজের প্রত্যক্ষ সেকুলারাইজেশন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা কমিউটেটিভ বা বিনিময়যোগ্য অর্থনীতির ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করে এবং এমন একটি সমাজে অত্যন্ত গতিশীল সদস্যের ভূমিকা পালন করে, যে সমাজ মূলত একটি স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামোর জন্য পরিচিত ছিল।” (Partial Secularism and General Secularism: 309)

 

জেনোসাইড

ফাংশনাল গ্রুপস ধারণা এবং পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর বিস্তৃত বিশ্লেষণের সঙ্গে এর সম্পর্কের আলোকে আল-মাসিরি জায়োনিজমের বিভিন্ন দিক এবং ইহুদিধর্মের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে সংঘটিত জেনোসাইডের ঘটনাগুলো সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব।

 

জেনোসাইডের একচেটিয়াকরণ

আল-মাসিরির মতে, সমস্যাটা নাৎসিদের হাতে সংঘটিত ইহুদি জেনোসাইডকে স্বীকার করা বা অস্বীকার করা নয়। বরং সমস্যাটা হলো—একই সময়ে এবং একই পরিস্থিতিতে আরও বেশ কিছু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ও ফাংশনাল গ্রুপও এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছিল। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে জায়োনিজম এই ইহুদি জেনোসাইডের ঘটনাটিকে একচেটিয়া করে তুলেছে। এমন একটি ধারণা তৈরি করেছে যে, কেবল ইহুদিরাই এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়—

এই গবেষণা ইহুদিদের (এবং স্লাভ ও জিপসিসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর) বিরুদ্ধে নাৎসিদের অপরাধের ব্যাপকতাকে কোনোভাবেই খাটো না করেই তার উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করবে। কারণ, নাৎসিদের অপরাধের মাত্রাকে হ্রাস করে দেখা একটি একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক ব্যর্থতা। বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে স্বীকার করতে ব্যর্থ হওয়া মানে, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য জেনোসাইড-প্রবণতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়া। আর নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি এমন একজন নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ ব্যক্তির ব্যর্থতার প্রতিনিধিত্ব করে, যিনি একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ প্রত্যক্ষ করেছেন, কিন্তু নীরব থাকার পথ বেছে নিয়েছেন। (Zionism, Nazism and the End of History: 16)

এই ধরনের একটি অমানবিক ঘটনার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করার পর, আল-মাসিরি জেনোসাইডকে একচেটিয়া করার ধারণাটি এভাবে ব্যাখ্যা করেন—

জায়োনিস্টরা ভিক্টিমের ভূমিকা শুধু নিজেদের জন্য সংরক্ষণ করতে চায়। এ ক্ষেত্রে তারা অন্য কোনো সংখ্যলঘু বা নৃগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে না। ফলে জেনোসাইডকে তারা এমন একটি অপরাধ হিসেবে তুলে ধরে, যা শুধু ইহুদিদের বিরুদ্ধেই সংঘটিত হয়েছে। এই কারণেই জায়োনিস্টরা এবং তাদের সহযোগীরা নাৎসিদের জেনোসাইডকে এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখতে চায় না, যা শুধু নাৎসি ও ইহুদিদের মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা ইহুদিদের বিরুদ্ধে নাৎসিদের অপরাধকে জিপসি ও পোলিশদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে তুলনা করতেও অস্বীকার করে। একইভাবে তারা নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গে হোয়াইট ম্যানের আচরণ কিংবা ফিলিস্তিনিদের সাথে তাদের নিজেদের আচরণের সাথে জেনোসাইডের কোনো সম্পর্ক দেখতে চায় না। (Zionism, Nazism and the End of History: 94)

আল-মাসিরি নাৎসি জেনোসাইড নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রশ্নটিও আলোচনা করেন। তাঁর মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে গবেষণার উপর কোনো ধরনের বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা গ্রহণযোগ্য নয়।

পশ্চিমা ও জায়োনিস্ট মিডিয়া ইহুদি ভিক্টিমের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বইগুলোর তীব্র সমালোচনা করে—সেগুলো বৈজ্ঞানিক হোক বা অবৈজ্ঞানিক। এমনকি এই সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশকারী ব্যক্তিদেরও তারা অভিযুক্ত করে, যদিও সেই ব্যক্তি এই বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ গবেষক হতে পারেন। এটি এমন এক পরিস্থিতিতে ঘটে, যখন কিছু ইসরায়েলি গবেষকের লেখায়ও ষাট লাখ সংখ্যাটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। সম্ভবত বৈজ্ঞানিক ও অবৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যে পার্থক্য করা এবং পশ্চিম ও পূর্বের সব গোপন নথি ও আর্কাইভ উন্মুক্ত করা—এই ফলাফলগুলোর যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আরও কার্যকর পদ্ধতি হতে পারত।
(Zionism, Nazism and the End of History: 98)

এরপর আল-মাসিরি আলোচনা করেন, জায়নিস্ট মিডিয়া ইহুদি জেনোসাইডকে এমনভাব উপস্থাপন করেছে যে এটি যৌক্তিক গবেষণাকে অস্বীকার করা এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে,

পশ্চিমা সমাজ নাৎসিদের হাতে ইহুদিদের জেনোসাইডের অর্থ এমনভাবে নির্ধারণ করেছে, যা সাধারণ ও নির্দিষ্ট উভয় স্তরকেই ম্যানিপুলেট করে। একই সঙ্গে এটি এই ঘটনাটিকে তার আধুনিক সভ্যতাগত ও রাজনৈতিক পশ্চিমা প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। (Zionism, Nazism and the End of History: 98)

এই ম্যানিপুলেশনের প্রক্রিয়াটি অনেকটা এভাবে কাজ করে—

অপরাধের দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে, শুধু জার্মানদের দায়ী করলে ব্যাপারটা খুব সংকীর্ণ হয়ে যায়। আবার সব অ-ইহুদিদের দায়ী করলে অতিরিক্ত ব্যাপক হয়ে যায়। ভিক্টিমের ক্ষেত্রে, অন্যান্য ভিকটিমদের উপেক্ষা করে ভিকটিম হিসেবে শুধু ইহুদিদের গণ্য করলে ব্যাপারটা অতিরিক্ত সংকীর্ণ হয়ে যায়। আবার শুধু পশ্চিমা ইহুদিদের বদলে সারা দুনিয়ার ইহুদিদের ভিকটিম গণ্য করলে অতিরিক্ত ব্যাপক হয়ে যায়। এরপর জেনোসাইড একটি আইকনে পরিণত হয়। যা কেবল নিজের ঘটনাগত অর্থকেই নির্দেশ করে না, বরং একটি স্বতন্ত্র প্রতীকী অর্থের উৎসে পরিণত হয়। ফলে এটি যেকোনো যৌক্তিক বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে এবং অর্থ ও ব্যাখ্যার একটি বিশেষ উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত এটি এমন এক মেটাফিজিক্যাল অবস্থান লাভ করে, যা সময় ও স্থানের সীমাকে অতিক্রম করে ফেলে। (Zionism, Nazism and the End of History: 94)

 

[৪] দ্য ফিউচার: ইসলামী আধুনিকতা

অধ্যাপক আল-মাসিরির ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির মূলকথা হলো একটি ইসলামী আধুনিকতা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা। এর অর্থ হলো, আধুনিকতার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করা এবং একই সঙ্গে পশ্চিমা আধুনিকতার অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক দিকগুলোর মোকাবিলায় একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা। বিশেষভাবে, তিনি পার্শিয়াল সেক্যুলারিজম গ্রহণ এবং জেনারেল সেক্যুলারিজম প্রত্যাখ্যানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে ইসলামী আধুনিকতা বলতে আল-মাসিরি বর্তমান মানবসভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অবস্থানকে বোঝান না। একইভাবে এর অর্থ অতীতের ইসলাম সভ্যতার কোনো ‘ক্লাসিক’ সামাজিক কাঠামোতে ফিরে যাওয়াও নয়। বরং এটি এমন একটি ধারণা, যেখানে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সত্তাকে সংরক্ষণ করে সমকালীন সভ্যতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার কথা বলা হয়। এখানে ‘ইসলামী’ বিশেষণটির মানে হলো একটি প্রধান সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে ইসলামী আত্মপরিচয় ও মূল্যবোধকে ধারণ করে সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে সমকালীন মানবসভ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে প্রকাশ করেন—

“এই গবেষণার আশা হলো, এটি আধুনিক আরব-ইসলামী সভ্যতায় বিকশিত হওয়া একটি নতুন চিন্তাধারার অংশ হয়ে উঠবে। এই চিন্তাধারার সূচনা হয়েছিল চল্লিশের দশকের শেষভাগে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও সুস্পষ্ট রূপ লাভ করছে। এর লক্ষ্য হলো, আরব-ইসলামী সভ্যতার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে মানবসভ্যতায় অংশগ্রহণ করা।

আমরা মনে করি, আধুনিক যুগে আরব-ইসলামী সভ্যতার প্রকল্প তখনই সংকটে পড়ে, যখন এর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে পশ্চিমের মতো হওয়া। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায়, পশ্চিমই হবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য, আর আমরা কেবল সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম। এর ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা তৃতীয় শ্রেণির মানুষে পরিণত হবো।  আর সর্বোচ্চ পর্যায়েও দ্বিতীয় শ্রেণির বেশি মর্যাদা অর্জন করতে পারবো না। পাশ্চাত্যের মতো হওয়ার প্রচেষ্টায় আমাদের নিজস্ব সৃজনশীলতার গলা টিপে দিতে হবে এবং নিজেদের মূল্যবোধও ত্যাগ করতে হবে ।” (Zionism, Nazism and the End of History: 17)

আধুনিকীকরণের সমস্যা নিয়ে একটি সংলাপে আল-মাসিরি তাঁর ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে বলেন—

“কিছু আরব-ইসলামী চিন্তাবিদ পশ্চিমা আধুনিকতার সমালোচনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন, যাতে একটি নতুন আরব-ইসলামী আধুনিকতা গড়ে তোলা যায়। এই আধুনিকতা অন্যদের পূর্ব-অভিজ্ঞতা, তাদের চিন্তা এবং তাদের ভুল থেকেও শিক্ষা নেবে। আমরা দেখেছি, পশ্চিমা মানুষ আধুনিকতাবাদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে অনেক কিছু অর্জন করেছে, আবার অনেক কিছু ধ্বংসও করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই অর্জনগুলো গ্রহণ করতে পারব এবং একই সঙ্গে মডার্নিটির ফলে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান ডিভোর্সের হার, পরিবার প্রতিষ্ঠানের পতন এবং বিশাল অমানবিক শহরের মতো সংকটগুলো এড়াতে পারব? আমরা কি এমন একটি আধুনিকতা গড়ে তুলতে পারি, যা শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট দূষণের দিকে অনিবার্যভাবে নিয়ে যাবে না? আমরা কি এমন একটি আধুনিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যা মূল্যবোধহীন নয়? এমন একটি আধুনিকতা, যা যুক্তির উপর দাঁড়াবে, কিন্তু হৃদয়কে বাদ দেবে না?” (Dialogue: Consciousness of the Other Is a Necessity)

 

আধুনিকতার মূল্য

একটি নতুন ইসলামী আধুনিকতা নির্মাণ করার পেছনে আল-মাসিরির উদ্দেশ্য শুধু আরব-ইসলামী স্বাতন্ত্র সংরক্ষণ করা নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত আছে আধুনিকতার উচ্চমূল্য। আল-বাগ পত্রিকার সঙ্গে এক সংলাপে  তিনি বলেন—

“আধুনিকতার জন্য নিঃসন্দেহে একটি উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। আধুনিক ব্যবস্থা একদিকে যেমন নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি এই সাফল্যের অন্তর্নিহিত মূল্যও দীর্ঘদিন আড়াল করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পর্নোগ্রাফির কথা চিন্তা করুন। এটি হয়তো কোনো না কোনো স্তরে মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয়; কিন্তু একই সঙ্গে পরিবার ও সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে। তাই আধুনিকতাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের আধুনিক অগ্রগতির প্রকৃত ‘খরচের হিসাব’ খুলতে হবে। অর্থাৎ, উন্নয়নের সুফলের পাশাপাশি এর সামাজিক ও মানবিক মূল্যও বিবেচনায় আনতে হবে। পরিবারের ভাঙনের মূল্য, পরিবেশ দূষণের মূল্য, নৈতিক অবক্ষয়ের মূল্য, এবং দ্রুতগতির জীবনযাত্রা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব ফেলে—এসবকেও একই হিসাবের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।

মানুষের জানা দরকার যে, মহান পশ্চিমা প্রগতি চার শতাব্দীর উপনিবেশবাদের মাধ্যমে পৃথিবীর সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমরা যখন গ্র্যাজুয়েশন করি, তখন বিষয়গুলো স্পষ্ট ছিল– হয় তুমি সমাজতন্ত্রী হবে, নয়তো পুঁজিবাদী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আধুনিকতা ছিল পশ্চিমা। এখন তুমি সমাজতান্ত্রিক কোনো রেফারেন্স খুঁজলে তা আর পাও না, আর পুঁজিবাদী রেফারেন্স খুঁজলেও দেখতে পাও যে, সেটিও সংকটের মধ্যে আছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ পুনঃচিন্তা করতে বাধ্য হয়। আমার মতো অনেকেই যে ষাটের দশকের শেষ দিকে ইসলামের দিকে ফিরে আসার যাত্রা শুরু করেছিল এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। সেই সময়ই পশ্চিমা আধুনিকতার সংকট স্পষ্ট হতে শুরু করে এবং উত্তরআধুনিকতার আবির্ভাব ঘটে। ইসলামের দিকে ফিরে আসা একটি বিশ্বব্যাপী ঘটনা। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো—আমরা সৃজনশীল চিন্তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং অগ্রাধিকারের সঠিক বিন্যাসকে স্বীকার করতে শুরু করেছি।” (Dialogue: Prerequisites of the Contemporary Islamic Activity)

 

ইসলামী আধুনিকতার ধারণা

আল-মাসিরির রচনা থেকে তাঁর ‘ইসলামী আধুনিকতা’র তাত্ত্বিক ধারণাটি বোঝা যায়।

প্রথমত, তাঁর এই ধারণা র‍্যাশনালিটির একটি বিশেষ বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখানে র‍্যাশনালিটিকে পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মতো দেখা হয় না। অর্থাৎ, মানুষ দুনিয়া সম্পর্কে সীমাহীন জ্ঞান অর্জন করতে পারে, এমন ধারণা তিনি গ্রহণ করেন না। বরং তাঁর মতে, যুক্তিরও একটি সীমা আছে। একই সঙ্গে মানুষের অনুভূতি ও বিশ্বাসকেও যুক্তির বাইরে রাখা যায় না। দ্বিতীয়ত, তাঁর ধারণা দাঁড়িয়ে আছে বস্তুজগৎ ও খোদার  মধ্যকার একটি ‘সেপারেশন-কানেকশন’ সম্পর্কের উপর। এটি ডোয়েলিং ম্যাটেরিয়ালিজম (এলিমিনেটিভ ম্যাটেরিয়ালিজম) এবং অ্যাবসোলিউট আইডিয়ালিজম উভয়ের থেকেই আলাদা। কারণ তাঁর মতে, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেই অ্যাবসোলিউট ও রিলেটিভের মধ্যকার পার্থক্য মুছে যায়। তাই এগুলো মূলত একই মুদ্রার দুই পিঠ।

তৃতীয়ত, তাঁর ধারণার আরেকটি ভিত্তি হলো সেকুলারিজমের দুই দিকের মধ্যে পার্থক্য করা—প্রক্রিয়াগত দিক (পার্শিয়াল সেকুলারিজম) এবং ধারণাগত দিক (জেনারেল সেকুলারিজম। এই পার্থক্য স্বীকার করলে সেকুলারিজমের প্রক্রিয়াগত দিক গ্রহণ করা সম্ভব। একই ইসলমী মানবতাবাদী চিন্তার উপরও নির্ভর করা যায়। এছাড়া, আল-মাসিরি মনে করেন, এই ধরনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং এ বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

ইসলামিক র‍্যাশনালিজম সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন—

র‍্যাশনালিজম হলো এই বিশ্বাস যে, মানবীয় বুদ্ধি জ্ঞানের বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে বাস্তবতাকে বুঝতে সক্ষম। এর মধ্যে কঠোর বস্তুগত বিশ্লেষণ যেমন অন্তর্ভুক্ত, তেমনি অনুভূতি, অন্তর্দৃষ্টি ও ওহিকেও বাদ দেওয়া হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সত্য কখনো সাধারণ বস্তুগত সত্য হতে পারে, কখনো জটিল মানবিক সত্য হতে পারে, আবার কখনো এমন সত্যও হতে পারে, যা কেবল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এই ধরনের বুদ্ধি যা জানা সম্ভব, তা বোঝার চেষ্টা করে; একইসঙ্গে যা অজানা, তাকে অস্বীকার করে না। এটি এ বিষয়টিও উপলব্ধি করে যে, মানুষ নিজে সম্পূর্ণ নতুন কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক বা নৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে না। বরং সে কিছু মৌলিক ধারণা গ্রহণ করে এবং আগে থেকেই বিদ্যমান কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে সেগুলোকে বিন্যস্ত করে। (Zionism, Nazism and the End of History: 238)

জগৎ ও খোদার মধ্যকার ‘সেপারেশন-কানেকশন’ সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন—

আমরা বলতে পারি, ইসলামী তাওহীদি ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘দূরত্ব’ ধারণা। এই ধারণা একইসঙ্গে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার পার্থক্য এবং সম্পর্ককে স্বীকার করে। খোদা অন্য কোনো সত্তার মতো নন; তিনি সম্পূর্ণভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে, আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তাঁকে উপলব্ধি করা যায় না। কিন্তু একই সময়ে তিনি আমাদের শিরার চেয়েও নিকটবর্তী। তবে এই নৈকট্য সত্ত্বেও তিনি আমাদের অংশ নন এবং পরিবর্তনশীল জগতের অন্তর্ভুক্তও নন। (Language and Allegory between Monotheism and Unity of Being: 131)

ইসলামী আখলাকের ভিত্তিতে একটি আধুনিক সমাজের ভিত্তি নির্মাণ সম্পর্কে তিনি বলেন—

পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী আধুনিকতাবাদ মানুষকে খণ্ডিত ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে এমন এক সত্তায় রূপান্তরিত করে, যা আর প্রকৃত অর্থে মানুষ থাকে না। এই ব্যাপারটার সাথেই আমি একমত নই। বরং আমার দৃষ্টিভঙ্গি আশাবাদী। এর সমাধান আমি দেখি বস্তুগত বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে দুনিয়াকে একটি নৈতিক ও মানবিক ব্যবস্থার আলোকে দেখার মধ্যে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের মধ্যে যেমন বিদ্যমান, তেমনি অন্যান্য মানবতাবাদী দর্শনেও পাওয়া যায়, এমনকি সেগুলো নাস্তিক্যবাদী হলেও।

এই কারণেই আমি সবসময় বলি, কোনো নাস্তিক মানবতাবাদী চিন্তাবিদও যদি পরম নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানুষের সমতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আমি তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। অবশ্যই আমি মনে করি না যে তাঁর অবস্থানের পেছনে একটি শক্তিশালী দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে; তবে এই বিষয়টি আমরা তাত্ত্বিক আলোচনার পরিসরে আলোচনা করতে পারি।

কিন্তু যখন আমরা একটি সামাজিক ঐকমত্যের ভিত্তি খুঁজে পাই, তখন আমি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রস্তুত, যতক্ষণ তিনি নৈতিক ভিত্তির ওপর একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী থাকেন। আমি একে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখি, আর তিনি একে হিউম্যানিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখতে পারেন। (Dialogue: Elmessiri tries to found an Islamic Modernism)

আরেকটি সংলাপে তিনি ব্যাখ্যা করেন, পার্শিয়াল ও জেনারেল সেকুলারিজমের মধ্যকার তাঁর পার্থক্যকরণের ভিত্তিতে আরব-ইসলামী সমাজে কীভাবে সেকুলারিজম প্রয়োগ করা যেতে পারে। তিনি বলেন —

আমি পার্শিয়াল ও জেনারেল সেকুলারিজমের মধ্যে পার্থক্য করি। যারা নিজেদের আরব সেকুলারিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন, তাদের অধিকাংশই মূলত পার্শিয়াল সেকুলারিজমে বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ, তারা প্রধানত রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সেকুলারিজমকে গ্রহণ করেন। তাদের কেউ কেউ একইসঙ্গে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধেও বিশ্বাস রাখেন। এটি জেনারেল সেকুলারিজম থেকে ভিন্ন, কারণ জেনারেল সেকুলারিজম সমাজের সব ক্ষেত্রকেই সেকুলারাইজ করতে চায়—নারী ও পুরুষের সম্পর্ক, মানুষের নিজের শরীরের সঙ্গে সম্পর্ক, খাদ্যাভ্যাসসহ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রও এর অন্তর্ভুক্ত। আমি মনে করি, এই পার্থক্যটি বিবেচনায় নিলে সেকুলারিস্ট ও ধার্মিক মানুষের মধ্যকার আলোচনা একটি ভিন্ন রূপ নিতে পারে। কারণ তাদের একসাথে কাজ করার বিস্তৃত কমন গ্রাউন্ড  রয়েছে।

যেমন, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেকুলারিজমের অর্থ হতে পারে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করবে না। উদাহরণস্বরূপ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে সরকারি ধর্মীয় প্রতীক থাকা উচিত নয়। অধিকাংশ ধর্মীয় মানুষও সম্ভবত এই বিষয়টি মেনে নেবেন। তারা বুঝবেন যে, ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক সরাসরি নয়; বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে এই সম্পর্ক তৈরি হয়। দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও কারিগরি রাজনীতির বিষয়গুলো বিশেষজ্ঞদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত এবং সেই যুদ্ধ ন্যায়সঙ্গত কি না, তা নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এখানে আবার আমরা পরম নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রশ্নে ফিরে আসি। এই ধরনের বিষয়ে শুধু বিশেষজ্ঞরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, কারণ বিশেষজ্ঞের চিন্তা অনেক সময় কেবল কারিগরি ও উপযোগবাদী যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এভাবেই আমরা একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারি। (Dialogue: Consciousness of the Other Is a Necessity)

​দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে সক্রিয় থাকার পর, ২০০৮ সালের ৩ জুন এই মহান লেখক ও দার্শনিক ইন্তেকাল করেন।

অধ্যাপক আল-মাসিরির রচনাকর্ম

আরবীতে প্রকাশিত রচনাসমূহ   

আধুনিকতা বিষয়ক রচনা-

  • The Profane Paradise: Studies and Impressions on the American Civilization, the Arabic establishment of studies and publishing,Beirut, 1979.
  • The Secrete Societies in the World, DarElhelal, Elhelal Book, Cairo, 1993.
  • The problematic of partiality: a cognitive vision and a call for new views, authoring and editing, two volumes, the Engineers’ Syndicate,Cairo, 1993, International Institute for Islamic Thought, Washington, 1996).
  • The thought of enlightenment and its contradictions, DarNahdat Masr, Cairo, 1999.
  • TheIssue of the Woman between Freedom and Female Centrism, Dar Nahdat Masr, Cairo, 1999.
  • SecularismUnder Scrutiny, with Dr. Aziz Al’azma, Dar Elfikr, Damascus, 2000.
  • The World from a Western View, DarElhelal, Elhelal Book, Cairo, 2001.
  • Humans, Civilization and the Complex Models: a theoretical and Practical study, DarElhelal, Elhelal Book, 2002.
  • The Materialist Philosophy and Dismantling of Humans, Darelfikr, Damascus, 2002.
  • Language and allegory between monotheism and unity of existence, DarElshorouk, Cairo, 2002.
  • Partial Secularism and General Secularism, two volumes, DarElshorouk, Cairo, 2002, 2005.
  • Zionism and the Modern Western Civilization, DarElhelal, Elhelal Book, Cairo, 2003.
  • A Defense of Human: a theoretical and practical study in complex models, DarElshorouk, Cairo, 2003.
  • Modernism and Postmodernism, with Dr.Fathi Eltereiki, Dar Elfikr, Damascus, 2003.
  • A Cognitive Studiesin Western Modernism, Dar Elshorouk, Cairo, 2006.

জায়োনিজম বিষয়ক রচনাবলী-   

  • The End of History: an introduction to study the structure of the Zionist thought, Al-Ahramcenter for political and strategic studies, Cairo, 1972, the Arabic establishment of studies and publishing, Beirut, 1979.
  • The Encyclopedia of Zionist Terms and Concepts: a critical vision, ,Al-Ahram center for political and strategic studies, Cairo, 1972.
  • Jewish Minorities between Commerce and Nationalist Claim, theInstitute of Arabic Researches and Studies, 1975.
  • The Zionist Racism, little encyclopedia series, Ministry of Arts and Culture,Baghdad, 1979.
  • Jews, Zionism and Israel: a study in the propagation and decline the Zionist vision to reality, the Arabic establishment of studies and publishing, Beirut, 1976.
  • The Zionist Ideology: a case study in sociology of knowledge, two volumes, the national council for culture, arts and literature,Alam Alma’refa, Kuwait, 1981, 1988.
  • ThePalestine’s’ Uprising and the Zionist Crisis: a study in the comprehension and dignity, Tunis, 1987, Alfaneya print, Cairo, 1988, the general organization for the book, Cairo, 2000.
  • Zionist Colonialism and the Naturalization of the Jewish Character: a study in some of the Zionist concepts and Israeli exercises,The Arabic establishment for research, Beirut, 1990.
  • Soviet Jewish Migration: a method in observation and Information analysis (DarElhelal, Elhelal Book, Cairo, 1990.
  • Secrets of the Zionist Mind, DarElhusam, Cairo, 1996.
  • Zionism, Nazism and the End of History: a new civilized vision, DarElshorouk, 1997, 1998, 2001.
  • Who is the Jew?,Dar Elshorouk, Cairo, 1997, 2001, 2002.
  • Encyclopedia of the history of Zionism, three volumes, DarElhusam, Cairo, 1997.
  • Jews in the Mind of Those, DarElma’aref, Cairo, 1998.
  • The Hidden Hand: a study in the secret destructive and secrete Jewish movements, DarElshorouk, 1998, 2001, the general organization for the book, Cairo, 2000.
  • The Encyclopedia of Jews, Judaism and Zionism: a new interpretive model, 8 volumes, DarElshorouk, Cairo, 1999.
  • Zionist Lies from the beginning of Settlement to theAqsa Uprising, Dar Elma’aref, Cairo, 2001.
  • Zionism and Violence from the beginning of Settlement to theAqsa Uprising, Dar Elshorouk, Cairo, 2001.
  • From the ‘Intifada’ to the Palestinian Liberation War: the effect of the ‘Intifada’ on Israel, several prints, Cairo, Damascus, Berlin, New York, Electronic publishing, 2002.
  • TheFall of Israel from Inside, Dar Elma’aref, Cairo, 2002.
  • The Jewish Functional Groups: a new interpretive model, DarElshorouk, Cairo, 2003.
  • An Introduction to the study of the Arab-Israeli struggle: its roots, coarse, and destiny, DarElfikr, Damascus, 2002.
  • The Protocols, the Jews and Zionism, DarElshorouk, Cairo, 2003.
  • On the Zionist terminology and discourse, DarElshorouk, Cairo, 2003., 2005.
  • The Zionist Comprehension of Arabs and the Armed Discourse, DarElhamraa, Beirut, 2003.
  • The Jewish Homogeneity and the Jewish Character, DarElhelal, Elhelal Book, Cairo, 2004.
  • The Concise Encyclopedia,two volumes, Dar Elshorouk, Cairo, 2004.
  • Zionism and the Spider strings, DarElfikr, Damascus, 2006.

সাহিত্য ও সমালোচনামূলক রচনা–

  • Selections of the English Romantic Poetry: some basic texts and some historical and critical studies, the Arabic establishment of studies and publishing,Beirut, 1979.
  • Palestinian, it was, and still: the hidden and recurrent subject of the Palestinian poetry, self publishing, Cairo, 2002.
  • Studies in Poetry, the International library ofElshorouk, Cairo, 2007.
  • Samuel Taylor Coleridge, the poem ‘The Rime of the Ancient Mariner’, seven parts, printed in Arabic and English, translation and comments,London, California,  2007.

শিশুতোষ রচনা- 

  • The Princess and the poet: a story for children,Alfata Alarabi, Cairo, 1993.
  • A collection of fictions, 7 stories, DarElshorouk, Cairo, 1999.
  • Songs to the beautiful things: a poem for children, DarElshorouk, Cairo, 2002.

অনুবাদসমূহ-

  • Israel and South Africa: with others, the general organization for information, 1979.
  • TheLand of Return, the general organization for information, 1980.
  • West and the World, by Kevin Riley, translation with others, two volumes, the national council for culture, arts and literature,The World of Thought, Kuwait, 1985.
  • Openings of the Calm, by StevenSoundaiem and John Weidman, translation with others, Ministry of Media, Kuwait, 1988.

জীবনী- 

  • My Journey from the seeds to the fruits: anon objective non subjective Biography, the general organization of the palaces of culture, Cairo, 2000.
  • The Songs of the Experience, Perplexity, and Innocence: a poetic Biography,quasi subjective, quasi objective, Dar Elshorouk, Cairo, 2003.

ইংরেজিতে প্রকাশিত রচনাসমূহ

  • Israel, Base of Western Imperialism (Committee of Supporting Middle East Liberation, New York, 1969).
  • A Lover fromPalestine and Other Poems: Palestine Information Office, Washington D.C. , 1972
  • Israel and South Africa:The Progression of a Relationship (North American, New Brunswick, N.J. , 1976; Second Edition 1977; Third Edition,1980; Arabic Translation, 1980).
  • TheLand of Promise: A Critique of Political Zionism (North American, New Brunswick, N.J. , 1977).
  • Three Studies in EnglishLiterature: (North American, New Brunswick, N.J. , 1979 (The Palestinian Wedding: A Bilingual Anthology of Contemporary Palestinian Resistance Poetry (Three Continents Press, Washington D. C. , 1983).
  • ALand of Stone and Thyme: Palestinian Short Stories (Co- editor) (Quartet, London, 1996).

অনুবাদসমূহ-

  • Zionism, translated byLouaa Roupary, an Iranian translation of the encyclopedia of the history of Zionism, Gap wantesharat organization, Tahran, 1994.
  • Israel-Africa DoSul: A Marcha Deum Relacionamento, a translation to Portuguese of the book ‘Israel and South Africa: the development of the relation between them, Rio De Janeiro, Brazil, 1987.
  • A translation to the Turkish language of a study in English titled, ‘Toward a more complex and general model of secularism, published in ‘Secularism in the MiddleEast’, ed. John Esposito and Azzam al- Tamimi, Istanpole, 1997, , London, 2000.

তাকে নিয়ে গবেষণাসমূহ-

  • A conference in College of Economics and Political Science about the Encyclopedia of Jews, Judaism and Zionism , 29-31 Mars, 2000.
  • In the World of Abel-WahabElmessiri, a book about his works, with participation of several major writers, 2004.
  • Emessiri in the Eyes of his friends and critics, an Honoring book in a series ” Honored Scientists”, contains the works of the conference, “Elmessiri: the vision and the methodology”, held in the higher council of culture-Egypt, DarElfikr, Damascus, 2007.

পুরস্কার ও সম্মাননা–

  • HonorCertificate from the association of the Indonesian thinkers, 1994.
  • Honor Certificate fromAlquds University, Palestine, 1995.
  • Honor Certificate from the International IslamicUniversity, Malaysia, 1996.
  • International Educators,Hall of Fame 1996
  • Honor Certificate from the syndicate of physicians,Cairo, 1997.
  • Honor Certificate fromAlbehera Governorate, 1998.
  • Honor Certificate from the union of the Indonesian students, 1999.
  • Honor Certificate from Faculty ofSharee’a and Law, Emirates University, 1999.
  • Award of the best book,Cairo international fair, on the encyclopedia of Jews, Judaism and Zionism, 2000.
  • Best book award,Cairo International fair, on the book ‘my intellectual journey’, 2001.
  • Honor Certificate from FATH, Palestinian Organization, 2001.
  • SultanAl’owees award, United Arab Emirates, on his overall intellectual production, 2002.
  • Honor Certificate from the 17thconvention of the Arab writers, Alexandria, 2002.
  • Honor Certificate from the Arab Physicians Syndicate, 2003.
  • SuzanMubarak award for best writer in children literature, 2003.
  • The Honor National Award in literature, 2004.

প্রবন্ধ ও বক্তৃতা–

  • অধ্যাপক আল-মাসিরি আরবী ও ইংরেজি উভয় ভাষায় বিভিন্ন পত্রিকা ও সংবাদপত্রে বহু নিবন্ধ লিখেছেন; এর মধ্যে রয়েছে—আল-আহরাম, আল-হায়াত, আশ-শার্ক আল-আওসাত, আশ-শাব, মিনবার আশ-শার্ক, আল-ইনসান, পলিটিক্যাল রিডিংস, প্যালেস্টাইনিয়ান অ্যাফেয়ার্স, আল-আরাবি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, জার্নাল অফ অ্যারাবিক স্টাডিজ, জার্নাল অফ প্যালেস্টাইন স্টাডিজ, আল-আহরাম উইকলি ইত্যাদি।

তথ্যসূত্র ও নমুনা পাঠ্য-

নিবন্ধসমূহ-

সংলাপ-

  • Professor Elmessiri to ‘Althaqafia’

Elmessiri tries to found a New Islamic Modernity

  • Alblaghmakes a dialogue with Dr. Abel-Wahab Emessiri around

Prerequistes of the Contemporary Arabic Activity)

  • A meeting withAlgazira Satellite channel

Abel-Wahab Elmessiri..A journey of thought and literature part1

Abel-Wahab Elmessiri..A journey of thought and literature part2

Dr. Abel-Wahab Elmessiri: it is possible for modernism to live with Islamic discourse with conditions

তাকে নিয়ে লেখা নিবন্ধসমূহ–

তাঁর রচনাবলির নির্বাচিত অংশ– 

সোর্স-

 

অনুবাদঃ ইয়াছিন মজুমদার 

৩৪ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।
Picture of রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক ডেস্ক

রোয়াক, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অনলাইন মুখপাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সময়ের চিন্তাগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top