বিশ্ব-সভ্যতায় ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (সা)

বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি

ইসলাম ও মানব সভ্যতা-সংস্কৃতি একটি জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত বিষয়- যার সম্পর্ক কেবল মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়ত এবং ইসলামের পয়গাম ও শিক্ষার সাথেই নয় বরং জীবনের বাস্তবতা, মানবতার বর্তমান ও ভবিষ্যত এবং সভ্যতা- সংস্কৃতির পুনর্গঠন ও দিকনির্দশনার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর ঐতিহাসিক ভূমিকার সাথেও রয়েছে। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই মূলত একক প্রচেষ্টার পরিবর্তে সম্মিলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টার দাবিদার। কারণ, এ বিষয়টি তার বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার দিক থেকে বিশ্বজনীন ও মানবীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং তা নিজের ভিতরে গভীরতা ও ব্যাপকতা, ব্যাপক প্রশস্ততা ও বিস্তৃত পরিসর ধারণ করে রেখেছে। তার সময়কাল হলো প্রথম ইসলামি শতাব্দী থেকে শুরু করে আমাদের বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত। আর তার ভৌগোলিক অবস্থান হলো পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। আর তার মর্মর্গত ব্যাপকতা হলো আকীদা-বিশ্বাস থেকে শুরু করে চরিত্র ও কর্ম পর্যন্ত, ব্যক্তি ও সমাজ জীবন থেকে রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত এবং চিন্তা-দর্শন, শিক্ষা, ও নৈতিকতার সংশোধন ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে নির্মাণশিল্প, কাব্য-সাহিত্য, শিল্পকলা পর্যন্ত ব্যাপৃত ও বিস্তৃত।

 

এর সাথে সাথে তার প্রতিটি পরিধি ও বিস্তৃতি বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট বলে প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য এ বিষয়বস্তুর দায়িত্ব কেবল এমন একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান এবং একটি একাডেমী আঞ্জাম দিতে সক্ষম- যা উক্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকমণ্ডলী দ্বারা পরিচালিত। এ বিষয়বস্তুর জন্য সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ পণ্ডিতদের প্রয়োজন- যারা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে এবং নিজেদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা অর্জিত ফলাফলের নির্ভীক ঘোষণা দেবার যোগ্যতা ও সক্ষমতা রাখেন। তাদের কেউ আকীদা-বিশ্বাস ও ধর্মীয় চিন্তা-চেতনার অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা করবেন, দ্বিতীয় দল সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করবেন, তৃতীয়রা করবেন শরীয়ত ও আইন-কানুন-সংবিধান নিয়ে গবেষণা। চতুর্থগণ ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবতার সাম্য-সম্প্রীতির জ্ঞানগর্ভ ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করবেন- যা ইসলামের ধর্ম-বিশ্বাস। পঞ্চমদল ইসলামের ঐ সকল ভূমিকা ও অবদানের উপর আলোকপাত করবেন- যা ঐ সমাজজীবনে নারীদেরকে তাদের বৈধ অধিকার প্রদান করার ক্ষেত্রে এবং তাদের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে পালন করেছে। এভাবে এ বিষয়বস্তুটি একটি স্বতন্ত্র বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া হবার দাবি রাখে। তারপরেও যেমনটি বলা হয়ে থাকে যে, مالايدرك كله لا يترل كله (যার পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয়, তা একেবারে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়)। আর এ কারণেই এ শূন্যতা পূরণ করার সাহসিকতা প্রদর্শন করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মাটির এক প্রকারের আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে-

فَإِنْ لَّمْ يُصِبْهَا وَا بِلْ فَطَلَّ

“সেখানে যদি মুষলধারে বৃষ্টি নাও পৌঁছে, তবু তার জন্য হালকা শিশিরই যথেষ্ট।” [সূরা বাকারা: ২৬৫]

 

অত্যন্ত কঠিন ও নাজুক কাজ

সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন নাজুক কাজ হলো কোন উন্নত সভ্যতার অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করাযার মাধ্যমে সভ্যতার অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহের বিভিন্ন যুগ ঐতিহাসিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়, তার শিকড় সন্ধান করা যেতে পারে, তার পারস্পারিক প্রভাবপ্রতিক্রিয়া লেনদেন এবং সভ্যতার মৌলিক বস্তুনিষ্ঠ উপাদানসমূহ (Factors) চিহ্নিত করা যেতে পারে। আর সেটাও অবস্থায় যখন সকল উপাদান প্রতিক্রিয়া একটি সভ্যতার রূপ মানব সমাজের আকৃতি ধারণ করে এবং গর্ভে প্রবেশ করে তার রক্ত প্রাণের অংশে পরিণত হয়েছে। এভাবে তা দ্বারা সংস্কৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে। যেমন স্বভাবগত বৈশিষ্টসমূহ, শিক্ষাদীক্ষা, পরিবেশ খাদ্যের মাধ্যমে কোন ব্যক্তির জীবনও বিশেষ বৈশিষ্ট্যরূপে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এখনো তার পর্যবেক্ষণের জন্য কোন গবেষণা ল্যাব গড়ে উঠেনি- যা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের কাজ করতে সক্ষম। অথবা এখনো কোন অণুবীক্ষণ যন্ত্রও আবিষ্কার হয়নি- যা সভ্যতার ঐ সকল সূক্ষ্ম উপাদানকে নিরীক্ষণ করে প্রকাশ করতে সক্ষম- যা কোন সভ্যতার অবকাঠামো রূপায়ণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

এ অবস্থায় জাতি-গোষ্ঠী, বিভিন্ন দেশ ও সমাজের ব্যাপক বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন হয়ে পড়ে- যা দ্বারা আমরা তার অতীত ও বর্তমানের পর্যালোচনা করতে পারি এবং ইসলামি দাওয়াত ও মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়তের বিপ্লবী ও সংস্কারমূলক কর্মের পরিধি সম্পর্কে অনুমান করতে পারি- যা তার আকীদা- বিশ্বাসের সংস্কার ও পরিবর্তন, জাহিলিয়াতের প্রভাব, শিরকী চিন্তা-দর্শন, পৈতৃক রেওয়াজ-প্রথা মিটাবার ক্ষেত্রে এবং চিন্তাধারার গতি ঘুরিয়ে দিতে, মূল্যবোধ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির পুনর্গঠন ও তার শ্রীবর্ধন করার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। বস্তুত এ কাজ মরণপণ গবেষণা ও অত্যন্ত মেধা ও বুদ্ধিগত সাধনার দাবি রাখে। তারপরেও এটি বাস্তবসম্মত, কল্যাণকর ও জরুরী পদক্ষেপ। এটি যদি ইউনেস্কো-এর মত কোন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান অথবা আমেরিকা-ইউরোপের কোন শিক্ষা একাডেমী না করে, তাহলে এ জন্যে প্রাচ্যের মুসলিম দেশের কোন শিক্ষা ও গবেষেণা কেন্দ্র অথবা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শিক্ষা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ কাজ অনেক শিক্ষামূলক কাজের তুলনায় বেশি কল্যাণকর ও কার্যকরী- যা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ আঞ্জাম দিচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে তারা নির্দ্বিধায় নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য ও উপকরণসমূহ ব্যয় করছে।

 

রাসূলুল্লাহ (সা) ও ফলপ্রসূ কর্মের সীমাবদ্ধকরণের জটিলতা

মানব সভ্যতায় ইসলামের অবদানকে নির্ধারণ ও সীমাবদ্ধ করা একটা মুশকিল ও প্রায় অসম্ভব কাজ। কারণ, তাঁর প্রভাব ও অবদান মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ও তার অস্থি-মজ্জার অংশে পরিণত হয়েছে এবং বর্তমানে তা মানব সভ্যতার রক্তে এভাবে মিশে গেছে যে, দুনিয়ার জাতি-গোষ্ঠী তার প্রভাব নির্ণয় করতে সক্ষম হবে না বা তারা কখনো কল্পনা করতেও সক্ষম হবে না যে, এ সকল প্রভাব তাদের কাছে বাইরে থেকে আগমন করেছে এবং তা কোন বিশ্বজয়ী দ্বীনি দাওয়াত ও তার বিপ্লবের ফসল। কারণ এখন তা ঐ সভ্যতার অস্তিত্ব ও তার চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

 

রাসূলুল্লাহ (সা) ও ইসলামের বিশ্বজনীন প্রভাব

এখানে লেখক স্বীয় গ্রন্থ ‘মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?’ থেকে একটি উদ্ধৃতি পেশ করছেন যাতে তিনি ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং মানব চিন্তা-চেতনায় তার প্রভাব সম্পর্কে পর্যালোচনা করেছেন।

“যেভাবে বসন্ত মৌসুমে উদ্ভিদ জগত ও মানুষের মেজায মৌসুম দ্বারা প্রভাবিত হয়, ঠিক তেমনি অনুভূত ও অন অনুভূত পন্থায় মুসলিম শাসন ও সভ্যতার যুগে মানুষের মন-মানসিকতাও পরিবর্তিত ও প্রভাবিত হতে থাকে, চিত্তে কোমলতা ও নম্রতা সৃষ্টি হতে থাকে, ইসলামের মৌল নীতিমালা ও সত্যবাণী মন ও মস্তিষ্কে প্রবিষ্ট হতে থাকে। বস্তুর মূল্য ও মান সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে থাকে। গতকাল পর্যন্ত যেসব বস্তু ও গুণাবলী মানুষের দৃষ্টিতে বিরাট মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্ববহ বলে বিবেচিত ছিল, আজ আর তা তেমন থাকল না। আর যেসব বস্তু গুরুত্বহীন ও মূল্যহীন ছিল, আজ তা গুরুত্ববহ ও মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হলো; পুরাতন মূল্যবোধের স্থলে নতুন মূল্যবোধের অনুভূতি জাগ্রত হলো। প্রবৃত্তি পূজারীদের মধ্যে হীনমন্যতাবোধ সৃষ্টি হলো। ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া, এর অভ্যাস, রীতিনীতি ও এর বৈশিষ্ট্যসমূহ এখতিয়ার করা গর্বের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায়। দুনিয়া ক্রমান্বয়ে ইসলামের নিকটতর হচ্ছিল, পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী মানুষ যেমন সূর্যের আবর্তনবিবর্তন সম্পর্কে অনুভব করতে পারে না, ঠিক তেমনি পৃথিবীর জাতিগোষ্ঠী এর মানুষগুলো নিজেদের ইসলামি প্রবণতা ইসলামের অভ্যন্তরীণ প্রভাবপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অনুভব করতে পারত না। জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শনধর্ম সভ্যতাসংস্কৃতি কোন কিছুই এর প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। মানুষের বিবেক তার অন্তর এসব প্রভাবের সাক্ষ্য দিত এবং তাদের সুকুমার বৃত্তিতে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মুসলমানদের পতনের পরও যেসব সংস্কার আন্দোলন ঐসব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্টি হয়, তা ইসলামি প্রভাব ইসলামি ধ্যানধারণারই ফলস্বরূপ।

 

পৃথিবীর জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) ও ইসলামের দশটি মৌলিক অবদান

জাতি-গোষ্ঠীর জীবনে এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব- সমূহকে নির্ধারণ করা এবং তাকে সীমাবদ্ধ করা যদিও অসম্ভব ব্যাপার, তদুপরি আমরা সংক্ষেপে ও নির্বাচন করে তাকে দশটি মৌলিক ও মূল্যবান অবদান হিসেবে নির্ধারণ করার চেষ্টা করব- যা মানব জাতির জন্য দিকনিদের্শনা, তার কল্যাণ ও সফলতা, তার গঠন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে এবং একটি জীবন্ত ও উজ্জীবিত পৃথিবী গড়তে ও এর রূপদান করতে সফলতা অর্জন করেছে; আর তা পচনশীল ও বিধ্বস্ত। দুনিয়ার সাথে কোন প্রকার সাদৃশ্য রাখে না। নিম্নে ঐ সকল মূল্যবান অবদান উল্লেখ করা হলো:

১. স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট একত্ববাদের ধারণা;

২. মানবীয় ঐক্য ও সাম্যের ধারণা;

৩. মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা;

৪. নারীর সামাজিক মর্যাদা ও তার অধিকার পুনরুদ্ধার;

৫. হতাশা ও কুধারণার পরিবর্তে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা- আকাঙ্ক্ষার আলো;

৬. দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয় এবং বর্ণবাদ ও শ্রেণী সংগ্রাম ও শ্রেণী বৈষম্যের অপসারণ;

৭. জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের পবিত্র ও স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন এবং একের ভাগ্যকে অপরের ভাগ্যের সাথে জুড়ে দেয়া, জ্ঞানের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং একে উদ্দেশ্যপূর্ণ, উপকারী ও আল্লাহ্র সাথে সম্পর্কের মাধ্যম বানানোর প্রশংসিত উদ্যোগ;

৮. জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা ধর্মীয় বিষয়ে উপকৃত হওয়া এবং জীবন ও মহাকাশ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার প্রতি উৎসাহদান;

৯. মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বনেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যাক্তিগত ও সামষ্টিক চরিত্র মানুষিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সমীক্ষা, পৃথিবীতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং সত্যের সাক্ষ্যের যিম্মাদারী গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা;

১০. আকীদা-বিশ্বাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতির বিশ্ব ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।

এগুলোর প্রতিটি বিষয়ই ব্যাপক-বিস্তৃত এবং প্রতিটি বিষয়ের রয়েছে সুদীর্ঘ শাখা-প্রশাখা। এ বিষয়গুলো মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়তপূর্ব জাহিলী যুগ ও সভ্যতা-সংস্কৃতিসমূহ এবং ইসলামের আবির্ভাবের যুগ, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার মাঝে বস্তুনিষ্ঠ ও ইনসাফের সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনার দাবি রাখে এবং এর প্রতিটি বিষয়ের জন্যই হাজার হাজার পৃষ্ঠার স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা প্রয়োজন।

অনুবাদঃ মাওলানা জুলফিকার আলী নদভী।

৫৩০ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (১৯১৪-১৯৯৯) বিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক ও দাঈ। ভারতের উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলিতে এক ধর্মীয় ও জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ পরিবারে তার জন্ম। শৈশবেই তিনি আরবি, উর্দু, ফার্সি ও ইসলামী জ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল ইলম, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির এক উর্বর ক্ষেত্র। পরবর্তীতে তিনি লক্ষ্ণৌর নাদওয়াতুল উলামায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং অল্প বয়সেই আরবি ভাষা ও ইসলামী ইতিহাসে অসাধারণ ব্যুৎপত্তির পরিচয় দেন। বিশ শতকের মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বিপর্যয়, নৈতিক অবক্ষয় এবং আত্মপরিচয়ের সংকট নদভীর চিন্তার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মুসলমানদের দুরবস্থার মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক শক্তিহীনতা নয়; বরং চিন্তার স্থবিরতা, আত্মবিস্মৃতি এবং ইতিহাসবোধের দুর্বলতা। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি মুসলিম উম্মাহর নৈতিক পুনর্জাগরণ, দ্বীনি চেতনার নবায়ন এবং সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি নাদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। শিক্ষকতা, দাওয়াহ, গবেষণা, লেখালেখি ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আরব বিশ্বেও গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। আরবি ভাষায় তার লেখনির শক্তি তাকে ভারতীয় আলেমদের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। তার রচিতমাযা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমীন গ্রন্থটি মুসলিম বিশ্বের অবক্ষয়কে কেবল মুসলমানদের ক্ষতি হিসেবে নয়, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য এক গভীর নৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। এছাড়া Islam and the World, Saviours of Islamic Spirit, Muslims in India প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার ইন্তিকালের মাধ্যমে মুসলিম পুনর্জাগরণচিন্তার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। তথাপি ইসলামী আত্মপরিচয়, ইতিহাসসচেতনতা ও নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রশ্নে সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী আজও মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল প্রেরণার নাম।
Picture of সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (১৯১৪-১৯৯৯) বিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক ও দাঈ। ভারতের উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলিতে এক ধর্মীয় ও জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ পরিবারে তার জন্ম। শৈশবেই তিনি আরবি, উর্দু, ফার্সি ও ইসলামী জ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল ইলম, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির এক উর্বর ক্ষেত্র। পরবর্তীতে তিনি লক্ষ্ণৌর নাদওয়াতুল উলামায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং অল্প বয়সেই আরবি ভাষা ও ইসলামী ইতিহাসে অসাধারণ ব্যুৎপত্তির পরিচয় দেন। বিশ শতকের মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বিপর্যয়, নৈতিক অবক্ষয় এবং আত্মপরিচয়ের সংকট নদভীর চিন্তার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মুসলমানদের দুরবস্থার মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক শক্তিহীনতা নয়; বরং চিন্তার স্থবিরতা, আত্মবিস্মৃতি এবং ইতিহাসবোধের দুর্বলতা। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি মুসলিম উম্মাহর নৈতিক পুনর্জাগরণ, দ্বীনি চেতনার নবায়ন এবং সভ্যতাগত আত্মসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি নাদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। শিক্ষকতা, দাওয়াহ, গবেষণা, লেখালেখি ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আরব বিশ্বেও গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। আরবি ভাষায় তার লেখনির শক্তি তাকে ভারতীয় আলেমদের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। তার রচিতমাযা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমীন গ্রন্থটি মুসলিম বিশ্বের অবক্ষয়কে কেবল মুসলমানদের ক্ষতি হিসেবে নয়, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার জন্য এক গভীর নৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। এছাড়া Islam and the World, Saviours of Islamic Spirit, Muslims in India প্রভৃতি গ্রন্থ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার ইন্তিকালের মাধ্যমে মুসলিম পুনর্জাগরণচিন্তার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। তথাপি ইসলামী আত্মপরিচয়, ইতিহাসসচেতনতা ও নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রশ্নে সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী আজও মুসলিম বিশ্বের এক উজ্জ্বল প্রেরণার নাম।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top