“আয় মাহে রমজান, আল-বেদা”-“আয় মাহে রমজান, আলবেদা”-প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শুনেছি-তবু আজো রমজানের মাসে মাঝে মাঝে কানে বেজে উঠে আয় মাহে রমজান, আলবেদা-আয় মাহে রমজান, আলবেদা!

বাড়ীর সংলগ্ন আমবাগ; সেই আমবাগে গাঁয়ের ছোট মছজিদ; রোজার মাসে তারাবীর নামাজে গাঁয়ের মুছল্লীরা ভেঙ্গে পড়ত। ইমামতী করতেন মুনশী কছিমুদ্দীন সাহেব। অমন বিনয় নম্র ব্যবহার, অমন হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি আর কোথাও দেখি নাই; অমন ভক্তি গদগদ অমৃতবর্ষী কেরায়াত আর কোথাও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। শরীয়তের শাসনের জন্য তিনি কাউকে কখনও জামাতে আটকে দেন নাই, কারো বিবি তালাকের ফতোয়া জারি করেন নাই। কারো পীঠে কখনো দোররা মারার হুকুমের কথা ভাবেন নাই। অথচ গাঁয়ের ছোট-বড় সবাই বিনা প্রতিবাদে তাঁর কথা মেনে চলত।

সে আমবাগানে ছিল বহু-বহুকালের পুরানো গাছ-আম, গাব, বট। আম গাছের গায় সুরুঙ, গাব গাছের গায় গোদ, বটের জটে মছজিদের লাগ বহু স্থান রেখেছিল ছেয়ে। মছজিদের চারপাশে ছিল নতুন-পুরাতন অগণ্য কবর। আর আমার মনে ছিল তখন বাল্যের অপার বিশ্বাস: দুনিয়ার কোন বিস্ময়ই এ বিশ্বাসকে হার মানাতে পারত না। এই মায়াময় পরিবেশে অবস্থিত মছজিদে দাঁড়িয়ে যখন মুনশী সাহেব তাঁর সুন্দর গম্ভীর ছন্দোময়ী কণ্ঠে উচ্চারণ করতেন, ‘আয় মাহে রমজান, আলবেদা’, ‘আয় মাহে রমজান, আলবেদা’, তখন বুঝতাম না কিছুই, অথচ কি একটি প্রিয় বস্তু হারানোর অজ্ঞাত বেদনায় মন টন টন করে উঠত।

কিন্তু রমজানকে কেন এই বেদনাময়ী সম্ভাষণ? উপবাসের মাস-এই মাস চলে যাচ্ছে, এতো স্বাভাবিক অবস্থায় খুশী হওয়ারই কথা ছিল। সে খুশীর বদলে মুছলমানের কণ্ঠে এ ব্যথার বাণী কেন?

ব্যক্তির জীবনে, প্রাচুর্যের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রাচুর্য সব সময়ে সম্পদ নয়; প্রাচুর্যে বিপদও আছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচুর্য হতে আসে বিলাস, বিলাস হতে আসে ব্যাসন। সে বিলাস-ব্যাসনে অবশেষে মন ভেঙ্গে পড়ে, আত্মা হাঁপিয়ে উঠে। তাই প্রাচুর্যের আপদকে শাসনে রাখার জন্য প্রয়োজন সংযমের। সাময়িক উপবাস সেই সংযম অনুশীলনের অন্যতম পথ। বেশী খেয়ে পেটের অসুখ ঘটিয়ে বসলে যে চিকিৎসক খানাপিনার ব্যাপারে লঙ্ঘন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই একই শ্রেণীর কারণে এ উপবাসের ব্যবস্থা। এ হিসাবে রমজানের রোজা মানুষের দুর্বল মনে নতুন শক্তির সঞ্চার করে, তার পীড়িত আত্মাকে দেয় শান্তি। ব্রত হিসাবে, সৎ কাজের সহায়ক হিসাবে স্বেচ্ছায় উপবাসকে বরণ করে নিলে মনে যে অপূর্ব শক্তির সৃষ্টি হয়, একথা বহু ধর্মের বহু মনীষী অকুণ্ঠ কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। সেই জন্য রমজান মাসের শেষ শুক্রবারে স্থানীয় মুছলমানেরা জুমা মছজিদে সমবেত হয়ে মাতমের সুরে তাদের বেদনা জ্ঞাপন করে:

আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া শাহরাল কোরআন,
আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া আমমারাল কুলুব
আলবেদা-আলবেদা, ইয়া শাহরা রমজান।

(হে কোরানের পবিত্র মাস, তোমায় সালাম।
হে হৃদয় শক্তি সঞ্চয়কারী মাস তোমায় সালাম,
বিদায়… বিদায় হে মাহে রমজান!)

রমজান সংযমের মাস। খাঁটি মুছলমান রমজানের প্রথমেই সংকল্প করে: আমি ষোল আনা রোজা রাখব দেহের রোজা, মনের রোজা, চোখের রোজা, মুখের রোজা। মানুষের দিলকে সাফ করবার জন্য এই যে নিয়ত, এই যে কোশেশ, এ রমজানের মাসকে এক বিরাট মর্যাদা দান করেছে। তাই রছুলুল্লাহ বলেছেন, রমজানের আগমনে বেহেস্তের দুয়ার খুলে যায়, আর দোজখের দুয়ার সব রুদ্ধ। আর এই জন্যই জুমুয়াতুল বেদার দিনে মুছল্লীরা হাজির হয়ে বার বার উচ্চারণ করে:

আচ্ছালামু আলায়কা ইয়া শাহরাল মাগফেরাতে ওয়াল আতকে মিনান্নিরান। ‘হে ক্ষমা ও দোজখ হতে বাঁচার মাস, তোমায় সালাম!’

মানুষের জীবনে যত বড় দুঃখ ঘটতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে অনশনের দুঃখ। অনশনের জ্বালায় ধার্মিক খোদাকে অভিশাপ দেয়, জননী সন্তানকে বিক্রি করে, সতী নারী পরকে দেহদান করে, কেউ বা গলায় দড়ি দিয়ে এত প্রিয় যে জীবন তাকেও ত্যাগ করে। এত বড় যে দুঃখ তাও প্রতিবেশী ধনীরা নিজ চোখে দেখেও সব সময় বোঝে না; কারণ জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তো তারা কখনো এ দুঃখ অনুভব করে নাই। আব্রাহাম লিঙ্কন গরীবের ঘরে জন্মেছিলেন, গরীবের দুঃখ-বেদনার খবর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই দুস্থ জনগণের কল্যাণে তিনি তাঁর দেশের ধনী ও প্রতিপত্তিশালী অভিজাতদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম ঘোষণা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ধনীর ঘরে যারা জন্মলাভ করে যুগে যুগে দেশে দেশে প্রধানত তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভুত্ব শক্তি পরিচালনা করে আসছে। এরা যদি দুস্থজনগনের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন না হয়, তবে সে দুস্থদের কল্যাণমূলক কাজ এদের দিয়ে সম্যকরূপে সম্পন্ন হওয়ার তো কথা নয়। এ ধনী সন্তানেরা নিজেরা যদি অনশন করে, তবেই অনশন পীড়িতদের প্রতি এদের যথোপযুক্ত সহানুভূতি হওয়ার একটা সঙ্গত সম্ভাবনা ঘটে।

জঠর জ্বালা কি, এ যারা না জানে, রমজানের রোজা তাদেরে সেই শিক্ষা দেয়। জনগণের দুঃখ নিজ জীবন দিয়ে বুঝবার জন্য গান্ধীজী চলতেন রেল-স্টীমারের তৃতীয় শ্রেণীতে, কাপড় পরতেন হাঁটু পর্যন্ত। জনগণের দুঃখ বুঝবার জন্য তাদের সঙ্গে কার্যগত সহানুভূতি সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য মহানবী তাঁর মদীনা জীবনের ঐশ্বর্যের দিনেও অনেক সময়ই তাঁর ক্ষুধার্ত পেটে বেঁধে রাখতেন নিষ্করুণ পাথর। তিনি বলতেন-রোজ হাসরে আমি এই দুস্থদের সঙ্গেই উত্থান করব। দুস্থ মানবতার জন্য এই যে গভীর মহিমাময় দরদ, রমজান মানুষকে তারই মন্ত্রে দীক্ষা দিতে চেষ্টা করে।

মানুষের দুঃখ বুঝবার জন্য রমজানের সাহায্যে এই যে প্রস্তুতি, আল্লার পথের যারা সত্যিকার পথিক, তারা এই সুযোগকে মনে করে আল্লার তরফ হতে এক পরম নেয়ামত। রমজান শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে, এ নেয়ামতের পথ হয়ে যাবে রুদ্ধ, একথা ভেবে তারা হয়ে পড়ে আকুল। তাই তারা এ মহান সুযোগের সম্ভাবিত অবসানের ব্যথায় অধীর হয়ে মছজিদে সমবেত হয়। কোন জাতীয় বিপদ ঘটলে যেমন সবাই মিলে দুঃখ করে, রোজাদারেরাও তেমনি সবাই সকরুণ স্বরে বলতে থাকে-

বিদায়-বিদায়-হে বন্ধু রমজান, বিদায়:
আলবেদা আলবেদা,
আয় মাহে রমজান,
আলবেদা।*

 

[*রেডিও পাকিস্তানের সৌজন্যে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত “ইব্রাহিম খাঁ রচনাবলী-১” থেকে সংগৃহীত।]

১০ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ (১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ – ২৯ মার্চ ১৯৭৮) ছিলেন উপমহাদেশের এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক ও রাজনীতিবিদ। তিনি বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রতিনিধি, যাঁর জীবন ও সাহিত্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষা, সংস্কার ও মানবকল্যাণের আদর্শের সঙ্গে।

ইব্রাহীম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন টাঙ্গাইল জেলার তৎকালীন ভুঞাপুর থানার অন্তর্গত বিরামদী (বর্তমান শাবাজ নগর) গ্রামে, এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। তাঁর পিতার নাম শাহবাজ খাঁ এবং মাতার নাম রতন খানম। শৈশব থেকেই তিনি মেধা, অধ্যবসায় ও নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন।

শিক্ষা ও কর্মজীবন

১৯০৬ সালে তিনি জামালপুরের সরিষাবাড়ি পিংনা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে সেখান থেকে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি এই বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাস করা প্রথম মুসলমান ছাত্র ছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এফ.এ এবং ১৯১৬ সালে কলকাতার সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১৯ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন। পাশাপাশি তিনি আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন (১৯১৮)।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি করটিয়া ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯২৬ সালে দানবীর ওয়াজেদ আলী খাঁ পন্নীর আর্থিক সহায়তায় করটিয়া সাদত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। তৎকালীন যুক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম কলেজ প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে এই কলেজ একসময় ‘বাংলার আলীগড়’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই দীর্ঘ অধ্যক্ষতা-জীবনই তাঁকে ‘প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ’ নামে সর্বাধিক পরিচিত করে তোলে।

১৯২৪ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে ময়মনসিংহ জজকোর্টে ওকালতি শুরু করেন, তবে সততার সঙ্গে আইন পেশা পরিচালনা করা কঠিন মনে হওয়ায় দু’বছরের মধ্যেই তিনি তা পরিত্যাগ করেন এবং সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা

ইব্রাহীম খাঁ ব্রিটিশ শাসনামলে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে (১৯২০–২২) সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমদিকে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে মধুপুর-গোলাপপুর কেন্দ্র থেকে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হন।

তিনি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভুঞাপুর হাই স্কুল, ভুঞাপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভুঞাপুর কলেজ ও করটিয়া জুনিয়র গার্লস মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা তাঁর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাহিত্যকর্ম

ইব্রাহীম খাঁ মূলত একজন সমাজসচেতন লেখক। তাঁর সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুসলিম সমাজের নবজাগরণ, শিক্ষা-সংস্কার ও নৈতিক উন্নয়ন। তিনি প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী, শিশুসাহিত্য, পাঠ্যবই ও অনুবাদ- সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় অবাধ বিচরণ করেছেন।

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১১৮টি। এর মধ্যে বাংলা ভাষায় মৌলিক গ্রন্থ প্রায় ৮৮টি, ইংরেজিতে লেখা ১২টি এবং অনুবাদ গ্রন্থ ১৮টি। তাঁর ভাষা সহজ, সরল ও সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য—তিনি জনগণের জন্য জনগণের সাহিত্য রচনায় বিশ্বাস করতেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ
  • নাটক: কামাল পাশা, আনোয়ার পাশা, ঋণ পরিশোধ, ভিস্তি বাদশা, কাফেলা
  • উপন্যাস: বৌ বেগম
  • গল্পগ্রন্থ: আলু বোখরা, উস্তাদ, দাদুর আসর, মানুষ, হীরক হার
  • স্মৃতিকথা: বাতায়ন
  • ভ্রমণকাহিনী: ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র, নয়া চীনে এক চক্কর
  • শিশুসাহিত্য: ব্যাঘ্র মামা, শিয়াল পণ্ডিত, নিজাম ডাকাত, ছেলেদের শাহনামা
  • ধর্ম ও শিক্ষা: মহানবী মুহাম্মদ, ইসলামের মর্মকথা, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

তাঁর ইংরেজিতে রচিত Anecdotes from Islam গ্রন্থটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এবং বহু ভাষায় অনূদিত।

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার

তাঁর সাহিত্য ও সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩) এবং একুশে পদক (১৯৭৬) লাভ করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সরকারের প্রদত্ত কয়েকটি খেতাব তিনি নীতিগত কারণে প্রত্যাখ্যান করেন- যা তাঁর দৃঢ় আদর্শবোধের পরিচায়ক।

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ ছিলেন মনে-প্রাণে একজন মানবতাবাদী, সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাব্রতী। মুসলিম সমাজের অধঃপতন থেকে উত্তরণের জন্য তিনি শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কারকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৯ মার্চ তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা, সাহিত্য ও আদর্শ আজও বাঙালি মুসলমান সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।

Picture of প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ (১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ – ২৯ মার্চ ১৯৭৮) ছিলেন উপমহাদেশের এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক ও রাজনীতিবিদ। তিনি বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রতিনিধি, যাঁর জীবন ও সাহিত্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষা, সংস্কার ও মানবকল্যাণের আদর্শের সঙ্গে।

ইব্রাহীম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন টাঙ্গাইল জেলার তৎকালীন ভুঞাপুর থানার অন্তর্গত বিরামদী (বর্তমান শাবাজ নগর) গ্রামে, এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। তাঁর পিতার নাম শাহবাজ খাঁ এবং মাতার নাম রতন খানম। শৈশব থেকেই তিনি মেধা, অধ্যবসায় ও নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন।

শিক্ষা ও কর্মজীবন

১৯০৬ সালে তিনি জামালপুরের সরিষাবাড়ি পিংনা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে সেখান থেকে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি এই বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাস করা প্রথম মুসলমান ছাত্র ছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এফ.এ এবং ১৯১৬ সালে কলকাতার সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১৯ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন। পাশাপাশি তিনি আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন (১৯১৮)।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি করটিয়া ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯২৬ সালে দানবীর ওয়াজেদ আলী খাঁ পন্নীর আর্থিক সহায়তায় করটিয়া সাদত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। তৎকালীন যুক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম কলেজ প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে এই কলেজ একসময় ‘বাংলার আলীগড়’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই দীর্ঘ অধ্যক্ষতা-জীবনই তাঁকে ‘প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ’ নামে সর্বাধিক পরিচিত করে তোলে।

১৯২৪ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে ময়মনসিংহ জজকোর্টে ওকালতি শুরু করেন, তবে সততার সঙ্গে আইন পেশা পরিচালনা করা কঠিন মনে হওয়ায় দু’বছরের মধ্যেই তিনি তা পরিত্যাগ করেন এবং সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা

ইব্রাহীম খাঁ ব্রিটিশ শাসনামলে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে (১৯২০–২২) সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমদিকে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে মধুপুর-গোলাপপুর কেন্দ্র থেকে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হন।

তিনি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভুঞাপুর হাই স্কুল, ভুঞাপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভুঞাপুর কলেজ ও করটিয়া জুনিয়র গার্লস মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা তাঁর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাহিত্যকর্ম

ইব্রাহীম খাঁ মূলত একজন সমাজসচেতন লেখক। তাঁর সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুসলিম সমাজের নবজাগরণ, শিক্ষা-সংস্কার ও নৈতিক উন্নয়ন। তিনি প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী, শিশুসাহিত্য, পাঠ্যবই ও অনুবাদ- সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় অবাধ বিচরণ করেছেন।

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১১৮টি। এর মধ্যে বাংলা ভাষায় মৌলিক গ্রন্থ প্রায় ৮৮টি, ইংরেজিতে লেখা ১২টি এবং অনুবাদ গ্রন্থ ১৮টি। তাঁর ভাষা সহজ, সরল ও সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য—তিনি জনগণের জন্য জনগণের সাহিত্য রচনায় বিশ্বাস করতেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ
  • নাটক: কামাল পাশা, আনোয়ার পাশা, ঋণ পরিশোধ, ভিস্তি বাদশা, কাফেলা
  • উপন্যাস: বৌ বেগম
  • গল্পগ্রন্থ: আলু বোখরা, উস্তাদ, দাদুর আসর, মানুষ, হীরক হার
  • স্মৃতিকথা: বাতায়ন
  • ভ্রমণকাহিনী: ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র, নয়া চীনে এক চক্কর
  • শিশুসাহিত্য: ব্যাঘ্র মামা, শিয়াল পণ্ডিত, নিজাম ডাকাত, ছেলেদের শাহনামা
  • ধর্ম ও শিক্ষা: মহানবী মুহাম্মদ, ইসলামের মর্মকথা, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

তাঁর ইংরেজিতে রচিত Anecdotes from Islam গ্রন্থটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এবং বহু ভাষায় অনূদিত।

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার

তাঁর সাহিত্য ও সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩) এবং একুশে পদক (১৯৭৬) লাভ করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সরকারের প্রদত্ত কয়েকটি খেতাব তিনি নীতিগত কারণে প্রত্যাখ্যান করেন- যা তাঁর দৃঢ় আদর্শবোধের পরিচায়ক।

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ ছিলেন মনে-প্রাণে একজন মানবতাবাদী, সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাব্রতী। মুসলিম সমাজের অধঃপতন থেকে উত্তরণের জন্য তিনি শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কারকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৯ মার্চ তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা, সাহিত্য ও আদর্শ আজও বাঙালি মুসলমান সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top