নতুনের প্রতি আকর্ষণ বস্তুতঃ একটি প্রশংসনীয় প্রেরণা এবং মানুষের জন্মগত আকর্ষণ। এই উদ্দীপনা না-থাকলে মানুষ পাথরের যুগ থেকে এ্যাটমের যুগ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হত না। অগ্রসর হতে পারত না, উট ও গরুর গাড়ি থেকে উড়োজাহাজ পর্যন্ত। মাটির প্রদ্বীপ বা মোমবাতির আলো হতে বিজলি বাতি, সার্চ লাইট পর্যন্ত উন্নতি করতে পারত না। এ সবই মানুষের বস্তুগত উন্নতি ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য। এক দিকে যেমন তারা গ্রহ- নক্ষত্রের নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে, অন্য দিকে সাগরের গভীর তলদেশে পৌঁছে অজানাকে জানার পয়গাম নিয়ে এসেছে। এ সবই মানুষের এই সহজাত প্রেরণারই পরিণতি যে, সে আধুনিকপ্রিয় এবং উত্তম থেকে উত্তমতরের প্রতি আকর্ষিত।

সুতরাং প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম কেবল ‘নতুন’ হওয়ার কারণে কোন ‘নতুন’ বিষয়ের প্রতি কোনরূপ বিধি-নিষেধ আরোপ করেনি। বরং সময়ে তাকে প্রশংসনীয় বলা হয়েছে এবং তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

বিশেষত কারিগরি, শিল্প ও যুদ্ধের কলা কৌশল প্রভৃতি বিষয়ে নতুন- নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করার বিষয়টি স্বয়ং হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই প্রমাণিত আছে। গাযওয়ায়ে আহযাবের সময় সমগ্র আরব গোত্র সম্মিলিতভাবে মদীনায় আক্রমন করার পরিকল্পনা করলে, হযরত সালমান ফারসী (রা) তা প্রতিহত করার জন্য এমন একটি নতুন কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দেন, যেটি আরবে এর আগে কখনো ব্যবহৃত হয়নি। সেই কৌশলটি ছিল, শহরের চারপাশে গভীর পরিখা খনন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পরামর্শটি গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করেন। তিনি নিজেও পরিখা খননের কাজে অংশ গ্রহণ করেন। (আল বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ ৯৫.৪)

হযরত সালমান ফারসী (রা) এর পরামর্শক্রমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ যুদ্ধে দুটি নতুন যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেন। কোন কোন বর্ণনা মতে সেগুলো হযরত সালমান (রা) নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। তন্মধ্যে একটি ছিল আধুনিক কালের আগ্নেয়াস্ত্র জাতীয় অস্ত্র এবং অন্যটি ছিল ট্যাংক জাতীয়। (আল বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ ৩৪৮.৪)

এখানেই শেষ নয়। বরং হাফেজ ইবনে কাসীর (রহঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ ও হযরত গায়লান ইবনে সালামা (রা) কে সিরিয়ার জরস নামক শহরে পাঠিয়েছিলেন; যাতে সেখানে থেকে তারা আগ্নেয়াস্ত্র, কামান, ট্যাংক তৈরির প্রযুক্তি শিক্ষা করে আসে। জরস ছিল সিরিয়ার একটি প্রসিদ্ধ শিল্প নগরী। এই দুই সাহাবী সিরিয়ায় সমরাস্ত্র-বিদ্যা অর্জনে নিরত ছিলেন বলেই তারা হুনাইন ও তায়িফ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেননি। (তাবকাত ইবনে সাআদ- খ.২. পৃ. ২২১, তারিখে তাবারী পৃ. ১৬৬৯, আল বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ খ. ৪, পৃ. ৩৪৫)

 

হাফেজ ইবনে জারীর বর্ণনা করেন, কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদেরকে বেশি করে চাষাবাদ করার নির্দেশ দিতেন। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জমিতে উটের গোবর ব্যবহার করার উপদেশ দিতেন। (কানযুল উম্মাল খ. ২ পৃ. ২১৯)

এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাপড়ের ব্যবসা করার জন্য মানুষকে উপদেশ দান করতেন। কেননা, কাপড়ের ব্যবসায়ীরা মনে-মনে কামনা করে, মানুষ সুখী স্বচ্ছল থাকুক। (কানযুল উম্মাল খ. ২, পৃ. ১৯৭)

এমনকি নবী করীম সা. কতিপয় লোককে ব্যবসায়ের উদ্দেশে ওমান ও মিসরে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। (কানযুল উম্মাল খ. ২, পৃ. ১৯৭)

কৃষি ও খনিজ দ্রব্য থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

أطلبوا الرزق في خبايا الارض

অর্থাৎ, জমিনে লুকায়িত নিয়ামতের মধ্যে তোমরা রিযিক অনুসন্ধান কর। (কানযুল উম্মাল খ. ২, পৃ. ১৯৭)

আরবের মানুষ নৌ জাহাজ কী তা জানত না। অথচ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দের সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, আমার উম্মতের মধ্য হতে কিছু লোক আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে পরাক্রমশালী সম্রাটের ন্যায় সামুদ্রিক ঊর্মিমালার উপর দিয়ে সফর করবে। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ) অতঃপর মুসলমানদের প্রথম নৌবাহিনীর অনেক ফযীলত বর্ণনা করেছেন। হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত উসমান (রা) এর খিলাফতকালে প্রথম সামরিক নৌবহর পরিচালনা করেন এবং সাইপ্রাস, রোডস, ইরকালিয়ান, সিসিলি প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জে মুসলিম আধিপত্য সম্প্রসারিত হয়। এমনকি সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল তাদের দখলে চলে আসে।

تھا یہاں ہنگامہ ان صحرا نشینوں کا کبھی

بحر بازی گاہ تھا جن کے سفینوں کا کبھی

একদিন এখানে সেই মরুচারীদের সমাগম ছিল।

সাগরের উত্তাল তরঙ্গ যাদের জাহাজগুলোর খেলার মাঠ ছিল।

হযরত আমর ইবনুল আস (রা) অষ্টম হিজরীতে লখম এবং জুযাম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘যাতুস সালাসিল’ অভিযানে সর্ব প্রথম ‘ব্লাক আউট’ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন। সৈন্যদের মাঝে ঘোষণা করে দেন, তিন দিন পর্যন্ত শিবিরে কোন প্রকার বাতি বা আগুন জ্বালানো যাবে না। মুসলিম সৈন্যদল মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জানতে পারেন, তখন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে হযরত আমর ইবনুল আস (রা) উত্তরে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, শত্রু-সৈন্যের তুলনায় আমাদের সৈন্য ছিল কম। আমাদের সৈন্যস্বল্পতা টের পেয়ে শত্রুরা যাতে আমাদের উপর চেপে বসতে না পারে, সে জন্য রাতে আলো জ্বালাতে নিষেধ করেছিলাম। রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সমর-কৌশলটি পছন্দ করেছিলেন এবং এর উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। (জামউল ফাওয়ায়েদ, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা-২৭)

সার কথা, এগুলো ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগের কতিপয় বিচ্ছিন্ন ঘটনার উদাহরণ। এ থেকে বুঝা যায় যে, নিছক নতুন হওয়ার কারণে কোন নতুন পদক্ষেপ বা আবিষ্কারের উপর ইসলাম কোন আপত্তি তোলেনি। বরং বৈধ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বৈধ সীমার মধ্যে থেকে আধুনিকতা প্রীতিকে উৎসাহিত করেছে।

তবে এটাও বাস্তব সত্য যে, আধুনিকতা প্রীতি ও নতুনের প্রতি আকর্ষণ যেমনিভাবে মানুষকে বস্তুগত উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে, নতুন- নতুন আবিষ্কারের পথ উন্মুক্ত করেছে, দান করেছে ভোগ বিলাসের সর্বোত্তম পদ্ধতি; অনুরূপভাবে এটা মানুষকে আক্রান্ত করেছে অসংখ্য আত্মিক ব্যাধিতে। ধ্বংসাত্মক ক্ষতি সাধনও করেছে অনেক। এই প্রগতির আশির্বাদে মানবেতিহাস আজ অনেক ফেরাউন-শাদ্দাদে পরিপূর্ণ; ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যলিপ্সা যাদের কোন অবস্থাতেই নির্বাপিত হয়নি। অবশেষে তারা শক্তির অহমিকায় রাজত্বের সীমা ডিঙ্গিয়ে খোদায়িত্বের দাবী করে বসে। এই প্রগতি হিটলার ও মুসেলিনিকেও জন্ম দিয়েছে। যাদের রাজ্যলিপ্সু-মন প্রতিদিন একটি করে নতুন ভূখন্ডের নেতৃত্ব কামনা করত। সারা বিশ্বে আজ উলঙ্গপনা আর অশ্লীলতার ঝড় তুলেছে এই প্রগতিপ্রীতি। পরস্পরের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যভিচারকেও বৈধতার সনদ দিয়েছে। এমনকি আজ বৃটেনের সংসদে প্রবল করতালির মাঝ দিয়ে সমকামিতার বিল মঞ্জুর করিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই আধুনিকতাপ্রীতির পরিণতিতে আজ পশ্চিমা নারীরা গর্ভপাত ঘটানোর অনুমোদনের জন্য প্রকাশ্যে দাবী আদায়ে সোচ্চার হয়েছে। এই আধুনিকতাপ্রীতিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে আজ মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম) নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনের দাবী করা হচ্ছে।

 

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে, ‘আধুনিকতাপ্রীতি’ এক দু-ধারী তরবারীর ন্যায়। যা একদিকে যেমন মানুষের অশেষ উপকার সাধন করতে পারে। অন্যদিকে সর্বনাশা ক্ষতিও ডেকে আনতে পারে। অতএব একটি নতুন আবিষ্কার নিছক নতুন হওয়ার দরুন যেমন গ্রহণীয় হতে পারে না। আবার কেবল নতুন হওয়ার কারণে বর্জনীয়ও হতে পারে না। কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মাপকাঠির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে যে, কোন আবিষ্কারটি উপকারী ও সাদরে গ্রহণীয় এবং কোনটি ক্ষতিকারক ও পরিত্যাজ্য। এই মানদন্ড নির্ধারণের একটি পদ্ধতি এও হতে পারে যে, বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বিবেক-বুদ্ধির হাতে সমর্পন করা হবে। সেক্যুলার সমাজে বিবেক-বুদ্ধির কাছেই সিদ্ধান্তের ভার অর্পণ করা হয়। কিন্তু এখানে সমস্যা হল, ‘প্রগতিবাদের’ নামে যারা মনুষ্যসমাজ থেকে শিষ্টাচার এবং শালীনতার যাবতীয় গুণ ছিনিয়ে নিয়ে পশুত্ব এবং হিংস্রতার অন্ধকার গলিতে এনে দাঁড় করিয়েছে তারা সকলেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দাবীদার ছিল। তারা সকলেই আপন বিবেক-বুদ্ধিকে নিজের একমাত্র পথ প্রদর্শক বানিয়েছিল। এর প্রকৃত কারণ হল, ঐশ্বরিক জ্ঞানের নিয়ন্ত্রন হতে মুক্ত হওয়ার পর ‘বিবেক-বুদ্ধির’ উদাহরণ হল, এক বহুচারিণী প্রেমাষ্পদের ন্যায়। পরস্পর বিরোধী চরম শত্রু একই সময়ে যাকে নিজের বলে ভাবে, অথচ সে কারো নয়। সুতরাং এমন ‘বিবেক-বুদ্ধির’, কাছে চরম নিকৃষ্ট, ঘৃণিত কাজ ও সিদ্ধান্তের স্বপক্ষেও অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য এবং মনোরম ব্যাখ্যা খুব সহজেই মিলে যাবে। উদাহরণত, হিরোশিমা ও নাগাসাকির নাম শোনা মাত্র আজও মানব সভ্যতা নেয়ে ঘেমে একাকার হয়ে যায়। অথচ এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকার মত বিশ্বখ্যাত গ্রন্থে যে- এটমবোমা নিক্ষেপের কারণে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়েছিল, তা পরে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এটম বোমার সংজ্ঞায় সর্ব প্রথম এই বাক্য লিখা হয়েছে:

Former prime minister Winston Churchill estimated that by shortening the war, the atomic bomb had saved the lives of 10,00,000 U.S. soldiers and 2,50,000 British soldiers. (ব্রিটানিকা, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৪৭, মুদ্রণ ১৯৫০ ইং, প্রবন্ধ: এটমবোম)।

অর্থাৎ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল মনে করেন যে, এটমবোমা যুদ্ধ সংক্ষেপ করে দশলক্ষ মার্কিন সৈন্য এবং আড়াইলক্ষ বৃটিশ সৈন্যের জীবন রক্ষা করেছে। এবার ভাবুন, এ ধরণের যুক্তির অবতারনা করা হলে কোন্ জুলুম-বর্বরতাকে বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী বলা যেতে পারে?

বিবেক প্রসূত ব্যাখ্যার এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়। এখানে লজ্জা শরমের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করে একটি উদাহরণ পেশ করব, যাতে বিবেক-বুদ্ধির সঠিক অবস্থান দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যায়। ইসলামী ইতিহাসে বাতেনিয়া নামক একটি পথভ্রষ্ট ফেরকার উদ্ভব ঘটেছিল। উবায়দুল্লাহ আল কিরওয়ানী নামক তাদের এক লিডার লিখেছেন:

وما العجب من شئ كالعجب من رجال يدعي العقل ثم يكون له أخت أو بنت حسناء وليست له زوجة في حسنها فيحرمها على نفسه و ينكحها من اجنبي ولو عقل الجاهل لعلم أنه أحق بأخته وبنته من الأجنبي ووجه ذالك إلا أن صاحبهم حرم عليهما الطيبات

(الفرق بين الفرق لعبد القاهر البغدادي)

অর্থাৎ, এরচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় আর কী হতে পারে যে, কোন ব্যক্তি সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও এমন বোকামি করতে পারে যে, স্বীয় স্ত্রী অপেক্ষা সুন্দরী কন্যা বা বোন তার ঘরে রয়েছে; অথচ এই সুন্দরী কন্যা বা বোনকে নিজের জন্য হারাম সাব্যস্ত করে তাকে অপরিচিত কোন ব্যক্তির কাছে বিয়ে দেয়। এই নির্বোধদের সামান্য বিবেক-বুদ্ধি থাকলে তারা বুঝত যে, কোন অপরিচিত ব্যক্তির তুলনায় স্বীয় রূপসী কন্যা বা বোনকে বিয়ে করার অধিকার তারই সবচেয়ে বেশি ছিল। এই নির্বুদ্ধিতার মূল কারণ, তাদের নবী তাদের জন্য উত্তম বস্তু হারাম করেছেন।

এই ঘৃণ্য মন্তব্যের প্রতি যত খুশি অভিশম্পাত করুন। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন তো, যে বিবেক আল্লাহ প্রদত্ত ওহীর জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তার কাছে এই যুক্তি খন্ডনের বিবেক প্রসূত কোন উত্তর আছে? বাস্তবতা হচ্ছে, কোন স্বাধীন বিবেকের কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। তাই শত-শত বছর পর আজ উবায়দুল্লাহ কিরওয়ানীর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে চলেছে। পশ্চিমাদেশে আজ বোনকে বিবাহের দাবী উঠছে।

সার কথা হল, ‘প্রগতিবাদের’ রীতি অনুসারে যদি ভাল-মন্দের ফয়সালার ভার শুধু বুদ্ধির উপর ন্যাস্ত করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন জীবনের কোন অংশই নিরাপদ থাকবে না। অন্যদিকে প্রত্যেকের বিবেক-বুদ্ধি অন্যের থেকে ভিন্ন রূপ হওয়ার কারণে মানুষ পরস্পর বিরোধী এমন সব ভুলের গ্যাড়াকলে ফেসে যাবে, যার থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায় থাকবে না। কারণ যে বিবেক আল্লাহ প্রদত্ত ঐশী জ্ঞানের বন্ধনমুক্ত, মানুষ তাকে বলে মুক্ত-বুদ্ধি। মূলতঃ তখন সে তার পাশবিক কামনা এবং জৈবিক তাড়নার গোলাম হয়ে পড়ে। যেটা বিবেকের গোলামীর সর্ব নিকৃষ্ট পর্যায়। এ কারণে কুরআনে কারীমের পরিভাষায় এমন আকলকে هوى “হাওয়া” বা প্রবৃত্তি বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে:

وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَهُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ

সত্য যদি সে সব লোকদের প্রবৃত্তির অনুগত হয়ে যেত, তাহলে আকাশ জমিন এবং সৃষ্টিকুলের মাঝে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হত।

 

আইন দর্শনের আলোচনায় দার্শনিকদের এক দলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যাদের মতে চরিত্রকে বলা হয়, “Cognitvist Theory.”। বিখ্যাত আইনবিদ ড. ফ্রায়েডমান তার Leagal Theory গ্রন্থে এই মূলনীতির সার সংক্ষেপ বর্ণনা করেছেন এভাবে:

“Reason is and ought only to be the slave of the passions and can never pretend to any other office than to serve and obey them. (P. 36)

বুদ্ধি তো মানবীয় আবেগ ও প্রবৃত্তির গোলাম মাত্র। আর প্রবৃত্তির গোলাম হওয়াটাই তার জন্য যুক্তিযুক্ত। কেননা আবেগ ছাড়া বুদ্ধি কোন কাজই করতে পারে না। সে কেবল আবেগের অনুসরণ করে।

 

এই মূলনীতির পরিণতি ড. ফ্রায়েডমানের ভাষায়:

“Every thing else but also words like ‘good’ ‘bad’ ‘ought’ ‘worthy’ are purely emotive and there cannot be such a thing as ethical and moral science” (P. 36-37)

প্রত্যেক বিষয় এমনকি ভাল-মন্দ, আবশ্যক-অনাবশ্যক ও উপযুক্ত- অনুপযুক্ত হওয়ার ধারণা আবেগ প্রসূত কথা এবং পৃথিবীতে নৈতিকতা বলতে কোন জিনিসের অস্তিত্ব নেই।

 

এই দৃষ্টিভঙ্গি আইন দর্শনের ভিত্তি হওয়ার জন্য যতই ভুল বা মন্দ সাব্যস্ত হোক, কিন্তু এটি এক ধর্মনিরপেক্ষ বিবেকের বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ। বাস্তব সত্য হল, ধর্মনিরপেক্ষ বিবেকের আনুগত্যের অনিবার্য পরিণতি এছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে, নৈতিকতা বলতে কোন জিনিষের অস্তিত্ব পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে না এবং মানুষের কথা ও কাজের উপর তার প্রবৃত্তিজাত আবেগ ছাড়া অন্য কারো রাজত্ব চলবে না। ধর্মনিরপেক্ষ বিবেক আর ‘নৈতিকতা’ কোন অবস্থায়ই সহাবস্থান করতে পারে না। কারণ, ‘প্রগতিবাদের’ ধারায় এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়, যখন মানুষের অন্তর একটি কাজকে খারাপ মনে করে; কিন্তু, ‘প্রগতিবাদ’ ও ধর্মনিরপেক্ষ বিবেকের নিকট সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার মত কোন দলিল থাকে না বলে তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আজ পশ্চিমা চিন্তাবিদগণ এই ভয়াবহ অসহায়ত্বের শিকার। বিগত কয়েক বছর পূর্বে বৃটেনের পার্লামেন্ট সমকামিতার যে আইনটি পাশ করেছে, বৃটেনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বুদ্ধিজীবী তাকে পছন্দ করেন নি। তথাপি তারা সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, প্রগতিবাদীদের দর্শনে যে মন্দ কাজগুলো প্রচলন ব্যাপকতা লাভ করে, সেগুলোকে আইনগত বৈধতা দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। বিষয়টি বিবেচনার জন্য গঠিত বুলফিন্ডেন কমিটি যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে, তা নিম্নরূপ:

“Unless a deliberate attempt is made by society acting through the agency of the law to equate this fear of crime with that of sin, there must remain a realm of private morality and immorality which in brief and crude terms, not the law’s business. (The Legal Theory)”

“আইনের অধীনে পরিচালিত সমাজের পক্ষ হতে যতক্ষণ পর্যন্ত বুঝে শুনে এই প্রচেষ্টা চালানো না হবে যে, মানুষের মাঝে অপরাধে লিপ্ত হওয়ার ভয় অপরাধের গুনাহের সমপর্যায়ের বলে প্রতিভাত হবে; ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও অনৈতিকতার চিন্তা চেতনার আধিপত্য বহাল থাকবে যাকে সুস্পষ্ট ভাষায় সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হবে যে তা আইনের পরিমন্ডলের আওতায় পড়বে না”।

 

অথচ বাস্তব সত্য হল এই যে যদি “ভাল-মন্দ” নিরূপণের সমস্ত সিদ্ধান্ত নিরেট বিবেকের উপর ন্যস্ত করা হয়, তাহলে মানুষের কাছে এরূপ কোন মানদন্ডই অবশিষ্ট থাকবে না, যার উপর ভিত্তি করে যে কোন নতুন প্রথাকে ঠেকানো যাবে। বরং অতিমূল্যবান চারিত্রিক শৃঙ্খলাও প্রগতিবাদের স্রোতে ভেসে যাবে।

আইনবিদগণ আজ খুবই চিন্তিত যে, প্রগতিবাদের এই অপ্রতিরোধ্য সয়লাবের মাঝে এমন কী নীতি অবলম্বন করা যায়, যাতে কমপক্ষে কিছু উচ্চ মানবীয় গুণাবলী সংরক্ষিত ও অপরিবর্তনীয় থাকবে। সুতরাং এক মার্কিন জজ বিচারপতি কার্ডোজো লিখেছেন:

আইনের জন্য আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল, আইনের এমন একটি মুলনীতি তৈরি করা যেটা হবে স্থির অপরিবর্তনীয় এবং বিবাদমান পরিস্থিতির চাহিদাগুলোর মাঝে সমন্বয় বিধানকারী।” (The Growth of the Law)

কিন্তু এটা কোন মানবীয় বিবেক প্রসূত দর্শনের পক্ষে সম্ভব নয়। যাবতীয় বিপর্যয়ের সৃষ্টি এখান থেকেই যে ঐশি প্রত্যাদেশের দায়দায়িত্ব মনুষ্য বিবেক বুদ্ধির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তার উপর এমন এক অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা বহনের সামর্থ তার নেই। বস্তুত, কোন আইনকে স্থায়ী এবং অপরিবর্তনশীল হওয়ার দাবী করলে, তার পিছনে শক্তিশালী যুক্তি প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু মানুষের জ্ঞান এমন কোন যুক্তি পেশ করতে অক্ষম। আজ কিছু লোক স্বীয় জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কোন একটি আইনকে অপরিবর্তনশীল বলে স্থির করবে; কাল অন্য জনের মনে হবে এটা স্থায়ী আইন হওয়ার যোগ্য নয়। সুতরাং তারা সেটাকে পরিবর্তনশীল বলে ঘোষণা করবে। অতএব বিষয়টি সমাধানের একটি মাত্র পথ যা রয়েছে তা হলো, মানুষ তার বুদ্ধিকে প্রবৃত্তির গোলাম না-বানিয়ে সেই মহান সত্তার গোলাম বানাবে, যিনি তাকে ও সমগ্র মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু পৃথবীর আবর্তন- বিবর্তন সম্পর্কে তিনিই সম্পূর্ণরূপে অবগত। অতএব তিনি ব্যতীত অন্য কেউ বলতে পারে না যে, আইনের কোন ধারাটি অপরিবর্তনশীল। প্রখ্যাত আইন প্রণেতা জর্জ প্যাটন সত্যকথাই বলেছেন:

“What interests should the ideal legal system protect? This is a question of values, in which legal philosophy plays its part… But however much we desire the help of philosophy, it is difficult to obtain. No agreed scale of values has ever been reached indeed it is only in religion that we can find a basis, and the truths of religion must be accepted by faith or intuition and not purely as the result of logical argument.” (Paton: Jurisprudence P. 121)

আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি আদর্শ সমাজে কোন্ কোন্ বিষয়গুলো সংরক্ষণ করা উচিৎ? এটি মূল্যবোধ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আইন দর্শন এতদসংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু এই ব্যাপারে আমরা দর্শনের কাছে যতই সাহায্য প্রার্থনা করি, ততই এই প্রশ্নের উত্তর মেলা কষ্টকর হয়ে পড়ে। কারণ, মূল্যবোধের এখন পর্যন্ত কোন সর্বসম্মত মাপকাঠি জানা যায়নি। বস্তুত একমাত্র ধর্মই হল এমন একটি বস্তু যাতে আমরা এর একটি শক্ত ভিত্তি পাই। তবে ধর্মীয় তত্ত্বকে কেবল যৌক্তিক প্রমাণ দিয়ে বিচার করলে চলবে না বরং গভীর অনুরাগ ও বিশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে।

সারকথা যুগের নতুনত্ব সম্পর্কে ভাল-মন্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেকুলার চিন্তাজাত বুদ্ধি ও জ্ঞান সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং এই সমস্যা সমাধানের জন্য এখন একটি মাত্র পথ অবশিষ্ট রয়েছে। তা হল, আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত বিধি বিধান থেকে দিক-নির্দেশনা গ্রহণ করা। মানবতার মুক্তির জন্য এটা ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই। কুরআন কারীম ঘোষণা করেছে:

أَفَمَنْ كَانَ عَلَي بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّهِ كَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ وَاتَّبَعُوا أَهْوَاهُمْ (محمد (١٤)

যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার পক্ষ হতে আগত নিদর্শন অনুসরণ করে, সে কি তার মত, যার কাছে তার মন্দকর্ম সমূহ ভাল বলে মনে হয় এবং সে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে? (মুহাম্মদ: ১৪)

সুতরাং এহেন সমস্যার একমাত্র সমাধান এই যে, যুগের প্রতিটি নতুন পন্থা পদ্ধতি ও আবিষ্কার, প্রতিটি নতুন প্রথা ও প্রচলনকে তার বাহ্যিক চমকের উপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা চলবে না। বরং সেগুলোকে গ্রহণ করতে হবে এই ভিত্তিতে যে তা সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী হচ্ছে কি না। যদি সেই ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ থেকে থাকে তাহলে তাকে দ্বিধাহীনভাবে মেনে নিতে হবে। এ মর্মে কুরআনে কারীম ঘোষণা করেছে:

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلاً مبينا (احزاب)

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ এবং নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হবে। (আহযাব : ৩৬)

অন্যত্র ঘোষণা হয়েছে:

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না-তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে করে; তারপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নিবে। (নিসা: ৬৫)

আল্লাহ তায়ালা যে সকল বিধি বিধান স্বীয় গ্রন্থে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে প্রদান করেছেন, সেগুলো এমন সব বিষয়ের সাথেই সংশ্লিষ্ট যে সব বিষয়ে কেবল জ্ঞানের উপর নির্ভর করলে সেগুলো মানুষকে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ যেহেতু অতীত ও ভবিষ্যতের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত, সুতরাং কেবল তারই বিধান সর্বযুগে প্রযোজ্য হতে পারে। তিনি ঘোষণা করেন:

يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَنْ تَضِلُّوا وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

তোমরা বিভ্রান্ত হবে বলে আল্লাহ তোমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন। আর আল্লাহ হচ্ছেন সর্ববিষয়ে অবগত। (নিসা: ১৭৬)

এর থেকে আধুনিকতার ব্যাপারে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মানব-জ্ঞানের মাধ্যমে এই সব বিষয়ে হেদায়াত বা সঠিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পৌঁছা অসম্ভব। তাই ওহী ও আহকামে শরীয়তের তীব্র প্রয়োজন। আর এ কারণেই আল্লাহর বিধানের হুবহু অনুসরণ করাও একান্ত জরুরী। যুগের কোন প্রথাকে প্রথমে নিজের জ্ঞান দ্বারা নির্ভুল এবং উত্তম বলে স্থির করে নিয়ে অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহকে তার সাথে ফিট করার জন্য টানাটানি করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের চোরাপথ অবলম্বন করা মোটেও সমীচীন নয়। কেননা, একে আল্লাহর বিধানের অনুসরণ বলা যায় না; এটাকে বরং অনুসরনের নামে সংশোধন ও পরিবর্তন বলা যায়। যা করার অধিকার কোন মানুষের নেই। কেননা, এতে আল্লাহর বিধান নাযিলের আসল উদ্দেশ্যই পাল্টে যায়। ইত্তিবা বা অনুসরণ বলতে বুঝায় যে, আল্লাহর বিধান সর্বাঙ্গীন ত্রুটিমুক্ত ও পূর্ণাঙ্গ -এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে কোনরূপ সংশোধন- পরিবর্তন ব্যতীত মানুষ তা অম্লান বদনে গ্রহণ করবে। পৃথিবীর সমগ্র মানুষ মিলে চেষ্টা করলেও তাকে আল্লাহর বিধান হতে বিচ্যুত করতে পারবে না।

ইরশাদ হচ্ছে:

لا مبدل لكلماته وهو السميع العليم. وإن وتمت كلم ربك صدقا وعدلا تُطِعْ أَكْثَرَ مَن الأرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ الله و إِنْ إن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ في وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ إِلَّا يَخْرُصُونَ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ مَنْ يَضِلُ عَنْ سَبِيْلِهِ وَهُوَ ا

আপনার প্রতিপালকের বাণী যথার্থ সত্য ও ভারসাম্যপূর্ণ। তাঁর বাণীর কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনি শ্রবণকারী মহাজ্ঞানী। আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমান ভিত্তিক কথা-বার্তা বলে থাকে। আপনার প্রতিপালক তাদের সম্পর্কে খুব জ্ঞাত রয়েছেন, যারা তার পথ থেকে বিপথগামী; এবং তিনি তাদেরকেও খুব ভাল করে জানেন, যারা তার পথে অনুগমন করে। (আনআম: ১১৫-১১৭)

অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:

قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا انْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلَهُ قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوْحِيَ إِلَيَّ

যারা আমার সাক্ষাতের (কিয়ামতের) উপর বিশ্বাস রাখে না তারা বলে, এই কোরআন ছাড়া অন্য কোন কোরআন নিয়ে এসো অথবা একে পরিবর্তন করে দাও। তাদেরকে আপনি বলে দিন, একে নিজের পক্ষ হতে পরিবর্তন করে দেওয়ার অধিকার আমার নেই। আমি তো সেই নির্দেশেরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে আসে। (ইউনুস: ১৫)

এই ধরনের অনুসরণ করতে গেলে কখনো যুগের প্রতিকূলতা ও চরম বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে হাজারো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যারা এই প্রতিকূল অবস্থা দৃঢ় চিত্তে মুকাবেলা করেন, তাদেরই আল্লাহর পক্ষ হতে দুনিয়া ও আখিরাতে হিদায়েতের নিয়ামত নসীব হয়। ইরশাদ হচ্ছে:

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَع

সুতরাং যে ঐশী বিধানের মাঝে বাহ্যিক লাভ দৃষ্টিগোচর হয়, সেটাকে গ্রহণ করা এবং যেখানে একটু কষ্ট বা প্রতিকূলতা দেখা দেয় সেটা প্রত্যাখ্যান করা কিংবা জটিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে তা এড়িয়ে যাওয়া মোটেই বৈধ নয়। কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী এই কাজের মধ্যে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের বিড়াম্বনা। ইরশাদ হচ্ছেঃ

“যারা আমার পথে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন”। (আনকাবুত : ৬৯)

মানুষের মধ্যে কেউ-কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে; যদি সে কোন পার্থিব কল্যাণ প্রাপ্ত হয়, তাহলে ইবাদতের উপর কায়েম থাকে এবং যদি কোন পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। এমন ব্যক্তি ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এটাই প্রকাশ্য ক্ষতি। (হজ্জ: ১১)

মোট কথা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রত্যেক নতুনত্বের ভাল-মন্দ যাচাই করার মাপকাঠি হল, আল্লাহ-প্রদত্ত শরীয়তের বিধান। যদি তা শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হয়, তাহলে সেটা গ্রহণীয়। আর যদি শরীয়তের বিধানের পরিপন্থী হয়, তাহলে শরীয়তের বিধানে কোনরূপ বিয়োজন-সংযোজনের পথ অবলম্বন না করে সে বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এতে যুগ-প্রথার বিরোধিতাই হোক বা মানুষ তাকে এই কাজের জন্য যত নিন্দা-বিদ্রুপই করুক। একজন মুসলমানের নিকট এই নিচুমনা বিদ্রুপের উত্তর শুধু এটাই:

اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدَّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ

বরং আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন। আর তাদেরকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন, যেন তারা নিজেদের অহংকার ও কুমতলবে হয়রান ও পেরেশান থাকে। (বাকারা: ১৫)

তবে এই বিধান যে সব বিষয়ে কুরআন ও হাদীস ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব বা হারাম ও মাকরূহ হিসেবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেই সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সুতরাং এই বিধান সর্ব যুগে সর্বাবস্থায় অপরিবর্তনীয় থাকবে। আর যে বিষয়গুলো ‘মুবাহ’ এর অন্তর্ভূক্ত, সে সব বিষয়ে মানুষকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। মানুষ সময়ের দাবী ও প্রয়োজন অনুযায়ী সে ক্ষেত্রে গ্রহণ বা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, জীবনের এমন বিষয় সংখ্যায় খুবই কম, যে ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত ফরয, ওয়াজিব, মাসনূন, মুস্তাহাব বা হারাম ও মাকরূহের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে এবং অপরিবর্তনীয় বলে সাব্যস্ত করেছে। পক্ষান্তরে জীবনের অসংখ্য বিষয় ‘মুবাহ’ এর অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে এবং তা গ্রহণ বা বর্জনের বিষয়টি সব সময় পরিবর্তনশীল।

সুতরাং ইসলাম আধুনিকতা বা প্রগতিবাদের বিকাশের জন্য যে ক্ষেত্র দান করেছে, তা অত্যন্ত ব্যাপক। এর মাঝে সে তার পূর্ণ কর্মদক্ষতা দেখাতে পারে। মানুষ স্বীয় মেধা কাজে লাগিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছে যেতে পারে। এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মানবতার জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

 

অতএব আজ মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল, প্রগতিবাদের বৈধঅবৈধের সীমা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। ইসলাম মানুষকে আধুনিকতার বিকাশের জন্য যে প্রশস্ত ক্ষেত্র দান করেছে, তা গ্রহণ না করে শরীয়তের বিধান যে সব সীমিত বিষয়ের সীমানা নির্দ্ধারণ করেছে এবং যে সব বিষয়কে অপরিবর্তনীয় বলে ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে অনধিকার চর্চা না করা। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা হলযে ময়দানে নব উদ্ভাবনআবিষ্কারের পথ অবলম্বন করার ছিল, সেই ময়দানে আমাদের চেষ্টাতদবির একেবারে শূণ্য। অন্যদিকে আল্লাহর যে বিধানাবলী অপরিবর্তনশীল, মুসলমান আজ তাদের প্রগতিবাদের লাগামহীন ঘোড়া সেই দিকে ধাবিত করেছে। এরই অনিবার্য পরিণতি হিসেবে চলমান যুগ মানবতার জন্য কল্যাণকর যা কিছু উপহার দিয়েছে, তা থেকে আমরা বঞ্চিত। আর যে অনিষ্টতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত বেগে আমাদের সমাজে সংক্রামিত হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যুগচাহিদা অনুসারে স্বীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের তাওফীক দিন।

৮০৩ বার পঠিত

শেয়ার করুন

মতামত প্রকাশ করুন

Scroll to Top