প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ (১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ – ২৯ মার্চ ১৯৭৮) ছিলেন উপমহাদেশের এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক ও রাজনীতিবিদ। তিনি বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রতিনিধি, যাঁর জীবন ও সাহিত্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষা, সংস্কার ও মানবকল্যাণের আদর্শের সঙ্গে।

ইব্রাহীম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন টাঙ্গাইল জেলার তৎকালীন ভুঞাপুর থানার অন্তর্গত বিরামদী (বর্তমান শাবাজ নগর) গ্রামে, এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। তাঁর পিতার নাম শাহবাজ খাঁ এবং মাতার নাম রতন খানম। শৈশব থেকেই তিনি মেধা, অধ্যবসায় ও নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন।

শিক্ষা ও কর্মজীবন

১৯০৬ সালে তিনি জামালপুরের সরিষাবাড়ি পিংনা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে সেখান থেকে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি এই বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাস করা প্রথম মুসলমান ছাত্র ছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এফ.এ এবং ১৯১৬ সালে কলকাতার সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১৯ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন। পাশাপাশি তিনি আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন (১৯১৮)।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি করটিয়া ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯২৬ সালে দানবীর ওয়াজেদ আলী খাঁ পন্নীর আর্থিক সহায়তায় করটিয়া সাদত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। তৎকালীন যুক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম কলেজ প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে এই কলেজ একসময় ‘বাংলার আলীগড়’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই দীর্ঘ অধ্যক্ষতা-জীবনই তাঁকে ‘প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ’ নামে সর্বাধিক পরিচিত করে তোলে।

১৯২৪ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে ময়মনসিংহ জজকোর্টে ওকালতি শুরু করেন, তবে সততার সঙ্গে আইন পেশা পরিচালনা করা কঠিন মনে হওয়ায় দু’বছরের মধ্যেই তিনি তা পরিত্যাগ করেন এবং সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা

ইব্রাহীম খাঁ ব্রিটিশ শাসনামলে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে (১৯২০–২২) সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমদিকে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে মধুপুর-গোলাপপুর কেন্দ্র থেকে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হন।

তিনি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভুঞাপুর হাই স্কুল, ভুঞাপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভুঞাপুর কলেজ ও করটিয়া জুনিয়র গার্লস মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা তাঁর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাহিত্যকর্ম

ইব্রাহীম খাঁ মূলত একজন সমাজসচেতন লেখক। তাঁর সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুসলিম সমাজের নবজাগরণ, শিক্ষা-সংস্কার ও নৈতিক উন্নয়ন। তিনি প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী, শিশুসাহিত্য, পাঠ্যবই ও অনুবাদ- সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় অবাধ বিচরণ করেছেন।

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১১৮টি। এর মধ্যে বাংলা ভাষায় মৌলিক গ্রন্থ প্রায় ৮৮টি, ইংরেজিতে লেখা ১২টি এবং অনুবাদ গ্রন্থ ১৮টি। তাঁর ভাষা সহজ, সরল ও সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য—তিনি জনগণের জন্য জনগণের সাহিত্য রচনায় বিশ্বাস করতেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ

  • নাটক: কামাল পাশা, আনোয়ার পাশা, ঋণ পরিশোধ, ভিস্তি বাদশা, কাফেলা
  • উপন্যাস: বৌ বেগম
  • গল্পগ্রন্থ: আলু বোখরা, উস্তাদ, দাদুর আসর, মানুষ, হীরক হার
  • স্মৃতিকথা: বাতায়ন
  • ভ্রমণকাহিনী: ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র, নয়া চীনে এক চক্কর
  • শিশুসাহিত্য: ব্যাঘ্র মামা, শিয়াল পণ্ডিত, নিজাম ডাকাত, ছেলেদের শাহনামা
  • ধর্ম ও শিক্ষা: মহানবী মুহাম্মদ, ইসলামের মর্মকথা, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

তাঁর ইংরেজিতে রচিত Anecdotes from Islam গ্রন্থটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এবং বহু ভাষায় অনূদিত।

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার

তাঁর সাহিত্য ও সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩) এবং একুশে পদক (১৯৭৬) লাভ করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সরকারের প্রদত্ত কয়েকটি খেতাব তিনি নীতিগত কারণে প্রত্যাখ্যান করেন- যা তাঁর দৃঢ় আদর্শবোধের পরিচায়ক।

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ ছিলেন মনে-প্রাণে একজন মানবতাবাদী, সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাব্রতী। মুসলিম সমাজের অধঃপতন থেকে উত্তরণের জন্য তিনি শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কারকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৯ মার্চ তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা, সাহিত্য ও আদর্শ আজও বাঙালি মুসলমান সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।

৩টি লেখা
সমাজ ও সংস্কৃতি

জুমুয়াতুল বেদা

"আয় মাহে রমজান, আল-বেদা"-"আয় মাহে রমজান, আলবেদা"-প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শুনেছি-তবু আজো রমজানের মাসে মাঝে মাঝে কানে বেজে উঠে আয় মাহে রমজান, আলবেদা-আয় মাহে রমজান, আলবেদা! বাড়ীর সংলগ্ন আমবাগ; সেই আমবাগে গাঁয়ের ছোট মছজিদ; রোজার মাসে তারাবীর নামাজে গাঁয়ের মুছল্লীরা…

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ
সংস্কৃতি

ইসলাম ও সংস্কৃতি

ইসলাম ও সংস্কৃতি- এ দুটি শব্দ পাশাপাশি উচ্চারণের মধ্যে সন্দেহ সংঘাতের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের সন্ধান পাওয়া যায়। ভাবটা এই রকমঃ…

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ
অনুদান দিন
Scroll to Top