ইমাম শাফেয়ীর ভাষায়,
أخي لن تنال العلم إلا بستة سأبينك عن تفصيلها ببيان ذكاء و حرص و اجتهاد و بلغة و صحبة أستاذ و طول زمان
الإمام الشافعي (رحمة الله عليه)
হে ভাই, ৬ টি বিষয় ছাড়া কক্ষনো জ্ঞানী হতে পারবে না। আমি তোমাকে এই সম্পর্কে অচিরেই বর্ণনা করে জানাব। সেগুলো হল:
- ১) الذكاء বা মেধা।
- ২) حرص বা প্রচন্ড আগ্রহ।
- ৩) اجتهاد বা চেষ্টা-প্রচেষ্টা।
- ৪) بلغة বা জীবন ধারণের জন্য যতটুকু সম্পদ থাকা প্রয়োজন, ততটুকু সম্পদ থাকা।
- ৫) صحبة أستاذ বা উস্তাদের সহবত।
- ৬) طول زمان বা দীর্ঘ সময়।
১) الذكاء: যে কোনো বিষয় দ্রুততার সাথে ধরতে পারার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে, জ্ঞান অর্জন করার মতো যোগ্যতা থাকতে হবে, স্মৃতিশক্তি ভালো থাকতে হবে, বোঝার ক্ষেত্রে খুব বেশি কাঠিন্য বোধ করবে না। এ বিষয়গুলো মেধার প্রমাণ।
২) حرص: প্রচন্ড স্পৃহা থাকতে হবে। সে সময়ের ব্যাপারে সব সময় সতর্ক থাকবে, অযথা সময় নষ্ট করবে না। সে ভালো ভালো বইপুস্তকের ব্যাপারে সব সময় উদগ্রীব থাকবে, সেগুলা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করবে। ভালো ভালো আলেমের সন্ধান করবে। উপকারী তথ্যগুলো লিখে রাখবে বা নোট করার চেষ্টা করবে। এসব কাজ যদি সে না করে, তাহলে তার ক্ষেত্রে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, সে জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে খুব আগ্রহী।
৩) اجتهاد: চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জ্ঞান অর্জনের জন্য সকল ধরনের কষ্ট, ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমি আমার মতো থাকবো, কোনো কষ্ট করবো না, এমনিতেই সব জ্ঞান আসবে, আমি ঘরেই বসে থাকবো, জ্ঞান ঘরের দরজা-জানালা দিয়ে প্রবেশ করবে– বিষয়টি মোটেই এমন নয়৷ জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর করতে হবে, কষ্ট করতে হবে, আরাম পরিত্যাগ করতে হবে।
৪) بلغة: জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সম্পদ থাকতে হবে। কারণ একজন আলেমের জ্ঞান অর্জন করার সময়ে এ কথা ভাবার সুযোগ নেই যে, অন্যরা এসে তাকে খাইয়ে দিবে। তার জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত টাকা তার থাকতে হবে। একজন আলেম যদি জীবন ধারণের জন্য কোনো ধনী মানুষের সম্পদের মুখাপেক্ষী হয়, তাহলে সে সত্যিকার অর্থে আলেম হতে পারবে না। কারন তখন তাকে সে মানুষটা বলবে, আমি তোমাকে রিজিক দিই, তাই আমি যা বলতে বলবো, তাই বলবে আর আমি যে ব্যাপারে চুপ থাকতে বলবো, সে ব্যাপারে চুপ থাকবে। এ কারণে একজন আলেম যদি রাব্বানী হতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই নিজেই উপার্জন করতে হবে এবং মুসতাকির বা স্বতন্ত্র হতে হবে, অন্য মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া যাবে না। এটি অন্যতম শর্ত।
৫) صحبة أستاذ: উস্তাদের সহবত অর্জন করতে হবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জ্ঞান বিস্তৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাবো, আমাদের জ্ঞান বিস্তৃত হয়েছে হযরত জিবরাইল (আ.) থেকে নবী করীম (সা.) এর মাধ্যমে, এরপর সাহাবাদের মাধ্যমে, এরপর তাবেঈনদের মাধ্যমে, এরপর প্রতিটি যুগের উস্তাদদের মাধ্যমে। বর্তমানে আমাদেরকে উস্তাদদের মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জন করতে হয়, অর্থাৎ তারাই কেন্দ্রবিন্দু। তাই তাদের সহবত জরুরী। কারণ জ্ঞান অর্জনের পথে যে একাই প্রবেশ করে, সে একাই বের হয়, অর্থাৎ সে খালি হাতে প্রবেশ করে এবং খালি হাতেই বের হয়; কারণ সে উস্তাদের সহবত পায় না। আবার যার শায়েখ বা উস্তাদ শুধুমাত্র কিতাব বা বইপুস্তক, তার ভুলভ্রান্তি অনেক বেশি। বর্তমানে এ বিষয়টিই আমাদের যুবক ভাইদের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের কথা হলো তারা কোরআন-হাদিসের কাছে ফিরে যাবে, এভাবে তারা যা পাবে, তাই জ্ঞান। এখানে কোনো মনুষ্য উস্তাদের প্রয়োজনীয়তা নেই, নিজে যা বুঝবে, তাই যথেষ্ট। এটি সবচেয়ে ভুল পন্থা বা মেথড। এ ধরনের ব্যক্তিরা হলো জাহেল আল মুরাক্কাব, অর্থাৎ সে যে জাহেল বা মূর্খ তা সে নিজেও জানে না। সে নিজেকে আলেম ভাবে, কিন্তু সে-ই আসলে সবচেয়ে মূর্খ। কারণ নিজেই কোরআন-হাদীস বোঝার মতো যোগ্যতা আসলে কারো নেই, এজন্য তার অবশ্যই উস্তাদ প্রয়োজন। আর উস্তাদের সহবতের পূর্বশর্ত হলো ধৈর্য। কারণ দীর্ঘদিন উস্তাদের সহবত নিতে হয়, এ সময়ে তার উঠাবসা, চাল-চলন অনেক কিছু হয়তো পছন্দ হবে না, কিন্তু তার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করার জন্য ধৈর্য ধরে তার কাছে থাকতে হবে।
৬) طول زمان: অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হবে। এটিও এক অর্থে ধৈর্যের সাথে সম্পৃক্ত। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা অল্প সময়ে অনেক কিছু অর্জন করতে চাই, কিন্তু তা হয়ে ওঠে না বা সময় স্বল্পতার কারণে আমরা ভুল করি। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের সময় যদি দীর্ঘ হয়, তাহলে পর্যালোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ থাকে এবং ভুল পথে আগালে সেখান থেকে ফিরে আসারও সুযোগ থাকে। তাই দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।