আমরা যখন সমগ্র বিশ্বে ওয়াসাতিয়্যাহ-এর আলোকে পৃথিবী বিনির্মাণ ও খিলাফতের দায়িত্ব পালন করার কথা বলবো, তখন অবশ্যই জিহাদ ও কিতালের মধ্যকার পার্থক্য আমাদের জানা থাকতে হবে।

বর্তমান বিশ্বের এ প্রেক্ষাপটে জিহাদ ও কিতালের বিষয়টি অনেক তরুণের মনেই বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। এমনকি আমরাও অনেক সময় জিহাদ ও কিতালের মধ্যে গুলিয়ে ফেলি। আমরা মনে করি, জিহাদ একটি চূড়ান্ত বিষয়, অথচ বাস্তবে জিহাদ হচ্ছে একটি উপায়, উসিলা বা মাধ্যম, জিহাদ কোনো লক্ষ্য নয়। অর্থাৎ, কোনো একটি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য চালানো প্রাণান্তকর প্রতিটি প্রচেষ্টাই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।

আমাদের যুবসমাজ জিহাদ নিয়ে প্রধানত দু‘টি ভুল করে থাকে। যথা,

১. জিহাদকে কেবল যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা।

২. জিহাদকে একমাত্র গন্তব্য বা উদ্দেশ্য মনে করা।

অথচ, জিহাদের রয়েছে ১৩টি স্তর। আর কিতালের বিষয়টি জিহাদের ১৩টি স্তরের মধ্যে মাত্র একটি বা শেষ স্তর।

এটা অবশ্যই সত্য যে, আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সর্বোত্তম জিহাদ। কিন্তু, জিহাদের অন্যান্য স্তরগুলো হচ্ছে, পিতা-মাতার সেবা-শুশ্রীয়া করা, অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা, আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য করা ইত্যাদি। এছাড়াও নারীদের জন্য অন্যতম একটি জিহাদ হচ্ছে, সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে হজ্জ ও ওমরা আদায় করা। অর্থাৎ, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জিহাদ-সমৃদ্ধ জীবন অপরিহার্য, তবে এর মানে এই নয় যে, প্রত্যেকের জন্য কিতাল বা যুদ্ধ করা অপরিহার্য।

 

জিহাদের আরো কিছু স্তর হচ্ছে,

  • শিক্ষাগত জিহাদ – জ্ঞানার্জন ও প্রচার।
  • আধ্যাত্মিক জিহাদ – নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
  • গণমাধ্যম জিহাদ – লেখনী ও বক্তব্য প্রকাশ।
  • রাজনৈতিক জিহাদ – ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান।
  • তরবিয়তী জিহাদ – শিক্ষা ও প্রজন্ম গঠন।
  • সামাজিক ও কল্যাণমূলক জিহাদ – দরিদ্রদের সহায়তা, সমাজসেবা।
  • উন্নয়নমূলক জিহাদ – অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি।
  • সভ্যতাকেন্দ্রিক জিহাদ – মানবতার কল্যাণে সভ্যতা বিনির্মাণ।

মূলত, জিহাদ শুরু হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগ বা মক্কী যুগে; আর কিতালের হুকুম এসেছে মাদানী জীবনে গিয়ে। এছাড়াও জিহাদ থেকে কিতালে যাবার অনেকগুলো স্তরও রয়েছে। রাসূলের জীবনকে সামনে রেখে ইতিহাস থেকে দেখলে জিহাদ থেকে কিতালে যাবার কয়েকটি স্তর পাওয়া যায়। যেমন,

১. মক্কী জীবনের শুরুতে আল্লাহ সরাসরি যুদ্ধ নিষিদ্ধ করে ইবাদতের মাধ্যমে ঈমানী শক্তিকে দৃঢ় করতে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করতে বলেছেন। যেমন,

كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের হাতকে গুটিয়ে রাখো এবং সালাত কায়েম করো।

২. এরপর আল্লাহ তায়ালা কেবলমাত্র তাদেরকে অনুমতি দিয়েছিলেন, যারা অত্যাচারিত।

যেমন,

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا

অর্থাৎ যাদের জুলুম করা হয়েছে, তাদেরকেই কেবল যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো।

৩. যুদ্ধ ফরজ করা হলেও তা আবার অনেকের কাছে ছিলো অপছন্দনীয়। যেমন,

كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ

অর্থাৎ, তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তোমাদের অনেকেই তা অপছন্দ করছো।

৪. এক্ষেত্রে আল্লাহ সরাসরি যুদ্ধের নীতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যেমন,

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا

অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, নতুবা তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না।

এপর্যায়ে এসে আরেকটি ভুল ধারণা দূর করে দেওয়া প্রয়োজন যে, আমরা অনেকেই মনে করি, কিতালের বৈধতা দানকারী কারণটা হলো কুফর। অর্থাৎ কাফেরদের বিরুদ্ধে কিতালের বিধান প্রযোজ্য। অথচ, এ ধারণাটি কোনোভাবেই সঠিক নয়। কারণ, কিতালের বৈধতা দানকারী কারণটা কুফর নয়, বরং জুলুম ও আগ্রাসন। যেমন আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন,

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا

অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে; নতুবা তোমরা সীমালঘন করো না। (সূরা বাকারা ২:১৯০)

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ

অর্থাৎ, আর যদি কোনো মুশরিক তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তবে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর বাণী শোনে; তারপর তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও। (সূরা তাওবা ৯:৬)

কিতালের বৈধতা দানকারী কারণটা যে কুফর নয়, বরং জুলুম ও আগ্রাসন; এর প্রমাণ রাসূলের মাদানী জীবন থেকেও পাওয়া যায়। কেননা আমরা দেখি যে, রাসূল (স.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনা শহর/রাষ্ট্রটি দ্বীনি রাষ্ট্র হলেও সেখানে ইহুদী ও মুনাফিকরাও বসবাস করতো। এমনকি, নাজরানের খ্রিস্টানরা মদীনায় এসেও নিজেদের ধর্ম বজায় রাখতে পেরেছিলো। সেসময়টায় ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হতো হিকমত, আকল, বিবেক, প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে। এমনকি, এরপরেও যারা বিশ্বাস করেনি, তাদেরকে জোরপূর্বক তরবারির মুখে ইসলাম গ্রহণ করানো হয়নি। এমনকি আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন, “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা ২:২৫৬)

এ আয়াতটির হুকুম চিরন্তন। চরমপঞ্চীরা দাবি করে থাকে যে, এ আয়াতের হুকুম নাকি রহিত (নাসখ) হয়ে গেছে। অথচ এটি একটি ‘খবরী’ আয়াত, আর খবরী আয়াতে নাসখ হয় না। নাসখ হয় কেবল হালাল-হারামের বিধানে, খবরী আয়াতে নয়। অর্থাৎ, কোরআন নিজেই নিশ্চিত করেছে যে, ঈমান জোর-জবরদস্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা হয় না; বরং হৃদয়ের পরিতৃপ্তি, আত্মিক প্রশান্তি এবং স্বেচ্ছা-নির্বাচনের মাধ্যমে হয়।

মোদ্দাকথা হচ্ছে, জিহাদ শুধু যুদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বিস্তৃত ধারণা। জিহাদ হলো একটি সামগ্রিক সভ্যতাকেন্দ্রিক আন্দোলন, যেখানে প্রতিটি মুসলিমই তার সামর্থ্য, যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারে। আর কিতালের বৈধতা দানকারী কারণটি হচ্ছে, জুলুম, অন্যায়, সীমালঙ্ঘন ও আক্রমণ।

অপরদিকে কিতাল মূলত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়। কিতাল কোনো ছোট দল বা গোষ্ঠীর কাজ নয়, যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র তুলে নেয়; এরপর, জিহাদের নাম দিয়ে মুসলিম সমাজের ভেতরে বিদ্রোহ সৃষ্টি করে, এবং নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করে।

এছাড়াও কিতালের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত, নিয়মকানুন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেগুলো মানা জরুরি। এমনকি, কিতালের কিছু আখলাকী বিষয়ও রয়েছে, মুসলিম মুজাহিদদের যেগুলোর প্রতি সম্মান জানাতে হয়। যেমন,

  • শিশুদের হত্যা করা যাবে না,
  • নারীদের হত্যা করা যাবে না,
  • বৃদ্ধদের হত্যা করা যাবে না,
  • কোনো উপত্যকা ধ্বংস করা যাবে না,
  • ফলদায়ক গাছ কাটা যাবে না,
  • পশুকে হত্যা করা যাবে না,
  • সবুজ বন-ভূমি ধ্বংস করা যাবে না,
  • জড়-পদার্থ অযথা নষ্ট করা যাবে না;

এমনকি, অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদেরকেও তাদের ইবাদতের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে।

যে মানুষ প্রতিহিংসাবশত নৃশংসভাবে রক্ত ঝরায়, সে কখনোই এসকল আখলাকী উসূলের প্রকৃত স্বরূপ গ্রহণ করতে পারবে না। এসবই হলো ইসলামী সভ্যতার যুদ্ধক্ষেত্রের আখলাক। এটা এমন এক আখলাক, যেখানে মানুষসহ সকল প্রাণীকেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। রাসূল (স.) বলেছেন,

“আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের উপরই ইহসানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যখন তোমরা হত্যা করবে, তখন বিধান অনুযায়ী হত্যা করবে। যখন তোমরা কোরবানি করবে, তখন সুন্দরভাবে কোরবানি করবে। তোমরা পশুকে শোয়ানোর পূর্বেই তোমাদের ছুরিকে ধারালো করে নেও এবং জবাইয়ের পশুটিকে কম কষ্ট দাও।”

তাহলে, এভাবে পশুর ক্ষেত্রেই যেখানে ইসলামে এতোটা দয়া ও কোমলতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে তো মানুষের ক্ষেত্রে আলাদা করে বলার প্রয়োজনই নেই। আবার আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সকল সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তুলে ধরেছেন। যেমন তিনি বলেন, “আমি আদমসন্তানকে মর্যাদাবান করেছি, তাদের স্থলে-জলে চলাচলের ব্যবস্থা দিয়েছি, তাদেরকে উত্তম রিয়িক দিয়েছি এবং আমার সৃষ্টির অনেক কিছুর উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।”

তাহলে কীভাবে জিহাদ এবং কিতাল এক হয় এবং ইসলামে নিষ্টুরভাবে হত্যা করা জায়েয় হয়? মূলত, এ ধরণের নিষ্টুরতা আসলে পুরনো খারেজিদের চিন্তারই সম্প্রসারণ, যারা কোরআন ও সুন্নাহর নসকে ভুলভাবে বুঝে রাষ্ট্রের বৈধ ক্ষমতা ধ্বংস করেছিলো, সমাজের নিরাপত্তা ভঙ্গ করেছিলো, সাহাবিদেরকেও কাফির বলেছিলো এবং মুসলমানদের রক্তকে হালাল করে নিয়েছিলো। এমনকি, আজকের যুগের খারেজিরাও জিহাদ ও কিতালের নামে একই কাজ করছে, যেখানে জিহাদ ও কিতাল তাদের কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাদের ভুল ব্যাখ্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে তারা গর্ভবতী নারীর পেট চিরে ভ্রূণ হত্যা করেছে, এরপর সে মাকেও তারা হত্যা করেছে। তাই, এসব কর্মকাণ্ডকে বিশ্লেষণ করার সময় সকলের সাথে তাদেরকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।

এক্ষেত্রে কিতাল নিয়ে একটি ভুল সংশোধন করা প্রয়োজন। অনেকেই রাসূলের একটি হাদীস নিয়ে প্রশ্ন করেন যে, রাসূল (স.) বলেছেন-

أُمِّرَتْ أَنْ أُقْتَلَ النَّاسِ

অর্থাৎ, আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষদের সাথে যুদ্ধ করতে।

এ হাদীস দিয়ে অনেকেই ইসলামের বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে থাকে। ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকে।

এর বিপরীতে আলেমগণও উত্তর দিয়ে থাকেন। অনেক আলেমগণ বলে থাকেন যে, এ বিধান কেবল আরবের মুশরিকদের জন্য প্রযোজ্য ছিলো। কিন্তু আসলে এ ব্যাখ্যাটি সঠিক নয়। কেন সঠিক নয়, এর উত্তর হাদীসের শব্দ থেকেই পাওয়া যায়। হাদীসে ব্যবহৃত শব্দটি হচ্ছে ‘উকাতিল’; ‘আকতুল’ না। আর ‘উকাতিল’ শব্দটি এসেছে বাবে মুফাআলাহ থেকে। বাবে মুফাআলাহ-এর বৈশিষ্ট হচ্ছে, কোনো কাজ পরস্পরের সাথে করা। সে হিসেবে ‘উকাতিল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, পরস্পর যুদ্ধ করা। অর্থাৎ, এ যুদ্ধের কারণ হচ্ছে বিদ্যমান আক্রমণ বা আসন্ন আক্রমণ প্রতিরোধ করা।

এছাড়াও আরেকটি হাদীস এমন আছে যে, সেখানে বলা হয়েছে, “আমাকে কিয়ামতের আগে তরবারি নিয়ে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে।” কিন্তু, এ হাদীসটির সনদ ও মতন দুর্বল। কারণ, এর মূল বর্ণনাকারী আবদুর রহমান ইবনে সাবিত ইবনে সাওবান-এর ব্যাপারে যারা রাবী হিসেবে দুর্বল বলেছেন ও সমালোচনা করেছেন তাদের সংখ্যা, তাকে শক্তিশালী বলেছেন এমন ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশি।

অন্যদিকে, কোরআনের কোনো আয়াতেই বলা হয়নি যে, আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদ (স.)কে তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছেন। বরং তিনি তরবারি হাতে নিয়েছিলেন কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলো, হয় তাদের অন্যায় রুখতে অথবা তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে। এছাড়াও, আমরা সকলেই জানি যে, মহান রব তাঁকে গ্রেরণ করেছেন বিশ্বজগতের রহমত হিসেবে।

যাইহোক, জিহাদ ও কিতালের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এটা উঠে এসেছে যে, বর্তমান বিশ্বে ওয়াসাতিয়্যাহ-এর আলোকে পৃথিবী বিনির্মাণের কাজ করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই জিহাদ ও কিতালের ধারণা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে।

 

খিলাফতের ধারণা

জিহাদ ও কিতালের আলোচনার পর আমাদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় সামনে আসে, সেটি হচ্ছে খিলাফত। কেননা, আমরা যদি সমগ্র বিশ্বে ওয়াসাতিয়্যাহর আলোকে পৃথিবী বিনির্মাণ ও খিলাফতের দায়িত্ব পালন করার কথা বলি, তখন অবশ্যই ইসলামী সভ্যতার বিষয়টি আসবে; আর সভ্যতা প্রতিষ্ঠার কথা আসলে অবশ্যই খিলাফতের আলোচনাও আসবে।

“খিলাফতের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্য। আর এ ঐক্যের মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের শক্তি, সম্পদ ও সামর্থ্য একত্রিত করে মানবজাতির সামনে দ্বীনে মুবীন ইসলামকে হেদায়াত হিসেবে উপস্থাপন করবে”।

কিন্তু, ইতিহাসে আমরা যেভাবে খিলাফতের অবকাঠামো দেখেছি, বিশ্বায়নের এ যুগে হুবহু সেভাবেই বাধ্যতামূলকভাবে খিলাফতের অবকাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। অর্থাৎ, ইতিহাসের খিলাফত ব্যবস্থাপনাকে হুবহু আজকের দুনিয়ার আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণার উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়াটা উচিত হবে না। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, উসমানী খিলাফতের পতনের পর থেকে মুসলিম উম্মাহ একত্রিত না হয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে গেছে, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রেরই রয়েছে নিজস্বও স্বতন্ত্র সংবিধান; রয়েছে আইন, শাসক, কর্মসূচি এবং সার্বভৌমত্ব।

তাহলে এখন অবশ্যই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইসলামী খিলাফতের কি কোনো নির্দিষ্ট রূপ আছে?

বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক তত্ত্বগুলোতে কিংবা ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তাধারার আধুনিক লেখনীতে অনেকেই ইতিহাসের পুরোনো কাঠামো সরাসরি বর্তমান বাস্তবাতার সঙ্গে মেলাতে চান। যেমন, কেউ যদি বলে যে, গণতন্ত্রের কোনো পন্থায় (শূরা অর্থে, বর্তমানের কথিত পশ্চিমা স্বার্থান্বেষী গণতন্ত্র নয়) শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত, তখন এর বিপরীতে পাল্টা যুক্তি আসে যে, খোলাফায়ে রাশেদীন তো সারাজীবনের জন্যই খিলাফতে ছিলেন।

হ্যাঁ, এ উত্তরটি সঠিক বটে। তবে আবার এক্ষেত্রে এটাও সঠিক যে, মৃত্যু পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনার বিষয়টি বৈধ ছিলো, কিন্তু বাধ্যতামূলক ছিলো না। তাই এটাও বলা যায় যে, শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ঐ পন্থাটিই একমাত্র সঠিক পন্থা, বাকিগুলো অবৈধ; বিষয়টা এমনও নয়। তাই যদি কোনো দেশ বা জাতি নিজেদের অবস্থার প্রেক্ষিতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর পদ্ধতিকে গ্রহণ করে, তবে সেটিও বৈধ। কেননা, এসব ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো, মুসলমানগণ শরীয়তের সীমার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তবে তাদের কোনো বিষয় যদি হারামকে হালাল করে দেয় বা হালালকে হারাম করে, তবে তা কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অর্থাৎ পশ্চিমা জাতিরাষ্ট্রের বিষয়টি সমস্যাযুক্ত হওয়ায় একদিকে যেমন তাদেরটা হুবহু মেনে নেওয়া যাবে না, অন্যদিকে তেমনি আবার খোলাফায়ের রাশেদার ব্যবস্থাপনাকে হুবহু সেভাবেই গ্রহণ করে বর্তমানে সময়ের একমাত্র ও বাধ্যতামূলক সমাধান হিসেবেও উপস্থাপন করাটা সমীচীন হবে না।

এজন্যই আমরা দেখি, হযরত উমর (রা.)-এর শহীদ হবার পর আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) যখন খিলাফতের প্রার্থী হিসেবে উসমান (রা.) ও আলী (রা.)-এর সামনে উন্মাহর শর্ত পেশ করেন; শর্তটা এমন ছিলো যে, “কোরআন, সুন্নাহ এবং দুই খলিফা (আবু বকর ও উমর)-এর পথ অনুসারে শাসন করা।” উসমান (রা.) তখন এই শর্ত মেনে নেন। কিন্তু আলী (রা.) বলেন, “কোরআন ও সুন্নাহ অবশ্যই, কিন্তু দুই খলিফার আমল আমি মান্য করবো যেখানে তা সঠিক মনে হবে। কেননা, তারা যেমন ইজতিহাদ করেছেন, আমিও তেমনি ইজতিহাদ করবো।” যার ফলে, পরবর্তীতে দেখা গেলো যে, তৎকালীন উন্মত উসমান (রা.)-কেই গ্রহণ করেছিলো।

অতএব, ইমামত/খিলাফত মূলত একটি চুক্তি, যেই চুক্তিতে থাকে দুটি পক্ষ- উম্মত এবং সুলতান তথা জনগণ এবং শাসক। জনগণের অধিকার আছে যে, তারা তাদের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শাসকের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম বা শর্ত বেঁধে দিতে পারবে। আর এসব শর্তাবলি ও ব্যবস্থাপনাগুলো পরিবেশ, পরিস্থিতি ও সময়ভেদে পরিবর্তিতও হতে পারে। কেননা, প্রতিটি সমাজ ও দেশের ভৌগোলিক অবস্থা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা একই রকম হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই প্রতিটি সমাজ ও দেশ তাদের বাস্তবার আলোকে উপযুক্ত রাজনৈতিক কাঠামো বেছে নিতে পারে, যতক্ষণ না তাদের কর্মপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা ইসলামের সার্বিক উদ্দেশ্য ও সামাজিক কল্যাণে বাইরে যায়।

তেমনি খিলাফতকেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যায় না। যারা বাস্তবার উর্ধ্বে গিয়ে কল্পনা করে বলেন যে, খিলাফত ফিরিয়ে আনার অর্থ হচ্ছে, ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য একজন খলিফা নিয়োগ করা হবে, যার আদেশে সারা দুনিয়ার সবাই চলবে। আমাদের উচিত তাদেরকে বলা যে, আপনাদের চাওয়াকে সম্মান করছি, কিন্তু আপনাদের পন্থাটা সঠিক নয়। কেননা এটি দ্বীনের মতো চিরস্থায়ী বিষয় নয়। খিলাফতের আসল বিষয় হলো, তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও মর্ম, কিন্তু খিলাফতের বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই।

যেমনটা দেখা যায় আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে। তারা তাদের মতো করে একটি কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, যেখানে রয়েছে আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে সমন্বয় এবং অর্থনীতিতে একক মুদ্রার ভিত্তি। তারা তাদের সীমান্তগুলো একে অপরের জন্য উন্নুক্ত করেছে এবং একত্রিত হয়ে সামরিকভাবে ন্যাটো জোট গঠন করেছে। অথচ সেখানে ভাষাগত, জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বহুত্ব বিদ্যমান; প্রতিটি রাষ্ট্রেরই রয়েছে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব এবং নিজস্ব সংবিধান, যার সাহায্যে তারা তাদের অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু তারা সম্মিলিতভাবে এমন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছে, যার হিসাব গোটা বিশ্বকে করতে হয়। এটিও এক ধরণের সমন্বয়ের রূপ।

সুতরাং মুসলমানদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র থাকতে পারে, সেখানে বিভিন্ন শাসক থাকতে পারে; কিন্তু তাদের মধ্যে আইনপ্রণয়ন, অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা, নৈতিকতা, শিল্পকলা, এমনকি খেলাধুলার ক্ষেত্রেও সমন্বয়ের ধরণ গড়ে উঠতে পারে। এভাবেই একটি কার্যকরী রূপ পাওয়া সম্ভব।

অর্থাৎ, এক্ষেত্রে এসে চিরন্তন বিষয় আর পরিবর্তনশীল বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এ কারণেই হয়তো জিহাদ ও কিতালের বিষয়েও বড় ধরণের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে আমরা বিশ্বায়নের এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন বিশ্বের দুই প্রান্তের দুইজন ব্যক্তি একইসাথে সংযুক্ত হতে পারছে। সম্পূর্ণ পৃথিবীটা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই আমাদেরকে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার ধারণাতে বিশ্বজনীনতা ও নতুনত্ব আনতে হবে। এক্ষেত্রেও আমাদেরকে ওয়াসাতিয়্যাহর পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

আমাদেরই অনেক সমকালীন তরুণ নব্য সালাফিজমের প্রভাবে মনে করে যে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হবে ‘শক্রতা’। অর্থাৎ, সম্পর্ক তৈরিই হচ্ছে বৈরিতার উপর ভিত্তি করে, শান্তির উপর ভিত্তি করে নয়। তাদের কারও কারও ধারণা এমন যে, ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার’ অর্থই হচ্ছে শক্রতা; অর্থাৎ, কোনো অমুসলিমের শুধুমাত্র সে অমুসলিম হওয়ার কারণেই কোনো ধরণের সৌহাদ্র্য-সম্প্রীতি রাখা যাবে না।

কিন্তু ওয়াসাতিয়্যাহর ফিকহে আল-ওয়ালা দুটি উপাদান নিয়ে গঠিত। যথা,

১. মুহাব্বত বা ভালোবাসা – অর্থাৎ, অন্তরের ঈমানভিত্তিক ভালোবাসা, যা একজন মুমিন থেকে অপর মুমিনের প্রতি হওয়া উচিত।

২. নূসরাত বা সাহায্য-সহায়তা – অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রে সাহায্য ও সমর্থন প্রদান করা, যা চুক্তি ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। এখানে ধর্ম কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এটা নিয়ে স্বয়ং আল্লাহ বলেন,

“যদি তারা তোমাদের কাছে ধর্মীয় কারণে সাহায্য চায়, তবে তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের সাহায্য করা; তবে সে জাতির বিরুদ্ধে নয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের চুক্তি আছে।”

রাসূলুল্লাহ (স.) কীভাবে তাঁর জীবনে এ আয়াতের পরিস্কৃটন ঘটিয়েছিলেন, তা এসানে দৃষ্টান্ত হিসেবে আনা যায়। একবার এক অন্য ধর্মের গোত্রের সাথে রাসূল (স.)-এর চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিলো, তারা যখন কুরাইশদের দ্বারা চুক্তিভঙ্গের শিকার হয়ে রাসূলের নিকট কৃত চুক্তির বদৌলতে সাহায্যের আবেদন জানায়, তখন রাসূল (স.) সে চুক্তির প্রতি সাড়া দিয়েছিলেন এবং গোত্রটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও তাদের সঙ্গে ধর্মের ভিন্নতা ছিলো, তবুও চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার কারণে তিনি সাহায্য করেছিলেন। আপনারা মক্কা বিজয়ের ঘটনাটা পড়লে এই বিষয়কে আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।

তাহলে কি শুধু ধর্মের ভিন্নতার কারণে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোনো ধরণের সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম?

না, কখনোই না। বাসার প্রতিবেশী হিসেবে পাশাপাশি বসবাস করা, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠী হিসেবে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা বা একই কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী হিসেবে সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া-এসবে কোনো সমস্যাই নেই। অর্থাৎ, এসকল ক্ষেত্রে সততা, চরিত্রের উৎকর্ষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আচার-ব্যবহার দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পদ গড়ে তোলাতে কোনো সমস্যা নেই। শুধু নিষেধ করা হয়েছে এতটুকুই যে, কোনো ব্যক্তি ভালোবাসার প্রেরণা যদি হয় ঈমানী প্রেরণা, তাহলে সেটা কেবল মুসলমানের জন্যই বৈধ। কোরআনেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কোরআন মুমিনদের উদ্দেশ্যে বলে, “দেখো, তোমর তাদেরকে ভালোবাসো, অথচ তারা তোমাদের ভালোবাসে না।” এছাড়াও রাসূল (স.)-কে ডেকে তাঁর চাচা আবু তালিব প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তুমি চাইলেই কাউবে হেদায়াত দিতে পারবে না, এমনকি তাকে যদি তুমি ভালোবাসো।” অর্থাৎ রাসূল (স.) তাঁর চাচাকে ভালোবাসতেন। এর কারণ ছিলো, রাসূলের চাচা রাসূলের জন্য নিজের সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করেছেন, তাকে রক্ষা করেছেন। যদিও তিনি ইসলামের অনুসারী ছিলেন না।

এছাড়াও, ইসলাম তো প্রাথমিক যুগে মুসলিম পুরুষকে আহলে-কিতাব নারীর সঙ্গে বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছিলো। অথচ, বিয়ের মতো সম্পর্ক তো গড়ে ওঠে ভালোবাসা ও মারহামাতের উপর ভিত্তি করে। তাহলে কি একজন মুসলিম এমন এক নারীকে বিয়ে করবে যাকে সে ঘৃণা করে? কোরআনেই আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি হলো, তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও, এবং তিনি তোমাদের মধ্যে স্নেহ ও দয়া স্থাপন করেছেন।”

এখানেই শেষ নয়। হযরত আলী (রা.) যখন মালিক ইবন আশতারকে মিশরের গভর্নর বানালেন, সে সময়ে মিশরে মুসলিম ছাড়াও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী ছিলো। তখন আলী (রা.) তাকে উপদেশ দিয়ে বললেন,“মানুষ দু’ধরণের, হয় সে তোমার দ্বীনি ভাই, নয়তো সে তোমার সৃষ্টিতে সমকক্ষ বা মানবতার ভাই। সুতরাং তোমার হৃদয়কে তাদের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও কোমলতায় পূর্ণকরে দাও। তাদের প্রতি নেকড়ে হয়ে যেও না, যে তাদের গ্রাস করতে চায়। কেননা, তারা হয় ইসলামে তোমার ভাই, নয়তো মানবিকতায় তোমার সমান। তাদের থেকে ভুল হতে পারে, রোগ-বালাই তাদের গ্রাস করতে পারে। তোমার মতোই তারা কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে আবার কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করবে। তাই তাদের প্রতি তোমার ক্ষমা ও সহনশীলতা এমন হওয়া উচিত, যেমনটি তুমি আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর ক্ষমা ও দয়া আশা করো। তুমি তাদের ওপর শাসক, তোমার ওপর শাসক হলো খলিফা, আর খলিফার ওপর আছেন আল্লাহ, যিনি তোমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন।”

এজন্যই আমরা বিশ্বাস করি যে, অন্যজন বলতে সবসময় শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বীকে বোঝানো সঠিক নয়। যে শত্রুতা কখনো বদলায় না, চিরস্থায়ী ও সর্বত্র সমান থাকে; এটা কেবল একটিমাত্র অবস্থার জন্য প্রযোজ্য, আর সেই অবস্থা হলো শয়তান। কোরআনের ভাষায়,

“إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَذَوٌّ فَأَتَّخِذُوهُ عَذَوٌّ

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ করো।

কিন্তু অপরদিকে, কোনো কাফের ইসলাম গ্রহণ করতে পারে, কোনো শত্রু শান্তি স্থাপন করতে পারে এবং কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী মিত্রে পরিণত হতে পারে। তাই মানুষের মধ্যে শত্রুতা কখনো স্থায়ী অবস্থা নয়; বরং তা পরিবর্তনশীল।

অতএব, “অন্যজন” নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমনই উদার হওয়া উচিত। ফলে, আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথমেই দেখতে হবে অপর ব্যক্তির সাথে আমাদের কোথায় সাধারণ মিল আছে! এ মিল বা সামঞ্জস্যতা হতে পারে ধর্মীয় দিক থেকে, হতে পারে সভ্যতাগত দিক থেকে, হতে পারে চিন্তাগত দিক থেকে নতুবা অবশ্যই হতে পারে মানবতা ও মনুষ্যত্বের দিক থেকে।

যেমন, কায়রোতে অনুষ্ঠিত জনসংখ্যা বিষয়ক সম্মেলনে গর্ভপাত বৈধকরণ ও সমকামিতা বৈধকরণের বিরুদ্ধে ভ্যাটিকান, আল-আযহার এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ একসাথে দাঁড়িয়েছিলো। তখন তারা ঘোষণা করেছিল যে, পরিবার গঠনের একমাত্র সঠিক উপায় হলো বৈধ বৈবাহিক বন্ধন, যেখানে একজন পুরুষ ও একজন নারী থাকবে।

তেমনিভাবে পরিবেশ রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্বলদের পক্ষে দাঁড়ানো, নৈতিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখা, এসব ক্ষেত্রেও মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে মিল থাকতে পারে। ঠিক একারণেই আমাদের জন্য প্রয়োজন ওয়াসাতিয়্যাহর ফিকহ। কিন্তু যারা বিশ্বকে দুটি শিবিরে ভাগ করতে চায়, যেখানে কোনো মিল নেই ও কোনো সহযোগিতা নেই, তাদের ধারণা ওয়াসাতিয়্যাহর ফিকহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১ বার পঠিত

শেয়ার করুন

Picture of ড. ইসাম আল বশীর

ড. ইসাম আল বশীর

ড. ইসাম আল বশীর সমকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন সুপরিচিত আলেম, চিন্তাবিদ, দাঈ এবং ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সুদানে তার জন্ম। শৈশবেই কুরআন, আরবি ভাষা এবং ইসলামী শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে ফিকহ, উসূল এবং সমকালীন মুসলিম সমাজের প্রশ্নে গভীর জ্ঞানার্জন করেন। তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাশীল জীবনের প্রধান ক্ষেত্র হলো মুসলিম সমাজের আখলাকী পুনর্গঠন, দাওয়াহ, ইসলামী ঐক্য এবং নতুন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্নে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা। তিনি মনে করেন, মুসলিম উম্মাহর সংকট কেবল বাহ্যিক শক্তির কারণে নয়; বরং তা রূহানী দুর্বলতা, বিভক্তি এবং চিন্তার স্থবিরতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি সুদানসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, দাওয়াহ, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ইসলামী ফোরামে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সমকালীন মুসলিম বিশ্বের নানা সংকট, ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং উম্মাহর ঐক্যের প্রশ্নে তার বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তার বক্তৃতা, প্রবন্ধ ও লেখনিতে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা, আখলাকী দ্রঢ়তা এবং বাস্তবতার গভীর অনুধাবন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সমকালীন মুসলিম জগতে ড. ইসাম আল বশীর এমন এক কণ্ঠ, যিনি ইসলামী চেতনা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।
Picture of ড. ইসাম আল বশীর

ড. ইসাম আল বশীর

ড. ইসাম আল বশীর সমকালীন মুসলিম বিশ্বের একজন সুপরিচিত আলেম, চিন্তাবিদ, দাঈ এবং ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সুদানে তার জন্ম। শৈশবেই কুরআন, আরবি ভাষা এবং ইসলামী শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে ফিকহ, উসূল এবং সমকালীন মুসলিম সমাজের প্রশ্নে গভীর জ্ঞানার্জন করেন। তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাশীল জীবনের প্রধান ক্ষেত্র হলো মুসলিম সমাজের আখলাকী পুনর্গঠন, দাওয়াহ, ইসলামী ঐক্য এবং নতুন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্নে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা। তিনি মনে করেন, মুসলিম উম্মাহর সংকট কেবল বাহ্যিক শক্তির কারণে নয়; বরং তা রূহানী দুর্বলতা, বিভক্তি এবং চিন্তার স্থবিরতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি সুদানসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, দাওয়াহ, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ইসলামী ফোরামে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সমকালীন মুসলিম বিশ্বের নানা সংকট, ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং উম্মাহর ঐক্যের প্রশ্নে তার বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তার বক্তৃতা, প্রবন্ধ ও লেখনিতে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা, আখলাকী দ্রঢ়তা এবং বাস্তবতার গভীর অনুধাবন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সমকালীন মুসলিম জগতে ড. ইসাম আল বশীর এমন এক কণ্ঠ, যিনি ইসলামী চেতনা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top