আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে জ্ঞান শুধুমাত্র তথ্য উপাত্তে, এই তথ্য উপাত্ত আবার বিনোদনের সেক্টরে পরিণত হয়েছে এবং দিন যত গড়াচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব যেন তথ্যের প্রাচুর্যে আচ্ছন্ন এক নতুন মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের আখলাক নিয়ে আলোচনা অধিক জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে অনেক বেশী জ্ঞানী হওয়া মানেই অনেক বেশী আখলাক সম্পন্ন ও মর্যাদাবান হওয়া বুঝায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আকলের মত একটি নিয়ামত খারাপভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিগত শতাব্দীতে যে অগ্রগতি হয়েছে তা শান্তি নয়, যুদ্ধ ও সন্ত্রাস ডেকে এনেছে। এর পাশাপাশি ভোগের প্রবণতা, স্বার্থপরতা এবং লালসতার সীমানা যেন ছাড়িয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে আখলাকবিহীন জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষকে কতটা সুখ ও শান্তি দিতে সক্ষম এটা নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো, এই সংকট কেবল পাশ্চাত্যের সেকুলার জ্ঞানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; দ্বীনি জ্ঞানের পরিমণ্ডলেও তা সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দ্বীনি জ্ঞানের উদ্দেশ্যই হল আখলাক ও মূল্যবোধ তৈরি করা। অতীতের তুলনায় ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি, ধর্মীয় ধারার প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব কতটুকু পড়ছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। এসব বিষয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও আমাদের সমাজের আখলাকী অবস্থা আজ কেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে? আমরা ভালোভাবেই জানি- অর্থহীন, ফায়দাহীন ও বেহুদা বিতর্ক কোনো সমাজ বা সভ্যতাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। বিশেষত দ্বীনের শাখা-প্রশাখা নিয়ে অযথা বিতর্ক মানুষের আখলাকী ও নৈতিক মানোন্নয়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
প্রতিটি দ্বীনি হুকুমেরই একটি ফিকহী দিক এবং একটি আখলাকী দিক রয়েছে। ফিকহী দিকটি মানুষের বাহ্যিক জগত এবং আখলাকী দিক মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতকে বিনির্মাণ করে থাকে। ইলমুল উসূলের ভাষায় ফিকহী দিকটি ইল্লতের উপর আর আখলাকী দিকটি গায়ে ইল্লতের (উদ্দেশ্য) উপর নির্ভর করে থাকে। এই অর্থে আখলাক হলো উদ্দেশ্য, ফিকহ হলো ওসিলা। ওসিলা ছাড়া উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতে পারে না। তবে উদ্দেশ্য যদি হারিয়ে যায় তাহলে ওসিলা কোন অর্থ বহন করে না।
অপরদিকে আখলাকের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হলো ইখতিলাফের আখলাক। মাকসাদ এক হলেও যদি কোন একটি বিষয়ের সমাধানের জন্য ব্যবহৃত পথ এবং পন্থা ভিন্ন হলে সেটাকে ইখতিলাফ বলা হয়ে থাকে। মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের জন্য ইখতিলাফ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে যে চিন্তা আকলে সালিমের বিপরীত এবং উম্মাহকে মেরুকরণের দিকে নিয়ে যায় সেটাকে খিলাফ বলা হয়ে থাকে। ইখতিলাফ হয়ে থাকে ফিকির বা চিন্তার মধ্যে আর খিলাফ হয়ে থাকে ব্যক্তির মধ্যে। ইখতেলাফ করা হয়ে থাকে দলীল এবং সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর ভিত্তি করে আর খিলাফ হয়ে থাকে ধারণার উপর ভিত্তি করে।
ফলশ্রুতিতে যেকোনো বিষয়ে ইখতিলাফ হতেই পারে এটাকে স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে নিতে হবে। তবে এ ইখতিলাফ যেনো খিলাফে রূপান্তরিত না হয় ও বিভেদ সৃষ্টি না করে সেই দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। মতামত দেওয়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে আমি ভুল করতে পারি, তাই আমার মতকে যেনো একমাত্র সত্য হিসেবে তুলে না ধরি। আমাদের ব্যক্তিগত তর্ক-বিতর্ককে জ্ঞানগত বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। যাদের সাথে ইখতিলাফ করা হয়, তাদের নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা তা অনুধাবনের চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এসব বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিপরীত পক্ষের কাউকে বিদয়াতপন্থী ও ভ্রান্ত বলে দোষারোপ না করা এবং কখনোই তাকফীর করার চেষ্টা না করা।
উপরোল্লিখিত বিষয়সমূহ থেকে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ফিকহকে আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন করার ফলে এবং ইখতিলাফের আখলাককে না মানার কারণে বর্তমানে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন হলো আহকাম ও আখলাকের সম্পর্ককে নতুন ভাবে বিশ্লেষণ করা এবং ‘আখলাক হলো আহকামের আকল’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে এই সম্পর্কে নতুন এক মাত্রা যোগ করা। আখলাক ও আহকামের সম্পর্ককে এ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিন্যাস করতে হলে আখলাককে মাকাসিদের একটি মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ফলশ্রুতিতে উসূলে ফিকহের মত আচরণকে আখলাকে রূপান্তরকারী মূল্যবোধের পদ্ধতি ও ক্রমধারাকে নতুন করে বিন্যাস করবে এমন একটি উসূলে আখলাকের বিকাশ সাধন অতীব জরুরী।
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন আজাদ।


