এক
সৈয়দ আলী আশরাফ হচ্ছেন আধুনিক মুসলিম শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, যার স্বপ্ন ছিল মুসলিম দুনিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করে মুসলিম মানস তৈরি করা। কলোনীর চাপিয়ে দেয়া সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থার সূত্রে মুসলিম মানসে এক ধরনের পরাধীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এই সংস্কৃতি মুসলিম মনোজগতকে উপনিবেশিত করে ফেলেছে এবং মুসলিম মানসে নানা বিচিত্রমুখী দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সৈয়দ আশরাফ চেয়েছিলেন আজকের দিনের মুসলমানের এই মনোজাগতিক উপনিবেশকে এক বিশ্বাস ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা (Faith based education) চালু করে হঠিয়ে দিতে । মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক অ-উপনিবেশীকরণের পাশাপাশি চিন্তা ও বুদ্ধির অ-উপনিবেশীকরণ আজও পুরোপুরি কার্যকরী হয়নি। ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সূত্রে পশ্চিমের প্রভুরা মুসলিম দেশগুলোতে যে সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয় তা ইসলামী অভিজ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে হঠিয়ে দেয় এবং এই ব্যবস্থার পথ ধরে নব জাগ্রত ইংরেজি শিক্ষিত ব্যক্তিদের কাছে পশ্চিমী আধুনিকতাই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে।
মুসলিম সমাজের এই অংশের কাছে আধুনিকতা ও পাশ্চাত্য সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেকুলার শিক্ষার সূত্রে এরা এমন এক মানস ভুবন গড়ে তোলে যা রুচি ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে দেশজ ও ইসলামী না হয়ে হয় পাশ্চাত্য ভাবাপন্ন। এই বিশিষ্ট পাশ্চাত্য মানসিকতার কারণে তারা সাম্রাজ্যবাদের দেশীয় খুঁটি হিসেবে কাজ করে এবং সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের পাহারাদার হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। সৈয়দ আলী আশরাফ খেয়াল করেছিলেন মুসলিম দেশগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও চেতনার স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্জন করেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বহাল রেখে একটি স্বাধীন ও প্রতিবাদী মানস গড়ে তোলা অসম্ভব। এই কারণেই মুসলিম দেশগুলোতে সৈয়দ আশরাফ জ্ঞানের সেকুলারাইজেশনের বদলে জ্ঞানের ইসলামীকরণ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম শিক্ষার্থীদের ভিতরে এক মুসলিম মানস গড়ে তোলা যারা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষাবলম্বন না করে মুসলিম সমাজের স্বার্থের পাহারাদার হবে।
সৈয়দ আশরাফ একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং সেই তৎপরতাকে তিনি প্রতিহত করারও চেষ্টা করেছিলেন। তার এই বিশিষ্ট ভূমিকার পিছনে তার ঐতিহ্যচেতনা ও মানসগঠন একটা মূল্যবান প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে হয়। মূলতঃ তিনি ছিলেন একজন শক্তিমান কবি এবং সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব। তার সংস্কৃতি চেতনা ছিল স্বাতন্ত্র্যধর্মী ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘ হাজার বছরের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যে মুসলিম আত্মচেতনা বিকশিত হয়েছে তাকে তিনি আমাদের স্বকীয়তা ও অস্তিত্বের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় মনে করতেন। কবি হিসেবেও তিনি ছিলেন ঐতিহ্য ও শিকড় সন্ধানী। আধুনিকতার নাস্তি অতিক্রম করে তিনি বাংলা কবিতার জমিনে এক আধ্যাত্মিকতার জাল বুনেছেন ।
দুই
সৈয়দ আলী আশরাফের জন্ম ১৯২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার আগলা গ্রামের মাতুলালয়ে। তার পিতৃনিবাস ছিল মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে। তার পিতা সৈয়দ আলী হামেদ ছিলেন আলোকদিয়ার বিখ্যাত পীর পরিবারের সন্তান। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ ছিলেন ঢাকার মীরপুর মাধারে শায়িত বিখ্যাত সাধক সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদী (রহ.), যিনি ইসলাম প্রচারের জন্য পঞ্চদশ শতকে সুদূর বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে সৈয়দ আশরাফের লেখাপড়ার শুরু। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা হয় আগলা গ্রামে। ১৯৩১ সালে তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং আরমানীটোলা সরকারি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। ছোটবেলা থেকেই সৈয়দ আশরাফ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি যথাক্রমে পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজিতে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পান এবং ১৯৪৬ সালে কৃতিত্বের সাথে এম এ পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে বৃটেনের কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজিতে বি এ অনার্স এবং ১৯৫৬ সালে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে English Poetry and its Audience শীর্ষক সন্দর্ভের জন্য কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তৎকালীন মুসলিম সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সূচিত রেনেসাঁ আন্দোলনের সাথে সৈয়দ আশরাফ ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। চল্লিশের দশকে রেনেসাঁ আন্দোলন ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের স্বাতন্ত্রকামী চিন্তাভাবনার একটা তাত্ত্বিক বুনিয়াদ তৈরি করবার চেষ্টা করে। এটি মূলতঃ কলকাতার দৈনিক আজাদকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। ঢাকায় এর ছায়া প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য সংস্কৃতিতে মুসলিম ঐতিহ্যের নবরূপায়ণ, স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের প্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চা। রেনেসাঁ আন্দোলনের সাথে সৈয়দ আশরাফের সম্পৃক্তি উত্তরকালে তার চিন্তা-ভাবনা ও ব্যক্তিত্বের নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কর্মজীবনে সৈয়দ আলী আশরাফ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে তার গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের শুরু। তারপর একে একে রাজশাহী, করাচী, সৌদি আরবের কিং আবদুল আজিজ ও উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজির অধ্যাপনা করেছেন। এর মধ্যে ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত তিনি কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। সৈয়দ আশরাফ তার দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবন থেকে উপলব্ধি করেন মুসলিম দেশগুলোতে চলমান সেকুলার বা ধর্মীয় মূল্যবোধহীন শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলিম সমাজের সার্বিক উন্নতির সহায়ক নয়।
কারণ জ্ঞানসমূহের মর্মমূলে ইসলামী ধ্যান ধারণা প্রতিষ্ঠিত না হলে তা একটি ধর্মীয় প্রভাবিত সমাজের কোনো কাজে আসবে না। উপরন্তু সেকুলার শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শিতা অর্জন করলেও তাদের চরিত্রের উপর এর কোনো প্রভাব নেই ৷ এতে মানুষের নৈতিক চরিত্রের কোনো উন্নতি হয় না। তাই তিনি বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ও শিক্ষার ইসলামীকরণের একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তিনি বলেছেনঃ
“মানবতার যে ধ্যান ধারণা ধর্ম আমাদের দিয়েছে, সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থা তাকে শুধু শুধু বিকৃত করেছে। ফলে মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থা মূল্যবোধহীন হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা রকম দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে । জ্ঞানের ইসলামীকরণের লক্ষ্য হলো মানুষকে এই দ্বন্দ্ব থেকে রক্ষা করে বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা নীতি প্রতিষ্ঠা করা।“২
সৈয়দ আশরাফ তার মিশনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সৌদি আরবের মরহুম বাদশাহ ফয়সলকে চিঠি দেন এবং সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামী ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে পশ্চিমী ধ্যান ধারণার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবসহ দুনিয়ার বিশিষ্ট মুসলিম শিক্ষাবিদদের নিয়ে ১৯৭৭ সালে মক্কায় প্রথম বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের উদ্যোক্তা ও সচিব হিসেবে কাজ করেন। এ ব্যাপারে তাকে সৌদি সরকার ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। এসব বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ড. ইসমাইল রাজী আল ফারুকী, ড. আবদুল হামিদ আবু সুলেমান, তাহা জাবির আল আলওয়ানী প্রমুখ। তারপর সৈয়দ আশরাফ ১৯৮০-৯৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে এ ধরনের আরো কয়েকটি বিশ্ব সম্মেলনের নেতৃত্ব দেন এবং বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলন, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার ইসলামীকরণ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে অতুলনীয় ভূমিকা রাখেন।
এ ব্যাপারে তিনি কয়েকজন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের সাথেও যোগাযোগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের প্রতিশ্রুতি কাগজে কলমে সীমিত থেকেছে এবং এইসব সম্মেলনের সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু তিনি হতাশ হননি। একজন আদর্শবাদীকে কখনো কখনো একাকী লড়াই করতে হয়। সৈয়দ আলী আশরাফও সেই কাজ করেছেন এবং তিনি তার লক্ষ্য থেকে কখনো পিছিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার স্বপ্নের শিক্ষার দর্শনকে বাস্তবায়ন করবার জন্য কেমব্রীজে ইসলামিক একাডেমী এবং ঢাকায় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে কার্যকরী অর্থে তিনি তার জ্ঞান ও শিক্ষার ইসলামীকরণের ধারণা বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ৭ আগস্ট সৈয়দ আলী আশরাফ ইন্তেকাল করেন।
তিন
রেনেসাঁ আন্দোলনের পটভূমিতে এবং এই আন্দোলনের মর্মবাণীর সাথে গভীর সম্পর্ক রেখে সৈয়দ আলী আশরাফ তার কাব্য সাধনা শুরু করেন। সেই সূত্রে আমরা তার কবিতায় মুসলিম ঐতিহ্যের অঙ্গীকার ও নবরূপায়ণ দেখতে পাই। তিনি কবিতায় স্বাতন্ত্র্য সন্ধানী ও স্বাতন্ত্র্য প্রয়াসী, একই সাথে তার কবিতা গভীরভাবে মিস্টিক ভাবাপন্ন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন একজন সুফী তত্ত্বরসিক ও সাধক; পাশাপাশি সুফী পরিবারের ঐতিহ্যিক ধারাবাহিকতা তার চেতনায় সংক্রমিত হয়েছিল। এই কারণে তার কবিতার শরীরে এক ধরনের সুফীর আত্মগত অনুভূতি, গূঢ় অন্বেষা, মরমীর অনুধ্যান, মৃদু মোলায়েম উচ্চারণ, মনোলগ বা আত্মকথন ও নির্ভার নিবেদিত চিত্ততা মিশে আছে। এক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফের কবিতার প্রাণ রসায়ন হলো বিশ্বাস। বাংলা কবিতায় তার সমসাময়িক অনেক কবিরা যখন নাস্তিক্যকে লালন করেছেন, নাস্তিক্যকে আধুনিকতার চূড়ান্ত রূপ মেনে মান্য করেছেন, তিনি তখন হেঁটেছেন আধ্যাত্মিকতার পথে। সুফীরা যেমন এই পৃথিবীর আলো-আঁধার, মঙ্গল-অমঙ্গল, থিসিস-এন্টিথিসিস অতিক্রম করে এক সত্যলোকে যাত্রা করেন তেমনি সৈয়দ আশরাফ তার কবিতার ভিতর দিয়ে হেঁটেছেন এক মহাজাগতিক সত্তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য। কবিতার ভিতর দিয়ে তার দিবাদৃষ্টির উন্মোচন ঘটেছে এমনিভাবে :
“তাই আজ সময়ের বাঁধ ভেঙ্গেচুরে চুরমার হল তাই আজ স্মৃতির গোলাপ স্বপ্নের কমলে মিশে গেল, তাই তার গাঢ় নীল চোখে কেয়ামৎ প্রতিভাত হল এক হল- শান্তিদীপ্ত সৃজন আলোক আর সুপ্ত অন্ধকারে বিধ্বস্ত দ্যুলোক।”৩
আধ্যাত্মিকতার উপকূলে উপনীত হবার যে প্রচেষ্টা সৈয়দ আশরাফের কবিতায় আমরা দেখি তা একটা নতুন দিকনির্দেশনার মত এবং তা বাংলা কবিতার জন্য সুখকর ঘটনাও বটে। পশ্চিমা আধুনিকতার প্রভাবে বাংলা কবিতায় যে অস্থিরতা, চিত্তচাঞ্চল্য, সংশয় ও অনিশ্চয়তা বাসা বেঁধেছে তার উপশমে এ ধারার কবিতা একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন অবশ্যই। কবিতায় নেতি, নাস্তি, পারক্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্বন্ধে টি.এস. এলিয়ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসগুলোকে অস্বীকার করা হয়েছে। তাই তিনি ইউরোপীয় জড়বাদের জয়যাত্রার যুগে তার কবিতায় এক ধর্মীয় সভ্যতার জাগরণের আভাস দিয়েছিলেন। তার কাছে মনে হয়েছিল এক মরমী আধ্যাত্মিকতার তুলি স্পর্শ ছাড়া ইউরোপীয় সভ্যতাকে রক্ষা করা যাবে না।
এলিয়টের মত সৈয়দ আশরাফও তার কবিতায় এক আধ্যাত্মিক যাত্রাপথের রূপচিত্র এঁকেছেন। তবে পার্থক্য হচ্ছে এলিয়ট যেখানে খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য থেকে চিত্রকল্প ও প্রতীক ব্যবহার করেছেন, সেখানে সৈয়দ আশরাফ ইসলামী ঐতিহ্য থেকে চিত্রকলা ও প্রতীক নিয়ে এসেছেন। তিনি কেন নির্দিষ্ট করে ইসলামের পথ বেছে নিয়েছেন সে সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন কারণ সে পথেই নিজের মুক্তির সন্ধান পেয়েছি, মানবিকতার চরম উৎকর্ষ উপলব্ধি করেছি, এবং হৃদয় সন্দেহ-চিহ্নিত সম্ভাবনার জগত পার হয়ে স্থির দৃঢ় একীনের জগতে উত্তীর্ণ হয়েছে। সেই জগৎকেই, সেই অনুভূতিকেই, সেই নতুন উপলব্ধিকেই প্রকাশ করার নতুন ভাষা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক ও ছন্দের সন্ধান করেছি। বাধ্য হয়েই সম্পূর্ণ নতুন প্রতীক সৃষ্টি করেছি। উদ্দেশ্য পাঠকের মনেও যেন এই অভিজ্ঞতার সত্তা দোলা জাগায় এবং সে বুঝতে সক্ষম হয় কিভাবে এক এক অবস্থা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে একটি মানুষ এই অবস্থায় উপনীত হয়।৪
চার
সৈয়দ আলী আশরাফের সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপতাকে তিনি ভাঙ্গবার চেষ্টা করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প একটি সংস্কৃতির রেখাচিত্র নির্মাণ করার স্বপ্ন তার ছিল। এটি ছিল তার দিক দিয়ে এক হিসাবে সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। রাজনৈতিক বিদ্রোহের কথা তিনি ভাবেননি। কারণ তিনি জানতেন সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে যদি মানুষের অন্তর্ভাগতে পরিবর্তন আনা যায়, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন অবধারিতভাবে আসবে। সবার অলক্ষ্যে তাই তিনি মুসলিম দুনিয়ায় প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। এটা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার যদি পরিবর্তন সম্ভব না হয়, তবে মুসলিম দুনিয়ার আরদ্ধ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা আসবে না। আর সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জিত না হলে যেটুকু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া গেছে তাও বিপন্ন হবে।
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে সৈয়দ আশরাফ শুধু প্রচলিত কলোনীর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন চাচ্ছেন না, তিনি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তনের কথা ভাবছেন যা হবে ইসলামের জীবন দর্শনভিত্তিক মুসলিম দুনিয়ায় কি ধরনের শিক্ষা সংস্কার প্রয়োজন তার প্রতিবেদন ও ভূমিকা রচনা করতে গিয়ে আলী আশরাফ একেবারে প্রথম কর্তব্য হিসেবে যার উল্লেখ করেছিলেন তা অন্য কিছু নয়, সেটি হচ্ছে একটি বিশ্বাসভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা আবার শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তনের কথা বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি, এই ব্যবস্থাকে অবলম্বন করে তিনি নতুন মানুষ তৈরি করার কথাও ভাবছেন । এইভাবে সাংস্কৃতিকভাবে নবচেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠা মানুষ সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়াবে। সৈয়দ আশরাফ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার এই ক্ষেত্রটিকে প্রশস্ত ও উর্বর করতে চেয়েছিলেন শিক্ষার সংস্কার ও মুসলিম মানস তৈরি করার ভিতর দিয়ে। শিক্ষার ভিতর দিয়ে মুসলিম মানস তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন তার কাছে? কারণ কলোনীর শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার ভিতর দিয়ে যে সংস্কৃতি দেশবাসীর জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তা হল পরাধীনতার। এই পরাধীনতার সংস্কৃতি একালের মুসলমানের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সৈয়দ আশরাফ চেয়েছিলেন মুসলমানের মনোজাগতিক উপনিবেশকে শিক্ষার ভিতর দিয়ে নির্মূল করতে।
কলোনীর শিক্ষা মানে হচ্ছে সেকুলার শিক্ষা। পশ্চিমীরা এটিকে আদর করে নাম দিয়েছে আধুনিক শিক্ষা। এ শিক্ষা কি অর্থে আধুনিক এবং আমাদের সমাজের জন্য কতখানি উপকারী তা কখনও আমরা অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিনি। আলী আশরাফ সাহেবই আমাদের মধ্যে প্রথম এ রকম শিক্ষার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এই নীতি শিক্ষা দেয়া যে ছাত্রদের জন্য ক্ষতিকর, সেই অর্থে জাতির জন্যও শুভ নয় সে কথাটি তিনি সরাসরি বলেছেন। এরকম শিক্ষার ক্ষতিকর প্রভাবটি নষ্ট করার জন্য পাঠ্যসূচীতে ইসলামের নীতি ও দর্শনের পাঠ নেয়া জরুরী বলে সাব্যস্ত করেছেন। আর এ ভাবেই তিনি সাম্রাজ্যবাদের সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং নিজের অবস্থানকে সুস্পষ্ট করে নিলেন। সেকুলার শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্য কি? ওহী বা প্রত্যাদেশভিত্তিক যে জ্ঞান, যার উপরে সব ধর্মের বুনিয়াদ দাঁড়িয়ে আছে তার নিয়ন্ত্রণ থেকে মানুষের চেতনার মুক্তি এবং এই মুক্তিকেই বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষকরণ বা সেকুলারাইজেশন। একালের পণ্ডিতরা বলে থাকেন সমাজের, রাষ্ট্রের এবং ব্যক্তিমনের এই সেকুলারাইজেশন হচ্ছে মানব ইতিহাসে আধুনিকতার সবচেয়ে বড় অবদান। আবার এইখানে এসে আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাও একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
পশ্চিমের পণ্ডিতদের মতে ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া আধুনিকতা হয় না। অন্যদিকে আধুনিকতা সেকুলারাইজেশনের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়। ধর্মের যে আধ্যাত্মিক ভিত্তি, আধুনিকতা তা স্বীকার করে না মানুষের সাথে তার সৃষ্টিকর্তার যে সম্পর্ক, যার ভেতর দিয়ে ধর্মের স্বরূপ উন্মোচিত হয় তা আধুনিকতার কাছে একান্তই গুরুত্বহীন। কোন মূল্যবোধই আধুনিকতার কাছে চূড়ান্ত নয়, সবই আপেক্ষিক। ধর্ম বলছে মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ। আধুনিকতা বলছে মানুষ এসেছে জৈব বিবর্তনের পথ ধরে। ধর্ম বলছে সুদ নির্মূলের কথা। আজকের আধুনিকতা দাঁড়িয়ে আছে সুদী অর্থনীতির উপর। ধর্ম মানুষকে খলিফাতুল্লাহর (Vicergent of God) মর্যাদা দিয়েছে। আধুনিকতা বলছে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও আত্মনির্ভরতার কথা। এই জীবন দৃষ্টির পার্থক্যের জন্যই আধুনিকতাকে ধর্ম পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি। বিশেষ করে ইসলামের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতাকে হজম করা সম্ভব হয়নি। সৈয়দ আলী আশরাফ সাহেব লিখেছেন :
It is impossible to compromise between Islam and Secularism. Where secularization means a modern scientific approach to knowledge and way of life, no adjustment is acceptable. What the Quran says in a similar context is true. Muslims can not be modern in the above sense. There can not be a compromise between Kufr and iman, faithlessness and faith, secularism and Islam.৫
আমাদের এখানে কেউ কেউ দাবি করেন ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ঠিক ধর্মহীনতা নয়। এ কথাটা স্রেফ অজ্ঞতার নামান্তর। ধর্মনিরপেক্ষতার যে মৌলিক দর্শন, যার উদ্ভব মধ্যযুগে ইউরোপে চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের ভেতর দিয়ে, তা কিন্তু ধর্ম বস্তুটাকে বরাবর পাশ কাটিয়ে যেতে আগ্রহী। এই জাতের ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের প্রতিদিনের জীবন ধারাকে অর্থ, কাম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার গহ্বরে ঠেলে দেয়। এগুলো আমাদের জীবনে প্রয়োজন আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু ধর্মের প্রতি উদাসীনতার এই সেকুলারিজম আমাদের সুকুমারবৃত্তি ও প্রবণতাগুলোকে ভোগবাদের দিকে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি, যে সমাজ, যে রাষ্ট্র এই সেকুলারিজমকে সারকথা বলে গ্রহণ করতে চায়, তা কিন্তু অনায়াসে হয়ে উঠতে পারে দুর্নীতির, প্রতারণাজাত কার্যসিদ্ধির, ও সমবেত চরিত্র হননের মাধ্যমে। ধর্ম না থাকলে নীতির খুঁটি মজবুত হয় না। পশ্চিমের ইঙ্গিতে আমাদের কালের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরিণতি যে আমাদের কারও কাছেই আদর্শ স্থানীয় হয়ে উঠতে পারেনি তা তো চোখের সামনেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে আধুনিকতার শক্তির পিছনে যে প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে তাকেই একালে আমরা ভেবে নিয়েছি সর্বশক্তিমান হিসেবে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহর সর্বশক্তিমানত্ব নিয়ে আমাদের সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে তৈরি করছে এক ধরনের ঔদ্ধতা। অন্যদিকে ধর্ম বলছে, মানুষ প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ করে বটে, কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার আল্লাহ প্রদত্ত। এই অনুভূতি মানুষকে নম্র ও বিনয়ী করে তোলে । আজকের সেকুলার শিক্ষা তাই কতকটা ঔদ্ধত্য ও দুর্বিনীত করে তোলার শিক্ষাও বটে । আধুনিকতার এই রূপের দিকে ইঙ্গিত করেই বোধ হয় ইয়েটস লিখেছিলেনঃ Things fall apart, the centre can not hold আমাদের দেশে কলোনীর সময় চালু হয়েছিল সেকুলার শিক্ষা। সেই শিক্ষার সুবাদে আমাদের এখানে অনেকেই সমাজের নানা স্তরে নানানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, কিন্তু পশ্চিমের নীতি ও দর্শনের কবলে পড়ে তাদের মাথা একরকম ধোলাই হয়ে গেছে। তারা এখন নিজেদের ধর্ম, রাষ্ট্র সমাজকেও ঐ পশ্চিমের চোখ দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এই রকমভাবে দেখার ফলে সমাজের প্রকৃত ছবিটা তাদের চোখে ধরা পড়ে না। সমাজের মূল স্রোত থেকে দূরে তারা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অবস্থান করেন এবং এখান থেকেই তারা পুরে সমাজটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। আর তখনই সমাজে শুরু হয় নানা রকমের বিশৃঙ্খলা।
অন্যদিকে আছে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তার অনুসারীরা। এই দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা দুটি জীবন দর্শনের প্রতীক । দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে এ দুটি ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশ। তাই স্বভাবতই দুটি ভিন্ন দর্শনাশ্রিত মানুষের লক্ষ্যও অভিন্ন হতে পারে না। মুসলিম দুনিয়ায় এ দুটি পরস্পরবিরোধী মতানুসারীরা আজ রীতিমতো দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। আলী আশরাফ সাহেবের ভাষায় : the two systems are creating conflicting groups who have already started fighting among themselves.৬
একালের সেকুলারিস্ট ও ইসলামপন্থীদের এই দ্বন্দ্ব কোন কোন ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। এ অনেকটা সাম্প্রদায়িক সমস্যার মতো। ইউরোপে ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্টদের লড়াই কিংবা উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের চেয়ে এর তীব্রতা আজকাল কোনো অংশেই কম নয় । এই বিভেদ-বিভাজনের নীতি পুরো মুসলিম উম্মাহকে খণ্ডিত ও দুর্বল করে ফেলছে। সাম্রাজ্যবাদের বড় সাফল্য হচ্ছে মুসলিম সমাজের এই আদর্শিক বিভাজন। যার প্রেক্ষাপটে আজ মুসলিম দেশগুলোর উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরকম একটা সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মুসলিম সমাজের আদর্শিক ঐক্য ও সংহতি দরকার। সেই ঐক্য ও সংহতি আসতে পারে এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে। কলোনীর চাপিয়ে দেয়া শিক্ষা ব্যবস্থা নয়, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বর্তমান চাহিদা ও আবেগকে নির্ভর করে এমন একটা ব্যবস্থার বিকাশ হওয়া দরকার যাতে যুগের প্রয়োজন যেমন মিটবে, তেমনি জনগণের আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রবৃদ্ধির দিকটাও যথার্থ অর্থে প্রতিফলিত হবে। এ কারণেই আলী আশরাফ সাহেব শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে প্রযুক্তির মানবিকীকরণের কথা বলছেন। শুধুমাত্র প্রাযুক্তিক জ্ঞান মানুষকে দুর্বিনীত করে তোলার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে মানবীয় কল্যাণের পথে পরিচালিত হওয়া চাই। আলী আশরাফ সাহেব লিখেছেন :
It is an attitude which must be changed from being one which is totally technological, to one which restrains science and technology and redirects it as an instrument for moral benefit. The humanization of technology is possible only if man accepts the principle that he must worship his creator and not his own achievements, that he must live in harmony with nature and learn to control his passions and live without conflict or war or being swayed by policies of self-aggrandisement and love of power.৭
এমনি প্রেক্ষাপটে জ্ঞানের ইসলামীকরণের কথাটা এসেছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ইসলামীকরণের এই আন্দোলনে সৈয়দ আলী আশরাফ একালে অন্যতম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুসলিম দেশগুলোতে সেকুলার শিক্ষা কাজ করছে না, আর এ শিক্ষার ফলে মুসলিম উম্মাহ পরস্পরবিরোধী দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে। তাই এমন একটি শিক্ষা চাই যা শিক্ষার্থীর জীবনে, মননে, কর্মে ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নে ইসলামের মূল্যবোধকেই চূড়ান্ত বলে প্রতিষ্ঠিত করবে। যেহেতু সেকুলার শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ নয়, আমাদের আংশিক প্রয়োজনই মাত্র পূরণ করে, আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রগতির সম্ভাবনা যেহেতু এর মাধ্যমে অসম্ভব এবং সবচেয়ে বড় কথা এই শিক্ষার মাধ্যমে আমরা পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক গোলামীকে একরকম কবুল করে নিচ্ছি; তাই মুসলিম দুনিয়ার জন্য এ কোনো রকমই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই গোলামী থেকে মুক্তির স্পৃহার সঙ্গে যুক্ত আলী আশরাফের জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি জ্ঞানের ইসলামীকরণ, যার লক্ষ্য তার ভাষায় :
The aim of education, according to the Ummah in general, is to produce a good Muslim who is both cultured and expert – cultured in the sense that he knows how to use knowledge for his spiritual, intellectual, and material progress, and expert in the sense that he is a useful member of the community.৮
সৈয়দ আলী আশরাফের এই চেষ্টা নামকাওয়াস্তো ছিল না। ছিল অনেকখানি সংহত ও ফলপ্রসূ। শিক্ষার জন্য শুধু ক্যাম্পাস, দালানকোঠা কিংবা সুযোগ সুবিধার কথা না বলে তিনি কার্যকর অর্থেই ইসলামী কারিকুলাম তৈরি, টেক্সটবুক প্রণয়ন এবং ইসলামী নীতির আলোকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর উপর কাজ করেছিলেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন এই সমস্ত প্রাথমিক ও মৌলিক কাজগুলো সুসম্পন্ন না করা গেলে ইসলামী শিক্ষার ধারণা কার্যকরী করা কঠিন হবে। ইসলামী শিক্ষা তারাই দিতে পারবেন যাদের অন্তর ও মন একই সাথে ইসলামী নীতির আলোয় উজ্জীবিত, অন্যদিকে জ্ঞানের বিশেষ শাখায় যাদের থাকবে যথেষ্ট দখল ও কর্তৃত্ব। শুধুমাত্র কুরআন ও হাদিস, জ্ঞানার্জনের উপর জোর দিয়েছে এই কারণে সব জ্ঞানই ইসলামী হয়ে উঠবে এমন ভাবা যেমন অমূলক তেমনি কোন প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারোপযোগিতা বাড়ালেই সেটি ইসলামী রং ধারণ করবে সেটিও তেমনি ভুল। আল আশরাফ সাহেব বলেছেন আজকের মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের নানা রকম জ্ঞানের বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করতে হবে শুধুমাত্র তা গ্রহণ বা অন্ধ অনুকরণ করে নয় বরং তার যথাযথ সমালোচনা দরকার গ্রহণ বর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট ইসলামী নীতিমালার ভিতর। যখন এই বিষয়টি মাথায় রেখে কোন বিষয় নিয়ে টেক্সট রচনা করা যাবে তখনই তা কেবলমাত্র ইসলামী হয়ে উঠতে পারে। এই প্রক্রিয়া ছাড়া মুসলিম বিশ্বের শিক্ষায়তনগুলো নামসর্বস্ব ইসলামী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। এর বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্তর্গত ব্যতীত ভবিষ্যৎ প্রজনের জন্য এখান থেকে সত্যিকারের মুসলিম বেরিয়ে আসবে না।
পাঁচ
ইনানী বুদ্ধিজীবী সৈয়দ হোসাইন নসর সৈয়দ আলী আশরাফের এই সব কাজকে বলেছেন “Intellectual Jihad”- “বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ”।৯ ঐ প্রকৃত অর্থেই একালের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের এই জিহাদ ছাড়া গত্যন্তর নেই এবং এটি ছাড়া মুসলিম বিশ্বের ভাগ্যও ফেরানো সম্ভব নয়। আলী আশরাফ সাহেব নিজের জীবনে, কাজে ও কর্মে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের জন্য এই নমুনা সৃষ্টি করে গেছেন। তার শিক্ষা দর্শনভিত্তিক ব্যবস্থাপনাগুলো মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের জন্য এখনো উজ্জ্বল পথের ইশারা দিয়ে চলেছে। আলী আশরাফ সাহেব মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এই বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে আধুনিক পশ্চিমী জ্ঞানের মূলে যে দার্শনিক রয়েছে তার প্রাচীর ভাঙ্গা যাবে না। আজকের পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিদ্যার কথা তিনি বলেননি। তিনি বলেছেন, ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি ও এর শিক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে একটি নতুন পৃথিবী নির্মাণের, যেখানে বস্তুগত অগ্রগতি, নতুন ধরনের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আহরণ ও যুক্তিবাদী ব্যবস্থার পাশাপাশি আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানের প্রতি বাধ্যবাধকতাও থাকবে। এ ক্ষেত্রে তিনি ইমাম গাজ্জালীর পথ অনুসরণ করার পক্ষপাতী ও মানুষের কল্যাণের জন্য জ্ঞানের উৎস বিশ্বাসের পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরী বলে মনে করেছেন।
নবজাগরণের এই বিবেকী পথিকৃৎ ও বিদ্রোহী তাই রাষ্ট্রের কথা ভাবেননি, সাম্রাজ্যবাদের তোয়াক্কা করেননি। তিনি ভেবেছেন তার উম্মাহর মুক্তির কথা, স্বপ্নের কথা। সেই অর্থে তিনি একজন বিশ্বনাগরিকতাবাদীও বটে। ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি তাকে হাত ধরে নিয়ে গেছে ক্ষুদ্রতর গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতার বৃত্তে। এইভাবেই তিনি বিশ্বের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তুলবার চেষ্টা করেছেন এবং সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছেন যা মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, আর এক গোলামীর শিকলে বেঁধে ফেলে। সৈয়দ আলী আশরাফ এখানেই একটি পথের নির্দেশ রেখে গেছেন একালের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের জন্য।
গ্রন্থঋণঃ
- ১. বরেণ্য : সৈয়দ আলী আশরাফ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা : মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ মিয়া ও অন্যান্য । ঢাকা : দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৯ ।
- ২ ইশরাফ হোসেনকে দেয়া সৈয়দ আলী আশরাফের সাক্ষাৎকার । উদ্ধৃত ঃ বরেণ্য : সৈয়দ আলী আশরাফ স্মারকগ্রন্থ।
- ৩. সৈয়দ আলী আশরাফ, সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা। ঢাকা : শিল্পতরু প্রকাশনী, ১৯৯১।
- ৪. সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতার ভূমিকা ।
- ৫. Syed Ali Ashraf, New Horizons in Muslim Education. Cambridge : Hodder And Stoughton, 1985.
- ৬. প্রাগুক্ত।
- ৭. প্রাগুক্ত।
- ৮. প্রাগুক্ত।
- ৯. Forward, New Horizons in Muslim Education by Syed Hossein Nasr.


