ভাই ভাই মিলি তোমরা সবাই

এক মহা পরিবার-

নাহি ভেদাভেদ আজমী আরবী

এক আদমের সন্তান সবি

গরব কিসের তার? (১)

-হজরত মুহম্মদ (দঃ)

ইসলাম ফেতরতের ধর্ম। ফেতরত মানে স্বভাব প্রকৃতি। অন্য কথায় ইসলাম স্বভাব সঙ্গত ধর্ম। যা অস্বাভাবিক, যা প্রকৃতির বিরোধী ইসলামে তা ধর্ম নয়। চির-কৌমার্য স্বাভাবিক নয়, না খেয়ে শরীরকে শুকিয়ে ফেলা, চেষ্টা করে বিকলাঙ্গ হওয়া, সংসার-সমাজ সব ছেড়ে নির্জন বাস, জঙ্গল-গুহায় আত্মগোপন-এ সব স্বাভাবিক নয়-কাজেই ইসলামে এতে ধর্ম নাই। “লা রোহহ্বানিয়াতু ফিল্ ইসলাম”-‘ইসলামে বৈরাগ্য নাই’।

‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি

সে আমার নয়-‘

ইসলামেরই মর্মবাণী-বাঙ্গালী কবির কণ্ঠে নবভাষা লাভ করেছে। বিধাতার বিধানের বিরুদ্ধে ইসলাম নব-সাম্রাজ্য স্থাপনের দুশ্চেষ্টা করে নাই বরং বিধাতার বিধানের সহায়ক হিসাবেই ইসলাম বিকাশ লাভ করেছে। যে প্রকৃত মুসলমান, সে দুনিয়ায় আল্লার খলীফা–বিধাতার প্রতিনিধি। আল্লা চান তাঁর সৃষ্টির কল্যাণ বিধান-তার ক্রম-বর্ধমান বিকাশ সাধন। আল্লার প্রতিনিধি খাঁটি মুমিনও তা-ই চায়। বন-জঙ্গলের যে বাঘ-সিংহ, স্বাধীন জীবনে তারা যেভাবে দেহে-মনে-শক্তিতে বাড়ে, তা-ই ফেতরত-তা-ই স্বাভাবিক। সার্কাস ওয়ালার পিজরায়-বদ্ধ অর্ধাহারক্লিষ্ট আফিমের অবসাদে ঢুল চুল আঁখি বাঘ সিংহের জীবন স্বাভাবিক নয়। তেমনি ধর্মের নামে যুগে যুগে মানুষের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে যে আফিমের হলাহল পরিবেশন করা হয়েছে, ইসলাম তাকে কখনও ধর্ম বা ধর্মের বিধান বলে স্বীকার করে নাই। মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বাধীনভাবে তার জীবনের বিকাশ সাধন করবে-এই-ই ইসলাম চায়, ইসলামের মতে এতেই ধর্ম। মানুষ সুস্থদেহে শক্তিমান মন নিয়ে সংসার করবে সৎ রোজগার করে নিজের পেট পুরে খাবে, বাচ্চা কাচ্চাকে খাওয়াবে, ঈদে-উৎসবে নিজে ভালো কাপড় পরবে, পোষ্য দশজনকে পরাবে ইসলামের মতে এতেও পুণ্য। কিন্তু তাই বলে বাকি জনগণ সম্বন্ধে উদাসীন থাকলে চলবে না। ইসলাম বলে ‘সে ব্যক্তি কখনই মুসলমান নয়, যে তার প্রতিবেশীকে (তা সে প্রতিবেশী মুসলমান অমুসলমান যে-ই হোক) অভুক্ত রেখে নিজে পেট ভরে খায়।’ ইসলাম আবার বলে-

বিচারের দিন সুধাবে বিধাতা-

“আদমের সন্তান,

ক্ষুধায়-কাতর অন্ন চেয়েছি

অন্ন কর নি দান”।

কহিবে মানব, ‘রাজ্জাক’ ওগো,

“তুমি নিখিলের স্বামী,

তোমারে কেমনে অন্ন দিতাম

নারিনু’ বুঝিতে আমি।”

কহিবেন খোদা, “বান্দা আমার

অন্ন চাহিল দান,

তারে দিলে সে-যে আমিই পেতাম,

(আজি) পেতে তার প্রতিদান।” (২)

রসুলুল্লাহ অন্যত্র বলেছেন-“মানুষের মধ্যে সেই সবচেয়ে ভালো যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে ভালো।”

প্রচারকের নাম অনুসারে কোন কোন ধর্মের নামকরণ হয়েছে-Christianity, Judaism, Confucianism ইত্যাদি। কিন্তু ইসলাম কারো নামানুগত ধর্ম নয়; ‘Muhamadanism’ নাম দিয়েছেন খৃস্টান লেখকেরা তাঁদের নিজেদের ধর্মের নামানুকরণে। মুসলমান শাস্ত্রকারেরা এ নাম কখনও ব্যবহার করেন নাই। আসল কথা, মহানবী মুহম্মদ (দঃ) ইসলামকে তাঁর বিরচিত ধর্ম বলে দাবী করেন নাই বরং একথাই বার বার বলছেন যে, মানবের সৃষ্টি হতে যে ধর্ম চলে এসেছে, ইসলাম তাই; কালক্রমে সেই ধর্ম স্বার্থবুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষের হাতে কলঙ্কিত হয়েছিল, তিনি তাকে সংশোধিত আকারে প্রচার করেছেন। ইসলাম গোষ্ঠী, জাতি বা দেশ-বিশেষের ধর্ম নয়-ইসলাম মানবীয় ধর্ম। প্রতিটি শিশু ইসলামে জন্ম গ্রহণ করে।

 

জগতের সর্বদেশের সর্বজাতির সর্বমানব ইসলামের জন্মগত অধিকারী: বড় হয়ে তবে তারা নিজ নিজ পিতৃ-সমাজের সংস্কার গ্রহণ করে। তাই, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক-তাই ইসলামের কবি ইকবাল উদাত্ত কণ্ঠে বলেন-

চীন ও আরব হামারা, হিন্দুস্তা হামারা

মুসলিম হ্যায় হাম, ওতান হ্যায় সারে জাহাঁ হামারা।

এই কথাই কবির কণ্ঠে ফের অন্যভাবে ধ্বনিত হয়েছে-

তু উয় ইউছুফ হ্যায় কে হর মেসের হ্যায় কেন’ন তেরা।

ধনী-গরীব, ধলাকালা, গৃহী-অগ্রহী সবারই জন্য ইসলামের দুয়ার খোলা। কোন পুরোহিত বাহু বিস্তার করে সে রাস্তা রোধ করে দাঁড়ায় নাই-ইসলামে পৌরহিত্যের স্থান নাই। ধর্মাচরণ ব্যাপারে মুসলমান স্বাধীন। কোন বিশেষ বয়স সে দুয়ার পথে কণ্টক সৃষ্টি করে নাই: বালেগ হাওয়ার পর হতেই ইসলামে সবার অধিকার-ইসলামের বিধান পালনে সবার কর্তব্য শুরু হয়। কেবল শেষ বয়স ধর্মের জন্য আলাদা করে রাখা ইসলাম অনুমোদন করে না। মূল কথা-ইসলাম সমগ্র জীবনের ধর্ম-শুধু মৃত্যু-ছায়া-মলিন অবসাদ-গ্রস্ত অকর্মণ্য বার্ধক্যের বা আত্মকেন্দ্রী চিন্তামগ্ন সমাজত্যাগী কর্মহীন গুহাবাসীর ধর্ম নয়। চলাই জীবন-

হাস্তাম আগার মীরওয়াম

গার নারওয়াম নিস্তাম। (৩)

‘গতিতেই আমার জীবন-গতিহীনতাতেই আমার মৃত্যু।’

ইসলাম এই চলমান কর্মময় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলামের যে প্রকৃত অনুসারী, তার কথায়-কাজে, তার অশনে-বসনে, তার চিন্তায়-স্বপনে ফুটে উঠবে তার ধর্মের সত্য-সুন্দর রূপ। কে কোন্ ঘরে জন্মলাভ করেছে, তা নিয়ে মুসলমানের গৌরব নয়। জীবনে ইসলামকে কে কতখানি রূপায়িত করতে পেরেছে, তা-ই দিয়ে তার সত্যিকার পরিচয়:

ইউ তু সৈয়দ ভি হো, মীর্জা ভি হো, আফগান ভি হো,

তোম সবহি কুছহো, বাতাও তো, মুসলমান ভি হো? (৪)

ইসলামের যে সত্যিকার আভিজাত্য, তাও সার্বজনীন জন্মস্থান, পিতৃপরিচয়, মস্তিষ্ক শক্তি, ঐশ্বর্য বা প্রভুত্ব ইসলামের আভিজাত্যের মাপকাঠি নয়:

নহে আশরাফ যার আছে শুধু

বংশের পরিচয়-

সেই আশরাফ জীবন যাহার

পুণ্য কর্মময়।

হাবশীও যদি সত্যের পথে

বরণীয় হয়, তবু এ জগতে

তারি নির্দেশ নত মস্তকে

মানিবে সুনিশ্চয়। (৫)

-হাদীস

ইসলামের এই যে সেবা ও সাধনার আভিজাত্য-এই Aristocracy of Service and Achievement-এ শুধু তার শুভ শাস্ত্রবাক্যে পর্যবসিত রহে নাই: যুগে যুগে প্রাণবন্ত মুসলমানেরা একে বাস্তবে রূপায়িত করেছে। রসুলুল্লার মুয়াজ্জিন ছিলেন গোষ্ঠিতে হাবশী। মহানবী তাঁর একজন জ্ঞাতি-বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তি-পাওয়া দরিদ্র দাসের সঙ্গে। কত ক্রীতদাসকে তাদের সাধনা সাফল্যের অভিনন্দনে বাদশা’রা দিয়েছেন তাঁদের কন্যা, আমীর, রঈসরা মিলে তুলে দিয়েছেন সিংহাসনে। ভারত-ইতিহাস পাঠকেরা তা ভাল করেই জানেন।

ছোট-বড়, ধলা-কালা, আরবী-আজমী-সর্বপ্রকার বিভেদ নির্বিশেষে সকলের সামনে সাধনার এই যে অবারিত দুয়ার, আর সাধনা সাফল্যের এই যে কার্যগত অকুণ্ঠিত স্বীকৃতি ইসলামের সার্বজনীনতার এ অন্যতম বিকাশ-জগতের আভিজাত্যের ইতিহাসে ইসলামের এ এক অভিনব অবদান।

এরই সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ইসলামের আর একটি স্মরণীয় বৈশিষ্ট্য-সে তার বিশ্বভ্রাতৃত্ব। বিপ্লবের বিপুল সমুদ্র মন্থন করে ফরাসীরা সাময়িকভাবে লাভ করেছিল যে সাম্যের সুধা, যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের মহিমা গাথা আজকের রুশীয়রা জগতময় গেয়ে ফিরছে এবং যার তরঙ্গ অভিঘাতে আমাদের ধ্যায়ানী যুবক সমাজের বহু জনের চিত্ত আজ উদ্বেলিত, সে উদার সাম্য ভ্রাতৃত্বের আদর্শ ইসলামের শৈশব হতে তার সত্যিকার অনুসারীদের জীবনের সঙ্গে এমন নিবিড়ভাবে মিশে রয়েছে যে, বাইরে তার কোন সরব প্রকাশ নাই-সরব পরিচয়ের কোন প্রয়োজন অনুভূত হয় না। এই যে রক্তের অনিরুদ্ধ প্রবাহ আমাদের ধমনী বেয়ে অহরহ চলছে, কবে সে তার বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়িয়েছে? বাস্তবিক রক্ত চলাচলে কোন বিঘ্ন না ঘটলে মানুষ টেরই পায় না এ রক্ত-স্রোতের অস্তিত্ব।

এ সম্বন্ধে Captain Mark Sykes-এর ‘Darul-Islam’ নামক বই হতে একটু উদ্ধৃত করার লোভ হচ্ছে। তিনি বলেছেন:

“জিজী কুর্দদের প্রতাপান্বিত সর্দার আগা ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে অভ্যর্থনা করার জন্য যে দরবার, তাতে রইলেন আগা স্বয়ং, তাঁর সেনাপতি, একজন অন্ধ ভিক্ষুক, একটি খৃস্টান দোকানদার, টেলিগ্রাফ অফিসের জনৈক কেরানী, দুইজন খানসামা, ইয়াকুব, আমি এবং একজন কসাই-যে চামড়া নিতে এসেছিল, আমরা সবাই এক টেবিলে বসে একসঙ্গে কফী খেলাম।”

এ সাম্যের দরজা পর্যন্তও আমরা পৌঁছতে পারি নাই। কখখনো পারব না। অথচ উদ্ধত মার্কিন মিশনারীরা এদেরকেই শিখাতে আসে সাম্যের মহিমা! আমেরিকার পথে-ঘাটে অহরহ শোনা যায়, ‘ওহ। আমরা সবাই সম্পূর্ণ সমান-আমাদের কেউ কারো চেয়ে ছোট নয়।’ কিন্তু এ দেশে সাম্য এমন পূর্ণতালাভ করেছে যে এখানে কেউ এর উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করে না।

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে সাম্যের গান আনন্দের উন্মত্ততায় এত যে মুখর হয়ে উঠেছে, তার এক বড় কারণ এই যে-ইসলামের অক্ষম অনুসারীদের হাতের বীণায় বহুকাল পর্যন্ত যে সাম্যের ঝঙ্কার কর্মহীন অবসাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, কমিউনিজমের প্রথম আঘাতেই সে ঘুমন্ত ঝঙ্কার ফিরে পেল তার জাগৃতি-বেজে উঠলো সে ঊষার পুলক স্পন্দনের উচ্ছল কলরোলে।

ইসলামের এই বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের মূল উৎস হ’ল তার তৌহীদ-একেশ্বর-পরায়ণতা। ‘আল্লাহু আকবার’-আল্লাই সবচেয়ে বড়, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-আল্লা ছাড়া আর কেউ উপাস্য নাই। একমাত্র তাঁরই উদ্দেশ্যে নত হবে মানুষের মাথা-কোনও মানুষের সামনে নয়, দুনিয়ার দুর্ধর্ষতম দিগ্বিজয়ী বীরের কাছেও নয়। মুসলমানের এই গভীর বিশ্বাস-তার এই দুর্জয় ঈমান যুগে যুগে তার বুকে জুগিয়েছে বল-দিয়েছে তাকে মৃত্যুর সঙ্গে যুঝবার শক্তি। সেই মহান আল্লার উদ্দেশেই কবি ডেকে বলছেন:

উছী-কে গজব-সে ডরো গার ডরো তোম

উছী-কে তলব মে মরো যব মরো তোম। (৬)

এই তৌহিদই মুসলমানের সামাজিক জীবনের সামনে তুলে ধরেছে সাম্যের উজ্জ্বল আদর্শ, তার রাষ্ট্র জীবনে জুগিয়েছে গণতন্ত্রের অনুপ্রেরণা, অন্য ধর্মীদের সঙ্গে ব্যবহারে দিয়েছে উদারতার স্নিগ্ধ ব্যঞ্জনা। আল্লা এক-সবাই তাঁরই সৃষ্টি-সবাই এক আদমের সন্তান-অতএব সবাই সমান-সবাই ভাই ভাই-সবাই সবার সুখ-দুঃখের সাথী, মূলত এই-ই তৌহিদের অন্তর্নিহিত নির্দেশ।

 

নারী সম্বন্ধে ইসলামের বিধান পরম ঔদার্যময়। ইসলামের ধর্ম, ইসলামের নীতি, ইসলামের সমাজ-ইসলামের রাষ্ট্র, ইসলামের শিক্ষা, ইসলামের সংগ্রাম, ইসলামের ব্যক্তিগত সম্পদ-ইসলামের ওয়ারেসী স্বত্ব, ইসলামের বিবাহ-সম্মতি-ইসলামে শান্তিহীন দাম্পত্যজীবনের বিষ বন্ধন হতে মুক্তির অধিকার, এর কোনটিতেই নর একক অধিকার পায় নাই; এর প্রত্যেকটিতে নারীরও বিশিষ্ট অধিকার বর্তমান। রসুলুল্লাহ তাঁর বিদায় হজের বক্তৃতায় সম্মিলিত জন-সংঘকে আকুল কণ্ঠে শেষবার মনে করিয়ে দেন-

সাবধান ভাই, সাবধান সব

তোমাদের পুরনারী।

পুণ্য শপথে বরিয়া লয়েছে

মহাদান বিধাতারি।

তাহাদের প্রতি তোমা সবাকা

দিয়াছে বিধাতা যেই অধিকার

তোমাদেরো পরে সেই অধিকারে

তাহারাও অধিকারী। (৭)

প্রাক-ইসলামীয় আরবে কন্যাকে মনে করা হ’ত বংশের ভাবী কলঙ্কের অঙ্কুর। কাজেই গর্বান্ধ পিতারা অনেক সময়ই তাদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করে ফেলত। পাঁচ বছরের নধর কান্তি কন্যা-মাকে ফাঁকি দিয়ে পিতা তাকে নিয়ে চলেছে কবর দিতে। খেজুর বনের ওপাশে মেয়েকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাপ মাটি খুঁড়ছে-হঠাৎ তার চোখে যায় একটু বালি-কণা-মেয়ে অমনি ব্যস্ত হয়ে তার সেই ছোট্ট স্নেহাঞ্চল দিয়ে মুছতে যায় বাপের চোখ। বাপ বিদ্যুৎ-স্পৃষ্টের মত চমকে ওঠে। থমকে দাঁড়ায়-ভাবে, হায়। কি করছি। কিন্তু না-মায়াবিনী, এ তোমার নতুন ফাঁদ। তারপর সহসা ধাক্কা দিয়ে মেয়েকে ফেলে দেয় সেই অসম্পূর্ণ গর্তে-তাড়াতাড়ি দুই হাত দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে ক্ষ্যাপার মত পালায়-তার দুই কানে আঙ্গুল, শেষে বা তার স্নেহের দুলালীর আর্তকণ্ঠ তথায় পশে।

মহানবী এই কন্যা-হত্যার দুয়ার যে চিরতরে রুদ্ধ করে দিলেন, কেবল তাই নয়-তিনি নিজে কন্যার অভ্যর্থনায় আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে শিক্ষা দিলেন কন্যার স্থান কত মহনীয়।

তারপর সবার উপর স্থান দিলেন তিনি সহধর্মিণীকে বল্লেন, ‘সেই মানুষ ভালো যে তার স্ত্রীর বিবেচনায় ভালো’-পীর-পুরোহিত, মৌলবী-মওলানা, ফকীর-দরবেশের বিবেচনায় নয়, স্ত্রীর বিবেচনায়।

সর্বশেষে জননীর হাতে দিলেন তিনি বেহেস্তের দুয়ারের চাবি, বল্লেন-

‘আল-জান্নাতু তাহতা আকদামেল উম্মেহাত’

– মায়ের পায়ের তলে বেহেস্তের স্থান।

জ্ঞান আহরণ ব্যাপারে ইসলাম পরম উদার নীতি অনুসরণ করেছে। রসুলুল্লাহ্ বলেছেন, ‘দরকার হলে চীনদেশে গিয়েও জ্ঞান অর্জন কর।’ গোষ্ঠিতে-জাতিতে, ধর্মে-কর্মে, আচারে-অনুষ্ঠানে, ভাষায়-ভঙ্গিতে, অশনে বসনে চীনারা আরব জাতি হতে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেকালে চীনে যাওয়ার পথও ছিল দুর্গম-বিপদ-সঙ্কুল। বিদ্যার খোঁজে এমন স্থানে যেতেও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মহানবী আবার বলেছেন, ‘জ্ঞান মুসলমানের হারানো মানিক-যেখানে পাও কুড়িয়ে নেও।’

এসব বাণীই প্রাথমিক মুসলমানগণকে প্রেরণা জুগিয়ছিল জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে জগতের বিভিন্ন সভ্যতা-কেন্দ্র হতে জ্ঞান সংগ্রহ করতে। গ্রীস, রোম, মিসর, পারস্য, ভারত প্রভৃতি দেশ হতে পরম যত্ন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁরা যে বিদ্যা আহরণ করেছিলেন, তারই গবেষণাশুদ্ধ ভিত্তির উপর গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা তাঁদের অভিনব সভ্যতা-যে সভ্যতার শিখা মুসলিম স্পেনের গ্রানাডা ও কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় মারফত মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্রবেশ করে বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার স্ফরণে উপকরণ ও উদ্দীপনা জুগিয়েছিল।

 

রাজ্য শাসন সংক্রান্ত ব্যবস্থায় ইসলামের অনুশাসন আজো জগতের সভ্যতম জাতিদেরেও অনেকের আদর্শ হয়ে আছে। বিজিত নাজরান ও পার্শ্ববর্তী খৃস্টান অধিবাসিগণের সম্বন্ধে মহানবী বলেছেন: আল্লা ও তাঁর রছুলের নামে তাঁদের ধন-প্রাণ ও ধর্মের সংরক্ষণ ভার গ্রহণ করছি। তাঁদের আচার অনুষ্ঠানে কোন ক্ষেত্রে কোন বাধা দেওয়া হবে না-কোন বিশপকে তাঁর পদ হতে সরানো হবে না-তাঁরা আগের মত তাঁদের সর্বপ্রকার অধিকার ভোগ করতে থাকবেন। বাদশা বাবর তাঁর ওছিয়তনামায় পুত্র হুমায়ুনকে বলেছেন-‘এই ভারত সাম্রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম মতের অন্ত নাই। তোমার কর্তব্য–নিজ মনকে গোঁড়ামির মোহ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত করে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ধর্মমত অনুসারে তাদের প্রতি সুবিচার করা।”

বাস্তবিক ইসলামের রাজ্যে মুসলমান অমুসলমান সমস্ত নাগরিকের পৌর অধিকার মোটামুটি সমান। মুসলিম শাসকদের এই সমদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে মধ্যযুগীয় খৃস্টান ইউরোপের উপদ্রুত অখৃস্টান প্রজারা দলে দলে এসে স্পেনে আশ্রয় নিয়েছিল। আইভান হো’র পাঠকেরা জানেন যে, এই একই কারণে ইহুদীনন্দিনী রেবেকা অশ্রুময়ী চোখে ইংলন্ডের মায়া ছেড়ে মুসলিম স্পেনে চলে এ’ল। ভারতে মুসলিম শাসনের ছায়াতলে হিন্দুবাসিন্দাদেরও যে এমনি শান্ত আশ্রয়লাভ ঘটেছিল, তার প্রমাণ এই যে-মুসলিম প্রভুত্বের কেন্দ্রগুলিতেই ছিল তাদের ভিড়-মুসলমান বাসিন্দারা ছিল সেখানে সংখ্যায় কম। আজ তাই দিল্লী-আগরা, লাক্ষ্ণৌ-এলাহাবাদ হিন্দু ডমিনিয়নের অন্তর্গত-আর সেই কারণেই আজমীরের মত ভারতের বৃহত্তম মুসলিম তীর্থ প্রদেশেও মুসলিম বাসিন্দারা আজো সংখ্যালঘু।

পরধর্মসহিষ্ণুতা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য। ইসলামের প্রথম কথা এই যে, ইসলাম সম্প্রদায় বা জাতি বিশেষের ধর্ম নয়-ইসলাম মানুষের ধর্ম। ইসলামের দ্বিতীয় কথা এই যে, আদি মানব হজরত আদম (আঃ) হতে ইসলাম চলে আসছে। যত নবী-পয়গাম্বর-তাঁরা সবাই ইসলাম প্রচার করে এসেছেন; সুতরাং হজরত মুছা (আঃ), ইছা (আঃ) এঁরা সবাই ইসলামের নবী, এঁরা প্রত্যেকেই মুসলমানের পরম শ্রদ্ধার পাত্র। ইসলামের তৃতীয় কথা এই যে, পৃথিবীর প্রতি দেশে খোদাতা’লা মানব সমাজের কল্যাণের জন্য পয়গম্বর পাঠিয়েছেন। এই পয়গম্বরেরা সংখ্যায় বিপুল-আমরা তাঁদের সবাইকে চিনি না-সবার নামও জানি না, সুতরাং অন্যধর্মের প্রবর্তকদের নাম নিতে সশ্রদ্ধভাবে সাবধান হওয়া দরকার, কারণ তাঁদের অন্তত কেউ কেউ যে ইসলামেরই পয়গম্বর ছিলেন না, একথা জোর করে বলা কঠিন। ইসলামের চতুর্থ কথা এই যে, অন্য ধর্মের যেসব দেব-দেবীকে ইসলাম মানে না, তাঁদের সম্বন্ধে কোন কটু বলা ইসলামে নিষিদ্ধ। যে মুসলমান কোন অমুসলমানেরও উপাস্য দেব-দেবীকে কটু বলবে, সে বাস্তবিক আল্লাকেই কটু বলবে; কারণ এই কটুর উত্তরে অমুসলমানেরা কার্যত মুসলমানের আল্লাকে কটু বলতে নিমন্ত্রিত হবে।

কিন্তু পরধর্ম সম্বন্ধে ইসলামের অনুশাসন এখানেই শেষ হয় নাই। মন্দির, মছজিদ, গীর্জা প্রভৃতি সর্বপ্রকার ধর্মস্থানকে রক্ষা করা বিষয়ে পবিত্র কোরানে যে তামি তাকিদ আছে, তা থেকে মরহুম খাজা কামাল উদ্দীন সাহেব সিদ্ধান্ত করেন যে, অন্যের ধর্ম মন্দিরকে রক্ষা করে অটুট অবস্থায় রাখা মুসলমানের পক্ষে ফরজ-অবশ্যকরণীয় ধর্ম কাজ। মুসলমানদের দ্বারা জেরুজালেম বিজয়ের পূর্বক্ষণে তথাকার খৃস্টান শাসনকর্তা বলেন, হজরত ওমর (রাঃ) ছাড়া আর কারো হাতে তিনি নগর সমর্পণ করবেন না। সংবাদ পেয়ে খলীফা গেলেন-গীর্জায় দাঁড়িয়ে খৃস্টান শাসনকর্তা ও মুসলিম খলীফা কথাবার্তা বলছেন, এমন সময় নামাজের সময় উপস্থিত হ’ল। খৃস্টান শাসনকর্তা বল্লেন, ‘তা নামাজ এখানেই পড়ুন।’ হজরত ওমর (রাঃ) বল্লেন, “না, তা হয় না। আজ আমি এখানে নামাজ পড়লে এই নজীর দেখে ভবিষ্যতে মুসলমানেরা-গীর্জাকে মসজিদে পরিণত করে নিতে পারে।” এই বলে তিনি গীর্জা ছেড়ে বাইরে গিয়ে তাঁর উপাসনা করলেন।

মুসলমান নামাজের শেষ পর্যায়ে যখন সালাম ফিরায়, তখন সে তার ডানে বামে-অর্থাৎ সর্বত্র অবস্থিত সর্বপ্রকার জীবের জন্য বিধাতার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে থাকে। নামাজে বসে দিনের মধ্যে কমপক্ষে চৌদ্দবার যে ব্যক্তি জাতি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে সবার জন্য আল্লার দরবারে কল্যাণ প্রার্থনা করে, তার পক্ষে পরধর্মীর প্রতি ঘৃণার ভাব পোষণ করা স্বাভাবিক, না সঙ্গত? মানব-প্রেম স্নিগ্ধ চিত্ত পারস্য কবি তাই বলেছেন:

দিল বদস্থ আর কে হজে আকবরাস্ত

আজ হাজারা কা’বা এক দিল খোশতারাস্ত

কা’বা বুনিয়াদে খলীলে আজরাস্ত

দিল গুজার গাহে জলীলে আকরাস্ত

 

নরের হৃদয় জয় কর, ভাই, শ্রেষ্ঠ হজ-ই তা’তে

হাজার কা’বার চেয়েও হৃদয় বড় জেনো তুমি,

কা’বা সে ত আজর-তনয় গড়ল আপন হাতে

হৃদয় সে যে স্বয়ং বিশ্বপতির বিহারভূমি।

উপরে ইসলামের যে সব উদার বিধানের কথা বলা হ’ল, তা মুসলিম ইতিহাসের সবযুগে মুসলমানেরা মেনে চলে নাই-একথা সত্য। তবে মুসলিম ইতিহাসের যাঁরা সত্যিকার গৌরব, তাঁরা যে মেনে চলেছেন, এই যথেষ্ট। আর তারা হঠাৎ বড় হয়ে যে ইসলামের বিধান মেনে চলেছেন এমনও নয়-ইসলামের অনুকূল পরিবেশই তাদের আত্মত্মবিকাশের বড় কারণ। একথাও লক্ষণীয় যে, কোন পরকীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি বা প্রগতিপথের ঝলকে, কোন ইন্দ্রজালের ক্ষণিক মায়ায় বা স্বার্থচিন্তার মোহ-বিভ্রমে পড়ে মুসলমানেরা ইসলামের মহান উদার আদর্শ হতে যখন যত দূরে সরে পড়েছে, পরিণামে ঠিক ততখানিই দূরে সরে পড়েছে তারা প্রকৃত কল্যাণ ও উন্নতির পথ হতে। ইসলামের আসল বৈশিষ্ট্য তার অনুপম ঔদার্য-তার সার্বজনীনতা। মুসলমানের এই মহান শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস হল তার কোরান ও হাদীস। বিদায় বেলায় এদের কথাই মহানবী বলেন-আরাফাতে সমবেত সেই সংঘকে:

তোমাদের কাছে রেখে গেনু আজি

দুটি মহা উপহার

কোরানের পূত মঙ্গল-বাণী

মম উপদেশ আর।

যতদিন সবে পরম আদরে

আঁকড়ি রাখিবে ধরি দুই করে

হারাবে না পথ ঝঞ্চা ও ঝড়ে

সংসার সাহারার। (৮)

মুসলমানকে আবার বড় হতে হলে এঁদের নির্দেশিত উদার পথে চলেই বড় হতে হবে।

[১৯৪৮ সালের ২৩শে জানুয়ারি তারিখে ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের মাঘোৎসব সভায় পঠিত এই প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত “ইব্রাহিম খাঁ রচনাবলী-১” থেকে সংগৃহীত এবং ঈশৎ পরিমার্জিত।]

 

টিকাঃ

  • (১) কথিকা-আবুল হাশেম
  • (২) কথিকা-আবুল হাশেম
  • (৩) ইকবাল
  • (8) ইকবাল
  • (৫) কথিকা-আবুল হাশেম
  • (৬) হালী
  • (৭) কথিকা-আবুল হাশেম
  • (৮) কথিকা-আবুল হাশেম
১৬৫ বার পঠিত

শেয়ার করুন

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top